সোমবার, ২৫ এপ্রিল, ২০১৬

সালেহা চৌধুরীর সাক্ষাৎকার | দূরে আছি বলে সবকিছু চোখের সামনে এত স্পষ্ট হয়ে ফুটে ওঠে

বাংলা সাহিত্যের সমকালীন ধারায় সালেহা চৌধুরী এক পরিচিত নাম। তিনি একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, অনুবাদক ও কবি। শিশুসাহিত্যিক হিসেবেও তাঁর সুখ্যাতি আছে। দীর্ঘদিন থেকেই লিখছেন। প্রথম গল্পগ্রন্থ নিঃসঙ্গ প্রকাশ পায় উনিশশ সাতষট্টি সালে। সত্তর সালে প্রকাশ পায় সাহিত্য প্রসঙ্গে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে কর্মরত থাকা অবস্থায়। তারপর বিদেশে চলে যান। বিশ বছর বাদে আবার লিখতে শুরু করেন। গ্রন্থসংখ্যা সত্তরের কাছাকাছি। লিখেছেন দুটি ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ। ২০১৫ সালে কলকাতার আনন্দ পাবলিশার্স থেকে ‘পঞ্চাশটি গল্প’ নামে তাঁর একটি বই বেরিয়েছে। সালেহা চৌধুরী অনন্যা সাহিত্যপুরস্কার ও বাংলা একাডেমির সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ সাহিত্যপুরস্কার পেয়েছেন।


সালেহা চৌধুরীর সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন কথাসাহিত্যিক মোজাফ্ফর হোসেন--


মোজাফফর হোসেন--
আপনি দেশের বাইরে থাকেন। প্রায় প্রতি বছর শীতের সময় দেশে আসেন। এই আসার পেছনে কি বইমেলার কোনো হাত আছে?

সালেহা চৌধুরী--
যখন ওখানে স্কুলে কাজ করতাম শীতে দেশে আসতে পারতাম না। গরমে বা সামার ভ্যাকেশনে আসতে হতো। যদি কখনো শীতে আসা হতো মন ভরতো না। মনে অতৃপ্তি নিয়ে ফিরে যেতাম। এরপর যখন চাকরি থেকে রিটায়ার করলাম শীতে দেশে আসায় আর কোন বাধা রইলো না। শীতে নতুন শাকসবজি, গরমের দাবদাহ না থাকা এবং ও দেশের প্রচন্ড শীতের হাত থেকে বাঁচতে আমি এবং আমার স্বামী তোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী চলে আসতাম। উনি তিন বছর হলো মারা গেছেন। এখন আমি একা আসি। বইমেলার উৎসবে ঢাকায়, বইবসন্ত উপভোগ করতে পারছি এ অনুভূতির কী কোন তুলনা আছে? আমার বই বেরোয়, যদি তখন এ দেশে থাকি সে আনন্দ প্রাণভরে উপভোগ করতে পারি।



মোজাফফর হোসেন--
এবার বইমেলায় আপনার কি কি বই বের হল?

সালেহা চৌধুরী--
এবার ছয়টি বই বের হয়েছে। মাওলা ব্রাদার্স বের করেছে -- আবু ইসহাক এবং প্রভাতের পাখিরা নামের ছোট গল্পের বই, উত্তরণ প্রকাশ করেছে অনুবাদ বই - ক্রিস্টি ব্রাউনের আমার বাঁ পা, বেহুলা বাংলা করছে মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস নিরাপদ নিরিবিলি, গ্রাফোস করেছে -- ছায়াবৃতা নামের উপন্যাস, আর ছোটদের বই বের হয়েছে একটি। এছাড়াও রাইটার্স ইংক বের করেছে আমার চৌদ্দটি বাংলা গল্পের ইংরাজি অনুবাদ - স্পাইডার্স এ্যান্ড আদার স্টোরিস।


মোজাফফর হোসেন--
আপনার গল্পে একটা সম্মোহনী শক্তি থাকে। একবার ধরলে শেষ না করে ওঠা যায় না। গল্পবলার এই শক্তিটা কি আপনি অর্জন করেছেন নাকি সহজাত?

সালেহা চৌধুরী--
 থাকে নাকি? শুনে খুশী হলাম। খানিকটা অর্জন খানিকটা সহজাত। রোয়াল্ড ডাল আমার গল্প লেখার মাস্টার। অনেকসময় ওঁকে আমি অনুসরণ করি। অনেকে বলে আমি পাঠককে একটু সাসপেন্সে রাখতে পছন্দ করি। হতে পারে। কারণ চরিত্রগুলো ঠিক যে কী চায় বুঝতে পারি না। একসময় আমি দেখি ওরা আমাকে হাত ধরে নিয়ে চলেছে গন্তব্যের দিকে। আমার শিক্ষক আনিসুজ্জামান স্যার বলেন -- আমার গল্পের শেষে এমন এক মোচড় থাকে যা আমার গল্পের সবকিছু বদলে দেয়। এই মোচড়টা ডালের কাছ থেকে পাওয়া। ওর ‘টুইস্ট ইন দ্য টেলের’ আমি বিশেষ ভক্ত। ওর বেশ কিছু গল্প অনুবাদ করতে করতে হয়তো আমিও মোচড় দেওয়া শিখে ফেলেছি। কিন্তু সব গল্পে কী মোচড় থাকে?


মোজাফফর হোসেন--
 আপনার গল্পে যে গদ্যরীতি, বর্ণনাভঙ্গি ও নির্মাণশৈলি, সেটি বাংলা সাহিত্যে বেশ নতুন। প্রথম ধাক্কায় মনে হয় যেন কোনো বিদেশি লেখকের বাংলা অনুবাদ পড়ছি। এই স্বকীয় স্ট্যাইলটা কি কোনো বিশেষ লেখকের প্রভাবে হয়েছে? বিশ্বসাহিত্যে আপনি কাদের লেখা দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত?

সালেহা চৌধুরী--
 আগেই বলেছি আমি রোয়াল্ড ডাল দ্বারা প্রভাবিত। মার্কেজ আমার প্রিয় গল্প লেখক। ওঁর ম্যাজিক রিয়ালিজম বা যাদু বাস্তবতা আমি ব্যবহার করতে পছন্দ করি। আমি যে একটু নতুন করে লিখছি সেটা ভেবে করছি না। তেতাল্লিশ বছরের ব্রিটেনে থাকা, অসংখ্য গল্প পড়া হয়তো আমার লেখাকে খানিকটা বদলে দিয়েছে। বলতে পারি তেতাল্লিশ বছরের ব্রিটেন আমার চিন্তার দিগন্ত বিস্তার করেছে, আমার চিন্তার নতুন জানালা খুলে দিয়েছে, গল্পের আঙ্গিক বা ভাষা ব্যবহারে নতুনত্ব এনেছে। কিন্তু বিশ্বাস করুন এটা আমি নতুন কিছু করবার জন্য করছি না, হয়তো হয়ে যাচ্ছে। আমার গল্প এত মন দিয়ে পড়বার জন্য ধন্যবাদ।


মোজাফফর হোসেন--
আপনি তো ডায়াসফরিক অবস্থান থেকে লেখেন। ভিন্নদেশে অবস্থান করে দেশের মানুষ ও সংস্কৃতি নিয়ে লিখতে কোনো সমস্যা হয় কিনা?

সালেহা চৌধুরী--
 একেবারেই না। দূরে আছি বলে সবকিছু চোখের সামনে এত স্পষ্ট হয়ে ফুটে ওঠে ভাবতেও অবাক লাগে আমি দেখি আমার বাড়ির পাশের নিম গাছের কথাও ভুলে যাইনি। যখন ‘বিন্নি ধানের খৈ’ এবং ‘উপালির উপাখ্যান’ লিখেছি আমি ব্যবহার করেছি বগুড়ার গ্রামের ভাষা। যে নানাবাড়িতে আমি ছোটবেলা যেতাম। ওমা ওদের মুখের ভাষা লিখতে গিয়ে দেখি আমার সব মনে আছে। স্মৃতি এক বিস্ময়কর হার্ডডিস্ক, কত কিছু যে সেখানে জনে থাকে ভাবাই যায় না। আমি যেমন ওদের (বিদেশীদের) কথা লিখতে ভালোবাসি তেমন আমার দেশের মানুষের কথাও বলতে ভালোবাসি। আর প্রতি বছর দেশে আসি বলে এর পরিবর্তন গুলো চোখে পড়ে। যেমন পরিবর্তন বাড়িঘর রাস্তাঘাটের তেমন পরিবর্তন মানুষেও। কসমোপলিটান ঢাকায় লেগেছে পশ্চিমের বাতাস। তাইতো মনে হয় কখনো। তুমিই তো বল -- অতীত এক ভিনদেশ। আমারও বার বার ঢাকায় এসে সে কথা মনে হয়।


মোজাফফর হোসেন--
একটা বিতর্ক বেশ শক্তভাবে চলমান, সেটা হল, যারা অধিবাস থেকে জন্মভূমি নিয়ে লেখেন তাঁদের লেখায় ঐ দেশের ইতিহাস ও সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থানের বিকৃতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা থাকে। রুশদি অবশ্য বলছেন, দূর থেকেই প্রকৃত সত্য লেখা সম্ভব। কারণ তখন প্রভাবিত হওয়ার কিছু থাকে না, আবেগশূন্যভাবে লেখা যায়। এই সম্পর্কে আপনার অভিমত কি?


সালেহা চৌধুরী--
 আমি সালমান রুশদির সঙ্গে একসমত। দূর থেকে অনেক নিরপেক্ষ ভাবে লেখা যায়। রুশদিও কিন্তু খুব বেশি ম্যাজিক রিয়ালিজমে বিশ্বাসী। ওর ‘মিডনাইট চিলড্রেন’ তো ওই জিনিসে পরিপূর্ণ। আমি এত বেশি ব্যবহার করি না। আমার ডোজ একটু কম। দূরে গেলেই তবে দেখা যায় একটি জিনিসের পরিপূর্ণ ছবি। সমগ্র ছবি। যখন সে চিন্তায় কেউ কোন প্রভাব ফেলতে চেষ্টা করে না। কোন বিকৃতির অভিযোগ পাইনি। মনে হয় আমি সঠিক পথেই চলেছি।


মোজাফফর হোসেন--
এবছর তো আপনার নির্বাচিত গল্প ইংরেজি অনুবাদে প্রকাশিত হল Writers Ink  থেকে। নাম Spiders and other Stort stories। এই সংকলনটি নিয়ে জানতে চাচ্ছিলাম। অনুবাদ কারা করেছেন? এবং তার মান নিয়ে আপনি সন্তুষ্ট কিনা?

সালেহা চৌধুরী--
 এখানে চৌদ্দটি গল্পের অনুবাদ করেছেন -- নিয়াজ জামান, সাব্রিনা আহমেদ, জ্যাকি কবির,মাশরুফা আয়েশা নুসরাত, শাহরুখ রহমান এবং আমি নিজে। পুরোটা বই সম্পাদনা করেছেন নিয়াজ জামান। ‘রাইটার্স ইংক’ আগেও বেশ কয়েক জন লেখকের গল্প অনুবাদ করে বই করেছে। আমার বিশ্বাস নিয়াজ জামানের ইংরাজি ভাষার উপর দখল প্রশ্নাতীত। আমি বই নিয়ে আশাবাদী। মানের কথা অন্যরা বলবে। আমি বইটি হাতে নিয়ে খূশী। এ এক নতুন অনুভব। যেন আমার সন্তান এবার সুটকোটে একেবারে অন্য একজন।


মোজাফফর হোসেন--
 আপনি নিজে যেহেতু অনুবাদক। আপনার কাছে জানতে চাই, বাংলাদেশের অনুবাদ সাহিত্য নিয়ে আপনার অভিমত কি? সেইসঙ্গে বাংলা সাহিত্যের ইংরেজি অনুবাদ হয় না বা হলেও খুব দুর্বল বলে অনেকে আক্ষেপ করেন। আপনি কি মনে করেন?

সালেহা চৌধুরী--
বাংলা দেশের অনুবাদ বাংলা থেকে ইংরাজির পরিমাণ খুব বেশি নেই। তবে যেগুলো হয়েছে সবগুলো যে ভালো এক কথায় বলা যাবে না। প্রথম কথা এ ভাষা আমাদের মাতৃভাষা নয়। দ্বিতীয় কথা এই ভাষার যে সব পরিবর্তন হয় বা হচ্ছে সে সবের সঙ্গে আমরা পরিচিত নই। তা ছাড়া অনেকসময় ব্যকরণ গত ভুলও লক্ষ্যগোচর হয়। কিন্তু নিয়াজ জামানের মত দক্ষ মানুষ এবং আরো যারা এই বিষয়ে দক্ষ তাঁদের কাছ থেকে কাজ আদায় করে নিতে হবে। এ না হলে আমাদের সাহিত্য বিশ্বের দরবার পৌঁছাবে না। ভাবোতো যদি কোনদিন গীতাঞ্জলির অনুবাদ না হতো? আর ইংরাজি থেকে বাংলার অনুবাদে কিছু ভালো কাজ আছে আবার কিছু যাচ্ছে তাই কাজ আছে। আমি নিজে বিশটি বই অনুবাদ করেছি। এর মধ্যে চারশো উনিশ পাতার ‘ট্র হিস্ট্রি অব কেলি গাং’ নামে পিটার কারির একটি বই অনুবাদ করেছি। আমার বাংলা অনুবাদে পাতার সংখ্যা ৪১৭। কিন্তু এই বই এখান থেকে একজন অনুবাদ করেছেন তার পাতার সংখ্যা দুশো পঞ্চাশ। তিনি অবলীলাক্রমে বাদ দিয়েছেন এবং কোনো খানে তার উল্লেখ করেননি। কোন জায়গা কঠিন মনে হলেই তা বাদ দেবার প্রবণতা লক্ষ করেছি। স্বাধীন অনুবাদ বা সংক্ষিপ্ত অনুবাদ হতে পারে তবে তা প্রথমেই বলা ভালো। আশার কথা এই ইংরাজি থেকে বাংলার অনুবাদে বেশ কিছু ভালো বই দেখেছি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন