রবিবার, ২৭ মার্চ, ২০১৬

রুমা মোদক'এর গল্প | ছয় ফোড়ন

আপন মায়ে ভাত পায়না সৎ মায়ে পাত বাড়ায়
মলিন সাদা শাড়ি পরা প্রণতিকে নিয়ে ঘরে ঢোকা মাত্রই তিনতলা বাড়িটিতে যেন গরম তেলে পানির ছিটা পড়ে। শালীন সমীহের ধার না ধেরে ক্ষেপে খেঁকিয়ে উঠে ছেলেরা

- আইন্যা যে উডাইছইন, টেহা-টুহা কইলাম দিতে পারতাম না। ঘরে প্রবেশের আগেই এই বিরূপ অভ্যর্থনায় হকচকিয়ে যায় প্রণতি। নগেন্দ্রনাথ নির্বিকার ঘরে ঢুকে বোনকে নিয়ে সিঁড়ি ভেঙ্গে দোতালায় উঠে পড়ে। জানা ছিল সংসারে তার প্রয়োজন ফুরিয়েছে আগেই, ছেলেরা যেদিন পেনশানের সব টাকাগুলো হাতিয়ে নিয়েছে সেদিনই। যে মুহুর্তে এই সংসারে স্ত্রী মাধবী পরিচারিকার ভূমিকায়, সেই মূহুর্তে বোন প্রণতিকে যে তারা উটকো ঝামেলা ভাববে এতে আর অবাক হবার কী আছে?
তবু মোবাইল ফোনের কল্যাণে শেষ বয়সে বোনটা যখন আকুল স্বরে সাহায্য চাইল, তখন নিজের অবস্থার কথাটা মুখ ফুটে বলতে পারল না নগেন্দ্রনাথ। বোনকে আসতে বলল, ছেলেদের কাছে আবদারও জানাল। পরিণামটাতো জানাই ছিল। প্রণতিকে নিয়ে নির্বিকার উপরে উঠে যাবার সময় নীচে বেধে যাওয়া অনিবার্য হল্লা দু’পুত্রে পুত্রবধূতে, শাশুড়ির ফোড়নে-আপন মায় ভাত পায়না, সৎ মায়ে পাত বাড়ায়, মোটেই অবাক আহত করেনা তাকে, তবু পুত্রদের কথায়, পাল্টা কথায়, বউদের বাক্যবাণে শাশুড়ির ফোড়নে নগেন্দ্রনাথের অতীত-বর্তমান-এবং হয়তোবা ভবিষ্যৎটাও কিছুটা স্মৃতির মোড়ক খুলে খুলে উন্মোচিত হয়ে যেতে থাকে। টের পায় নগেন্দ্রনাথ।

-

এই দিন দিন না আরো দিন আছে
মায়ের মতো দেখি বুড়িরও কথায় কথায় ফোড়ন কাটার বাতিক, বয়স হলে জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতাগুলি বোধহয় ফোড়ন হয়ে আত্মপ্রকাশ করে ক্লান্ত সময়ের প্রতি পদক্ষেপে। ৭১ এর মে মাসের এক অগভীর রাতে নগেন্দ্রনাথ যখন পৌঁছেছিল তাঁর গ্রাম থেকে মাইল পঁচিশেক দূরে চারদিক হাওড় বেষ্টিত প্রত্যন্ত গ্রামটিতে, যেখানে তার সহোদরা প্রণতিকে বিয়ে দিয়েছিল কয়েক বছর আগে এমনি এক মে মাসে, ধনে জনে সম্পন্ন পরিবাওে, তখন চারদিক সুনসান। দূরে কোথাও কানাকূয়োর ডাক কিংবা শেয়ালের হল্লা শোনা যায় কি যায় না, যতসামান্য অস্থাবর সম্পত্তি নিয়ে পালিয়ে আসার ত্রস্ততায় গলা বুক শুকিয়ে যাওয়া খা খা আতংকে ঠিকঠাক ঠাওড় করতে পাওে নি সে। হাওড়গুলি একের পর এক পাড়ি দিলেই যে গঞ্জ সেই গঞ্জের ধ্বংস আর আগুনের আঁচ তখনো সেই প্রত্যন্ত গ্রামে পৌঁছায়নি বলেই বোধহয় দরজা খুলে প্রণতি আর প্রণতির শাশুড়ি ভড়কে গিয়েছিল এতোগুলো মানুষকে একসাথে দেখে। পরে বৃত্তান্ত শুনে কাঁচা ঘুম ভেঙে জেগে উঠা প্রণতি পড়শির বাড়ি থেকে ধার করে ডিম এনে রান্না করে খাইয়েছে। আর সেই প্রথম রাতেই গরম ভাতের বগবগ গন্ধ শুনে পাশের ঘর থেকে ফোড়ন কেটেছিল প্রণতির শাশুড়ি- এই দিন দিন না লো বউ আরো দিন আছে.......। ফোড়নের ইংগিত শুধু নগেন্দ্রনাথ কেন তার স্ত্রী পঙ্গু মা সহ সবাই আন্দাজ করতে পেরেও চুপচাপ থেকেছে। উপায় কী? প্রণতি নিজেও বুঝেও না বুঝার ভান করে যতোটা সম্ভব আন্তরিক আপ্যায়ন করেছে প্রথমবার শ্বশুর ঘরে আসা বাপের ঘরের মানুষগুলিকে। কিন্তু সেই রাতেই প্রণতিরে কী বলেছে তার শাশুড়ি জামাই ননদেরা কে জানে, পরদিন পূর্বকাশে উদিত হওয়া সূর্য মধ্যাকাশে প্রস্থানের আগেই প্রণতি নগেন্দ্রনাথের কাছে নির্বিকার জানিয়েছে- বড়দা তোমরার এত্তোগুলা মাইনষেরে আমি এখান কেমনে রাখুম, অইন্য জায়গা দেহ। এত্তোগুলা মানুষ নিয়া এমন দিনে কই যায় দিশ পায় না নগেন্দ্রনাথ। যাই-যাই করে ততদিনে সীমান্ত পার হবার রাস্তাগুলোও বন্ধ হয়ে গেছে। রাতটা অবস্থানের জন্য বোন-জামাইএর হাতে পায়ে ধরে অনুমতি আদায় করে সে রাতেই পুরো পরিবারের মানুষগুলিকে এক অনিশ্চিত বিপদের মুখে ফেলে পালিয়েছিল নগেন্দ্রনাথ। বন্ধু মনজুর লেগেছিল পিছনে বেশ কদিন-চল যুদ্ধে যাইগা, অনিমেষদা গেরামে গেরামে ঘুইরা পোলা খুঁজতাছে....



যে যাহা কররে বন্ধু আপনার লাগিয়া

এই পড়ন্ত বেলায় মায়ের যে ফোড়নগুলি বারবার মনে পড়ে সেগুলি তখন যে খুব মনযোগ দিয়ে শুনেছে তা নায় মোটেই। তবু কারণে অকারণে প্রসঙ্গক্রমে ফোড়নগুলি মনে পড়ে তাঁর। বাকী ভাইগুলোর শ্রমিক জীবন থেকে তার জীবন যে আলাদা হয়ে গেছে সে তো একটা সার্টিফিকেটের কারণে। মুক্তিযুদ্ধে সার্টিফিকেটটার জোরেই চাকরি মিলে গেছে আনসার বাহিনীতে। আর সে চাকরির সুবাদে মহকুমা শহরে আলাদা বাসা, ছেলেমেয়েগুলিকে নিয়ম করে স্কুলে পাঠানো, ভদ্রস্থ খাট আর কুশন মোড়ানো চেয়ার, গ্রামের কাদামাটি লেপা মাটির দেয়াল দেয়া ঘরখানা ছেড়ে মহকুমা শহরের হাফ ওয়ালের ঘরে উন্নীত হওয়ার সময় কেবল পঙ্গু মাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছে নগেন্দ্রনাথ। এবং এটাকে তার মোটেই স্বার্থপরতা মনে হয়নি। কেন না বাকী জীবন বাপের রেখে যাওয়া যৎসামান্য সম্পত্তির কোনো ভাগই সে নিতে যায় নি। এ নিয়ে উঠতে বসতে মাধবীর খোটাও কম খেতে হয় নি। কিন্তু সে কানে তুলে নি। সোজাসাপ্টা হিসাব ছিল তার ছেলে মেয়েগুলো কম বেশি লেখাপড়া করে এই সার্টিফিকেট খানার কারণেই কোনো না কোনো চাকরি জুটিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু সব হিসাবে গোলমালে হয়ে গেছে। কেমন করে যেন ছেলেগুলো বিগড়ে গেছে। আধাখেঁচড়া পড়াশোনা করে কেমন ধান্ধাবাজির নেশায় পড়ে গেছে। বড়টা সার্টিফিকেট নিয়ে ঘুরে বেড়ায় কন্ট্রাকটারের লাইসেন্সে কাজ বাগানোর ধান্ধায় আর ছোটটা সকাল বিকাল এমপির বাড়ি ধর্না দেয় ভোটে কাউন্সিলর পদে নমিনেশনের জন্য। বাপের প্রত্যাশার পথই মাড়ায় নি তারা। অবশ্য মাধবী তাতে বেশ সন্তুষ্ট-হারা জীবন চাকরি কইরা তো ঘরের চালের একখান টিনও বদলাইতে পার নাই পোলার বরাতে তো দোতলা ঘর উডছে। প্রতিমা-প্রতিমার মতো মেয়েটি সুইপার কলোনির শ্রী গবিনের ছেলেটার সঙ্গে ভাগলো সেদিনও বেশ সন্তুষ্ট চেহারা নিয়েই ঘুরে ফিরছিল মাধবী- টেহা অইল টেহা, মদ বেইচ্যা অইছে না দুধ বেইচ্যা, অহনের দিনঅ মাইনষে খুঁজে না। বাংলা চোলাই মদ বিক্রি করে টাকাপয়সার বাড়ন্ত শ্রী গবিনের তখন সুইপার কলোনীতে একমাত্র তিনতলা দালানটি তোলার কাজ শেষ হয়েছে। তিনতলা সেই দালানটির দিকে মাঝে মাঝেই চোখ যায় নগেন্দ্রনাথের-টেহা অইল টেহা.....মাধবীর কথাগুলিও কানে বাজে। টাকার জন্য মাঝে মাঝেই মহকুমা শহরের বাউন্ডারি দেয়া হাফ দেয়ালের বাড়িটাতে হানা দিত তিন তিনজন দোকান কর্মচারি আর ট্রেইলারি করা একজন মোট চারজন ভাইএর কেউ না কেউ। মূলত ভাইদের অর্থনৈতিক অবস্থার কারণেই পঙ্গু মাকে নিজের বাড়িতে তুলেছিল সে, মাধবীর মাথাখুড়া আপত্তি সত্ত্বেও। ছেলের চিকিৎসা বউ এর অপারেশান নানা বাহানায় তারা যখনই আসতো খিটখিটিয়ে উঠতো মাধবী। পঙ্গু মাকে নিজের কাছে এনে রাখার খোঁটাটাও আসতো আবশ্যিক প্রসঙ্গ হয়ে- হাউরি কি আমার এক্লা? বেডি কী হের বাপেরে এক্লা পেডে ধরছে? বেডির তলে মাসে হাজার টাকা খরচ। আমার পোলা মাইয়ার ভবিষ্যৎ নাই? বৃদ্ধা অক্ষম শাশুড়ির প্রতি এই অবহেলার আঘাতে মোড়ানো তাচ্ছিল্যের বানগুলো তার ছেলেমেয়েরা যে হা করে গিলছে, সেদিকে দৃষ্টি দেবার মতো শিক্ষা বা শালীনতা কোনটাই ছিল না মাধবীর। অপমানের চূড়ান্ত করে ভাইগুলোকে যখন বিদায় দিত মাধবী, তখন নিশ্চুপ ভাত খেতে খেতে ঢেকুর তুলে অসহায় বসে থাকতো নগেন্দ্রনাথ। পঙ্গু অসুস্থ মা মিনমিনে গলায় ফোড়ন কাটতো

- যে যাহা কররে বন্ধু আপনার লাগিয়া



ঠেলাঠেলির ঘর খোদায় রক্ষা কর
কোন হরমে আবার টেহা চাইতে আইছে- দোতলা বাড়িটার নীচতলায় যতোই পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে দু ছেলের হল্লা-হৈচৈ, মাধবীর চাপা গলাটা ততই স্পষ্ট হতে থাকে- চুফ কর, চুফ কর হোনবো হোনবো। পুত্রবধু দুজনের গলা আরো দ্বিগুন চড়া- কিতার লাইগ্যা ডরাইয়া কওন লাগবো? হোনলে হোনছে। আমরা হুনি নাই কী করছিল আপ্নাগোর লগে। মাধবীর চাপা গলাটা এবার দীর্ঘশ্বাস আর প্রতিশোধস্পৃহায় ঝলসে উঠার মূহুর্তটা চোখে না দেখলেও ঠিক আন্দাজ করতে পারে নগেন্দ্রনাথ। সেই রাতে পালিয়ে যাবার পর না খাইয়ে প্রায় ঘাড়ে ধরে রাস্তায় বের করে দিয়েছিল পুরো পরিবারটাকে প্রণতির জামাই-শশুর। পঙ্গু মা তরুণী ভ্রাতৃবধুকে নিয়ে নাবালক ভাইগুলি কী করে শেষ পর্যন্ত আগরতলা শরনার্থী শিবিরে পৌঁছেছিল সে এক বিরাট রহস্য। সে ইতিহাস এ পরিবারের প্রতিটি সদস্যের এতোই শোনা আর সেই কাসুন্দি ঘাঁটা মাধবীর এতই প্রিয় যে, ঢাকনা খুলতে মূহুর্ত মাত্র সময় লাগে না। সুযোগ পেলেই মাধবী সে কাসুন্দির ঢাকনা খুলে গন্ধ ছড়াতে থাকে- হ বউমা হেই দিনগুলো কী ভুলন যায়? কোন হরমে অহন আবার হাত পাততে আইয়ে! কম করছি ক ও, হংসারটার লাইগ্যা কম করছি? বুড়া বেডির গু-মুত খাঁটছি বছরের পর বছর।

সারাদিন নোংরা বিছানায় শুয়ে থাকা বৃদ্ধা মায়ের বিছানাটা দিনশেষে অফিস থেকে ফিরে যখন নিজের হাতে পরিষ্কার করে দিত নগেন্দ্রনাথ। মায়ের মুখে ফুটে উঠা প্রশান্তির ভাষাটা পড়তে পারতো সে। মাধবী ভুলেও কাছ ঘেঁষতো না শাশুড়ির। খাবারের থালাটা কন্যা প্রতিমাকে দিয়ে পাঠিয়ে দিত ঘরে, খেলো কী খেলো না চুপি দিয়ে দেখতো না একবারও। ঘরের দরজাটা পর্যন্ত খুলতটা দিন একবারও গন্ধ ছড়াবে বলে।

সেই মাধবী সারাদিন দু ছেলের নাতিপুতির গু-মুত পরিষ্কার করে, তাদের স্কুলে আনা-নেয়া করে, বউমারা ঘুম থেকে জাগায় আগে সকলে সিদ্ধভাত রান্না করে, ঝাঁকা ভর্তি মাছ কেটে রেখেও বউদের মন না পেয়ে যখন নিজের শাশুড়ি সেবার গল্প শুনায় তখন মনে মনে হাসি পায় নগেন্দ্রনাথের। করুণাও হয়। নিজের সংসারে নিয়ে আসার আগে, গ্রামে গিয়ে মায়ের কাছে বসে যখন জানতে চাইতো- ক্যামন আছ গ মাই? মা উত্তর দিত- ঠেলাঠেলির ঘর খোদায় রক্ষা কর। মায়ের সেই ফোড়ন কাটার মর্মার্থটা এখন হাড়ে হাড়ে টের পায় সে।

নীচের হল্লা কিছুটা ঝিমিয়ে আসলে প্রণতি উঠে দাঁড়ায়, ভ্রাতুস্পুত্রদের বাড় বাড়ন্ত টাকা পয়সার গল্প শুনে এসেছিল সামান্য সাহায্যের আশায়। বড় ছেলেটা ব্যাংক লোন নিয়ে ব্যবসা ফেল মেরে ঋণ খেলাপীর মামলায় জেল খাটছে। ছোট-টা ঋণের জ্বালায় বসতভিটার অর্ধেকটা বিক্রি করে দিয়েছে। কিছু টাকা দিলে একটা মুদি দোকান দিয়ে বসতে পারে, আপাতত সংসারটা চলে। নগেন্দ্রনাথ পালিয়ে আসার মাস দুয়েক পরই পাকিস্তানিদেও হাতে গ্রামের শ খানেক লোকের সাথে মারা যায় প্রণতির জামাইও, আগুনে আর লুটপাটে নিঃস্ব শুধু প্রাণকয়টা নিয়ে সেই যে বিপর্যস্ত জীবনের যুদ্ধ শুরু, তা ফুরায়নি আজো। প্রণতির সম্পন্ন ঘরে ক্রমে ধস নামার গল্পটা দাদা নগেন্দ্রনাথ ছাড়া আর কেউ শোনে নি। এসব আজাইরা প্যাচাল কারো শোনার প্রয়োজনও নেই। তারা কেবল টাকা চাইবার ফন্দিটাই শুনেছে। সব দেখে শুনে বুঝে আহত বিমর্ষ উঠে দাড়ায় প্রণতি- থাউক গো দাদা। সেই দুর্দিনে ঘরে খাওন আছিল কিন্তু হউর-হাউড়ি জামাই সবাই ডরাইছিল, কী জানি কত্তোদিন তোমরারে খাওয়ানি লাগে। আমি ঘরের বউ, কত্ত কানছি হাউড়ির পায়ে পইরা, হুনলো না। তহন জোর করবার হাহস আছিল না। অহন যহন হাহস হইছে গো দাদা ঘরঅ তহন খাওন নাই, তোমারে কেমনে কই চলঅ আমার লগে! তবু একডাবার বড় জাইনবার মন চায় কোন পরানে পোয়াতি বৌ ল্যাংড়া মা আর পুরা পরিবারডারে থুইয়া সেই রাতে পলাইছিলা!



মরার উপরে ছয় মণও মাটি, নয় মণও মাটি
সংসার সমরাঙ্গনে পুত্র কন্যাদের কুরুক্ষেত্র সামলে খুব নিরালায় যে ভাবার অবকাশ পেয়েছেন কোনদিন তা নয়, তবু এটা প্রণতির কেন, তার নগেন্দ্রনাথের নিজেরই যে কতোদিন নিজের মনে নিজের জানবার ইচ্ছা হয়েছে! কেমনে গেলো সে সেই রাতে, কেনো গেলো!! উত্তাল অভ্যুত্থানের মিছিলে সামনে এমনকি পেছনের সারিতেও ছিলোনা সে কোনদিন। ছোটবেলার ডাংগুলি আর বড় বেলার তাস পেটানোর সাথী মনজুর মিছিলের সামনে থেকে শ্লোগান ধরলেও ছাপোষা নগেন্দ্রনাথ চিরকালই দূরের দর্শক বই কিছু ছিলো না। নগেন্দ্রনাথকে কোনোদিন ডাকেওনি মনজুর। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হলে গঞ্জে দলে দলে জোয়ান ছেলেদের পালিয়ে যুদ্ধে যাবার হিড়িক পড়লে মনজু বার কয়েক টানাটানি করেছিল তাকেও। কিন্তু কেবল এইটাই যে তার যুদ্ধে যাবার একমাত্র কারণ নয় এটা স্পষ্ট এবং অকপটভাবেই জানে নগেন্দ্রনাথ। তবে কেন গিয়েছিল সে! আজ অথই সমুদ্রে কূল না পাওয়া নাবিকের মতো দিশেহারা সহোদরার প্রশ্নটির মুখোমুখি চট কওে সেই রাতটা ঘাই মাওে তার স্মৃতির স্তূপে ... একটা ঘুটঘুটে রাত ... ঘোর অমাবস্যায় দূরে কোথাও একটানা টিমটিম জ্বলছে হারিকেনের মৃদু আলো, পরিবারের সবাই যখন পরদিনের অকল্পনীয় অনিশ্চয়তায়ও দিন ক্লান্ত ঘুমের কাছে পরাজিত, তখন নগেন্দ্রনাথের দুচোখে ঘুম নামে না-- কোথায় যাবে সে-- কি করবে সে এতগুলো মানুষকে নিয়ে ... পথ খুজে সে উদভ্রান্তের মতো ... যত উপায় আছে সব উপায়ে ... কিন্তু পথ পায়না। ঠিক তখন মনজুরকে মনে পড়ে তার, মনজুর এখনো গঞ্জের ঘরে ঘরে ঘুরছে জোয়ান পোলাপান জোগাড়ের চেষ্টায়। মুহুর্তে একটা উজ্জ্বল আলোর পথ দৃশ্যমান হয় তার সামনে। সেই মৃত্যুসম ভয়াবহ স্নায়ূর চাপ থেকে পালানোর মুহুর্তে মার ফোড়নটা মনে পড়ে তার-- মড়ার উপরে ছয় মণও মাটি, নয় মণও মাটি। যা হবার হবে তার পরিবারের। তারপর আর কিছু ভেবেছিল কি না, আজ সহোদরার উৎসুক চোখের সামনে কিছুতেই মনে করতে পারে না নগেন্দ্রনাথ। কেবল মনে পড়ে নিস্তব্ধ ঘুমন্ত বাড়িটার দাওয়া থেকে উঠে একবারও পিছনদিকে না তাকিয়ে হনহন হাটা দিয়েছিল গঞ্জের দিকে ... যতক্ষণ না পৌছে যায় নাগাল পাওয়া দূরত্ব থেকে অনেক দূরে ... ।



নিয়তে বরকত
ক্লান্ত দীর্ঘশ্বাসে ফোড়ন কাটে নগেন্দ্রনাথ-- বইনরে, নিয়তে বরকত। ভাইগুলো যখন খিদা পেটে ক্লান্ত শরীরে এ বাড়িতে আসত, ছেলেমেয়ের পাতে মাছে ভাতে ঠেসে দিলেও মাধবী কোনদিন তার ভাইদের একবেলা খেয়ে যাবার কথা বলতো না। মায়ের প্যানপ্যানানিতে বাধ্য হলেও পাতিলের তলা থেকে তলানিটুকু এনে দিত তাদের পাতে। সেই তলানিই বড় চোরের মত চেটেপুটে খেত ভাইগুলো। মা তখন ফোড়ন কাটতো-- নিয়তে বরকতরে পুত, নিয়তে বরকত।

নগেন্দ্রনাথের গলায় যেন গ্লানি জাপটে ধরে অক্টোপাসের মতো। আত্মজিজ্ঞাসার বোধটাকেও আজ এতদিন পর চাপা দেওয়ার ইচ্ছা হয়না আর। যথেষ্ট সামর্থ থাকা সত্ত্বেও ভাইদের-বোনদের জন্য কিছুই করতে পারেনি সে। অথচ অক্ষত দেহে যুদ্ধ থেকে ফিরে এলে আর মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে ভালো চাকরিটা পেয়ে গেলে মনে মনে ভীষণ শপথ ছিল তার-- যুদ্ধের সময় অবিচার করা পরিবারটিকে সর্বস্ব দিয়ে সহায়তা করবে। পারলো না। কিন্তু পারলো না যে স্ত্রী মাধবী আর সন্তানদের জন্য তাদেরই বা কি হাল আজ-- ফেলে আসা বছরগুলো আর বর্তমানের দিকে নির্মোহ অপলক চেয়ে কোনো সান্ত্বনাই পায়না সে!


চলে যাবার জন্য উঠে দাড়ায় প্রণতি-- গড় হয়ে প্রণাম করে নগেন্দ্রনাথকে। নগেন্দ্রনাথ তার মাথায় হাত রাখেন, আক্ষেপে নাকি হতাশায় বোঝা যায় না-- বইনরে, আমি জানি না সেই রাইতে আমার পলাইয়া যাইবার নিয়তটা কি আছিলো, ক্যান বরকতটা এমন হইলো।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন