সোমবার, ২৫ এপ্রিল, ২০১৬

সৈয়দ শামসুল হক | বর্ণনা থেকে সংলাপকে আলাদা করা


আমরা গল্প উপন্যাস যখন পড়ি তখন আমরা বর্ণনার ভেতরে সংলাপের অবস্থানগুলো স্পষ্ট করে বুঝতে চাই। এই বোঝানোর দায়টা লেখকেরই। কাজটা সারবার বেশ কয়েকটি কৌশল আছে। মূলে তারা একই বটে, ডালপালায় ভিন্ন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কপালকুন্ডলা উপন্যাস থেকে অণুগল্পের স্বাদ-লাগা একটি অংশ করে কৌশলের ব্যাপারটা দেখি না কেন - নবকুমারের সঙ্গে এক সুন্দরী সাক্ষাত হলো পান্থনিবাসে।


সুন্দরী নবকুমারের চক্ষু নিমেষশূন্য দেখিয়া কহিলেন, “আপনি কি দেখিতেছেন, আমার রূপ?”

নবকুমার ভদ্রলোক, অপ্রতিভ হইয়া মুখাবনত করলেন। নবকুমারকে নিরুত্তর দেখিয়া অপরিচিতা পুনরপি হাসিয়া কহিলেন,“আপনি কখনও কি স্ত্রীলোক দেখেন নাই, না আপনি আমাকে বড় সুন্দরী মনে করিতেছেন? --"

সহজে এ কথা কহিলে, তিরষ্কারস্বরূপ বোধ হইত, কিন্তু রমণী যে হাসির সহিত বলিলেন, তাহাতে ব্যঙ্গ ব্যতীত আর কিছুই বোধ হইল না। নবকুমার দেখিলেন, এ অতি মুখরা। মুখরার কথায় কেন না উত্তর করবেন - কহিলেন,

“আমি স্ত্রীলোক দেখিয়াছি, কিন্তু এরূপ সুন্দরী দেখি নাই।"

রমণী সগৰ্ব্বে জিজ্ঞাসা করিলেন, "একটিও না .

" নবকুমারের হৃদয়ে কপালকুন্ডলার রূপ জাগিতেছিল, তিনিও সগৰ্ব্বে উত্তর করিলেন, “একটিও না, এমত বলিতে পারি না।”

উত্তরকারিণী কহিলেন, “তবুও ভাল। সেটি কি আপনার গৃহিণী?"

নব। ''কেন? গৃহিণী কেন মনে ভাবিতেছ?''

স্ত্রী। ''বাঙ্গালীরা আপন গৃহিণীকে সৰ্ব্বাপেক্ষা সুন্দরী দেখে।''

নব। ''আমি বাঙ্গালী, আপনিও ত বাঙ্গালীর ন্যায় কথা কহিতেছেন, আপনি তবে কোন দেশীয়?”

যুবতী আপন পরিচ্ছদের প্রতি দৃষ্টি করিয়া কহিলেন, “অভাগিনী বাঙ্গালী নহে, পশ্চিমদেশীয়া মুসলমানী।” নবকুমার পর্যবেক্ষণ করিয়া দেখিলেন, পরিচ্ছদ পশ্চিমদেশীয়া মুসলমানীর ন্যায় বটে। কিন্তু বাঙ্গালা ত ঠিক বাঙ্গালীর মতই বলিতেছে। ক্ষণপরে তরুণী বলিতে লাগিলেন,

“মহাশয় বাগবৈদগ্ধা আমার পরিচয় লইলেন-- আপন পরিচয় দিয়া চরিতার্থ করুন। যে গৃহে সেই অদ্বিতীয়া রূপসী গৃহিণী, সে গৃহ কোথায়?"

নবকুমার কহিলেন, “আমার নিবাস সঞ্জয়াম।"

বিদেশিনী কোন উত্তর করিলেন না। সহসা তিনি মুখাবনত করিয়া, প্রদীপ উজ্জ্বল করিতে লাগিলেন।

ক্ষণেক পরে মুখ না তুলিয়া বলিলেন, “দাসীর নাম মতি। মহাশয়ের নাম কি শুনিতে পাই না? "

নবকুমার বললেন, “নবকুমার শর্ম্মা।"

প্রদীপ নিবিয়া গেল ।


আমরা পরিষ্কার বুঝতে পারছি কে কোন সংলাপটি বলছে। বুঝতে পারছি প্রত্যেকটি সংলাপের আগে পরে দুটি করে “ উর্ধ্বকমার স্থাপন দেখে। সংলাপের এটাই অনেক পুরনো একটি নিয়ম— সংলাপ থাকবে উর্ধ্বকমার ভেতরে। তবে বঙ্কিমচন্দ্রের কলমে, তার পরেও অনেক লেখকের, এবং এখনো কারো কারো কলমে, দুটি উর্ধ্বকমার ব্যবহার থাকলেও, ক্রমে তা একটিতে এসে দাড়িয়েছে-- যেমন ওপরের একটি অংশ এরকম হতে পারতো : ‘মহাশয় বাগবৈদগ্ধে আমার পরিচয় লইলেন- আপন পরিচয় দিয়া চরিতার্থ করুন। যে গৃহে সেই অদ্বিতীয়া রূপসী গৃহিণী, সে গৃহ কোথায়?’

নবকুমার কহিলেন, “আমার নিবাস সপ্তগ্রাম।"

আবার, এরকমও লেখা হতে পারে সংলাপ– উর্ধ্বকমা ছাড়াই :

সুন্দরী, নবকুমারের চক্ষু নিমেষশূন্য দেখিয়া কহিলেন, আপনি কি দেখিতেছেন, আমার রূপ?

নবকুমার ভদ্রলোক অপ্রতিভ হইয়া মুখাবনত করলেন। নবকুমারকে নিরুক্তর দেখিয়া অপরিচিতা পুনরপি হাসিয়া কহিলেন, আপনি কখনও কি স্ত্রীলোক দেখেন নাই, না আপনি আমাকে বড় সুন্দরী মনে করিতেছেন? এবং আমাদের কোনো অসুবিধেই হতো না কোনটি বর্ণনা আর কোনটি সংলাপ নির্ণয় করতে ।

আর একটি জিনিশ লক্ষ করি ওপরের এই অংশে--অপরিচিতা হেসে যে কথাটি বলেছেন, আপনি কখনও কি স্ত্রীলোক দেখেন নাই, না আপনি আমাকে বড় সুন্দরী মনে করিতেছেন?বঙ্কিমচন্দ্র এই সংলাপটি দিয়েছেন বর্ণনা-বাক্যের পরের লাইনে। না দিলেও চলতো। এখনো অনেক লেখক এ রকম লেখেন--বর্ণনা-বাক্যের পরের লাইনে সংলাপ লেখেন; আমি মনে করি, এটা বোধহয় তারা করেন রচনার লাইন বাড়াবার জন্যে, বইয়ের পাতা বাড়াবার জন্যে। বঙ্কিমচন্দ্র, আমার মনে হয়, সে উদ্দেশ্যে পরের লাইনে এ সংলাপ লেখেন নি, এমন লিখলে তিনি সব সংলাপই বর্ণনা-বাক্যের পরের লাইনে লিখতেন। আমি মনে করি, এই বিশেষ সংলাপটি আপনি কখনও কি স্ত্রীলোক দেখেন নাই, না আপনি আমাকে বড় সুন্দরী মনে করিতেছেন? -- এর ওপর বিশেষ একটা জোর দেবার জন্যে, ভাবের দিক থেকে কথাটা যে চমকপ্রদ ও আলাদা, এটা দেখাবার জন্যেই পরের লাইনে একে স্থাপন করেছেন।

সংলাপ বোঝাতে কেবল উর্ধ্বকমাই নয়, ড্যাশ-এরও ব্যবহার অনেকে করেন। যেমন, বঙ্কিমচন্দ্রের এই অংশকে উর্ধ্বকমা বাদ দিয়ে ড্যাশ সহযোগে লিখে দেখাই :

উত্তরকারিণী কহিলেন, তবুও ভাল। সেটি কি আপনার গৃহিনী?

—কেন? গৃহিণী কেন মনে ভাবিতেছ?

—বাঙ্গালীরা আপন গৃহিণীকে সৰ্ব্বাপেক্ষা সুন্দরী দেখে।

আমি বাঙ্গালী আপনিও ত বাঙ্গালীর ন্যায় কথা কহিতেছেন, আপনি তবে কোন দেশীয়?

চরিত্রের নাম উল্লেখ না করে ড্যাশ দিয়ে সংলাপ শুরু করার কৌশল এখনো অনেকেই ব্যবহার করেন। একসময় দেখেছি, বিশেষ করে আমি যখন লেখা শুরু করি তখন, এবং আমি নিজেও এ কৌশলটি প্রথম কিছুকাল ব্যবহার করেছি-- বক্তার চিহ্নহীন সংলাপ ডবল ফুটকি দিয়ে শুরু করা।

: কেন? গৃহিণী কেন মনে ভাবিতেছ?

: বাঙ্গালীরা আপন গৃহিণীকে সৰ্ব্বাপেক্ষা সুন্দরী দেখে।

: আমি বাঙ্গালী, আপনিও ত বাঙ্গালীর ন্যায় কথা কহিতেছেন, আপনি তবে কোন দেশীয়?

এ রীতি এখন একেবারে উঠেই গেছে বলে দেখতে পাই।


মুশকিল হয় একটা ক্ষেত্রে এসে-- যেখানে একই বক্তার সংলাপের মধ্যে তার কিছু বর্ণনা দেবারও দরকার হয়। ধরা যাক বঙ্কিমচন্দ্রের এই বাক্যটি : যুবতী আপন পরিচ্ছদের প্রতি দৃষ্টি করিয়া কহিলেন, “অভাগিনী বাঙ্গালী নহে; পশ্চিমদেশীয়া মুসলমানী।”—তিনি যদি মনে করতেন পরিচ্ছদের প্রতি দৃষ্টি করার বর্ণনাটি আনবেন অভাগিনী বাঙ্গালী নহে-র পরে, অতঃপর উচ্চারণ করাবেন পশ্চিমদেশীয়া মুসলমানী তাহলে কীভাবে লিখতেন - দেখা যাক :

“অভাগিনী বাঙ্গালী নহে", যুবতী আপন পরিচ্ছদের প্রতি দৃষ্টি করিয়া কহিলেন, “পশ্চিমদেশীয়া মুসলমানী।" এভাবেই কি? অথবা এভাবে-অভাগিনী বাঙ্গালী নহে, যুবতী আপন পরিচ্ছদের প্রতি দৃষ্টি কহিলেন, পশ্চিমদেশীয় মুসলমানী।

এখনকার চোখে পরিচ্ছন্ন দেখাবে দ্বিতীয়টি, এতে সন্দেহ নেই। এবং এটাই এখনকার লেখকদের কলমে আমরা পাই। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, টানা সংলাপের মাঝখানে কমা দিয়ে বর্ণনা লিখেও পার পাওয়া যাচ্ছে না। যেমন, মন থেকে বানিয়ে এবার একটা অংশ দেখাই :

তখন বন্ধুটি হেসে উঠে, আরে তোমার বোন রাজি বলেই তার হাত ধরে টান দিয়ে বললো, তুমি এখনি যেয়ো না। এই অংশে সংলাপের ওই প্রথম কমাটি যদি ছাপার কোনো কারণে বাদ পড়ে যায় তাহলে কী হয় । তখন বন্ধুটি হেসে উঠে, আরে তোর বোন রাজি বলেই তার হাত ধরে টান দিয়ে বললো, তুমি একটু দাঁড়াও তো! বোঝাই দুষ্কর হাত ধরে টান দিলো সংলাপের বক্তা, না তার বোন, আর দাঁড়াতেই বা বললো কে কাকে বন্ধুটি বললো সংলাপের উদ্দিষ্টকে না, বোন বললো তাকে যার কথায় সে রাজি!

বঙ্কিমচন্দ্র থেকে উদ্ধৃত অংশটুকু প্রথম পড়বার সময়েই আমাদের নজর হয়তো এড়ায় নি যে, একটা পর্যায়ে এসে বঙ্কিমচন্দ্র সংলাপের আগে নাম ব্যবহার করেছেন সংক্ষিপ্ত আকারে : উত্তরকারিণী কহিলেন, “তবুও ভাল। সেটি কি আপনার গৃহিনী?"

নব। কেন? গৃহিণী কেন মনে ভাবিতেছ?

স্ত্রী। বাঙ্গালীরা আপন গৃহিণীকে সৰ্ব্বাপেক্ষা সুন্দরী দেখে।

নব। আমি বাঙ্গালী আপনিও ত বাঙ্গালীর ন্যায় কথা কহিতেছেন, আপনি তবে কোন দেশীয়? --

বর্ণনা-বাক্যের যখন আর প্রয়োজন নেই, শুধু সংলাপই যখন মুখ্য, সংলাপের সেই অক্ষুন্ন ধারার ভেতরে বক্তা যেন হারিয়ে না যায়, পাঠক যেন গোলমালে না পড়ে, তখনই দরকার পড়ে এ কৌশলের। কিম্বা পড়তো- একদা সে দরকারটা পড়তো- রবীন্দ্রনাথও তার কোনো কোনো রচনায় এ দরকার বোধ করেছেন, কিন্তু শরৎচন্দ্র থেকে বাংলা কথাসাহিত্যের ছাপা পৃষ্ঠায় আর কখনোই নয়।

সংলাপের ধারা বর্ণনা-বাক্য বিনা দীর্ঘ হলে পাঠক খেই হারিয়ে ফেলতে পারে: পাঠকের ধন্দ লাগতে পারে কে কোন কথাটা বলছে। অনেক উপন্যাস পড়তে গিয়ে আমার নিজেরই এরকম হয়। আমি পিছিয়ে গিয়ে আঙুলে টিপ দিয়ে দিয়ে সনাক্ত করি কোন সংলাপটি কার। এই ধন্দ থেকে পাঠককে রেহাই দেবার জন্যে সব লেখকই একটা কৌশল করেন। দু'তিনটি সংলাপের পরই, যখন মনে হয় পাঠক খেই হারিয়ে ফেলছে, লেখক তখন সংলাপের আগে অনাবশ্যক কিন্তু আবশ্যক বাক্য বসান-- তখন অমুক বললো-- তার উত্তরে সে বললো- কিম্বা, কৌশলটা গোপন করবার জন্যে এরকম বাক্যও লেখেন- সে হেসে বললো-- তার উত্তরে মুখ ভার করে সে বললো-বা, সিগারেটে একটা টান দিয়ে বললো- চায়ের পেয়ালাটা নামিয়ে রেখে বললো-উদাস গলায় বললো ইত্যাদি ও ইত্যাদি। আমরা একটু সতর্ক হয়ে পড়ে দেখলেই আবিষ্কার করবো ওই হেসে বলা, উত্তরে বলা, সিগারেটে টান দিয়ে বলা, উদাস গলায় বলা--গল্পের যাত্রায় এরা মোটেই জরুরি ছিলো না।

সংলাপ লিখতে এখন আমি বেশ কিছুদিন থেকে উর্ধ্বকমা ব্যবহার করি না; বক্তার চিহ্নহীন সংলাপের আগে ড্যাশ বা ফুটকিও ব্যবহার করি না। চারদিকের আর সকলের লেখা পড়ে দেখি, সংলাপ আর বর্ণনা আলাদা করবার কৌশল কোনো একটিতে কারো কিছু স্থির নয়। আর তারপরেও আছেন প্রকাশকেরা, তারা অনেকেই আজকাল দেখি, লেখক লিখলেও, উর্ধ্বকমা বাদ দিয়ে দেন, ড্যাশ কেটে দেন, লেখা ছাপতে গিয়ে। আমি মনে করি, অর্থ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রেখে সংলাপ-চিহ্ন যত বাদ দেয়া যায় ততই আরাম পায় চোখ, ছাপা পৃষ্ঠাও নন্দনযোগ্য হয়ে ওঠে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন