সোমবার, ২৫ এপ্রিল, ২০১৬

শামসুজ্জামান হীরা'র গল্প | বায়োগ্রাফি

বছর পাঁচেক তো হলই রিটায়ারমেন্টে গেছেন তিনি। সরকারের সর্বোচ্চ পদে আসীন ছিলেন চাকরির শেষের দিকে ক’বছর । ডাকসাইটে আমলা হিসাবে তিনি ছিলেন অনেকেরই ঈর্ষার পাত্র। দীর্ঘদেহী, গৌরকান্তি, এক কথায় নজরকাড়া দেহসৌষ্ঠব। চাকরিজীবনের প্রারম্ভ থেকেই স্ট্রিক্ট ডিসিপ্লিন্ড লাইফ লিড করে আসছেন। সূর্য পূর্বাকাশে মুখ তুলবার আগেই মর্নিং-ওয়াক, তারপর ঘন্টা খানেক ফ্রিহ্যান্ড এক্সারসাইজ, ক্যালরি মেপে ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ, ডিনার — রাত এগারটায় ঘুম। এ রুটিনের নড়চড় নরম্যালি ঘটে না। সন্ধ্যা গড়াতেই পরিমিত মদ্যপান, ঘরেই থাকুন আর বাইরে। গেস্ট এলে হাল্কা, কখনও-বা সিরিয়াস বিষয় নিয়ে আড্ডা।


এখন বিরাট এক কনসালটিং ফার্মের টিম লিডার। সরকারি চাকরির চেয়ে এখন তাঁর আয় বহুগুণ বেশি।

রাজধানী শহরের পশ এলাকায় দশ কাঠা প্লটের ওপর প্রাসাদোপম বাড়ি। নামকরা আর্কিটেক্ট দিয়ে ডিজাইন-করা বাড়িটি আশপাশের বাড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে যেন মুখ টিপে টিটকারি দেয়, তোদের শরীরে পয়সার ভার আছে, কিন্তু রুচির বেলায় কচু! সম্মুখে লন, মখমলের মত হরিৎ দূর্বাঘাস-মোড়া লনটি শৈল্পিক নৈপুণ্যে সাজানো বিভিন্ন অর্নামেন্টাল প্ল্যান্ট, দেশিবিদেশি ফুলগাছ আর পাতাবাহার-ক্যাকটাস দিয়ে। আঙিনার সাথে ম্যাচ করে লাগানো পাম ট্রি। শুধু পশ্চিম কোণে, একটু যেন বেখাপ্পা ভাবেই দাঁড়ানো একজোড়া নারকেলগাছ।

বাড়িটার যতগুলো রুম তার যোগফলের প্রায় সমান আয়তনের ড্রয়িং-কাম-ডাইনিং রুম। বিদেশি দামি কার্টেন দিয়ে পার্টিশন দেওয়া। প্রয়োজন পড়লে দুটোকে এক করে শ’খানেক লোকের আসর বসানো যায় হেসেখেলে।

যখন চাকরিতে ছিলেন তখনও সরকারি বাসায় সপ্তাহে দু’তিন দিন আড্ডা বসত। উইকএন্ডে তো কথাই নেই। থার্টিফার্স্ট বা অন্য কোনও অকেশনে সে কী জম্পেশ আড্ডা! তবে অসুবিধা ছিল লোক আটানো নিয়ে। সরকারি বাসার ড্রয়িংরুম তো আঁটসাঁট — ওয়ার্থলেস! তখন থেকেই বিষয়টি মাথায় রেখেছিলেন শাজাহান আলী আর রিটায়ারমেন্টে যাওয়ার বছর পনের আগে যখন নিজবাড়ি বানাবার চিন্তা মাথায় আসে তখন পরামর্শটা দিয়েছিলেন স্থপতিকে।

শাজাহান সাহেব ঝানু আমলা, বহু বিষয়ে পণ্ডিত, বুদ্ধির জাহাজ — তারপরও সামান্য হিসাবের গোলমাল। অবসরজীবন কাটাতে যে গৃহে তিনি আশ্রয় নেবেন সে গৃহের পরিকল্পনার সময়, সময় নামক মাত্রাটির চিন্তা তাঁর অতি তুখোড় মাথায়ও ঢোকেনি। তিনি চল্লিশ থেকে পঞ্চাশের কোঠার বয়সটাকে নিত্য জ্ঞান করেছিলেন এবং সেই সঙ্গে ওই বয়সের উদ্দামতা, প্রাণচাঞ্চল্যকেও। এখন এই বিশাল ভবনে বসবাসের প্রাণী তিনি আর তাঁর স্ত্রী লুৎফুন্নেসা। একমাত্র পুত্র ডেনমার্কে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে এলিজা নামের এক বান্ধবীর সঙ্গে, — লিভিং টুগেদার। দু’কন্যার একজন স্টেটস্-এ, অন্যটি সুইডেনে। পৌঢ় দুই মানব-মানবীর সেবাযত্ন করবার, ফাইফরমাশ খাটবার জন্য অবশ্য নারী-পুরুষ মিলিয়ে রয়েছে জনাপাঁচেক। গার্ড-গার্ডেনার-মেইড-ড্রাইভার-কুক...।

বিশাল প্রাসাদ এখন বেশির-ভাগ সময় খাঁ খাঁ করে। কালেভদ্রে এখনও পার্টি যে বসে না তা নয়। মাঝেমধ্যে পুরনো বন্ধুরা আসেন — ড্রিংকস্ চলে, চলে ডিনার। এখন পার্টি হলে অনেক সময় সময়ের রাশ কিছুটা ঢিলে হয়ে যায়। বেডে যেতে দেরি হয়। বুড়োদের আসর শুরু হয় দেরিতে, ভাঙেও দেরিতে। আসরের শেষ প্রান্তে অতিথিদের আচরণে বিচিত্র ভাবভঙ্গি লক্ষ করা যায়। কোনও কবি হয়তো হোঃ হোঃ হাসেন আর পছন্দের কোনও স্বরচিত কবিতার পঙক্তি জিবজড়ানো উচ্চারণে উচ্চকণ্ঠে আবৃত্তি করেন, দুনিয়ার তাবৎ কবির গুষ্টি উদ্ধার করেন, তাঁরা যে আসলে কবিতা কী তা-ই বোঝেন না, তা বোঝাতে হাত পা নেড়ে চেঁচান, কেউ কেউ নিজের অতীত-স্মৃতির জাবর কাটেন জবর উৎসাহে — রাজাউজির মারেন অনবরত। কেউ পুরনো দিনের গান ভাঙা রেকর্ডের মত বারবার গেয়ে যান। আরও কত কী — পার্টিতে এ রকম হয়েই থাকে। পার্টি ইজ পার্টি, কেউ আমল দেয় না।

শাজাহান আলীর স্ত্রী লুৎফুন্নেসার এখন একদম পছন্দ নয় এসব কিছু — কখনও যে ছিল তাও নয়, কিন্তু কী করবেন; জীবনের আটত্রিশ বছর, না কি বেশি, এই ভদ্রলোকটির সঙ্গে বসবাস করে গা-সওয়া হয়ে গিয়েছে সবকিছু। ওঁর বয়স তখন কতই বা, একুশ, বাপ-মা তুলে দিলেন সাতাশ-আটাশ বছর বয়সের তরুণ অফিসার শাজাহানের হাতে। চাকরির প্রথম দিকে আর্থিক টানাটানি থাকলেও দাম্পত্যসুখে ঘাটতি ছিল না। এমন কি যখন চাকরির মাঝামাঝি সোপানে তখনও শাজাহান আলীর বন্ধুদের কেউ কেউ মুচকি হেসে মশকারা করতেন, কী রে অ্যালি, বয়স তো কম হল না, এখনও ভরদুপুরে বেডরুম থেকে কীসব শব্দ শোনা যায়; গুড গুড ক্যারি অন...

লুৎফুন্নেসা, সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে-আসা সাদাসিধে মহিলা। স্বামীর পদতলে জান্নাত, যার পাদদেশে সুশীতল নদী প্রবাহিত, ছোটকাল থেকে এ জাতীয় এক বিশ্বাসে অটল তিনি। রাত করে ঘরে-ফেরা স্বামীর শার্টের কলারে লাল রঙের ছোপ দেখে আঁতকে উঠতেন — কেটেকুটে গেল না তো! তিনি এখন সময় কাটান পোষা কাকাতুয়া আর ময়না দুটোর যত্ন নিয়ে, ওদের সঙ্গে কথা বলে, লনে ঘুরে ঘুরে ফুলগাছের গায়ে আলতো হাত ছুঁইয়ে, বাড়ির পেছনের ওপেন ইয়ার্ডে জড়ো-হওয়া শালিক, চড়ুই আর কাকদের আধার দিয়ে, বিদেশে বসবাসরত সন্তানদের সঙ্গে সময় সময় টেলিফোনে কথা বলে এবং হাতেগনা ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে মাঝে মাঝে কখনও-বা ফিক্সড, কখনও-বা মুঠোফোনে আলাপ করে এবং টেলিভিশনে পছন্দের চ্যানেল দেখে আর সিডিতে রবীন্দ্রসংগীত ও পুরনো দিনের গান শুনে। চিন্ময় এবং হেমন্ত ওর খুব ফেভারিট সিংগার।





–হ্যাঁ, যা বলছিলাম, আমার চাইল্ডহুড, এমনকি ইউথটাও খুব হার্ডশিপের মধ্যে কেটেছে, — তুমি বিশ্বাস করবে না... একটু দম নেন শাজাহান আলী। হুইস্কির গ্লাশে সিপ্ করেন, বেনসনের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট ঠোঁটে এঁটে সোনালি লাইটারের নীল আলোয় তা ধরান।

–জি। এই জি বলার তেমন কোনও তাৎপর্য বা অর্থ নেই। সম্মানীত ব্যক্তিদের কথার ফাঁকে এ-ধরনের শব্দ ব্যবহারের রেওয়াজ বহুদিনের। এই সংক্ষিপ্ত শব্দ ব্যবহারে শুধু বোঝানো হয়, গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে শোনা হচ্ছে। নিজের গ্লাশে আলতো ঠোঁট ছোঁয়ায় আরিফ — শামসুল আরেফিন জোয়ার্দার। আরিফ পত্রিকায় গল্প-প্রবন্ধ লেখে। কলমে জোর আছে। ‘সমকালীন সাহিত্য-সংস্কৃতির ওপর গোলকায়নের প্রভাব’ — আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থটি রাতারাতি ওকে বুদ্ধিজীবী গোত্রভুক্ত করে তুলেছে। একটা এনজিওতে কাজ করে। বেঁটেখাটো হ্যাংলা পাতলা পঞ্চাশোর্ধ্ব লোক। শাজাহান আলীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা মাস ছ’সাতেক থেকে। শাজাহান আলীর কনসালট্যান্সি ফার্ম যখন ইউয়েনডিপির ফান্ডে উইমেন এমপাওয়ারমেন্টের ওপর এনজিওদের নিয়ে কাজ করছিল তখনই আরিফের সঙ্গে তাঁর পরিচয়। ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠতা। কিছুদিন আগে আরিফ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে শাজাহান আলীর কাছে তাঁর বায়োগ্রাফি লেখার প্রস্তাব রেখেছিল, আর প্রস্তাবটা খুবই মনে ধরেছিল শাজাহান আলীর। নিজের ঢোল পেটানো তিনি খুবই ডিজলাইক করেন, কিন্তু মনে করেন তাঁর বায়োগ্রাফি লেখা হলে অনেকের কল্যাণ হবে — বিশেষ করে ফিউচার জেনারেশনের।

ড্রইংরুমের ডোরবেল বেজে ওঠে। সিকিউরিটি গার্ড এসে জানায়, –স্যার দুজন লোক দ্যাখা করতে চায় — আপনার দ্যাশের লোক...

–বলে দাও এখন দ্যাখা হবে না। ননসেন্স, অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেই, হুট করে চলে আসে। বিরক্তিভরা কণ্ঠে বলে ওঠেন শাজাহান আলী।

–জি, এরা সময় অসময় বোঝে না... ... পটেটো চিপস্ মুখে পুরতে পুরতে বলে আরিফ।

দারোয়ান যেতে উদ্যত হতেই শাজাহান হেঁকে ওঠেন, – অ্যাই শোনো, ওদের আসতে বল..., দেশের লোক, আফটার অল দেশের লোক...

আড়ষ্ট ভাব নিয়ে ঘরে ঢোকে দু’জন লোক।

–কেমন আছো বলো..., দেশের খবর কী একলাস মিয়া, বসো, সোফার দিকে ইঙ্গিত করে বলেন শাজাহান আলী।

–আল্লার রহমতে, আপনাগরের দোআয় এই একরকম আছি ভাইজান, লোকটার থুতনিতে একগুচ্ছ পাতলা দাড়ি, মাথায় টুপি, বসতে বসতে বলে, আপনার শরীরস্বাস্থ্য ক্যামন ভাইজান?

মাইনুদ্দিনকে ইতিমধ্যে মেহমানদের জন্য নাস্তাপানির ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে। জমে-ওঠা আসরে কী উটকো ঝামেলা, আরিফের চোখেমুখে বিরক্তির প্রচ্ছন্ন আভাস।

–পরিচয় করিয়ে দেই আরিফ — একলাস আমার ছোট ভাই আর ওর সাথে এই যে কী জানি নাম তোমার?

–আফজাল, কাঁচুমাচু করে বলে এখলাসের পাশে বসা লোকটা।

–হ্যাঁ, আফজাল আমার ভাস্তে...

–জরুরি কাজেই আপনার কাছে আসলাম ভাইজান। আফজাল আইএ পাশ কইরা বেকার। আমার অবস্থা তো জানেনই...ওর একটা চাকরির ব্যবস্থা...

–কোথাও অ্যাপ্লাই করেছে?

–জি। আফজাল একপাতা কাগজ খুব তমিজের সঙ্গে শাজাহান আলীর হাতে তুলে দিয়ে বলে, নাটোর ডিসি অফিসে এমএলএসএসের চাকরি...

–তোমাদের নিয়ে এই হল প্রবলেম! একটু লেখাপড়া শিখলেই চাকরি, তা সুইপারের হোক বা কেরানির, চাকরি ছাড়া কি আর কোনও পথ নেই ভালোভাবে বেঁচে থাকার?

আফজাল মাথা নিচু করে বসে থাকে।

–ঠিক আছে নাটোরের ডিসিকে বলে দেব। ক’দিন আগেও ফোনে কথা হয়েছে, ভালো অফিসার...

একলাসের চেহারায় স্বস্তির ছাপ; প্রসঙ্গ পাল্টে বলে, কথাটা বলা আমার কত্তব্য মনে করি। আপনার গেরামের ভিটাবাড়ি, জোতজমি সব কিন্তু বেদখল হওনের পথে। একটু খেয়াল করা দরকার ভাইজান...।

–আমি জানি, ঠিক আছে তোমরা এখন তাহলে এসো...জরুরি একটা কাজে ব্যস্ত আছি...

লোক দু’জন চলে যাওয়ার পর শাজাহান বলেন, এরা আমার গ্রামের লোক। একসময় এদের যথেষ্ট প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল, স্বভাব দোষে এখন এই হাল। আমাকে জমিজমার ব্যাপারে সাবধান করে! ভিটেবাড়ি-জমিজমা তো পড়েই রয়েছে, গরিবরা খাচ্ছে খাক। আমি নিজেই তো ওদেরকে বসিয়ে দিয়ে এসেছি। উঠে যেতে বললেই যাবে। গরিবরা মেরে খায় না — ওরা আমাদের মতো ভদ্দরলোকের চেয়ে অনেক ভালো — অনেস্ট...

আরিফ সম্মতিসূচক মাথা নাড়ে।

–কতজনকে তো টেনে তুললাম, ক’জন মনে রেখেছে, বলো? অতি ঘনিষ্ঠ এক ব্যবসায়ী...থাক্ ওসব কথা। চলো, স্টাডিতে গিয়ে বসি, ওখানটা নিরিবিলি, (একটু থেমে) অ্যাই মাইনুদ্দিন এগুলো স্টাডিতে নিয়ে রাখ।

ছিমছাম স্টাডি। এনসাইক্লোপিডিয়া, স্টাডি ডকুমেন্ট, রিসার্চ ওয়ার্ক, দামি দামি রেফারেন্স বইতে বুকশেল্ফ ঠাসা। স্টাডিতে দুটো ওপেনিং, একটা ড্রয়িংরুমের সাথে অন্যটি ড্রেসিংরুমের। ড্রেসিংরুম পেরিয়ে মাস্টার বেড। রিমোট টিপে প্লিট এসি ছেড়ে দিয়ে সুদৃশ্য টেবিলের একদিকে কুশন চেয়ার টেনে বসলেন শাজাহান আলী। খানিকটা জড়সড় আরিফ আরেকটি চেয়ার টেনে নিয়ে বসল। মাইনুদ্দিন ছোট টেবিলের ওপর রাখল ড্রিংক্স আর ট্রেতে সাজানো খাবারের প্লেট।

–তোমারটা কি শেষ? নাও নিজেই ঢেলে নাও... আরিফের গ্লাশের দিকে আঙুলের ইশারা করে বলেন শাজাহান আলী।

–থ্যাঙ্ক ইউ স্যার, গদগদ আরিফ। ব্ল্যাক লেবেলের মুখ তার গ্লাশে ঠেকিয়ে দু’আঙ্গুল পরিমাণ ঢেলে নেয়। তারপর বলে, আপনাকে দেব, স্যার...?

–নো, থ্যাঙ্কস, আমি খুব মেপে খাই..., তা যা বলছিলাম, আমার জীবনী লেখা হলে তা অনেকের উপকারে আসবে। এই যে আজকের আমি, একজন সফল মানুষ, সমাজের গুণীজন কে না চেনে আমাকে? তুমি কী বলো, বাড়িয়ে বলছি? অ্যাম আই এগজাজারেটিং...?

–কী যে বলেন স্যার, প্রেসিডেন্ট, পিএম থেকে শুরু করে ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট, ইনটেলেকচুয়াল কে না কদর করে আপনার... একটু জড়ানো গলা আরিফের।

–হ্যাঁ, তবে কিছু লোক যে নেই আড়ালে আবডালে আমার বদনাম করে, তা নয়। যাদের উপকার করেছি তাদের মধ্যেই এদের সংখ্যা বেশি। একটু আগে বলছিলাম না, এক ব্যবসায়ী, নাম বলব না, তুমি চিনে ফেলবে; যখন ক্ষমতায় ছিলাম আঠার মতো লেগে থাকত — এ-তদবির ও-তদবির। একবার তো ব্যবসায় ধরা খেয়ে ছেলেপুলে নিয়ে পথে বসবার জোগাড়, এমনভাবে ধরল যে ঠিক থাকতে পারলাম না। কর্জটর্জ করে টাকা গুছিয়ে তুলে দিলাম ওর হাতে। ভোজবাজির মত ওর অবস্থার পরিবর্তন হতে থাকল। তারপর ইলেকশনে কোটি টাকা খরচ করে নমিনেশন ক্রয়, দল ক্ষমতায় গেলে স্টেট মিনিস্টার, কী ব্যাপার, ওভাবে তাকিয়ে আছো ক্যানো, বিশ্বাস হচ্ছে না?

–কিছুটা তো তাই স্যার, তারপর?

হুইস্কির গ্লাশটা টেবিলে রাখতে রাখতে বলেন শাজাহান আলী, তারপর? একদিন ওর সরকারি বাসায় গিয়েছিলাম দেখা করতে। ড্রয়িংরুমে দু’ঘন্টা বসে থেকেও দেখা মেলেনি, দু’বার স্লিপ দিয়ে জবাব পেয়েছি, মন্ত্রী মহোদয়ের শরীর ম্যাজম্যাজ করছে — আজ দেখা হবে না।

স্টাডি আর ড্রেসিংরুমের মাঝবরাবর অ্যালুমিনিয়াম স্লাইডিং ডোরটা খটাস্ করে খুলে গেল। পৌঢ়া এক মহিলা তীর্যক দৃষ্টিতে তাকিয়ে খনখনে গলায় বলে উঠলেন, –মোবাইলটা ড্রইংরুমে ফেলে এসেছিলে কোন দুঃখে, ধরো...

কিঞ্চিৎ বিব্রত শাজাহান আলী জিজ্ঞেস করেন, –কে?

–কে, তা আমি কি জানি?

উৎফুল্ল মুড কিছুটা থিতিয়ে পড়ে। মোবাইলে কান ঠেকিয়ে বলেন, –হ্যালো, ওলায়কুম আস্ সালাম, হাফসা? হ্যাঁ ভালো আছি; পরে কথা হবে’খন, এখন আমি অফুলি বিজি... সরি...। ঠক করে ফোল্ডেড সেটটা বন্ধ করে ক্রুদ্ধ শাজাহান গজরাতে থাকেন, এই সমস্যা ওই সমস্যা — টাকার গাছ লাগিয়েছি নাকি আমি? দিলো তো মুডটা অফ করে — ন্যাস্টি উইম্যান...!

ড্রেসিংরুমের খোলা দরজা ডিঙিয়ে আরিফের দৃষ্টি গিয়ে ঠেকে একসারি ঝকঝকে জুতো আর স্যান্ডেলের ওপর। কত জোড়া হবে, অনুমান করাও কঠিন। এত জুতো-স্যান্ডেল দোকানের শোকেস ছাড়া কোনও বাসায় কল্পনাও করা যায় না।

–ডোন্ট মাইন্ড, ডোরটা লাগিয়ে দাও।

–দ্যাটস্ নো ম্যাটার..., উঠে গিয়ে দরজাটা ঠেলে লাগিয়ে দেয় আরিফ।

শাজাহান আলী মোবাইলের কি-প্যাডে দ্রুত আঙুল চালিয়ে কানের কাছে সেট ধরে বলতে থাকেন, সরি হাফসা, এক্সট্রিমলি সরি। রাগ করেছ? বিশ্বাস করো, আসলেই খুব ব্যস্ত...। ধ্যাৎ পাগলি, কীযে বলে; তোমাকে অবহেলা, এধরনের চিন্তা মাথায় আসে কী করে? দু’এক দিনের মধ্যেই যাব তোমার ওখানে, ঠিক আছে? রাখি সোনামণি?..

গ্লাশে এক পেগ পরিমাণ হুইস্কি ঢেলে নিয়ে শাজাহান আলী বলে চলেন, জানো আরিফ, অতি সাধারণ কিন্তু সম্পন্ন এক কৃষক পরিবারে আমার জন্ম। কত সালে তা সঠিক বলতে পারব না; তবে আমার জন্মের বছর যে সব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার বিবরণ বাবা-মার মুখে শুনেছি তাতে মনে হয় ১৯৩৮-এর দিকে; সার্টিফিকেটে অবশ্য ১৯৪১। যখন ছোট, বাপের সাথে খেতে নিড়ানি দিতে গেছি, পোলো আর খেপজাল দিয়ে বাড়ির সামনের বিলে মাছ ধরেছি; ও হ্যাঁ আমার আদি নিবাসের বৃত্তান্তই তো দেওয়া হয়নি তোমাকে — নাটোরের সিংড়া। গ্যাছো কখনও সিংড়া? কী ছবির মত গ্রাম। দিগন্তবিস্তৃত ফসলের খেত। চলনবিল, বর্ষায় আদিগন্ত থৈ থৈ জল, সমুদ্র যেন ...আহ্...।

তো একবার ভয়াবহ ন্যাচারাল ডিজাস্টারে আমাদের ফসল, বাড়িঘর সব লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল। দুবেলা অন্ন জোটানোই কঠিন। তখন সবে আমি ক্লাশ নাইনে। বাপ এটা-ওটা কাজ করে যা পায় তাতে খুব কষ্টে একবেলা-আধবেলা পেটে দানা-পানি জোটে। আমার পড়াশোনা বন্ধ। এমনই যখন অবস্থা তখন মাথায় অদ্ভুত এক বুদ্ধি এল আমার। এ-বাড়ি ও-বাড়ি থেকে ডাব সংগ্রহ করে নিয়ে চলে যেতাম নাটোর শহরে। ভাল দামেই বিক্রি হত। লাভের পয়সায় কোনওমতে পড়াশুনা চালু করলাম আবার। ছাত্র হিসাবে বরাবরই ক্লাশে ফার্স্ট। ম্যাট্রিক পরীক্ষাতে খুবই ভাল রেজাল্ট করলাম। কিন্তু তারপর? তখন তো আর মফস্বলে কলেজ ছিল না আজকালকার মতো।

শাজাহান আলীর অকপট খোলামেলা বয়ানে বিস্মিত আরিফ। এত উঁচুতে উঠে কেউ এঁদো ডোবার দিকে তাকায় কখনও? মোবাইলের সুরেলা ধ্বনিতে শাজাহান আলীর কথায় ছেদ পড়ে। ফোন সেটটা তুলে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে নড়েচড়ে উচ্ছ্বাস মেশানো সুরে কলবলিয়ে ওঠেন, –গুড ইভিনিং, হ্যালো অ্যাবি?.... আই অ্যাম ফাইন...হাউ আর ইউ? নো নেভার, হাউ ক্যান আই ফরগেট দোজ ফ্যান্ট্যাসটিক মোমেন্টস্ ...? ইংরেজিতে বেশ ক’মিনিট আলাপ সেরে ওপরের ঠোঁটের ডান পাশটা উঁচিয়ে চুক্ শব্দ তুলে বললেন, –মেয়েটি ফিলিপিনো। মাস তিনেক আগে ফার্মের কাজে ফিলিপিন্স গিয়েছিলাম, তখন পরিচয়। কী যে চার্মিং গ্যার্ল... তোমাকে বোঝাতে পারব না। সিমপ্লি ওয়ান্ডারফুল...!

–ফিলিপিনো মেয়েরা খুব ইয়ে-ই হয়...

আরিফের কথা শাজাহান আলি কানে তুললেন বলে মনে হল না।

–হ্যাঁ, যা বলছিলাম, কী যেন বলছিলাম?

–কলেজে পড়বার কথা...

–ও হ্যাঁ, কলেজ, দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়র বাড়িতে জায়গির থেকে কলেজের পাট চুকালাম। তারপর নিঃসম্বল আমি শুধু মনের প্রচণ্ড জোর নিয়ে ভর্তি হলাম ঢাকা ভার্সিটিতে। তখনকার ঢাকা ভার্সিটি আর এখনকার, আকাশ-পাতাল ফারাক। নিরিবিলি সুনসান। ঢাকা শহরটাই তো ছিল গাছগাছালি ছাওয়া নিট এন্ড ক্লিন ছিমছাম শহর। কিছুটা ভিড়ভাট্টা ওই ইংলিশ রোড, ইসলামপুর, আরমানিটোলা, সদরঘাট — ওসব এলাকায়। ফাঁকা পথে রিকশা আর টাঙা মনের সুখে চড়ে বেড়াত।

–সফিসটিকেটেড, মানে সম্ভ্রান্ত আবাসিক এলাকা ছিল উয়ারি, রেঙ্কিন স্ট্রিট...

–তুমি জানো তাহলে, গুড। অতীত জানাটা খুবই ভালো — হুইস্কিতে চুমুক দিয়ে বলেন শাজাহান, –ভার্সিটিতে ভালো ডিপার্টমেন্টে চান্স পেয়ে গেলাম — ইকোনমিক্স। সাতান্ন সনের কথা। আর্টস্ ফ্যাকাল্টি তখন, এখন যেখানে ঢাকা মেডিক্যালের এমারজেন্সি...।

আবার অ্যালুমিনিয়াম ডোর খুলে গেল। সেই মহিলা, হাতে কর্ডলেস রিসিভার, চোখেমুখে বিরক্তির ছাপ, বললেন, –এই নাও, কী জ্বালা! মেয়েলোকগুলো কি মোবাইলে ফোন করতে পারে না?

–ডোন্ট বি সো ইরিটেটেড... তোমার এমনিতেই হাইপারটেনশন, মাইনুদ্দিনকে দিয়ে পাঠালেই তো হত..., মহিলাটি রুম ত্যাগ করতেই মুখ কুঁচকে চাপাস্বরে বলে ওঠেন জনাব শাজাহান, –একসেনট্রিক উইম্যান; (তারপর ফোনের রিসিভারের কাছে ঠোঁট নিয়ে) –শাজাহান স্পিকিং, কে? ও মনিকা। এক্সকিউজ মি ডার্লিং... আজ এক বিশিষ্ট, আই মিন প্রোলিফিক রাইটার আমার গেস্ট... এই তো সামনেই বসে আছেন। জানো উনি আমার বায়োগ্রাফি লিখতে খুবই আগ্রহী। বিলিভ মি, ইম্পর্ট্যান্ট এই অ্যাপয়েন্টমেন্টটার কথা তোমাকে বলতে একদম ভুলে গিয়েছিলাম, কাল ইনভেরিয়্যাবলি তোমাকে নিয়ে বেরুবো...। ওকে, মাই সুইট লিউনস্কি, হো হো হো... ...

আরিফ তার সম্পর্কে ব্যক্ত বিশেষণে যুগপৎ বিব্রত ও বিস্ময় বোধ করে। স্টাডির দেওয়ালে ঝোলানো নামিদামি আর্টিস্টদের পেইন্টিঙে চোখ বোলায় আর ফর্ক দিয়ে ট্রে থেকে স্লাইসড্ বীফ স্টেক আর সালাদ তুলে মুখে ফেলতে থাকে।

–দ্যাখো, কী মনভুলো হয়ে পড়েছি। বয়সটা, যতই কসরত করি না কেন, ধস নামাবেই হেথা হোথা... অথচ ছাত্রজীবনে কী স্মৃতিশক্তিই না ছিল আমার! একবার পড়লেই মনে গেঁথে যেত। পড়াশোনার খরচ নিজেকেই জোটাতে হত আর সেজন্য প্রাইভেট ট্যুশনি...। কী যে কঠিন সময় ছিল, উফ্....। আরে কী হল! তোমার গ্লাশ যে খালি, নাও। আজ আমার মনের পুরনো এই সিন্দুকটা ক্যানো জানি খুলে গেল ফ্রেন্ড — মাই ইয়াং ফ্রেন্ড — জানি না।

আরিফ গ্লাশে ব্ল্যাক লেবেল ঢালতে কিছুটা অসুবিধা ফিল করছে, স্ন্যাক্সয়ের ট্রেতে হাত লেগে টুংটাং শব্দ ওঠে। আইসবক্স থেকে কিউব নিতে গিয়ে পিকার ফসকে একটা পড়ে যায় ফ্লোরে। শাজাহান আলীর ভ্রূক্ষেপ নেই। তিনি বলে চলেছেন, জানো আরিফ, একদিনের এক ঘটনা আজও মাঝে মাঝেই মনে আসে। মে সিম ভেরি ট্রিভিয়্যাল টু ইউ, বাট...। ক্লাশে টিচার — কী যেন নাম... নাম... নাম, হ্যাঁ মনে পড়েছে ডক্টর জগদীশ ভটচারিয়া, অক্সফোর্ড থেকে ডক্টরেট, ইংলিশ লিটারেচারে, কনটেম্পোরারি বেঙ্গলি পয়েটদের ওপর কিটস্ এবং ইয়েটস্’য়ের প্রভাব — এর ওপর একটা অ্যাসে লিখতে দিলেন। নেক্সট ক্লাশে ওনাকে দেখাতে হবে...। পরে যেদিন ওনার ক্লাশ এল আমার লেখা অ্যাসেটা সবাইকে পড়ে শোনালেন স্যার এবং বললেন, কনটেন্ট আর ইংরিজিটা দ্যাখো, হোয়াট অ্যান এক্সেলেন্ট পিস... আই ডাউট, নিজেও এরকম লিখতে পারতাম কিনা! আমার আনন্দ দেখে কে! অতি আনন্দে এবং উত্তেজনায় বেঞ্চের নিচে পা ভাঁজ করে দোলাতে লাগলাম। ক্ষণিকের মধ্যেই সতীর্থদের খিলখিল হাসির শব্দ কানে এসে আছড়ে পড়ল। প্রথমে কিছুই আঁচ করতে পারছিলাম না। হাসছে কেন ওরা, তাও আবার সমস্বরে! কী এমন ঘটল!

ক্লাশ শেষ হবার পর এক সহপাঠিনীকে জিজ্ঞেস করলে সে খিলখিল হেসেই জবাব দিল, তুমি যখন পা দোলাচ্ছিলে তখন তোমার ছেঁড়া স্যান্ডেলের ক্ষয়ে যাওয়া সোল দেখা যাচ্ছিল। সোলের ফোকর দিয়ে তোমার পায়ের তলাও...। (আরিফকে লক্ষ করে) কী, বিশ্বাস হচ্ছে না বুঝি?

–না মানে, মানে স্যার, তারপর...? জিব ভালোই জড়িয়ে এসেছে আরিফের, মাথাটাও সামান্য ঝিমঝিম করতে শুরু করেছে। কিন্তু তারপরও মোহাচ্ছন্নের মত সে শুনে যাচ্ছে সফল এক মানুষের স্মৃতিকথা গভীর মনোযোগে।

ঘড়ির দিকে তাকালেন শাজাহান আলী। ঘণ্টার কাটা দশটা ছুঁই ছুঁই। কলবেলের রিমোটের বাটনে তর্জনি ছোঁয়ালেন। শ্যামলা মত এক পরিচারিকা স্লাইডিং ডোর ঠেলে উঁকি দিল, –ওষুধ আনব, জেঠু?

–আনো, আধঘন্টা পর টেবিলে যাব। তোমার জেঠিমা খেয়েছেন?

–ক-খ-ন। উনি এখন শুয়ে শুয়ে গান শুনতাছেন।

–বেশ, যাও তা হলে, শোনো, এখনই না, পনের মিনিট পরে ওষুধ এনো, ঠিক আছে?

আবার দরজার ওপাশে ড্রেসিংরুমে রাখা সারি সারি চকচকে জুতো আর স্যান্ডেলের ওপর নজর পড়ে আরিফের। কী চটকদার সব জুতো, বিদেশি হবে নিশ্চয়ই!

–আজ শিডিউল এলোমেলো হয়ে গেল, রাত দশটায় খাওয়াদাওয়ার পালা সাঙ্গ করা এখন আমার রুটিন। যাকগে, কখনও সখনও শিডিউল ব্রেক হতেই পারে। তোমার সঙ্গে কথা বলে বেশ লাগছে, আর ইউ ফিলিং বোর্ড?

–কী যে বলেন স্যার... এমন সুন্দর সময় বহুদিন পাইনি...

–জানো, ওই খিলখিল গ্রুপের মেয়েদের মধ্যে একজনকে ভাল্লাগতো আমার। লম্বা, দোহারা গড়ন, টানাটানা চোখ — এক কথায় সব মিলিয়ে দারুণ অ্যাট্রাকটিভ। ছাত্রী হিসাবেও ভালো। নোট চেয়ে নিত আমার কাছ থেকে। মেয়েটির বাবা মাঝারি স্তরের সরকারি কর্মকর্তা। ঢাকাতেই বাসা। বাসায় থেকেই ভার্সিটি করত। একদিন ক্লাশ শেষে ফ্যাকাল্টি বিল্ডিঙের করিডোরে আমরা দুজন গল্প করছিলাম, কতক্ষণ খেয়াল নেই। যখন খেয়াল হল, দেখি চারিদিক ফাঁকা। হঠাৎ ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। খুশি হলাম, বৃষ্টি না-থামা পর্যন্ত মেয়েটিকে কাছে পাওয়া যাবে, কথা বলা যাবে। দোতলা থেকে আশেপাশে অনেকদূর দৃষ্টি যায়। বৃষ্টিতে নেয়ে ঝাঁকড়া গাছগুলো স্নিগ্ধ সজীব, ক’টা কদমগাছে থোকায় থোকায় কদমফুল দোল খাচ্ছে বাতাসের ঝাপটায়। প্রকৃতি আর পরিবেশ মানুষের মনে কখনও এমন প্রভাব ফেলে যা ব্যাখ্যা করা মুশকিল। যে আমি মেয়েদের সামনে কথা বলতে বিব্রত বোধ করি সেই আমিই কিনা সরাসরি বলে বসলাম ওকে আমার মনের কথা। ওর কোমল ফরসা মুখে চকিতে রক্তিম আভা খেলে গেল। ক্রমশ ওর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গাঢ় হতে থাকে।

–কী নাম ছিল ওনার?

–হোয়াট অ্যা সিলি কোয়েশ্চন! নাম দিয়ে কি করবে? মেয়ে ব্যস্, মেয়ে। ধরে নাও ওর নাম ছিল মিস্ খিলখিল, হল?

ওষুধ নিয়ে শ্যামলামত মেয়েটি এল।

–আজ তা হলে এখানেই সাঙ্গ করি। তোমার গ্লাশ শেষ হয়েছে? হালকা সুরে বললেন শাজাহান আলী, কাল সন্ধ্যায় আমার এক ফ্রেন্ডের বাসায় পার্টি। ওর সিক্সটিফিফথ্ বার্থ ডে। বিকেলেও জরুরি এক কাজ, পরশু এসো। তবে হ্যাঁ, আসবার আগে ফোন করে এসো।





লুৎফুন্নেসা নিজেকে এখন গুটিয়ে রাখেন নিজেরই তৈরি-করা কেমন এক নির্মোকে। কথা বলেন কম। কার সঙ্গেই বা বলবেন? বাড়ির কাজের লোকেরা ছাড়া কথা বলবার আছেই বা কে! শাজাহান আলী কতটুকু সময়ই বা বাড়িতে থাকেন। আর থাকলেই বা কী? তাঁর সঙ্গে কথা বলতে কোনও উৎসাহ পান না লুৎফুন্নেসা। আটত্রিশ বছর আগে ওঁর নিজস্ব একটা ভুবন ছিল, একটা জীবনবোধ — আর দশটা মধ্যবিত্ত বাঙালি মেয়ের সচরাচর যেমন থাকে। শাজাহান আলীর সংস্পর্শে এসে অনেক কিছুই পাল্টে গিয়েছিল। স্বামীর প্রভাবে পুরাতন অনেক বদ্ধ ধারণাতে চিড় ধরেছিল — ধস নেমেছিল। তাঁর ধারণায়, বিশ্বভুবনে পতিদেবতাটির মত জ্ঞানী দ্বিতীয় কেউ নেই। বান্ধবী আর আত্মীয়-পরিচিতজনদের কাছে স্বামীর গুণ প্রচারে তিনি পঞ্চমুখ থাকতেন একসময়। তখন সন্ধ্যার পর আড্ডায় লুৎফুন্নেসা মধ্যমণি। নিজের পছন্দ না হলেও স্বামীকে খুশি করতে অতিথিদের সঙ্গ দিতেন পার্টিতে। এখন লোকজন এলে বেডরুমে কাত হয়ে শুয়ে টিভির রিমোট টিপে টিপে কখনও এ-চ্যানেল কখনও ও-চ্যানেল দেখেন। গেস্টরা জানতে চাইলে শাজাহান আলীর একই জবাব, –মাই ওয়াইফ ইজ সিক্; শি ইজ ইন বেডরেস্ট.......।

শাজাহান আলীর পরনারী আসক্তির ব্যাপারটি প্রথম যেদিন এক জয়েন্ট সেক্রেটারির স্ত্রীর মুখ থেকে শুনেছিলেন লুৎফুন্নেসা, দুর-দুর করে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। আমার স্বামীকে আমার চেয়ে বেশি কেউ চেনে? আমার সুখে ওদের চোখ টাটায়, না? মুখ ঝামটা দিয়ে বলেছিলেন তিনি।

–আমি তো তাই বলি ভাবি। শাজাহান ভাইয়ের চালচলনে ছিটেফোঁটা দোষও কখনও নজরে পড়েনি — ইনফিডেলিটির প্রশ্নই ওঠে না...।

–আপনি যার কথা বললেন, ওকে তো হাড়েহাড়ে চিনি, স্বামী ঢাকার বাইরে গেলে, কী যেন নাম ছোকরাটার? ছেলের বয়সী...থাক্, পরের গিবত গাওয়া একদম পছন্দ নয় আমার।

রাতে অতি ক্ষীণ নীলাভ আলোয় নরম বিছানায় শাজাহানের বুকে মাথা রেখে শুয়ে উদ্ভট গুজবগুলোর বর্ণনা দিতেন লুৎফা। শাজাহান নিঃশব্দ হাসি হেসে বলতেন, –জানো ওই মহিলাটি বহুদিন ধরে আমাকে পটাতে চাচ্ছে, পাত্তা দিচ্ছি না — দ্যাটস হোয়াই...। আবেগে গলে যাওয়া লুৎফা নীল আলোতে স্বামীর শরীরে শরীর লেপ্টে দিয়ে কুঁকড়ে কুঁকড়ে উঠতেন; এক সময় পরম তৃপ্তির আবেশে কপোতির মতো ডানা ঝাপটে পালক ফোলাতেন।

কিন্তু আজ থেকে বছর দশেক আগে সবকিছু কেমন এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল লুৎফুন্নেসার। একদিন তাঁর বিধবা এক বান্ধবী সুস্মিতা পাকড়াশি গম্ভীর মুখে ভুরু কুঁচকে নালিশ জানিয়েছিল, –তোকে না বলে পারছি না, বিশ্বাস করাই কঠিন, শাজাহান ভাই... আই স্টিল কান্ট বিলিভ মাই ইয়ারস্...

–কী হয়েছে, কী করেছে তোর দাদাবাবু, হ্যাঁ?

–ছিঃ, আমাকে প্রোপোজ করার চিন্তা কীভাবে করতে পারলেন? একটা চাকরির তদবিরে গিয়েছিলাম ওনার কাছে...

সুস্মিতার দিকে কোল্ডড্রিংকসের গ্লাশটা এগিয়ে দিতে গিয়ে থমকে গিয়েছিলেন লুৎফুন্নেসা। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছিল যেন তাঁর। স্বামী ঘরে ফিরতেই কোনও ভনিতা না করে জানতে চেয়েছিলেন ব্যাপারটা। টাইয়ের নট আলগা করতে করতে স্বাভাবিক গলায় জানিয়েছিলেন শাজাহান, –ইটস্ অ্যা ব্ল্যাট্যান্ট লাই। তুমি বিশ্বাস করো? তোমার বান্ধবীটিকে তো আমি ভালোই জানতাম — কিন্তু...। বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়নি লুৎফুন্নেসার। মিথ্যা ভাবতে চেষ্টা করেছেন কিন্তু তারপরও কেন জানি যন্ত্রণার খচখচানিটা থেকেই গেছে বুকের ভেতর। শাজাহান আগের চেয়ে অনেক শীতল। তাছাড়া সুস্মিতাকে তো চেনে ও — খুবই ব্যালেনস্ড এবং ডিগনিফায়েড মহিলা। ওর কথা অবিশ্বাস করতেও মন সায় দেয় না। অনেক কেঁদেছিলেন লুৎফা। তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে মুচকি হেসে বলে উঠেছিলেন শাজাহান, –পাগলামি করে না, লক্ষ্মী। আর ধরো, যদিও একেবারেই বেজলেস, তবু ধরো ব্যাপারটা যদি সত্যিই হয়, তোমার বান্ধবীটির গর্ব হওয়ার কথা; আই মিন শি শ্যুড বি প্রাউড অব দ্যাট... এ হ্যান্ডসাম ম্যান লাইক মি ডিজায়ারস হার...।

খুবই ভেঙ্গে পড়েছিলেন লুৎফুন্নেসা। এক বিছানায় শুলেও দু’জনার মধ্যে অদৃশ্য এক দেয়াল থেকে গেছে; অপরিচিত এক পুরুষ মনে হয়েছে শাজাহানকে। মাঝেমধ্যে আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন সবকিছু ভুলেটুলে আগের মত স্বাভাবিক হতে, পারেননি। শাজাহান আলীও যে তাঁর এই পরিবর্তনে খুব একটা গরজ করেছেন, তা নয়। কি করবেন লুৎফুন্নেসা! দিশাহারা তিনি কেঁদেছেন — অনেক কেঁদেছেন। ঘনিষ্ঠজনেরা সান্ত্বনা দিয়েছেন, বুঝিয়েছেন, পুরুষদের এরকম এট্টুআট্টু দোষ থাকেই — কেটে যাবে একসময়। এত ভেঙে পড়লে কি চলে?

কিন্তু কারও কোনও পরামর্শ কাজে এল না; বরঞ্চ দিন-কে দিন লুৎফুন্নেসার বাড়াবাড়ি রকমের সন্দেহপ্রবণতা, অস্বাভাবিক আচরণ বেড়েই চলল। জনসমক্ষে মাঝেমধ্যেই বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দিতে লাগলেন শাজাহান আলীকে। শাজাহান আলীও বদলে যেতে থাকলেন। এতদিন যা আড়ালে-আবডালে চলত এখন তা খোলামেলা। এক ধরনের জেদ যেন পেয়ে বসল তাঁকে।

এখন ষাট ছুঁই ছুঁই লুৎফুন্নেসা অন্য এক লুৎফুন্নেসা।

ম্যাক্সি পরে শ্লথ পায়ে পায়চারি করেন এ-ঘর ও-ঘর। কাজের লোকেরা কিছু জিজ্ঞেস করলে সংক্ষেপে জবাব দেন। নিজ মনে কী যেন বিড়বিড় করেন। কখনও রবীন্দ্রসংগীতের দু’এক লাইন চাপা কণ্ঠে গুনগুন করেন। ময়না-কাকাতুয়াদের কথা শেখাতে চেষ্টা করেন, যে কথা তাঁর মনে আসে। অনেকদিন ধরেই শেখাতে চেষ্টা করছেন, ‘অচিনপুরির একটা পাখি সুখপাখি তার নাম।’ নাহ্, কিছুতেই হচ্ছে না। এত লম্বা কথা পাখিরা নাকি মুখস্ত করতে পারে না।

বড় মেয়ে অ্যামেরিকা থেকে নাতি সেজানের ছবি পাঠিয়েছে। কী ফুটফুটে, দেবশিশু যেন। ছবিটা বাঁধিয়ে বুকশেলফের ওপর রাখা। ছবির সঙ্গে কথা বলেন লুৎফুন্নেসা, আমার তু তু পাখি, আমার পরান পাখি... অর্থহীন কত শব্দ। স্বামী, তিন সন্তান এই নিয়ে লুৎফুন্নেসার পৃথিবী; ওঁর ভালোবাসা — ওঁর আবেগ এই চারটি প্রাণীকে ঘিরেই। সেজানকে এখনও দেখেননি — মাস খানেকের মধ্যেই অ্যামেরিকা যাবার প্ল্যান। পৃথিবীতে ভালোবাসার আরও একটা প্রাণী এসে গেল। শাজাহান আলীকে বলেছিলেন সঙ্গে যেতে, রাজি হননি। ওনার কোন ক্লাশমেট নাকি মৃত্যুশয্যায়, তার ওপর দেশে নাকি অসময়ে ভয়াবহ বন্যা, টিভিতে অবশ্য তিনিও দেখেন — মানুষের দুর্দশায় আলী সাহেবের কলজে ছিঁড়ে যায়! কী দরদ, আহা! স্ত্রী-সন্তান-পরিবার এগুলো যেন বানের জলে ভেসে-আসা কচুরিপানা — অদ্ভুত এক মানুষ রে বাবা! সেজান — প্রথম নাতি, তু তু পাখি, অনাবিল হাসির রেখা দেখা দেয় লুৎফুন্নেসার ঠোঁটে। তিনি এখন নানীমা। দেখতে দেখতেই নানীমা। প্রথম প্রথম চাচি...আন্টি শুনলে কানে বাজত। প্রসাধনের সময় মিররে মুখ দেখতেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে — রেশমি কালো চুলের ফাঁকে ধূসর দু’একটার দেখা মিললেই তৎক্ষণাৎ মূলোৎপাটন। এখন তো মেহেদি দিয়ে চুল তাঁর ব্রাউন— ডাইতে এলার্জি ।

শাজাহান আলীর সঙ্গে সম্পর্কের শেকড়ে বাসা-বাঁধা সন্দেহের কীট কবেই আলগা করে দিয়েছে দাম্পত্যবন্ধন, কিন্তু সমাজ আর সন্তানদের কথা ভেবে — নাকি দীর্ঘ চার দশকের অভ্যাসের বশে এখনও তাঁর প্রতি কেমন এক মমত্ববোধ মনের গভীরে ডুব মেরে থাকে।

মাস তিনেক আগে অসুখে পড়েছিলেন শাজাহান আলী। জ্বর আর দাস্তবমিতে জান যায়-যায় অবস্থা। শহরে তখন ডেঙ্গুর ভারি প্রাদুর্ভাব। হাসপাতালে দিবারাত্র কী টেনশনেই না কেটেছে লুৎফুন্নেসার। শাজাহান আলী কাঁতরেছেন, স্ত্রীর হাত মুঠোয় নিয়ে ক্ষীণকণ্ঠে বলেছেন, –আই অ্যাম অ্যা স্কাউন্ড্রেল, হেট মি মণি — এবার ভাল হয়ে উঠলে জীবনটাকে নতুন করে শুরু করব... হাহ্ লাইফ ... ইটস্ টু লেট...

লুৎফুন্নেসা মাথায় হাত বুলিয়েছেন, চেয়ে থেকেছেন স্বামীর লালচে মুখের দিকে, কথা ফোটেনি আবেগ জমে-থাকা কণ্ঠ ভেদ করে। ইচ্ছে হয়েছে বলতে, অ্যাতো অত্যাচার শরীরে সইবে ক্যানো? ক্যানো তুমি নিজেকেই শেষ করে দিচ্ছো? কার ওপর অভিমান তোমার? আমি কী কিছুই করিনি তোমাকে সুখ দিতে? কিন্তু মুখ ফুটে কিছুই বলতে পারেননি — দ্বিধা হয়েছে তাঁর।





আরিফ একদিন পরই ফোন করেছে। সাহেব বাসায় নাই, ফিরতে ফিরতে রাত নয়টা হইব, কোনও ম্যাসেজ থাকলে দিতে পারেন, — অপর প্রান্ত থেকে জবাব পেয়েছে। তারপর প্রায় প্রতিদিনই এই একই কথার পুনরাবৃত্তি। নাহ্, বিরক্ত হয়েছে আরিফ। বিদঘুটে লোক তো! হুইস্কির নেশাটাও সন্ধ্যা গড়াতেই পেয়ে বসে। অন্য প্রোগ্রামও রাখা হয় না, যদি যেতে হয় শাজাহান সাহেবের ওখানে। বাসায় একা বসে কাটানো কম অস্বস্তিকর নয়। বউটা চাকরি করে একটা ইনস্যুরেন্স কম্পানিতে। কলেজপড়ুয়া একমাত্র ছেলে, কাজের মেয়ে আর বৃদ্ধা মা — এই নিয়ে আরিফের সংসার। বউয়ের বয়স চল্লিশ তো পেরলোই — দেখে কিন্তু বোঝার জো নেই। মনে হয় এই তিরিশ-বত্রিশ। নিটোল গড়ন — উজ্জ্বল শ্যাম, শালিকের মত চোখ, হাসলে টোল পড়ে। স্ত্রীভাগ্য নিয়ে আরিফের যথেষ্ট গর্ব। শুধু ঘর সামলানো মেয়েদের দায়িত্ব, আউটডেটেড এই চিন্তার ধারেকাছেও নেই সে। এনজিও করে এ ব্যাপারে চিন্তা তার এখন আরও স্বচ্ছ। হাতঘড়ি দেখে আরিফ, বিকেল পাঁচটা বেজে পঁচিশ। দিনের আলো ম্লান হয়ে এসেছে। মোবাইল বেজে ওঠে। শাজাহান সাহেবের গলা, চলে এসো যদি ফ্রি থাকো। আমি আজ বাসা ছেড়ে বেরুবো না...। ঝটপট রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়ে আরিফ।

শাজাহান সাহেবের বাসায় যাচ্ছে পনের দিন পর। গ্যাপটা তার কাছে বেশ লম্বা বলেই মনে হচ্ছে। ভদ্রলোকটির অদ্ভুত এক আকর্ষণী ক্ষমতা। এই ক’মাসের ওঠাবসায় আরিফ ওঁর এই অসাধারণ গুণটি উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছে। দর্শন বা বিজ্ঞানের মত দুরূহ বিষয়সহ বিভিন্ন শাস্ত্রের ওপর পড়াশোনা থেকে শুরু করে খেলাধুলোর মত হালকা বিষয় বা টিভির জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান দেখতেও আগ্রহের ঘাটতি নেই ওঁর। জমজমাট আসরে শাজাহান আলীর জ্ঞানের গভীরতা দেখে বিস্মিত হয় আরিফ। লেখার ধারও তাঁর অনেক নামিদামি লেখকের থেকে কম কিসে। ছাত্রকাল থেকেই লেখার অভ্যাস। ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময়ে পত্রপত্রিকায় কবিতা আর ছোটগল্প বেরোত। উঁচুমানের একজন ক্রিটিক, সমঝদার হিসাবেও দেখতে দেখতে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল বুদ্ধিজীবী মহলে। কিন্তু সরকারি চাকরি তাঁর সাহিত্যপ্রতিভার আগুনে পানি ঢেলে দিয়েছিল। চাকরি করলে লেখালেখিতে অনেক সমস্যা। কিন্তু এখন, এখন তো অখণ্ড অবসর — আরিফের দুঃখ হয়, এমন একজন জিনিয়াস সময়ের কতটুকুই-বা ব্যয় করেন সৃষ্টিকর্মে। সৃজনশীলতা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করলে বায়োগ্রাফির পরতে পরতে আরও কত উজ্জ্বল মণিমাণিক্য গাঁথা যেত অনায়াসে।

জীবনের সায়াহ্নে এসে শাজাহান আলী আজ যেন বড় বেশি বেপরোয়া — ভোজনের শেষে প্লেট চেঁচেপুঁছে খেতে বড় বেশি ব্যতিব্যস্ত।

ধুস্ শালা — কী সব আবোল-তাবোল ভাবছি। মনীষায় পৌঁছে গেটে বসানো কলবেলের বাটনে চাপ দেয় আরিফ।

ড্রইংরুমে ঢুকতেই পরিচিত সেই প্রাণছোঁয়া সহাস্য অভ্যর্থনা, আরে এসো, এসো। আর বলো না, কত যে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়তে হয়...। ওয়ান আফটার অ্যানাদার (একটু থেমে) মাইনুদ্দিন দুটো গ্লাশ নিয়ে এসো আর বুয়াকে বলো খাবার যা আছে দিতে, বলে নিজেই উঠে যান সেলার থেকে ড্রিংকস্ আনতে শাজাহান আলী। কিছুক্ষণের মধ্যেই দু’হাতে দু’বোতল নিয়ে এসে বসেন সোফার ওপর।

–ড্রাই জিন, বিফ ইটার; হুইস্কি, সিভাস রিগাল… কোনটা চলবে?

–আপনি?

–আমারটা আমি বুঝব, তোমার যেটা পছন্দ নাও...

–হুইস্কি

জিনের সাথে টনিক ওয়াটার মিশিয়ে নেন শাজাহান। আরিফ সিভাস রিগালে কটা কিউব আর পানি। চিয়ারস্, টোস্ট-এর অনুচ্চ আওয়াজ।

–বেশ কটা দিন ছেদ পড়ে গেল আমাদের আলাপে, কোথায় গিয়ে যেন শেষ করেছিলাম সেদিন, মনে আছে তোমার? টেলিভিশন সিরিয়ালের রিক্যাপ, কি বলো? হোঃ হোঃ হো ... ...

–ভার্সিটির এক মেয়ে, মিস খিলখিল্...

–হোঃ হোঃ, তুমি দেখছি রসিক কম নও। মিস খিলখিল্। হ্যাঁ, আজ ওর আসল নামটাই বলি — ইয়াসনা জামিল চৌধুরী। ওর বাবা জামিল চৌধুরী ছিলেন একজন সেকশন অফিসার — আজকাল যাদেরকে অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি বলে।

মাইনুদ্দিন খাবারের ট্রে চিরাচরিত নিয়মে রাখে ঢাউস সেন্টার টেবিলের ওপর। একটুকরো গাজর মুখে তুলে নিয়ে চিবোতে চিবোতে সশব্দ শ্বাস ছাড়লেন শাজাহান।

–ক্রমেই আমি যেন বুঁদ হয়ে পড়লাম ভালোবাসার নেশায় — বয়সটা অবভিয়াসলি ওয়াজ ওয়ান অব দ্য মেজর ফ্যাকটরস্ অব সাচ অবসেশন ...ইউ ফলো মি?

–ইয়েস স্যার... শেষে কী হল?

–অনার্স পড়া অবস্থাতেই এক ইঞ্জিনিয়ারের সাথে এনগেজমেন্ট হয়ে গেল ওর...

–ইজ ইট! চোখ গোল গোল করে একরাশ বিস্ময় জড়ানো গলায় বলে ওঠে আরিফ।

–আমি তখন অ্যাবনরম্যাল, প্রথম প্রেম বোঝোই তো...। লজ্জা শরম জড়তা কোথায় পালালো, সটান হাজির হলাম ওর বাবার সম্মুখেই, সব খুলে বললাম...। ওর বাবা যা বলেছিলেন সংক্ষেপে তা এই, দুটো কারণে এটা সম্ভব নয়, ফার্স্টলি আমাদের ফ্যামিলি স্ট্যাটাস, সেকেন্ডলি তখনও আমার ফিউচার আনসার্টেন...। ঘটনাটি আমাকে ভীষণ ঝাঁকুনি দিয়েছিলো — জোলটেড মি লাইক অ্যা ট্রেমার অব এইট অন রিখটার স্কেল...। কথাগুলো বলার সময় এক চিলতে অদ্ভুত হাসির রেখা দেখা দেয় শাজাহান আলীর ঠোঁটে, সম্ভবত তাঁর তৎকালীন অপরিণত বয়সের মানসিক সমস্যা এখন একটা মজার ব্যাপার তাঁর নিজের কাছেই।

–স্ট্রেঞ্জ! মেয়েটি কিছু বলল না?

টেলিফোন বেজে ওঠে। নিজেই উঠে গিয়ে কর্ডলেস সেটের রিসিভারটা তুলে এনে কিছুটা উত্তেজিত স্বরে বলে ওঠেন,

–হোয়াট! কী বললে, শি হ্যাজ লেফট্ ইয়োর হাউস? হোয়াট অ্যা স্ক্যান্ডাল...! অ্যাতোটুকু গড়াবে আগেভাগে বোঝোনি, ইউ স্টুপিড! (একটু পজ দিয়ে) কিপ ইওর কুল... কাল কথা বলব’খন...ওক্কে...। রিসিভার রাখতে রাখতে গম্ভীর গলায় বলেন শাজাহান, এক করপোরেশনের চেয়ারম্যান, খুব ভক্ত আমার, ওর সেকেন্ড ওয়াইফ গৃহ ত্যাগ করে ঝুলে পড়েছে মাল্টিন্যাশনাল কম্পানির ইয়াং এক এগজিকিউটিভের গলায়। সমাজের মরাল স্ট্রাকচারে ধস নামতে শুরু করেছে, বুঝলে হে পণ্ডিত? হরহামেশাই ঘটছে এগুলো। মুখে গ্লোবালাইজেশন, ফ্রি মার্কেট ইকনমির গুণকীর্তন করবে আর মনে লালন করবে ওল্ড ভ্যালুজ, তা কি হয়?

–রাইট স্যার...

হুইস্কির বোতলটা গ্লাশের ওপর পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি কৌণিক অবস্থানে ধরে থাকল আরিফ। মেজারার লাগানো বোতলের মুখে — এক পেগ হলেই অটোম্যাটিক্যালি বন্ধ হয়ে যাবে।

–ফার্স্ট ওয়ার্ল্ডে বিয়েটাই তো দিন দিন অবসোলিট হয়ে যাচ্ছে... আসলেই চিন্তার মিল না থাকলে প্রাতিষ্ঠানিক বিয়ে, আমি মনে করি একধরনের ভলেন্টারি বন্ডেজ — সারা জীবন ধুঁকে ধুঁকে মরো...

–সম্ভবত তাই... মানে কথাটা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ... আমতা আমতা করে বলে আরিফ। বিষয়টা নিয়ে খুব গভীরভাবে ভাবেনি — যতটুকু ভেবেছে দ্বিধাহীন কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনি।

–ইন ফ্যাক্ট আমরা কিছু ট্যাবুতে আচ্ছন্ন... ভারচুস-ভাইসেস, পাপ-পুণ্য এসব ধারণা গড়ে ওঠে একটি সমাজের অর্থনীতি, নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের দ্বারা, গ্লাশে চুমুক দিয়ে বলে চলেন শাজাহান, অতীতে যাও, ইতিহাস ঘাঁটো, অনেক পূজনীয় ব্যক্তির জীবনাচারে অনেক কিছুই পাবে যা আজ কেউ করলে নির্ঘাত তার কপালে দুর্ভোগ নেমে আসবে; অ্যাবসোল্যুট গুডনেস বলতে কিছু আছে কী? বিরাট লেকচার দিয়ে ফেললাম, সরি, বুড়োদের এ এক জঘন্য অভ্যাস।

আরিফ চুপচাপ, প্লেট থেকে কাজু বাদাম তুলে নিয়ে মুখের গহ্বরে ঢিল ছোড়ার মত ছুড়তে থাকে।

–কোনিগসবার্গের শেয়াল অবশ্য খুব চেষ্টা করেছেন অ্যাবসোল্যুট গুডনেস জাতীয় কিছু একটার স্বতন্ত্র অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠা করতে, বলেন শাজাহান আলী।

–কোনিগস্ বার্গের শেয়াল! তোতলায় আরিফ।

–হ্যাঁ, ইমানুয়েল কান্টের কথা বলছি। মেটাফিজিক অফ মরালস্ না কি জানি নাম বইটার, তাতে ক্যাটাগরিক্যাল ইম্পারেটিভ, গুড উইল ইজ গুড ইন ইটসেল্ফ, অনেকটা যেন জ্যামিতিক নিশ্চিতিতে নৈতিকতার পরম ভিত্তি স্থাপন করতে চেয়েছিলেন ধূর্ত ওই জার্মান দার্শনিকটি... আর তা থেকে পরমেশ্বর...।

আরিফ অপ্রতিভ, মাথা নাড়ছিল অনবরত, মাথামুণ্ডু কিছুই না বুঝে, আদপে দর্শনের ওপর ওর পড়াশোনা নেই বললেই চলে।

–আমাদের চার্বাক দর্শন বরং বাস্তবতার অনেক কাছাকাছি — মানুষ যুক্তির চেয়ে ইন্সটিংক্ট দ্বারা অনেক বেশি ড্রিভেন... শোপেনহাওয়ার, নিৎশে পড়েছ? খুব ইন্টারেস্টিং। তবে একটা বিষয়ে আমি অন্তত দ্বিধামুক্ত, তা হল, মানুষকে ভালোবাসাতেই জীবনের প্রকৃত সুখ, আর সুখই জীবনের পরমার্থ...

অর্ধমনস্ক আরিফ ড্যাবড্যাব তাকিয়ে থাকে; মুখে কোনও রা নেই।

–থ্যাৎ, কীসব প্যাচাল পাড়ছি... সময় নষ্ট, হ্যাঁ কোথায় গিয়ে যেন থেমেছিলাম?

–মেয়েটির এক ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে এনগেজমেন্ট...

–থ্যাংক ইউ, তোমার স্মৃতিশক্তির তারিফ করতেই হয়...। হ্যাঁ, এনগেজমেন্ট তারপর বিয়ে। বেশ কিছুদিন উদ্ভ্রান্তের মত কাটল, মনে হল দুনিয়ায় সবকিছু অর্থহীন। তারপর একসময় স্বাভাবিক হলাম। মাস্টারস্ ফাইনালে যত ভালো রেজাল্ট আশা করেছিলাম ততটা হল না। চাকরি খুঁজতে লাগলাম। এরই মধ্যে সিএসএস — সেন্ট্রাল সুপিরিয়র সার্ভিস — পাকিস্তানের সবচেয়ে এলিট সার্ভিস-এর পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পাওয়া গেলো...। চৌষট্টি সালের কথা।

–এখনকার বিসিএস যেমন ...

–কী যে বলো, আলবত না। তখনকার সময় পাকিস্তানের সব থেকে ট্যালেন্টেড বয়রা স্বপ্ন দেখত সিএসপি হবার। এখন তো মাল্টিন্যাশনাল কম্পানি — উহুঁ তাও নয়, দেশের বাইরে চাকরিবাকরি করতেই ইন্টারেস্টেড ট্যালেন্টরা...। মিডিওকারদের মধ্য থেকেই বিসিএস দিচ্ছে আজকাল। যা বলছিলাম, খুব সিরিয়াসলি নিয়েছিলাম পরীক্ষাটাকে — আর কী আশ্চর্য জানো, অসম্ভব ভালো রেজাল্টও হল — সিংড়ার এন্তাজ আলীর ছাওয়াল মোহাম্মদ শাজাহান আলী সিএসপি বনে গেল!

সেলফোনে পলিফোনিক রিংটোন বেজে ওঠে। শাজাহান আলী ফতুয়ার পকেট থেকে ফোনসেট বার করে চোখ বোলান স্ক্রিনে, তারপর বলেন, –জাস্ট এ মোমেন্ট আরিফ। হ্যালো, হ্যাঁ, ভাল আছি, তুমি? কী বললে তদবির? কার কাছে? ও আচ্ছা, আচ্ছা, হ্যাঁ আমার খুব ক্লোজ; হু-হু, হু-হু, ইয়াহ্ আই আন্ডারস্ট্যান্ড, ডেফিনিটলি; বাব্ বা-ই।

শাজাহান আলী পরম আয়েশে শরীরটা নরম সোফায় আরও একটু ছড়িয়ে দিলেন। সিগারেট ধরালেন আরেকটা। তারপর শ্রাগ করলেন এবং একমুখ ধোঁয়া ছাড়লেন। রোস্টেড টোবাকোর পোড়া গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল জমে-থাকা ঘরের বাতাসে।

–ওই মেয়েটা — মানে ইয়াসনা আমার মনের বিশাল একটা অংশ জুড়ে আছে এখনও। আমার জীবনের দুটো টার্নিং পয়েন্টে ওর কন্ট্রিবিউশন। ওর প্রত্যাখ্যান জীবনে প্রতিষ্ঠা পেতে আমাকে অ্যাগ্রেসিভ করে তুলেছিল — পেয়েছি। দ্বিতীয় মোড়... থাক, সে তুমি নাই বা শুনলে...

–প্লিজ গো এহেড স্যার, এগুলো আপনার বায়োগ্রাফির ইম্পর্ট্যান্ট এলিমেন্ট হতে পারে... অদ্ভুত দীর্ঘলয়ে জড়ানো গলায় বলে আরিফ।

–ওকে, বলছি। কিন্তু সোয়্যার অন গড, বায়োগ্রাফিতে সবকিছু হুবহু উল্লেখ করো না কিন্তু। তুমি জানো, আই লাইক ইউ মাচ; হ্যাভ কনফিডেন্স ইন ইউ...

–ঠিক আছে, স্যার...

–ইয়াসনার স্বামী, মানে ওই ইঞ্জিনিয়ার শ্বশুরের পয়সায় জাপান পাড়ি দেয়, ভালো চাকরিও জুটে যায় ওখানে। ইয়াসনাকে নিয়ে যাবে যাবে করে এক বছর কাটিয়ে দেয়। একসময় জানা যায়, ইঞ্জিনিয়ারটি এক জাপানি মেয়েকে বিয়ে করে ঘরসংসার করছে। এসব আমি জানতে পারি আরো অনেক পরে, আমি তখন নারায়ণগঞ্জের এসডিও। আনম্যারেড। কি ভাবে আমার খোঁজ পেল জানি না — হয়তো পুরনো কোনও ক্লাশমেট থেকেই — একদিন গিয়ে হাজির আমার অফিসে। খুব কেঁদেছিল ও। ডিভোর্সি এক বান্ধবীর সঙ্গে তেজকুনি পাড়াতে বাসা নিয়ে থাকে। সে আমলে তেজকুনিপাড়া তো শহরতলি। আজ যেমন...

কথা শেষ না হতেই ভারি পর্দা ঠেলে আজও সেই শ্যামলা মেয়েটি এসে জানান দিল, –জেঠু আপনার ওষুধ খাওয়ার সময় পার হয়া গেল যে...

–ওহ্ গড, দ্যাখো কথায় মশগুল থেকে দশটা বাজিয়ে ফেলেছি...। পরশু শুক্রবার, হলিডে, চলে এসো। কাল আবার সিরিয়াস অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে এক বড়কর্তার সাথে..। সো, সি ইউ আরিফ... টেক কেয়ার অব ইয়োরসেল্ফ...।

আরিফ বেশ টেনেছে আজ। এলোমেলো পায়ে এগিয়ে যায় সদর দরজার দিকে। মাইনুদ্দিন সমীহের সঙ্গে দরজা খুলে ধরে।







ভয়ানক ব্যস্ততার মধ্যে দিনটা কেটেছে আরিফের। সারাদিনের খাটাখাটুনি শেষে ধস্ত শরীর নিয়ে সন্ধ্যায় ঘরে ফেরে আরিফ। কাজের মেয়েটা নিয়মমাফিক চা-নাস্তা রেখে যায়। ক’দিন ধরে জ্বরে ভুগছেন মা। পাশের কক্ষ থেকে আহ্ উহ্ শব্দ ভেসে আসে। আরিফ মায়ের কপালে হাত দিয়ে তাপ পরখ করে। একশো দু’তিন হবে। জিজ্ঞেস করে মেয়েটাকে, কি রে তোর দাদিমাকে ওসুধপথ্য দিয়েছিস?

–চাচিমা ওষুধ খাওয়াইয়া দিয়া গেছে, মুরগির ছুপ্ও দিছে...

–তোর চাচিমা কখন এলেন আর কখন গেলেন?

–এই তো আপনে আসার দশ মিনিট আগেই বাইর হইয়া গেলেন, বললেন ফিরতে দেরি অইব, জরুলি কি কাম নাকি আছে...

–অ, আচ্ছা...

বিবিসির খবরটা শোনা দরকার। রিমোট টিপে টিভি অন করে আরিফ। ইরাকে মার্কিনিদের নির্বিচার হত্যাকাণ্ড, ইনভেশন বিরোধীদের পাল্টা প্রতিরোধ, ইসরায়েলে ফিলিস্তিনি গেরিলাদের সুইসাইড বোম্বিঙের ব্রেকিং নিউজ ফলাও করে দেখাচ্ছে বিবিসি।

স্ত্রী নুসরাতকে নিয়েও ভাবে। কী পরিশ্রম করে — পুরো পরিবারটিকেই তো বলতে গেলে আগলে রেখেছে ও। আরিফের কীই-বা ইনকাম! বাসা ভাড়া দিতেই ওর বেতন শেষ। ছেলেটার পড়াশোনার খরচ কী কম? এইচএসসি লেভেলে — তিনতিনটে প্রাইভেট টিউটরের কাছে গিয়ে পড়তে হয়। ওর পেছনেই মাসে হাজার পাঁচেক লাগে। দিন-কে দিন খরচ বেড়েই চলেছে। নুসরাতের মত অমন দায়িত্বশীল স্ত্রী না থাকলে কী যে হত ভাবতেও শিউরে ওঠে আরিফ। কিন্তু ইনস্যুরেন্সের চাকরি তো ব্যবসা নির্ভর। কাজ করো, বেতন নাও। টার্গেট অ্যাচিভ করতে না পারলে বেতন বন্ধ। জব সিকিউরিটি নেই বললেই চলে। বড় কর্তার মন যোগানো গেল না, চাকরি নট।

শাজাহান আলীর চিন্তা এসে ভর করে মাথায়। লোকটাকে বুঝে উঠতে পারে না আরিফ। কখনও মনে হয় মাটির সোঁদা গন্ধ ওর গায়ে, আবার কখনও কমপ্লিট ওয়েস্টার্নাইজড। কখনও মানুষের জন্য ওর দরদ সমুদ্রতরঙ্গের মত আছড়ে পড়ে, আবার কখনও মনে হয় বড় বেশি আত্মকেন্দ্রিক, — আত্মপ্রেমী। কখনও নিষ্কাম, পরার্থপরায়ণ, কখনও-বা প্রবৃত্তির অসহায় দাস! সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার হল, উনি যখন কোনও কিছু নিয়ে কথা বলেন — সত্যি বলে মনে হয়। এরকম তীক্ষ্ণধী — এরকম প্রতিভাবান ব্যক্তির সান্নিধ্য পাওয়ার সুযোগ আরিফের এই প্রথম। বায়োগ্রাফিটা কীভাবে শুরু করা যায় এ নিয়ে বেশ ক’দিন ধরে খুব ভাবছে আরিফ। শ্রুতিলিখন নাকি অন্য কোনও পদ্ধতির আশ্রয় নেবে। যেরকম ব্যস্ততা ওঁর, তাতে ডিকটেশন নিয়ে লিখতে গেলে জীবদ্দশাতে শেষ হবে কিনা সন্দেহ! আর বায়োগ্রাফিটা তো আকার-আকৃতিতে যথেষ্ট বড়সড়ই হবে। কত বিচিত্র এবং আকর্ষণীয় ঘটনায় ভরা ওঁর সাতষট্টি বছরের জীবনটা। তিন-চারশ পৃষ্ঠায় কুলাবে কিনা সন্দেহ! সে যাই হোক, কথা যখন দিয়েছি, কাজটা করতেই হবে; এবং সাধ্যের মধ্যে যদ্দুর সম্ভব নিপুণভাবে। একটা কথা অবশ্য সোজাসাপ্টা ওঁকে না বললেই নয়, তা হলো, যদি আমাকে দিয়ে কাজটা করাতে চান, দিনে অন্তত চার-পাঁচ ঘন্টা সময় দিতে হবে — এক্সক্লুসিভলি ফর দ্য পারপাস, অন্যদের সঙ্গে অত আড্ডা-ফাড্ডা চলবে না, কথাগুলো ভাবে আরিফ এবং সিদ্ধান্ত নেয়, কাল দেখা হলে শাজাহান সাহেবের সঙ্গে ফাইনাল বোঝাপড়া করে ফেলতে হবে। পয়সাকড়ির একটা ব্যাপারও আছে। ও ব্যাপারে এখনই কথা বলা কী ঠিক হবে?

মোবাইল বেজে উঠল। বন্ধু সাকলাইনের কল,

–ক্যামন আছিস দোস্ত? হুট করে প্রোগ্রাম, অনেকেই, মানে আমাদের অতি ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা মোখতারের বাসায় আড্ডা মারব, গলা ভেজানোর ব্যবস্থাও আছে... দ্রুত চলে আয়... আসছিস তো?

সাকলাইন কবি এবং বহুলপ্রচারিত একটি দৈনিকের সাহিত্যসম্পাদক।

তাড়াহুড়ো করেই বেরিয়ে পড়ে আরিফ। সাহিত্যিক হিসাবে ওর বর্তমান অবস্থানে পৌঁছনোর পেছনে সাকলাইনের অনেক অবদান। ওর কথা ফেলা যায় না। আধ ঘন্টার মধ্যেই পৌঁছে যায় মোখতারের বাসায়। মাঝবয়সী মোখতার প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী — গার্মেন্টস, রিয়েল এস্টেট বহু ধরনের ব্যবসা। একটা পত্রিকা বার করবার প্রবল ইচ্ছা তার — ব্যবসার সঙ্গে প্রিন্ট মিডিয়ার সংযোগ না থাকলে দ্রুত এগোনো যায় না। মোখতারকে দেখলে কিন্তু বোঝাই যায় না যে, দেশের সম্পদশালীদের মধ্যে সে-ও একজন। বেশভুষায় কথাবার্তায় নিতান্ত সাদামাটা। শানশওকত যা ওর ঘরদোর আর আসবাবপত্রে। আড্ডা ভালোই জমে ওঠে। সবাই পূর্বপরিচিত — ফরমালিটির বালাই নেই।

কথাচ্ছলে একটু যেন কৌতুকমেশানো সুরে বলে ওঠে সাকলাইন, –তোমরা বোধহয় জানো না আরিফ এক বিশাল গ্রন্থ... এক মহাভারত লেখার কাজে হাত দিতে যাচ্ছে।

–তাই নাকি? বেশ বেশ, তো মহাভারতটা কি নিয়ে? মুচকি হেসে বলে তৌফিক, একটি দৈনিক পত্রিকার নিউজ এডিটর।

–শাজাহান সাহেবের বায়োগ্রাফি, বলে সাকলাইন, ভালোই, কী বলো?

–সার্টেনলি, ওনার মত একজন ভার্সেটাইল জিনিয়াস, তার চেয়ে বড় কথা এমন একজন ফিলানথ্রপিস্ট সমাজে ক’টা নজরে পড়ে? ইংরেজি দৈনিকের বিশিষ্ট পোস্ট এডিটরিয়াল লেখক শওকতের মন্তব্য।

–আরে রাখো তোমার জিনিয়াস, ফিলানথ্রোপিস্ট! হি ইজ ওয়াইডলি নোউন অ্যাজ অ্যা উইমেনাইজার...। নিট পেগ খানেক কোঁত করে গিলে কথাগুলো বলে সুবৃহৎ এক প্রকাশনা সংস্থার স্বত্বাধিকারী বদরুদ্দিন মোল্লা।

–ওক্কে, ধরে নিলাম তোমার কথা ঠিক। কিন্তু কোন পুরুষটা এ ব্যাপারে ধোয়া তুলসীপাতা, অ্যাঁ? কে এমন আছে যে সুন্দরী নারীর শরীর মনে মনে চাটে না? কোন নারীই বা সুঠাম পুরুষ দেখলে ভাইস ভার্সা... কারও সামর্থ্য বা সাহসে কুলায়, কারও কুলায় না; কেউ লুকিয়ে চুরিয়ে, কেউ খোলামেলা — এই যা, মিথ্যা বললাম? একজন মানুষের বিচার তার কাজ দিয়ে, মানুষের কল্যাণে তার অবদান দিয়ে; ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি কেন? মোপাসঁ, পিকাসো বা হালের ক্লিনটনকে তোমরা কোন অ্যাঙ্গেল থেকে বিচার করবে? — আই অ্যাডমিট, তুলনাটা একটু বাড়াবাড়ির পর্যায়েই পড়ে গেল, শওকত কিছুটা ঝাঁজালো সুরেই বলে।

শাজাহান প্রসঙ্গ থেকে অন্য প্রসঙ্গে আলোচনা সরে যায়। অনেক রাত পর্যন্ত চলে আড্ডা। বাড়ি পৌঁছে টের পায় আরিফ সবাই গভীর ঘুমে ডুবে আছে। কোনওমতে বিছানায় গিয়ে সটান শুয়ে পড়ে সে — নুসরাত টেরও পায় না।





আজ সকাল থেকেই ইলশেগুঁড়ি। সেই সাথে শনশনে বাতাস। নিম্নচাপ। এ ধারা ক’দিন চললে শীত নামবে আগেভাগেই। সন্ধ্যার একটু পরেই আরিফ পৌঁছে যায় শাজাহান আলীর বাসায়।

মনীষার কার পার্কিঙের ক্যান্টিলিভারে লাগানো মার্কারি লাইটের আলো পড়ে বৃষ্টি-ভেজা ফুলগাছ আর প্লান্টগুলো চিকচিক্ করছে — মুখ টিপে হাসছে যেন আরিফকে দেখে।

ড্রইং রুমে গিয়ে বসল আরিফ। কিছুক্ষণের মধ্যেই সফেদ ঝুল-পাঞ্জাবি আর ঢোলা পাজামা পরে এসে উপস্থিত হলেন শাজাহান সাহেব। কী সজীব — কী পবিত্র এক অলৌকিক দ্যুতি ছড়িয়ে রয়েছে লোকটার সারা দেহে, আরিফ অভিভূত, ক’মুহূর্ত বাকহীন, তাঁকে দেখে উঠে দাঁড়ায়।

–আরে বসো, বসো। ক্যামন আছো, হাউ ইজ লাইফ? সিভাস রিগালের বোতল আর দুটো গ্লাশ টেবিলের ওপর রাখতে রাখতে বলেন শাজাহান আলী। মাইনুদ্দিন অন্যান্য জিনিসপত্তর জায়গামত সাজিয়ে রেখে যায়।

–আপনার জীবনী — আই মিন বায়োগ্রাফি লেখার কাজটা তাড়াতাড়ি শুরু করা দরকার। একটু সোজাসাপ্টাভাবেই কথাটা পাড়ে আরিফ।

–ল্যাখো, তোমাকে দেরি করতে বলেছে কে? নিজের গ্লাশে সোনালি তরল ঢালতে ঢালতে নিরাবেগ গলায় বলেন শাজাহান আলী।

–আগামী বিষ্যুৎবার থেকেই তাহলে কাজটা শুরু করা যাক স্যার, কি বলেন?

–করো, সংক্ষিপ্ত জবাব দেন শাজাহান আলী। মোবাইল সেটটা নিয়ে বারবার টিপতে থাকেন। তারপর দাঁতে দাঁত ঘষে বিরক্তিভরা কণ্ঠে গজরাতে থাকেন, –হোয়াট অ্যা হেল, রিং হচ্ছে অথচ নো অ্যান্সার...। মোবাইল ফেলে রেখে আড্ডা মারতে বেরিয়েছেন নিশ্চয়ই অ্যাটেনডেন্ট সাহেব! ব্যাটারা বোঝে না তাদের খামখেয়ালি আরেকজনের টেনশন কতটা বাড়িয়ে দিতে পারে! কিছু মনে করো না আরিফ; আমি ইদানীং লুজ টেম্পার্ড হয়ে পড়েছি...। হ্যাঁ আরিফ, ওই মেয়েটা — ওই যে ইয়াসনা, যার কথা তোমাকে বলেছিলাম, এখন তো বৃদ্ধা, না হলেও পঁয়ষট্টি বছরের বুড়ি, আমি আর ও তো প্রায় সমবয়সী, তাই না? নাউ আই অ্যাম অ্যান ওল্ডম্যান, শি টূ...। সময়... ওনলি টাইম ইজ ইম্পারশ্যাল টু এভরি ওয়ান!

–যোগাযোগ আছে এখনও স্যার?

–শি ইজ অ্যাট দ্য থ্রেশোল্ড অফ হার এন্ড... অনেকদিন ধরে লিউকেমিয়াতে ভুগে ভুগে এখন...

কথা শেষ করতে পারেন না শাজাহান আলী, গলা বুজে আসে, চশমাটা খুলে পাঞ্জাবির খুঁটে চোখ মোছেন। তারপর এক ঢোকে গিলে ফেলেন গ্লাশের অবশিষ্ট হুইস্কি।

–আজও সকালে ওকে দেখতে গিয়েছিলাম, কী অবস্থা, আহ্! ওর চিকিৎসার কোনও ত্রুটি তো রাখিনি। ঢাকা, দিল্লি, সিঙ্গাপুর — কিন্তু কোনও ফায়দা হল না...। দুহাত নেড়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন, হাহ্!

–ইটস্ ভেরি স্যাড, স্যার...

–সব্বাইকে পেরোতে হবে ওই দরজা — পেরোতেই হবে, এ নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। যন্ত্রণাটাই হল গিয়ে ম্যাটার অব কনসার্ন। তবে ইয়াসনার সাথে জড়ানো আমার আবেগ টিকে থাকবে যতদিন আমি ওই দরজাটা না পেরোই...। জানো, মানুষে মানুষে সম্পর্কটা নিছক আবেগ বই কিছু নয়। কাঁপা হাতে হুইস্কি ঢেলে নিলেন শাজাহান — অনেকখানি। আরিফের গ্লাশেও ঢেলে দিলেন। বিস্মিত আরিফ শুধু দেখতে থাকল ওঁর এই ব্যতিক্রমী আচরণ। লম্বা চুমুকে অর্ধেক গ্লাশ শুষে নিয়ে শাজাহান আলী বললেন, জানো, ইয়াসনার ডিভোর্স হয়ে যাওয়ার পর আমাদের মধ্যেকার পুরনো সম্পর্ক আবার চাঙা হয়ে ওঠে। আমি, তুমি বিশ্বাস করবে, আমি তখনও নারী পুরুষের শরীর-রসায়ন সম্পর্কে ছিলাম একদম অনভিজ্ঞ। অতটা বয়স পর্যন্ত কোনও নারীর শরীরে ডুব দেইনি — আমার নিজের কাছেই আনবিলিভেবল মনে হয় ব্যাপারটা এখন। ইয়াসনাই প্রথম আমাকে দীক্ষা দেয় এই শাস্ত্রে। আই শ্যুড সে ফ্রাংকলি, ওই যে আমার জীবনের দ্বিতীয় টার্নিং পয়েন্ট, যেটা বলেছিলাম সেদিন, ওটা ছিল এই এক্সপেরিয়েন্স। ইঞ্জিনিয়ারের সাথে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার পর ও নিজেকে পুরোপুরি সমর্পণ করে আমার কাছে।

তোমার ভাবি — আই মিন লুৎফার সাথে বিয়ের পরও ইয়াসনা আর আমার সম্পর্ক থেকেই যায়। সামাজিক প্রতিষ্ঠা প্রতিপত্তি যত বাড়তে থাকে সঙ্গিনীদের সংখ্যাও তত বাড়তে থাকে। বাট নেভার আই কমিটেড এনিথিং রং টু দেম। ওরা আমাকে চাইতো — আমিও রুচিতে না বাধলে কাউকে প্রত্যাখ্যান করতাম না। অবশ্য ইয়াসনা ছাড়া অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ক শরীরেই সীমাবদ্ধ ছিল।

কথা কিছুটা জড়িয়ে এসেছে শাজাহান আলীর। সিগারেট ধরাতে গিয়ে ফিল্টারের দিকে ধরালেন এবং উৎকট স্বাদে থতমত খেয়ে চকিতেই শুধরে নিলেন ভুলটা। আরিফও মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ায় শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে। ওয়াশরুমে যেতে নিয়ে হোঁচট খায় সেন্টার টেবিলের পায়ায়। টেবিলের ওপর রাখা জিনিসপত্তর ঝনঝনিয়ে ওঠে। দুবার হিক্কা ওঠে ওর। মাথা সোজা রাখতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। ওয়াশরুম থেকে ফিরে এসে গ্লাশে সামান্য যেটুকু ছিল ঢেলে দেয় গলার ভেতর। আরিফের সম্মুখের আসবাবপত্র, দেয়ালের পেইন্টিংগুলো কেমন ঝাপসা।

শাজাহান আলী সিজনড্ অ্যালকোহলিক। পরিমাণটা আজ একটু বেশি হলেও নিজেকে সংযত রেখেছেন — ওই সিগারেটের ব্যাপারটাই যা একটু...

–কী ব্যাপার ইয়াং ফ্রেন্ড গেটিং টিপসি... বেশি আনইজি ফিল করছ?

–নো, নট দ্যাট মাচ, ইটস্ ও-ও-ক্যায় স্যার... বলে আরিফ।

–বাই দ্য ওয়ে, কথাটা তোমাকে বলা হয়নি, গতকাল আই মেট অ্যা উইম্যান, ম্যারেড বাট সো স্মার্ট অ্যান্ড গুড লুকিং...

–এই বয়সেও আপনি যা…, কী যে বলব স্যার, ভাষা খুঁজে পাই না, হে হে হেসে ওঠে আরিফ।

–বয়সটা কিছু নয়, মন, মনটাকে ইয়াং রাখলে দেখবে তুমি ইয়াং ম্যান অব থারটি। কাল যে মহিলার সাথে পরিচয় হল, কে বলবে তার ছেলে কলেজে পড়ে। দেখে মনে হয় বিলো থার্টি...

–কুড ইউ অ্যাবল টু ম্যানেজ হার, স্যার?

–তুমি সব কিছুতেই ওই একই গন্ধ খোঁজো ক্যানো? স্বার্থ ছাড়া কী কারও উপকার করতে নেই? তাছাড়া বেশি কথা হয়নি। যদ্দুর জেনেছি মেয়েটির হাজব্যান্ড একটা ভ্যাগাবন্ড, ওয়ার্থলেস ক্রিয়েচার...। ওকেই সংসারের বোঝা টানতে হয়। ইনস্যুরেন্সের চাকরি। খুব মায়া হল ওর জন্য। মায়া হল খুব। এক নিশ্বাসে কথাগুলো আউড়ে যান শাজাহান আলী।

–ওই মা-য়া-টা-ই তো খেলো আপনাকে, স্যা-য়্যা-র, — টেনে টেনে মুখ বেঁকিয়ে বলে আরিফ।

স্বাভাবিক ভরাট গলায় বলেন শাজাহান আলী, মানুষের জন্য যার ফিলিংস্, সিমপ্যাথি নেই সে আবার মানুষ নাকি হে? ব্যাঙ্কের এমডিকে বলে দিয়েছি, কথা দিয়েছে হেলপ্ করবে। ব্যবসায়ীদের তো ডিপেন্ড করতেই হয় ব্যাঙ্কের ওপর। এমডির মন জোগাতে ইনস্যুরেন্স কম্পানিকে ব্যবসা দেবে, এ আর এমন কী?

রাত ভালোই হয়েছে। ওষুধের কৌটোটা সেই কখন রেখে গেছে মাইনুদ্দিন। আড়মোড়া ভেঙে বলে ওঠেন শাজাহান আলী, ওয়েল মাই ফ্রেন্ড, নেকস্ট থারসডে থেকে বায়োগ্রাফিটায় হাত দিচ্ছ, তাই না? আমি জানি কলোস্যাল এই কাজটা একমাত্র তোমার পক্ষেই করা সম্ভব। তোমার ভেতর প্রতিভার আগুন দেখি আমি। তো আজকের মত ওঠা যাক, কি বলো?




পাঁচ পেগ হুইস্কি আরিফের স্নায়ুগুলোকে শরীরের কোষ থেকে আলগা করে দিচ্ছে; যেমন আলগা করা হয় পাট থেকে আঁশ। সামনের সবকিছু অর্থহীন অবাস্তব ঠেকছে ওর কাছে। দুলছে সবকিছু... ঝাপসা ঝাপসা কিছু ছায়া দুলছে তো দুলছেই। চোখের পাতা খোলা রাখতে কষ্ট হচ্ছে খুব। সশব্দ হেঁচকি ওঠে পর পর ক’বার। জিব-জড়ানো অসংলগ্ন, অস্পষ্ট ঘড় ঘড় শব্দ বেরোয় ওর গলা থেকে : বা-য়ো-গ্রা-ফি ...।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন