সোমবার, ২৫ এপ্রিল, ২০১৬

সালেহা চৌধুরী'র গল্প | আবু ইসহাক এবং প্রভাতের পাখিরা

বউটাকে মেরেও শান্তি পায় না আবুল ইসহাক। জীবনে এই প্রথম সে বউএর গায়ে হাত তুলেছে। সাত বছরে প্রথম। কারণ কী? জরিণার অপরাধ কী? সেকি আর কারো সঙ্গে প্রেম করছে না আর কারো বিছানায় ঘুমিয়েছে? না, সেসব কারণ নয়। কারণ আরো গূঢ়তর। কারণ জরিণা আবুল ইসহাকের কোয়ার্টার অফ এ মিলিয়ন পাউন্ড ওয়াশিং মেসিনে কাপড় ধুতে দিয়ে ধুয়ে ফেলেছে। কেমন করে? অন্যদিনের মত সেদিন লটারির টিকিট কেটে আবুল ইসহাক প্যান্টের পকেটে রেখেছিল। পরে ও সে টিকিট ও ছোট টেবিলের ড্রয়ারে রাখে।
প্রায় দশ বছর হলো একই নাম্বারের টিকিট কাটে ও। ১০ ১৭ ২১ ২৫ ৪০ ৫০। দশ তারিখে ওর জন্ম। সতেরো তারিখে জরিণার। একুশ তারিখে ওরা বিয়ে করেছে। এখন জরিনার বয়স ২৫। ওর নিজের বয়স ৩৬ হলেও ওর আশা চল্লিশ পেরোতে না পেরেতো ও লটারি জিতে ফেলবে। ৩০ বছর বয়সে ও এই নাম্বার দিয়ে খেলা শুরু করেছে। এখন ওর বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। ওর বিশ্বাস এখনই ও লটারি জিতবেএবং যখন ওর বয়স ৫০ হবে ওদের টাকাপয়সার আর কোন চিন্তা থাকবে না। একজন গনক বলেছিলেন -- চল্লিশ বছর বয়সে আপনার অর্থ প্রাপ্তির যোগ আছে। তিনি আরো বলেছিলেন -- আমার গননা মিথ্যা হবে না আপনি ওই বয়সে বেশ কিছু টাকা পাবেন এবং যা দিয়ে আপনার বাঁকি জীবন বেশ ভালো চলবে। দুইশত পঞ্চাশ হাজার পাউন্ড পেলে বাঁকি জীবন খারাপ যাবার কথা নয়। দেড়শো হাজারে একটা বাড়ি কিনবে। দুই কামরার সুন্দর ছোট বাড়ি। বাড়িটা ও আর জরিণা যখন হাঁটতে বেরোয় দেখেছে। সেল লেখা সেই বাড়ি। হানিসাকল রোডের শেষ মাথায়। প্রায় সেমি ডিটাচ্ড একটি বাড়ি। সে বাড়ি মাসখানেক খেটে একটি অসাধারণ বাড়িতে পরিণত করতে ওর সময় লাগার কথা নয়। বন্ধু রকিবুল ওকে সাহায্য করবে ও জানে। অতএব দুজনে গায়ে গতরে খেটে বাড়িটার দাম বাড়িয়ে তিনশো হাজার করে ফেলবে। এবং বাকি টাকা ব্যাংকে রেখে সুদ নেবে। না হলে নিজে একটা ছোট ব্যবসা শুরু করবে। সে ব্যবসা ওর একার। সেখানে ও মালিক, চাকর সব। হিসাব তো ঠিকই ছিল। গনকের কথাও সত্যি হয়েছিল। কেবল লটারির টিকিটটা যদি জরিণা প্যান্ট ওয়াশিং মেসিনে দেবার আগে পকেট থেকে বের করে নিত তাহলে সবই সত্যি হতো। দোষ যে জরিণার তাও ন। ইসহাক সবসময় ওজিফা শরিফের ভেতরে লটারির টিকিট রাখে। প্রথমে দোকান থেকে কিনে পকেটে রাখে তারপর ওজিফা শরীফের ভেতর চালান করে। আর সেই ওজিফা শরীফ থাকে একটি স্পেসাল ড্রয়ারে। যেখানে আতর, তসবিহ, আকিক পাথর এইসব রাখে ও। মোটামুটি নামাজ রোজায় ্একজন ভালো মুসলমান আবুল ইসহাক। খেটে খায় সারা বছর। একটা দোকানের কাজকাম দেখে। জিনিস বিক্রি করে। বিক্রির হিসাব রাখে। ট্রাক থেকে ভারী ভারী মাল টেনে নামায়। দোকানী তাকে যে বেতন দেয় তা দিয়ে চলে যায় মোটামুটি। জরিণা কিছু করে না। ইসহাক বলে -- থাক কী আর করবা? বাচ্চা নেই কাচ্চা নেই। দুইটা মানুষ আমরা। আমার রোজগারেই চলবে। আর লন্ডনে কাজ করবার মত পড়াশুনা বা বিদ্যাবুদ্ধি জরিণার নাই। ক্লাশ নাইন পর্যন্ত পড়াশুনা। কোন একটা ফাক্টরিতে কাজ হয়তো পেতে পারে কিন্তু আবুল ইসহাক বলে -- কী দরকার বাড়িতেই থাকো। মা বাবার একটি ছেলে আবু ইসহাক। ওরা কেউ আর নেই, দেশে পিছুটান বলতেও তেমন কেউ নেই। আবুল ইসহাক জরিণার চেহারা দেখেই বিয়ে করেছিল। বড় বড় চোখ, মিষ্টি শ্যামলা মেয়ে। এখন সুস্থসবল এই দুই মানুষ দাম্পত্যজীবনে ভালোই আছে। জরিণা বাড়ি গোছায়, ঘর গোছায়, রান্না করে, বাজার করে এবং নামাজ রোজা এসবে বেশ কিছু সময় ব্যয় করে। লন্ডনে জরিণার একজন মামা থাকেন। মার খেয়ে জরিণা এক কাপড়ে সেখানে চলে গেছে। আবুল ইসহাক রাগ দেখিয়ে চিৎকার করে বলেছে -- আর কোনদিন এই বাড়িত আসবি না। অলক্ষী মেয়েমানুষ। একটা ট্রাউজার মেসিনে দিতে পকেট দেখতে হয় সে জ্ঞানবুদ্ধিও তোর নাই? রেগে জরিণাকে এরপর কষে মার দিয়েছে। আর বলেছে -- আজ থেকে এই বাড়ির দরজা তোর জন্য বন্ধ। মার খেয়ে কোন কথা বলেনি জরিণা। সেও কী এই খবরে কষ্ট পায়নি? তারও কী এমন ঘটনায় প্রচন্ড জ্বালা-যন্ত্রনা হচ্ছে না? মার তো সেই জায়গায় কিছুই না। তবু সে কাঁদতে কাঁদতে বলেছে -- ঠিক আছে। আর আসবো না।

মামার বাড়ি যাবার ৩৬ নম্বর বাসে চেপে সে মামার বাড়ি রওনা দিয়েছে। ছোট একটা পার্সে দশ পাউন্ড এবং বাড়ির চাবি। এই নিয়ে চলে এসেছে ও। এক ঘরের কাউন্মিলের বাড়িতে ওরা থাকে। একটি ঘর, রান্নাঘর আর ব্যালকনি। যে ব্যালকনিতে টবে সবুজ মরিচ, টমাটো ফলায় ও। সেই বাড়িটা যা ওরা দুজনেই দেখেছে এবং কিনতে চেয়েছিল সে বাড়ি হারানোর কষ্ট, বাঁকি টাকা হারাণোর কষ্ট এত বেশি যদি শরীর কেটে নুন লাগিয়ে দিত আবু ইসহাক তাতেও বোধকরি কিছুই যেত আসতো না তার। একটা সুন্দর নিজের বাড়ি! ইস ভাবতেও বুকটা কেমন ফুলে যায় আর এখন সেই বুক ওর ব্যথায় টন টন করছে। নিজের বাড়ি সাজাতো, পেছনের বাগানে ফুল আর সবজির চাষ করতো। কত কী যে হতো সেখানে ভাবছে আর চোখ মুছছে।

মামি বাঁকা চেখে দেখে বলেন -- পুরুষ ভাগ্যে জন আর নারী ভাগ্যে ধন। তোর কপালে এত টাকা নাই। মামা বলেন -- থাক থাক তুমি আর কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দিও না। তারপর বলেন -- থাক যতদিন জামাইএর মাথা ঠিক না হয় থাক। তারপর তার কথা অনেকটা এই রকম --হায়রে হায়রে দুইশত পঞ্চাশ হাজার পাউন্ড। ইস! মামা কপাল চাপড়তে চাপড়াতে চলে যান। জরিণা ক্লান্ত-করুণ মুখে শুয়ে শুয়ে মামার বাড়ির ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। সে সবসময় পকেট পরীক্ষা করে তারপর কাপড় ওয়াশিং মেসিনে দেয়। সেদিন কেন সে পকেট পরীক্ষা করেনি। তারপর বালিশে মুখ রেখে কাঁদতে থাকে।

আবুল ইসহাক সাতদিনের ছুটি নিয়েছে শোক সামলাতে। ছুটি তার পাওনা ছিল। দুজনে মিলে দেশে যেত তারা। একটা মসজিদে টাকা দান করে ফিরে আসতো। তারপর বাঁকি জীবন কী আরাম। দুজনে মিলে হজটাও সেরে ফেলতো। গনক বলেছিল তাকে -- হাতের রেখা বদলায়। তবে আপনার টাকা প্রাপ্তির রেখা এত পরিস্কার মনে হয় না এটা কোন কারণে বদলাবে। কেন বদলে গেল? কেন সে পেল না টাকা এই কথা ভাবতে ভাবতে আবুল ইসহাক প্রায় মাথা খারপর করে ফেললো। সে এখানে ওখানে ঘুরলো। খেল কী খেল না মনে করতেও পারে না। কেমন যেন ভোঁতা সবকিছু। কী হতো আজ আর কী হলো। বার বার হাত দেখে। হাতের রেখাগুলো ওর মুখস্ত। হ্রদয়, জীবন, মস্তিস্ক, ভাগ্য। এর মধ্যে কোনটা যে টাকার রেখা ও ঠিক জানে না। তবে আছে কোথাও। না হলে গনক এমন কথা বলবেন কেন? হঠাৎ বাসের শব্দে ও চোখ তোলে। কখন যে বাসে চেপে ট্রাফালগার স্কোয়ারে এসেছিল মনে করতে পারে না। পায়রার ওড়াওড়ি দেখে। দেখে চারপাশের জন¯্রােত। যে যার মত পথ চলছে, হাসছে, কথা বলছে, চুপ করে আছে। ও ভাবছে ওদের নিশ্চয় ওর মত কষ্ট নেই। তারপর আবার ফিরে যায় পুরণো ভাবনায়। একসময় ভাবে ফিরে যাবে। কাল থেকে আবার কাজে যাবে ও। জরিণাকে আনবার কোন ইচ্ছা আছে মনে হয় না। মামা বলেছিলেন -- বাবা জরিণা এখানে আছে। ওর জন্য কোন চিন্তা করবা না। ও তো কখনো আসতেই চায় না। এখন যখন এসেছে থাক কিছুদিন। মামা মামি দুজনেই কাজ করেন। অবস্থা ভালো।

না জরিণার জন্য চিন্তা করছে না। কেবল চোখের সামনে ভাসছে সে বাড়িটা, একটা ছোট গাড়ি আর ব্যাংকের টাকার অংক। নিজের একটা ছোটখাটো ব্যবসা।

কতদিন আর মন খারাপ কইরা থাকবা। কাম কাজ কর। মন ভালো কর। দোকানদার তাকে বলে। আবুল ইসহাক কথা বলে না কাজে হাত লাগায়। ওর এই খবর কারা যেন আবার কাগজে দিয়েছে। -- হাত ফসকে চলে গেল বড় মাছ। তারপর বেশ ফলিয়ে ওর লটারির টিকট হারাণোর গল্প লিখেছে। এখন বোধকরি লন্ডনের অনেকেই ওর নাম জানে।

ঠিক একমাস চলে গেছে। জরিণা এখনো মামার বাড়িতে। মামা জরিণার প্রশ্নের উত্তরে বলেছিল কেবল -- আর কয়টা দিন থাক। মাথা ঠান্ডা হবে। যতদিন মন চায় থাক। জুলাইমাসের গরমে ও হাঁসের ডিমের মত টপ টপ বড় দিনে জরিণা সপ্তাহে দুটো রোজা করে। মামি কাজে যায়। ছেলে আর মেয়ে য়ুনিভার্সিটিতে। জরিণা ওদের জন্য রাঁধে। ওরা উপভোগ করে। কাজেই ওর যাওয়া নিয়ে কারো কোন মাথা ব্যথা নেই। ছেলেটা মাঝে মাঝে আসে। মামার মেয়েটা বাড়িতেই থাকে। চারঘরের বাড়িতে জরিণাও একটা ঘর পেয়ে যায়। সেদিন ও রোজা ছিল। তারপর মামার বাড়ির কার্পেটে জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ পড়তে পড়তে জায়নামাজেই ঘুমিয়ে পড়েছিল একসময়। লোবানের আতরের গন্ধ ওর চারপাশে। আর হালকাবাতিটা ঘরের ভেতরে একটা জোছনার মত আলো এনে দিয়েছে। জরিণা এইসবের ভেতর নামাজ পড়তে পড়তে আর প্রার্থনা করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে জানে না।

হঠাৎ দেখে ওর শাশুড়ি খাটের এক পাশে বসে আছেন। বলছেন -- কেমন আছো গো জরি? আহারে আমার পোলাডা ঠিকমত খায় না ঘুমায় না। কী কর তুমি এখানে। নিজের বাড়ি। চাবি তোমার হাতে। সোজা গিয়া হাত পা ধইরা মাপ চাও। ওইতো তোমার ইহকাল পরকালের মালিক। আবছা অন্ধকারে জরিণা শাশুড়িকে দেখছে। পাঁচ বছর হলো তিনি মৃত। শাশুড়ি আবার বলছেন -- মনে আছেনিগো জরি আমার বেড়ালটারে রুটি বানানার বেলুন ছুঁইড়া মারছিলা। বেড়ালটা পরে মারা যায়। জানি তুমি ইচ্ছা কইরা মারো নাই। কিন্তু বেড়ালের অভিশাপগো জরি। কতদিনে এ অভিশাপ থাকবো কে জানে। তাই বড় মাছটা তোমার হাত ফসকাইয়া চইলা গেছে। তোমার কোলে সন্তান আসে নাই। তুমি জানো নাগো জরি আমার বেড়াল টুনি তখন পোয়াতি ছিল। কী করবা কও। দোষ তোমার না। এরপর শাশুড়ি চুপ করে থাকেন। খানিক পর বলেন এখন আমার সময় হইছে তোমাদের সংসারে আসার। কেমনে আসি কওতো জরি? জরি মুখ দিয়ে কোন শব্দ করতে পারে না। কেবল অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকে। বলতে চায় -- মা গো আমি আপনার টুনিরে মারার জন্য বেলুন ছুঁড়ে মারিনি। কেবল আমি একটু ভয় দেখাইতে চাইছিলাম গো মা। আমি জানতাম না আপনার টুনি পোয়াতি। মা মা কেমন করে আমি অভিশাপমুক্ত হবো মা। জরিণা এইসব বলতে বলতে বিছানায় উঠে বসে। কেউ নেই। সব অন্ধকার। মামার বাড়িতে এখন আর কোন শব্দ নাই। জরিণা যখন সত্যিই জেগে ওঠে কেউ নেই চারপাশে তখন। শাশুড়ির ছায়াও নেই। শাশুড়ি ওকে মেয়ের মত ভালোবাসতো। তাই কোনদিন বৌ বা বৌমা না বলে ডেকেছে জরি বলে। বলে জরি -- যেমন করে পারেন আপনি একবার আসেন মা। তারপর চেয়ে দেখে অন্ধকারের পাতলা জোছনা। ওপারের জগত থেকে মা কেমন করে আসতে পারে জরিণা ভাবতে থাকে। হয়তো ওপারের জগতে মাও ভাবছেন তিনি কেমন করে ওদের সংসারে আসবেন? জরিনা কী ভাবতে ভাবতে ক্লান্ত শরীরে আবার ঘুমিয়ে পড়ে।



সকালবেলা যখন সুর্য ওঠেনি, যে সময়টাকে বলে সোবেহসাদেক, ইসহাক দরজা খুলে বাইরে আসে। মনে হয় ওর মা ওর খুব কাছে বসেছিল। যে মাঠটায় ও মাঝে মাঝে হাঁটতে যায় সেদিকে যাবে বলে আলোছায়ায় হঁ^াটতে থাকে। কেউ নেই রাস্তায়। ভোর পাঁচটায় কে থাকবে? সকলে আসে আটটার পরে। যারা কুকুর হাঁটাতে আসে তারাও এত সকালে মাঠে আসে না। ইসহাককে দেখে গাছগুলো বোধকরি একবার ঘুম থেকে জেগে উঠে আবার ঘুমিয়ে যায়। একটি বড় পাতার গাছের তলায় বেঞ্চ পাতা। ইসহাক বসে। হাঁটতে ভালো লাগছে না। বসে বসে কী সব ভাবছে। ভাবছে মা’কে ভাবছে বাবাকে। যারা এখন আর ওর জীবনে নেই। জরির মুখও মনে পড়ছে। কঠিন মনটা এখন বোধকরি খানিকটা নরম। তবু সে ভাবছে এখন যাবে না জরিকে আনতে। কবে যাবে তখনো জানে না।

যেখানে গাছপালা একটা রেখার মত সবুজ ¯িœগ্ধ ছায়া ছায়া ঘন গভীর রহস্য তৈরী করেছে ঠিক সেইখানে সাদা পাখির মত কে যেন। ওদিক দিয়ে দূরের বনের দিকে একটা পথ চলে গেছে। জায়গাটা দিনের বেলাতেও আঁধার আঁধার। অনেকসময় ওইখানে সমুদ্র থেকে পাখি আসে। তারা মাঠে ঘুরে নেচে আবার আকাশে চলে যায়। সাদা পাখি, নীল পাখি, আর ডোরাকাটা পাখি। জরিণা কখনো কখনো পাখিদের দিকে তাকিয়ে বলে -- ওরা সব কোথায় থেকে আসে বলতো? ইসহাক উত্তর দেয় -- কী জানি। বোধকরি আকাশ থেকে। না হলে সমুদ্র থেকে। মনে রেখ আমরা যেখানে আছি সেখান থেকে সমুদ্র দূরে নয়। আর এখনকার পাখিটা যেন একটা বিশাল আলবাট্রসের মত। পাখিটা একটু একটু করে ওর দিকে এগিয়ে আসছে। সূর্য ওঠেনি। বা উঠবে। কিন্তু তার আলো মাঠের রহস্য তখনো দূর করেনি। কী ভাবছিল হঠাৎ বুঝতে পারে পাখিটা আর সেখানে নেই। সারা মাঠে বা মেডোতে স্গ্ধি সকাল। এমন মাঠ ঢাকায় দেখেনি ও। দেশের বাড়িতেও দেখেনি। এরা বলে মেডো। এখানে হাঁটতে গেলে নানা সব চিন্তা চলে আসে। এ মাঠ আবুল ইসহাকের প্রিয়।

পাশে কখন যে একজন মানুষ এসে বসেছে ইসহাক বুঝতে পারেনি। সাদা কাপড়। লোকটা চেয়ে আছে মাঠের দিকে। কেমন নূরানী চেহারা। ফকফকা দাড়ি। অনেকসময় সে চুপচাপ বসে। তারপর হঠাৎ শোনে লোকটার কথা -- আপনার দুটো চোখ ----

আমার দুটো চোখ?

না এমনি বললাম। আমার ছোটভাইএর দুটো চোখ হঠাৎ খারাপ হলো। লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করেও চোখের দৃষ্টি আর ফিরে পেল না। এখন একটা অন্ধকার জগতের অধিবাসী। আপনার দুটো চোখের জন্য আপনি কত টাকা খরচ করবেন?

দৃষ্টি ফিরে পেতে?

ধরুণ ওইরকমই কিছু।

বাড়িঘর জমিজিরাত সব বেচে দুটো চোখ ভালো করতে চাইবো। একদিন কারো সঙ্গে কথা বলতে ওর ভালো লাগেনি। এখন এই বিশাল পাখির মত লোকটার কথার উত্তর দিতে ওর খারাপ লাগছে না। যেন পাখি থেকে বেরিয়ে এসেছে একটা মানুষ।

আর যদি কিডনি খারাপ হয়? আমার মামাতো বোন তিরিশ লক্ষ টাকা খরচ করে কিডনি ঠিক করলো। তারপর কী হলো জানেন শরীর সেই কিডনি মেনে নিল না। সেই মাংসের টুকরা শরীর থেকে বের করে তারপর আবার ডায়ালিসিস। কতদিন বাঁচবে কে জানে।

আপনি এসব আমাকে বলছেন কেন?

আমরা যা বিনাপয়সায় পাই তার কী কোন দাম থাকে। কিডনি, হার্ট, লিভার, কানের শোনা, চোখের দেখা, পায়ের হাঁটা, মুখের কথা, সুন্দর মস্তিস্ক সব হিসাব করলে কতটাকার জিনিস আল্লাহ আমাদের দিয়েছেন বলতে পারেন? দাঁত, চোখ, কান, এসবের দাম কত হবে?

মিলিয়ন মিলিয়ন পাউন্ড। মিলিয়ন মিলিয়ন পাউন্ড। এসবের কী কোন হিসাব আছে। ইসহাক বলে।

আপনার চোখের দেখার জন্য কত টাকা আপনি ব্যয় করবেন? লোকটা প্রশ্ন করে আবার।

যা আছে তার সর্বস্ব। উত্তর দেয় ইসহাক। -- চোখের দেখা, কানের শোনা, পায়ের হাঁটা, কথা বলা, জিভের স্বাদ, চিন্তার মাথা, হাতের ক্ষমতা এর কোনটা আপনি আমাকে দেবেন যদি আমি আপনাকে এক মিলিয়ন পাউন্ড দেই।

এর কোনটাও আমি আপনাকে দিতে পারবো না। যত টাকাই আপনি দেন না কেন আমি এর কোন কিছু দেব না। এগুলো আমার। আল্লাহ এ গুলো আমাকে দান করেছেন। আমি টাকার বিনিময়ে এর কোন কিছু আপনাকে দেব না।

আমার বন্ধুর মেয়ে একটা এ্যাকসিডেন্টে আর হাঁটতে পারে না। এখন কেবল হুইলচেয়ারে বসে থাকে। ও দুই মিলিয়ন পাউন্ড কমপেনসেসন পেয়েছে। বলে আমাকে -- চাচা যদি আবার আপনাদের মত হাঁটতে পারি তাহলে এই দুই মিলিয়ন পাউন্ডএর সব টাকা আপনাকে দিয়ে দেব। ইসহাক কথা শুনছে। কথা শুনতে শুনতে নানা কিছু ভাবছে।

ইসহাক লক্ষ করে পাশের লোকটা নেই। কেউ নেই পাশে। কেবল ঠিক যেদিকে সূর্য ওঠে সেদিকে দুই পাখা মেলে একটা পাখি উড়ে গেল। পাখিটা বড়, সাদা, আলব্রাটর্সের মত। ইসহাক তাকায়, দুই চোখের পূর্ন জ্যোতিতে চেয়ে দেখে। গাছাপালা। পাখিরা। মাঠের ঘাস। উঠে দাঁড়ায়। দুই পায়ে হাঁটে। তারপর বিড় বিড় করে -- মিলিয়ন পাউন্ড মিলিয়ন পাউন্ড। এবার তার সু¯থ মাথা হিসাব করে তার নিরোগ সুঠাম শরীর, বলিষ্ঠ হার্ট, কাজ করবার ক্ষমতা। লোকটা বলেছিল -- দুই চোখের জন্য আমার ভাই মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করতে রাজি। অনেক বড় কারবারি। মিলিয়ন পাউন্ড কিছু না। টাকা তাকলেই কী সব পাওয়া যায়? যে হুইলচেয়ারে বসে আছে কেবল আমাদের মত হাঁটতে পারার জন্য কত টাকা সে দিতে চেয়েছিল?

ইসহাক চারপাশে তাকায়। এখনো কেউ মাঠে আসেনি। তার দুই পা কেমন যেন কাঁপছে। সে ভালো করে তাকায়। কোথায় গেল সেই লোক। সে কী এমন কোন লোককে কল্পনা করেছে? লোকটা কী কল্পনার। না হলে কোথায় গেল লোকটা? প্রায় ছয় সপ্তাহ পরে ইসহাক পরিস্কার মাথায় এখন সবকিছু দেখতে পাচ্ছে। যা আছে তার, যা নেই সে এমন কী? কেমন হালকা হয়ে ওঠে শরীরটা। ফুরফুরে বাতাসে হঠাৎ গানের মত কী মনে পড়ে, শিষ দেয় আপনমনে। মাথার উপরের গাছ তখন একটু একটু করে জেগে উঠে ওকে জুলাইএর বাতাসে আরো একটু ফুরফুরে করছে। আর চাপাশের সেই গাছপাখি ভরা মেডোতে ইসহাক যেন নতুন করে নতুন ভাবে অনেক কিছু বুঝতে পারে। বুকের কষ্টটা তেমন করে ওকে যন্ত্রনা বা দহনের নদীতে চুবিয়ে মারছে না। ইসহাক সেই নদী থেকে উঠে এসেছে। হালকা পায়ে মাঠের সরু পথ ধরে হেঁটে বাড়ির দিকে আসে।



জরিণা কবে তুমি বাড়ি আসবে। জরিণা খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলে

তুমি একটু মামির সঙ্গে কথা বল।

মামি ফোন ধরেন। কোন প্রকার ভণিতা বাদ দিয়ে বলেন --

বাবা দুলামিয়া সুখবর। আমাদের জরিণার বাচ্চা হবে বাবা।

কী বলছে মামি। এ কেমন করে সত্যি হবে। বলে কেবল -- মামি জরিণাকে ফোনটা দেন। জরিণা ফোন ধরে -- যেন আর্তচিৎকারে বিশ্বাস অবিশ্বাসের গলায় প্রশ্ন করে -- জরিণা! সতি!

মামি চলে গেছেন। বলে জরিণা -- গতকালই জানতে পারলাম। আমার তো আবার মাসিকের গোলমাল। ডাক্তার সাহেব বললেন -- না এটা কোন গোলমালের ব্যাপার না। সত্যিই আপনার বাচ্চা হবে।। দুজনে চুপচাপ অনেকক্ষণ। বলে ইসহাক খুশী খুশী গলায় -- জরিণা আল্লাহ বড় মেহেরবান। আল্লাহ আমাদের যা দিয়েছে তার পরিমান অনেক। আর আজকের এই খবর! আল্লাহ মেহেরবান, রহমানুর রহিম, গাফুরুর রহিম। তিনি বিশাল। তিনি অফুরাণ।

যখন ইসহাকের উচ্ছা¦স একটু কমে যায় বলে জরিণা খুবই স্বাভাবিক গলায় --

আমি ওর নাম রাখবো হাসিনা। আমার শাশুড়ির নামে। ডাকবো হাসি করে।

মেয়ে হবে কী করে জানলে?



আমি জানি। জরিণা বলে শান্ত-গম্ভির গলায়।

1 টি মন্তব্য: