রবিবার, ২৭ মার্চ, ২০১৬

মাহবুব লীলেন'এর গল্প | কুত্তায়ন

ঘরে মেকুর- বাইরে কুকুর’ নীতির কারণে আমাদের বাড়িগুলোতে কুকুর পোষা বড়োই কঠিন। এই আইনের দ্বারা বিড়াল নিশ্চিন্তে ঘরে প্রবেশাধিকার পেলেও কুকুরে সীমারেখা দরজার চৌকাঠ পর্যন্ত নির্ধারিত ছিল। কুকুরের জন্য এটুকু শেখা বেশি কঠিন ছিল না। ঘরে ঢোকামাত্র কঞ্চি-চালান আর বাইরে যাওয়া মাত্র একটা দুইটা বিস্কুট কি রুটির টুকরা দিয়ে কয়েকদিন প্রশিক্ষণ দিলেই কুকুর তা শিখে নিতো। কিন্তু শিয়াল আর টলায় ভর্তি আমাদের গ্রামে ঘরের বাইরে কুকুরের বাচ্চাকে বড়ো করে তোলা সত্যি এক কঠিন কাজ। কুকুরের বাচ্চা শিয়াল কিংবা টলার এক প্রিয় খাদ্য। টলা মানে বাঘডাস। এদের আবার দুইটা জাত। মেকুরটলা আর বাকুটলা। মেকুর-টলা বিড়ালের মতো সাইজ তাই কুকুরের বাচ্চার দিকে তারা নজর দিতো না। কিন্তু বাকুটলা; যার আরেক নাম কুকুর-টলা; আকারে শিয়ালের সমান। কুতুনির বাচ্চা বিয়ানোর কালে কয়েকমাস এদের খাদ্যের বড়ো একটা জোগান দিতো কুকুরের ছানা। কারণ গেরস্তরা হাঁসমুরগি ছাগল-ভেড়ার মতো মতো কুকুরকে যেমন ঘরে রাখত না তেমনি একটা দুইটা কুকুরছানা শেয়াল কিংবা টলায় খেলে দলবেঁধে টলা-শিয়ালের আস্তানায়ও আক্রমণ চালাতো না। কুকুরের ছানাগুলোকে বড়ো করে তোলার দায়িত্ব কুতুনি একাই পালন করত। কিন্তু সেটাও খুব একটা সহজ ছিল না। শিয়াল কিংবা টলা দল বেঁধে এসে প্রথমে একটা কুতুনির সামনে গিয়ে ভুলকি-ভালকি দিতো। কুতুনি তাকে দৌড়ে নিয়ে গেলে অন্যদিকে লুকিয়ে থাকা আরেকটা এসে সাঁই করে বাচ্চা মুখে তুলে দিতো দৌড়... তাও মায়ের সাথে থাকলে কুকুরের বাচ্চাগুলো অনেক বেশি নিরাপদ থাকত। কিন্তু কুকুর-মেকুর পুষতে হয় দুধ ছাড়ার আগে থেকেই। না হলে এরা ঠিক কথা শুনতে চায় না। তাই চোখ ফুটে গুতুগুতু করে হাঁটতে শেখার সাথে সাথেই কুকুরের বাচ্চা নিয়ে আসতে হতো। দিনের বেলা এদের দেখে রাখা কোনো সমস্যা না; কিন্তু ভয়ানক কঠিন রাতের বেলা এদেরকে টিকিয়ে রাখা। রাতে এদেরকে রাখতে হতো মাটিতে গর্ত খুঁড়ে খড়কুটো বিছিয়ে। গর্তের মুখে শ্বাস চলাচলের ফাঁক রেখে খুঁটি দিয়ে শক্ত তক্তা বসিয়ে দিতো হতো। এই ব্যবস্থা সহজে মেনে নিতে পারত না সদ্য মা-ছাড়া নবাগত কুকুরের বাচ্চাগুলো। সারারাত কুঁৎকুঁৎকুঁৎ কিঁয়াও কিঁয়াও শব্দ করে নখ দিয়ে মাটি আঁচড়ে চেষ্টা করত গর্ত থেকে বের হয়ে আসার। মাঝে মাঝে দুয়েকটা বেরও হয়ে যেত। আর বের হতে না পারলেও তাদের এই ডাকে চলে আসতো টলা কিংবা শিয়ালের দল। এই বয়সের বাচ্চারা শিয়াল-টলা চিনে না। শিয়াল-টলা গর্তের সামনে এলে সদ্য মা-ছাড়া বাচ্চা মনে করে তার মা বুঝি এসেছে; তখন কান্নাকাটি বন্ধ করে আগ্রহে সে আরো মুখ কিংবা হাত বাড়িয়ে দেয় বের হবার জন্য। তখন শিয়ালের জন্য মাটি খুঁড়ে তক্তার দরজা গলিয়ে তাকে নিয়ে যাওয়া মুহূর্তের বিষয় মাত্র....

শুধু শিয়াল- টলার হাত থেকে বাঁচাতে পারলে ছয় মাসের এই প্রথম পর্ব বরং কম ঝামেলার; ভোরবেলা ইস্কুলে যাবার আগে গর্তের পেশাব পায়খানা পরিষ্কার করা আর সপ্তায় একদিন তাকে গোসল করানো ছাড়া এ পর্বে বেশি ঝামেলা নেই। কিন্তু গায়ে গতরে বড়ো হয়ে কুক কুক ছেড়ে বাউক বাউক করে ডাকতে শেখার পর দ্বিতীয় পর্বটা বরং বেশি ঝামেলার। এ পর্বে তাকে রাতে ছেড়ে দিয়ে দিনে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখতে হয়। এই অভ্যাসটা করাতেও বেশ সময় লাগে। প্রথম প্রথম সারাদিন অস্থির হয়ে শেকল কামড়াতে থাকে। কুকুরকে দিনে বেঁধে রাখলে রাতে আর ঘুমায় না। সারারাত জেগে থেকে দৌড়ায়। একই কারণে রাতে কুকুরকে খাবার দেয়া নিষেধ; খাবার খেলেই সে ঘুমাবে। এই পর্যায়ে তাকে বাড়ির বাইরে গিয়ে হাগু করার প্রশিক্ষণ দিতে হয়; এটাও বেশ কঠিন প্রক্রিয়া। আর আমার বাড়ির অবস্থানের কারণে বেশ বিপজ্জনকও। বাড়িটা একেবারে সিলেট তামাবিল মহাসড়কের উপর যেখান দিয়ে রাতের বেলা শত শত ট্রাক সাঁই সাঁই করে ছোটে। ফলে রাতের বেলা বাড়ি ছেড়ে রাস্তার ওপারে হাগু করতে গিয়ে বেশিরভাগ কুকুরই জীবনের দ্বিতীয় পর্বে মারা পড়ে ট্রাকের তলায়। এক্ষেত্রে কুত্তা বিলাই শিয়াল কিংবা টলায় কোনো পার্থক্য নেই। রাতের গাড়ির আলো চোখে পড়লে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে প্রাণীগুলো রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে। অথবা রাস্তার একপাশে কতক্ষণ ঝিম মেরে থেকে গাড়ি কাছে আসলে তীব্র আলোয় ভয় পেয়ে রাস্তার উপর দিয়ে দৌড়াতে গিয়ে গাড়ির তলাতেই পড়ে। একই পদ্ধতিতে মেছোবাঘ চিতাবাঘ এমনকি বড়োবাঘের মৃত্যুর সংবাদও শুনেছি আমি...


যদি কোনো কুকুর লড়াইতে হেরে গিয়ে পিঠ মাটিতে ছুঁইয়ে ভয়ে পেশাব করে দেয় তবে তার ভবিষ্যৎ ছারখার। তাই এই পর্যায়ে কুকুরকে কামড়া- কামড়ির চেয়ে বেশি বেশি ঘেউ ঘেউ শেখাতে হয়। শেখাতে হয় শরীরের সাইজ বুঝে অন্য কুকুরের সাথে মারামারি কিংবা পিছিয়ে আসার কৌশল। তাছাড়া ইশারা দিলে কামড়ানো- গুলতি দিয়ে শিকার করা পাখির গলায় না ধরে ডানার পালক কামড়ে ধরে আনা; বাড়ির খ্যাপাটে লোকজন পিটুনি দিলে কামড় না দিয়ে দূরে সরে যাওয়া; বাচ্চাদের হাত থেকে খাবার না নেয়া; দরজার সামনে না ঘুমানো; খাবার দেবার পর মাকে স্পর্শ না করে দূর থেকে কৃতজ্ঞতা জানানোর কৌশল; বাড়ির হাঁস মুরগি কবুতর কিংবা অন্য পোষা পাখি না ধরা আর দ্রুত অতিথিদের চিনে নেয়া... সারাদিন কুকুরের পেছনে লেগে না থাকলে এসব শেখানো বড়োই কঠিন


একটা কুকুরের তখন গর্তবাসী বয়স। কী যেন কী কারণে পুরো শরীরটা তার দগদগে ক্ষতে আর পোকায় ভরে গেলো। বাচ্চাটা সারাদিন কুঁইকুঁই করে। আশপাশের পশু ডাক্তাররা কুকুরের চিকিৎসা করেন না। একজনের কাছে গিয়ে কাকুতি মিনতি করায় ধমক দিয়ে পড়াশোনায় মন দিতে বলে উপদেশ দিলেন কুকুরটাকে জঙ্গলে ফেলে আসতে। নিজের বুদ্ধিতে আমি ওষুধের দোকান থেকে মানুষের চর্মরোগে লাগানোর একটা মলম কিনে লোমের ফাঁকে ফাঁকে লাগিয়ে দিলাম। কুকুরটা ওরকমই কাটালো সপ্তাদিন। একদিন ভোরে গর্ত থেকে তাকে বের করতে গিয়ে দেখি মরে ঠান্ডা হয়ে আছে। আমি মরা কুকুরের লাশটা নিয়ে বসে থাকলাম। হঠাৎ করে দেখি আমার মাথায় কারো হাত। আমার পিতামহী; মরণাপন্ন অসুখে হাসপাতালে আমার বাবার শরীর কাটাছেঁড়া হবে বলে তিনি এসেছেন। অপারেশনে কী যেন কী জটিলতায় তিনদিন ধরে তার জ্ঞান আসে আর যায়; এর মধ্যে কেউ কেউ আশা ছেড়ে দিয়ে আমাদের আত্মবিশ্বাসী হবার পরামর্শও দিয়েছেন...

ভোরের নামাজ পড়ে দাদি আমার মাথায় হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছেন- তোর বাপ বেঁচে যাবে। অতগুলা মুখের দিকে তাকিয়ে তোর বাপের বদলে আল্লা কুকুরটা নিয়ে গেলেন....


কুকুরটার দিকে তাকালাম আমি- হয়তো তাই। হয়তো কুকুরটা মরে প্রায়-মৃত আমার বাবার শরীরে প্রাণ সঞ্চার করবে। ভাত আর ভর্তার জন্য বাবার জীবিত থাকাটা আমাদের বড়ো বেশি প্রয়োজন....


দাদির আল্লাকে তখন আমিও ঈশ্বর ভাবতাম। আমি তাকে ধন্যবাদ জানালাম মৃত কুকুরের বাচ্চাটার প্রতি কৃতজ্ঞ হয়ে। বাবা সেরে উঠলেন। আমরাও খেয়েপরে বড়ো হতে থাকলাম। আরেকটা কুকুরের বাচ্চা এনে সবকিছু শিখিয়ে আমি বড়ো করে তুললাম। কুকুরটার সাড়ে তিন বছর বয়সে এক মাঝরাতে ট্রাকের অস্বাভাবিক শব্দের সাথে কুকুরটার চিৎকারে ঘুম ভেঙে দৌড়ে রাস্তায় গিয়ে অন্ধকারেও বুঝতে পারলাম কুকুরটার মাজা থেকে পেছনের দুটো পা থেঁতলে রাস্তার সাথে মিশে আছে। আমাকে দেখে কুকুরটা শরীর টেনে এগোতে চাইল। নাড়িভুঁড়ি লেপ্টে আছে রাস্তার পিচের সাথে। ...রাস্তার মাঝখানে পড়া আহত পূর্ণ বয়স্ক কুকুর। ক্ষতস্থানে ধরলে ব্যথায় কামড়ে দিতে পারে আবার সরিয়ে না নিলে যে কোনো ট্রাক এসে পিষে দেবে। আমি তার কাছে আগাই। সে মুখ বাড়িয়ে আমাকে নিশ্চিত করে। আমি তার বুকের তলে ধরে তোলার চেষ্টা করি। কিন্তু ওজনে আমার থেকে বেশি সে; আমি তাকে শূন্যে তুলতে পারি না। আমি এবার পেছন দিকে গিয়ে মাজায় ধরে তার থেঁতলানো পা দুটো তুলি; সে তার সামনের পা দুটো দ্রুত চালায়; আমি শূন্যে তুলে রাখি পেছনের দুটো পা। ...আমরা বাড়ি ফিরে আসি। গলগল করে রক্ত ঝরছে। শরীরের পেছন দিকে বের হওয়া নাড়িভুঁড়ির সাথে পা দুটোও থেঁতলে ঝুলে আছে চামড়ার সাথে....

কুকুরটাকে আমি নামিয়ে রাখি। আমার দিকে মুখ তুলে একটা আর্তনাদ করে কুকুরটা। আমি কুকুরের চিকিৎসা জানি না। কোথায় কুকুরের চিকিৎসা হয় তাও জানি না। আমি তার মুখের সামনে এনে পানি রাখি... সে পানি খায় না। সে মুখ বাড়িয়ে আমাকে কিছু বলতে চায়। সে নড়তে পারে না...

আমি বসে থাকি। ভোর হয়। কুকুরটা শুধুই আমার দিকে তাকায়। আমি তার মৃত্যুর অপেক্ষা করি। সে মরে না; রক্তের মধ্যে গড়াগড়ি যেতে যেতে আমাকে কী যেন বলতে চায়। আমি উঠে যাই। মোটা একটা নাইলনের দড়ি নিয়ে ফিরে এসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেই.... কুকুরটা আরাম পায়। দড়িতে ফাঁস লাগিয়ে তার গলায় পরাই। কুকুরটা তাকিয়ে থাকে। ফাঁসের একপাশ একটা গাছের গোড়ায় বেঁধে অন্যপাশ নিজের হাতে পেঁচিয়ে আমি টান দেই। শুয়ে থাকা কুকুরটা খ্যাত খ্যাত করে শ্বাস ফেলার চেষ্টা করে... আমি আরেকটা গাছের সাথে পা ঠেকিয়ে শরীর পেছনে বাঁকিয়ে জোরে টান দেই। ... কিন্তু মরে না... মরে না... আমি আরো শক্ত করি দড়ি... কিন্তু মরে না... কুকুর মরে না... অনেকক্ষণ আমি দড়ি ধরে থাকি কিন্তু কুকুর মরে না...

আমি ছেড়ে দেই... সে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকায়। আমি আবার তার কপালে হাত বুলিয়ে আশ্বাস দেই। সে আবার আশ্বস্ত হয়ে কুই কুই করে। আমি উঠে ঘর থেকে একটা শাবল নিয়ে ফিরে আসি। দড়িটা আবার গলায় পরিয়ে এবার তাকে দুটো গাছের মাঝখানে ঝুলাই। কুকুরটা খ্যাৎ খ্যাৎ করে শ্বাস ফেলার চেষ্টা করে। আমি তার পেছন দিকে শাবল নিয়ে দাঁড়াই... হু...হুপ

সমস্ত শক্তি দিয়ে শাবলটা নামিয়ে আনি তার মাথার খুলিতে। কিন্তু শুধু একটা ধুপ শব্দ করে শাবলটা স্প্রিংয়ের মতো ফিরে আসে। আমি আরেকটা আঘাত করি। একই অবস্থা... আমি পেছনে সরে যাই অনেক। মাথার উপর শাবল তুলে দৌড়ে এসে একটা বাড়ি বসাই- ঠাস...

কুকুরটার খুলি ফেটে অল্প কিছু কালচে রক্ত বের হয়। কুকুরটা স্থির হয়ে যায়। পেছনে তাকিয়ে দেখি ভোরের নামাজ শেষে হা করে তাকিয়ে আছেন আমার পিতামহী ... কী করলি এটা তুই?....

রক্তমাখা শাবল নিয়ে আমি দাঁড়িয়ে থাকি। তিনি বড়ো বড়ো চোখ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন- কুকুরটার অভিশাপ লাগবে তোর উপর...

আমি কিছু না বলে ছালা এনে কুকুরটার লাশ ঢোকাই। কোদাল দিয়ে রক্ত পরিষ্কার করি। তিনি দাঁড়িয়ে থাকেন- কুকুরটার অভিশাপ লাগলে যে তোর উপর কুকুরের আত্মা ভর করবে...

দুই যুগ ধরে আশীর্বাদ- অভিশাপ- কুকুর এবং ঈশ্বর সকল কিছুর সাথেই সম্পর্ক ছিন্ন আমার। কয়দিন আগে এক শৈশববন্ধু হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞেস করে- তোর নিজের কণ্ঠ তুই শুনেছিস ইদানীং?

আমি বলি কেন?

- শুনে দেখ’। বলে সে তার মোবাইল বের করে আড্ডায় আমার কথাবার্তা রেকর্ড করে আমাকে শোনায়। আমি হা করে দেখি সেখানে একটাও শব্দ নেই। আমার গলা থেকে অনর্গল বের হচ্ছে শুধু ঘেউ ঘেউ ধ্বনি...



লেখক পরিচিতি
মাহবুব লীলেন
গল্পকার। নাট্যকার। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন