মঙ্গলবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৬

হেলাল মহিদীন'এর গল্প : বাতপূন্নি

বাতপুন্নির কালরাত-নিশুতিতে, এই শাপশাপান্তের লগনেও শীস? কে বেরিয়েছে? কার অ্যাত সাহস?

ভয়ভয়-ছাওয়া গেহস্থঘরগুলোর নেভানেভা হ্যারিকেন-কুপির সলতেশিখা আলতো বাড়ে কমে। ঘরঘর ফিসফাস জিজ্ঞাসা একি আসলেই ইনসানি সুর? জোহুরা তোহুরা হুরিপরি, সোলেমান জ্বিনেরা, ভূতপ্রেতরা শীষকাঁদনের ভুলভুলাইয়া সুরের মোহনফাঁদে ডাকছেনাতো? বেহাগ অ্যাতটা ছটফটানি উচাটনি যাদুকরি বাজিকরি কেন হবে! বড়ই উতলাউথালি কাঁদনঝাপটানি টান­­।

গ্রামের মসজিদে এশা’র আজান হতে না হতেই জামাত করে নিয়েছিল মুস্ললিরা। আর গ্রামে হাটবার ছিল। তবু দোকানপাটে ঝাঁপ পড়েছে মাগরেবের আগেই। সাঁঝবাতি হতেই চার গ্রাম সুনসান। খালবিলে বেড়জালগুলো আসমানমুখো। ছাউনিখলায় রাতকাটানো জেলেমাছালিরা আজ ঘরে ফিরেছে। মাছ ভুতপেতনির দুলকি ঘোড়া! এই অভিশপ্ত রাতে বেড়জালে তোলা মাছ বাজারে বিকোবেনা। সবাই জেনেছে বাতপুন্নির পাগলা রাতে সাধুবুড়ি বাদে কোনো আদমসন্তানের, পোয়াতিদের ঘরের বার বারণ। জোয়ান মরদের বাঁশি ঠোঁটে ছোঁয়া বারণ। এই মায়ারাত দোযখরাত খালি বশিকারের; বংশিকারের শীসকারের নয়।

পষ্ট বুঝা যায় বিরহা-বিবাগি শীসকান্নায় তোলা ভাওয়াইয়া সুর সাধুবুড়ির ছাপড়ার দিকে এগোচ্ছে।

দিন দুই আগে হাটবারের শেষ বেলা। ত্রয়োদশি চাঁদের আলো। দূর গ্রামে কোনো এক প্রসবিনির ঘরে ধাই-আচারি শেষে বাড়ি ফিরছিল সাধুবুড়ি। চার গ্রামের মানুষ জানতে চাইল—সত্যিসত্যি বাতপূন্নি হবে পরের রাতের পরের রাত?

সাধুবুড়ি এ গেরামের ধাই। বৈদ্দ কবিরাজ হেকিম তান্ত্রিক মগাশাস্ত্রি বশিকারনি বিয়া-নিকার ঘটক সব। এলেম-জ্ঞানে চার গেরামের সামিয়ানা! ঘরঘর পোলাবুড়া সবার নাম বয়স তার মুখস্ত। হাজার জনের জনম তার হাতে। হাজার জনের বাঁচন। কোনোদিন একটা পিঁপড়ারও ক্ষতি করেনি। উপকারের বয়ানে গেলে হাজারে হাজার ছাড়াবে। পুঁথির পাতায়ও আঁটবেনা। সাধুবুড়ি বলেছিল—হর ঊনপঞ্চাশ সাল বাদ সাত মোছুমের সাত গিট্টা শেষে এক পঞ্চদশির রাইতে এশার শেষ হতে ফজরের আজান’তক বাতপূন্নি হয়। একেক সাত বছরে একটা আকাল। সাত আকাল শ্যাষে চাঁদ আরেকবার ডাঙ্গর হয়। মাঝনিশুতে বোরাকের ঘোড়ির মত খুবসুরত চাঁদ নামে। জোয়ান আদমির গতরে জোহুরা তোহুরা হুরিপরি ভর করে। সোলেমান জ্বিনে পায় ডাগরজোয়ানি জেনানারে। উথালিপাথালি পরীর বহর উড়ালি সাঁতারে জমিন মাড়ায় ইনসানের তালাশে। বিল-বাওড়ে ছায়াছায়া একদল মায়াবিনি নামে। চাঁদপাগলির যৌবনপাখি দুনিয়ার পিরিতে উম্মাদিনী হয়। দুনিয়ারও পাগল পাগল লাগে। চান্নির আর দোজাহানের মিলন হয়। ইসুফ জোলাইখার মিলন।

কে না জানে সাধুবুড়ির কথা? কে না মানে? মাইল দশেক দূরের গঞ্জ নাগাদ চলে এসেছে খানসেনারা। সাধুবুড়ির বাতপুন্নির বয়ান তাদের কানেও গেছে। শুনেছে এ’রাতে যে পাগল হয় সে আর মানুষের দেশে ফেরেনা। মজনুন হয়। বাতপুন্নির পরও সাতদিন সাতরাত ছায়ামায়াবিনি পরীর দল সারেজাঁহা্য় ঘুরঘুর করে। এই সাতদিন পতি-পত্নি আশেকান-আশেকিনিরা ছাড়া গলদ আদমি জেনানার গতরে গলদ হাত দিলে জনম-জনমের আউলাপাগল হয়। কুনজর দিলে চোক্ষু কুরবায় খায়। আন্ধা হয়। শুনেটুনে খালি একিনই করেনি খানসেনারা নাকি ভয়ও পেয়েছে খুব। জেনেছে ভূতপ্রেত বিজলি-আগুন ভয় পায়। গঞ্জ হতে ফিরে আজই একজন জানাল পরের সাত-আট দিন বিজলি বাতির আরামে-ওরশে গঞ্জেই থাকবে হারামির বাচ্চারা। ভয়ে্ডরে সাত দিন এমুখো হবার সম্ভাবনা নাই।

ইমাম হুজুরকেও আজ তাহাজ্জুদ ঘরে পড়তে হবে। তা হোক! শরিয়ত মারফতে দা’ত-বে’দাতে টক্কর লাগে লাগুক! সাধুবু’জির হাতেই যে তার ছয়-ছয়টি সন্তানের পয়দায়েশ, চার সন্তানের শাদি; তার অছিলায়ই যে দশ-বারোবার বিবির মওত তবিয়ত হতে পরোয়ারদিগারের পানাহ মেলা! তবুও ধন্দ হয় বাতপুন্নির বয়ানে কোথায় কি জানি একটা ধোঁয়াশাও আছে! হাদিস কোরান তফসির কালাম কোথাওতো বাতপুন্নির বিষয় নজরে আসেনি! ইমাম হুজুরের নিজের বয়সই বাষট্টি। তাহলে ঊনপঞ্চাশ বছর আগের বাতপুন্নিতে বয়স ছিল তের বছর। সাধুবু’জিও ছিল তেইশ-চব্বিশের যুবতি। কই সেই সময়ের কোনো বাতপুন্নির কথা মনে নাই তো! আশি নব্বইয়ের বুড়োবুড়িদের একটাই কথা সাধুবুড়ি বলছে বাতপুন্নি আছে; তাহ’লে সত্যসত্যিই বাতপুন্নি আছে। তাদের বয়সকালে বাতপুন্নি পেয়েছে কি পায়নি অতশত এখন আর মনে নাই। থাকতেওতো পারে! সাধুবু’জি জীবনে একটি মিথ্যা কথাও কখনো বলেছে এমন নজির নাই। সেই সময়ের অশিক্ষিত মুখ্যসুখ্য চাষাভূষারা গোয়ালে গরু তুলেই সাঁঝখাবার পেটে ঢেলে লম্বা ঘুম দিত বলে হয়ত কিছু টেরই পায় নাই। জানতওনা হয়তবা! তবে ঊনপঞ্চাশ বছরে সাতটা খরা-বারিষ-বান-আকাল-আক্রার ঝাপ্টাতো আসলেই তছনছ করে গিয়েছিল এই তল্লাট-তালুক। আরো ধন্দ লাগছে নুরি আর হালিমারও আজ ঘরবারানির অনুমতি নাই। আশ্রিতা এই দুই বয়স্থা বিধবা সাধুবু’জির গায়েগায়ে লেগে থাকা সার্বক্ষণিক সঙ্গি। সহকারি। শিক্ষানবিশ ধাত্রী। এতসব হলে কি হবে আজ তাদেরও ঘর ছেড়ে বাইরে আসা বারণ!

ছেলেবুড়ো সকল গেরামিইতো বিশ্বাস করেছে বাতপুন্নি-কাহন! পাকিস্তানি জানোয়ারগুলো পর্যন্ত! বাতপুন্নির আশির্বাদও আছে তাহ’লে? হায়েনাগুলোকে ভয় খাওয়ানো বাতপুন্নি বে’দাত কুসংস্কার হলেও হোক! হর পূর্ণিমা বাতপুন্নি হোক! শুয়োরের পালের উপর আল্লার গজব নামুক এই বাতপুন্নির সুযোগে।

ইমাম হুজুর ক্লান্ত পরিশ্রান্ত। চোখে সাত জনমের ঘুম। যেন এই ঘুমের দেশ হতে ফিরে আসা হবেনা আর কোনোদিন। গত দু’দিনে গোটা কুড়ি বিয়ে পড়াতে হয়েছে। নিষ্পাপ কচি বেতফলের মমতামাখা মুখগুলো! সদ্য কৈশোরে ডাক মিলেছে মাত্র। চোখমুখভর ছি-বৈচি খেলায় ফিরে যাবার ছটফটানি কলকলিমাখা মা হাওয়ার রুহানিসুরত! দুনিয়াদারি ডোবানো রোনাজারির ঢলে আল্লার আরশ ভাসিয়ে বাপ-মা’র দল হৃদয়কণা রাজকন্যাদের তুলে দিচ্ছে আপদ বালাই অপদার্থ অক্ষম মরদসরদের হাতে। দু’চারটি বাদে গেহস্থঘরের অনেক খানাপরিবারই জোয়ান সোমত্ত মেয়েদের নিয়ে সুবে সাদেকের কুয়াশা আঁধারে গ্রাম ছেড়েছে। খান সেনাদের গ্রামে ঢুকে যাবার আগেই এখানে সেখানে সরিয়ে রাখার চেষ্টায় ব্যস্ত সবাই। এরই মাঝে অভিশাপের বাতপূন্নি! মরার ঘুম তুলার আঁশের মত শুন্যে উড়িয়ে নিচ্ছে মরাকাটালের কষ্ট বিষাদ বিষন্নতায় অবশ অবসন্ন ইমাম হুজুরকে।

তখনই কানে লাগে খসখস খসখস পাতা মাড়িয়ে খড় মাড়িয়ে কে যেন দৌড়ে আসছে এদিকটায়। ইমাম হুজুর চিৎকার দেয়—বিবি, আসমা, আয়েশা কুপির আগুন বাড়াও। ভিতরের ঘরে যাও। হঠাত মনে পড়ল বিবি আর দুই কন্যা আসমা আয়েশাকেও খানসেনাদের ভয়ে আজই কূড়ি মাইল দূরে শ্বশুরবাড়ি রেখে এসেছে নিজেই। পাতামাড়ানি আওয়াজ তোলা ভূতমানুষটি এখন দরজা ভেঙ্গে চলছে—হুজুর, হুজুর আমার মেয়েটাকে বাঁচান। মৃতের দেশ হতে পা টেনেহিঁচড়ে ঊঠে দরজা খোলে ইমাম হুজুর—“আবুমিয়া তুমি? তোমার বাতপুন্নির ভয়ডর নাই? এই রাতে ঘরের বার বারণ। মানুষ পাগল মজনুন হয়!”

আপনিওত বাপ, হুজুর! বাপ-মা ত’ পাগল-মজনুন! আমার মেয়েটা...... .....। ডুকরে কেঁদে উঠে আবুমিয়া।

আবুমিয়া আর সালেহা বানুর মেয়ে রূপা এত পাহারার মাঝেও কিভাবে যেন মূহুর্তখানেকের জন্য ঘরের বাইরে দাঁড়িয়েছিল। লহমায় সোলেমান জ্বিন কব্জা করে নিয়েছে তাকে। জোয়ান কন্যা। গরুচোখা মায়াভরা মুখের এক কালো মেয়ে। বিয়েবাজারে কালো মেয়ে চলেনা। তাও কি কপাল মেয়েটার! গত ক’দিনে দশ-বারোটা বিয়েশাদির সম্পর্ক এসেছে। অথচ মারধর যন্ত্রণা মন্ত্রণা কোনোকিছু দিয়েই কপালপুড়িকে বিয়ের পিঁড়িতে বসানো গেলনা। সাধুবু’জির নসিহত নতিজা মানে নাই এমন আদমি দুই দশ গেরামে একজনও নাই। সেও রূপাকে বুঝাতে গিয়ে নিজেই উলটা বুঝ নিয়ে এসে আবুমিয়া সালেহাকে বলছিল— “জোরাজুরির নিকায় ইশক মহাব্বত হয়না, জেন্দেগিভর দোজখের আজাব হয়।“

সাধুবুড়ির পর ইমাম হুজুরই চার গ্রামের মানুষের বিপদ-আপদের ভরসা। আজ সত্যিসত্যিই সবাই পাগল হয়ে যাচ্ছে কি? নইলে ইমাম হুজুরও ক্লান্তি ঠেলে ঊঠে দাঁড়য় কোন গায়েবি শক্তিতে? আবুমিয়া সালেহারও কণামাত্র ডরভয় নাই কেন? সালেহার একটাই কথা সাধুবুড়ির কাছে যেতে হলে সেও যাবে। গঞ্জে বড় হেকিমের কাছে বা হাসপাতালে বা পাতালপুরির পরির রাজ্যে যেতে হলেও যাবে। ওদিকে একই সময়ে গ্রামজুড়ে শীতশিরশির ভয়ের আঁচড় বুলানো শীসের রোদনটি সাধুবুড়ির ছাপড়া ছুঁয়েছে বুঝা যাচ্ছে। এই লগনেও অ্যাতঅ্যাত সাহস কার?

“সুখালি?”

বিস্ময়ে সাধুবুড়ির চোখের মনিতে লাটিমের ঘূর্ণিচক্কর নামে। এই কি সেই যুবক? রাজ্যের ভীতু আর লাজুক ছেলেটি? যে কিনা সাঁঝবেলা বাঁশি বাজালেও ঘর-বারান্দার বাইরে যাবার সাহসটুকুও রাখেনা? সুখালি উত্তর দেবার গরজ করেনা। পাগল মজনুন হবার নিয়ত-এরাদার ঝলকানি তার চোখেমুখে। ছাপড়ার বাঁশঝাঁপি-আঁটা পাশদরজা টেনে নিতে গিয়ে সাধুবুড়ির মনে হল খানিকটা দুরে আরো এক নারীর দীর্ঘ ছায়া দীর্ঘতর হয়ে পাগলের মত ছুটে আসছে এদিকে।

“রূপার মা? পাগল হয়েছো? তুমি পোয়াতি!”

“সাধুখালা, আমার রূপা......’ ভয়-আতঙ্কে স্রোতের গাছপালা জড়িয়ে যাচ্ছে সালেহার জিহবায়।

ভালবাসার চেয়ে বড় পাগলামি কিছু হয়? মেয়ের আঠারো বসন্ত শেষে সালেহা আবার পোয়াতি। কি লজ্জা! আবুমিয়া সালেহার ভয় ছিল লজ্জাটজ্জা নিয়েটিয়ে সমাজে মুখ দেখানো গেলেও রূপা হয়ত সহ্যই করবেনা। ঘরে খিড়কি দেবে। ঘটলো উল্টোটি। মেয়েই বাড়িবাড়ি-পাড়াগ্রামরাষ্ট্র করল খবরটি। এতটা দিন অ্যাত আনন্দ-উচ্ছ্বাস কোথায় লুকিয়ে রেখেছিল মেয়েটি কে জানে! মাচান হতে একটা লাউ কেটে আনতে বললে যে একশ’টা ছূতা বার করত হুট করে সেই মেয়েই নিজ জিম্মায় কবজায় নিয়ে নিয়েছে সালেহার সংসারকে। সালেহাকে। আবুমিয়াকে। সাধুদিদার কাছে শেখা পোয়াতি-পরিচর্যা ফলানোর সু্যোগ মিলে গেছে তার। এটা করা যাবেনা, ওটা খাওয়া যাবেনা, এখন বিশ্রামের সময়—ইত্যাকার শাসন-নিয়মের দারোয়ানিতে তটস্থ রাখছিল মা’কে। আবুমিয়া সালেহা অবাক বিস্ময়ে দেখতে শুরু করেছিল কন্যার অস্ত্বিত্বজূড়ে ভালবাসা-কিশলয়টির ডালপালায় বেড়ে মহিরুহ হবার কালপর্বটি।

ডানাঝাঁপ্টানো রাজহংসির অধিকার ফলানো চঞ্চলা মেয়েটির আচানক কি যেন হল! কী এক অজানা বিবশা বাতাসে গত দু’দিনে ঝড়ে ভেঙ্গে পড়া পাটিপাতাগাছের মত মিইয়ে পড়েছে। চুপসানো। নিস্তেজ। কখনো বেচইন পেরেশান! দুইদিন-দুইরাত এক কণা খানাপানিও ছোঁয়নি। এক লহমার জন্যও ঘুমায়নি। চোখ-মুখ ফুলে আতাফল যেন! সালেহা আবুমিয়ার কানেকানে বলেছিল—“বয়সকাল! অ্যাতঅ্যাত সম্বন্ধ আসে মাইয়া্র ইজাজত নাই! রূপার মনে হয় কাউরে মনে ধরছে; মন দেয়ানেয়া ভাব-ভালবাসার কষ্ট নয়ত!” জননী গর্ভধারিনীদের দুই চোখ থাকলে চলেনা দুই কুড়ি চোখ লাগে। আবুমিয়া জানতে চায় সালেহার নজরে নমূনা-নিশানা কিছু ধরা পড়েছে কি কখনো? সালেহার দিলে-কলবে ডাক পড়ে গেছে সুখালি ছেলেটা রূপার পাগল। ছায়ার মত বাড়ি-বাগান-ঘাটায় তার ঘুরঘুর চলাচল সালেহার চোখ এড়ায়না! খুঁজলে আরো নমূনাসমূনা মেলে। সাঁঝভর বাঁশি বাজায় কেন ছেলেটা? তাও শুধুই এই বাড়িমুখো? গিরস্থঘরের ছাওয়াল হয়েও কত ভালো স্কুল পাশ দিল; গঞ্জের কলেজে বিনাবেতন পড়া-থাকা-খাওয়া সাহেবিয়ানা রংঢং সিনেমা-সার্কাস কতশত আমোদফুর্ত্তির সুযোগ—সব ছেড়েছুড়ে পাড়াগাঁ’য় কেন? কিছু একটা কিন্তু আছে নিশ্চয়ই! সুখালির ইয়ার দোস্ত সমবয়সিরা মুক্তির খাতায় নাম তুলেছে। যুদ্ধে গেছে। সেখানে সুখালিই একা গ্রামে পড়ে থাক কেন? কীসের মায়ায়?

এই গেরামে জ্বিনদোষলাগা মেয়ের শাদিসম্বন্ধ হয়না। ওদিকে ভয় হয় যে কোনো সময় খান সেনারা হামলে পড়তে পারে গেরামে। বাতপুন্নির ভয়ে ইবলিস শয়তান সাতদিন সরে থাকলেও থাকতে পারে বিশ্বাস করা যায়; ইয়াহিয়ার ইবলিশদের বিষয়ে পাড়ার নেড়িকুত্তা্রও অ্যাতটা বিশ্বাস নাই। এমেয়েটির এমন ফুল ফুটবার কালে ভালবাসার কালে বাতপুন্নির আঁচড়ে আবুমিয়া সালেহার দিকদিশাহারা কষ্টভাংচুর আর্তনাদ আকাশ ছুঁইছুঁই হয়। ভয় নয় সোলেমান জ্বিনকে দেখে নেবার আগুনিজেদে জ্বলতে থাকে দু’জন। সোলেমান জ্বিন কাপুরুষ! বিবশ নাজুক একটি মেয়েতে ভর করা কাপুরুষতা নয়ত কী! আজ রাতেই মেয়েকে তার মাশুকের কথা জিজ্ঞেস করার যোগাড়যন্ত ছিল সালেহা আবুমিয়ার। বোকা মেয়ে কি বোঝেনা সুখালিই তার মনের মানুষ কথাটি জানা সালেহা আবুমিয়ার জন্য খোশখবরি! কাল ভোরেই সম্বন্ধের প্রস্তাব নিয়ে সুখালিদের বাড়ি যাবার ছক-পরিকল্পনাও করে রেখেছিল দু’জনে।

আবুমিয়া সালেহার চোখ হতে যে আগুন ঠিকরে পড়ছিল তাতেই সোলেমান জ্বিনের ভস্ম হয়ে যাবার কথা। কে জানত এই আগুনও পানি হতে পারে মুহুর্তেই!

“জ্বিনে ধরে নাই।” সুখালি বলল। ইমাম হুজুরও বলল জ্বিনে ধরার কোন লক্ষণ নাই। গঞ্জের ডাক্তারকে দেখানো দরকার। সাধুবুড়ির দুই আশ্রিতা নুরি আর হালিমারও একই কথা।

“রূপারে জ্বিনে ধরে নাই, জ্বিনে কাউরেই ধরেনা।” নিজের সঙ্গে কথা বলার মত ফিসফিস উচ্চারণে সাধুবুড়ি বলল—“বাতপুন্নিটুন্নি কিছু নাই!”

ইমাম হুজুর, আবুমিয়া আর সালেহার চোখেমুখে মহাশুন্যের বিস্ময়! সাধুবুড়ি বলছে একথা? সাধুবুড়ি আবারো মুখ খোলে—“তোমার পেটে বাচ্চা, রূপার মা! খবরদার, পাগলামি করবা না; বাচ্চার ক্ষতি হবে। রূপার চিকিৎসা লাগবে, আমি দেখছি। বাতপুন্নি জ্বিনপরি সব মিথ্যা।”

খালের ঘাটে সুখালিদের নৌকা বাধা আছে। সাধুবুড়ি সবাইকে নৌকায় উঠতে বলল। কেউ জানেনা কিজন্য! ঘুমচাদরে মোড়া মেয়েকে কাঁধে তুলে নেয় আবুমিয়া। ঝকমকি চকমকি আকাশ ছেয়ে আছে সোনাঝরা মায়াপূর্ণিমায়। এক জনমে এমন রাত একবারই মিলে।

বাতপুন্নির গল্পে ভূবন ভুলাতে পারা সাধুবুড়ি আসলেই পিশাচিনী নয়তো! ইমাম হুজুরের ধন্দ বাড়ে। কেন ষাট-ঊনষাট বছর আগে এক ভরপুর্ণিমার রাতে আঠারো-কুড়ির তাগড়া জোয়ান পরাণ মাঝি এক ফুটুফুটে পুর্ণিমাচাঁদমুখ নিয়ে এসেছিল ঘরে? জনজনান্তে ঘরঘর কানাকানি ফুসুরফাসুর ছড়িয়ে পড়েছিল পরাণ মাঝিকে যাদুটোনার মায়ায় বশ করেছে পিশাচিনী। বালেগা হবার আগ হতেই নাকি কামরূপকামাখ্যাযোগিনী সাপিনী ছিল! তা না হলে বেহেস্তের হুরপরির আশেকেও সমাজ-সমাজি খান্দান-সিলসিলা লাজলজ্জা শরমভরম খোয়াবার পোলা আছিল না পরাণ! তেলেসমাতি ব্যপার! তেরো-চৌদ্দ বছর বয়সি যাদুকরনি মায়াবিনী বালিকাবৌটি দু’চার দিনের ভিতর গেরামিদের নয়নমনি ব’নে গেল। বশ করে ফেলল গ্রামের ছেলেবুড়ো সকলকে। ইমাম হুজুর তখন তিন-চার বছরের শিশু। সাধুবু’জি ইমাম হুজুরের বয়েসিদের বছর দশ এগারো বড়। ক’দিনেই বাচ্চাকাচ্চা শিশুমিশুদের আব্দার-আশকারার আস্তানা রাজধানি হয়ে উঠল কিশোরি সাধুবু’জি। সাধু নামটির শরীরে খেতাব লাগল ‘বু’জি’—মায়ের বেটের বোন। বড়বোন!

বছর দশ আগে পরাণ মাঝিকে সাপে কাটে। সে রাতও ছিল ধবল পুর্ণিমা। সাধুবু’জির জীবনের প্রথম বিচ্ছেদরাত। গেরামিরা কেঁদে সারা হয়েছে মানিকজোড়ের ভাঙ্গনে; সাধুবু’জি কাঁদেনি। গাঁওভর ‘ও শুকসারি, ও ব্যংগমা-ব্যংগমি, ও রহিমবাদশা-রূপবান বাড়ি আছো?’ হাঁকডাকের শেষ দিন! সাধু-পরাণ সন্তানহীন। নিরালে-আড়ালে গেরামিরা মিলাদ-মৌলুদ-মানত করত; নিত্য দোয়ায় মোনাজাতে পরোয়ারদেগারের কেরামতির নজদির একটি সন্তানের আরজ করত। অথচ আনজানাজনে আওলাদের বিত্তান্ত জানতে চাইলে পরাণ-সাধু হোহো করে হাসত। পরাণ আঙ্গুল তুলে দেখাত সাধুকে। সাধু দেখাত পরাণকে। শাদি-নিকা-আকদ মেহফিল মোনাজাতে ইমাম হুজুর দোয়া করত—‘ইয়া পরয়ারদিগার আজ যেই দুই মিয়াবিবিরে এক করে দিলা তাদের মহব্বতকে সাধু-পরানের ইশকের মত বুলন্দ মাহতাব করে দিও’! কতটা

এ্ত ভালবাসাবাসির অভিনয়ও মিথ্যা ছিল কিনা সন্দেহে ইমাম হুজুরের বুকে এক দলা ঘৃণার বিষ জমে। কত বড় মিথ্যা! অ্যাতটা ছলনা! সাধুবু’জি হয়ে বড় বোনের জায়গা জুড়ে ছিল যে সে কোনো পিশাচিনী নয়তো! ঝুট কাহানিতে গেরামিদের ঘরবন্দি না করা হলে খেতফসলি-শেষ হেমন্তরাতের এমন ভরপূর্ণিমায় সাত তল্লাট নেয়েগেয়ে উঠতে পারত। জোছনার অমন ‘ঘর ছাড় ঘর ছাড় গেরামিরা’ ডাক! বাতপুন্নির ভয় না ছড়ালে এই ডাকে ভরাট পঞ্চদশির চাঁদখোলা মাঠে ছুটত গেরামিরা। এমন সোনাঝরা হেমন্তরাতে মাঠকাবারি বলিখেলার অপেক্ষায় থাকে ধানতোলা খড়-ন্যাড়া জমিন। অন্যদিন হলে এই রাতে পুঁথির টানে ঝাঁক বেঁধে জড়ো হত পুঁথিয়াল বহর, বাহাসের টানে কবিয়ালের দল। অথচ কি বঞ্চনা! হাজারো জনকে ঠকানোর, এমন বঞ্চিত করার ঘটনা গ্রামে আর কখনো ঘটেনি। আগামীকাল হ’তে গ্রামগ্রাম লোকে জেনে গেলে কি হতে পারে সাধুবুড়ির দশা? গ্রামছাড়া নাকি একঘরে হবে বুড়ি? নাকি পাথর ছুঁড়ে আগুনে পুড়ে মারতে আসে গ্রামবাসীরা কে জানে!

নাউজুনিল্লাহ! আল্লাহ তুমি কলব হ’তে শয়তানি বদচিন্তা দুর করে দাও। নিজেকে সামলে নেবার চেষ্টা করে ইমাম হুজুর।

নৌকার পাটাতনে নিশ্চিন্ত নির্ভরতায় আবুমিয়া সালেহা মেয়েকে জড়িয়ে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। সবে জনম নেয়া কুকুরছানারা যেমন কুকুরি মা’র গা’য়ে গুটিশুটি গা লাগিয়ে রোদ পোহায় সেরকম। ঘুমঘোর স্বপ্নদোলনায় দোল খেতে খতে সালেহা দেখে সব গেরামিরা বেহেস্তের বাগানে ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছে। শরীরে বেহেস্তি পোশাক। তাদের পথ দেখিয়ে চলছে সাধুখালা, ইমাম হুজুর, নুরি, হালিমা আর সুখালি। গলায় গলা মিলিয়ে আস্বস্ত করছে —‘রূপা ভালো আছে। কোনো জ্বিনের সাধ্য নাই রূপার কিছু করে’।

সরসর শব্দে খালের পানি কেটে নৌকা চলছে। গলুইয়ে বসে তসবি জঁপছে ইমাম হুজুর। সুখালির লগির ঝাপ্টায় জলের শরীরে ছলাৎছলাৎ কলকল শব্দ জাগে কিশোরির থামতে না জানা হাসির মত। নৌকার দুলুনি, গলুইয়ে লাফিয়ে পড়া পুঁটিপাব্দা ছোটমাছের কাতরানি শোনে সাধুবুড়ি। জান্নাতের ঝাঁপি খুলে দিয়েছে মহামহিম। উপচে পড়া চাঁদের আলোর জোয়ার ধূয়েমুছে সাফসুতরা করে দিচ্ছে সারেজাঁহা। হেমন্তবাতাসের ঝিরিঝিরি ছোঁয়ায় রোগ-শোক-কষ্ট-ব্যথার পাথর গ’লে পড়ছে মোমের মতন। বসুধাবিবিকে এতটা সুন্দরি সাজে কে সাজিয়ে দেয়!

‘হুজুর লগিটা ধরবেন?’

সুখালির অনুরোধে ইমাম হুজুর লগি ধরে। চাতালে সিকি আঙ্গুল পানি জমেছে। চাঁদোয়ারাতে খালের জলে ভাসতে থাকা চিংড়ি টেংরা পুঁটি লগির গায়ে বাড়ি খায়। লাফিয়ে পড়ে চাতালে জমা হয়। সুখালি সেগুলোকে জলে ফিরিয়ে দিতে থাকে।

‘বাঁশি বাজাবো। জীবনের শেষ বাজানি। কাল হ’তে হাতে আর বাঁশি থাকবেনা......’।

কোমরের খুঁট হতে বাঁশি ছাড়িয়ে ঠোঁটে ছোঁয়ায় সুখালি। বাঁশির অলিন্দ বেয়ে ভেসে আসা বুকচেরা কান্নার সুরে কেঁপেকেঁপে উঠে চারপাশ। মাছদের লাফালাফি বন্ধ হয়। থমকে যায় জলের গতরে ইমাম হুজুরের লগির আঁচড়। দুরের গেহস্থ ঘরবাটিতে বাতপুন্নি-ভয়ের কুপির আগুন বাড়েকমে। ঘুমের রাজ্য ছেড়ে উঠে আসে রূপা সালেহা আবুমিয়া। খালের মাঝখানে থেমে পড়া নৌকা বাতাসে এদিক-ওদিক দোল খায়। ফাতনার মত।

সাধুবুড়ি ঠোঁটে আঙ্গুলের ইঙ্গিতে সবাইকে থামিয়ে দেয়। ঘোর নিরবতার আঁধারে ঝুপ মেরে ডুব দিয়ে থাকে নৌকাসহ যাত্রীরা অনেকক্ষণ। দূরে আলোবাতি ছাড়া ছায়াছায়া একটি নৌকা দেখা যায়। ছায়ানৌকাটি ক্রমেই বড় হতে হতে এক সময় সুখালির নৌকার গায়েগায়ে লেগে থামে। নৌকায় দশ বারোজন তরুণ যুবক। দু’জন দুই নৌকার ছই গায়েগায়ে ধরে রেখেছে। চারদিক সুনসান। নিঃশব্দ দুই নৌকার সবগুলো মানুষ। সাধুবুড়ি ফিসফিস করে অন্য নৌকার যুবক মাঝিটিকে আশ্বাস শোনাল—ভয় নাই। কেউ কিছু জানবেনা, এরা কেউ কোনোদিনও কাউকে জানাবেনা। আগামি দু’চার দিনেই গ্রামের বাকি মেয়েদের মা’দের বুড়াবুড়ি বাচ্চাকাচ্চাদের নিরাপদ যায়গায় সরিয়ে নেয়া যাবে। অন্য নৌকা হতে একজন এই নৌকায় উঠে এল। পাটাতনের কাঠ সরিয়ে মাছধরা জালের আড়াল হতে প্লাস্টিকে মোড়ানো দু’তিনটি পোঁটলা তুলে নিয়ে গেল নিজেদের নৌকায়। রাইফেল বন্দুক গুলি গ্রেনেড।

অন্য নৌকার যাত্রীরা কারো জন্য অপেক্ষা করছে কি?

সুখালি ফিসফিস করে প্রশ্ন করে—সাধুদিদা, কবি ছিলা?

- না

- চানপুন্নির গপ্পো?

- তোর দাদুর। গেরামিরা ভয় খায়। তোর দাদু আমারে নিয়া পলাইয়া আসে এই গেরামে।

- আরেকটা পলানি কিন্তু ধরতে পার নাই!

- কার পলানি?

সুখালি হাসে। উত্তরের গরজ করেনা। আবারো প্রশ্ন করে—

- সাধুদিদা, পুঁথি লিখ?

- মনেমনে। চোখেচোখে লিখি।

- কার জন্য লিখ?

সাধুদিদার দীর্ঘশ্বাসবাতাসের শীষ দূরে মেলাতে থাকে। যার জন্য লিখে তার কাছেই ঝরা পালকের মত উড়েউড়ে যায় তার নিঃশ্বাসকাহিনী।

রূপার হাতে বাঁশি গুঁজে দেয় সুখালি। চোখ রাখে রূপার চোখে। রূপার প্লাবনের চোখ দেখতে পায়না অন্য দু’টি চোখের আগুন। মুহুর্তক্ষণ মাত্র। সুখালি নেমে পড়ে পাশের নৌকায়। বাতপুন্নির আলোর জোয়ারের মাঝে ছায়া হয়ে দূরে মিলিয়ে যায় নৌকাটি।

রূপা জানে আর কিছুক্ষণ পরই অ্যাম্বুশ হবে গঞ্জে। খান সেনাদের ক্যাম্পে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন