রবিবার, ২৭ মার্চ, ২০১৬

আমি তুমি সে | অস্তিত্বে ‘আমিত্ব বোধ'

সতীর্থ আহসান


অবন্তী,
আমি তেমন চিন্তাশীল নই, তবুও কেন যে বিভিন্ন চিন্তা পেয়ে বসে আমাকে! যখন পেয়ে বসে, তখন তাকে আর এড়াতে পারি না। গত দু থেকে তিনদিন যাবৎ একটা ব্যাপার আমাকে বিস্মিত করে রেখেছে; সেটা হচ্ছে, সেই সুদূর শৈশবে যখন আমি আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াতাম আর খুব ধেয়ান ধরে খেয়াল করতাম আমার চোখ নাক ঠোঁট দাঁত– মানে সমগ্র মুখমণ্ডল, তখন মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য একটা অনুভূতি তীব্র মাত্রায় বয়ে যেত ঘাড় বেয়ে, এবং আমি তখন সচকিত হয়ে আপন মনেই বলে উঠতাম, ‘ও… তাই..তো!’
কিন্তু আজ পর্যন্ত সেই অনুভূতিটার ভাষারূপ দিতে পারি নাই। কাউকে ঠিকঠাক মত বোঝাতেও পারি নাই। শুধু বছর তিনেক আগে, সন্ধ্যাকালীন এক আড্ডায় টিএসসির মাঠে গৌতম ভাইকে কিছুটা বোঝাতে পেরেছিলাম। সেটা হচ্ছে, আয়নায় নিজেকে খেয়াল করতে গিয়ে মনে হত, ‘আমি কে?’
না না না… ঠিক এই প্রশ্নটা না… আমার মনে হত… এই দ্যাখো তোমাকেও ঠিক মত বোঝাতে পারছি না। শুধু এইটুকু বুঝতে পারছি, এই অনুভূতিটা কবিতা-পাঠ পরবর্তী অভিজ্ঞতার মত। কাউকে ঠিক বোঝানো যায় না, নিজেও যুক্তি দিয়ে বুঝে ওঠা যায় না। শুধু অনুভব করতে হয়। বুঝতে গেলেই কর্পূরের মত হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। আর অন্যকে বোঝাতে গেলে তো আরো! অবাক করার ব্যাপার হচ্ছে, এই অনুভূতিটা আমাকে এখনো তাড়িয়ে বেড়ায়। যেমন তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে গত তিন দিন যাবৎ। যাইহোক, এই বিষয়টা নিয়ে একটু পরে আসছি।

খুব ছোটবেলায় কিছু প্রশ্ন আমাকে তাড়িয়ে বেড়াত। সবকটাই জীবন সম্পর্কিত। মনে পড়ে, দাদির ঘরের চটির ভাঙা বেড়ার ফাঁক দিয়ে আমি উদাস চোখে বাইরের দিকে তাকিয়ে থেকে ভাবতাম। শুধু ভাবতাম। ভাবতাম, মৃত্যুর পর কী হবে? এই সমস্ত সৃষ্টিই বা করল কে? একদিন দাদি এর উত্তর দিলেন, বললেন, সব কিছু সৃষ্টি করেছে আল্লা। দাদি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন, তাই আল্লা বলতে চোখের সামনে ভেসে ওঠল শাদা পায়জামা-পাগড়ি পরিহিত দাঁড়িওয়ালা এক বয়স্ক লোককে। এইভাবে স্রষ্টার খোঁজ পেলাম। তারপর জানতে পারলাম, মানুষ মৃত্যুর পর হয় বেহেস্তে যায়, নয়তো দোজকে যায়। সে সময়টা ছিল কোন এক জ্যোৎস্না-রাত। উঠোনে ফুফুর কোলে আমি বসে আছি। তখনো জানি না পরকাল বলে কিছু আছে। আমি জানতে চাইলাম, মানুষ মরার পর কোথায় যায়?

আপা আমার সেই প্রশ্নের উত্তর দিল, ‘মানুষ মরার পর আল্লার কাছে চলে যায়, না ফুফু?’ হুম। ভাল কাজ করে গেলে দুধের ভেতর রাখে। আর খারাপ কাজ করলে আগুনের ভেতর। তখনো কথাটার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারি নি। গুরুত্ব উপলব্ধি করলাম বছর খানেক পর নানির বাড়িতে ঘরের দেয়ালে টাঙানো একটা ছবি দেখে। ছবিতে একপাশে নরকবাসী ভয়াবহ সব শাস্তি ভোগ করছে, আরেকপাশে স্বর্গবাসী কী চমৎকার সব সুখ উপভোগ করছে! এইসব দেখে-শুনে দুঃচিন্তায় খাওয়া-দাওয়া প্রায় বাদই দিলাম। তখন একটাই শুধু চিন্তা, আমি যদি দোজকে যাই?…

যেখানে যেতাম সেখানেই এই দুঃচিন্তা পিছুপিছু যেত, আমি এই পরিস্থিতি থেকে অবশেষে মুক্তি পাবার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠি। ফলে, তখন আশ্রয় নিলাম ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করে অদ্ভুত এক শান্তি পেতে থাকি। কিন্তু সেই শান্তিও কপালে সইল না। হঠাৎ করে কিছু প্রশ্ন পেয়ে বসল আমাকে। স্রষ্টা আর পরকাল সম্পর্কে আমার সন্দেহ জাগতে থাকে… এইসবের অনেক পরে, সেই সন্দেহ চূড়ান্ত রূপ পায় যখন আমি সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র। হুমায়ুন আজাদ তখন গোগ্রাসে গিলছি।

২.
গরুর গাড়ির উপর শুয়ে শুয়ে প্রায়ই রাতের আকাশ দেখা হত। চাঁদনী রাতের আকাশ আমার ভাল লাগে না। ভাল লাগে তারা ভরা আকাশ। এই তারা ভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে যখন ভাবতাম, এমন কতশত কোটি সৌরজগত ছেঁয়ে আছে মহাবিশ্বজুড়ে, তখন কী এক রহস্যময় অনুভূতিতে মন ছেঁয়ে যেত। অবাক-বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়তাম যখন ভাবতাম যে, এই মহাবিশ্বের কোন শেষ নেই!

এই পৃথিবীর সবকিছুই ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু মৃত্যুর পরের সময়টা অনন্ত। আমি যখন বেহেস্তে যাব, অনন্ত কাল ধরে সুখ উপভোগ করতে থাকব। কিন্তু, ভাবনায় পড়ে যাই ভেবে যে, অনন্ত কালটা তবে কতটুকু কাল? শেষ বলে তো একটা কিছু আছে; শেষ নেই, এটা কেমন কথা? যদি শেষ বলে কিছু থাকে, তাহলে মরেও তো দেখি শান্তি নাই। তাছাড়া, স্রষ্টাকে কে সৃষ্টি করল? নিজে নিজে একজন কেমনে সৃষ্টি হয়? তেমনি, পরে মহাবিশ্ব নিয়েও একি প্রশ্ন যাকে; এর শেষ নেই এটা কেমন কথা! পরে জেনেছি, এইসব হচ্ছে চিরন্তন প্রশ্ন এবং এগুলোর কোন সদুত্তর এখন পর্যন্ত পাওয়া যায় নি।

এমনি কত শত প্রশ্ন যে আচ্ছন্ন করে রাখত ছেলেবেলায়!

৩.
মনটা অস্থির হয়ে আছে। কে দেবে আমার প্রশ্নের উত্তর। ছোট থাকতে আয়নায় নিজেকে নিরিখ করার সময় যে অনুভূতি খেলে যেত, তা-ই ইদানীং একটু একটু করে ভাষা পাচ্ছে। জানি না, কবে নাগাদ আমার সেই অনুভূতিটা পরিপূর্ণ ভাষা পাবে। তবে, যতটুকু ভাষা পেয়েছে, ততোটুকুই তোমার সাথে শেয়ার করব বলে আজ লিখতে বসা।

তোমাকে দিয়েই উদাহরণটা দেই। অবন্তী, তুমি একটা মেয়ে। স্বাভাবিকভাবেই শারীরিক এবং মানসিক দিক থেকে তোমার কিছু মেয়েলি বৈশিষ্ট্য আছে, যে বৈশিষ্ট্যগুলো প্রমাণ করে যে তুমি প্রজাতিতে মানুষ কিন্তু মানুষের ভেতর সামান্য ভিন্ন আরেক প্রজাতি। এই বৈশিষ্ট্যই পুরুষ প্রজাতি থেকে তোমাকে আলাদা করেছে। এবার তুমি আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াও। তারপর, নিজেকে নিরিখ করে দেখো। দেখো চোখ, দেখো ঠোঁট, দেখো নাক দাঁত কপাল চুল… এই প্রত্যঙ্গগুলো তোমাকে অন্য মানুষ এমনকি অন্যান্য মেয়েদের থেকে আলাদা করেছে। একটা ব্যাপার খেয়াল করেছ? তোমার থেকে অন্যান্যদের শারীরিক পার্থক্যটা শুধু জ্যামিতিক। তোমার প্রত্যঙ্গগুলো কেবল অন্যান্যদের থেকে এদিক-সেদিক। আমাদের এই দেহগত পার্থক্যটা ভৌগোলিক আর জিনগত। এই জ্যামিতিক পার্থক্যটা তুলে দিলে তোমার সাথে আসলে পৃথিবীর আর সব মেয়ের কোন পার্থক্য নেই। তেমনি, আমিও পৃথিবীর আর সব পুরুষের মতই। একইভাবে, আমার আর পৃথিবীর আর সব পুরুষের অথবা তোমার আর পৃথিবীর সব মেয়েদের মধ্যকার মানসিক পার্থক্য যে থাকতে পারে সেটাও সাংস্কৃতিক এবং জিনগত। এই মানসিক পার্থক্যটা শুধু ‘ধরণে’; অমুক এইভাবে বলে, তমুক অইভাবে চলে, সে এই রকম চিন্তা করে, তার মানসিকতা এই রকম… এইসব ধরণ। কারোর সংবেদনশীলতা তীব্র এবং বিস্তৃত, কারোর সংবেদনশীলতা ভোঁতা এবং সংকীর্ণ। কারোর চিন্তা বহুগামী, কারোর চিন্তা একমুখী।

কিন্তু এক মানুষের সাথে আরেক মানুষের প্রধান পার্থক্য এবং সাদৃশ্য হচ্ছে, ‘আমিত্ব বোধ’-এ! অবাক হচ্ছো? একটা জিনিস একিসাথে কী করে পৃথক এবং সদৃশ হতে পারে, এটা ভেবে? তাহলে প্রথমে ‘পার্থক্য’ নিয়ে আলাপ করি।

তুমি, অবন্তী! পৃথিবীর দৃশ্যাবলী চোখ দিয়ে দেখো, ত্বক দিয়ে তাপমাত্রা অনুভব কর, নাক দিয়ে ঘ্রাণ নাও, জিভে দিয়ে স্বাদ, মন দিয়ে উপলব্ধি– এগুলো সবই অতি জানা কথা। আমি এইসব করি আমার ইন্দ্রিয় দিয়ে। সে করে তারটা দিয়ে। তারা অনুভব করে তাদেরটা দিয়ে…

এবার, একটা দৃশ্যকল্প কল্পনা কর। তুমি আর আমি একই টেবিলের দুই প্রান্তে বসে আছি। তুমি খাচ্ছ আইসক্রিম আর আমি গরম চা। তুমি শুনছো অর্ণবের ‘হারিয়ে গিয়েছি’, আর আমি মোবাইলে দেখছি মুভি। তুমি এই মুহূর্তে যে সমস্ত অনুভূতির ভেতর দিয়ে যাচ্ছো, আমি তা অনুভব করতে পারছি না; তেমনি আমি যা যা অনুভব করছি, তুমি তা করছ না। দেখেছ? আমি আমার ‘আমিত্ব বোধ’ নিয়ে বন্দী, তুমি তোমার ‘আমিত্ব বোধ’ নিয়ে বন্দী। প্রাচীনকালে অপরাধীদের ভয়ানকভাবে শাস্তি দেওয়া হত। তাকে এনে দাঁড় করানো হত স্টেডিয়ামের মাঝখানে তারপর সেখানে ছেড়ে দেওয়া হত হিংস জন্তু-জানোয়ার। মানুষটি প্রাণপণে লড়াই করত জন্তুদের সাথে কিন্তু জন্তুগুলো পাত্তাই দিত না সেইসব হতভাগা মানুষদের। ছিন্নভিন্ন করে দিত একেবারে। মানুষটি প্রচন্ড যন্ত্রণা আর ভয়ে ভয়ানক চিৎকার করত; এবং টিকেট কেটে এই খেলা দেখতে আসা মানুষগুলো তখন গ্যালারিতে বসে আনন্দে হাততালি দিয়ে ওঠত, কেউ বা শিষ বাজাত, কেউ বা খুশিতে নাচতে আরম্ভ করে দিত।

অবন্তী, হিংস্র জন্তুদের নখর-দাঁত-থাবার নিচে সেই অসহায় আর ভয়ার্ত মানুষটির এবং গ্যালারিতে বসে আনন্দ উপভোগ করা সেইসব দর্শকদের মধ্যে মূলত পার্থক্য কোথায়, জানো? পার্থক্যটা হচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে সেই মানুষটি যা যা অনুভব করছে, যে সমস্ত অনুভূতির ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, গ্যালারিতে বসে সেই সকল দর্শকগুলো সেই সমস্ত অনুভূতির ভেতর দিয়ে যাচ্ছে না। যদি ব্লুটুথের মত কোন ডিভাইসের মাধ্যমে সেই মানুষটির সেই সময়কার অনুভূতি গ্যালারির দর্শকদের মাঝে ঠিক ঠিকভাবে সঞ্চারিত করা যেত, তবে চিত্র ভিন্ন হয়ে যেত। তখন বুনো উল্লাসের বদলে ভয়ার্ত বুনো চিৎকারে ভেসে যেত পুরো স্টেডিয়াম।

পার্থক্য এটাই যে, আমরা একক সময়ে কেউ কারোর অনুভূতি অনুভব করতে পারি না। শুধু যা করতে পারি তা হচ্ছে, কারোর অবস্থা আমাদের মত করে অনুভব; যাকে বলে সহানুভূতিশীল হওয়া, কিন্তু সেটা কোনভাবেই একক সময়ে তার মত করে অনুভব নয়।

ফলে, তুমি ১৯৯৬ সালে জন্ম নিয়েছ এবং ২০৪৬ সালে যদি মারা যাও, এই ৫০ বছরের জীবনে যা কিছু অনুভব তা একান্তই তোমার। সেই অনুভবই তোমার ‘আমিত্ব বোধ’! যা অন্য সবার থেকে একদম আলাদা।

এবার, মানুষের সাথে মানুষের ‘আমিত্ব বোধে’ যে সাদৃশ্য তা নিয়ে কথা বলি। এই অংশটুকু নিজের কাছেই সবচেয়ে দুর্বোধ্য লাগে। আমি জানি না তোমাকে ঠিক বোঝাতে পারব কিনা।

এই দেখো, আজকের এই ভোরে আমি বেঁচে আছি। জানালার ওপাশেই রাস্তা। জানালার এপাশে বসে আছি, আর তাকিয়ে আছি রাস্তার দিকে। ভোরের আলোয় চোখের সামনে স্পষ্ট রাস্তা, সারি সারি বাড়ি, বাড়ির সাথে হেলান দেওয়া গাছ, আর রাস্তা দিয়ে চলমান মানুষ। এইসব দেখছি। দেখতে দেখতে কখনো বা ভাবনায় উদ্বেলিত হয়ে ওঠছি, কখনো বা মনের ভেতর অতীতের কোন কথা দৃশ্য ভাবনা এইসব চেতনা প্রবাহে বয়ে যাচ্ছে, আবার কখনো বা দিবাস্বপ্নে হারিয়ে যাচ্ছি, তখন এই যে চোখের সামনেকার রাস্তা-বাড়ি-গাছ-মানুষের দৃশ্যাবলী, এইগুলো বেমালুম ভুলে যাচ্ছি। তখন আমার মনোজগতের শব্দ দৃশ্যই বাস্তবতা। এটা একটা মুহূর্ত। খেয়াল কর, সময়টা ভোর। ভোরের এই মুহূর্তটায় আমি বেঁচে আছি। এই মুহূর্তে আমার ভেতরে যে ‘বোধ’ কাজ করছে, এরই নাম ‘বেঁচে থাকা’। একজন মানুষ বেঁচে থাকাকালীন এমনও অসংখ্য মুহূর্তের ভেতর দিয়ে যায়। এবং, সেইসব মুহূর্তগুলোয় এমন অসংখ্য বোধ জন্ম নেয়। আরো খেয়াল কর, আমার বা তোমার অথবা যে-কারোর জন্মের আগেও পৃথিবীতে ‘সময়’ বয়ে গেছে, আমাদের মৃত্যুর পরেও ‘সময়’ বয়ে যাবে। কিন্তু সেই ‘সময়’-এ আমি বেঁচে ছিলাম না বলে অথবা বেঁচে থাকব না বলে আমাদের সেইসব বোধসম্পন্ন মুহূর্ত তৈরী হয় নি। এবং, হবে না।

কিন্তু, সেইসব মুহূর্ত কাটানোর সময় আমার ভেতরে যে ‘আমিত্ব বোধ’ কাজ করত, সেটা তোমার মধ্যেও কাজ করে। সত্যি বলতে, বেঁচে থাকা প্রতিটা মানুষই এই বোধে তাড়িত হয়। তাহলে তুমি যখন মরে যাবে, বা আমি যখন মরে যাব, বেঁচে থাকাকালীন আমার ভেতরে কাজ করা এই ‘আমিত্ব বোধ’ পৃথিবীর জীবিত অন্যান্য প্রতিটা মানুষের ভেতরেই তো কাজ করবে। তারা বেঁচে থাকার যে অনুভূতির ভেতর দিয়ে যাবে, আমরাও যখন বেঁচে ছিলাম, সেই ‘রকম’ অনুভূতির ভেতর দিয়েই যেতাম। হয়ত তাদের সেই ‘আমিত্ব বোধ’ আমার বা তোমার ‘আমিত্ব বোধের’ মত নয়। তারা অনুভব করবে তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক এবং জিনগত ‘আমিত্ব বোধ’; কিন্তু অনুভব কিন্তু একি। আমার বা তোমার অথবা অন্যান্যদের মতই সে অনুভব। এটাই মানুষের সাথে মানুষের অন্তর্গত প্রধান মিল।

কিন্তু আমি একটা বিষয় নিয়ে দ্বিধায় আছি। আর কৌতূহলীও। জানি না ব্যাপারটা শিশুসুলভ কিনা… অনেক কিছুই তোমার সাথে শেয়ার করলাম। সুতরাং এটাও করি।

পৃথিবীতে মানুষ আসছে মোট কত বছর হল? ৬০ লক্ষ? ধরো, ৬০ লক্ষ বছর। টিকে থাকবে আরো কত লক্ষ/কোটি বছর? ধরো, আরো ৬০ লক্ষ বছর। তাহলে মানবপ্রজাতির টিকে থাকার মোট ব্যাপ্তিকাল ১২০ লক্ষ বছর। এই সময়টুকুতে বিলিয়ন বিলিয়ন মানুষ এসেছে, ভবিষ্যতেও আসবে। এবং, প্রতিটা মানুষের আমার মতই ‘আমিত্ব বোধ’ ছিল আর থাকবে। মানুষ বিচরণের এই ব্যাপ্তিকালে আমি জন্ম নিয়েছি ‘৯৪ সালে, ধরো, মরে যাব ‘৪৪ সালে; ফলে আমার মোট ৫০ বছরের জীবনের (অন্যকথায়, আমার এই ৫০ বছরের বোধ-যাপন কালের) আগে পৃথিবীতে কি একজন মানুষও ছিল না যে আমি এখন যে আমিত্ব বোধের অনুভবের ভেতর দিয়ে যাই, সে একি বোধের ভেতর দিয়ে গিয়েছিল? অথবা, আমার মৃত্যুর পর এত হাজার হাজার কোটি মানুষ জন্ম নেবে, তাদের ভেতর একজনও কি আমার আমিত্ব অনুভব নিয়ে পৃথিবীতে জন্ম নেবে না? যদি নিয়েই থাকে এবং ভবিষ্যতে যদি নেয় তবে এটাও আবার ঠিক যে, একি সময়ে একাধিক ব্যক্তি এই ‘আমি’র অনুভব নিয়ে পৃথিবীতে থাকবে না। থাকলে, একক সময়ে একজনই থাকবে। যেমন, এখন আমি বেঁচে আছি; এই সময়ে আমি ছাড়া পৃথিবীতে দ্বিতীয় কেউ তো নেই যে আমার হয়ে মুহূর্তগুলো অনুভব করতে পারে; কেউ নেই। যাইহোক, যদি এমন থেকেই থাকে সে নিশ্চয় আমার এই চেহারা বা এই মানসিকতা নিয়ে জন্মাবে না! হয়ত তখন আমার এই দেহ থাকবে না, এই মন-মানসিকতাও থাকবে না; আজকের দিনের কিছুই থাকবে না। তবুও হয়ত কোন ভাঙা ঘরের চৌকির উপর বসে আমার এই ‘আমিত্ব বোধ’ নিয়ে কোন এক নগ্ন বালক বা বালিকা বসে থাকবে। অথবা, মানুষ না হয়ে অন্য কোন প্রাণীর মাঝেও থাকতে পারি…

এই ভাবনাটা বোঝার জন্য একটা দৃশ্যকল্পের সাহায্য নেই। পৃথিবীকে একিসাথে উন্মুক্ত এবং অন্ধকার একটা মাঠ কল্পনা করা যাক।
সময়ঃ ১২ মার্চ ‘১৬; রাত ১০ টা।
ধরো, এই মাঠে বিভিন্ন মানুষ যে যার কাজে ব্যস্ত। আরো কল্পনা কর, এই অন্ধকার মাঠে সবাইকে ঘোলাটে দেখাছে, শুধু উজ্জ্বল বাতির মত আমিই জ্বলে আছি। এই জ্বলে থাকাটাই আমার ‘আমিত্ব বোধ’ নিয়ে বেঁচে থাকা। এবার, মনে কর, আমি মারা গেলাম। ফলে মাঠের যে কোণে আমি বাতি হয়ে জ্বলেছিলাম, মৃত্যুর সাথে সাথে তা নিভে গেল!

এবং,
মাঠের অন্য কোনো প্রান্ত থেকে ঘোলাটে আলোর ভেতর থেকে কেউ একজন বাতি হয়ে জ্বলে ওঠল! প্রকারান্তরে, তখন ওটা আমিই!

এই ব্যাপারটা আমি জীবিত থাকাকালে যারা বেঁচে আছে, তাদের ভেতর থেকেও হতে পারে; অথবা আমি মৃত্যুর পর নতুন কেউ জন্ম নেওয়া মানুষের ভেতরেও হতে পারে। আমার জন্মের আগেও সেই অন্ধকার মাঠে উজ্জ্বল বাতি নিয়ে কেউ জ্বলে থেকে থাকতে পারে, যার মৃত্যুর পর আমি সেই আলোকপ্রাপ্ত হয়েছিলাম…

এমন হলে ভাল হবে। এমন হলে, যতদিন প্রাণের কোন অস্তিত্ব এই মহাবিশ্বে থাকবে, ততোদিন আমি ফিরে ফিরে আসব!

আমি কিন্তু হিন্দুধর্মের সেই জন্মান্তরবাদের কথা বলছি না। তবে আমার ধারণা, আমার এই চিন্তাটা শুধু আমার মাথাতেই আসে নি; মানুষের বহু পুরোনো চিন্তা এটা। জন্মান্তরবাদ খুব সম্ভব এই চিন্তারই আদিম ফসল।

অবন্তী, আমি জানি না তোমাকে কিছু বোঝাতে পারলাম কিনা। ভাষারূপ দিতে পারলাম না বলে অনেক অনুভূতিই বাদ পড়ে গেল। অথবা, উপরে এই যে এত এত শব্দ বাক্য খরচ করলাম, বেহুদা গেল কিনা, এটাই ভাবছি। আমার অক্ষমতা ক্ষমা কর।

পুনশ্চঃ
১। জন্মটা নাকি একটা প্রাকৃতিক দুর্ঘটনা। প্রতিটা মিলনে ভ্রুণ তৈরী হয় না, আবার যে মিলনে তা তৈরী হয় সে মিলনের সময় কোটি কোটি শুক্রানু আর কোটি কোটি ডিম্বানুর ভেতর যে কোন গ্রুপ মিলিত হয়ে ভ্রুণ তৈরী হয় সেটা পুরোটাই কাকতালীয়! হয়ত মিলনটা কয়েক সেকেন্ড আগে পরে হলেই যে জন্ম নিল, সে নাও নিতে পারত, জন্ম নিত ভিন্ন আরেকজন। সেই দুজনের মধ্যে প্রধান যে পার্থক্য হতে পারে সেটা সেই ‘আমিত্ব বোধে’!

২। জাফর ইকবালের একটা সায়েন্স ফিকশন আছে, যেখানে একটা লোককে নদীর তীরে নিয়ে গুলি করে মারা হয়, এবং মৃত্যুর পর দেখতে পায় সেখানে ‘আমি’ বলে একক কোন অস্তিত্ব নেই। সমস্ত প্রাণের অস্তিত্ব মিলে একটা অস্তিত্ব। এবং, সে চাইলে ‘যে কেউ’ হয়ে যেতে পারে। মানে, যে কারোর ‘আমিত্ব বোধ’ লাভ করে তাকে অস্তিত্ব অনুভব করতে পারে। অদ্ভুত চিন্তার গল্প না?

৩। এতকাল ধরে পৃথিবীতে মানুষ, হয়ত টিকে থাকবে আরো বহুকাল, আমি কেন এই বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে জন্ম নিলাম? প্রাকৃতিক দুর্ঘটনা!

ধর্মীয় মিথে আস্থা নেই। তাই এইসবের উত্তর খোঁজার জন্য মনে মনে অনুসন্ধান চলছে। কবে মিলবে উত্তর, জানি না। অথবা আদৌ মিলবে কি? নাকি এগুলোও চিরন্তন প্রশ্নই রয়ে যাবে? কার্ল সাগান বলেছিলেন, অধিকাংশ মানুষ মহাবিশ্বের কিছু না জেনেই দিব্যি জীবন-যাপন করে যাচ্ছে। সত্য! যাইহোক, কত কিছু আবিষ্কৃত হচ্ছে, উদ্ভাবিত হচ্ছে। সবটাই জীবনকে সহনীয় আর জীবন-যাপনকে আয়াস সাধ্য করার জন্য। তবুও এইসব প্রশ্ন প্রশ্নই রয়ে গেছে। একদিন মানুষ আর থাকবে না; তারা মহাবিশ্ব থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে হয়ত এইসব প্রশ্নের উত্তর না জেনেই! কারণ, এগুলোর সমাধান না জেনেই দিব্যি জীবন-যাপন করে যাওয়া যায় যে! শুধু আমার মত কিছু অকর্মাদের মন-মগজ দখল করে রাখবে এইসব প্রশ্ন!

ইতি–
সতীর্থ
১৫ মার্চ ‘১৬


লেখক পরিচিতি 
সতীর্থ আহসান
থাকেন জামালপুর, বাংলাদেশে।

গল্পকার, প্রবন্ধকার। ব্লগার। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন