মঙ্গলবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৬

দীপেন ভট্টাচার্য'এর গল্প : লৌহশকট

No matter how improbable an assertion is,
if it is made with enough assurance it has an affect.
- এরিক মারিয়া রিমার্ক



ভূমিকা:

আমাদের প্রটাগনিস্ট ছিল এক বিপ্লবী। সে রুশী বিপ্লবী। এই কাহিনী পুরোপুরিই একটি রুশী কাহিনী, একে হয়ত আর একটু সহজ ভাবে বলা যেত, হয়ত একজন গুণী লেখক সেটা করতে পারেন, কারণ ইতিহাসের ঘটনাকে নানাভাবে উপস্থাপনা করা সম্ভব, গুণী লেখকের হাতে সেটা ইতিহাসের পাঠ্যপুস্তক হয়ে ওঠে না, হয়ে ওঠে নাটক। আমি সেই লেখক নই।


এই গল্পের নায়ক বিপ্লবীর পুরো নাম হল কনস্তানতিন নিকোলায়েভিচ দ্রাগোমিরভ। কনস্তানতিন হল তার নাম, নিকোলায়েভিচ হল মধ্যনাম যা কিনা পিতার নাম নিকোলাই থেকে উদ্ভূত এবং দ্রাগোমিরভ হল পদবী। কনস্তানতিনকে ছোট করে কস্তিয়া বলে ডাকা যায়, তার নিকটজন তাকে কস্তিয়া বলে ডাকতে পারে। এই গল্পে কনস্তানতিনকে অনেক সময় কস্তিয়া বলে অভিহিত করা হয়েছে, অনেক সময় দ্রাগোমিরভও বলা হয়েছে। রুশ সংস্কৃতিকে একে অপরকে শ্রদ্ধা জানিয়ে সম্বোধন করতে হলে প্রথম নাম ও মধ্য নাম ব্যবহার করতে হয়, যেমন এইক্ষেত্রে বলতে হবে কনস্তানতিন নিকোলায়েভিচ। কাজেই কনস্তানতিন, কস্তিয়া ও কনস্তানতিন নিকোলায়েভিচ একই ব্যক্তি। একইভাবে কনস্তানতিনের স্ত্রীর নাম ও মধ্যনাম হল যথাক্রমে তাতিয়ানা ফিলিপভনা। তাতিয়ানাকে আবার ছোট করে তানিয়া বলা যায়, অর্থাৎ তার ডাক নাম হল তানিয়া। কনস্তানতিনের বন্ধু একজন চিত্রকর তার নাম হল গ্রিগরি দেনিসোভিচ কারেতনিকভ। গ্রিগরির ডাক নাম হল গ্রিশা। গ্রিগরিকে আমরা বেশিরভাগ সময় গ্রিশা বলেই সম্বোধন করেছি। কনস্তানতিন ও তাতিয়ানা ঐতিহাসিক চরিত্র, ইতিহাসে তাদের নাম ভিন্ন। গ্রিশা একটি কাল্পনিক চরিত্র। এই তিনজন এবং একটি কাল্পনিক জার্মান চরিত্র ছাড়া অন্য সবকটি চরিত্রের নাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। গল্পটি ঐতিহাসিক ঘটনাসমূহের প্রেক্ষাপটেই লেখা।


প্রথম অধ্যায়: জুরিখ, মার্চ ১৯১৭


ডিসেম্বরের শেষ থেকে সূর্যের উত্তরায়ণ শুরু হয়েছে, তাতে কি শীত কমে? বরং মার্চ শুরু হতে না হতে জাঁকিয়ে বসেছে ঠাণ্ডা। দুদিন আগে তুষারপাতে ঢেকে গিয়েছিল স্পিগেলগাস রাস্তা, এখন সেই তুষার গলতে শুরু করেছে। দোতলায় কোনো বারান্দা নেই, সকালে তাতিয়ানা রাস্তার দিকের জানালাটা খোলা বাতাসের জন্য খুলে দেয়, নিচে রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখে গ্রিগরি কারেতনিকভ এক বগলে একটা কাগজে-মোড়ানো ছবি, আর এক হাতে একটা ব্যাগ নিয়ে হেঁটে আসছে। তাতিয়ানার স্বামী কনস্তানতিন দ্রাগোমিরভ বাথরুমে ছিল, তাতিয়ানা যেয়ে দরজা ধাক্কা দিয়ে বলল, "কস্তিয়া! কারেতনিকভ আসছে।"

যতক্ষণ গ্রিশা কারেতনিকভ সিঁড়ি বেয়ে ১৪ স্পিগেলগাসের দোতলায় উঠে দরজার কড়া নাড়ল ততক্ষণে কনস্তানতিন বাথরুম থেকে ফিটফাট হয়ে বেড়িয়ে বাইরের জানালাটা বন্ধ করছিল। তাতিয়ানা দরজা খুলে বলল, "আসুন, আসুন, গ্রিগরি দেনিসোভিচ।" গ্রিশার মাথায় রুশী টুপি শাপকা, পরনে ঢিলে পান্তালোন, ওপরে ভারি কোট, এক বগলে ছবি, অন্য হাতে ব্যাগ। তাতিয়ানা তাঁর হাত থেকে ব্যাগটা নিল, গ্রিশা কোটটা খুলে দরজার পাশে রাখা একটা লম্বা কোটর‍্যাকে ঝুলিয়ে দিল।

কস্তিয়া নিজের দু-হাত ঘষতে ঘষতে জিজ্ঞেস করে, "সুপ্রভাত গ্রিগরি দেনসোভিচ, নতুন ছবি আঁকলেন নাকি?" গ্রিশা লক্ষ করে কস্তিয়ার চোখে মুখে কেমন যেন অস্থিরতা, মাথা ঝাঁকিয়ে বলে, "সুপ্রভাত। এই শীতে বাইরে বসে যে ছবি আঁকবো তার জো নেই, আমার জানালাতেই বসে যা দেখি তাই আঁকছি। এটা দোকানে নিয়ে যাচ্ছি, দেখি ওরা কী বলে।" গ্রিশার মুখটা একেবারেই ভালমানুষের, থুতনির নিচে অল্প দাঁড়ি, আর্টিস্টদের বোধহয় এরকম রাখতে হয়, তবে তাঁর লাল গালটা দেখতে এমনই গোলগাল আর নরম যে তাঁকে ঠিক আর্টিস্ট নয়, রুশী জমিদার বলেই মনে হতে পারে।

গ্রিশা ওপরের কাগজটা খুলে ছবিটা জানালার পাশে টেবিলের ওপরে রাখে। তানিয়া আর কস্তিয়া দেখল সবুজ আর হলুদ রঙের তীক্ষ্ণ রেখায় ফুটে উঠেছে গাছ, তার মধ্যে দিয়ে কিছু কিছু জিনিস উড়ে যাচ্ছে, পাখী হতে পারে। কিন্তু পুরো ব্যাপারটা স্পষ্ট নয়। গ্রিশা বলল, "ছবিটার নাম সবুজ-হলুদ বন।" তানিয়া বলল, "বাহ!" কস্তিয়া শ্বাস টেনে বলল, "এটা আপনি এই শীতে জানালার পাশে বসে এঁকেছেন?" গ্রিশা হা হা করে হাসল, উদার দরাজ হাসি। বলল, "আমি জানি আপনার এটা ঠিক পছন্দ হবে না কনস্তানতিন নিকোলায়েভিচ, কিন্তু আর্টের বিশ্ব বদলে যাচ্ছে। আপনি এসব ব্যাপারে একেবারেই রক্ষণশীল থেকে গেলেন।"

তানিয়া বলল, "আমি চায়ের জল বসাই, আপনারা কথা বলুন।"

কাঠের মেঝে, ঘরের দুদিকে দুটো বইয়ের তাক, জানালার পাশে টেবিল, সেখানেই খাওয়া হয়, তারপর কনস্তানতিন সেখানেই পড়াশোনা করে। দুজনে সেই টেবিলের পাশেই চেয়ার টেনে বসে। কনস্তানতিন বলল, "সবকিছু বদলাচ্ছে। আপনি কি খবর শোনেন নি?" টেবিলের ওপরেই জুরিখ জাইটুং খবরের কাগজটি ছিল, সেদিকে আঙ্গুল তুলে ইঙ্গিত করল কনস্তানতিন। গ্রিশা কাগজটি তুলে প্রথম পাতায় দেখল লেখা, "রাশিয়ায় বিপ্লব, জার অপসারিত।" কাগজ থেকে মুখ তুলে কস্তিয়ার দিকে তাকাল। তার মুখে সেই অস্থিরতা ফিরে এসেছে, নিজেকে যেন ধরে রাখতে পারছে না, কস্তিয়া চেয়ার ছেড়ে প্রায় লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে, বলে, "গ্রিগরি দেনিসোভিচ, এই দিনটার জন্য আমি কত বছর অপেক্ষা করেছি, আমার এখন পেত্রোগ্রাদ থাকার কথা, এই মরা জুরিখে নয়। এখনই সুযোগ, আমাদের কোনো না কোনোভাবে রাশিয়া যেতে হবে।"

গ্রিশা কিছুক্ষণ কস্তিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, ভাবল কস্তিয়া কেমন করে এই খবরটা এতক্ষণ চেপে ছিলে। রাশিয়ায় বিপ্লব কস্তিয়াকে বাদ দিয়েই হয়ে গেল, এই দুঃখ কি কস্তিয়া আর তানিয়া ভুলতে পারবে? কস্তিয়ার উজ্জ্বল চোখ, টাক-পড়া গোল মাথার দু-পাশে কালো চুল, তীক্ষ্ণ থুতনি, থুতনিতে দাড়ি। এসব কিছুর মধ্যে একটা চুম্বকের আকর্ষণ আছে, সে যখন কথা বলতে শুরু করে তখন সেই কথা না শুনে পারা যায় না। এই ফ্ল্যাটে তারা বছরখানেকের মত আছে, খুব একটা আনন্দে আছে তা নয়, কিন্তু জুরিখের নিরিবিলি কস্তিয়াকে লেখাপড়া করার সময় দিয়েছে, সাম্রাজ্যবাদের ওপর বইটা সে প্রায় শেষ করে এনেছে।

"আপনারা এখন রাশিয়া ফিরে যেতে চাইছেন?" গ্রিশা বলে, "তা তো সম্ভব নয়, যুদ্ধ যতদিন চলবে ততদিন তো আপনাদের সুইজারল্যান্ডেই থাকতে হবে।"

"তা বটে," ঘরময় পায়চারি করতে করতে কস্তিয়া বলে, "জার্মানি বা অস্ট্রিয়ার মধ্যে দিয়ে তো যাওয়া যাবে না। কোনো একটা উপায় বের করতে হবে। হয়তো জার্মানি রাজি হবে আমাদেরকে পথ দিতে।"

"জার্মানি রাজি হবে? কী বলছেন আপনি?" গ্রিশা প্রায় চিৎকার করে ওঠে। পূর্ব ফ্রন্টে রুশদেশের সঙ্গে জার্মানির যুদ্ধ চলছে, পশ্চিমে ফ্রান্স আর ব্রিটেনের সাথে।

"এটা একটা খুব সহজ ব্যাপার। আপনার সঙ্গে এই নিয়ে কতবার কথা হয়েছে, এই যুদ্ধের জন্য রাশিয়া কি যে দুর্দশার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে সে তো জানেনই! কিরকম অসহ্য অবস্থা দেখুন? আমরা যদি পূর্ব ফ্রন্টে যুদ্ধ থামাতে পারি সেটা রুশ দেশের জন্য আশীর্বাদ হবে।"

"মানে আপনি বলছেন জার্মান সরকারকে আপনি যদি বোঝাতে পারেন যে আপনি পূর্ব ফ্রন্টে যুদ্ধ থামাতে পারবেন তাহলে তারা আপনাকে জার্মানির মধ্যে দিয়ে যেতে দেবে?"


তানিয়া চা নিয়ে আসে, সাথে কিছু কেকের টুকরো। টেবিলের ওপর সেগুলো রেখে বলে, "কস্তিয়া আজ সকাল থেকে খুব অস্থির। কিন্তু ও যা বলছে সেটা ঠিক। আমাদের দেশে ফিরে যেতে হবে, এখানে বসে আমরা সময় নষ্ট করছি।"

গ্রিশা মাথা নাড়ায়, গত এক বছর ধরে এই বিপ্লবী দম্পতির সাথে তার ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছে, কিন্তু এখনো সে তাদের পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারে নি। সে বলে, "আপনারা দেখছি একেবারে নিশ্চিত যে রাশিয়ায় ফিরে গিয়ে আপনারা নতুন বিপ্লবী সরকারকে বোঝাতে পারবেন যে যুদ্ধ থামানো দরকার।"

কস্তিয়া পায়চারি থামায়। গ্রিশার দিকে তাকিয়ে বলে, "না বোঝাতে পারলে আমাদের ক্ষমতা নিতে হবে।"

গ্রিশা চায়ের কাপে চুমুক দেয়, সময় নেয় কথাটা আত্মস্থ করতে। বলে, "ক্ষমতা নেবেন? কীভাবে নেবেন, ভোটাভুটি করে? আপনি তো এত বছর দেশের বাইরে, আপনার মনে হয় আপনি অত তাড়াতাড়ি জনসমর্থন তৈরি করতে পারবেন?"

"ভোটের সমর্থন না পেলে সশস্ত্র বিপ্লব করতে হবে। সেনাবাহিনী এই যুদ্ধ চায় না, তারা আমাদের পক্ষে থাকবে, তারাই বিপ্লব করবে," এই বলে কস্তিয়া টেবিলে বসে।

গ্রিশা কাঁচের জানালা দিয়ে বাইরে একটা পত্রহীন ম্যাপেল গাছ দেখে। ভাবে মানুষ এত আত্মবিশ্বাস পায় কোথা থেকে। রাজনীতি হল রাজার নীতি, যে মানুষ নিজেকে রাজা হবার যোগ্য মনে না করে তার হয়তো রাজনীতি করা উচিত নয়, এইজন্য গ্রিশা কারেতনিকভ একজন চিত্রকর। সে বলে, "কনস্তানতিন নিকোলায়েভিচ, আপনি মানুষের ভাগ্য বদলাতে চান। আপনার বিশ্বাস, আপনার দৃঢ়তাকে আমি সম্মান করি, কিন্তু আপনি যে পথের কথা বলছেন তা খুবই বিপজ্জনক।"

কনস্তানতিন তার চা ছোঁয় না, রাজনীতির কথা একবার শুরু হলে সে সব্কিছু ভুলে যায়। বলে, "আর এখন? রুশদেশ কি এখন বিপদে নেই? সৈন্যরা ফ্রন্টে মারা যাচ্ছে, দেশের ভেতর মানুষ না খেয়ে মরছে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থা শ্রমিকদের প্রতিটি বিন্দু ঘাম থেকে টাকা আদায় করছে। এরকম তো চলতে দেয়া যায় না। আমার পথ এর থেকে আর কীরকম বিপজ্জনক হতে পারে?"

জানালার কাছে মাথাটা নিলে নিচে সরু রাস্তাটায় পথচারী দেখা যায়। আজ রোববার, রাস্তায় লোক কম, তবু টুপি, কোট, লম্বা ফ্রক পড়া মানুষ লাঠি হাতে হেঁটে যাচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে গ্রিশা যেন নিজের মনেই বলে, "আমি নিজেকে বড় আর্টিস্ট বলে দাবি করব না, দু-একটা ছবি আঁকি, সেগুলো যদি বিক্রি হয় তো আমার দিন চলে, ঠেকায় পড়লে লন্ডন থেকে আমার দিদি টাকা পাঠায়। আমি মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের কথা ভাবি না। পৃথিবীর সাথে আমার লেনদেন একেবারেই নিজস্ব, সেখানে সারা বিশ্বের মানুষের প্রতি আমার কোনো দায় নেই।"

"হা, হা," বেশ জোরে হেসে ওঠে কনস্তানতিন, "দায় নেই? দায় নেই বললেই হল। আমরা সবাই সবার কাছে দায়বদ্ধ। আপনি আর্টিস্ট মানুষ, ভাবেন ছবি এঁকে দিন পার করবেন। কিন্তু আপনার ছবি যে কেনে সে কেনার সামর্থ পায় কোথা থেকে, শ্রমিককে শোষণ করেই তো? ভেবে দেখুন আপনি যে রঙ-তুলি-কাগজ-কাপড়-কাঠ ব্যবহার করেন তার জন্য কত মানুষ প্রায় বিনা পয়সায় খেটে যাচ্ছে। আপনি তাদের সাথে এক সুতোয় বাঁধা, তাদের থেকে নিজেকে বিযুক্ত করতে পারবেন না।"

এরকম কথাবার্তা যে আগে তাদের মধ্যে হয় নি তা নয়, কিন্তু গ্রিশার মনে হল আজ কস্তিয়ার কথা অন্যদিনের চেয়ে তীক্ষ্ণ, যেন তাকে আঘাত দেবার জন্যই বলা। দু-দিন আগের রুশ বিপ্লব কস্তিয়াকে শক্ত করেছে। গ্রিশা অনেকদিন ধরে কস্তিয়াকে কিছু কথা বলবে ভাবছিল, কস্তিয়ার ব্যঙ্গোক্তির উত্তর সেটা হতে পারে, কিন্তু রোববার সকালের চায়ের আয়োজনটা সে তিক্ত করে দিতে চাইছিল না। তানিয়া ঘরের অন্যপাশে স্টোভের পাশে চেয়ারে বসে একটা বই দেখছিল, তাকে উদ্দেশ্য করে গ্রিশা বলল, "তাতিয়ানা ফিলিপভনা, চা খুব ভাল হয়েছে। আপনিও কি জার্মানদের সাথে বোঝাপড়া করতে চান?"

তানিয়া উঠে বইটা তাকে রেখে দেয়, বলে, "আমি আপনাকে আর এক কাপ চা দিই।" টেবিল থেকে গ্রিশার কাপটা নিয়ে যেতে যেতে বলে, "আমাদের আসলেই দেশে ফিরে যাওয়া দরকার, এজন্য জার্মানির সাথে সমঝোতা করতে হলে করতে হবে।"

কস্তিয়া হাসে, বিজয়ের হাসি, স্বামী-স্ত্রী নীতিগতভাবে এককাট্টা। বলে, "এই বুর্জোয়া সমাজকে উপড়ে ফেলতে হবে, নইলে সমাজে সাম্য আসবে না, শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা হবে না।"

গ্রিশা চুপ করে থাকতে চায়, কথায় কথা বাড়ে, কিন্তু শেষপর্যন্ত চুপ করে থাকতে পারে না। বলে, "কনস্তানতিন নিকোলায়েভিচ, আপনি সবসময় শ্রমিকদের নিয়ে কথা বলেন, আপনি কি কখনো কারখানায় কাজ করেছেন?"

"না, করি নি," কস্তিয়া উত্তর দিতে দেরি করে না, "কিন্তু আমি নিয়মিত কারখানায় গিয়েছি শ্রমিকদের সংগঠিত করতে। তাদেরকে আমি বছরের পর বছর কাছের থেকে দেখেছি। আমি জানি কেমন করে তাদের শ্রমকে অল্পমূল্যে কেনা হয়। আর যখন তাদের দরকার না হয় কেমন করে তাদের ছাঁটাই করা হয়, রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলা হয়। ধর্মঘট করলে পুলিশ ডেকে গুলি চালানো হয়।"

"তা তো বটেই। কিন্তু কনস্তানতিন নিকোলায়েভিচ, কিছু মনে করবেন না, আপনি নিজে একজন বুদ্ধিজীবী, আপনার দক্ষতা হল মাথার চিন্তা কলম দিয়ে কাগজে ফুটিয়ে তোলা, ইস্পাত বানানো বা কাপড় বুননের দক্ষতা আপনার নেই। অর্থাৎ আপনার কোনো শ্রমজাতীয় দক্ষতা নেই, কিন্তু আপনি চাইছেন শ্রমিকের ভাগ্য পরিবর্তন করতে?"

"নিশ্চয়, এই পথটা নিয়ে আমার কোনো দ্বন্দ্ব নেই। শ্রমিক ইস্পাত বানাতে পারে বটে, কিন্তু নিজের অধিকার আদায়ের পথটা তার জানা নেই। সেই পথের তত্ত্ব দিতে বুদ্ধিজীবীদের," কস্তিয়ার কথায় কোন দ্বিধা নেই।

"কিন্তু আপনি শুধু তত্ত্ব দিয়েই ক্ষান্ত নন, আপনি সেটা হাতে নাতে বাস্তবায়িত করতে চাইছেন। আপনি অনেকটা ঈশ্বরের দায়িত্ব পালন করতে চাইছেন," গ্রিশা বলে।

"হা, হা, হা," বেশ জোরে হেসে ওঠে কস্তিয়া, "আপনি কি ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন?"

"আপনি জানেন আমি এখানে ঈশ্বর শব্দটি নিতান্ত উপমা হিসাবে ব্যবহার করছি, ভাগ্যনিয়ন্ত্রক অর্থে। দেখুন, কনস্তানতিন নিকোলায়েভিচ, আপনি জীবনে কখনো কাস্তে বা হাতুড়ি ধরেন নি, আপনি বড়ই হয়েছেন প্রতি গ্রীষ্মে গ্রামের এক জমিদারি বাড়িতে ছুটি কাটিয়ে, আপনার কাজই হল লাইব্রেরিতে বসে বইপত্র লেখা। সে বই কি যক্ষ্ণা রোগের নিরাময় দিচ্ছে, কি পৃথিবী ছেড়ে চাঁদে যাবার উপায় বাতলাচ্ছে? না, আপনার তত্ত্ব হল যা কিছু ইতিমধ্যে হয়েছে, যেমন কল-কারখানা ইত্যাদি, তার ওপর ভিত্তি করে যে শ্রমিক শ্রেণী তৈরি হয়েছে সেই শ্রেণীর অধিকার কিভাবে আদায় করানো যায় তার পদ্ধতি বাতলানো। আমি বলছি না এর দরকার নেই, কিন্তু আপনি পৃথিবীকে নতুন কিছু দিয়ে যাচ্ছেন না যা দিয়ে মানুষ আজ থেকে একশো, দুশো বছর পরেও বাঁচতে পারে। বরং আপনার পথ পৃথিবীকে পিছিয়ে দেবে। আপনার যা মেধা তা দিয়ে অনেক কিছু হতে পারত, কিন্তু যে পথে আপনি যাচ্ছেন শেষাবধি তাতে সবার কষ্টই বাড়াবে, এতে কিছুর নিরাময় হবে না।"

কস্তিয়া কি একটা বলতে যায়, এর মধ্যে তানিয়া চা নিয়ে আসে, কাপটা গ্রিশার সামনে রেখে আবার রান্নাঘরে ফিরে যায়। দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ থাকে। তারপর কস্তিয়া বলে, "আপনার মনে হয় এরকম অবিরাম শোষণ চললে পৃথিবী আরো একশো, দুশো বছর বাঁচতে পারবে? আমাদের কাজই হবে পৃথিবীকে বদলে ফেলা, তাকে আমূল উৎপাটন করা। আপনি ভুল বলছেন, আমরা যদি এবার জয়ী হই তবে আজ থেকে একশো, দুশো বছর পরে পৃথিবী আমাদের স্মরণ করবে, শ্রদ্ধা ভরেই স্মরণ করবে, আমরা নতুন পথ দেখিয়েছি বলে। আর আপনি গ্রিগরি দেনসোভিচ, আপনি আপনার দায়িত্ব এড়াচ্ছেন, এই বুর্জোয়া সুইজারল্যান্ড আপনাকে মোহিত করে রেখেছে।"

গ্রিশার উজ্জ্বল মুখ কালো হয়ে যায়, নিজেকে সংযত করতে জানালার বাইরে শীতের ঠাণ্ডা নীল আকাশটাকে দেখে। তারপর বলে, "আপনাকে কখনো বলি নি আগে, কনস্তানতিন নিকোলায়েভিচ, আমি পেত্রোগ্রাদে একটা ছাপাখানায় কাজ করতাম, আমার কাজ ছিল দিস্তা দিস্তা কাগজ কাটার। সারা রাত ধরে কাজ করতাম। আমার এই বাঁ হাতের মধ্যমা আঙ্গুলের ওপরটা নেই, দেখেছেন?" গ্রিশা বাঁ হাতের আঙ্গুলগুলো মেলে ধরে কস্তিয়ার সামনে, বলে, "করাতের নিচ থেকে হাতটা বের করতে দেরি হয়েছিল।" কেমন করে সে এটা এতদিন খেয়াল করে নি, ভাবে কস্তিয়া। "এরপরে আমি ফ্রান্সে চলে যাই, সেখানকার রুশ প্রবাসী সমাজ আমাকে সাহায্য করে, ওখানে যেয়ে আমি অনেক কষ্ট করি, রেস্তোরাঁয় পরিচারক, তারপর রাঁধুনী, এর মধ্যে ছবি আঁকা। যুদ্ধ শুরু হবার আগে সুইজারল্যান্ডে চলে আসি। আমার বেঁচে থাকার জন্য আমি মানুষের সাহায্য পেয়েছি, তাদের কাছে আমি ঋণী। আমি তাদের জন্য সবকিছু করতে পারি, কিন্তু সারা পৃথিবীর শ্রমিকের কাছে আমার কোনো ঋণ নেই। আমি এক সময় নিজে শ্রমিক ছিলাম, আজও এক ধরণের শ্রমিক, আমার শ্রমের ফসল যদি কোনো শ্রমিককে আনন্দ দিতে পারে সেটুকুই হবে আমার দান। সেটুকুই আমার দায়িত্ব। আর আপনি যে দায়িত্বের কথা বলছেন সেটা হল আপনার মোহ, মেগালোম্যানিয়া, পৃথিবীকে আরোগ্য করার বদলে সেটা পৃথিবীকে অস্থির করে দেবে।"

কস্তিয়ার চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে, দুই হাত মুঠিবদ্ধ হয়। এরকম আলোচনা তাদের মধ্যে আগেও হয়েছে, কিন্তু এত তিক্ত পর্যায়ে পর্যন্ত সেগুলো যায় নি। এসময়ই নিচে গাড়ির আওয়াজ শোনা যায়। গ্রিশা আর কস্তিয়া দুজনেই জানালা দিয়ে নিচে তাকায়, দুজনেই যেন এই বিতর্ক থেকে নিস্তার পেয়ে একটু শান্তি পায়। ওপর থেকে তারা দেখে একটা ছাদখোলা বড় আধুনিক জার্মান গাড়ি, অওডি হতে পারে, গাড়ি থেকে একজন বড়সড় লোক নামে, তার পরনে ধূসর ওভারকোট, মাথায় টুপি। সে ওপর দিকে কনস্তানতিনের ফ্ল্যাটের দিকে তাকায়, তারপর নিচের দরজা দিয়ে ঢোকে। পথচারী অনেকেই কৌতূহলী হয়ে গাড়িটা দেখে।

গ্রিশা কস্তিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, "আপনি বোধহয় এর জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। আমার এখানে থাকা আর ঠিক হবে না।" কোনোরকমে তার ছবিটা কাগজে জড়িয়ে হাতে নিয়ে, তারপর কোটর‍্যাক থেকে কোটটা তুলে র‍্যাকের নিচে রাখা ব্যাগটা তুলে নেয়। তখনই কী যেন তার মনে পড়ে। ব্যাগটা খুলে একটা স্বচ্ছ তরলের বোতল বের করে কস্তিয়ার হাতে দেয়, বলে, "রাশিয়ায় তো এখন ভদকা রেস্তোঁরায় ছাড়া খাওয়া নিষেধ, তা আমি একটা বোতল জোগাড় করেছিলাম। এটা আপাততঃ আপনার এখানেই থাকুক।" বোত্লটা বিস্মিত কস্তিয়ার হাতে গছিয়ে নিজেই বাইরের দরজাটা খোলে গ্রিশা। দরজার ওপাশে এক বিরাট জার্মান মানুষ দরজায় টোকা দেবার জন্য হাত তুলছিল, গ্রিশা তাকে সুপ্রভাত বলে সিঁড়ি দিয়ে নেমে যায়।

কনস্তানতিন বা কস্তিয়া আসলে কারুরই প্রতীক্ষা করছিল না। কোনো এক কেউকেটা জার্মান গাড়ি হাঁকিয়ে তার সঙ্গে স্পিগেলগাসে দেখা করতে আসবে সে ভাবে নি। ছ-ফুট লম্বা মানুষটির চোখে রিমছাড়া চশমা, মাথায় বাদামী টুপি, গায়ে লম্বা ওভারকোট, তাতে সোনালী রঙ্গের বড় ঈগল পাখীমার্কা বোতাম। নীল চোখ, চৌকো থুতনি। টুপি খুলে, কস্তিয়ার হাতে ভদকার বোতলটার দিকে এক মুহূর্ত নজর দিয়ে সে জার্মান ভাষায় বলল, "শুভদিন, হের দ্রাগোমিরভ, আমি শুনেছি আপনি ভালই জার্মান জানেন। আমি দুঃখিত এভাবে হঠাৎ করে চলে আসার জন্য, কিন্তু আমাদের কারুর হাতেই সেরকম সময় নেই। আমার নাম ভাগনার, কার্ল ভাগনার, তবে আমি ক্লাসিকাল সুরকার ভাগনারের আত্মীয় নই।" এই বলে হাসে কার্ল ভাগনার। কস্তিয়ার পছন্দ হয় সোনালী চুলের মানুষটিকে।

তানিয়া এতক্ষণে রান্নাঘর থেকে বের হয়ে এসেছে। কস্তিয়া বলে, "ইনি আমার স্ত্রী, তাতিয়ানা ফিলিপভনা।"

কার্ল ভাগনার মাথা ঝুঁকিয়ে তানিয়াকে অভিবাদন করে। মাথার টুপি আর বড় কোটটা কোথায় রাখবে ভাবে, তানিয়া সেগুলো হাতে নিয়ে কোটর‍্যাকে ঝুলিয়ে দেয়। কস্তিয়া ভদকার বোতলটা তানিয়ার হাতে দিয়ে কার্লকে বসতে বলে। তানিয়া বুঝে পায় না বোতলটা কোথা থেকে এসেছে, রান্নাঘরে নিয়ে যায়।

চেয়ারে বসেই কার্ল বলে, "আমি জার্মান সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কাজ করি, গতকালই বার্লিন থেকে এসেছি। মূলতঃ আপনাদের সাথেই দেখা করতে। বার্নে আপনাদের কয়েকজন নিকট বন্ধু আছে, তাঁরা বলেছে আপনাদের কথা। সেখান থেকে বার্লিনে গেছে খবর। আপনারা রাশিয়ার বিপ্লবের কথা জানেন, জার ক্ষমতা ছেড়ে দিয়েছে, অবশ্য রাস্তায় অনেক লোক মারা যাবার পর, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা নিয়েছে।"

তানিয়া রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে দূরের চেয়ারটায় বসে।

এই খবরগুলো জুরিখ জাইটুংয়েই পড়েছে কস্তিয়া, খবরের কাগজটা এখন আবার টেবিলের ওপরেই আছে। কস্তিয়া আর তানিয়া চুপ করে থাকে কার্লের পরের কথাটার জন্য। কার্ল বলতে থাকে, "কিন্তু এই বিপ্লবের একটা মূল উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব ফ্রন্টে যুদ্ধ থামানোর। কিন্তু নতুন রুশ সরকার এই ব্যাপারে কোনো উদ্যোগই নিচ্ছে না। আমাদের কাছে খবর এসেছে যুদ্ধক্ষেত্রের রুশ সৈন্যরা পারলে এখনই বাড়ি চলে যায়। হের দ্রাগোমিরভ, আপনি কি পারবেন এই যুদ্ধ থামাতে?"

কস্তিয়া আর তানিয়া দুজনেই হকচকিয়ে যায় এই প্রস্তাবে। "আপনাদের আমরা জার্মানীর মধ্য দিয়ে যাবার পথ করে দেব যাতে আপনারা রুশদেশে পৌঁছাতে পারেন, কিন্তু এই পথ করে দেবার শর্ত হল আপনাকে যেয়ে পূর্ব ফ্রন্ট থেকে রুশ সৈন্য তুলে নিতে হবে।"

কস্তিয়া হেসে ওঠে, বলে, "আমি যুদ্ধ থামাবো? সে কি করে সম্ভব? আপনারা আমাকে যেতে দিলেও আমার কি ক্ষমতা আছে যে আমি নির্দেশনামা দেব? আমি তো নতুন সরকার বা সংসদের সদস্যই নই।"

কার্লও হাসে, তবে সেই হাসির মধ্যে যেন সব উত্তর নিহিত থাকে। বলে, "আমি আপনার লেখা পড়েছি, হের দ্রাগোমিরভ, আপনি সংসদীয় পদ্ধতিতে বিশ্বাসী নন, সশস্ত্র পন্থায় শ্রমিক-কৃষকদের জন্য রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করার পক্ষে আপনি লিখেছেন। এই পথে আপনি দৃঢ় বিশ্বাসী, এর জন্য আপনি আপনার পুরোনো বন্ধুদের ছেড়ে আসতে দ্বিধা করেন নি। আপনার লেখা থেকে আমি আপনাকে যতটুকু বুঝেছি তাতে আমি জানি আপনি চুম্বকের মত মানুষকে আকর্ষণ করেন, সেই মানুষেরা আপনার দ্বারা প্রভাবিত হয়, কিন্তু একই সঙ্গে আপনি যাদের আগাছা বলে মনে করেন তাদের ঝেড়ে ফেলতে আপনার দ্বিধা হয় না।"

কার্লের কথায় কস্তিয়া তানিয়ার বুক ফুলে ওঠার কথা, হয়তো সেটা কিছুটা হয়েছিল, কিন্তু দুজনেই চুপ করে থাকে।

কার্ল বলতে থাকে, "আপনাদের আজকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে না। একদিন সময় আছে আমাদের হাতে। কিন্তু এর ব্যবস্থাটা কিভাবে হবে সেটা বলি। একটা আবদ্ধ ট্রেনের ওয়াগনে আপনারা জার্মানির মধ্য দিয়ে যাবেন, আপনাদের জার্মানিতে কেউ দেখবে না, আপনারা কারুর সঙ্গে কথাও বলবেন না। জার্মানিতে আপনাদের শেষ স্টেশন হল সাসনিটজ, একেবারে বালটিক সাগরের ধারে। সেখান থেকে ফেরি আপনাদের নিয়ে যাবে সুইডেনের ট্রেলবোর্গ, তারপর ট্রেনে করে ফিনল্যান্ডের হেলসিঙ্কি, তারপর আর একটা ট্রেনে পেত্রোগ্রাদ। আপনারা একা যাচ্ছেন না, আপনাদের অনেক বন্ধুরাই যাবেন।"

ঘরের মধ্যে নিস্তব্ধতা বিরাজ করে। এটা কি সম্ভব? বার্নে তার বিপ্লবী বন্ধুরা একটা অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। কস্তিয়া আর তানিয়া একে অপরের দিকে তাকায়, তাদের দুজনের মুখেই চাপা উত্তেজনা, আনন্দ। বিপ্লব থেকে দূরে, জুরিখের অন্ধকার রাস্তায় তাদের পড়ে থাকতে হবে না।

তাদের চিন্তা কার্ল ভাগনারের অলক্ষিত থাকে না, সে নিজেও নিজের কাজে যেন প্রীত হয়, বলে, "আমি এখন উঠব, কাল এসময়ে আবার আসব। আপনারা যদি যাবার সিদ্ধান্ত নেন তবে আগামী সপ্তাহেই আপনাদের যেতে হবে।" কস্তিয়া আর তানিয়াকে আর কথা বলার সুযোগ না দিয়ে কোটর‍্যাক থেকে টুপি আর কোট তুলে নিয়ে কার্ল নিজেই দরজা খুলে সিঁড়ি দিয়ে নেমে যায়।

সূর্য উঠে গেছে অনেক উপরে, তারা দুজনেই নিশ্চুপ বসে থাকে। ঘটনা সব দ্রুত ঘটছে। দুপুরের খাবারের পর কস্তিয়া একাই বের হয়। তাকে একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে। লিমাট নদীর পার দিয়ে হাঁটে, কিন্তু মনটা বিক্ষিপ্ত থাকে। গ্রিশার কথাগুলো তার মনে ভাসে। একটা সমাজকে উল্টে দেবার ক্ষমতা পেলেই কি সেটা করা উচিত? আর সত্যিই তো, সে কোনোদিন নিজের হাতে কিছু গড়ে নি, অন্যের ভবিষ্যৎ কি সেটা রচনা করার অধিকার কি সে রাখে? জুরিখে এক বছর সে থাকল, কাউকে কি সে দেখল যে এখানে বিপ্লব করতে আগ্রহী? এখানে বামপন্থীরা সংসদে ভোটাভুটি করে আসতে চায়, কিন্তু সেভাবে এগোলে তারা কি কোনোদিন ক্ষমতায় আসতে পারবে? জার্মানরা প্রস্তাব দিয়েছে, তাদের প্রস্তাবে কি সায় দেয়া উচিত? জার্মান ইচ্ছা পূরণ করেও রাশিয়ার স্বার্থ কি সংরক্ষণ সম্ভব? নানান সংশয়ে মনটা বিক্ষিপ্ত থাকে কস্তিয়ার।

পরদিন খুব ভোরে কে যেন ফ্ল্যাটের দরজায় টোকা দেয়। কস্তিয়া দরজা খুলে দেখে একটি পনেরো ষোল বছরের কিশোর, তার হাতে একটা খাম, খামটা কস্তিয়ার হাতে ধরিয়ে দিয়ে সে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নেমে যায়। কস্তিয়া তাকে বলে, "দাঁড়াও, তোমাকে দুটো ফ্রাঙ্ক দিই।" ছেলেটি চিৎকার করে উত্তর দেয়, "লাগবে না, ফ্রলাইন আমাকে পয়সা দিয়েছেন।"

বাইরে সবে আলো হচ্ছে, তানিয়া এখনো ওঠে নি। কস্তিয়া খামের ওপরে হাতের লেখা দেখেই বোঝে কার কাছ থেকে সেটা এসেছে। ইনেসা আরমান্দ। কস্তিয়ার হাত কাঁপে, খামটা ছিঁড়ে চিঠিটা বার করে। তাতে লেখা -

"প্রিয় কস্তিয়া, আমি জানি জার্মান দূত তোমার বাসায় গিয়েছিল। আমরা বার্ন থেকে বার্লিনে যোগাযোগ করে এই ট্রেনের ব্যবস্থা করেছি। আমি যাচ্ছি, আশা করছি তুমি এবং তানিয়া আমাদের সাথে যোগ দিতে পারবে। শুভেচ্ছান্তে, ইনেসা।"

ইনেসা যাচ্ছে। লৌহশকট তৈরি। এখন সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হয় না কনস্তানতিন দ্রাগোমিরভের। ট্রেনের চাকায় ইতিহাস দ্রুত ঘোরে।



দ্বিতীয় অধ্যায় : পেত্রোগ্রাদ, রাশিয়া, এপ্রিল থেকে নভেম্বর ১৯১৭

জুরিখ থেকে শাফহাউজেন, সেখান থেকে সাসনিট্জ, সমুদ্র পার হয়ে ট্রেলবোর্গ, আবার ট্রেনে হেলসিঙ্কি, অন্য একটা ট্রেনে রাশিয়ার পেত্রোগ্রাদ শহরের ফিনল্যান্ড স্টেশন। লৌহশকট থেকে কস্তিয়া, তানিয়া, ইনেসাসহ সমমনা আরো কিছু মানুষ যখন স্টেশনে নামল তাদের অভ্যর্থনা জানাতে সেখানে উত্তাল জনতা। কস্তিয়া এরকম আশা করে নি, তানিয়াও না। শ্রমিক, সৈনিক, কেরানি, শিক্ষক স্লোগান তোলে "দ্রাগোমিরভ, দ্রাগোমিরভ"। কস্তিয়া বুঝে পায় না কি করতে হবে, বুক কাঁপে, তবু ট্রেনের পাদানিতে দাঁড়িয়ে হাত তুলে সবাইকে অভিবাদন জানায়। যেই মুহূর্তে তার হাত অভিবাদন দিতে ওপরে উঠল, সেই মুহূর্তে, পেত্রোগ্রাদের বসন্তের হাল্কা শীতল বাতাস তার কপালে ছুঁল, সেই মুহূর্তে কনস্তানতিন দ্রাগোমিরভের মনে হল একজন কলমপেষা বুদ্ধিজীবী থেকে সে রূপান্তরিত হয়েছে এক যুদ্ধক্ষেত্রের সৈনিকে। না না, সৈনিক নয়, যুদ্ধক্ষেত্রের সর্বাধিনায়ক হিসেবে। কস্তিয়ার মনে হল পৃথিবীর ইতিহাস এখন বদলাবে, সেই বদলাতে পারবে। স্টেশনের মধ্যে দিয়ে কস্তিয়া হেঁটে যায়, উপস্থিত নেতা, জনতা সবাইকে অগ্রাহ্য করে। বাইরে আরো জনতা, কাতারে কাতারে মানুষ রাতের আঁধারে সমুদ্রের ঢেউয়ের মত দোলে। একটা সাঁজোয়া গাড়ি ছিল সেখানে, কোনো দ্বিধা ছাড়া কস্তিয়া গাড়ির গায়ের হাতল ধরে ওপরে পাদানিতে লাফ দিয়ে ওঠে। চোখ কুঁচকে দেখতে চায় সমুদ্রের তীর কোথায়। চিৎকার করে বলে, "আমরা পৃথিবীর নতুন নাগরিক। সারা পৃথিবীতে পুঁজিবাদের পতন শুরু হয়ে গেছে। এই সরকার মুখে সমাজতন্ত্রের কথা বলে, কিন্তু পুঁজিবাদকে উৎখাত করতে সমর্থ হবে না। কোনো প্রকৃত সমাজতন্ত্রী নতুন সরকারকে সমর্থন করতে পারে না, তাই আমরা নতুন সরকারকে সমর্থন করি না। এই বিপ্লব নকল বিপ্লব, আসল বিপ্লব সমাগত।"

জনতা বুঝতে পারে না দ্রাগোমিরভ কী বলতে চাইছে, এমন কি তানিয়াও তাকিয়ে থাকে বিস্ময়ের দৃষ্টিতে। জনতা ভাবে সবেমাত্র একটা বিপ্লব হয়েছে, জারকে উৎখাত করা হয়েছে, আবার এর মধ্যেই আর একটা বিপ্লব করতে হবে? কস্তিয়া নিজে বোঝে না তার মধ্যে এই সাহস কোনখান থেকে এল। লন্ডন, জেনিভা, মিউনিখ, ক্রাকাউ, বার্ন, জুরিখের একঘেয়ে বনবাসের নিশ্চয়তা আর নেই, এসেছে এক নতুন অনিশ্চয়তা, কিন্তু তার মাঝে আছে উত্তেজনা, বিপ্লবের স্বাদ, সমাজকে আমূল বদলে দেবার স্বপ্ন। গ্রিশার কথা অনেক দূরে পড়ে থাকে।

সে রাতে বোন মারিয়ার ফ্ল্যাটে নরম বিছানায় শুয়ে সে চোখ বোঁজে, একরাশ চিন্তা জমা হয়। সে ভাবে, দেরি হয়ে গেল, বড় দেরি হয়ে গেল। রুশদেশ বদলাচ্ছে দ্রুত, এক বিরাট আন্দোলনের মুখে জার তার সিংহাসন ছাড়তে বাধ্য হয়েছে, সেই আন্দোলনে সে যোগ দিতে পারে নি। জার আর তার পরিবারকে নতুন অন্তর্বর্তীকালীন যুক্তফ্রন্ট সরকার নজরদারিতে রেখেছে। অন্যদিকে বলতে গেলে এই সরকারের সবাই বামপন্থী - ক্যাডেট, বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী আর মেনশেভিক। এরা রুশ অধিকৃত অঞ্চলে জাতিগোষ্ঠীর অধিকারের কথা বলছে, কৃষকদের মাঝে ভূমিবন্টনের কথা বলছে, কারখানায় শ্রমিকদের অধিকারের কথা বলছে। কিন্তু ওদিকে জার্মান ফ্রন্টে সৈন্যরা গুলিতে মরছে, না খেয়ে মরছে, কারখানা সব বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তবু এই সরকার পশ্চিমের মিত্রদের দেখাতে চায় রুশদের ওপর নির্ভর করা চলে, তাই তারা যুদ্ধ থামাতে চায় না। মানুষকে নতুন করে বিপ্লবের কথা কি বলা যাবে? কিন্তু এই সরকার, সরকার সমর্থক সব পার্টি সব বালখিল্য, এদের সঙ্গে কোনো সমঝোতা করা যাবে না, ঘুমিয়ে পড়ার আগে কস্তিয়া ভাবে।

১৯১৭র এপ্রিল মাস, রাশিয়ায় তখন মুক্তির হাওয়া বইছে। রাজনীতি, আর্ট, সাহিত্য সব্কিছুর মধ্যে বসন্তের হাওয়া লেগেছে। যদিও চার বছরের যুদ্ধ অর্থনীতি ভেঙ্গে দিয়েছে, তবু সব শ্রেণীর মানুষ নতুন স্বাধীনতায় ভবিষ্যতের জন্য আশাবাদী হয়ে উঠেছে। কনস্তানতিন পরদিন হাজির হয় তাভরিচেস্কি প্রাসাদে মার্ক্সবাদী দলগুলোর সভায়। এই প্রাসাদেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আর সংসদ কাজ করে, আবার সব পার্টিগুলোও সভা করতে পারে। সাবেক জারের সব প্রাসাদকেই গণতন্ত্রের অনুশীলন কেন্দ্র হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সবাই দ্রাগোমিরভের আগমনে উচ্ছসিত। ওদিকে এক রাতের বিশ্রামেই কনস্তানতিন যেন আরো বল পেয়েছে। সময় এসেছে তার লৌহকঠিন মনোবলকে তুলে ধরার। স্টেজে পায়চারি করে সে, দু আঙুল কোটের পকেটে ঢুকিয়ে, মাঝে মধ্যে উচ্চস্বরে, মাঝে মধ্যে নিচুস্বরে বলে, "বন্ধুগণ, এই সরকার সাম্রাজ্যবাদী সরকারদের অনুগত। যে সমাজতন্ত্রী এই সরকারকে সমর্থন করবে সে বিশ্বাসঘাতক। সমস্ত সমাজতন্ত্রীর কাজ হবে এখন রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করার।" উপস্থিত সবাই আশ্চর্য হয় দ্রাগোমিরভের কথায়। জার সবেমাত্র গেছে, এখন গণতন্ত্রের পথ ধরে রুশদেশ এগোবে, বাম সমাজতন্ত্রী শক্তির এত ক্ষমতা নেই যে সশস্ত্র বিপ্লব করে ক্ষমতা দখল করবে। কেউই এই কথা আশা করে নি। কিন্তু ভবিষ্যৎ যেন কস্তিয়ার কাছে ধরা দিয়েছে, সেই ভবিষ্যৎ অনমনীয়।

রাতে কামেনেভ আসে। সুদর্শন লেভ কামেনেভ, লম্বা গোঁফ পাকানো দুদিকে, চোখে রিমলেস চশমা। কিছুটা উদভ্রান্ত, চেয়ারে বসে কোনোরকম ভূমিকা ছাড়াই বলে, "কনস্তানতিন নিকোলায়েভিচ, আপনি এসব কী বলছেন? এখন সময় হল সব সমাজতন্ত্রী পার্টিদের এককাট্টা হওয়া। আমরা জোর করে কিছু করতে গেলে ওরা আমাদের পিষে মারবে। বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী আর মেনশেভিকদের সঙ্গে মিলে মিশে আমাদের বলশেভিকদের একসাথে এগোতে হবে।"


জুরিখের দ্রাগোমিরভ এখন খাঁচামুক্ত বাঘ, এসব শোনার ধৈর্য তার নেই। সেই কবে, ১৯০৩ সনে, সদস্যপদের সংজ্ঞা কি হবে এই সামান্য একটা ব্যাপারে সে সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টিকে গরিষ্ঠ বলশেভিক এবং লঘিষ্ঠ মেনশিভিক এই দুইভাগে ভাগ করে ফেলতে সে দ্বিধা করে নি। চূড়ান্ত উদ্দেশ্যের জন্য সব পন্থাই সঙ্গত, নিজের কর্মপদ্ধতি নিয়ে কনস্তানতিনের কখনই দ্বিধা ছিল না। কনস্তানতিন কামেনেভের সামনের চেয়ারে বসে। খুব ধীরে, বাঁ হাতটা কামেনেভের দিকে বাড়িয়ে বলে, "লেভ বরিসোভিচ, আমরা এতদিন ধরে যে স্বপ্ন দেখে এসেছি তা এখন আমাদের, বলশেভিকদের, হাতের মুঠোয়," এই বলে বাঁ হাতটা মুঠিবদ্ধ করে সে। বলে, "বিপ্লব এখন বাতাসে, তাকে শুধু হাত বাড়িয়ে ধরতে হবে, এই সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না। আর এইসব পার্টিগুলোর কোনো দূরদৃষ্টি নেই, তারা জানে না ঐতিহাসিক মুহূর্তকে কেমন করে কব্জা করতে হয়।"

"কনস্তানতিন নিকোলায়েভিচ," কামেনেভ আশ্বস্ত হয় না দ্রাগোমিরভের কথায়, আলতোভাবে গোঁফে হাত বোলায়, "আমরা এর জন্য প্রস্তুত নই। আমাদের সৈন্যরা ক্লান্ত, তাদেরকে আমাদের পক্ষে নিয়ে আসা এত সহজ হবে না। আমরা যদি সশস্ত্র সংগ্রামের ডাক দিই সেটা হবে নিতান্ত হটকারিতা। বিপ্লব হবার কথা পশ্চিমের শিল্পোন্নত দেশে, জার্মানীতে, ফ্রান্সে, ইংল্যান্ডে, সুইজারল্যান্ডে। সামন্ততান্ত্রিক রুশ দেশে নয়।"

কনস্তানতিন এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে দ্বিধা করে না। বলে, "আমাদের সৈন্যরা ক্লান্ত, তারা আর যুদ্ধ করতে চায় না। জার্মানির সঙ্গে আমাদের যুদ্ধ থামাতে হবে। এই সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধে রাশিয়ার কোনো সংশ্রব নেই। সেটা থামালেই সৈন্যরা ফিরে যাবে ব্যারাকে, আমরা যুদ্ধ থামিয়েছি বলে আমাদের কাছে ঋণী থাকবে। আর মার্ক্স কোনো জায়গায় স্পষ্টভাবে লেখেন নি যে সামন্ততান্ত্রিক দেশে বিপ্লব হতে পারে না, আমরা পুঁজিবাদকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি সমাজতন্ত্রে যাব। আমরা হব পৃথিবীর পথিকৃৎ। চিন্তা করে দেখুন, লেভ বরিসোভিচ, পৃথিবীর মুক্ত মানুষ আমাদের কথা স্মরণ করবে হাজার বছর পরেও।"

কামেনেভ কনস্তানতিনের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনে, কিন্তু সায় দিতে পারে না। দরজা দিয়ে বের হতে হতে মারিয়াকে বলে, "কনস্তানতিন নিকোলায়েভিচকে কিছুদিন বিশ্রাম নিতে বলুন। আপনি তো ভাল রান্না করেন, কিছুদিন ওনাকে ভাল খাবার খাওয়ান।"

এপ্রিল, মে, জুন, জুলাই দ্রুত চলে যায় সব মাস। দারুণ উত্তেজনায় কাটে দিন, সশস্ত্র বিপ্লব ভোটাভুটি থেকে অনেক বেশী ইন্টারেস্টিং। সশস্ত্র বিপ্লবের কথা অন্তর্বর্তীকালীন যুক্তফ্রন্ট সরকারের পছন্দ হয় না, রাস্তায় সংঘর্ষ হয়, তারা কস্তিয়াকে গ্রেপ্তার করার আদেশ দেয়। কনস্তানতিন পালায় ফিনল্যান্ডে, কিন্তু পার্টির ওপর কর্তৃত্ব হারায় না।

আর এক বিপ্লবী গ্রিগরি জিনোভিয়েভের সাথে রুশ সীমান্তের কাছে এক কুটিরে আত্মগোপন করে কনস্তানতিন। কামেনেভের মত জিনোভিয়েভও সশস্ত্র বিপ্লব নিয়ে সন্দিহান ছিল। রাতে কুটিরের সামনে আগুন পোহায় তারা, ভদকা, চর্বি আর কালো রুটি ভাগ করে খায়। জিনোভিয়েভের সঙ্গে কস্তিয়ার তর্ক হয়, সে বলে, "পুঁজিবাদ বিকাশের পরে সাম্রাজ্যবাদী ক্ষুধায় বিপ্লবের স্বতঃস্ফূর্ত আগমন হবার কথা, সেই বিপ্লব হবার কথা শিল্পোন্নত দেশে। রুশদেশে নয়।"

কনস্তানতিন বলে, "আমাদের থিসিস বদলাতে হবে। কৌশল পরিবর্তন করতে হবে। সামন্তবাদী রুশ দেশে বিপ্লব হবার কথা নয়, তাই এখানে একদল বিপ্লবী বুদ্ধিজীবীরা নেতৃত্ব দিয়ে বিপ্লব করবে, সেই বুদ্ধিজীবীরা সর্বহারার একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করবে। পুরাতন আবর্জনা সব ঝেঁটিয়ে বিদায় করতে হবে। বিশেষতঃ বিশেষজ্ঞদের যারা জারের আমলে সমস্ত সুবিধা ভোগ করেছে। পুঁজিবাদ জাতিভিত্তিক রাষ্ট্র তৈরি করেছে, তাকে ভাঙ্গাই হল সাম্যবাদের কাজ। কিন্তু এই মুহূর্তে রাষ্ট্রকে আরো শক্তিশালী হতে হবে, এই রাষ্ট্র হবে সর্বহারার, না ঠিক সর্বহারার নয়, সর্বহারার একনায়কতন্ত্রের। সেই রাষ্ট্র সাম্যবাদের নিশ্চয়তা দেবে। ভবিষ্যতের মানুষ সে সাম্যের আলোকে গড়ে উঠবে, তারা মানুষের জন্য কাজ করবে, টাকার জন্য নয়। প্রতিজন নিজের ক্ষমতা অনুযায়ী কাজ করবে, প্রতিজন নিজের চাহিদা অনুযায়ী পাবে।"

জিনোভিয়েভ কামেনেভের মতই পুরোপুরি নিঃসন্দেহ হয় না এই পথের কার্যকারিতায়। সে বলে, "সমাজ না তৈরি হলে জোর করে কিছু করা সম্ভব নয়। আর যে রাষ্ট্রব্যবস্থাকে আমরা ভেঙ্গে দিতে চাইছি আপনি সেই রাষ্ট্রকেই আরো জোরদার করতে চাইছেন। সেই রাষ্ট্র মানুষের ওপর অত্যাচারের যন্ত্র হিসাবেই উদ্ভূত হবে।"

কনস্তানতিন এসব নিয়ে অনেক ভেবেছে, নিজের থিসিসে তার বিশ্বাস অচঞ্চল। সে বলে, "কিছু লোক, বিশেষতঃ পুরাতন সময়ে যারা সুবিধা ভোগ করেছে তারা এই রাষ্ট্রের ক্ষতিসাধন করতে চাইবে, তাদেরকে দমন করার জন্য এই রাষ্ট্রকে আরো শক্তিশালী হতে হবে। শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষার জন্যই রাষ্ট্রকে শক্তিশালী হতে হবে।"

আর্টিস্ট গ্রিশা ঠিকই বলেছিল, কস্তিয়া মানুষকে চুম্বকের মত আকর্ষণ করে রাখতে পারত। একটা কাজ তা যতই কঠিন হোক না, মানুষ যতই সেটার বিরুদ্ধে যাক না কেন, কস্তিয়া বিশ্বাস করত শেষ পর্যন্ত তার পথে সবাই আসবে। সেই দুর্দমনীয় ইচ্ছা পেত্রোগ্রাদ আসার পরে তাকে রাতে ঘুমাতে দেয় নি, প্রতিটি জাগরিত মুহূর্ত সে ব্যয় করেছে হয় লেখায়, নয় মিটিংয়ে, সেটা যেখানেই হোক না কেন। জুরিখের ফ্ল্যাটে গ্রিশা তার জন্য একটা ভদকার বোতল নিয়ে এসেছিল, কিন্তু ভদকার তরলে সে বাস্তবকে বদলে দিতে নারাজ, তার একটা নেশা, রাষ্ট্রের চরিত্র বদলানোর। জীবনে তাকে আর কিছু আকৃষ্ট করতে পারে নি - ভাল খাবার, সুললিত সঙ্গীত, চমকপ্রদ চিত্রকলা, কিংবা রোমাঞ্চকর প্রেম। ইনেসা আরমন্ড তাকে আকৃষ্ট করেছে, কিন্তু সারা জীবন সেই আকর্ষণের বিরুদ্ধে সে লড়েছে।

ক্যাম্পের আগুনের আলোয় দ্বীর্ঘশ্বাস ফেলে তাকে দেখে গ্রিগরি জিনোভিয়েভ, গ্লাসে যতটুকু ভদকা বাকি ছিল সেটা শেষ করে। দ্রাগোমিরভের কথা সে বিশ্বাস করে না বটে, কিন্তু দ্রাগোমিরভকে নিরাপত্তা দিতে তার কথা জনগণকে পৌঁছে দিতে সে যেন দায়বদ্ধ।

অক্টোবরের শেষে বিপ্লবের চুড়ান্ত সুযোগ আসে, ফিনল্যান্ড থেকে কনস্তানতিন ফিরে আসে, বিপ্লবের কলকব্জা কখনই তার হাত ছাড়া হয় নি। শুধুমাত্র কামেনেভ আর জিনোভিয়েভ এই পথের কার্যকারিতায় সন্দেহ প্রকাশ করে। তারা প্রস্তাব দেয়, বলশেভিকদের অন্য সমাজতন্ত্রী লোকজন, মূলতঃ মেনশেভিকদের সাথে, মিলে মিশে এগোবার। কিন্তু দ্রাগোমিরভ যেন জানত বলশেভিকরা একাই এই বিপ্লব সমাধা করতে পারবে, তাকে সমর্থন দেয় দুই বলিষ্ঠ নেতা নেতা - জোসেফ স্তালিন ও লিওন ত্রৎস্কি। অবশেষে ৮ই নভেম্বর কনস্তানতিনের ইচ্ছা পূরণ হয়।

বিপ্লব একেবারে সবকিছু মেনে হল না, কিছুটা ছন্নছাড়াভাবেই হল। সবার সন্দেহকে মিথ্যা প্রমাণ করে বলশেভিকরা ক্ষমতা নিল। পেত্রোগ্রাদের স্মলনি ইনস্টিটিউটের একটা ঘর থেকে কনস্তানতিন লিখল, "রাশিয়ার নাগরিকেরা, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে, ক্ষমতা এখন শ্রমিক-সৈনিক বিপ্লবী বাহিনীর হাতে। সমস্ত অভিজাতদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে, উৎপাদনের উৎস থাকবে শ্রমিকের হাতে, শান্তিকে প্রাধান্য দেয়া হবে। বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক।"


তৃতীয় অধ্যায় : মেক্সিকো শহর, ২০ অগাস্ট ১৯৪০



গ্রীষ্মের সময়, তাও সমুদ্রের প্রায় দুই কিলোমিটার ওপরে হওয়াতে অত গরম পড়ে না। সকালে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে, আকাশ দুএকটা কাল মেঘ, তার মধ্যে নীল আকাশ উঁকি দিচ্ছে। সকালে উঠে নিচে বাড়ির মধ্যের আঙ্গিনায় পায়চারি করে লিওন ত্রৎস্কি। বিপ্লবের সময় তাকে সবাই লেভ দাভিদোভিচ বলত। থুতনির নিচে সাদা দাড়ি, সাদা গোফ, সাদা চুল, এখনো তার চোখে বিদ্যুতের ঝলক। রুশ বিপ্লবের এক নেতা ছিল সে, আজ সুদূর মেক্সিকো শহরের কোয়াকান পাড়ায় নির্বাসিত।

কত বছর কেটে গেছে বিপ্লবের পর? তেইশ বছর? কত বছরে কেটে গেছে সে লাল ফৌজের নেতৃত্ব দিয়েছে। কিন্তু সেটুকুই সব নয়।

বাড়িটা দেয়াল দিয়ে ঘেরা, এর বাইরে যায় না সে। সেই দেয়ালে আর বাড়ির ভেতরের দেয়ালে এখনো গুলির দাগের চিহ্ন বর্তমান, মাত্র কয়েকমাস আগে মেশিনগান দিয়ে স্তালিনের অনুগতরা আক্রমণ করেছিল, তার এক তরুণ সহকর্মী ও দেহরক্ষী রবার্ট হার্টকে তারা অপহরণ করে, রবার্টের মৃতদেহ পরে পাওয়া যায়। বিশ্বাস করা যায় না, কিন্তু জোসেফ স্তালিনের হাত এরকমই সুদূরপ্রসারী, তার অন্ধ অনুগতেরা রাশিয়া থেকে মেক্সিকো পর্যন্ত বিস্তৃত। "স্তালিন," ভাবে ত্রৎস্কি, "যে কোনো বিপ্লবের ফলাফল হয়তো এরকমই, এরকম একক নায়কের উথ্বান হয়ত বিপ্লবের নক্সার মধ্যে নিহিত।" বহু মানুষের মৃত্যুকে দেখেছে সে, নিকটজনের, অজানা লোকের। বাড়ির বাইরে ত্রৎস্কি এখন আর যায় না, তবে সাংবাদিকরা মাঝে মধ্যেই আসে। আজ বিকেলে ফ্রাঙ্ক জ্যাকসন আবার আসবে, সে প্রায় বিকেলেই আসছে, এই তরুণকে বেশ পছন্দ করেছে লিওন।

নাতি এস্তেবান স্কুলে গেছে। স্ত্রী নাতাশার সঙ্গে সকালের খাবার খেয়ে দিনের কাগজগুলো পড়ে সে। সুদূর ইউরোপে আর এশিয়ায় যুদ্ধ চলছে, আর একটি মহাযুদ্ধ, জার্মানি আবার স্টেজে ফিরে এসেছে। সাম্রাজ্যবাদের পতন হবে এবার, ভাবে সে, কিন্তু সেই বিপ্লব কি আর হবে, যে পৃথিবীব্যাপী বিপ্লবের জন্য সে তার জীবন বাজি রেখেছে? নিজেকে মাঝে মাঝে এসব থেকে বিযুক্ত মনে হলেও কয়েক দশকের নিয়মানুবর্তিতা তাকে টেবিলে ফিরিয়ে নিয়ে আসে, পড়াশোনার জন্য। কাগজ বার করে সে লেখে, "আমি বিপ্লবী ছিলাম, এখনো আছি। ভুলভ্রান্তি হয়েছে, কিন্তু পথ ঠিকই আছে। নতুন প্রজন্ম সারা পৃথিবীতে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবে, তারা সমস্ত শোষণ ও হিংস্রতা ঝেঁটিয়ে বিদায় করবে। বর্তমানকে উপভোগ করে সুখ পাওয়া যায় না, বরং ভবিষ্যতের প্রস্তুতিই মানুষকে সবচেয়ে বেশী আনন্দ দেয়।"

দুপুরের খাবারের পর আবার পড়ার ঘরে ফিরে আসে লিওন। একটু পরেই, জোসেফ হানসেন, তার সহকর্মী ও দেহরক্ষী, এসে বলল বাইরে একজন তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে, কিছুতেই বিদায় করানো যাচ্ছে না। জোসেফ বলল, "লোকটা তার নাম বলছে নিকোলাই, পদবী বলতে চাইছে না, আপনাকে এই ছবিটা শুধু দেখাতে বলছে।" লিওন ত্রৎস্কি ছবিটা এক মুহূর্ত দেখেই চমকে ওঠে, টেবিল ছেড়ে উঠে বারন্দায় যায়। চিৎকার করে বলে, "কোথায়, কোথায় সে?"

সে নিচেই দাঁড়িয়ে ছিল। দূর থেকে তাকে চিনতে অসুবিধা হয় না, তার মাথার ক্যাপটা সেইভাবে পড়া, একটা সাধারণ ধূসর জামা আর ঢিলে পান্তালোন। বিপ্লবের সময় ফিনল্যান্ডে পালাতে গিয়ে যেরকম সে দেখতে হয়েছিল অনেকটা সেরকম। এটা একটা অসম্ভব ব্যাপার, তবুও ঐ মুহূর্তে লিওন ত্রৎস্কি যেন ব্যাপারটা মেনে নেয়। দূরে আইসক্রিম বিক্রেতার ঘন্টাধ্বনি শোনা যায়। একই সময়ে কাছের গীর্জার ঘন্টা বেজে ওঠে। মেক্সিকো শহরের নীল আকাশ তাকে যেন আশাবাদী করে তোলে, জোসেফকে বলে, "ওনার কাছ কোনো অস্ত্র আছে কিনা একটু দেখে নাও, তারপর ওনাকে নিয়ে ওপরে আস।"

সিঁড়িতে তার পদধ্বনি শোনা যায়, সময় নেয় সে উঠতে। ঘরে যখন সে ঢোকে লিওনের মনে হয় সে ফিরে গেছে বিপ্লবের উত্তেজনার দিনগুলোয় যখন পৃথিবীর সবকিছু সম্ভব মনে হয়েছিল, সে দৌড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে, উচ্চস্বরে বলে, "কনস্তানতিন নিকোলায়েভিচ, কনস্তানতিন নিকোলায়েভিচ, আপনি এখানে, কেমন করে?"

দ্রাগোমিরভের চোখে জল আসে, পুরাতন বন্ধুর পিঠটা আলতোভাবে সে চাপরায়। তাদের মধ্যে অনেক স্মৃতি, তারা পৃথিবী পালটাতে চেয়েছিল, কিছুটা পালটিয়েছেও বটে, কিন্তু সেই পথটা মসৃণ হয় নি। দুজন দুজনকে ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর লিওন কনস্তানতিনের হাত ধরে নিজের চেয়ারে বসায়। বলে, "আপনি, কনস্তানতিন নিকোলায়েভিচ, তাহলে মৃত নন, আপনি এতদিন কোথায় ছিলেন?"

"এতদিন কোথায় ছিলেন?" প্রশ্নটা যেন কনস্তানতিনকে হতচকিত করে দেয়, সে যেন বুঝতে পারে না তাকে কি জিজ্ঞেস করা হচ্ছে, প্রশ্নটা যেন তাকে চেয়ারে বসে থাকতে দেয় না, কষ্ট করে দাঁড়ায়, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। জানালার কাছে যায় সে। রাস্তা পার করে তার দৃষ্টি যেন বহুদূরে যেতে চায়, তারপর নিচের সুন্দর গোছানো বাগান দেখে। বিষুবীয় অঞ্চলে এরকম একটা সুন্দর গোছানো বাড়িতে চাইলেই সে থাকতে পারত, হয়তো ইনেসা আরমান্ড তার সাথে যোগ দিত। ইনেসার কথা ভাবলে এখনো বুকে যন্ত্রণা হয়। ধীরে কথা বলে কনস্তানতিন, "আমরা সবাই বুদ্ধিজীবী ছিলাম, লেভ দাভিদোভিচ। পৃথিবী বদলাতে আমরা যোদ্ধা হলাম। কিন্তু পৃথিবী বদলাতে গিয়ে নিজেরাই বদলালাম, শেষ ফলাফলের জন্য সর্বধরণের পন্থাই সঙ্গত বলে নিজেদের বোঝালাম। আমরা কলম পেষা ফেলে দিয়ে বন্দুকের পেষা নিলাম। আমাদেরকে কেউ বলে নি যে তোমরা এটা কর। যে শ্রমিক শ্রেণীকে আমরা বাঁচাব ভেবেছিলাম তারা কিন্তু এগিয়ে এসে বলে নি এটা তোমাদের দায়িত্ব - হাতে বন্দুক নেয়া।"

আলমারি থেকে টাকিলার বোতল বের করে ত্রৎস্কি। টেবিলে রাখে ছোট দুটি গ্লাসে ঢেলে জানালার কাছে যেয়ে একটি দ্রাগোমিরভকে দেয়, অপরটি নিজে নিয়ে বলে, "কনস্তানতিন নিকোলায়েভিচ, আপনার শুভ প্রত্যাগমন উপলক্ষে।" দুজনে এক চুমুকে গ্লাসের তরল নিঃশেষ করে দেয়।

টাকিলার ঘ্রাণ আর স্বাদ দ্রগোমিরভকে অতীতে টেনে নিয়ে যায়, মেক্সিকোর উষ্ণ আলোয় রুশের তুষার পড়ে থাকে বহূ দূরে। তবু তার মনে স্মৃতি উথলে ওঠে। সেইসব স্মৃতিকে মধুর, অম্ল-মধুর এসব বিশেষণ দিয়ে বোঝান যাবে না, সেইসব স্মৃতি মানুষের জীবনকে ওলোট-পালোট করে দেবার স্মৃতি। তাতে বেদনা নেই, উল্লাস নেই, আছে এক ধরণের তীক্ষ্ণতা, হৃদয়কে ইস্পাত না করে সেগুলিকে স্মরণ করার উপায় নেই।

কনস্তানতিন ত্রৎস্কিকে জিজ্ঞেস করে, "লেভ দাভিদোভিচ, আপনার ক্রনস্তাদের কথা মনে পড়ে?"

ত্রৎস্কি হেঁটে টেবিলের অন্যদিকে যায়, দ্রাগোমিরভের প্রশ্নটা বোঝার চেষ্টা করে। পেত্রোগ্রাদের কাছেই ক্রনস্তাদ দ্বীপ নৌবাহিনীর ঘাঁটি। সেই দ্বীপের বিদ্রোহের কথা না মনে রাখার কোনো কারণ নেই। কনস্তানতিন বলতে থাকে, "ক্রনস্তাদের নৌসেনারা আমাদের সব্চেয়ে বড় সমর্থক ছিল, ১৯১৭র নভেম্বর বিপ্লবের সময় যুদ্ধজাহাজ অরোরাকে তারা নেভা নদীতে নিয়ে আসে। অরোরার কামানের প্রথম গর্জন শ্বেত প্রাসাদের আক্রমণের সূচনা করে।"

"আপনি জানেন এসব আমি ভাল করেই জানি, কনস্তানতিন নিকোলায়েভিচ," লিওন বলে।

"অবশ্যই, কিন্তু ১৯২১ সনে আমরা সেটা ভুলে গিয়েছিলাম। ১৭ সনের বিপ্লবী নৌসেনারা যখন ২১ সনে এসে আমাদের কাছে বাক-স্বাধীনতা চাইল, গণতন্ত্র চাইল, তখন আমরা কী করলাম?"

লিওন চুপ করে থাকে, ক্রনস্তাদ নিয়ে সে চিন্তা করতে চায় না। দ্রাগোমিরভ বলতে থাকে, "তাদের দাবী-দেয়ায় অন্যায্য কিছু ছিল না। তারা চেয়েছিল ট্রেড ইউনিয়ন করার স্বাধীনতা, সমস্ত বামপন্থী সমাজতন্ত্রী পার্টিদের রাজনীতি করার অনুমতি দেয়া।"

"তারা বিপ্লব বিরোধী শ্বেত-অফিসারদের প্ররোচনায় এগুলো করেছিল। আপনি নিজেই এটা বলেছিলেন," ত্রৎস্কি বলে।

শ্বেত বাহিনী! বিপ্লবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে এই বাহিনী, ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিল তারা আগের সরকারকে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে কনস্তানতিন। বলে, "বলেছিলাম, কিন্তু আপনি আর আমি জানি আসল ঘটনা জানি। আর প্রতিবিপ্লবী শ্বেতদের প্ররোচনায় হয়ে থাকলেও তারা চেয়েছিল গোপন ভোটে সমস্ত কমিটি নির্বাচন হবে। সেই দাবী তো অন্যায্য ছিল না। তারা কৃষকদের অবস্থা আমাদের চেয়ে ভালভাবে বুঝেছিল, কৃষকদের খোলা বাজারে পণ্য বিক্রী করার অধিকার চেয়েছিল। বলেছিল কৃষকদের শস্যকে যত্রতত্র ইচ্ছামত বাজেয়াপ্ত করাকে নিষিদ্ধ করতে হবে। তাদের কোনো দাবীই অযৌক্তিক ছিল না। আমরাই তো এইসব দাবী প্রথম তুলি, তাই না? আপনি লাল ফৌজের প্রধান ছিলেন, ক্রনস্তাদের বিদ্রোহকে কঠোর হাতে দমন করলেন। ওরা আত্মসমর্পণ করল, সেই আত্মসমর্পণ করা তরুণ ক'জন নৌসেনাকে আপনি প্রাণে মারলেন? হাজারখানেক?"

"তা হবে, এর থেকে বেশীও হতে পারে। তবে এর জন্য আপনার প্রিয়পাত্র ফেলিক্স দেরঝিনস্কি আমার থেকে বেশী দায়ী," লিওন বিরক্তি সহকারে কথাটা বলে। মেক্সিকোর এই সুন্দর সকালে সে ক্রনস্তাদের কথা স্মরণ করতে চায় না।

"তা হবে," দীর্ঘশ্বাস ফেলে কনস্তানতিন, "ফেলিক্স কঠোর হাতে সবকিছু দমন করতে পেরেছিল, নইলে নতুন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র টিঁকতে পারত না। আপনি বোধহয় জানেন ক্রনস্তাদের কিছু সেনা, শ'পাঁচেকের মত হবে, ফিনল্যান্ড পালিয়ে যেতে পারে। ভাগ্য কিরকম দেখুন আপনাকেও এখন পশ্চিমের দেশগুলোতে পালিয়ে বাঁচতে হচ্ছে।"

"আপনিও ফিনল্যান্ডে নভেম্বর বিপ্লবের আগে আশ্রয় নিয়েছিলেন, কনস্তানতিন নিকোলায়েভিচ। আমি শুধু বলব আপনার অনুমতি ছাড়া এসব কোনো কিছুই হয় নি। আপনি অনুমতি দিয়েছিলেন বলেই ইয়াকেতেরনবুর্গে জার নিকোলাসকে পরিবারশুদ্ধ মেরে ফেলার সাহস হয়েছিল ইউরভস্কির।"

"এটি আমার সম্পূর্ণ অজান্তে হয়েছে," কনস্তানতিনের গলা প্রায় শোনা যায় না। এই কাহিনী সে মনে করতে চায় না।

"হতে পারে," বলে লিওন, "তবে আপনার বড় ভাই আলেক্সান্দরকে জার নিকোলাস ক্ষমা করে নি, ফাঁসীতে ঝুলিয়েছে, সেই ক্ষত আপনি ভোলেন নি। ১৯১৮তে আপনার মা বেঁচে থাকলে হয়তো উনি আপনাকে সামলাতে পারতেন।"

"আমার বড় ভাইয়ের কথা তুললেন, আর জারের বাদবাকি অত্যাচারের কথা তুললেন না। ১৯০৫য়ের রক্তাক্ত রবিবারের কথা, জারের গোপন পুলিসের অত্যাচারের কথা।"

"এ নিয়ে তো আমাদের মধ্য কোনো মতভেদ নেই, কনস্তানতিন নিকোলায়েভিচ, জারের পুলিশ ক্রমাগতই নিরস্ত্র মানুষের ওপরে গুলি করেছে, বিপ্লবীদের ফাঁসীতে ঝুলিয়েছে। কিন্তু প্রথম থেকেই আমাদের বিপ্লবী সরকার যে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী সেটা প্রতিষ্ঠা করা দরকার ছিল। সেটা করা হয় নি বলেই আপনি চলে যাবার পরে স্তালিন এখন ওরকম সাজানো বিচার চালানোর সাহস পেল। জার নিকোলাসকে বিচারের আওতাও এনে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়াই যেত, কিন্তু তার অপ্রাপ্তবয়স্ক চারটি মেয়ে, একটি ছেলে, স্ত্রী, পারিবারিক ডাক্তার আর পরিচারিকাকে মেরে ফেলার কোনো যুক্তি আমি দেখি না। আমরা বিপ্লবীরা এরকম মধ্যযুগীয় কায়দা এভাবে কেমন করে রপ্ত করলাম, কনস্তানতিন নিকোলায়েভিচ?"

"আমি এ সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। বিপ্লব-বিরোধী শ্বেত-সৈনিকদের হাতে তখন বলশেভিকরা বহু জায়গায় পিছু হটছে। শ্বেত-সৈনিকদের ইয়াকেতেরনবুর্গ দখল করার ঠিক আগে ইউরভস্কি নিজের উদ্যোগে এটা করে। হয়তো স্ভের্দলভের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল?"

"হা, হা, আপনি এটা আমাকে বিশ্বাস করতে বলেন? তাহলে ইউরভস্কি কোনোদিন কোনো সাজা পেল না কেন? আমি যুদ্ধফ্রন্ট থেকে ফিরে আসার পরে আমার সঙ্গে স্ভের্দলভের দেখা হলে তাকে আমি জার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করি, সে বলে জারকে পরিবারসুদ্ধ মেরে ফেলা হয়েছে, আমি কথাটা বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম কার নির্দেশে। সে বলেছিল আমাদের সবার হুকুমে।" ত্রৎস্কির কথাগুলো বলতে একটু কষ্টই হয়। লাল ফৌজের নেতৃত্বে লেভ দাভিদোভিচ ত্রৎস্কি ছিল কয়েক বছর, বলতে গেলে তার অধীনেই বলশেভিকেরা এই বিপ্লবকে সোভিয়েত ইউনিয়নে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। শ্বেতসৈনিকেরা যেমন সন্ত্রাস করেছে তার বিরুদ্ধে লাল সন্ত্রাস না করলে এই বিপ্লবকে বাঁচানো যেত না এটা তার এখনো বিশ্বাস। কিন্তু একবার যখন সন্ত্রাস প্রতিষ্ঠা হয় তার থেকে ফিরে আসা খুব মুশকিল পরবর্তীকালের ঘটনাই তার প্রমাণ।

দ্রাগোমিরভ নিচের বাগানে আবার মনোনিবেশ করে। দুটো কমলা ঠোঁটের টিয়া এসে একটা গাছে বসে, দূরে রাস্তায় ফেরিওয়ালা জোরে হাঁক দিয়ে আইসক্রীম বেচে। এরকম একটা জীবন হতে পারত, আবার ভাবে সে, দুপুরের খাবারের আগে ওয়াইন, বন্ধু-বান্ধব নিয়ে আড্ডা, গিটার, নাচ। অন্ধকার রাতে জারের ছোট ছোট মেয়ে আর অসুস্থ ছেলেটির কথা ভাবতে হত না। বহুদূর থেকে তার মনে ত্রৎস্কির কথা ভেসে আসে, "এরকম নির্বংশ করে দেবার উদাহরণ অতীতে আছে, ভবিষ্যতেও হয়তো হবে। কিন্তু প্রায় একশো পঁচিশ বছর আগে ফরাসী বিপ্লবের সময় রাজা লুই চৌদ্দ আর মারি আন্তোয়ানেতের বিচার হয়েছিল। বিচারে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল, কিন্তু যেরকম বিচারই হোক তাতে ফরাসী ডেপুটিরা অংশগ্রহণ করতে পেরেছিল, ভোট দিতে পেরেছিল, অন্ততঃ তারা শিশু হত্যা করে নি।"

দ্রাগোমিরভ জানালা থেকে সরে এসে চেয়ারে বসে। ভীষণ ক্লান্ত সে। ধীরে ধীরে সে বলে, "যে প্রক্রিয়া একবার শুরু হয় তাকে থামানো যায় না। আপনি নিজে ট্রেড ইউনিয়নদের স্বাধীনতা দেবার কিরকম বিপক্ষে ছিলেন মনে আছে? আপনি বলেছিলেন, 'এটা হল শ্রমিকের রাষ্ট্র। শ্রমিক আর রাষ্ট্র এক, কাজেই ট্রেড ইউনিয়নের প্রয়োজন কী, রাষ্ট্রই ট্রেড ইউনিয়ন।' আপনার কথা মানলে শ্রমিকরা কোনো কাজ করতে অস্বীকার করলে রাষ্ট্র তাদের নিস্পেষণ করার অধিকার পেত। আমি আপনার মতবাদের বিপক্ষে ছিলাম।"

ত্রৎস্কি হেসে ওঠে। বলে, "সেই আপনার চ্যালারাই শেষে সমস্ত শ্রমিক স্বাধীনতা কেড়ে নিল। অনাহারে তারা যতবার ধর্মঘট করতে গেল সেইসব ধর্মঘট তারা কঠোর হাতে দমন করল।"

দ্বীর্ঘশ্বাস ফেলে কনস্তানতিন। বলে, "আমাকে আমার এক আর্টিস্ট বন্ধু বহু আগে এই নিয়ে সাবধান করেছিল। আজ তার নাম মনে করতে পারছি না। না, পেরেছি, তার নাম ছিল গ্রিশা। সে আমাকে সাবধান করার চেষ্টা করেছিল। যে কাজ করার জন্য বিপ্লব করলাম তার ফলাফলটা হল উল্টো। মানুষের স্বাধীনতার জন্য করলাম লড়াই, কিন্তু নিজেরাই সেই স্বাধীনতা হরণ করলাম। বিপ্লব খাদ্যাভাবও মিটাতে পারল না। ভেবেছিলাম জার্মানির সঙ্গে শান্তি হলে দেশের ভেতর একটু মনোযোগ দেয়া যাবে। কিন্তু শান্তির জন্য জার্মানির শর্ত ছিল কড়া, আপনারা সবাই সেই শর্তের বিরোধিতা করলেন। রাশিয়া বাল্টিক রাষ্ট্র, বাইলোরাশিয়া আর ইউক্রেন হারাবে। কিন্তু ঐ শর্ত মেনে না নিলে বিপ্লবী সোভিয়েত সরকার টিঁকতে পারত না। আপনি জানেন আমি প্রথম থেকেই সমস্ত অধিগৃহীত দেশগুলোর আত্মনিয়ন্ত্রণ দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু জার্মান শর্তে সেরকম কিছু ছিল না। কিন্তু আমাদের হাতে উপায় ছিল না।"

একটু থেমে নিয়ে কনস্তানতিন বলে, "কিন্ত, লেভ দাভিদোভিচ, ঐ মুহূর্তে ঐ শর্ত মেনে নেওয়া আমাদের জন্য লজ্জাজনক ছিল বটে কিন্তু পরবর্তীকালে পোল্যান্ড, ফিনল্যাণ্ড, বালটিক রাজ্যগুলো স্বাধীনতা পায়, সেটা তো আমাদের উদ্দেশ্যই ছিল।"

ত্রৎস্কি হেঁটে জানালার দিকে যায়।বলে, "জার্মানির সঙ্গে সন্ধি করতে আমাকে পাঠিয়েছিলেন। কি লজ্জাজনক ছিল সেই চুক্তি। দেশের কেউই সেটা মেনে নিতে পারে নি, তখন যদি গণতন্ত্র থাকত ভোটাভুটিতে আমরা হারতাম। মনে আছে ইনেসা আরমান্ড সেই চুক্তির বিরোধিতা করেছিল, শুধুমাত্র আপনি একা চুক্তির স্বপক্ষে ছিলেন। আর গতবছর আপনার শিষ্য স্তালিন পোল্যান্ড ভাগ করে নিতে হিটলারের সঙ্গে চুক্তি করল। আর এই মুহূর্তে সোভিয়েত সৈন্যরা বালটিকের রাষ্ট্রগুলোকে আবার দখল করছে। আপনার এইসব রাষ্ট্রের নিজ অধিকারের ধারণা কার্যকর হয় নি। "

দ্রাগোমিরভ চুপ করে থাকে। সে এরকম চায় নি, রাশিয়ার আশেপাশে সমস্ত জাতিগুলোকে সে আসলেই আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার দিতে চেয়েছিল। ত্রৎস্কি বলতে থাকে, "আপনি স্তালিনকে ক্ষমতা দিতে না করেছিলেন, পার্টির মধ্যে, দেশের মধ্যে যদি গণতন্ত্র থাকত তাহলে সেটা অনায়াসেই করা যেত। আপনি আপনার ইচ্ছাকে একটা গোপন চিঠিতে লিখে গেলেন, কিন্তু গণতন্ত্র না থাকলে চিঠি দিয়ে কি কাজ হয়? তাতিয়ানা ফিলিপভনা ঐ চিঠি তো পার্টিকে হস্তান্তর করেছিলেন, কিন্তু জিনোভিয়েভ আর কামেনেভ স্তালিনের সঙ্গে মিলে আমার পেছনে লাগল, স্তালিনকে আর সরানো গেল না। শেষ পর্যন্ত এটা কি ওদের বাঁচাতে পারল?"

"না, পারল না," সায় দেয় কনস্তানতিন।

"কনস্তানতিন নিকোলায়েভিচ, ১৯১৭র প্রথম পলিটবুরোতে কে কে ছিল আপনার খেয়াল আছে?" জিজ্ঞেস করে ত্রৎস্কি জানালায় দাঁড়িয়ে বাইরের দিকে চেয়ে।

"আমি ছিলাম," কনস্তানতিন কষ্ট করে বলল, "আপনি ছিলেন, আর ছিল স্তালিন, জিনোভিয়েভ, কামেনেভে, সকলনিকভ আর বুবনভ।"

"এবার দেখুন কাকে স্তালিন তার ১৯৩৬ সালের সোভিয়েত সরকার উৎখাতের সাজানো বিচারে ফাঁসায় নি? এর মধ্যে কে স্তালিনের হাতে মারা যায় নি? স্তালিন সবাইকে আশ্বাস দিয়েছিল ঐ সব বানানো মিথ্যা অভিযোগ মেনে নিলে ওদের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে না। জিনোভিয়েভ আর কামেনেভ তাই বানোয়াট অভিযোগ মেনে নিয়ে স্বীকারোক্তি দিল। আমার কাছে খবর এসেছে, এর পরই, একই দিনে ওদের মেরে ফেলা হয়। জার নিকোলাসকে গুলি করার সময় যখন জার যেমন বিশ্বাস করতে পারছিল না যে তাদের সবাইকে এখনই মেরে ফেলা হবে, ওরাও-- জিনোভিয়েভ ও কামেনেভ--বিশ্বাস করতে পারে নি তাদেরকে ওরকমভাবে হত্যা করা হবে। তাকে গুলি করতে নিয়ে যাবার সময় জিনোভিয়েভ এমন চিৎকার চেচামেচি করল যে তাকে কয়েদখানার কামরাতেই গুলি করে মারল। তো এরা সব স্বচ্ছল পরিবারের ছেলে ছিল, আমি বলব শুধোশুধি বিপ্লবী হতে গিয়ে প্রাণ খোয়াল।"

কনস্তানতিন যেন এই প্রথম শুনল জিনোভিয়েভ ও কামেনেভের মৃত্যুসংবাদ। ফিনল্যান্ডে পালিয়ে থাকার সময় জিনোভিয়েভের সাথে ক্যাম্পের আগুনের পাশে তার কথোপকথনের কথা মনে পড়ে।

"আর সকলনিকভ ও বুবনভ?" ক্ষীণ গলায় প্রশ্ন করে কনস্তানতিন।

"আপনি জানেন না? এতদিন কোথায় ছিলেন?"

কনস্তানতিন উত্তর দেয় না।

"এরা তো কোনো সাতে-পাঁচে ছিল না। বুবনভ দেখত শিক্ষা মন্ত্রাণালয়, ক্ষমতার লোভ করে নি কখনও। সেও হিংস্রতা এড়াতে পারল না। সাজানো বিচার যেদিন তাকে মৃত্যুদণ্ড দিলে সেদিনই সেটা কার্যকর হল। সকলনিকভকে জেলে অন্য লোক দিয়ে হত্যা করানো হল। আপনার সাথে সকলনিকভ ১৯১৭র মার্চে ট্রেনে জার্মানি পার হয়ে এসেছিল, সেই যাত্রাই তার কাল হল।"

কষ্ট হয় ত্রৎস্কির কথা বলতে। অসুস্থ সে বেশ কয়েক বছর। তার দিন এমনিতেই শেষ হয়ে আসছে, ভাবে সে। কমলা-ঠোঁট টিয়াগুলি গাছের ডাল ছেড়ে উড়ে যায়। বলে, "প্রথম পলিটবুরোর মধ্যে খালি আমি বেঁচে আছি। আমি বেঁচে আছি কারণ স্তালিন আমাকে ১৯২৯ সনে নির্বাসনে পাঠিয়েছিল। আমাকে মেরে ফেলতে পারে নি, তখ্নও তার এত শক্তি হয় নি সেইজন্য। তবে কতদিন আর বেঁচে থাকব তাও বলতে পারছি না। কয়েক মাস আগে মেশিনগান দিয়ে এই বাড়ি ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল, এখ্ন গুলির দাগ দেখতে পাবেন।"

"কিন্তু আমি মাত্র কয়েকজনের কথা বললাম," ত্রৎস্কি থামে না, "বলতে গেলে যারা নভেম্বর বিপ্লব করেছিল এবং সেনাবাহিনীর যারা অগ্রগণ্য ছিল তাদের সবাইকে মেরে ফেলা হয়েছে, বাদবাকি দু-একজন যারা বেঁচে আছে তারাও যাবে। কিন্তু শুধু তারাই নয় তাদের পরিবারের লোকজনও রেহাই পায় নি। কামেনেভের তিনটি ছেলে ছিল। এদের মধ্যে দুজনকে গুলি করে মারা হয়েছে। ছোটটি যার বয়স হয়েছিল মাত্র সতেরো আর বড়টি বিমানবাহিনীর অফিসার ছিল।"

"আর তাদের মা?" জিজ্ঞেস করে দ্রাগোমিরভ, "আপনার বোন ওলগা?"

"হ্যাঁ, ওদের মা ওলগা হল আমার বোন, কামেনেভ ছিল আমার শ্যালক। ওলগাকে স্টালিন জেলে ভরে রেখেছে, বাঁচিয়ে রাখবে বলে মনে হয় না।" এর পরের কথাগুলো বলতে কষ্ট হয় ত্রৎস্কির, "আর আপনাকে আমার ছেলে সের্গেইয়ের কথা না হয় নাই বললাম। সের্গেই কোনো রাজনীতির মধ্যে ছিল না। খুব গুণী ইঞ্জিনিয়ার ছিল, প্রফেসর, তাকেও ৩৭ সালে হত্যা করা হয়। আর আমার প্রথ্ম স্ত্রী আলেকজান্দ্রাকে শ্রম-ক্যাম্পে পাঠানো হয়েছে। গত দুবছর ধরে তার আর কোনো খবর পাওয়া যায় নি। আলেকজান্দ্রার সঙ্গে আমার দুটি মেয়ে ছিল। বড় মেয়ে জিনাইদা দুবার বিয়ে করে, দুটি স্বামীই স্তালিনের কারাগারে প্রাণ দেয়। জিনাইদা পরে আত্মহত্যা করে। জিনাইদার প্রথম স্বামীর মাও সাইবেরিয়ার গুলাগে হারিয়ে গেছেন। "

দুজনেই অনেক ক্ষণ চুপ করে থাকে। এই ট্র‍্যাজেডির খতিয়ানের খাতা দীর্ঘ। গ্রিশার কথা আবার মনে হয় কস্তিয়ার। গ্রিশা বলত আমরা দুদিনের জন্য পৃথিবীতে এসেছি। এই দুটো দিন আমি কাটাতে চাই আমার এই জগৎটাকে বুঝতে, তাকে ভাল করে দেখতে। এই দুটো মাত্র দিন আমি বিপ্লব করে কাটাতে চাই না। তার মানে এই না আমি সত্য থেকে দূরে থাকব, কারণ সত্যটাও মহাবিশ্বকে বোঝার জন্য দরকার। সেই সত্য আমাকে অন্য কারুর ক্ষতি করতে দেবে না।  
"কার কথা বলব আর কার কথা বলব না," ত্রৎস্কির কথায় সম্বিত ফেরে কস্তিয়ার, "নিকোলাই বুখারিন, কত বড় তাত্ত্বিক ছিল আপনি জানেন, সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে খোলা বাজার কিভাবে কাজ করতে পারে তা নিয়ে লিখল, পলিটবুরোর সদস্য ছিল, স্তালিনের কত প্রিয়পাত্র ছিল, একসাথে তাদের পরিবারেরা ছুটি কাটাত। শেষাবধি ১৯৩৮ সনে তার সাজানো বিচার আরম্ভ হল, তার মধ্যে একটা কী অভিযোগ ছিল জানেন?"

"কী?" জানতে চায় কনস্তানতিন।

"আপনাকে ১৯১৮তে জার্মানির সঙ্গে চুক্তি করার জন্য হত্যার ষড়যন্ত্র। বুখারিন নাকি সেই ষড়যন্ত্রের নেতা ছিলেন।"

"কিন্তু সেটা তো অসম্ভব একটা ব্যাপার, হাস্যকর বলতে হবে।"

"বুখারিনের জন্য হাস্যকর হয় নি। ফরাসী দার্শনিক নোবেল বিজয়ী রমা রোলাঁ স্তালিনের কাছে কেঁদেকেটে বুখারিনের প্রাণভিক্ষা চেয়েছিল, বলেছিল, বুখারিন হল রাশিয়ার সম্পদ পৃথিবীর সম্পদ। বলেছিল, ফরাসী বিপ্লবের সময় রসায়নবিদ লাভয়জিয়েকে বিপ্লবীরা গিলোটিনে শিরোচ্ছেদ করেছিল, ফরাসীরা এখনো সেই হঠকারি কাজের জন্য শোচনা করে। রাশিয়া যেন সেটা না করে। রমা রোলাঁ মাক্সিম গোর্কির দোহাই দিয়ে বুখারিনের প্রতি দয়া দেখাতে বলল। কিছুতেই কিছু হল না। স্তালিন নিজের বন্ধু বুখারিনকে গুলি করে মারতে বলল, তার স্ত্রীকে গুলাগে পাঠানো হোল।"

"আমার এখন মন পড়ছে, আবছাভাবে," স্মৃতি হাতাড়ায় কনস্তানতিন, "বুখারিন মৃত্যুর আগে স্তালিনকে লিখেছিল, 'কোভা, আমার মৃত্যু তোমার এত প্রয়োজন কেন?' স্তালিনকে তার বিপ্লবী ঘনিষ্ঠজন কোভা বলে ডাকত।"

"লিখেছিল নাকি? কিন্তু সেটা আপনি কী করে জানলেন?"

নিজের মাথায় হাত বোলায় কনস্তানতিন। সত্যিই তো সে মনে করতে পারছে না কোথায় সে এটা পড়েছে। স্তালিন তো বুখারিনের শেষ চিঠি প্রকাশ করবে না। ধীরে ধীরে কনস্তানতিন বলে, "আমি ভুলে গেছি। আমার শুধু মনে পড়ে ঘরে স্তালিনের অত্যাচার না সহ্য করতে পেরে ১৯৩২য়ে তার স্ত্রী নাদেঝদা আত্মহত্যা করে। বুখারিন নাদেঝদাকে ভাল করে চিনত, স্তালিনের মেয়ে স্ভেৎলানাকে স্নেহ করত। জানি না, প্যারানোয়ায় আক্রান্ত স্তালিন হয়তো সেজন্যই সিদ্ধান্ত নেয় বুখারিনকে বাঁচিয়ে রাখবে না।"

ত্রৎস্কি বলে, "এত কিছু, তবু পৃথিবীজুড়ে স্তালিনের অন্ধ ভক্তের অভাব হয় না। এতসব বিদেশী কম্যুনিস্ট মস্কোয় ছিল, শত শত, তাদেরকেও স্তালিন মেরে ফেলল। তুর্কী, ভারতীয়, মার্কিন, মঙ্গোলীয়, কোন দেশ তার মধ্যে নেই। সব আদর্শবাদী মানুষেরা মস্কোয় এসেছিল নতুন বিশ্ব গড়ার স্বপ্নে।"

একটু অপেক্ষা করে ত্রৎস্কি বলে, "আপনি বেঁচে গিয়েছেন যে আপনার কোনো সন্তান ছিল না। তবে আপনার ইনেসা আরমান্ডকে বিয়ে করা উচিত ছিল। আরমান্ড আপনার জীবনে হয়তো আর একটু রঙ দিতে পারত, হয়ত আপনাকে আমাদের স্বেচ্ছাচারিতা থেকে বাঁচাতে পারত। আপনার স্ত্রী তাতিয়ানা ফিলপভনা আপনি যা বলতেন তাই শুনতেন, তাই শেষ পর্যন্ত উনি স্তালিনকে রুখতে পারলেন না, বরং নিজেই কেমন যেন রঙহীন চরিত্র হয়ে গেলেন," বলে ত্রৎস্কি।

দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে কনস্তানতিন। লিওন ঠিক কথাই বলছে। সেই ভাগ্য-নির্ধারক ট্রেনে ইনেসাও ছিল। ফরাসী ইনেসা রাশিয়ায় বড় হয়েছে, সুন্দর বুদ্ধিদীপ্ত চেহার ছিল ইনেসার। ইনেসাও জার্মানদের সঙ্গে চুক্তির বিরোধী ছিল। কনস্তানতিন বলে, "বিপ্লবের পরে ইনেসা এত কাজ করছিল যে ওর শরীরটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। ১৯২০ হবে সালটা, আমিই ব্যবস্থা করে ইনেসাকে দক্ষিণের পাহাড়ে পাঠিয়েছিলাম একটু বিশ্রামের জন্য। এখন ভাবি কেন পাঠালাম। ওখানেই কলেরাতে মারা গেল।"

"আপনি প্রেম ভালবাসা ইত্যাদির ব্যাপারে খুব রক্ষণশীল ছিলেন," বলে ত্রৎস্কি, "অথচ ইনেসা, কল্লনতাই এসব মেয়েরা আপনার মফস্বলের মানসিকতা থেকে অনেক এগিয়ে ছিল। তবে আমি বলব ইনেসার ভাগ্য ভাল, ২০ সালেই মারা গিয়েছিল, নইলে স্তালিন ওকে বাঁচতে দিত না।"

"ঠিকই," সায় দেয় কনস্তানতিন। "কিন্তু বিপ্লবীরা এত হিংস্র হল কেন?"

"বিপ্লব, বিইইইপলব, কথাটার মধ্যে কেমন যাদু আছে তাই না," ত্রৎস্কি বিপ্লব শব্দটা টেনে উচ্চারণ করে। বলে, "এমন যেন এটা বললেই আকাশে রামধনু ভেসে উঠবে, ফুল ঝড়বে, সবার মুখ হাসিতে আনন্দে ভরে উঠবে। কিন্তু তার জন্য যদি কোনো ভূমি না গড়া হয় তবে শেষাবধি বিপ্লবীদের হিংস্রতা বাছা ছাড়া উপায় নেই। আপনার মনে পড়ে, কনস্তানতিন নিকোলায়েভিচ, ১৯১৮ সনে অগাস্ট মাসে অনেক কটা জেলায় বড় জমির মালিকেরা তাদের জমি প্রত্যর্পণ করতে রাজি হচ্ছিল না, এমনকি বিদ্রোহ করল, আপনি পেনজা অঞ্চলের বলশেভিকদের কাছে চিঠি পাঠালেন যেন তারা একশোজন ধনী রক্তখেকোকে ফাঁসীতে ঝোলায়, তাদের সমস্ত ফসল অধিগ্রহণ করা হয় এবং আশেপাশের মানুষদের কাছে যেন এই শাস্তি দৃষ্টান্তমূলক হয়। তারা এই আদেশ কার্যকর করতে দেরি করে নি, কিন্তু আপনি নিজে একবার ভাবলেন না এরকম ঢালাও আদেশে কত নিরাপরাধ লোকের মৃত্যু হতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা আপনি এরকম কলমপেষা মানুষ, মানুষকে না দেখে তার মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেবার মনোবৃত্তি কী করে আপনার মধ্যে জন্মাল বলতে পারেন? তার কারণ আপনি আমি সব সময় উচ্চারণ করতাম একটি মাত্র কথা বিপ্লব, বিপ্লব, বিপ্লব। বিপ্লবের জন্য সবকিছুই সম্ভব।"

পেনজাররের ধনী নিধন মনে করতে চায় না কনস্তানতিন। সে ভাবে জুরিখের স্পিগেলগাস রাস্তার ১৪ নম্বর বাড়িটার কথা। সে আর তানিয়া কেমন নিরুপদ্রবে দিন যাপন করছিল, কে ভেবেছিল সে এক কলমের খোঁচায় মানুষের দণ্ড-মুণ্ডের বিধাতা হবে। গ্রিশার কথাই ঠিক হল শেষে। সর্বোচ্চ আদর্শ সূর্যের মতন, যে সেই আদর্শে সম্পূর্ণভাবে নিমজ্জিত করেছে তার কাছে সমঝোতা বোঝাপড়া এসব ব্যাপার নেই। সেও সূর্যের আগুনে পুড়বে, অন্যকেও পোড়াবে।

ত্রৎস্কি বলতে থাকে, "আপনি পথটা দেখিয়েছেন। যখন ২০য়ের দশকের শেষে ব্যাপকহারে যৌথখামারের জন্য জোর করে জমি গ্রহণ করা শুরু হলে তখনকার অত্যাচারের মাত্রা সবকিছু ছাড়িয়ে যায়, বুখারিন স্তালিনকে বলেছিল এত তাড়াতাড়ি করার দরকার ছিল না, সময় দাও, জোর করে কোনো জিনিস হয় না, রাশিয়া এখনো যৌথখামারের জন্য প্রস্তুত নয়। স্তালিন শুনল না, লাখে লাখে মানুষ মরল না খেয়ে, নয় রাষ্ট্রীয় গুলিতে। বুখারিনের পতন তখন থেকেই শুরু।"

কনস্তানতিন কোনোরকমে বলতে পারে, "আমিই তাহলে এসবের জন্য দায়ী, লেভ দাভিদোভিচ, সেটাই কি আপনি বলছেন?"

ত্রৎস্কি উত্তর দেয়, "আপনি মনে করলেন আপনিই সব জানেন, মানুষের মঙ্গলের জন্য আপনার পথই সবচেয়ে উত্তম। মানুষ যখন মনে করে সে নিজে সব জানে, অন্য কারুর অভিমতের দরকার নেই তখন থেকেই স্বৈরাচারের শুরু হয়। আপনি তো সমস্ত বামপন্থী দলগুলোর রাজনীতি করার অধিকার ধীরে ধীরে কেড়ে নিলেন। স্তালিন আপনার কাছ থেকেই শিখল বিপ্লবের পথে কোনো বাধা রাখা যাবে না। আমি লাল বাহিনীতে জারের সময়কার সামরিক অফিসারদের নিয়োগ দিয়েছিলাম, স্তালিন তাদের একের পর এক হত্যা করল।"

"কিন্তু তাও আপনি এখনো পৃথিবী জুড়ে বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেন, লেভ দাভিদোভিচ? কেন, এত্সব দেখেও কি আপনার শিক্ষা হয় নি?" কনস্তানতিন প্রশ্ন করে।

"না, সমাজকে আবার নতুন করে গড়তে হবে, আমি চিরকালের বিপ্লবী, ভবিষ্যৎ সমাজ যে সাম্যবাদী সমাজ হবে তাতে আমি নিসন্দেহ।"

কনস্তানতিন টেবিলের ওপর থেকে ত্রৎস্কির ডায়রিটা তুলে চোখের কাছে নিয়ে আসে, ডায়রির একটা পাতায় লেখা: "আমি বিপ্লবী ছিলাম, এখনো আছি। ভুলভ্রান্তি হয়েছে, কিন্তু পথ ঠিকই আছে। নতুন প্রজন্ম সারা পৃথিবীতে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবে, তারা সমস্ত শোষণ ও হিংস্রতা ঝেঁটিয়ে বিদায় করবে। বর্তমানকে উপভোগ করে সুখ পাওয়া যায় না, বরং ভবিষ্যতের প্রস্তুতিই মানুষকে সবচেয়ে বেশী আনন্দ দেয়।"

ডায়রির আর এক পাতায় লেখা: "নাতাশা এসে ঘরের জানালা খুলে দিল। বসন্তের রোদ এসে ঘরকে, মনকে ভরিয়ে দিল। জানালার বাইরে নিচে সবুজ ঘাস দেখা যাচ্ছে, তার ঘ্রাণ ভেসে আসে বাতাসে। আহ, জীবন কি সুন্দর।"

কনস্তানতিন বলে, "কোনটা বাছবেন, লেভ দাভিদোভিচ, বর্তমানকে না ভবিষ্যৎকে? জীবন একটাই। সেই জীবন দিয়ে কি ঘাসের গন্ধ নেবেন না তাকে ভবিষ্যতের কাছে অর্পণ করবেন?"

ত্রৎস্কি জানালায় দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে, জমি থেকে সোঁদা গন্ধা ভেসে আসছে, আর্দ্র বাতাস ঘরে ঢুকছে, মেক্সিকো শহরের এই কোয়াকান পাড়াটাকে খুব ভালবাসে সে, এর সাথে অনেক অম্লমধুর স্মৃতি জড়ানো । কনস্তানতিনের প্রশ্নটা মনে হল খুব দূর থেকে ভেসে এল। মনে হল কথাটা কনস্তানতিন তাকে জিজ্ঞেস করছে না, বরং নিজেকেই করছে। জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে দেয় ত্রৎস্কি, হাতে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে, বিড় বিড় করে বলে, "এটাই বর্তমান, তাকে ফেলে আমরা কোন অলীকের পেছনে ঘুরি।" তারপর বাইরে দিকে তাকিয়েই কনস্তানতিনকে বলে, "আপনি হয়তো নিজেকেই এটা জিজ্ঞেস করছেন, কনস্তানতিন নিকোলায়েভিচ। মানুষের জীবনে অনেক ধরণের সুযোগ থাকে, তার মধ্যে থেকে তাকে পথ বাছাই করতে হয়। আপনাকেও যেমন করতে হয়েছিল, কিন্তু বিপ্লবের পথ বেছে নিলে তাকে যন্ত্রের মত হতে হবে, সেখানে কোনো আশা-নিরাশার স্থান থাকবে না, বিপ্লবের উদ্দেশ্যে আপনি সমর্পিত। কিন্তু মানুষ আশা ছাড়া বাঁচতে পারে না, তাই আপনি মারা গেলেও আপনার দেহকে য্ত্ন করে রসায়ন দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে, এমন যেন আপনি জনতার মাঝে বর্তমান। কিন্তু, তাই যদি হয়..," পরের কথাগুলো বলতে যেন ত্রৎস্কিকে একটু ভাবতে হয়ে, "..তাই যদি হয় আপনার দেহ যদি এখন ক্রেমলিনে সংরক্ষিত থাকে তাহলে আপনি এই শহরে কী করছেন?"

ত্রৎস্কি কোনো উত্তর পেল না। ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখল কনস্তানতিন যে চেয়ারে বসেছিল সেটা খালি। তাই হবার কথা। কনস্তানতিন নিকোলায়েভিচ দ্রাগোমিরভ ১৯২৪য়ে মারা গেছে, তার এখন মেক্সিকো শহরে থাকার কথা নয়। এখন সে বোঝে কেমন করে দ্রাগোমিরভ বুখারিনের চিঠির কথা জানল যে চিঠিতে লেখা ছিল "কোভা, আমার মৃত্যু তোমার এত প্রয়োজন কেন?" নাতাশা পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে আসে, জিজ্ঞেস করে, "কার সঙ্গে কথা বলছিলে?" লিওন বিড়বিড় করে, মাথা নাড়ে। নাতাশা অধৈর্য হয়ে চলে যায়।

দ্রাগোমিরভের শেষ প্রশ্নের উত্তর সে দেয় নি, সেটা সে জানে। এত বছর পরেও, স্তালিনের হাতে নিজের নিকটজনদের বিসর্জন দিয়ে, তার হাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে রাখতেও সে নিজেকে বোঝায় সারা পৃথিবীতে বিপ্লবের সম্ভাবনার কথা। কিন্তু একইসাথে সে কল্পনা করে পাততাড়ি গুটিয়ে বেনামে চিলি কি আর্জেনটিনায় চলে যাবার, যেখানে স্তালিনের গুপ্তচররা তাকে আর ধরতে পারবে না।

বারান্দায় বেরিয়ে আসে ত্রৎস্কি। নিচে বাগানে দেহরক্ষী জোসেফ হানসেন দাঁড়িয়ে আছে, তাকে ত্রৎস্কি জিজ্ঞেস করল আজ দুপুরে তার সঙ্গে কেউ দেখা করতে এসেছিল কিনা। মাথা নেড়ে না করল জোসেফ। দ্রাগোমিরভ তাহলে অলীকই ছিল। এর মধ্যেই বাইরের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হল। জোসেফ দরজার মধ্যে একটা ছোট জানালা খুলে দেখল ফ্রাঙ্ক জ্যাকসন। ফ্রাঙ্ককে পছন্দ করে জোসেফ, এই বাসায় জ্যাকসনের আনাগোণা গত কয়েক মাস ধরে নিত্যই, মাঝে মধ্যে তার জন্য কিউবান চুরুট নিয়ে আসে সে। আজ বিকেলে তার সঙ্গে ত্রৎস্কির চা খাবার কথা আছে। জ্যাকসনের পরনে একটা বর্ষাতি।

ত্রৎস্কির পড়ার ঘরে চা খেতে বসে দুজনে। নাতাশা পেয়ালায় চা ঢেলে বলে, "আমি একটু পরে আসছি।" বর্ষাতি খুলে পাশে চেয়ারের হাতলে ঝুলিয়ে রাখে জ্যাকসন। লিওন একটু আরাম করে বসে, দ্রাগোমিরভের সঙ্গে আলোচনা তাকে মানসিক্ভাবে বিপর্যস্ত করেছে, এখন একটু শান্তি পাওয়া যাবে। এই ছেলেটি তার খুব ভক্ত। তাকে ত্রৎস্কি জিজ্ঞেস করে, "আমার 'অবিরাম বিপ্লব' বইটা কি তোমার পড়া শেষ হল?"

জ্যাকসন ত্রৎস্কির দিকে অদ্ভূত দৃষ্টিতে তাকায়, মনে হয় সে প্রশ্নটা বুঝতে পারে নি। তারপর সে মুখ সরিয়ে জানালার দিকে তাকায়, কিন্তু তার ডান হাত চেয়ারের হাতলে রাখা বর্ষাতির মধ্যে ঢোকে। সেখান থেকে পাহাড় চড়ার একটা বরফ-কুড়াল বার করে জ্যাকসন। দাঁড়ায়, দুহাত দিয়ে কুড়ালের বাঁটটা ধরে ধাতব অংশ দিয়ে আঘাত করে ত্রৎস্কির মাথায়। তার লক্ষ্য ব্যর্থ হয় না, রক্ত ঝড়ে, মেঝেতে পড়ে যায় লিওন ত্রৎস্কি আর্তনাদ করে। তার আর্তনাদে ছুটে আসে জোসেফ, এসে জাপটে ধরে জ্যাকসনকে। জ্যাকসন পালাতে পারে না। নাতশা দৌড়ে আসে, ত্রৎস্কি পরদিন হাসপাতালে মারা যায়।

ফ্রাঙ্ক জ্যাকসনের পরিচয় ছিল সে একজন কানাডীয় কম্যুনিস্ট। কিন্তু সেটা ছিল নিতান্তই ছদ্মপরিচয়। জানা যায় সে হল বেলজিয়ান জ্যাক মনার্ড। কিন্তূ সেটাও ঠিক ছিল না। অবশেষে দশ বছর পরে, জেলে থাকার সময়, তার আসল পরিচয় উদ্ঘাটন হয়, সে হল স্পেনের কাতালানিয়ার অধিবাসী রামন মেরকাদর, স্তালিনের অনুরাগী চর।



চতুর্থ অধ্যায় : জুরিখ, মার্চ ১৯১৭

কার্ল ভাগনার তার ট্রেনের প্রস্তাব দিয়ে চলে যাবার পরে রাতে দ্রাগোমিরভ ঘুমাতে পারে না। বিছানায় এপাশ ওপাশ করে। আধো স্বপ্ন আধো জাগরণের মধ্য দিয়ে যায় তার রাত। বিড়বিড় করে, জিনোভিয়েভ কামেনেভ ত্রৎস্কি বুখারিন। দুঃস্বপ্ন দেখে, রায় লিখছে, "আর্টিস্ট গ্রিগরি কারেতনিকভ, জনবিরোধী চিত্র আঁকার জন্য আপনাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হল।" তানিয়া দুবার তাকে ধাক্কা দিয়ে জাগিয়ে দেয়, বলে দুঃস্বপ্ন দেখছ? তারপর ঘুমিয়ে পড়ে দ্রাগোমিরভ, মনে হয় ত্রৎস্কির সঙ্গে কথা বলছে, কিন্তু রুশ দেশে নয়, আলোকোজ্জ্বল কোন আঙ্গিনায় রাজনীতি থেকে দূরে, দুজনে বসে টাকিলা পান করছে। হাসছে। দূরে গাছে দুটি কমলা-ঠোঁট টিয়া পাখি বসে আছে। রাস্তা থেকে ফেরিয়ালার ডাক ভেসে আসছে। মনে হল ত্রৎস্কি তাকে বলছে, "আমরা হলাম সূর্যের মতন, সবাইকে অঙ্গারে পরিণত করতে পারি। তবে সূর্য হয়ে কাজ নেই, এসব ছেড়ে বরং ইনেসাকে নিয়ে পালাও। চিলি বা আর্জেনটিনায় অনেক জমি আছে। জীবন তো একটাই। নিজের জীবন নষ্ট করবে না, সবচেয়ে বড় কথা অন্যের জীবন নষ্ট কর না।" কস্তিয়ার মনে হল সে জিজ্ঞেস করল, "আর আপনি কী করবেন, লেভ দাভিদোভিচ?" একটা আবছা ছায়ার মধ্যে মনে হল ত্রৎস্কি টাকিলার গ্লাস ওপরে তুলে বলল, "জীবন হল একটা স্বপ্ন, কনস্তানতিন নিকোলায়েভিচ। আর বিপ্লবও একটা স্বপ্ন। আমি স্বপ্নই দেখব।"

সকালে ঘুম ভাঙ্গল কারুর দরজা ধাক্কানিতে। দরজা খুলে দেখে একটি কিশোর ছেলে, হাতে একটা খাম। ইনেসার চিঠি। ছেলেটা চলে যাবার পরে দরজায় দাঁড়িয়েই খামটা খোলে কনস্তানতিন। ইনেসা লিখেছে, "প্রিয় কস্তিয়া, আমি জানি জার্মান দূত তোমার বাসায় গিয়েছিল। আমরা বার্ন থেকে বার্লিনে যোগাযোগ করে এই ট্রেনের ব্যবস্থা করেছি। অনেকেই যাচ্ছে, কিন্তু আমি শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিয়েছি না যাবার, তোমার হয়তো এই সিদ্ধান্ত পছন্দ হবে না। অন্য ধরণের কাজ করব ভাবছি, জানি না তুমি কি করবে? শুভেচ্ছান্তে, ইনেসা।"

চিঠিটা কয়েকবার পড়ে দ্রাগোমিরভ, লৌহশকট তৈরি, কিন্তু ইনেসা যাচ্ছে না। কিসের স্বপ্ন দেখছিল সে? টাকিলার? টাকিলাটা কী জিনিস? কোটর‍্যাক থেকে কোটটা তুলে পড়ে নেয় কস্তিয়া। তানিয়া তখনো ঘুমাচ্ছে। কোটের পকেট থেকে মানিব্যাগটা তুলে নিয়ে টেবিলের ওপর রাখে, তানিয়ার লাগবে সেটা। ফ্ল্যাটের বাইরে বেরিয়ে দরজাটা ভেজিয়ে দেয় পেছনে কস্তিয়া। সোমবার সকালে জুরিখ সবে জেগে উঠছে। বেশ ঠাণ্ডা। লিমাট নদীর ধার ধরে হাঁটে কনস্তানতিন। ইনেসা যে হোটেলে উঠেছে সেটা এই পথেই পড়বে।

শীষ দেয় কনস্তানতিন নিকোলায়েভিচ দ্রাগোমিরভ। বক্তৃতার দিন শেষ হয়েছে, পাহাড়ে গলছে বরফ, বসন্তের হাওয়া যেন নিয়ে আসে সদ্য ফোটা ফুলের ঘ্রাণ। তরুণ ইয়েসেনিনের কবিতা আওড়ায় কস্তিয়া।

গমক্ষেতের একঘেয়েমী
ফেলেছে আমায় ক্লান্ত করে,
হলামই বা ভবঘুরে কিংবা চোর
কিন্তু যাব এবার দেশ ছেড়ে।

চাঁদ সাঁতার কাটে
তার বৈঠা ফেলে হ্রদে,
তবু রাশিয়ার চলে যাবে
আগের মতই - নেচে কেঁদে হেসে।।

1 টি মন্তব্য:

  1. apurbo sundor shoktishalee lekha. Itihash aar kolponar majhe kothay niye jay pathokkey jekhan theke firte ichchhe hoyna. Aro lekhar ashay roilam.

    উত্তরমুছুন