রবিবার, ২৭ মার্চ, ২০১৬

শ্যামল ছায়ার হাতছানি!

খুরশীদ শাম্মী

পিরোজপুর শহর তখনও মহকুমা। শহরের গার্লস স্কুল, বয়েজ স্কুলের মাঝামাঝি কৃষ্ণচূড়া মোড়। খানিকটা দূরেই অনেক বড় এলাকা নিয়ে ছিলো এস.ডি.ও এবং সেকেন্ড অফিসার সহ সকল প্রশাসনিক অফিসারদের বাসভবন। এর পাশেই ছিলো পিরোজপুরের স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব সালাম তালুকদারের দেয়াল ঘেরা দোতলা বাড়ি। এগুলোর খুব কাছেই ছিলো রায় পুকুর। রায় পুকুরের পাড় ধরে সিআই পাড়া রোড নামে একটি রাস্তা সোজা চলে গেলো সবুজ গাছ গাছালীতে ঘেরা খুব নিরিবিলি এলাকা চানমারির পথে। আর পুকুরের ঠিক চারপাশের বাড়িগুলোতে তখন গড়ে উঠেছিলো বিভিন্ন শহর থেকে আগত সরকারী কর্মজীবী, শিক্ষক, ডাক্তারদের বসবাস। তখন ঐ পুরো এলাকা আদর্শ পাড়া বলেই পরিচিত ছিলো। আবার কেউ কেউ বলতো এসডিও পাড়া।


সেখানে এক কলেজ শিক্ষক পরিবারে বেড়ে উঠে আট নয় বছরের এক কিশোরী। প্রকৃতির সাথে তার যত বন্ধুত্ব। প্রকৃতির টানে ছোটবেলা থেকেই সে বাবার সাথে বাইরে যেতে খুব পছন্দ করতো। কলেজ শিক্ষক বাবার সাথে প্রতিদিন বিকেলে সবজী বাগান পরিচর্চা করতে তার ভুল হতো না কখনো। বাগানের গাছগুলোই ছিলো তার মূল আকর্ষণ। আদর করে তার বাবা তাকে ডাকতো শ্যামল। শ্যামল জন্মসূত্রে একজন নারী হয়ে জন্মালেও পিতার দেয়া অবাধ প্রেরণায় জীবনের প্রথম লগ্ন থেকেই সে নিজেকে দেখেছে একজন মানুষ হিসেবে। নিজের বাড়িতে মা, বড়বোন, ফুফুদের খুব কাছাকাছি থাকলেও নর এবং নারীর সামাজিক অবস্থান এবং লিঙ্গ বৈষম্যের বিষয়গুলো কখনো তার নজরে আসেনি। অন্যান্য কিশোরীদের মতো অতিরিক্ত কাপড়ে তৈরি পোশাক পরিধান করে বাড়িতে পুতুল খেলায় তার ছিলো না কোন আগ্রহ। বরং তার অফুরন্ত ভালোবাসা ছিলো শার্ট-প্যান্ট পরে মাঠে খেলতে, গাছে চড়ে পেয়ারা, বড়ই, লিচু ইত্যাদি পেড়ে খেতে।

ছোট শহর। পাড়ায় সব শিক্ষিত মানুষের বসবাস। সবাই একটি পরিবারের মতো করেই বাস করতো। নিরাপত্তার অভাব ছিলো না মোটেও। সূর্য্যিমামা একটু ক্লান্ত হয়ে পশ্চিম আকাশে হেলে পড়লেই কিশোর কিশোরীদের দখলে চলে যেত স্থানীয় খেলার মাঠ। দল বেঁধে সাঁতচাঁড়া, গোল্লাছুট, চোর-পুলিশ আরও কত কি খেলা যে তারা খেলতো। আবার যারা খেলতে পারতো না তারা চুপ করে বসে অন্যদের খেলা দেখতো। শ্যামল চোর-পুলিশ খেলতে খুব বেশী পছন্দ করতো কারন ঐ খেলায় সে খুব সহজে দৌঁড়ে নিজের মতো দুরত্বে পৌঁছে যেতে পারতো।

মাঝে মাঝে চোর-পুলিশ খেলার ঠিক মাঝ পথে, চোর হতে পারলেই গার্স স্কুলের পিছনের আদর্শ পাড়া রাস্তা ধরে নদীর পার রাস্তায় বাম দিকে মোড় নিয়ে সোজা দৌঁড়ে সে পৌঁছে যেতো বলেশ্বর ঘাট, শহীদ স্মৃতিস্তম্ভের কাছাকাছি। মুরুব্বিরা বলে, “মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি আর্মিরা ওখানে অনেক মুক্তিযোদ্ধাদের গুলি করে মেরে নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছিলো”। কেন যেন ঐ স্থানটি তাকে খুব কাছে টানতো। খেলায় পুলিশের ভূমিকায় যে থাকতো সে সহ আরও অনেকে শ্যামলকে লক্ষ্য করে পৌঁছে যেতো সেখানে। সবুজ ছায়ায় ঢাকা শান্ত শহরে সবাই একে অপরের খুব পরিচিত। পারস্পারিক সম্পর্কও ছিলো ভালো। বিকেলে বলেশ্বর নদীর তীরে মুক্ত বাতাসে হাঁটার উদ্দেশে অসংখ্য মানুষের যাতায়াত ছিলো তখনও। অনেকে আবার সূর্যাস্ত দেখার উদ্দেশ্যে সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করতো সেখানে। কেউ কেউ নৌকা ভাড়া করে সূর্যের সিঁদুর লাল রশ্নিতে মাখামাখি পানিতে ভেসে বেড়াতো। তবে শ্যামলের ভাগ্যে সূর্যাস্ত দেখার সুযোগ খুব একটা হতো না। দৌঁড়ে ক্লান্ত হয়ে শ্যামল কিছুটা সময় বিশ্রাম নিয়ে সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফেরার হিসেবে সূর্যাস্তের আগেই বাড়ি ফিরে আসত খেলার সাথীদের সাথে। তবে বাবা এবং চাচাদের সহযোগিতায় তার বলেশ্বর নদীতে বেশ কয়েকবার সূর্যাস্ত দেখার সুযোগ হয়েছিলো।

ঐ বলেশ্বর নদীতেই প্রতিবছর আনুষ্ঠানিকভাবে নৌকা বাইচ হতো। বাইচের দিন আকর্ষনীয় নানান রঙের নৌকা এবং বাদ্যযন্ত্র অনুসরণ করে শ্যামল তার দলের সাথীদের সাথে নদীর পার ধরে হেঁটে চলে যেত বেশ বহুদূর। এভাবে অবাধে দূরের পথে হারিয়ে যাওয়ার অপরাধে তাকে মায়ের চোখ রাঙানো শাসন, এমন কি কানমলাও খেতে হোতো কখনো কখনো।

শ্যামল তখন তৃতীয় শ্রেনী শেষ করে সরকারী বালিকা স্কুলের চতুর্থ শ্রেনীর ছাত্রী মাত্র। পরিবারের সকলের সাথে তাকে বাসা পরিবর্তন করে চলে যেতে হলো টিবি হাসপাতাল রোডের এক বাড়িতে। পরিচিত স্থান এবং বন্ধুদের ছেড়ে যেতে খুব কষ্ট হোলো শ্যামলের। প্রকৃতি প্রেমিক শ্যামল কিছুদিনের মধ্যে তার কষ্ট ভুলে আবার নতুন করে নতুনকে আগলে তৈরি করলো তার পৃথিবী। সে একটু বড় হয়েছে, ভালোমন্দ অনেকটা না হলেও কিছুটা বুঝতে শিখেছে। নতুন এলাকায় নতুন বন্ধু হয়েছে। তখন আর সে ইচ্ছে হলেই দৌঁড়ে বলেশ্বর নদীর তীরে যেতে পারে না। সে সুশৃঙ্খল মানুষের মতো নতুন বন্ধুদের সাথে বাড়ির সামনের মাঠে খেলে। খুব ইচ্ছে হলে বন্ধুদের সাথে দামোদার খালের সিও অফিস সাঁকো পার হয়ে অনেক দূর পর্যন্ত হাঁটতে যায়। এই দামোদার খাল বলেশ্বর নদী থেকে শুরু হয়ে পিরোজপুর শহরের গাঁ ঘেষে এঁকেবেঁকে চলে গেছে হুলারহাট লঞ্চঘাট পর্যন্ত। সেখানে গিয়ে দামোদার কালীগঙ্গা নদীতে মিশেছে। তবে নতুন স্থানে গিয়ে শ্যামল আকৃষ্ট হয় পালদের মৃৎশিল্পে। ছুটির দিনে সুযোগ পেলেই বাড়ির উল্টো দিকে কিছুটা দূরের পথ হেঁটে সে চলে যায় পাল পাড়ায় কোন এক পাল বাড়ির সামনের খোলা কর্মস্থানের উদ্দেশ্যে। সেখানে বসে বসে কুমারদের হাতের কাজ দেখতো সে মুগ্ধ হয়ে। একটি কাঠের চাকতি ঘুরতে ঘুরতে কুমারদের হাতের ছোঁয়ায় কাদার গোলা থেকে বাসন হয়ে যাওয়া বিষয়টি তাকে শুধু মুগ্ধই করতো না বরং তাকে সৃষ্টিশীলের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে বাধ্য করতো। সরস্বতী, কালী, লক্ষ্মী, দুর্গার মতো অসাধারণ সব দেবীদের খুব সাধারণ মানুষের হাতে তৈরি হতে দেখে সে জীবন এবং ধর্মের অর্থ খুঁজতো তখন থেকেই। এভাবে বছর পার হতে না হতেই প্রশস্ত জীবনের আশায় তাকে আবার পরিবারের সবার সাথে চলে যেতে হলো বরিশাল শহরে।

বরিশাল শহরেও গাছগাছালির কমতি নেই। গাছের ছায়া, পাখিদের কলকাকলী আর কীর্তনখোলার রূপালী পানিতে মুগ্ধ হয়ে জীবন স্রোতে ভেসে ভেসে শ্যামল পূর্ণাঙ্গ মানুষে পরিণত হয়। যেমন করে প্রকৃতির নিয়ম জোয়ার-ভাটা, অমাবস্যা–পূর্ণিমা, দিন-রাত পার করে হয় মাস, তারপর বছর, যুগ, শতাব্দী ইত্যাদি। সময়ের চাকায় ঘুরে ঘুরে বাস্তবতার পাশাপাশি প্রকৃতিকে ভালোবেসে সংসার, পরিজন নিয়ে আজ শ্যামল ব্যস্ত একজন মানুষ।

মন চাইলেই প্রবাস জীবনের গতি থামিয়ে এখনও প্রায়ই সে সুযোগ করে বসে থাকে কোন এক পার্কের বেঞ্চিতে অথবা পাহাড় ঘেরা হ্রদের পারে। হ্রদের চকচকা রুপালি পানিতে সন্ধ্যাকালের লাল সূর্য্যের আলোর জড়াজড়ি দেখতে দেখতে শ্যামল হারিয়ে যায় তার শৈশবে, কৈশোরের সোনালী জীবনে। আজও শ্যামল খুঁজে ফেরে সেই বলেশ্বর নদীর সূর্যাস্তকাল, রিজার্ভ পুকুর, কৃষ্ণচূড়া মোড়, বয়েজ স্কুলের মাঠে স্বাধীনতা দিবস এবং বিজয় দিবসের প্যারেড, ফুল চুরি করে প্রভাত ফেরীতে অংশগ্রহন, আরও কত কি। এখনও নিজের শরীরে নিজের জন্মভূমি পিরোজপুরের মাটির গন্ধ খুঁজে পায় সে। অনুভব করে নিস্পাপ জীবনের অস্পষ্ট স্মৃতির শ্যামল ছায়ার হাতছানি।

মার্চ ১৭, ২০১৬

লেখক পরিচিতি
খুরশীদ শাম্মী
টরন্টো, কানাডা

গল্পকার।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন