সোমবার, ২৫ এপ্রিল, ২০১৬

মাহবুব লীলেন'এর গল্প | মাটি

ডালিম এখন ঘুমুচ্ছে। শিখু দাস জলপট্টি দেবার ন্যাকড়াটা হাতে নিয়ে উঠানে দাঁড়ায়। উঠানে টাটকা রোদ। কাপড়ের টুকরাটা ঘাসের উপর মেলে দেয়। আকাশে তাকায়। হাত দিয়ে সূর্য আড়াল করে কী যেন দেখে। উঠে ঘরের দিকে গিয়ে দাওয়া থেকে আবার ফিরে আসে। কাপড়টা কয়েক হাত টেনে এনে আবার মেলে দেয়। আবার আকাশে তাকায়।
দুই হাতে কাপড়টার দুই কোনা ধরে হাতে ঝুলিয়ে রাখে। ঘাড় ঘুরিয়ে আশেপাশে তাকায়। এক পাক ঘুরে এসে আগের জায়গায় দাঁড়ায় আবার। আবার কাপড়টা বিছিয়ে দেবার জন্য নুয়ে পড়ে। কিন্তু বিছায় না। উঠে দাঁড়ায় কাপড়টা হাতে নিয়ে। কয়েক কদম এগিয়ে বড়ো করে একটা চক্কর মারে। এবার তার চোখে পড়ে উঠানের একপাশে কাপড় মেলে দেবার জন্য একটা বাঁশ টানানো আছে। হাতের ন্যাকড়াটা নিয়ে সেদিকে এগিয়ে যায়। কাপড়টা ঝেড়ে বালি ফেলে বাঁশের উপর মেলে দেয়। অস্পষ্ট বিড়বিড় করে। আবার কাপড়ের টুকরাটা বাঁশ থেকে নিয়ে এসে উঠানে মেলে দিয়ে ধরে বসে থাকে। আকাশে তাকায়- কী রইদরে বাবা। জিতা মানুষ শুঁটকি কইরা ফালায়

মাথা ঘুরিয়ে কাপড়ের টুকরাটার দিকে তাকায় শিখু দাস। একটু হাসে- দূর শুকাইব কেমনে। আমিইতো ছায়া দিয়া বইসা আছি

এবার কাপড়টা পোটলা করে হাতে নিয়ে রোদের মুখোমুখি বসে। হঠাৎ তার কী যেন মনে পড়ে। পোটলা করা ভেজা কাপড়টা নিয়ে দ্রুত ঘরের দাওয়ায় উঠে। চাটাইয়ের দরজাটা টেনে দেয়া ছিল। সেটা সরাতে গিয়ে খেয়াল হয় হাতে ভেজা কাপড়ের পোটলা। আবার নেমে আসে উঠানে- দুরো কিচ্ছু মনে থাকে না আমার...

শিখু দাস কাপড়টা মেলে দেবার জন্য আবার উঠানের দিকে যেতে যেতে ঘরের ভেতর থেকে ডালিমের গোঙানি শোনে। আবার ফিরে যায় ঘরের দিকে। এক দৌড়ে। দরজা সরিয়ে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে কাপড়টা দরজার উপরে রেখেই ভেতরে চলে যায় শিখু দাস

খাটের উপর আঠারো বছরের ডালিম কাঁথাগুলোকে জড়িয়ে আছে নাকি কাঁথাগুলোই তাকে জড়িয়ে আছে বোঝার উপায় নেই। ওই কাঁথা এবং ডালিমের ভেতর থেকেই গোঙানির আওয়াজটা আসছে। শিখু দাস ডালিমের মাথায় হাত রাখে। জ্বরে পুড়ে যাচেছ কপাল। শিখু দাস ডালিমের মাথায় হাত বোলাতে থাকে- বাজান। বাজান আমি কাপড় ভিজাইয়া আনছি। মাথায় পট্টি দিলে জ্বর কমবো

পট্টির কথা মুখে আসতেই তার খেয়াল হয় জলপট্টির কাপড়টা কই? শিখু দাস ডালিমের কাঁথা সরিয়ে কাপড়টা খোঁজে। নেই। খাটের নিচে খোঁজে। নেই। দেয়ালে টাঙানো যিশুর ছবির পেছনে দেখে। সেখানেও নেই। কিন্তু তার স্পষ্ট মনে আছে পুকুর থেকে কাপড়টা সে ভিজিয়ে এনেছে। তাহলে কাপড়টা যাবে কোথায়? ডালিমের মা শিখু দাস ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ঘোরে আর ভাবে। কাপড়টা গেলো কই? বজ্জাত পোলাপানগুলাওতো আসেনি। তাহলে কাপড়টা নিল কে?

- যাউক। আমি আরেকটা ভিজাইয়া আনতাছি বাপ

ঘরের কোনা থেকে নিজের একটা শাড়ি হাতে নিয়ে বের হতে গিয়ে দরজার উপর ভেজা কাপড়টা দেখতে পায় শিখু দাস- দুরো জলপট্টির কাপড় আমি রোদে দিছি শুকাইতে। আমার যুদি একটাও কিছু মনে থাকে ঠিকঠাক মতো

একটানে দরজার উপর থেকে কাপড়টা নিয়ে নেড়ে চেড়ে দেখে এটা দিয়ে জলপট্টি হবে কি না। নাহ। আবার ভেজাতে হবে।... থাউক। এইটা থাউক। শাড়িটাই ভিজাই

শিখু দাস দুটো কাপড় নিয়েই উঠানে নামে। একবার ঘরের দিকে তাকায়। আবার রোদের দিকে। একবার একটা চক্কর দিতেই চোখে পড়ে কুটি তার ঘর থেকে বের হয়ে শার্ট গায়ে দিতে দিতে উঠান ক্রস করে যাচ্ছে। শিখু যাতে তাকে না দেখে সেজন্য শিখুর ঘরের দিকে মাথার ছাতাটা কাৎ করে মুখ ঢেকে কুটি দ্রুত পা চালায়। কুটি তার ছোট ভাই। ফ্যামিলির কর্তা সে। ভাইদের মধ্যে বড়ো আর বাবা ঘরবসা হবার পর সে এই বাড়ির অভিভাবক। ...কুটি ছোটখাট ঠিকাদারি করে; এই দু গাড়ি বালি কিংবা দুইশো বাঁশ সাপ্লাই। এই আর কি

কুটি উঠানের শেষ মাথায় আসার আগেই শিখু দৌড়ে গিয়ে তার ছাতার বাট ধরে পথ আগলে দাঁড়ায়। কুটি বিরক্ত- এই রইদের মইধ্যে ছাতা ধইরা টানাটানি করো ক্যান? কও কী হইছে?

- কুটি। ভাইরে আমার ডালিমরে একবার হাসপাতাল নিয়া যা রে ভাই

- এখন পারুম না। ম্যালা কাম আছে। সইন্ধ্যায় দেখুমনে

কুটি শিখুর হাত থেকে ছাতা ছাড়িয়ে সামনে পা বাড়ায়। শিখু পেছন পেছন দৌড়াতে থাকে- ভাইরে। ও কুটি। কুটি আমার ডালিমরে হাসপাতালে নিবি না ভাই?

কুটি আবার দাঁড়ায়- হাসপাতাল কইলেইতো হয় না। আইচ্ছা নিতে হইলে কাইল নেওয়া যাইব

- ডেইলি ডেইলিই তো কস কাইল নিমু

এইবার কুটি ক্ষেপে যায়- ক্যান আমি নিমু ক্যান? ওর বাপে নাই?

- ওর বাপেরে আমি পামু কই?

- না পাইলে বইয়া থাকো। আমার অত সময় নাই

কুটি আবারও পা বাড়ায়। বাড়ি ছেড়ে রাস্তার কাছাকাছি চলে এসেছে। শিখু আবারও গিয়ে পথ আগলায়- ভাইরে পোলাডারে একবার একটু দেইখা যা ভাই

- দেখার আবার কী হইছে ওর?

- শইলডা পুইড়া যাইতাছে

- এইডা কিছু না। জ্বর। ফুলু জ্বর। এইডা ফুলুর সিজন

- তুই একবার দেইখা যা

- দেখন লাগব না। রাইতে প্যারাসিটামল নিয়া আসুম। খাওয়াইয়া দিবা। এখন গিয়া ওর মাথায় পানি দেও ঠিক অইয়া যাইব


কুটি এগিয়ে যায়। শিখু দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ রোদের মধ্যে। আবার দৌড়াতে দৌড়াতে কুটির পথ আগলে দাঁড়ায়- ও কুটি। কুটি

- আবার কী হইল?

- না কিছু না। তোরে কী যেন কইতে আসছিলাম। ভুইলা গেছি। আইচছা তুই যা। রাইতে মনে কইরা প্যারাসিটামল নিয়া আসিস

শিখু দাস বিড়বিড় করতে করতে বাড়ির দিকে ফিরে আসতে আসতে খেয়াল করে তার হাতে দুটো কাপড়। সে মনে করতে পারে না কাপড়গুলো কিসের জন্য তার হাতে। এর মধ্যে একটা আবার একটু ভেজা। সে ভেজা কাপড়টা কাপড় মেলে দেয়া বাঁশে মেলে দেয় শুকানোর জন্য। তারপর হাতের শাড়িটার দিকে তাকায়। বোঝে না শাড়িটা তার হাতে কেন। একবার ভাবে হয়ত ধুয়ে দেবার জন্য নিয়ে এসছিল। নাহ। মনে পড়ছে না কিছুই

শিখু দাস হাতের পোটলা করা শাড়ি নিয়ে ঘুরতে থাকে উঠানে রোদের মধ্যে। কিছুতেই মনে করতে পারে না শাড়িটা সে কেন হাতে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে এসছিল। এর মধ্যে ভেতর থেকে ডালিমের গোঙানি শোনা যায়। শব্দটা শুনেই শিখু হাতের শাড়িটা নিয়ে ঘরের দিকে দৌড় লাগায়

ডালিম বিছানায় পোটলা হয়ে শুয়ে আছে। মাঝেমাঝে কাৎরাচ্ছে। শিখু ডালিমের মাথায় বুকে হাত বুলায়। পুরো শরীর আগুন হয়ে আছে। শিখু হাত বোলাতে বোলাতে যিশুর ছবির দিকে তাকায়- ঘুমা বাবা। ঘুমা। রাইতে তোর মামায় প্যারাসিটামল আনবো। ঘুমা। যিশুরে ডাক। যিশুর ইচ্ছায় মানুষের কুষ্টি ব্যারামও ভালো হইছে। দেখ দেখ ছবিটার দিকে দেখ। যিশু তোরে দেখতাছে। যিশুরে বল তোরে ভালা কইরা দিতে। বল ডালিম। যিশুরে ডাক। যিশু ছাড়া গতি নাই বাবা। ঘুমা। তোর কিছু হয় নাই। খালি একটু জ্বর হইছে। ফুলু জ্বর। এইটা ফুলুর সিজন। রাইতে তোর মামায় ওষুধ আনবো। ওষুধ খাইলে যিশু তোরে ভালা কইরা দিবো বাপ। ঘুমা

ডালিম কাৎরাতে কাৎরাতে হয় ঘুমিয়ে পড়ে না হয় চুপ হয়ে যায়। কিন্তু শিখু দাস সত্যি সত্যি ঘুমিয়ে পড়ে ডালিমের শরীরে মাথা দিয়ে। ডালিম কোনো নড়াচড়া করে না আর। শিখু ঘুমায় আর স্বপ্ন দেখে; কুটি এক বস্তা প্যারাসিটামল নিয়ে এসে ঢুকেছে। ঢুকেই ঘুমানোর জন্য শিখুকে গালাগালি করছে- পোলারে খালি আদর কইরা ধইরা রাখলেই অইব? আদরে জ্বর ছাড়ে না। জ্বর ভালা হওনের লাইগা ওষুধ খাওয়াইতে অয়। উঠো

শিখু দাসের নিজেকে অপরাধী মনে হয়। আসোলেই তো। ওষুধ তো খাওয়াইতেই হইব। কুটিকে অন্য সময় যত খারাপ মনে হয় এখন ততটা মনে হয় না। মনে হবেই বা কেন? এই কুটি আছে বলেইতো ছেলেটাকে নিয়ে খেয়ে পরে থাকতে পারছে। ...কুটি একা মানুষ। তারও সংসার আছে। বৌটা পোয়াতি। বাবা ঘরবসা। মা। ছোট দুইটা ভাই। সবইতো কুটির উপর। খামাখা তার উপর রাগ করার কিছু নেই। কতদিক সামলাবে? তাই যখন পারে না তখন আবোলতাবোল করে

শিখু দাস ডালিমের উপর শুয়ে শুয়ে স্বপ্ন দেখে; কুটি সবগুলো ওষুধ বস্তা থেকে বের করে একটা কাগজের উপর রাখে। তার কাছে পানি চায়। সে গ্লাসে করে পানি বাড়িয়ে দিলে কুটি রেগে উঠে- অতগুলান ওষুধ এই গ্লাসের পানিতে হইব? কলসি কই?

শিখু কলসিটা বাড়িয়ে দেয় কুটির দিকে। কুটি সবগুলো ওষুধ খুলে কলসির ভেতরে ঢোকায়। তারপর হাত ঢুকিয়ে ওষুধগুলো পানির সাথে মেশায়। মেশানো শেষ হলে তার দিকে তাকায়- কই তোমার পোলারে হা করতে কও। ওষুধ খাইব

শিখু দাস ডালিমের দুই চোয়াল ধরে হা করায়। কুটি কলসিটা তুলে আস্তে আস্তে ডালিমের মুখে ওষুধ-গোলা পানি ঢালতে থাকে। ...কুটিটা কোনো কামের না। ঠিকমতো ওষুধের পানিটাও ঢালতে পারে না। পোলাটার মুখ আর মাথাও ভিজে যায় ওষুধের পানিতে। কিন্তু কিছু বলারও উপায় নেই। বললেই বলবে- এই কাম এর থাইকা ভালা কইরা কোনো ডাক্তারেও করতে পারব না। কেমনে পারব? এক কলসি ওষুধ এইটুকু একটা মুখে ঢাললে কিছু না কিছু তো বাইরে পড়বই

তর্ক করা কুটির ছোটবেলার অভ্যাস। শিখু আর কিছু বলে না। তর্ক করলেও কুটির মায়া আছে। এক বস্তা ওষুধ কিনে এনে নিজের হাতে খাওয়াচ্ছে। ডালিমের দিকে তাকিয়ে শিখুর খেয়াল হয় ছোট বেলা কিছু খাওয়াতে গেলেই ডালিম যা খেতো বাইরে ফেলত তার দশ গুণ। এখন অনেকটা সেরকমই দেখাচ্ছে তাকে। তবে এটা সে ইচ্ছা করে করেনি। সে তো ঘুমে। কুটিই ঠিকমতো মুখে ওষুধ ঢালতে পারেনি বলে বাইরে পড়ে গেছে

পুরো কলসি শেষ না হওয়া পর্যন্ত শিখু ডালিমের মুখটা হা করে ধরে রাখে। কলসিটা শেষ হয়ে যাবার পর আস্তে আস্তে আঁচল দিয়ে ওর মুখ মোছায়। ঠিক যেমন ছোটবেলা খাওয়ানোর পর মুখ মুছিয়ে দিত। কিন্তু অতবড়ো ছেলের মুখ কি ওষুধ খাওয়ানোর পর মোছানো সম্ভব? অনেক বড়ো মুখ। মুখটা সে মোছানো শুরু করেছে মাত্র; ডালিম লাফ দিয়ে বিছানায় বসে ধাক্কা দিয়ে ওর হাত সরিয়ে দেয়- তোমারে না কইছি ময়লা শাড়ি আমার মুখে ছুয়াবা না?

- তোর মুখে ওষুধ লাইগা আছে। দে মুইছা দেই

- লাগব না

ডালিম নিজেই হাত দিয়ে এক ঝটকায় মুখ মুছে বিছানায় উঠে দাঁড়ায়। শিখু দাস হাহাকার করে উঠে- কী করস? শুইয়া থাক

- সরো তো। খালি এক ঘ্যানঘ্যানানি। শুইয়া থাক। শুইয়া থাক। খালি খালি শুইয়া থাকন যায়?

- ও ডালিম। বাবা ঘুমা। তোর শইল খারাপ

এইবার ডালিম কুটিকে সাক্ষী মানে- দেহ মামা; মায় কী কয়। মামায় আমারে ওষুধ খাওয়াইল না? অখনও কি আমার শইল খারাপ আছে নি? আসোলে তোমারই মাথায় গণ্ডগোল। পাবলিকে যে কয় মিছা কয় না

ডালিম শিখু দাসকে আর একটাও কথা বলার সুযোগ না দিয়ে এক দৌড়ে ঘর থেকে বের হয়ে যায়। তখন কুটি তার দিকে ফিরে- তোমার পোলারে কইবা খালি ওষুধ খাইলে অইব না। লগে ভাতটাতও খাওন লাগব। না খাইয়া এমুন চক্কর দিলে আবার অসুখ বান্ধাইব সে

- হ কমু

শিখু দাস ডালিমের কাঁথাগুলো গোছাতে শুরু করে। এই গরমে এগুলোর আর দরকার পড়বে না। তুলে রাখতে হবে। কুটি কোন সময় বের হয়ে যায় সে খেয়াল করে না। কাঁথা গোছাতে গোছাতে চোখ পড়ে যিশুর ছবির দিকে। যিশু তার দিকে তাকিয়ে হাসছেন- কী রে তুই কি মনে করস কুটির প্যারাসিটামলেই তোর পোলা ভালা হইছে? আমি কিছু করি নাই?

শিখু দাস বিছানার মধ্যেই হাঁটু গেড়ে বসে- মাপ কইরা দেও প্রভু। একটাই পোলা। হুশ বুদ্ধি ঠিক আছিল না তাই তোমারে ভক্তি দিতে ভুইলা গেছি। আসোলে তুমিই তো সব করছ। প্যারাসিটামল আর কুটি উছিলা মাত্র। তুমিই কুটির মন সদয় কইরা দিছো দেইখা সে প্যারাসিটামল আনছে। আর এই রোগের লাইগা তুমিইতো প্যারাসিটামল বানাইছ প্রভু। প্রভু আমার দোষে তুমি প্যারাসিটামল থাইকা তোমার আশীর্বাদ ফিরাইয়া নিও না। আমার পোলাডারে আবার অসুখে ফেইল না প্রভু

শিখু দাসের অনুনয়ে প্রভু যিশু হাসেন- আরে না। পাগলি কী কয় দেহ। আমি কিছু মনে করি নাই। তোর সাথে একটু মস্করা করলাম আমার কথা তোর মনে আছে কি না জিগাইয়া। ...তোর বিশ্বাস অত কম অইলে চলব কেমনে? তুই এইটা ভাবলি কী কইরা যে ঈশ্বরপুত্র যিশু তার এক সন্তানেরে একবার আশীর্বাদ কইরা আবার ফিরাইয়া নিবো? পোলার লাইগা তোর মাথা আউলা হইছে ঠিক। কিন্তু তুই এইডা কেমনে ভাবলি যে আমি তোর উপরে রাগ কইরা ডালিমরে আবার অসুখে ফালামু?

- মাপ কইরা দেও প্রভু। আমি গির্জায় একটা চাটাই দিমু

- আইচ্ছা যা। মাপ কইরা দিলাম। তয় খালি চাটাই দিলে হইব না। তোর পোলারে কইবি গির্জার উঠানের ঘাসগুলা যেন কোদাল দিয়া তুইলা দেয়

- হ প্রভু। কমু। আমি কমু। আর আমি নিজেও ঘাস তুলুম

প্রভু যিশু খুশি হয়ে আবার ছবি হয়ে যান আর ডালিমের মায়ের ঘুম ভাঙে ডালিমের চিৎকারে। ঘুম ভাঙতেই শিখু আবার ডালিমের গায়ে মাথায় হাত বোলাতে থাকে- যিশুরে ডাক বাবা। যিশুরে ডাক। ...ভাত খাবি? তোর নানির ঘর থাইকা নিয়া আহি? ...ইসরে গরম। মাথায় পানি দেই?

শিখু দাস ঘরের মধ্যে পানি খুঁজতে থাকে। জগ গ্লাস কলসি। কোথাও এক ফোঁটা পানি নেই

ডালিম আবার চুপ হয়ে যায় আর শিখুও ভুলে যায় সে কী খুঁজছিল। সে আবার ডালিমের বিছানায় বসে তার গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ঘুমিয়ে পড়ে। তার আবার ঘুম ভাঙে যখন ডালিম আবার কাৎরায়। শিখু দাস আবারো ছেলের মাথায় গলায় বুকে হাত বোলাতে থাকে। অনেকক্ষণ হাত বুলিয়ে তার মনে হয় ডালিম কিছু খেতে চাইছে। সে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ায়। দূর থেকে একটু দেখে ছেলেকে- চা খাবি? তোর নানির ঘর থাইকা নিয়া আসি? তোর মামায়তো এখনও ওষুধ নিয়া আসলো না। খাড়া চা খাইলে জ্বর ছাড়ব

ডালিম চিৎকার করতে থাকে। শিখু দাস বের হতে থামে- পানি খাবি?

শিখু দাস আবার পানি খোঁজে। পায় না। অবশ্য একটু পরেই ভুলে যায় আসোলে সে কী খুঁজছে। ডালিম আবার চিৎকার করে। শিখু দাসের চোখ পড়ে হাতপাখায়। হাতপাখাটা নিয়ে ডালিমকে বাতাস করতে থাকে- ইস যা গরম। পোলাডা ঘুমাইব কেমনে? ঘুমা বাবা। ঘুমা। আমি তোরে বাতাস করতাছি। ঘুমা

বাতাস করতে করতেই তার চোখ পড়ে ঘরের একপাশে রাখা তেলের শিশির উপর। সে শিশি থেকে তেল নিয়ে ছেলের পায়ে মালিশ করতে থাকে। শিখু দাস তেল মালিশ করে আর বিড়বিড় করে- ঘুমা বাবা। ঘুমা। ও ডালিম যিশুরে ডাক। ঘুমা। তেল মালিশ দিতাছি আরাম পাবি। ছোটকালে তোরে কত তেল মালিশ দিছি আমি। আরাম পাবি বাবা। ঘুমা। তোর মামায় তোরে প্যারাসিটামল দিবো। হাসপাতালে নিবো। এখন ঘুমা। তোর মামা আইলেই তোরে ডাক দিমু। এখন ঘুমা

ছেলে আরাম পায় কি না বোঝা যায় না। সে সমানে গোঙাতে থাকে। শিখু দাসের তখন আবারও চায়ের কথা মনে হয়- ইসসিরে। চা না আনবার চাইছিলাম? সে এক দৌড়ে ঘর থেকে বের হয়ে যায় চা আনার জন্য। মায়ের ঘরে

ডালিমের মা শিখু দাস যখন সত্যি সত্যি হাতে করে এক কাপ চা নিয়ে ঘরে ঢোকে তখন ডালিম আবার ঘুমাচ্ছে। আর তার মাথার কাছে বসে কপালে হাত রেখে তাপ বোঝার চেষ্টা করছে ডালিমের বাবা ডেভিড অভয় দাস। শিখু স্বামীকে দেখে চায়ের কাপটা বাড়িয়ে দেয়- ডালিমের বাপ নেও চা খাও

- লাল চা?

- হ। চিনি পাই নাই। কুটির বৌ চিনি লুকাইয়া রাখে। খালি পাতি দিয়াই বানাইয়া আনছি। খাও

ডালিমের বাবা পাঞ্জাবির পকেট হাতড়িয়ে ছোট একটা পাউরুটি বের করে- এইটা রাখো

এইটা রাখো বলে পাউরুটিটা প্রথমে বিছানায় রাখে। তারপর নিজেই খুলে চায়ের মধ্যে ডুবিয়ে ডুবিয়ে খাওয়া শুরু করে। শিখু দাস দেখে ডালিম ঘুমাচ্ছে। ছেলেকে আবারও সে মাথায় বুকে হাত বোলায়- আর কোনো চিন্তা নাই বাবা। তোর বাবায় আইছে। তোরে হাসপাতালে নিবো

শিখু স্বামীর দিকে ফেরে- যাও না একটা রিকশা নিয়া আসো। ডালিমরে হাসপাতালে নিমু। যাও

ডেভিড অভয় দাস কিছুক্ষণ ছেলেকে দেখে। ...স্ত্রীর দিকে তাকায়। শিখু আবারও তাড়া দেয়। অভয় দাস ব্রেডটার অর্ধেক খেয়ে বাকিটা শিখুর হাতে দেয়- নেও রাখো। খুব টেস্টি বেরেড

অভয় দাস আরেকবার ছেলের কপালে হাত রেখে বেরিয়ে যায়। শিখু পেছন থেকে চিৎকার করে- ভাঙাচোরা রিকশা আইনো না। পোলাডায় চড়তে পারব না। দেইখা শুইনা একটা ভালো রিকশা আইনো

শিখু আবার ছেলেকে নিয়ে পড়ে- বেরেড খাবি ডালিম? খুব টেস্টি বেরেড। তোর বাবায় আনছে আর রিকশা ডাকতে গেছে। তোরে হাসপাতালে নিবো। নে চা দিয়া বেরেড খা

চায়ের কথা মনে হতেই চোখ পড়ে খালি কাপটার দিকে- দুরো। ডালিমের বাপের যুদি কোনো বুদ্ধিশুদ্ধি থাকে; পোলার লাইগা চা আনলাম সেই চা সে খাইয়া ফালাইল। দুর

শিখু দাস আবার ব্যস্ত হয়ে পড়ে তার বিড়বিড়ানি আর ছেলেকে নিয়ে। হঠাৎ দরজা দিয়ে তাকিয়ে দেখে কুটি বাড়িতে ঢুকছে। সে দৌড়ে বের হয়ে আসে উঠানে- ও কুটি। ডালিমের বাপরে দেখছস?

কুটি বেশ অবাক হয়ে দাঁড়ায়- হেয় আসছে নাকি?

- আইছে তো

- টেকা পয়সা আনছে?

- না। একটা বেরেড আনছে

- দুই মাস পরে আসছে একটা বেরেড নিয়া। হেরে দেইখা আমার লাভ কী? কই গেছে এখন?

- ডালিমরে হাসপাতালে নিবো। রিকশা আনবার গেছে

- হেয় আনবো রিকশা? আবার পলাইছে সে

- তাইলে তুই একটু যা না ভাই। একটা রিকশা আইনা দে

- অখন আমার কাম আছে। পরে দেখুমনে

কুটি বাড়ির দিকে পা বাড়ায়। শিখু দাস তার পথ আগলে দাঁড়ায়- প্যারাসিটামল আনছস?

- ভুইলা গেছি। কাইল আনুমনে

ডালিমের মা আকাশের দিকে তাকায়- ইস গরম। এই গরমে রিকশা পাইব কই? রিকশাওয়ালারা বাড়িতে ঘুমাইতাছে এখন

ডেভিড অভয় দাস রাস্তায় এসে দাঁড়ায়। বিশালদেহী শরীরটা টেনে হাঁটতে থাকে বড়ো রাস্তা ধরে। পাশ দিয়ে যেতে যেতে প্যাসেঞ্জার নামানোর জন্য একটা বাস থামে। অভয় দাস উঠে পড়ে। ভাড়া না থাকার অপরাধে সিট থাকা সত্ত্বেও পুরো রাস্তা সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আসে কন্ডাকটরের ঝাড়ি খেয়ে। কন্ডাকটরটা বেশ ভালো। রাস্তায় নামিয়ে দেয়নি। বাস স্ট্যান্ডেই এনে নামায়। বাস স্ট্যান্ডে নেমে অভয় দাস পা বাড়ায় মিশনের দিকে। এক সময় এই মিশনটাই ছিল তার কর্মস্থল। আর চাকরি হারানোর পর যখনই তার থাকার কোনো জায়গা নেই তখন এই মিশনের বারান্দাই তার থাকার জায়গা। ফাদার অ্যানোস হাসদা আর অন্যরা সবাই তাকে চেনে। থাকলে কেউ আপত্তি করে না। মাঝে মধ্যে কেউ টুটাফাটা খাবারও দেয়। কারো সাথে অবশ্য তার খুব একটা কথা হয় না। বিশেষ করে মিশন ছাড়ার পর

ডেভিড অভয় দাস মিশনে গিয়ে সোজা ফাদারের রুমে ঢুকে পড়ে। ফাদার অ্যানোস হাসদা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। এটা তার অতি পরিচিত বৈশিষ্ট্য। তিনি যখন খুব ব্যস্ত না থাকেন তখন যে কারো সাথে কথা বলতে হলে হেঁটে হেঁটে বলেন। কারো সাথে কখনও তাকে কড়া করে কথা বলতে শোনেনি কেউ। ফাদার তাকে দেখে হাসিমুখে এগিয়ে আসেন- ডেভিড। ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন। অনেক দিন পর তোমাকে দেখলাম। অবশ্য আমরা না দেখলেও ঈশ্বর সব সময় আমাদের সবাইকেই দেখে রাখেন

- জ্বি ফাদার

ফাদার অ্যানোস হাসদা হাঁটতে হাঁটতে ঘর থেকে বের হয়ে আসেন। সামনের লম্বা বারান্দা দিয়ে আস্তে আস্তে হাঁটেন আর কথা বলেন। এটাও তার আরেকটা অভ্যাস। তিনি সবার সাথে ঘরে বসে কথা বলেন না। অভয় দাস যখন এখানে চাকরি করেছে তখনও দেখেছে। ফাদার অ্যানোস হাসদা কীভাবে কথা বলতে বলতে কাউকে ঘর থেকে বের করে নিয়ে আসেন আর কীভাবে পেছনের দরজা হাত দিয়ে টেনে বন্ধ করে দেন। এবং এক সময়- আমি প্রার্থনা করব কিংবা আমার পড়ে থাকা কিছু কাজ রয়ে গেছে; সেগুলো এখনই না করলে ঈশ্বরের কাছে আমি দায়িত্বহীন হব বলে আবার নিজের ঘরে ঢুকে পড়েন অতিথিকে বাইরে রেখে

অভিজ্ঞতা থেকেই অভয় দাস বুঝে যায় ফাদার নিজের ঘরে তার সাথে কথা বলতে চান না। সেও বের হয়ে আসে ফাদারের সাথে। ফাদার সামনে হাঁটছেন। মাঝেমাঝে বারান্দার এগিয়ে আসা ফুল গাছের পাতায় একটু আধটু হাত বোলাচ্ছেন- এইসব গাছ- তৃণ কোনো কিছুই ঈশ্বরের নজরের বাইরে নয়। তিনি সব কিছুকেই ঠিক ঠিক নিয়মে পরিচালিত করেন

- জ্বি ফাদার

- ডেভিড তুমি কি আমাকে বিশেষ কিছু বলবে?

অভয় দাস কিছু বলে না। ফাদারের পেছন পেছন হাঁটে। ফাদার সরাসরি তাকান- কিছু বলতে হলে দ্বিধা না করেই বলো ডেভিড। ঈশ্বর মানুষের সমাজে বিভিন্ন স্তর তৈরি করেছেন পরস্পর পরস্পরের সাহায্যে আসার জন্য। আমাকে যদি ঈশ্বর তোমার কোনো সাহায্যের সামর্থ্য না দেন তাহলে নিশ্চয়ই তিনি তোমার জন্য আরো সমর্থ কোনো মানুষ সৃষ্টি করেছেন এই বিশ্বজগতের কোথাও। এবং একমাত্র তিনিই জানেন তুমি কীভাবে তার কাছে যাবে আর তিনি কীভাবে তোমাকে ঈশ্বরের আদেশে সাহায্য করবেন

- জ্বি ফাদার

- বলো ডেভিড

- ফাদার রিকশা চালাইবার চেষ্টা করছিলাম কিছুদিন

- ঈশ্বর তোমাকে সুমতি দিন। কাজকর্ম করছ তাহলে?

- পারি নাই ফাদার। তারপরে এক জাগায় মাটি কাটার কাম নিছিলাম

- সদাপ্রভু যার জন্য যা নির্দিষ্ট করে রাখেন তাকে সেখানেই যেতে হয়। এটাই নিয়ম ডেভিড

ডেভিড অভয় দাস আবারও চুপ করে যায়। সে দুটো কাজের কথা বললেও মাঝখানে ইটের ভাঁটায় চৌকিদারি করার কথা ইচ্ছা করেই চেপে যায়

ফাদার হাঁটছেন। বোধ হয় এখন তার হাতে কোনো কাজ নেই। অথবা এখনও তিনি অভয় দাসের উপর বিরক্ত হয়ে উঠেননি। তাই এখনও হাঁটছেন। অভয় দাস ফাদারের পেছনে হাঁটতে হাঁটতে আগের কথার রেশ ধরে- ফাদার শক্ত কাম করবার পরি না

- ঈশ্বরের ইচ্ছায় তোমার জন্য নিশ্চয়ই অন্য কোনো কাজ রয়েছে ডেভিড। নিরাশ হয়ো না

- জ্বি ফাদার। ...শইলে দেয় না ফাদার। ফাদার...

- আমি শুনছি

- আপনের এখানে আমি তিন বছর পিওনের কাম করছি

- হ্যাঁ

- আমার চাকরিটা চইলা যায় ফাদার

- তোমার নিজের দোষেই তুমি চাকরিটা হারিয়েছ ডেভিড

- আমার বৌ আর একটা পোলা আছে ফাদার

- ঈশ্বর তাদের মঙ্গল করুন। তাদের প্রতি তোমার অনেক দায়িত্ব আছে। এখন তোমাকে আর আগের মতো অবিবেচক হলে চলবে না ডেভিড

- ফাদার। চাকরিটা আমারে আবার দেওন যায় না?

- সেখানেতো অনেক দিন ধরে আরেকজন কাজ করছে

- অন্য কোনো কাম দেওন যায় না ফাদার? যে কোনো কাম?

- যিশুকে স্মরণ করো। তিনি নিশ্চয়ই তোমাকে একটা ভালো পথ দেখাবেন। তিনি যখন এখানে তোমার কর্মসংস্থান করবেন তখন নিশ্চয়ই তুমি তা পাবে। যোগাযোগ রেখো ডেভিড

- জ্বি ফাদার

- আর কিছু কি বলবে তুমি?

- না ফাদার

- ঈশ্বর তোমার আর তোমার পরিবারকে দেখে রাখুন। যিশুকে স্মরণ রেখো

ফাদার বারান্দায় হাঁটতে থাকেন। অভয় দাস ফিরে এসে বসে পেছনের বারান্দায়। মাথার নিচে হাত রেখে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে মেঝেতে

আজ রোববার। বিষুদবারে ডালিমের বাপ রিকশা আনতে গিয়েছিল এখনও সে রিকশা পায়নি। কুটিও প্যারাসিটামল আনার কথা মনে করতে পারেনি এই কয় দিনে। সকালে উঠেই শিখুর মনে হয় এই পবিত্র দিনে যিশু কিছু একটা করবেন। অন্তত ডালিমের বাপকে একটা রিকশা পাইয়ে দেবেন অথবা কুটিকে মনে করিয়ে দেবেন ওষুধের কথা। বেশ খোশ মেজাজেই কথাগুলো সে ছেলেকে শোনায়। তার মনে হয় এই গির্জা দিনের সকালে এক কাপ চা খেলে ছেলের ভালো লাগবে। নির্ভুলভাবে সে কুটির ঘরে ঢুকে এক কাপ চা বানিয়ে এসে ছেলেকে ডাকে- আইজও চিনি পাইলাম না। নে গরম গরম খাইয়া ফালা। ...আইজ রবিবারতো। হগগলে গির্জায় গেছে। চা খাইতে খাইতে কুটি আইয়া পড়ব। খা

চা খাওয়ার ব্যাপারে ছেলের কোনো আগ্রহ না দেখে সে ছেলের পায়ে তেল মালিশ শুরু করে। তেলও নেই। শিশি উল্টে ঝাঁকান দিতে মাত্র দুয়েক ফোঁটা পড়ে হাতে। সেটুকু নিয়েই ছেলের দুপায়ের পাতায় মালিশ করতে থাকে- আইজ যিশুরে ডাকলে সে ফিরাইতে পারব না। তেল মালিশ দিতাছি পা গরম অইব

শিখুর মনে হয় যিশু তার কথা শুনেছেন। আজ ডালিমের শরীরে জ্বর নেই। যাক। এই গরমের দিনে ছেলেটা অন্তত আরামে ঘুমাতে পারবে। তার চোখ চায়ের কাপের দিকে যায়। চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। থাক। অতদিন পরে যখন ছেলেটার শরীর ঠান্ডা হলো তখন আর গরম চা খাইয়ে আবার গরম করে তোলার দরকার নেই। ঘুমাক। ঘুম থেকে উঠে ঠান্ডা চা-ই খাবে

ছেলের পায়ে তেল মালিশ করতে করতে তার মনে পড়ে চা বানাতে গিয়ে হাঁড়ির ঢাকনা সরিয়ে দেখে এসছে কুটির বৌ শিং মাছের ঝোল করেছে। বললে নিশ্চয়ই ডালিমের জন্য একটা মাছ দেবে। আচ্ছা তারা গির্জা থেকে ফিরুক। ডালিমের জন্য একটা মাছ নিয়ে আসবে সে

গির্জা থেকে ফিরে কুটি দরজা বন্ধ করে মাত্র খেতে বসেছে। দরজা ঠেলে হুড়মুড় করে ঘরে ঢোকে শিখু। কুটির বৌ বেশ বিরক্ত হয়। বিয়ের সময় এরা কেউই বলেনি যে তাদের এক বোন পাগল। নাহলে কিছুতেই তার বাপ এমন ঘরে মেয়ে বিয়ে দিত না। শুধু বোন হলেও এক কথা ছিল; বোনের জামাইটাও বেদিশা। কিন্তু কুটির জন্য কিছু বলারও উপায় নেই। না বললেও এইসব ঝামেলা আর কাঁহাতক সহ্য করা যায়। শিখুকে দেখে কুটির বৌ অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয় আর কুটি বলে উঠে- আইজ আর ভুলুম না। আইজ বিকালেই ওষুধ আইনা দিমু

- ওষুধ লাগবো না। তুই একটু আয় ভাই

- খাইতাছি তো। কী হইছে আবার?

- আমার ডালিম কথা কয় না

- হেয় তো আইজ এক মাস ধইরাই কথা কয় না। এইডা আবার নতুন কী?

- শব্দ করে তো

- ঘুমাইতাছে। ঘুম ভাঙলে শব্দ করব নে

- নারে ভাই কুটি। তুই একটু আয় । পরে আইসা খাবি। আয়

- জ্বালাইয়া মারলা তোমরা। আসো দেখি কী হইছে

কুটি হাত ধুয়ে উঠে পড়ে। বৌকে বলে- ঢাইকা রাখো আসতাছি

শিখু দাসের আগে আগে এসে ঢোকে ডালিমের ঘরে। ঘরটা দুর্গন্ধ। ডালিম শুয়ে আছে কাঁথার নিচে। তেল মালিশের জন্য তার মা পায়ের দিকে যে অংশটি থেকে কাঁথা সরিয়েছিল সেটি সেভাবেই আছে। কুটি মুখের দিকে কাঁথা সরিয়ে ডালিমের কপালে হাত দেয়। তারপর বোনের দিকে ফেরে- আসো। তুমি আমার লগে আসো

শিখু দাস কুটির সাথে বের হয়ে আসে। কুটি চাটাইয়ের দরজাটা টেনে বন্ধ করে দেয়। শিখুকে নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে বৌকে বলে- এরে ভাত দেও। ওই ঘরে আর যাইতে দিবা না। আমি গির্জায় যাইতাছি

- গির্জায় ডাক্তার আছে?

- না ফাদাররে ডাকতে অইব

বৌকে কানে কানে কিছু একটা বলে শার্ট গায়ে দিয়ে কুটি বের হয়ে যায়। যাবার আগে শিখুকে বলে যায় ডালিম ঘুমাক। সে যেন সেই ঘরে আর না যায়। কিন্তু কুটি বের হতে না হতেই আস্তে করে কুটির ঘর থেকে বেরিয়ে শিখু ঢুকে পড়ে নিজের ঘরে। ...ডালিম ঘুমাচ্ছে অঘোরে। শিখু দাস বিছানার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। কুটি বেরোবার আগে ডালিমের মুখ কাঁথা দিয়ে ঢেকে দিয়েছিল। শিখু মুখের কাঁথা সরায়। মাথায় হাত দেয়। জ্বর নেই। শিখু ছেলের মাথায় গলায় বুকে হাত বুলিয়ে বিড়বিড় করে- তোর মামায় গির্জায় গেছে। ফাদাররে নিয়া আইব।। আইজ রবিবার। আইজ ফাদার আইসা তোর লাইগা যিশুরে কইলে যিশু তার কথা শুনবেন

ডালিমের মা শিখু দাস এই এক মাসে যতটুকু ঘুমিয়েছে তা সবই ছেলের যত্ন করতে করতে ছেলের উপর পড়ে গিয়ে। সেই ঘটনা এখনও ঘটল। সে ঘুমিয়ে পড়ল ডালিমের উপর। ঘুমিয়েই স্বপ্ন দেখতে শুরু করে শিখু দাস; কুটি তাদের গ্রামের গির্জার ফাদার প্যাট্রিক ডি কস্তাকে নিয়ে এসে ঘরে ঢুকেছে। ফাদার এসেই তার দিকে তাকিয়ে বলছেন- আর কোনো চিন্তা নাই দিদি। প্রভু যিশুর ইচ্ছায় আজকের এই পবিত্র দিনেই তোমার পোলা সুস্থ হইব। তুমি সরো। আমি যিশুর নামে তার শইলে একটু হাত বুলাই

এই বলেই ফাদার প্যাট্রিক ঘরের বেড়াতে ঝোলানো যিশুর ছবির সামনে ক্রুশ করে ডালিমের দিকে এগিয়ে যান- বাবা ডালিম। প্রভু যিশুর ইচ্ছায় আইজ আমি তোমার ঘরে আসছি তার মঙ্গল বার্তা নিয়া। প্রভু বলেছেন তুমি সুস্থ হইয়া উঠবা। আগামী রবিবারের গির্জায় তিনি সবার লগে তোমারেও দেখতে চান। তাই তিনি আমারে পাঠাইছেন তোমারে এই আনন্দ বার্তা পৌঁছাইয়া দিতে। ডালিম। ডালিম আব্রাহাম দাস। চোখ খোলো। উইঠা বসো। তোমার মা চিন্তিত আছেন তোমারে নিয়া। উইঠা বসো ডালিম আব্রাহাম দাস

ফাদার প্যাট্রিক ডি কস্তা ডালিমকে ডাকেন আর কাঁথা সরিয়ে শরীরে হাত বোলাতে থাকেন। শিখু কুটির সাথে দাঁড়িয়ে থাকে বেড়ার পাশে। তারা দেখে ডালিমের মুখ থেকে এত দিনের অসুস্থতার সব চিহ্ন আস্তে আস্তে কেটে যাচ্ছে। ডালিম ঘুমের মধ্যে হাসছে। এটা তার অভ্যাস। ছোট বেলায় ঘুমের মধ্যে শব্দ করেই হাসতো ডালিম। বড়ো হবার পরে আর শব্দ করে না। মুচকি হাসে। কিন্তু সে অনেক জোরে জোরে কথা বলে ঘুমের মধ্যে। কতদিন শিখু ঘুম ভেঙে কুপি জ্বালিয়ে বিছানার কাছে গিয়ে দেখেছে ডালিম ঘুমাচ্ছে। অথচ তার হাসির শব্দেই শিখুর ঘুম ভেঙে গেছে

শিখু দাস দেখে ফাদার ডালিমের সারা শরীরে হাত বোলানো শেষে আবার যিশুর ছবির দিকে তাকিয়ে ক্রুশ করেন। তারপর ডালিমের বুকে ক্রুশ করেন ফাদার। কয়েকবার। প্রতিবারই আস্তে আস্তে বলতে থাকেন- হে প্রভু তুমি আমাগো ডালিম আব্রাহাম দাসেরে কৃপা করো যেন সে আমাগো লগে তোমার এবং তোমার প্রিয় পুত্রের প্রশংসা করবার পারে। তুমি আমাদিগকে এবং আমাদিগো ডালিমেরে কৃপা করো প্রভু

ফাদার কয়েকবার ডালিমের বুকে ক্রুশ করে- সদাপ্রভু আমাগো ডালিমের প্রতি সদয় হোন বলে আস্তে আস্তে হাত রাখেন ডালিমের চোখের উপর- পুত্র ডালিম আব্রাহাম দাস। পিতা-পুত্র ও পবিত্র আত্মার নামে তোমার চোখ খোলো

ফাদার কথাটা বলে ডালিমের চোখের উপর থেকে হাত সরাতেই ডালিম আস্তে করে দুই চোখ খুলে তাকায় ফাদার আর ঘরের সবার দিকে। তার দিকে তাকিয়ে খুশি হয়ে উঠেন ফাদার। হাসেন- প্রভুরে স্মরণ কইরা এইবার উইঠা বসো ডালিম

ফাদার ডালিমের একটা হাত ধরেন। ডালিম ফাদারের হাত ধরে বিছানায় উঠে বসে

- ঈশ্বরের অসীম করুণা। এইবার দুই পায়ে খাড়াও পুত

এবার আর ফাদারকে ধরতে হয় না। ডালিম নিজে থেকেই উঠে দাঁড়ায়। একেবারে বিছানার উপর। তার মাথা গিয়ে ঘরের চালে লাগে। ফাদার আবারও দেয়ালে যিশুর ছবির দিকে তাকিয়ে ক্রুশ করেন- প্রভুরে ধন্যবাদ। প্রভুর কৃপায় আমাগো ডালিম আইজ রোগমুক্ত হইছে। ...প্রভুরে কৃতজ্ঞতা জানাও ডালিম

কিন্তু ডালিম কিছুই করে না। লাফ দিয়ে বিছানা থেকে নেমে এক দৌড়ে বের হয়ে যায় ঘর থেকে। শিখু ডাকতে ডাকতে পেছনে ছোটে। ফাদার প্যাট্রিক তাকে আটকান- যাইতে দেও দিদি। ছেলে মানুষ। অনেকদিন ঘরে বন্দী আছিল। প্রভু তারে আবারও বাইরে যাওয়ার ক্ষমতা দিছেন। যাইতে দেও। প্রভুর কৃপা অসীম। আসো আমরা প্রভুরে কৃতজ্ঞতা জানাই

শিখু আর কুটি ফাদারের সঙ্গে সঙ্গে ক্রুশ করে কৃতজ্ঞতা জানাতে যাবে এমন সময় পেছন থেকে কুটির চিৎকারে ঘুম ভেঙে যায় শিখু দাসের- তোমারে না কইলাম এই ঘরে ঢুকবা না? যাও বাইরে যাও

শিখু দেখে কুটি দাঁড়িয়ে আছে পেছনে। আর তার সাথে গ্রামের গির্জার ফাদার প্যাট্রিক ডি

কস্তা। যিনি একটু আগেই স্বপ্নে প্রভু যিশুর ইচ্ছায় ডালিমকে সুস্থ করেছেন। ফাদারকে দেখেই শিখু ছেলের মুখ থেকে কাঁথা সরিয়ে ডাকে- ও ডালিম। উঠ বাপ। দেখ কে আইছে। তোর আর কোনো চিন্তা নাই

কুটি ধমকে ওঠে- কী করো এইডা? তুমি সরো। বাইরে যাও

- ক্যান আমার পোলারে রাইখা আমি যামু কেন?

ফাদার হাতের ইশারায় কুটিকে থামিয়ে শিখুর দিকে এগিয়ে যান- আমারে একটু দেখতে দেও দিদি


শিখু সরে আসে বিছানার কাছ থেকে। এর মধ্যে কুটির বৌ আর মা এসে দাঁড়িয়েছে পেছনে। কুটি তাদের দিকে ফিরে- এরে বাইরে নিয়া যাওতো

কুটির বৌ আর মা শিখু দাসকে টেনে বাইরে বের করতে না করতেই নজরুলের গলা শোনা যায়- কুটি দা আছ ?

- কেডা?

- আমি নজরুল। একটু বাইরে আসোতো


নজরুল কুটির বয়সে ছোট হলেও গ্রামের উঠতি নেতা। সামনের ইলেকশনে চেয়ারম্যানিতে দাঁড়াবে। বয়স কম হলেও সে এলাকায় নিজেকে প্রমাণ করে নিয়েছে

কুটি বাইরে এসে দাঁড়ায়- তুমি কই থাইকা?

নজরুলের সাথে আরো কয়েকটা ছেলে। কুটির কেমন সন্দেহ হয়। ঝামেলা এড়াতে সে সোজা বলে- আমার ভাইগ্না পোলাডা গত রাতে মারা গেছে। সেইডা নিয়া টেনশনে আছি নজরুল। কও কী খবর?

- এই খবরডা শুইনাই আইলাম

- ভালা করছ। বিপদে আপদে তো তোমরাই ভরসা। পোলাডার মা পাগল আর বাবা একটা বেদিশা মানুষ। তোমরা আছ বইলাই না সাহস পাই

নজরুল হাসে- অবশ্যই। গ্রামের কোনখানে কী হইতাছে আর কোনখানে কী দরকার তা যদি খবর নাই নিলাম তয় সমাজে থাকনের দরকারটা কী?

- ঠিকই কইছো। ...তোমরা বসো। আমি ফাদারের লগে আলাপ কইরা পোলাডার কী ব্যবস্থা করা যায় দেখি

- তা তো করবাই। তুমি হইতাছ পোলার মামা। আইনগত গার্জিয়ান। কিন্তু কুটি দা...

- কী?

- ফাদাররে চইলা যাইতে কও

- ক্যান?

- তোমার ভাইগ্নার কবর আমরা মুসলমান নিয়মে দিমু

- ক্যান? আমি খিরিস্টান। আমার ভাইগ্নাও খিরিস্টান। ওর কবর মুসলমান নিয়মে হইব কেন?

- তুমি খিরিস্টান ঠিক আছ। কিন্তু তোমার ভাইগ্না মুসলমান। হের বাপে হের মা আর তারে লইয়া মুসলমান হইছে

- তোমারে কইছে কেডায়?

- সেইটা কোনো বিষয় না। একটা মুসলমানরে তুমি খিরিস্টান নিয়মে করব দিতে পারো না। এইটাই আসোল কথা

কুটি আমতা আমতা করে- দ্যাখো নজরুল। আমরা নিরীহ মানুষ। কারো সাথে কোনো ভেজালে নাই। আমার ভাইগ্নাটা মরছে। তারে আমাগো মতো কবর দিবার দেও

- তোমার ভাইগ্না সেইডাতো কেউ অস্বীকার যাইতাছে না। কিন্তু সে মুসলমান। তার দাফনের ব্যবস্থা আমরাই আমাগো নিয়মে করুম। এইডা সাফ কথা


আস্তে আস্তে লোক জমে যায়। নজরুল সবার কাছে ডালিমের বাবার ছেলে এবং বৌসহ কলেমা পড়ার কাহিনী বয়ান করে। সমর্থন নজরুলের দিকে আর চাপ কুটির দিকে বাড়তে থাকে। কুটি একটু দূরে গিয়ে ফাদারের সাথে কানে কানে কিছু কথা বলে। ফাদার প্যাট্রিক ডি কস্তা এগিয়ে আসেন- আপনেরা যা ভাবতাছেন তা ঠিক না। আমরা সবাই জানি ডেভিড অভয় দাসের পোলা ডালিম আব্রাহাম দাস ক্যাথলিক খ্রিস্টান। তার কোনোভাবেই মুসলিম হওয়ার কোনো কারণ নাই। তার আত্মীয় স্বজন সবাই খ্রিস্টান

- ওর মায়েরে ডাকেন। তারে জিগান ডালিমের বাপে বৌ-পোলা নিয়া মুসলমান হইছে কি না

শিখুর প্রসঙ্গ আসতেই কুটি বাধা দেয়- হের মাথার ঠিক নাই হগগলেই জানে। হেয় কী কইব?

- বেঠিক মাথা নিয়াও মুসলমান হইতে বাধা নাই। মুসলমানগো মইধ্যেও পাগল আছে


শিখু দাস দৌড়ে এসে কুটির হাতে ধরে- ও কুটি। কুটি আমার কথা শোন ভাই

- তুমি ঘরে যাও

- শোন না। একটা কথা শুন

- কী? কও

- কাইজা করিস না ভাই

- হইছে। তোমারে আর পণ্ডিতি করা লাগব না। ঘরে যাও

কুটির বাবা প্রমোদ বিশ্বাস লাঠি ভর করে নজরুলের সামনে গিয়ে দাঁড়ান- শোনো ভাতিজা। তোমাগো এই মুসলমানগো গ্রামে আমরা কয়েক ঘর খ্রিস্টান। বাপ দাদার আমল থাইকা বসবাস কইরা আসছি তোমাগো বাপ দাদার লগে। কোনোদিন মুসলমান আর খ্রিস্টানের মাঝে কোনো ঝামেলা হয় নাই

নজরুল প্রমোদ বিশ্বাসের কথা বেশ সম্মানের সাথে শোনে। তারপর খুব বিনীতভাবে বলে- কাকা। আমরাও আপনাগো সাথে মিলা-মিশাইতো বড়ো হইলাম। আপনারা খিরিস্টান বইলা কোনোদিন কি কোনো বেয়াদবি করছি আপনার লগে?

প্রমোদ বিশ্বাস মাথা নাড়ে- না। কোনোদিন না। তোমার বাবা এখনও আমারে দেখলে দাদা বইলা ভালো মন্দ জিগায়

- হ কাকা। মানুষরে তার যোগ্য সম্মান দেওয়া আমারে আমার পরিবার শিখাইছে। আমাগো ধর্মেও আছে সেই কথা। না হইলে আপনারা মাত্র কয়েক ঘর খিরিস্টান। ঝামেলা করতে চাইলে কীই বা করতে পারতেন আপনারা? আমরা ঝামেলায় নাই কাকা

- আমরাও নাই ভাতিজা। আমরা নিরীহ মানুষ

- হ কাকা। কিন্তু আপনার নাতিতো মুসলমান

- কথাটা ঠিক না ভাতিজা। আমার নাতি ক্যাথলিক খ্রিস্টান

- ক্যাথলিক না কি সেইটা জানি না। তয় হেয় খিরিস্টান আছিল। কিন্তু আপনার জামাই আপনার মাইয়া আর নাতিরে লইয়া মুসলমান হইছে কাকা

কুটি এবার এগিয়ে আসে- এর কোনো প্রমাণ আছে তোমার কাছে?

- পোলার মারে জিগাও

- এর মাথার ঠিক নাই। এ আবার কী কইব?

- তাইলে পোলার বাপেরে আনো। তারে জিগাইলেই বাইর অইব

- তারে আমি পামু কই? তার কি কোনো ঠিক-ঠিকানা আছে?



নজরুল আবারও হাসে। তোমার কিছু করতে হইব না কুটি দা। পোলার বাপরে খুঁজতে লোক পাঠাইছি আমি। হেয় আসলেই মীমাংসা হইব

প্রমোদ বিশ্বাস এগিয়ে আসে আবার- কিন্তু ভাতিজা। ধরো তারে পাওয়া গেলো না। অথবা তার আসতে দেরি হইল। তখন কিন্তু লাশে পচন ধরব। গরমের দিন

- কিছু করার নাই কাকা। আপনার নাতি। আপনি যদি তারে দাফনের অনুমতি দেন তাইলে আমরা অখনই জানাজা কইরা দাফন করতে পারি। কিন্তু আপনারা বাধা দিলে তো মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত লাশ এইভাবেই থাকতে অইব

নজরুল ফাদারের দিকে তাকায়- আপনে সম্মানিত মানুষ। আপনে এইসবের মইধ্যে না আসাই ভালো। পোলার বাপে আসুক। তার আগে পর্যন্ত আমাগো লোক থাকব। লাশেরে নিয়া আপনারা কিছু চিন্তা কইরেন না। মীমাংসা হইবার পরে যদি দেখা যায় সে আপনাগো ধর্মের লোক তাইলে যা করার কইরেন

শিখু দাস আবারও দৌড়ে আসে- ও কুটি। কুটি। তোর কোনো বুদ্ধিশুদ্ধি নাই? এই রইদের মইধ্যে সবাইরে খাড়া করাইয়া রাখছস? যা হেগোরে নিয়া ঘরে গিয়া বস

কুটি তার কথার কোনো উত্তর দেয় না। নজরুল পাশের জনের দিকে তাকায়- আহারে মানুষটা। নিজের পেটের পোলা নাই সেইডা সে কইতেও পারে না। আর আমাগো মাথায় রইদ লাগে হেইডা লইয়া পেরেশান

কুটির মা শিখুকে টেনে নিয়ে যায়। নজরুল এগিয়ে যায় প্রমোদ বিশ্বাসের দিকে- কাকা। আপনেরে যেমন কাকা বইলা ডাকি সেইরকম সম্মান করতে চাই যতদিন বাঁচি। এইখানে একটা ঝামেলা ঘটছে। কারোই কিছু করার নাই। আমি অখন যাইতাছি। কিছু কাম আছে আমার। তয় আপনেরে কইয়া যাই কাকা। লাশডা যেমন আছে তেমনই যেন থাকে। হের বাপ আসলে পরে যা করার করা যাইব। আপনি ইচ্ছা করলে তখন ফাদাররেও আসতে কইতে পারেন। তিনি নিজের কানে শুনবেন সব

নজরুল তার লোকজনকে কানে কানে কিছু বলে বের হয়ে যায়। পেছন থেকে শিখু দৌড়ে আসে- ও নজরুল চা খাইলি না? খালি মুখে যায় নি? খাড়া চা বহাই

- না দিদি পরে আরেকদিন খামুনে। একটু কাম আছে। যাই

নজরুল যতই কাকা বলে সম্মান দেখাক না কেন। প্রমোদ বিশ্বাস বুঝতে পারে ঝামেলা কোথায় গড়াচ্ছে। নজরুল নিজে চলে গেলেও বাড়ির সামনে লোক বসিয়ে রেখে গেছে। তাদের বাইপাস করে কিছু করা সম্ভব নয়। ফাদার বাইরের লোক। তিনি নিজে থেকে কিছু করতে নারাজ। তিনি পরামর্শ দিলেন মিশনে ফোন করতে। সেখান থেকে যদি ফাদার অ্যানোস হাসদা কোনো লোক পাঠান তাহলে একটা মীমাংসা করা যাবে। তবে নজরুলের লোক অভয় দাসকে পাবার আগেই যদি অভয়কে বুঝিয়ে ফেলা যায় তাহলে হয়ত ঝামেলার একটা সমাধান হলেও হতে পারে। কিন্তু তাকে পাওয়াও তো একটা কাজ

শিখু বিশ্বাসের খেয়াল হয় এই ঝামেলার মধ্যে ছেলের খোঁজ নেয়া হচ্ছে না অনেকক্ষণ। সে গিয়ে হাজির হয় ডালিমের ঘরে। ডালিম ঘুমুচেছ। মুখের কাঁথা সরিয়ে ছেলের মাথায় গলায় বুকে হাত দিয়ে দেখে জ্বর নেই। হয়ত প্রভু যিশু কৃপা করেছেন। জ্বরটা ছেড়ে গেছে। সে তেলের শিশিটা উপুড় করে হাতে। কয়েক ফোঁটা পড়ে। ডালিমের পায়ের কাঁথা সরিয়ে মালিশ করতে থাকে- ঘুমাক। অনেকদিন পোলাটা ভালো করে ঘুমাতে পারে না। পায়ে তেল মালিশ দিলে ঘুম আরো ভালো করে আসবে। ঘুমাক

পেছন থেকে খ্যাঁকিয়ে উঠে কুটি- ফ্যাসাদের মইধ্যে ফ্যাসাদ। এইডা আবার কী করো তুমি? সরো। বাইরে যাও

কুটির সাথে কুটির মাও ঢোকে ঘরে। ডালিমের মা তার কাজ করেই যাচ্ছে। কুটি আবারও তাকে বের করে দিতে গেলে সে বিগড়ে যায়- কেডা তুই? তুই কেডা? আমার ঘর থাইকা আমি বাইরামু ক্যান?

কুটি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু কুটির মা তাকে থামায়- থাউক। সে তার পোলার লগেই থাউক। এখনও কিছু বুঝে নাই। বুঝলে আবার ওরে সামলাইব কেডায়?

কথাটায় যুক্তি আছে। ঠিকইতো। বাইরের ঝামেলা সামলানোই এখন কঠিন। তার উপর যদি পাগল সামলাতে হয়। তার চেয়ে থাকুক সে তার মতো। সময়মতো যা করার করা যাবে। ...কুটি বের হয়ে আসবে এমন সময় শিখু ডেকে থামায়- ও কুটি। কুটি

- কী আবার?

- তোর বৌরে কইবি একটু চিনি বাইর কইরা দিতে?

- চিনি?

- হ। পোলাডারে একটু চা বানাইয়া দিমু। হেয় আবার চিনি ছাড়া চা খাইতে পারে না

কুটি তার মায়ের দিকে তাকায়। কী বলবে বুঝে পায় না। শিখু দাস আবারও পীড়াপীড়ি করে- ক না ভাই। এক চামচের বেশি নিমু না। খালি পোলাডার লাইগা এক কাপ চা

- ঠিক আছে কমুনে

- এখনই কইয়া দে

কুটির সাথে সাথে শিখু দাসও বের হয়ে আসে ঘর থেকে। যতক্ষণ না কুটি তার বৌকে চিনি বের করে দিতে বলেছে ততক্ষণ লেগে থাকে পেছনে। তারপর পরম নিশ্চিন্তে চা বানাতে চলে যায় শিখু

নজরুলের লোক যখন ডেভিড অভয় দাসকে খুঁজে বের করে তখন সে শহরের মিশনের পেছনের বারান্দায় বিড়ি ফুঁকতে ফুকতে কার কাছে যেন কোন দেশের কোন সেনাপতির গল্প শুনছিল। খবরটা তাকে খুব একটা নাড়া দেয় বলে মনে হয় না। সে সোজা উঠে দাঁড়ায়। সংবাদদাতাকে জিজ্ঞেস করে গাড়ি ভাড়া আছে কি না। কিন্তু শ্বশুর বাড়ির কাছে এসে জানতে পারে তাকে আনিয়েছে নজরুল। এবং ছেলের লাশ দেখতে নয়। লাশের ধর্ম ঠিক করতে

অভয় দাস কথা একেবারেই কম বলে। নজরুলের জেরার মুখে শুধু বলে- ধর্ম তোমরা একটা ঠিক কইরা লইও। আমি একটু পোলাডারে দেখবার চাই

ডেভিড অভয় দাস যখন শিখু দাসের বাড়ি পৌঁছায় তখনও শিখু দাস ছেলের ঘরে। চায়ের কাপ ছেলের মুখের কাছে নিয়ে ছেলেকে ডাকছে। স্বামীকে দেখেই সে খুশি হয়ে উঠে- ডালিমের জ্বর কমছে

অভয় দাস আস্তে আস্তে ছেলেকে দেখে। এর মধ্যে এসে ঢোকে কুটি। তাকে টেনে বের করে নিয়ে যায় ঘর থেকে। বাইরে তখন বেশ ক’জন লোক আর হুজুরকে নিয়ে নজরুল হাজির হয়ে গেছে। কুটিকে বের হতে দেখেই নজরুল এগিয়ে আসে- পোলার বাপ যখন আসছে তখন আর দেরি কইরা কী লাভ?

ডেভিড অভয় দাস কিছু একটা বলতে যাচিছল কিন্তু কুটি থামিয়ে দেয়- এখন কিছু করা যাইব না নজরুল। তোমরা তোমাগো লোক নিয়া আইছ । আমরাও মিশনে খবর পাঠাইছি। মিশন থাইকা লোক না আসা পর্যন্ত কোনো সালিশ করা যাইব না

- সালিশের কী আছে? ডালিমের বাপে কইলেই অইব

- না হেয় কিছু কইব না। মিশনের লোক না আসা পর্যন্ত তোমরা কেউ তার লগে কথা কইতে পারবা না

কুটি অভয় দাসকে তার ঘরে নিয়ে বসিয়ে রাখে। নিষেধ করে দেয় কারো সাথে কোনো কথা বলতে। কিন্তু সে বের হয়ে আসতেই নজরুল জানায় ডালিমের বাবা যার মাধ্যমে ছেলে আর বৌ নিয়ে মুসলিম হয়েছে সেই ইট ভাঁটার মালিককেও দরকার হলে আনা হবে। ডালিমের বাপ যদি অস্বীকার করে তবে তার না আসা পর্যন্ত লাশ দাফন বন্ধ থাকবে

সালিশ বসতে বসতে রাত হয়ে যায়। নজরুলের পক্ষে লাশ দাফনের ব্যবস্থা করা হয়ে গেছে। কুটির পক্ষেও তাই। মিশন থেকে ফাদার অ্যানোস হাসদা প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন তিনজন। একপাশে নজরুলের লোক আর অন্যপাশে কুটির আত্মীয় স্বজন- ফাদার প্যাট্রিক এবং মিশনের প্রতিনিধিরা। ডালিমের বাবা দুপক্ষের মাঝখানে আর মা ঘুরে বেড়াচ্ছে চারপাশে। মাঝেমাঝে এক দৌড়ে ডালিমকে দেখে আবার চলে আসছে। আবার যাচ্ছে। একবার তাকে জগে করে পানি নিয়ে ঘরে ঢুকতে দেখে কুটি ক্ষেপে উঠে- তুমি আবার পানি দিয়া কী করো?

- ডালিমের শইল থাইকা গন্ধ বাইরাইতাছে। একটু মুইছা দেই

কুটি তাকে থামাতে গেলে দুই পক্ষই কুটিকে থামিয়ে দেয়- যাউক। মাথা ঠিক নাই মানুষডার। পোলায় মরছে এখনও কইতে পারে না। করতে দেও

ডালিমের বাবাকে একপক্ষ ডাকছে ডেভিড অভয় দাস আরেক পক্ষ বলছে মোহাম্মদ দাউদ আলী। দুটোর উত্তরেই সে তাকাচ্ছে প্রশ্নকর্তার দিকে। কিন্তু এখনও বলেনি কিছু। এখন পর্যন্ত তর্ক চলছে নজরুল- নজরুলের পক্ষ এবং মিশনপক্ষের মাঝে

মিশন পক্ষের যুক্তি হচ্ছে কাউকে লোভ দেখিয়ে ধর্মান্তরিত করলে সেটাকে ধর্মান্তর বলা যায় না। ডেভিড অভয় দাসকে ইট ভাঁটার মালিক চাকরির বিনিময়ে কলেমা পড়িয়েছিল। সুতরাং সেটাকে ধর্মান্তর বলা ঠিক হবে না। তাছাড়া ডালিমের বাবা এখনও মিশনে থাকে এবং রোববারে গির্জা করে

অন্যপক্ষের যুক্তি হচ্ছে বাংলাদেশে যত খ্রিস্টান তার বেশিরভাগই হয় লোভে পড়ে হয়েছে না হয় বাধ্য হয়ে হয়েছে। ধর্মান্তরিত হবার প্রক্রিয়া দিয়ে ধর্ম বিচার করলে বাংলাদেশের কোনো খ্রিস্টানই আর খ্রিস্টান থাকে না। সুতরাং কে কীভাবে ধর্ম চেঞ্জ করল সেটা কোনো বিষয় না। বিষয়টা হলো সে ধর্ম চেঞ্জ করেছে কি না। অভয় দাস কীভাবে বৌ বাচ্চা নিয়ে কলেমা পড়ল সেটাও এখানে বিষয় না। বিষয় হচ্ছে সে কলেমা পড়ে মোহাম্মদ দাউদ আলী হয়েছে কি না। যদি সে কলেমা পড়ার পরও গির্জায় যায় তবে তার জন্য কাফফারা আছে- তওবা আছে। তার মানে এই নয় যে সে আবার খ্রিস্টান হয়ে গেলো

ডেভিড অভয় দাস ওরফে দাউদ আলী বলছে না কিছুই। কিন্তু শিখু দাসকে অনেকক্ষণ ডালিমের ঘর থেকে বের হতে না দেখে অনেকেরই সন্দেহ হয়। নজরুল উঠে- দেইখা আসি দিদি আবার মুর্দার কাছে কী করে

কুটিও উঠে যায়। নজরুল না আবার দিদিরে ধুনফুন কিছু বুঝাইয়া ফালায় একা পাইয়া

দুজন যখন ডালিমের ঘরে পৌঁছায় তখন শিখু আঁচল ভিজিয়ে ছেলের বুক মুছিয়ে দিচ্ছে। কুটি আর নজরুল দুজন দুজনের দিকে তাকায়। নজরুল কুটির পিঠে হাত রাখে- যাই হউক কুটি দা। দিদিরে মনে হয় এই ঘরে রাখা ঠিক না

কুটিও একমত। দুজন এগিয়ে গিয়ে শিখুকে তাদের সাথে বের হয়ে আসতে বলে। শিখু রাজি না- গন্ধ বাইরাইতাছে তো। শইলডা মুইছা দেই

- লাগব না দিদি। আমরাই ওরে গোসল করামু

- বেক্কলের মতো কথা কস দেখি। জ্বরের মইধ্যে গোসল করব কেমনে?

- এখনতো জ্বর নাই

কথাটা ঠিক। শিখু দাসের মনে ধরে। নজরুল আর কুটির সাথে সে বেরিয়ে এসে দাঁড়ায় অভয় দাসের পেছনে। হাতে ধরে টানতে থাকে- ও ডালিমের বাপ দেখো আইসা ডালিমের শইল থাইকা গন্ধ বাইরাইতাছে

ডালিমের বাপ হাত ছাড়াতে পারে না। ফাদার প্যাট্রিক শিখু দাসকে বোঝানোর চেষ্টা করেন- দিদি তুমি ঘরে যাও। চিন্তা কইরো না। তোমার পোলারে গোসল দিয়া আমরা মাটি দিমু

- মাটি দিবেন? তাইলে দিয়া ফালান

সবাই সবার মুখের দিকে তাকায়। শিখু দাসও তাকায় সবার দিকে। নজরুলকে তার মনে ধরে- নজরুল। তোর লগে তো মেলা লোক। তুই আমার পোলাডারে মাটি দিবার পারস না?

নজরুল কোনো উত্তর খুঁজে পায় না। কুটি খ্যাঁকিয়ে উঠে- যেই মাটি দেউক। তোমারে তা নিয়া মাথা না ঘামাইলেও চলব। যাও ঘরে যাও

- আমি দেইখা আইলাম গন্ধা বাইর অইতাছে। আমার কথায় বিশ্বাস যায় না। উল্টা গরম দেখায়

নজরুল এবার সরব হয়- থাউক কুটি দা। মাথা ঠিক নাই। তার লগে এমন করা ঠিক না। ...তুমি চিন্তা কইরো না দিদি আমরা আছি

- আছি তা বুঝুম কেমনে? আমার পোলাডারে মাটি দিলেই পারস

- হ দিদি। আমরা তো হের লাইগাই আইছি। কিন্তু তার আগে যে ঠিক করা লাগে তোমার পোলা খিরিস্টান না মুসলমান

- আমার পোলা ডালিম


আরেক বিপদ। কুটি নজরুলের দিকে ফিরে- এর লগে কথা কইয়া লাভ নাই। ভেজালটা তুমিই বাধাইছ

- আমি আবার কী ভেজাল করলাম? তোমরা একটা মুসলমানরে খিরিস্টান বানাইয়া কবর দিবা। আমরা বুড়া আঙুল চুষুম?


হুজুর নজরুল আর কুটিকে থামান। শিখু দাস আস্তে করে আবার বেরিয়ে যায় মিটিং থেকে। হুজুর রেগে উঠেন অভয় দাসের উপর। এই লোকটার হাতেই সমাধান- আমি তোমারে সোজাসুজি কিছু কথা জিগাই মিয়া। সোজা উত্তর দিবা

ডেভিড অভয় দাস তার দিকে তাকায়

- তুমি কি মুসলমান না খিরিস্টান?

- খিরিস্টান

কুটি উত্তর দেয়। নজরুল বাধা দিয়ে উঠে- তারে কইতে দেও। তোমারে জিগাইছে কেডায়?


হুজুর আবার অভয় দাসের দিকে ফিরেন- তুমি কও মিয়া। তোমার মুখে জবান নাই?

- কী কমু

- তুমি মুসলমান না খিরিস্টান?

- মানে?

- মানে আবার কী? দুধ খাও নি মিয়া? কথা বোঝো না? তুমি ইট ভাঁটির চকিদারি করার সময় তোমার বৌ-পোলা নিয়া মুসলমান হইছিলা কি না কও


ডেভিড অভয় দাস আবারও চুপ মেরে যায়। মিশন প্রতিনিধি কথার রেশ ধরেন- এভাবে চাপে ফেলে স্বীকারোক্তি নেয়া ঠিক না

- চাপ কিসের? কিসের চাপ? আমি তো তারে ভালো কইরাই জিগাইতাছি- কও মিয়া তুমি বৌ পোলা নিয়া কলেমা পড়ছিলা?

- পড়াইছিল

- কেডা?

- ইট ভাঁটির মালিক

আবারও মিশন প্রতিনিধি কথা ধরেন- সেটা লোভ দেখিয়ে

- কিসের লোভ? ওই মিয়া তোমারে মুসলমান হইবার লাইগা কেউ কিছু দিছিল?

- একটা লুঙ্গি আর টুপি

হুজুর একটু থতমত খেয়ে যান- এইডা ঠিক হয় নাই। তয় সেইডা হের দোষ যে তোমারে লুঙ্গি আর টুপি দিছে; তয় হের লাইগা তোমার মুসলমানিত্ব খারিজ হয় নাই। তুমি মুসলমান

- অবশ্যই না

কথা ধরেন মিশন প্রতিনিধি- ডেভিড অভয় দাস যখন বৌ ছেলে নিয়ে অসহায় অবস্থায় তখন একজন চাকরির লোভ দেখিয়ে তাকে কলেমা পড়ায়। তাকে মোহাম্মদ দাউদ আলী নামে চাকরি দেয়। কিন্তু ডেভিড অভয় দাস কোনোদিনও মুসলিম হয়নি। তার প্রমাণ সে এর পরেও নিয়মিত গির্জায় গেছে

রাত অনেক হয়ে গেছে। আলোচনা খাড়াবড়ি-থোড় আর থোড়বড়ি-খাড়াতেই ঘুরছে। ডালিমের বাবা যদি ডেভিড অভয় দাস হয় তবে ডালিমের শেষকৃত্য হবে খ্রিস্টান নিয়মে। আর সে যদি মোহাম্মদ দাউদ আলী হয় তবে শেষকৃত্য হবে মুসলিম নিয়মে। কিন্তু যে লোক এই সিদ্ধান্ত দিতে পারে সে লাজওয়াব

মিটিংয়ের অর্ধেক লোক যখন উঠে দাঁড়িয়ে এ ওর দিকে তেড়ে যাচ্ছে তখন শিখু দাস ডালিমের ঘর থেকে দৌড়ে এসে স্বামীকে ঝাঁকাতে থাকে প্রচণ্ড শক্তিতে- ও ডালিমের বাপ। মুসলমানেও মাটি পায়। খিরিস্টানেও মাটি পায়। তুমি হেগোরে কও না আমার পোলাটারে মাটি দিয়া আইসা ঠিক করতে হেয় মুসলমান না খিরিস্টান?

২০০৬.১১.২০



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন