সোমবার, ২৫ এপ্রিল, ২০১৬

সৈয়দ শামসুল হক | তেলেনাপোতা আবিষ্কার গল্পের কলকব্জা

এই যে আমরা এতকাল এত গল্প পড়েছি, একবার দেখি না কেন, লেখক তার গল্পটিকে সময়ের কোন থাকে দেখছেন। তিনি কি এমন দেখছেন যে গল্পটি এইমাত্র ঘটে গেছে, এই কিছুক্ষণ আগে, এবং তিনি লিখছেন? অথবা, অনেক আগে ? কিম্বা এই মুহুর্তেই তার চোখের ওপর সব ঘটছে এবং তিনি বয়ন করে চলেছেন গল্প? অথবা তিনি এভাবেই কি দেখেন তার গল্প যে, এই গল্প আগেও ঘটেছিল, এখন ঘটছে এবং ভবিষ্যতেও ঘটবে - লেখক কীভাবে দেখছেন তার গল্পটিকে, কোন কালে, তার সংকেত পাওয়া যাবে গল্পে প্রযুক্ত ক্রিয়াপদের কালরূপটিতে।
বাংলা ছাড়া অপর যে-ভাষার সাহিত্যের সঙ্গে আমাদের কিছুটা পরিচয় আছে, সেই ইংরেজি ভাষায় দেখতে পাই গল্প-উপন্যাসে ক্রিয়াপদের একটি বিশেষ রূপই প্রযুক্ত হয়, সাধারণ অতীত রূপ-হি সেড়, শি লাফড, দে ওয়েন্ট; এর ব্যতিক্রম যে ওদের ভেতরে নেই তা নয়— আছে, তবে তা ষোলো আনাই পরীক্ষামূলক। ইংরেজি ভাষায় একজন গল্পলেখকের হাতে খুব স্বাভাবিকভাবেই ক্রিয়াপদ তার সাধারণ অতীত রূপটি নিয়ে ধরা দেয়, এতেই তার কাজ চমৎকার চলে যায়; গল্পটিকে তিনি কালের কোন পর্যায়ে ঘটতে দেখছেন সেটা আমাদের অনুমান করে নিতে হয় ভেতরের অন্য সাক্ষ্য প্রমাণ থেকে।

কিন্তু বাংলা ভাষার লেখকের বেলায় পরিস্থিতিটা অন্য রকম। একটু আগে ইংরেজি কথাসাহিত্যে দেখেছি এই রূপ-হি সেড, শি লাফড, দে ওয়েন্ট, বাংলা ভাষায় যখন লিখছি, অনিবার্যভাবেই কি লিখছি- সে বললো, সে হাসলো, তারা গেলো ? না। একটু লক্ষ করলেই দেখব, বাঙালি লেখকের হাতে এইটে ছাড়াও ক্রিয়াপদের আরো অন্তত দুটি রূপ আছে যা তিনি ব্যবহার করতে পারেন; যেমন, সে বলেছিলো, সে হেসেছিলো, তারা গিয়েছিলো, এবং, সে বলে, সে হাসে, তারা যায়। আর এই রূপটিও আছে লেখকের হাতে- সে বলেছে, সে হেসেছে, তারা গিয়েছে।

অর্থাৎ বাংলা ভাষায় একজন কথাশিল্পীর জন্যে অপেক্ষা করছে ক্রিয়াপদের একাধিক রূপ যা তিনি কাজে লাগাতে পারেন- বলে-বলেছে-বলেছিলো-বললো, হাসে-হেসেছে-হেসেছিলো-হাসলো, যায়-গিয়েছে-গিয়েছিলো-গেলো। এবং ক্রিয়াপদের এই রূপগুলোর যে-কোনো একটিকে তিনি মূল রূপ হিসেবে ধরে নিয়ে গল্প নিৰ্মাণ করতে পারেন। তার গল্পটিকে তিনি কালের কোন দূরত্বে দেখছেন, এখন অথবা তখন কিংবা সারাক্ষণ-গল্পের সেই ঘটে যাবার কালের ওপরেই সম্পূর্ণ নির্ভর করে ক্রিয়াপদের বিশেষ একটি রূপ নির্বাচন।

গল্প থেকে লেখকের এই কালিক দূরত্ব, যার নির্ধারক লেখক স্বয়ং, এখন আমাদের পর্যবেক্ষণের বিষয়। কারণ, আর কিছুক্ষণের ভেতরেই আমরা দেখবো প্রেমেন্দ্র মিত্র তার একটি গল্পে ক্রিয়াপদের এমন এক রূপ প্রয়োগ করেছেন যা গল্প লেখার ইতিহাসে অভাবিত, অপ্রত্যাশিত এবং অভূতপূর্ব-বাংলা ভাষায় তো বটেই, ইংরেজিতেও এর তুল্য প্রযুক্তি আমি দেখি নি। আমার বলতে লোভ হয়, গোটা বিশ্ব সাহিত্যেই প্রেমেন্দ্র মিত্রর তেলেনাপোতা আবিষ্কার' নিৰ্মাণ-কৌশলের দিক থেকে অনন্য, শ্রদ্ধেয় এবং পথিকৃৎ এক রচনা।

তবে, তেলেনাপোতা আবিষ্কার'-এর আগে আমরা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করবো এবং বাংলা গল্পে ক্রিয়াপদের বিভিন্ন রূপ কীভাবে প্রযুক্ত হয়েছে তা জেনে নিয়ে তৈরি হবো: প্রেমেন্দ্র মিত্রর বিভিন্ন গল্প থেকেই উদাহরণগুলো নেবো।

সে বলে-করে-হাসে-গায়-নাচে- 'পুন্নাম' গল্প থেকে।

অসুখ আর কিছুতেই সারে না। কাসি সর্দি সারে তো খোসে সর্বাঙ্গ ছেয়ে যায়, খোস গিয়ে লিভার ওঠে ঠেলে, তারপর ন্যাবায় ধরে। চার বছরের ছেলেটাকে নিয়ে যমে-মানুষে টানাটানি চলেছে তো চলেইছে। পাকাটির মতো সরু চারটে হাত-পা নড়বড় করে, ফ্যাকাশে হলুদবরণ মুখে কাতর অসহায় চোখ দুটি জ্বলজ্বল করে- সে চোখে বিশ্বের সকল ক্লান্তি, সকল অবসাদ, সকল বিরক্তি যেন মাখানো। শিশুর চোখ সে নয়, জীবনের সমস্ত বিরস বিস্বাদ পাত্রে চুমুক দিয়ে তিক্তমুখে কোনো বৃদ্ধ যেন সে চোখকে আশ্রয় করেছে। শুধু ওই অসহায় কাতরতটুকু শিশুর।

সারাদিন কান্না আর অন্যায় বায়না। ছবিও এক-এক সময় আর পারে না। হঠাৎ

পিঠে এক থাবড় মেরে বলে, 'মর না, মরলে যে হাড় জুড়োয় আমার।'

সে বলেছে-করেছে-হেসেছে-গেয়েছে-নেচেছে- “মহানগর" থেকে।

এইবার সে কেঁদেছে। কে জানে কারা নিয়ে গেল দিদিকে ধরে। তারা হয়ত দিদিকে মারছে, হয়ত দিচ্ছে না খেতে । দিদি হয়ত রতনকে দেখবার জন্য কাঁদছে। এ কথা ভেবে তার যেন আরও কান্না পায়।

বাবা তাকে আদর করেছেন কান্না দেখে। মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছেন, “কান্না কেন বাবা?”

চুপি চুপি রতন বলেছে, “দিদি যে আসছে না বাবা!"

মুকুন্দ শিশুর সজাগ মনের রহস্য না জেনে বলেছে, “আসবে বৈকি বাবা, শ্বশুরবাড়ি থেকে কি রোজ রোজ আসতে আছে।"

রতন আর বেশি কিছু বলেনি। কিন্তু বাবা তার কাছে কেন লুকোতে চান বুঝতে না পেরে তার বড়ো ভয় হয়েছে।

তারপর একদিন সে শুনেছে যে দিদিকে নাকি পাওয়া গেছে। দারোগা সাহেব পুলিশ নিয়ে গিয়ে তাকে নাকি কোন দূরদেশ থেকে খুঁজে বার করেছেন। দিদিকে খুঁজে পাওয়া গেছে।"

সে বলেছিলো-করেছিলো-হেসেছিলো-গেয়েছিলো-নেচেছিলো- কলকাতার ‘আরব্য রজনী' থেকে।

এই বকবকানিতে নীলাম্বরের বিরক্তির বদলে একটু মজাই লেগেছিল এবার।

কতকটা ভৎসনার ভঙ্গীতে বলেছিল, ‘তুমি সব জানো না - একেবারে সব হাড়ির খবর।’ চোখটা অন্ধকারে সয়ে আসায় লোকটার পোশাক-পরিচ্ছদ চেহারা আরেকটু স্পষ্ট দেখতে পেয়েই তুমি বলে সম্বোধন করতে পেরেছিল নীলাম্বর। চেহারা পোশাক আখখুটে ইতর গোছেরই মুখটা ভালো দেখা না যাওয়ায় বয়সটা অবশ্য বোঝা যায় নি।

লোকটা নীলাম্বরের ভৎসনায় একটু শুধু হেসেছিল। সহিষ্ণুতার হাসি যেন। বলেছিল, "আমি জানব না তো জানবে কে, স্যার। এই শহরের হাড়ির খবর নাড়ির খবর কি আমি না জানি ।"

নীলাম্বরের এবার স্থির বিশ্বাস হয়েছিল লোকটা পাগল-টাগল হবে। তবে ভয় করবার কিছু নেই। নীলাম্বর গায়ে দস্তুরমত ক্ষমতা রাখে, আমন একটা ফড়িংকে টুসকি মেরে উড়িয়ে দিতে পারে। আপাতত রিকশা মেরামত না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার সময়টা পাগলের সঙ্গে কাটাতে মন্দ লাগছিল না।

নীলাম্বর একটু বিদ্রুপ করেই বলেছিল, “নাড়ির খবর হাড়ির খবর কি করে এত জানলে ।"

সে বললো-করলো-হাসলো-গাইলো-নাচলো- "ভবিষ্যতের ভার' থেকে।

টিকে বেশ ধরে উঠেছিল; প্রস্তুত কলকেটি হুকোর মাথায় রেখে হাতটি এগিয়ে দিয়ে সেকেন্ড পণ্ডিত মশাই বললেন, ‘নিন মশাই।'

বললাম, “মাপ করবেন।"

হেড পণ্ডিত মশাই পেছনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন, হাত বাড়িয়ে হুকোটা নিয়ে বললেন, তামাক খান না, ওই সিগারেটগুলো খান তো। ওগুলোর কাগজ যে মশাই ধুতু দিয়ে জোড়ে– তা জানেন - সদ্য ওই মেম মাগীদের থুতু।"

ঘৃণায় এক ধাবড়া থুতু পণ্ডিত মশাই ঘরের দেয়ালেই ফেললেন। তারপর হুকোর খোলটি ডান হাতে কর্কশ চেটো দিয়ে মুছে একট টান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, ‘পায়েস ছেড়ে আমানি।"

যে চারটি গল্প থেকে উদ্ধৃতি দেয়া হলো— পুন্নাম', 'মহানগর’, ‘কলকাতার আরব্য রজনী' ও ভবিষ্যতের ভার', এর সবই প্রেমেন্দ্র মিত্রর লেখা, এবং এই যে তিনি একেকটি গল্পে ক্রিয়াপদের একেক বিশেষ রূপ প্রয়োগ করেছেন এর দায়িত্বও সম্পূর্ণ তারই।ইংরেজি ভাষার একজন লেখকের মতো, যদি জিজ্ঞাসিত হন, তিনি পাশ কাটিয়ে যেতে পারবেন না এই বলে যে, ক্রিয়াপদের কোন রূপ গল্পে প্রযুক্ত হবে তা ঐতিহ্য বা রেওয়াজ হিসেবে আমি পেয়েছি ও কাজে লাগিয়েছি। গল্পের জন্যে বাংলা ভাষায় ক্রিয়াপদের যে চারটি রূপ আমরা হাতের কাছে সারাক্ষণ পাই, প্রেমেন্দ্র মিত্রর আগেও লেখকেরা তাদের গল্পে ব্যবহার করেছেন, তার পরের লেখকেরাও করেছেন; তাই বাংলা ভাষার লেখক হিসেবে প্রেমেন্দ্র মিত্র এবং আমাদের প্রত্যেককেই দায়িত্ব বহন করতে হয় ক্রিয়াপদের বিশেষ রূপটি সচেতনভাবে নির্বাচন করে নেবার ব্যাপারে; সচেতনভাবে, কারণ, ক্রিয়াপদই হচ্ছে বাক্যের বাক্য হয়ে ওঠার হেতু। এটা তো বলবার অপেক্ষা রাখে না যে, ক্রিয়াপদের রূপ বাক্যের মাত্রা রচনা করে, তাই সে করে এবং সে করেছিলো এ দুই সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বাক্য, একটির সঙ্গে আরেকটির বিনিময় চলে না। যদি মনে হয়, আমি এমন একটি প্রসঙ্গ তুলেছি যা শিশুতেও বোঝে, অর্থাৎ সে করে এবং সে করেছিলো" এ দুই যে ভিন্ন অর্থদ্যোতক- এ আমার না বললেও চলতো; তাহলে এখন বলি, এই সোজা ব্যাপারটাই কিন্তু বাঙালি লেখকের গল্প লেখাটিকে কিঞ্চিৎ জটিলতা দান করেছে। যেহেতু সে করে এবং সে করেছিলো এ দুই ভিন্ন মাত্রার বাক্য, তাই লেখককে গল্প লেখার আগেই খুব হিসেব করে ঠিক করে নিতে হয় ক্রিয়াপদের কোন রূপটি তিনি ব্যবহার করবেন তার হাতের এই বিশেষ গল্পটির জন্যে। ক্রিয়াপদের রূপ যেহেতু সম্পূর্ণ কালনির্ভর, তাই লেখককে ভেবে নিতে হয় গল্পটিকে তিনি কোন কালিক দূরত্বে দেখছেন। দেখছেন অথবা দেখেছেন? দেখেন কিংবা দেখেছিলেন? এবং এই বিশেষ একটি রূপ বেছে নেয়া, এটা যে কেবল কালিক দূরত্ব ঠিক করে নেয়ার ওপরেই নির্ভর করছে তাও নয়, বরং আমার মনে হয়, গল্পটির প্রতি লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি এবং গল্পের অস্তিত্বকে ব্যাখ্যা করে ওঠা, এ সবেরও সমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

‘পুন্নাম’ গল্পে প্রেমেন্দ্র মিত্র ক্রিয়াপদের বলে-করে-হাসে-গায় রূপটি ব্যবহার করেছেন; আমরা একটু কান পেতে শুনি না কেন, ক্রিয়াপদের এই বিশেষ রূপটি কোন ভাবের দিকে আমাদের ডাকছে বলে, করে, হাসে, গায়, আসে, যায়, পড়ে-যেনবা এই ক্রিয়াগুলোর শুরু নেই, শেষ নেই, বৃত্তের মতো ঘুরে ঘুরে ঘটে চলেছে, হয়ে চলেছে, বারবার, আবার, আরো একবার, অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ ঘিরে, বিরামহীন। তাই নয় কি ? পুন্নাম' গল্পটিকেও প্রেমেন্দ্র মিত্র দেখেছেন বারবার অভিনীত হয়েছে, হয়, হচ্ছে ও হবে এমন একটি ইতিহাস হিসেবে। এক দম্পতির শিশুপুত্র অসুস্থ, তাকে ভালো করবার জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা করেছে তরুণ দম্পতি। স্বামীটির “মাসে যা আয় হয় তাতে মুদির ঋণ শোধাই চলে না, তা ডাক্তার। কিছু তবু সে চেষ্টার কোনো ক্রটি রাখেনি" ডাক্তার ছেলেটিকে নিয়ে হাওয়া বদল করতে যাবার পরামর্শ দিয়েছেন, কিন্তু সঙ্গতি কোথায়? ললিত অর্থাৎ স্বামীটি রাতে বিছানায় স্ত্রীর “পিছন ফিরে শুয়ে মনে মনে চেঙ্গে যাবার টাকা সংগ্রহের অসংখ্য আজগুবি কল্পনা করে”। অসুস্থ ও অর্থাভাবে পিষ্ট এই বাড়িটির কলতলায় বুনো কী একটা গাছে নামহীন গন্ধহীন ফুল ফুটেছে। প্রেমেন্দ্র মিত্র বলছেন, ও যেন দীন সংসারের মুখে হতাশার হাসি "আর তার পরেই তিনি লিখেছেন ছোট্ট একটি অনুচ্ছেদ, যা আমাদের সংকেত দেয়- কেন লেখক এ গল্পের জন্যে নির্বাচন করেছেন ক্রিয়াপদের করে-হাসে-বলে রূপটি – এই ছোটো সংসারটির ভেতরেই কিন্তু মানুষের সেই পুরাতন কাহিনীর একটি ক্ষীণ ধারা শ্রান্তভাবে বয় দিন থেকে রাতে, রাত হতে আবার নতুন দিনে – মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার আমানুষিক কৃচ্ছসাধনার অসামান্য আত্মবলিদানের কাহিনীর ধারা।"

এই ধারাটিকেই প্রেমেন্দ্র মিত্র আরো বানান করে উচ্চারণ করেন গল্পের শেষ দিকে, যখন হাওয়া বদলের জায়গায় নতুন একটি শিশুর সঙ্গে আমাদের অসুস্থ শিশুটির বন্ধুত্ব হয়, আমাদের অসুস্থ শিশুটি ভালো হয়ে উঠেছে, কিন্তু হঠাৎ স্থানীয় অপর শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়ে ও মারা যায়, দূর থেকে কান্নার রোল ভেসে আসে। ললিত বিছানা থেকে নেমে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর ঘরের মধ্যে গেল আর আমাদের ছেলে বেঁচে উঠল- আশ্চর্য নয় ছবি? '

ছবি একবার শিউরে উঠল মাত্র, উত্তর দিল না। ললিত মাথা নিচু করে পায়চারি করে বেড়াতে বেড়াতে বলে যেতে লাগল, আমরা অনেক ত্যাগ করেছি, অনেক আমাদের এত চেষ্টা এত কষ্ট স্বীকার যে বৃথা ছবি – স্বর তার অত্যন্ত অস্বাভাবিক।

ছবি বিরক্ত হয়ে বললে, “তোমরা মাথা খারাপ হয়েছে।"

লক্ষ না করে পারব না, এই শেষ দিকে প্রেমেন্দ্র মিত্র ক্রিয়াপদের করে-বলে কাঁদে রূপটি ব্যবহার না করে করলো-বললো-কাঁদলো রূপটি প্রয়োগ করেছেন। যেনবা তিনি বিশাল থেকে ক্ষুদ্রে এসে প্রবেশ করলেন, মাঠ থেকে ঘরে, সমষ্টি থেকে ব্যক্তিতে— বিশেষ এই ব্যক্তিটির করোটিতে, যার স্বার্থপরতা দেখে তারই স্ত্রী বলতে বাধ্য হচ্ছে, "তোমার মাথা খারাপ হয়েছে।' প্রেমেন্দ্র মিত্র যদি এই শেষভাগেও ক্রিয়াপদের আগের রূপটি প্রয়োগ করে যেতেন তাহলে আমাদের মনে যে ভাবটি তিনি গ্রহণ করতে বলতেন, তা হলো, এই স্বার্থপরতাই সত্য এবং চিরকালের। কিন্তু প্রেমেন্দ্র মিত্রর বক্তব্য তা নয় এবং তা যে নয়, তার প্রমাণ গল্পের শেষে এসে তার ক্রিয়াপদের রূপ পরিবর্তন করা।

“মহানগর" গল্পে প্রেমেন্দ্র মিত্র ক্রিয়াপদের দুটি রূপ ব্যবহার করেছেন, বলেছে-করেছে-গিয়েছে এবং বলে-করে-গিয়ে। দেখাই যাক না, এই দুই রূপ কীভাবে কখন কোন ভাবনায় প্রেমেন্দ্র মিত্র নির্ণয় করে নিয়েছেন।

আকাশের তলায় পৃথিবীর ক্ষতের মতো, আবার যে-মহানগর উঠেছে মিনারে মন্দিরছড়ায়, আর অভ্ৰভেদী প্রাসাদশিখরে তারাদের দিকে, প্রার্থনার মতো মানবাত্মার 'লেখকের দুটি হাত যতদূর প্রসারিত হয় ততদূর প্রসারিত করে এই যে তিনি আমাদের ডাক দিলেন, অচিরেই কিন্তু বলছেন, আমি শুধু মহানগরের একটুখানি গল্প বলতে পারি- মহানগরের মহাকাব্যের একটুখানি ভগ্নাংশ, তার কাহিনী সমুদ্রের দু'একটি ঢেউ 'কিন্তু হাত গুটিয়ে আনতে চাইলেই তো চট করে পারা যায় না, মাপ ছোট করতে চাইলেই কি সহজে তা করা যায় - তাই বিশাল মহানগরের এক অংশে একটি মাত্র চরিত্র নিয়ে গল্প যখন শুরু করলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র, তিনি একেবারেই হঠাৎ সেই বিশেষ পরিবেশের সমান্তরালে নিজেকে স্থাপিত করতে পারলেন না, করলে সেটা মসৃণ ও স্বাভাবিক হতো না, তাই চরিত্র বা ঘটনার পাশাপাশি হাঁটা তাঁর পক্ষে সম্ভব হলো না, তিনি একটু ওপর থেকেই দেখতে লাগলেন সব কিছু। জোয়ারের টানে ভেসে চলেছে নৌকো, মাঝিরা বড়ো নদীতে বরাবর এসেছিল দাঁড় টেনে, এখন তারা ছই-এর ভেতর একটু ঘুমিয়ে নিচ্ছে। শুধু হালে বসে আছে মুকুন্দ, আর তার কাছে কখন থেকে চুপটি করে গিয়ে বসেছে রতন তা কেউ জানে না- সেই বুঝি রাত না পোহাতেই 'আমরা লক্ষ না করে পারি না ক্রিয়াপদের চলেছে-বসেছে রূপটি। রতনের মনে হয়েছে সব তারা যেন নেমেছে জলের ওপর। নদী তখন মহানগরের নাগাল পেয়েছে। আমরা অনুভব করে উঠি বিশাল থেকে বিশেষে এই যে আমাদের নিয়ে যাচ্ছেন লেখক, এর জন্যে ক্রিয়াপদের এই রূপটি কত জরুরি ছিল। তারপর নৌকো যখন মহানগরের ঘাটে এসে লাগলো, ক্রিয়াপদ হয়ে গেল করে-বলে-ওঠে। মুকুন্দদাস নৌকা থেকে জলে নেমে ডাঙায় ওঠে। পিছন দিকে হঠাৎ চোখ পড়ায় ধমক দিয়ে বলে, ‘তুই নামলি যে বড়।"

রতন বাবার দিকে কাতরভাবে তাকায়। মুকুন্দ একটু নরম হয়ে বলে, “আচ্ছা, কোথাও যাস নি যেন, ওই কদমগাছের তলায় দাঁড়াগে যা।"

আমরা অচিরেই জানবো যে রতন তার দিদিকে মনে মনে এই মহানগরে খোঁজে। আমরা অস্পষ্টভাবে আরো জানতে পারবো যে, রতনের দিদিকে গুণ্ডারা ধরে নিয়ে গিয়েছে; আমাদের অনুমান হবে, রতনের দিদি এই মহানগরে বেশ্যা পল্লীতে হয়তো আছে, হয়তো তাকে বিক্রি করে দিয়েছে সেই গুণ্ডারা; কিন্তু কিছুই স্পষ্ট নয়, বরং আমাদের চেয়ে রতনের ধারণা অনেক বেশি স্পষ্ট, সে বিশ্বাস করে এই মহানগরেই তার দিদি আছে। দিদির কথা সে আগে বহুবার বাবাকে শুধিয়েছে, লেখক তখন ক্রিয়াপদের করেছে-বলেছে রূপটির সাহায্য নিয়েছেন।

রতন এখন বাবার চোখ এড়িয়ে মহানগরে বেরিয়ে পড়ে এবং ভাগ্যচক্রে এক বেশ্যা পল্লীতেই প্রবেশ করে; সেখানে এক বেশ্যা রমণীই তাকে নিয়ে যায় চপলা নামে এক যুবতীর কাছে। রতনের দিদির নাম ছিল চপলা। যুবতী রতনকে বুকে জড়িয়ে ধরে। এদিক ওদিক চেয়ে ধরা গলায় বলে, তুই একা এসেছিস "ভাইবোনে এভাবেই মহানগরে দেখা হয়। লক্ষ করবো, গল্পের সংক্ষিপ্ত আভাস দিতে গিয়ে আমি ব্যবহার করেছি ধরে-বলে-পড়ে-যায়; প্রেমেন্দ্র মিত্র মূল গল্পেও তাইই করেছেন-রতন দিদির বুকে মুখ লুকিয়ে থাকে, কিছু বলে না।" ক্রিয়াপদের এই রূপটি না ব্যবহার করে যদি লিখতেন, রতন দিদির বুকে মুখ লুকিয়ে রইল, কিছু বলল না" তাহলে কি রচিত হতো, রক্ষিত হতো, ভাগ্যতাড়িত অসহায় দুটি ভাইবোনের বিচ্ছেদ ও আকস্মিক সাক্ষাতের এই স্পন্দিত বেদনাটুকু ?

গল্পের শেষে আমরা দেখছি, রতন দিদির কাছে থাকতে চায়, কিন্তু দিদি তাকে রাখবে কী করে দিদি তাকে জোর করে বিদায় দেয়। রতন হেটে যায় বড় রাস্তা পর্যন্ত। চপলা তখনও দাড়িয়ে আছে 'রতন তার কাছে এসে হঠাৎ বলে, বড়ো হয়ে আমি তোমায় নিয়ে যাব দিদি। কারুর কথা শুনব না।" বলেই সে এবার সোজা এগিয়ে যায়। তার মুখে আর নেই বেদনার ছায়া মহানগরের ওপর সন্ধ্যা নামে বিস্মৃতির মতো গাঢ।

গল্পটি এখানেই শেষ : শেষ হয়েও যে শেষ হয় না; রতন যে আমাদের কানে বারবারই বলে যেতে থাকে, আমি তোমায় নিয়ে যাব দিদি, কারুর কথা শুনব না।" এবং বারবার যে মহানগরের ওপর বিস্মৃতির মতো গাঢ় অন্ধকার নামে, আমরা যে বুকের ভেতরে তোলপাড় নিয়ে অনুভব করে উঠি— শেষ পর্যন্ত বিস্মৃতিই সত্য, সূর্যোদয় ও সূর্যস্ত যে সময়ের বহমানতার সংকেত, সেই সময় আমাদের সব কিছু একদিন ভুলিয়ে দেয়, রতনও একদিন ভুলে যাবে তার দিদির কথা, দিদিকে দেয়া তার প্রতিজ্ঞার কথা; এই বেদনা ও এই সত্য, এ কেবল ক্রিয়াপদের ঐ করে-বলে-আসে-যায় রূপটির ভেতর দিয়েই আমাদের বুকের ভেতরে অবিরাম এখন ঢেউ ভাঙ্গে যতদিন এ গল্প আমাদের মনে পড়বে, এভাবেই এ ঢেউ এসে আমাদের পাড়ে আঘাত করবে- এখানেই ক্রিয়াপদের এই বিশেষ রূপটির যাদু।

“কলকাতার আরব্য রজনী' গল্পে আমরা পাই করেছিলো-বলেছিলো-হেসেছিলো-গেয়েছিলো, ক্রিয়াপদের এই মূল রূপ। একটি ছোট পরীক্ষা করা যাক; এই যে ক্রিয়াপদ চারটি আমি এখন বলেছি, যদি এ চারটি শব্দ খুব দ্রুত উচ্চারণ করে যাই, লক্ষ করবো, এক ধরনের চটুলতা ফুটে উঠছে, যেনবা কারো পায়ে ঘুঙুর বেঁধে দেয়া হয়েছে; আবার ঐ শব্দ চারটিই যদি টেনে টেনে উচ্চারণ করি, কী আশ্চর্য, আমরা দেখতে পাবো, রচিত হচ্ছে কম্পমান এক বিষাদ। এবার আমার ধারণাটির কথা বলা যায়; ক্রিয়াপদের এই বিশেষ রূপটির ভেতরে লুকিয়ে রয়েছে একই সঙ্গে চটুলতা ও বিষন্নতা; এবং একে খুব ভালোভাবেই কাজে লাগিয়েছেন প্রেমেন্দ্র মিত্র তার এই গল্পে। নামেই রয়েছে সংকেত– ‘কলকাতার আরব্য রজনী', তার নিচে আবার উপশিরোনাম কয়লা চোরের কেচ্ছা; আমরা ঘন হয়ে উঠি মজাদার কিছু শোনবার জন্যে, কারণ, একে আরব্য রজনী, তায় কেচ্ছা-কিন্তু প্রেমেন্দ্র মিত্রর মতো লেখক কেবল মজাদার 'কেচ্ছা’ শোনাতে কলম ধরবেন, ভাবা যায় না; অতএব এর ভেতরে নিশ্চয়ই কিছু কথা আছে, আছে মানব জীবন সম্পর্কে কোনো আবিষ্কার, কোনো পর্যবেক্ষণ। অতঃপর গল্পটি পাঠ করে উঠে আমরা অনুভব করি, কেচ্ছা তো বটেই, সেটা মোড়ক মাত্র, ছিড়ে ফেলবার বস্তু, এ গল্পের ভেতরে রয়েছে মানুষ সম্পর্কে লেখকের এই পর্যবেক্ষণটি যে, মানুষ গড়িয়ে নিচে পড়ে যাবার জন্যেই প্রস্তুত, প্রেম ভালোবাসাও মানুষকে মানুষ হিসেবে ধরে রাখতে পারে না, মানুষ কেবলই নষ্ট হয়ে যেতে চায়, নষ্ট হয়ে যায়।

গল্পটি এই যে, এক তরুণ দম্পতি, বড় গরীব তারা— চৌকাঠ পেরিয়ে কদিনই বা সংসারে ঢুকেছে; কিন্তু এরই মধ্যে হালে পানি না পেয়ে ফেসে গেছে পাথুরে ডুবো ডাঙায় "এখন তারা শেষ কড়ি খরচ করে শেষ বাসর সাজিয়েছে, ফুল কিনে এসেন্স আতর ছড়িয়ে "অতঃপর তারা আত্মহত্যা করবে। এদিকে ওই রাতেই এক চোর চুরি করে ফেরার পথে গোপনে এই দম্পতির কথা শোনে, তারপর করুণায় সে তার চুরি করা বেশ কিছু টাকা দম্পতিটির জন্যে রেখে যায়। সেই টাকায় তাদের দারিদ্র্য ঘোঁচে, তারা আবার জীবনের স্বাদ ফিরে পায়; আর, চোরটি- তার নাম বেচারাম, বেচারামের সেই এক নেশা লাগল, স্যার। ভগবান হওয়ার নেশা, পঞ্চ রংয়ের চেয়ে কড়া। কিছুদিন অন্তর অন্তর বেশ কিছু লুকিয়ে সেখানে ঢেলে আসে।”

প্রেমেন্দ্র মিত্র গল্পটি বলেছেন মাঝরাতে পার্কে রহস্যময় বাউণ্ডুলে এক ব্যক্তির জবানীতে এবং স্বয়ং তিনি যেন শুনছেন; কেচ্ছার মোড়কটা এখানেই। গল্পের শেষদিকে এসে সে বলছে, ঘর-দোর পাল্টেছিল, শেষে পাল্টাল মানুষ । একদিন চোর বেচারাম এসে দ্যাখে, রাতদুপুরে সিড়ির কাছে মেয়েটি বসে আছে, তারপর রাত দেড়টার সময় ছোকরা এলো, স্যার। বুঝতেই পারছেন, মদ খেয়ে এসেছে কোন হুরীর ঘর থেকে কে জানে। দুজনে তারপরে কি চিল্লামিল্লি চুলোচুলি। নেহাৎ দুপুর রাত বলে কাক চিল ওড়েনি।

মেয়েটি বলে, মানতাসার জন্যে টাকা রেখেছিলাম, তুমি তাই চুরি করে গিয়ে ফূর্তি করেছ।” ছেলেটা বলে, বেশ করেছি। মানতাসা গড়বে। গয়নার লালচ আর মেটে না ।"

চোর লুকিয়ে লুকিয়ে দেখে যেতো এদের সংসার, আজ এই যা সে দেখলো তাতে তার ভগবান সাজবার নেশা ছুটে গেলো। অন্য বাড়িতে চুরি করে ফিরছিলো সে, ঝুলির ভেতরে ছিলো টাকা পয়সা সোনার গয়না; সে আজ গোপনে এদের বাসায় রেখে গেলো কিছু গয়না। আমাদের মনে হতে পারে, চোর বেচারাম বুঝি আরো একবার করুণায় উথলে উঠে সাহায্য করে গেলো ওদের কিংবা, পুরুষটির ওপর তার রাগ হয়েছে, তাই সে স্ত্রীটির জন্যে রেখে গেছে গয়না, যা নিয়ে আজ রাতের এই কলহ। চোর এ গল্প বলেছিলো পার্কের সেই লোকটিকে যার নাম নীলাম্বর, আর নীলাম্বর এখন বলছে লেখককে, এই দু'হাত ফেরা গল্পের এখানে এসে যেমন আমরা, তেমনি নীলাম্বর এবং লেখক, সকলেই উদগ্রীব হয়ে উঠি-অতঃপর?

তারপর? জিজ্ঞাসা না করে পারে নি নীলাম্বর। তারপর আর বেশি কিছু নেই, স্যার। ছোকরার জেল হল চোরাই গয়না বেচতে গিয়ে ধরা পড়ে "আমাদের সন্দেহ থাকে না, বেচারাম ঐ পুরুষটিকে শাস্তি দেবার জন্যেই চোরাই গয়না রেখে গিয়েছিলো, সাহায্য করবার জন্যে নয়। গল্পটি যখন ঘটেছে আর গল্পটি আমরা যখন জানতে পারছি-সময়ের দূরত্ব এ দুয়ের ভেতরে কম বেশি যাই থাক না কেন, লক্ষ করতে হবে এর বক্তা স্বয়ং চোরের মুখে বর্ণিত ঘটনার শ্রোতা, এবং শুনবার পর, কত পরে আমরা জানি না, সে বলছে লেখককে এবং তিনি বলছেন আমাদের। প্রেমেন্দ্র মিত্র এই বাক্সের ভেতরে বাক্স থেকে পায়রা বের করবার কৌশলটি অবলম্বন করেছেন আরব্য রজনী' ও 'কেচ্ছা'র মেজাজ আনবার জন্যে; আর তাকে যে ক্রিয়াপদের করেছিলো-খেয়েছিলো-বলেছিলো-হেসেছিলো রূপটি ব্যবহার করতে হয়েছে, সেটা শ্রুত ঘটনা বিবৃত করার কারণে যতটা, ততটাই চটুলতা ও বিষন্নতাকে একই সঙ্গে ধরে দেখাবার প্ররোচনায়।

ক্রিয়াপদের বললো-করলো-হাসলো-গাইল রূপটি “ভবিষ্যতের ভার" গল্পের শুরুতে ব্যবহার করা হয়েছে। লক্ষ করবো ক্রিয়াপদের এই বিশেষ রূপটি আমরা প্রতিদিন সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে থাকি। ক্রিয়াপদের এই রূপটির কাজই হচ্ছে কাজের কথাটি সরাসরি হাজির করা; এবং এই রূপটির রেখে যাওয়া ঢেউ হচ্ছে, ঐ যা ঘটে গেলো তার রেশ এখনো রয়েছে, এখনো সেটা ফুরিয়ে যায় নি। “ভবিষ্যতের ভার" গল্পে প্রেমেন্দ্র মিত্র এমন এক তরুণ শিক্ষকের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন যে মাস্টারির চাকরি পাবার পর স্ত্রীকে বলছে, মানুষ জাতটাকে গড়ে তোলবার ভার আমাদের ওপর, তা জানো - প্রাণ দিয়ে করলে এর চেয়ে বড়, এর চেয়ে শক্ত কাজ আর আছে " এই গল্পের ভেতরে অতঃপর যত অগ্রসর হবো, দেখতে থাকবো- কীভাবে তার প্রাণশক্তি ফুরিয়ে আসছে, বাধা তাকে কাবু করছে, এবং শেষে একদিন সে নিজেই আবিষ্কার করতে পারছে, যে-শিক্ষকতা ও যে-শিক্ষাদান রীতিকে সে ঘৃণা করতো, সে নিজেই কবে সেই শিক্ষকে রূপান্তরিত হয়ে গেছে।

স্কুলের শেষ দুটো ঘন্টায় মাথার যন্ত্রণা অসহ্য হয়ে ওঠে।

ডাক্তার বলেছে, কিছুদিন রেষ্ট নিন না- আপনিই সেরে যাবে।'

বলি, হ্যা, এইবার নেবো ভাবছি- আচ্ছা এর কোনো ওষুধ টষুধ দেয়া চলে না তো?"

কিছু না। শুধু বিশ্রাম নিলে আপনি সেরে যাবে।'

ক্লাসে শেষ দুঘন্টায় কিছুতেই বই খুলে পড়তে পারি না।

আর সত্যিই মাঝে মাঝে লিখতে দেওয়া তো আর খারাপ নয়। লেখাটাও তো দরকার। আমি তো আর ফাঁকি দেবার জন্যে লেখাচ্ছি না- লেখার ভেতর দিয়েও তো ছেলেদের বেশ আনন্দের সঙ্গে শিক্ষা দেওয়া যায়। ভেবেচিত্তে লেখার একটা খেলাও তো বার করা যেতে পারে।

ছেলেদের বলি, কে কোন অক্ষর নিবি বল।"

এফ. স্যার, আর-স:

বেশ । আজকের পড়া থেকে নিজের নিজের অক্ষর যে কটা কথার আগে আছে খুঁজে খুঁজে খাতায় লিখে ফেল দেখি। দেখি কার ভাগে কটা অক্ষর পড়ে।


বেশি করে ছেলেদের আর বোঝাতে হয় না। ক'দিন ধরেই তারা এ খেলা করছে- জানে। তারা উৎসাহের সঙ্গে বলে, হ্যাঁ, স্যার ।"

এই তো বেশ লেখার পদ্ধতি। ধরতে গেলে মাথা থেকে বেশ ভালো মতলবই বেরিয়েছে। একটা ছেলে অত্যন্ত তাড়াতাড়ি খাতা দিয়ে বলে আমার ওয়াই ছিল, স্যার, হয়ে গেছে।"

"আচ্ছা এবার ই ধরো

কী বোঝে জানি না, কেউ খাতা নিয়ে আসে না।

হঠাৎ ঘন্টার শব্দে জেগে উঠি।

চমকে দেখি

ঘুমছিলাম

টেবিলের ওপর পা তুলে দিয়ে চেয়ারের পিঠে মাথা রেখে ঘুমচ্ছিলাম।"

প্রেমেন্দ্র মিত্র তার এই গল্পের শুরুতে ক্রিয়াপদের যে বললো-করলো-হাসলো-গাইল রূপ ব্যবহার করেছেন তা আমাদের একটানে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে সেই স্কুলটিতে যেখানে আমাদের তরুণ শিক্ষকটি নতুন কাজ নিয়ে এসেছে। তারপর যখন দরকার হলো এই চাকুরি নেবার পূর্বকথা জানাবার-ক্রিয়াপদ হয়ে গেলো করে-বলে-হাসে-গায় এবং এই রূপটিই ধরে লিখিত হলো গল্পের শেষ দীর্ঘ পর্বটি। শিক্ষকটি যে ক্রমশ তার স্বপ্ন, সাহস ও মেরুদণ্ড হারাচ্ছে, এই যে শেষ পর্যন্ত হয়, মানুষ এভাবেই যে একদিন পতিত হয়- এই ভাবটি ফুটিয়ে তোলবার জন্যেই ক্রিয়াপদের এই বিশেষ রূপটিকে লেখক বেছে নেন।

ক্রিয়াপদের যে চারটি রূপের কথা এতক্ষণ বলা হলো, বাঙালি গল্প লেখকের হাতে এই রূপগুলো ছাড়াও অন্য কোনো রূপ আছে কিনা, আমি অনুমান করি, সম্ভবত এরকম কোনো ভাবনা প্রেমেন্দ্র মিত্রর মনে একদা এসেছিলো। রবীন্দ্রনাথের পরে বাঙলা ভাষায় এখন পর্যন্ত যে সামান্য কয়েকজন প্রধান গল্প লেখকের সাক্ষাৎ আমরা পেয়েছি তাদের মধ্যে প্রেমেন্দ্র মিত্র অবশ্যই একজন এবং আমার বিবেচনায় তিনি বুধগণের মধ্যেও উজ্জ্বলতম, কারণ কালোত্তীর্ণ গল্প রচনাই তিনি করেছেন কেবল তা নয়, তিনি গল্পের নির্মাণ কৌশল নিয়েও কালোত্তীর্ণ পরীক্ষা করেছেন, সম্পূর্ণ নতুন একটি দরোজা খুলে দিয়েছেন, আর সেটি তার তেলেনাপোতা আবিষ্কার গল্পে।

সে বলবে, সে হাসবে, তারা যাবে-ক্রিয়াপদের ভবিষ্যৎ রূপটি যে গল্প বলবার কাজে লাগতে পারে, এ আমরা ধারণাই করি নি। প্রতিদিনের ব্যবহারে ক্রিয়াপদের ভবিষ্যৎ রূপটির ভূমিকা, আমরা অবাক হয়ে লক্ষ করি, আমাদের ধারণার চেয়েও ব্যাপক আমরা অনেক কথাই ভবিষ্যৎ ছাড়া জ্ঞাপন করতে পারি না, যদিও এসবের বক্তব্যে ভবিষ্যতের ভূমিকা এমন কিছুই নয়, যেমন- এখন খাবো, এবার ঘুমোবো, চিঠি লিখবো, আসবে তো কখন আসবে, কী বলবো দুঃখের কথা। আমার সন্দেহ হয়, কাউকে যদি বলা হয় ক্রিয়াপদের ভবিষ্যৎ রূপ প্রয়োগ না করে এক বেলা সংসারে ওঠাবসা করতে, সে পারবে না, বাজি হারবে। প্রতিদিনের সংসারে আমরা গল্প করবার কালেও ক্রিয়াপদের ভবিষ্যৎ রূপটি বেশ ব্যবহার করি, যদিও বর্ণিত গল্পের সবটাই ঘটে গেছে অতীতে। যেমন, মনে করা যাক, পূর্বে কেউ দুর্ঘটনায় পড়েছে, সেই গল্প বলা হচ্ছে, বলতে বলতে আহত ব্যক্তিটির পথ চলার অন্যমনস্কতা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলা হয়- তুমি দেখবে ও হাঁটছে, তোমারই পাশে পাশে, তুমি ডাকবে, তোমার পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে, ফিরে তাকাবে না, যত হাত নাড়ো দেখতেই পাবে না।

কিন্তু গল্প বলার লৌকিক এই ভঙ্গিটি আমরা সাহিত্যে কখনো ব্যবহার করেছি বলে আমার মনে পড়ে না-সম্পূর্ণ ভবিষ্যৎ রূপ প্রয়োগ করে রচনা তো দূরের কথা; পরীক্ষাটি অপেক্ষা করছিল একজন প্রেমেন্দ্র মিত্রর জন্যে।

এবং যে-কোনো প্রতিভাবান শিল্পীর মতো প্রেমেন্দ্র মিত্রও জানেন, ক্রিয়াপদের এই ভবিষ্যৎ রূপটি পাঠকের অভ্যেসকে ক্ষুন্ন করবে, চমকিত করবে, গল্পের চেয়েও কৌশল বড় হয়ে যাবার সম্ভাবনা দেখা দেবে- এবং আমরা জানি, রচনার চেয়ে কৌশল যখন বড় হয়ে দাঁড়ায় তখন সেটা শিল্প না হয়ে খেলায় পরিণত হয়; অতএব তিনি এমনভাবে অগ্রসর হন গল্পটিকে নিয়ে যেন আমরা বুঝতে না পারি ভেতরে ভেতরে কতখানি চমকপ্রদ তার বলবার কৌশলটি ।

প্রথমত, গল্পের নামই আমাদের উন্মুখ করে সমুখের জন্যে, ঐ আবিষ্কার' শব্দটি সংকেত দেয়— কোনো কিছু আবিষ্কৃত হবার অপেক্ষায় রয়েছে, হ্যাঁ, ভবিষ্যতে; এবং আমরা পাঠক হিসেবে গল্পের ভেতরে কেবল নয় ভবিষ্যতেরই বলয়ে প্রবেশ করে যাই শিরোনাম উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে। তারপর, খুব মৃদু কষ্ঠে, কিছুটা ইতঃস্তত করে- এবং সবই লেখকের ইচ্ছাকৃত ভান, ক্রিয়াপদের ভবিষ্যৎ রূপটির ভেতরে আমাদের ডেকে নেবার কৌশল এ, প্রেমেন্দ্র মিত্র শুরু করেন তাঁর গল্প এভাবে- শনি ও মঙ্গলের, মঙ্গলই হবে বোধ হয়-যোগাযোগ হলে তেলেনাপোতা আপনারাও একদিন আবিষ্কার করতে পারেন।"

এখানে, গল্পের এই প্রথম অনুচ্ছেদে, ক্রিয়াপদের ভবিষ্যৎ রূপ ব্যবহার করা হয় নি, তবে যে রূপটি ব্যবহার করা হয়েছে, তা প্রায় ভবিষ্যৎসূচক- যদি যান তবে আবিষ্কার করতে পারেন, যেন একটি পরামর্শ, কেবল একটি নির্দোষ প্ররোচনা মাত্র। এই প্রথম অনুচ্ছেদে লোভও দেখানো হচ্ছে, তেলেনাপোতায় গেলে মাছ ধরবার ভারী সুবিধে আছে। দ্বিতীয় অনুচ্ছেদের শুরুতেই লেখক আপনার অনেক কিছুই স্থির বলে ধরে নিয়েছেন; যেমন, আপনি মাছ ধরতে ভালোবাসেন, আপনি আপিস থেকে দুদিন ছুটি পেয়ে গেছেন এবং এখন আপনি তেলেনাপোতায় যাবার জন্যে পা বাড়িয়েছেন। তাই দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ শুরু হচ্ছে দুম করে এভাবে -

“তেলেনাপোতা আবিষ্কার করতে হলে একদিন বিকেলবেলার পড়ন্ত রোদে জিনিসে মানুষে ঠাসাঠাসি একটা বাসে গিয়ে আপনাকে উঠতে হবে, তারপর রাস্তার কাঁকানির সঙ্গে মানুষের গুতো খেতে খেতে ভাদ্রের গরমে ঘামে, ধুলোয় চটচটে শরীর নিয়ে ঘন্টা দুয়েক বাদে রাস্তার মাঝখানে নেমে পড়তে হবে আচমকা।"

লক্ষ না করে পারি না, লেখক এই দীর্ঘ বাক্যে যাত্রার যে কষ্টের ইঙ্গিত দিয়েছেন তা আমাদের সাবধান বা পিছপা করবার জন্যে কেবল নয়, কিছু পরিমাণে আড়াল করে রাখবার জন্যেও বটে যে, এখান থেকেই তিনি আমাদের ক্রমাগত এখন ভবিষ্যতের দিকে ঠেলবেন। এই প্রথম ক্রিয়াপদ পেয়েছে ভবিষ্যৎ রূপ- এবং এখনো পরামর্শ ও পথ-সংকেতের সূত্রেই এই ভবিষ্যৎ রূপটি প্রযুক্ত হয়ে চলেছে, কিন্তু অচিরেই ফেরার পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে আপনার, কারণ- একটা সাঁতসেতে ভিজে ভাপসা আবহাওয়া টের পাবেন। মনে হবে নিচের জলা থেকে একটা ক্রুর কুণ্ডলিত জলীয় অভিশাপ ধীরে ধীরে অদৃশ্য ফণা তুলে উঠে আসছে।’এবং আপনার পেছনের জগত, আপনার চেনা জগত, আপনার সমগ্র বাস্তব সেই কুণ্ডলিত জলীয় বাম্পের আড়ালে ঢাকা পড়ে যাবে।

লেখক ধরেই নিয়েছেন আপনি এখন তেলেনাপোতার পথিক, এবং তিনি এখন এই বাষ্প কুণ্ডলের সাহায্যে আপনাকে এতটাই বাস্তব থেকে বিযুক্ত করে ফেলেছেন যে, তিনি যা বলছেন তাইই আপনি মেনে নিচ্ছেন। গল্পে এই প্রথম, পথে বেরিয়ে এতটা এগোবার পর, আপনি জানতে পেরেছেন- আপনি একা নন, আপনার সঙ্গে আরো দু’জন বন্ধু আছেন, তারাও আপনারই সঙ্গে একই পথের পথিক।

লেখক আপনার ওপর এতটাই অধিকার এখন আয়ত্ত্ব করতে পেরেছেন যে, রীতিমতো তিনি আপনাকে হুকুম করছেন। তেলেনাপোতায় পৌছে আপনি একটা ভাঙা দালানের সমুখে নেমেছেন, লেখকের নির্দেশ– এই ধ্বংসাবশেষেরই একটি অপেক্ষাকৃত বাসযোগ্য ঘরে আপনাদের থাকার ব্যবস্থা করে নিতে হবে। আর এখানে আপনি রাতে দেখতে পাবেন দূরের একটি জানালায় কোনো রমণীর ছায়া এবং পরদিন মাছ ধরতে বসে দেখা পাবেন এক যুবতীর যে কলসি নিয়ে চলে যেতে যেতে ফিরে তাকিয়ে হঠাৎ বলবে, “বসে আছেন যে - টান দিন " আর আপনি সেই মেয়েটির কথা ভাবতে ভাবতে ঘরে ফিরে এসে জানতে পারবেন, আপনার সঙ্গে যে দু’জন বন্ধু আছেন তাদেরই একজন এই মেয়েটির আত্মীয়। এ খবরটিও লেখক আপনাকে আচমকা দিয়েছেন, আগে দেবার দরকার বোধ করেন নি। আমরা অবাক হয়ে লক্ষ করি, কীভাবে পাঠকের ওপরে লেখক তার নিয়ন্ত্রণ এতটাই প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছেন যে তিনি যা বলছেন, যেভাবে বলছেন, সেটাই বিশ্বাস করতে হচ্ছে- এবং অসহায়ভাবে নয়, লেখকেরই সহযোগী হিসেবে।

এবার গল্পটি সংক্ষেপে বলে নেয়া যায়। পুরনো এই দালানে থাকে যামিনী নামে এক যুবতী এবং তার অন্ধ মা— আর কোনো জনমানবের সাড়া নেই। দূর সম্পর্কের এক বোনপোর সঙ্গে যামিনীর বিয়ে ঠিক করেছিলেন তার মা; নিরঞ্জন নামে সেই বোনপো কথা দিয়েছিল বিয়ে করবে, কিন্তু সেটা ছিল বুড়ির হাত থেকে নিস্তার পাবার জন্যে একটা কথার কথা; নিরঞ্জন চিরদিনের মতো পালিয়ে যায়; বুড়ি এখনো অপেক্ষা করে আছে- নিরঞ্জন আসবে, এলে তার হাতে মেয়েকে সঁপে দিয়ে সে নিশ্চিন্তে চোখ বুজবে। নিরঞ্জন কখনোই আর আসে না, যামিনীর বিয়ে হয় না, যামিনী মেনে নিয়েছে তার আইবুড়ো জীবন, মা এখনো চেয়ে আছেন পথ, পায়ের শব্দ পেলেই তিনি চমকে ওঠেন— ঐ বুঝি নিরঞ্জন এলো। এই গল্পটিকে একদিক থেকে বলা যায়-স্থির একটি চিত্র, বিবর্ণ একটি ফটোগ্রাফ, মা ও মেয়ে-বিধ্বস্ত অট্টালিকার পটভূমিতে, চারদিকে এগিয়ে আসছে অরণ্য, আলোর চেয়ে অন্ধকারই এখানে প্রবল ।

কোনো গল্প কীভাবে বলবেন লেখক, সে সম্পূর্ণ তার ব্যাপার, সিদ্ধান্ত তারই— এ নিয়ে প্রশ্ন চলে না; একই গল্প যদি দু'জন লেখেন তবে দু'জনের কলমে দু’টো আলাদা গল্পই হবে। প্রেমেন্দ্র মিত্র, তার এ গল্পটি পড়বার পর সিদ্ধান্ত করতে পারি, স্থির করেন দুটি বিষয়-এক, মা ও মেয়ের এই স্থির জীবন আর কখনোই পরিবর্তিত হবে না; দুই, নিরঞ্জন ছাড়া জগতে আর কারো সাধ্য নেই, সম্ভবত সেই নিরঞ্জনেরও আর এখন ক্ষমতা নেই এই স্থির চিত্রে জীবন-সঞ্চার করতে পারে-বরং সে চেষ্টায় নষ্ট ভ্ৰষ্ট হতে হবে নিজেকেই; করুণা যদি করি এক মুহুর্তের জন্যে, তো প্রতিশোধ নেৰে স্বয়ং প্রকৃতি।

এবং তাইই হয়। যামিনীর এই ইতিহাস শুনে আপনি বীরত্ব অথবা করুণা দেখিয়ে তার অন্ধ মায়ের সমুখে নিরঞ্জন সেজেছিলেন; তিনি যখন বলেছিলেন, এবার তো আর অমন করে পালাবি না "তখন আপনি উত্তর দিয়েছিলেন, না মাসিমা, আর পালাব না ।"

বৃদ্ধ ছোট একটি নিশ্বাস ফেলে বললেন, “যামিনীকে তুই নিবি তো বাবা তোর শেষ কথা না পেলে আমি মরেও শক্তি পাব না।"

ধরা গলায় আপনি তখন শুধু বলতে পারবেন, “আমি তোমায় কথা দিচ্ছি মাসিমা । আমার কথার নড়চড় হবে না।"

তেলেনাপোতা আবিষ্কারে এসে এ আপনি কোন মায়ায় জড়িয়ে পড়লেন ? বন্ধনের চিহ্ন হিসেবে আপনি আপনার ছিপখানা ফেলে এলেন তেলেনাপোতায় যেন আবার ফিরে আসবেন, এবং যামিনীর কাছে। কিন্তু ওই যে বলেছি, প্রকৃতি নেবে শোধ– প্রকৃতির কাছে কোনো ভাবালুতার অবকাশ নেই– আপনাকে ধরবে ম্যালেরিয়া, বহুদিন শয্যাশায়ী হয়ে থাকবেন, কোনোদিন আর ফিরে যাওয়া হবে না সেই তেলেনাপোতায় কিংবা যামিনীর কাছে- কারণ, অস্ত যাওয়া তারার মত তেলেনাপোতার স্মৃতি আপনার কাছে ঝাপসা একটা স্বপ্ন বলে মনে হবে, তেলেনাপোতা বলে কোথাও কিছু সত্যি নেই। গম্ভীর কঠিন যার মুখ আর দৃষ্টি যার সুদুর ও করুণ, ধ্বংসপুরীর ছায়ার মত সেই মেয়েটি হয়তো আপনার কোনো দুর্বল মুহূর্তের অবাস্তৰ কুয়াশার কল্পনা মাত্র।"

প্রেমেন্দ্র মিত্রর মতো খুব বড় মাপের একজন লেখকই পারেন, শেষ পর্যন্ত গল্পের প্রাথমিক অনুমানটিও নিঃশেষে গুড়িয়ে দিতে, যে, তেলেনাপোতা বলে সত্যি সত্যি কিছু নেই, এবং তারপরও আমাদের কাছে দাবি করতে, যে, আমরা জীবনের একটি নির্মম সত্যের নিষ্করুণ উচ্চারণের সম্মুখে বিস্ময়ে, বেদনায়, সীমাবদ্ধতার ক্ষোভে একবার ভেঙে পড়বো এবং আরেকবার উঠে দাঁড়াবো তবে তাই হোক বলে।’

তার এই দাবির পেছনে জোর এনে দিয়েছিলো ক্রিয়াপদের ভবিষ্যৎ রূপ প্রয়োগের মতো তুলনারহিত পরীক্ষাটি।

পুনশ্চ উল্লেখ করি : প্রেমেন্দ্র মিত্রর কলমে এই বর্ণনা-গম্ভীর কঠিন যার মুখ আর দৃষ্টি যার সুদূর ও করুণ, ধ্বংসপুরীর ছায়ার মত সেই মেয়েটি আমাকে স্মরণ করায় রবীন্দ্রনাথের আঁকা নারীদের মুখ। গল্পের কলকজায় এই যোগটুকু নিতান্তই আকস্মিক বলে আমার মনে হয় না। এমন কি হতে পারে, রবীন্দ্র অংকিত ওই চিত্র দেখেই হয়তো একদিন প্রেমেন্দ্র মিত্রর করোটিতে এই গল্পের বীজ রোপিত হয়েছিলো ?

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন