সোমবার, ২৫ এপ্রিল, ২০১৬

হামীম কামরুল হকের গল্প | নির্জন বারান্দায়, সন্ধ্যা হয়ে গেছে

পাশের বাড়িতে কেউ কাশছে। তিনতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে দীপন সিগারেট টানছিল। বাড়িগুলো এখানে একটা আরেকটা গায়ে গায়ে। অথচ একে নতুন ঢাকাই বলা যায়। পুরানো ঢাকা হলেও মানাতো। সিগারেট টানতে টানতে সে কাশির আওয়াজটা শোনে। মৃত্যু কয়েকদিন আগে বাবা খুব কাশতো। বাবা মারা গেলেন অনেক বছর হয়ে গেছে। দীপনের বাসার বারান্দাটা বাড়ির পেছনে। আরেকটা বাড়িরও পেছন দিকটা এসে প্রায় ঘেঁষেছে এই বাড়িতে। তাও ফাঁক আছে তিন ফিট। এ বাড়ির ছাদ থেকে সহজেই ওই বাড়িতে লাফিয়ে পড়া যায়। বারান্দার অর্ধেকটা আড়ালে পড়েছে, বাকিটা অবশ্য খোলা। খোলা জায়গাটা আবার অনেকখানিই খোলা। কারো দখলে রাখা জমি হয়তো। সেখানে নানান জাতের গাছপালা।
ঢাকা শহরের বুকের ভেতরে এমন একটা জায়গাতে এত গাছপালা, বলতে গেলে ওই ফাঁকা জায়গা আর সেখানে থাকা গাছপালার জন্যই এত হাওয়া খেলে। গরমেরও দিনেও। বাড়ির পেছনটা দক্ষিণ দিক বলেও হয়তো। বাড়ি ঘেঁষে যে-বাড়িটা পেছনে আছে তার মুখোমুখি একেবারে তিনতলা একটা ঘরের জানালা, আর দীপনের বারান্দার দূরত্বটা এমন যে এক বাড়ি থেকে চায়ের কাপ বাড়িয়ে দিলে তার বাড়ির বারান্দা থেকে আরেক হাত বাড়িয়ে সেটা সহজেই নেওয়া যাবে।

পূরবীদি এভাবে কতকতদিন সন্ধ্যা বেলায় তাকে চা করে দিয়েছে। স্বামী মারা গেল গত বছর। বিরাট চাকরি করতো। খুব বৈষয়িক ছিল। বসুন্ধরাতে একটা জমি কিনেছিল। ঢাকার আরো কয়েকটা এলাকায় জায়গা রাখা আছে। খুবই করিৎকর্মা। পূরবীর অনুযোগ দীপন তেমন নয়। যদিও দীপন ভালো করেই জানে পূরবী তাকে খুব পছন্দ করে। একদিন তো বলেই ফেলেছে, আগে হলে আর বয়সে কম হলে দীপনকে সে বিয়েই করতো। ‘তোমার সঙ্গে কেন যে আমার আরো আগে দেখা হল না!’ আগে হলে মানে কী? পূরবীদি কি অসুখী ছিল? দীপন বলেছিল, ছোট-বড়তে কী আসে যায়? আদ্যিকালের মানসিকতা ছাড়তে পারলেন না, না? ঢাকা শহরে সবাই স্বাধীন।’ তখন ‘আপনি আপনি’ ছিল। পূরবী বলে, ‘সবাই স্বাধীন বলো না, বলো যার টাকা আছে সে স্বাধীন।’

দীপন একটা বহুজাতিক সংস্থায় কাজ করে। প্রশাসনিক কাজ। বাড়ি খুলনায়। সেখানের একটা সরকারি কলেজ থেকে রসায়নে এম.এস.সি করে ঢাকার একটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ করেছে। এই সময়টায় এদিকে টিউশুনি, অন্য দিকে এমবিএ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএতে ভর্তি পরীক্ষায় দুবার ভাইভা পর্যন্ত গিয়েছিল। বোর্ডে ঢোকার সময়ই সবাই চমকে উঠেছিল। ছয়ফুট লম্বা, দীপনকে কালো বলা যাবে না, যদিও কালোর দিকেই ওর রঙটা। অসাধারণ একটা কমনীয়তা আছে। কাটাকাটা পুরুষালী চোখমুখ, কথাবার্তায়ও ভালো, খুলনার আঞ্চলিক টান একেবারেই নেই। তারপরও খুব সামান্য পয়েন্টের ঘাটতির জন্য তার সেখানে পড়বার সুযোগ হয়নি।

পূরবী বলে, ‘ঘরের বৌ না হলে তোমার সঙ্গে হাতির ঝিলে বেড়াতে যেতাম।’ দীপন চাপা গলায় তখন একটু গায়,‘হাতের কাছে হাতির ঝিল তৃষ্ণা মেটে না।’ পূরবী সেদিন খুব হেসেছিল। হাসলে পূরবীকে এত আবেদনময়ী মনে হয় যে, দীপেনের ইচ্ছা করে তক্ষুনি জড়িয়ে ধরে চুমু দিতে। কী ফিগার পূরবীর, কী সব খাঁজ ভাঁজ বাঁক। মাই গড! রহস্যেভরা নদী একটা। হাসার সময় সেই শরীরনদী সমুদ্র হয়ে যায়। দীপন তখন ঝড়ে পড়া অসহায় জাহাজ। চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আর কিছু করার থাকে না। পূরবী যেন ধরা দিতে দিতেও ধরা দেয় না। অনেক বলে কয়ে একবার মাত্র ধানম-ি লেকে নিয়ে যেতে পেরেছিল। সেই শেষ। সামনে পিছনে অনেকটা খোলা রেখে ব্লাউজ পরে। কখনো টাঙ্গাইল, কখনো জামদানি বেশিরভাগ সময় সুতির শাড়ি। দেখলেই এমন টান বোধ করে। আজকাল তো এমন সুন্দর করে প্রতিদিন শাড়ি পরা মহিলা দেখাই যায় না।

দীপন কারো কাছে বলেনি যে এমন একটা নারীর প্রতি তার এত টান আছে। স্বামী মারা গেছে। এখন তো রীতিমতো ধনী-বিধবা। সবকিছুই ছিল পূরবীর। স্বামীও অনেক ভালোবাসতো। পূরবী বলে, ‘ভালোবাসার সঙ্গে বেঈমানি করতে পারবো না। আমি শয়তান নই।’ দীপন বলে, ‘উনি তো বেঁচে নেই। তুমি তো ওনাকে ঠকাতে যাচ্ছ না। তার অসুস্থ বাপকেও ঠেলে ফেলে দিচ্ছো না। একটা বুড়ো লোক। তোমাকে দেখবার কেউ নেই। এমন একটা বাড়িতে থাকো। একা।’ পূরবী বলে, ‘কেন তুমি আছো না। ডাক দিলেই তো তোমাকে পাওয়া যাবে।’ কত অপেক্ষা করেছে, পূরবী কোনোদিন তাকে নিজ থেকে ডাকেনি।

পূরবীর সঙ্গে কথা হতো অদ্ভুতভাবে। সে ওই বাড়ির পেছনের বারান্দায় কখনো দাঁড়াত। পূরবী তখন জানালায়। দুজনেই মোবাইলে কথা বলতে, খুব নিচু স্বরে। মাঝে মাঝে এক অন্যের দিকে ঠাঁয় তাকিয়ে তাকিয়ে। পূরবীর বর কোনোদিন ঠাট্টা করেও বলেনি যে আমি মরে গেলে তুমি বিয়ে করো না। পূরবীও বলেনি যে, সে আর কোনোদিন বিয়ের ভেতরেই যাবে না। স্বামী তাকে সব রকম সুখই দিয়েছে। বিদেশে ঘোরাতে নিয়ে গেছে কয়েকবার। বিছানাও খুব ভালো ছিল। বেঁচে থাকতে স্বামী এত সুখ নাকি দিয়েছে যে সারাজীবনে আর সুখের কথা ভাবা লাগবে না। পূরবী এসবও বলেছে, অবশ্য দীপন জানতে চাইলে পর। এমনিতে নিজেকে থেকে তেমন কিছুই তো কোনোদিন বলেনি।

পূরবী কোনোদিন দীপনকে বলেনি: সারাদিন মোবাইল খেলা রাখতে শুধু তারই জন্য। পূরবীর জন্য তার সঙ্গে আসলে কি তেমন কোনো পাল্টাপাল্টি ভাষা তৈরি হয়েছে। দীপন জানে না। কখনোই কোনো জরুরি বা দরকারি ফোন করে তাকে ডাকেনি সে। বলেনি তার অন্তরের গভীর কোনো কথা বা নিজের একান্ত কোনো কষ্টের কথা বা সমস্যার কথা। মাঝে মাঝে কেবল বলেছে, আমার ছেলেটা বেঁচে থাকলে আর কোনো কিছুর জন্যই ভাবতাম না। পূরবীর বিয়ের পর পরই একটা সন্তান হয়েছিল, কিন্তু নানান জটিলতায় অনেক চেষ্টা করেও বাচ্চাটাকে বাঁচানো যায়নি। সঞ্জয় আসলে যখন দেখল যে বেঁচে যদিও থাকে, তাকে অনেক ঝামেলা নিয়ে টিকে থাকতে হবে, তাতে বাচ্চাটাও কষ্ট পাবে। তারপর তো সঞ্জয় ঠিক করেছিল, কানাডার সিটিজেনশিপ নিবে। ছেলেপেলে হলে সেখানে মানুষ করবে। কিন্তু কখনো সে ভারতে যাওয়ার কথা ভাবেনি।

দীপন মানুষ হিসেবে কারো সাথে পাছে নেই। এত বছর অব্দি তার সম্পর্কে কেউ কোনো আজেবাজে কথা বলেছে বলে মনে হয় না। এক সিগারেট খাওয়া ছাড়া তার আর কোনো রকম বদ অভ্যাস নেই। পরের বৌকে ফুসলে (যদিও বিধবা) ভাগিয়ে আনার কোনো ইচ্ছাও নেই। তারপরও পূরবীর সঙ্গে কী করে কী করে যোগাযোগ হয়ে গেল। কথাবার্তা চলল। একদিন পূরবী জানালা পর্দা সরিয়ে থুতু ফেলতে যাবে আর তখন দীপন বারান্দায় দাঁড়িয়ে। সে থুতু না ফেলে সেটা গিলে নেয়। আর অস্ফুটে ভীষণ বিব্রত চোখমুখ, কোনোমতে টেনে টেনে বলে, ‘স-অ-রি।’ বিহ্বল চেয়ে থাকে তার মুখের দিকে। দীপন বলে,‘ কেন কী হল?’ পূরবী বলে, ‘না এমনি।’ তারপর সেদিন টুকটাক দুটো কথা হয়।

‘আপনি এখানে থাকেন?’

‘জ্বি।’

‘ভাবী?’

‘বিয়ে করিনি। একা থাকি।’

এরপর পর্দা সরিয়ে দীপন তাকে দেখতে পেলেই বলত, শুনছেন। এভাবে আলাপ। পরে তো মোবাইল নম্বর নেওয়া। একটু একটু করে আলাপ জমে ওঠে। দীপন নিজের থেকেই বলেছিল, ‘আমি কিন্তু লোক খারাপ না। যাকে বলে কিনা মতলববাজ না।’ হ্যাঁ প্রখর যৌবনে থাকা মানুষ হিসেবে তার কিছু ফ্যান্টাসি আছে। ফ্যান্টাসির সেই স্রোত সে হাতে পার করে দেয়। এজন্য ঘুমের ভেতরে কিছু হয় না। পূরবীদির সঙ্গে আলাপ এতদূর গিয়েছে যে, একদিন বলে ফেলে,‘তাহলে তো তোমার নকটার্নাল ইমিশান হওয়ার কথা।’ সে বলেছিল,‘হয় না।’ পূরবী বলে,‘সঞ্জয় যতদিন বিয়ে করেনি, ততদিন নাকি ওর খুব হতো। তোমার হয় না! আশ্চর্য! কারণ?’ উত্তরে বলে,‘কারণ ‘থাকিতে নিজের হস্ত...।’ ‘বদমাশ কোথাকার?’ একদিন রাতের বেলা এসএমএস লিখিছিল, ‘প্রচ- গরম। ঘুমিয়ে পড়েছো।’ পূরবী লিখেছিল, ‘গরমে গায়ে কিছু রাখতে পারছি না। একটা সুতাও না।’ উত্তরে সেই লেখে,‘আমি তো একেবারে দিগম্বর সন্ন্যাসী হয়ে গেছি।’ মাঝে মাঝে সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখে সে পুরো উদোম হয়ে গেছে। লুঙ্গিটা পড়ে আছে পায়ের কাছে। তার অফিসের বসকে বিয়ের আগেই হবু বৌ বলেছিল, বাসায় লুঙ্গি পরা যাবে না। থ্রিকোয়াটার প্যান্ট পড়তে হবে। নইলে পাজামা। দীপনের লুঙ্গি ছাড়া বাসায় আর কোনো কিছু ভালো লাগে না। লোকজন তো এখন বাড়ির একটু বাইরে গেলেই লুঙ্গি বদলে নিয়ে প্যান্ট পরে বের হয়। দোকানে সামান্য কিছু আনার জন্য একটুখানির জন্য বেরতে হবে, তখনো। দীপনের বাসায় সকালে একটা ছুটা বুয়া এসে রান্না বান্না করে দিয়ে যায়। বাড়িঘর পরিষ্কার করে, ঘর মোছে। এছাড়া তার বাড়িতে সে বন্ধু বান্ধব হোক কিংবা অন্য লোকজন, প্রায় আসেই না। নিজেও কোথাও যায় না। একা একা থাকা। এমনকি তার এই বাড়ির পেছনের বারান্দা লাগোয়া যে ঘরটায় সে রাতে ঘুমায় সেখানে অন্য কোনো বাড়ি থেকে নজর দেওয়া সম্ভব নয়। গরমের দিন সে রাতে আর গায়ে কাপড় রাখতে পারে না। সকালে উঠে দেখে ‘স্টাক নেকেড’ হয়ে আছে। মাঝে মাঝে তার মনে হয় পূরবী তার ওই জানালা দিয়ে তাকে দেখেছে কিনা। দেখতেও তো পারে। তবে কেউ তার মতো ভোরে ওঠে না বলে রক্ষা। যত রাতেই ঘুমাতে যাক ভোরে দীপনের ঘুম ভেঙে যাবে। অভ্যাসটা বাবা করিয়েছিল, সেই ছোটবেলায়, আর সেটা কাটেনি। আগে ভোরের বেলা হাঁটত, সেটাও পুরানো অভ্যাস। ওই মনিং ওয়াকে গিয়েই তুরিন আপার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। খুলনার মতো শহরে সেই আমলে দিব্যি হাত ধরে হাঁটতো। দেখতে মোটেও ভালো ছিল না। তারওপর ইয়া লম্বা আর মোটাশোটা। ব্রা-প্যান্টি না পড়লেই হাঁটার সময় বিশাল বিশাল স্তননিতম্ব এমন দুলতো। মুখটা ছিল একেবারে শিশুর মতো। শরীরের সঙ্গে একেবারে যায় না। কুয়েটে পড়তো। সুযোগ পেলেই চুমু খেতে চাইতো। দীপন তখন সদ্য কলেজে উঠেছে। তারপরও চূড়ান্ত কিছু হতে হতেও হয়নি। এই একটা জিনিস-- সে কখনো কিছুর চূড়ান্তে যেতে পারে না। আইবিএতে এত ইচ্ছা ছিল, তারপরও হল না। জীবনে আর সব কিছু ভুলে গেছে, কিন্তু এই দুঃখ তার কাটেনি। এখন তার অধীনেই আইবিএ থেকে পাশ করা ছেলেমেয়েরা কাজ করে। তারপরও তার দুঃখ যায় না। আর একটা দুঃখ ছিল তুরিন আপাকে নিয়ে। কল্পনায় তাকে অনেক চাইতো কিন্তু বাস্তবে পেলেই তার মনে হতো কী দরকার। সম্পর্কটাই নষ্ট হয়ে যাবে। এটা ওটা কিনে দিত। খেতে নিয়ে যেত। মাঝে মাঝে তার এক বান্ধবীর বাসায়ও নিয়ে যেত। একটা বন্ধ ঘরে চুমাচুমি আর শরীর ছানাছানি করতো। একদিন তাকে নিজের উদোম করে নিয়ে অনেকক্ষণ ঘুরিয়েফিরে দেখেছে। ‘তুই তো পুরো ব্যাটা একটা। কিন্তু এমন ঠান্ডা মেরে আছিস? করবি?’ ‘না থাক। করলে সব শেষ হয়ে যাবে।’ ‘তা ঠিক।’ নানান সময় উস্কে দিয়ে নিজেই বলত, ‘না থাক।’ সেও ভাবত যাক বাঁচা গেল। পরে মনে হয় কী এসে যেতো। কত সুযোগ ছিল, হেলায় হারিয়েছে। তুরিন আপার সঙ্গে বহু বছর পর এখন ফেসবুকে দেখা। থাকে ফ্লোরিডায়। তিনটা বাচ্চা হয়েছে। দীপনকে কদিন হল খুব জ্বালাতে শুরু করেছে। নিজের কতগুলি খোলামেলা ফটো পাঠিয়েছে, এখন এত স্লিম হয়েছে! বিস্ময়কর। একটাতেও মুখ ঠিক মতো দেখা যাচ্ছে না। কেবল থুতনির বাম পাশে যে বড় একটা তিল আছে, সেটা দেখে বোঝা যায় এটা তুরিন আপাই। তারপর থেকে কেবলই বলতে শুরু করে, ‘তোর ন্যূড দে।’ দীপন কোনো গাইগুই করেনি। সোজা দিয়ে দিয়েছে। কোনো আড়াল ছাড়া। ছবিগুলো নিজের ডিজিটাল ক্যামেরায় একা একাই তোলা। তুরিন বলে,‘তোর তো দেখি বডিবিল্ডারের মতো ফিগার হয়েছে। জিমে যাস নাকি? একেবারে ঋত্বিক রৌশন স্টাইল। ও তোর যে বৌ হবে! মাগো আমি ভাবতেই পারি না। আয় না স্টেটসে, চলে যায়। আমি স্পন্সার করি। দুজনে একসঙ্গে সংসার শুরু করি।’ তুরিন আপা সব সময় এই ধরনের কথা বলে। তখনও বলত। ‘পাশ করেই তোকে বিয়ে করবো।’ ‘আমি কিন্তু মুসলমান হতে পারবো না।’ সেদিন বিছানায় পাশাপাশি শোয়া তুরিন আপা আশ্লেষে একটু চুমু খেয়ে নাক টিপে বলে,‘জানিস আমার কত সিঁদুর পরার শখ। তোর বৌ হলে সব সময় সিঁদুর পরব।’ কেবল মুখেই বলে কিন্তু একেবারে সেদিকে এগোয় না। দীপন একটা জিনিস কেবল মনে করে, কিছু ধরতে হলে কিছু ছেড়ে দিতে হয়। আর এক জীবনে সবার সব হয় না। তুরিন আপাকে বলেছে, ‘সুখে আছেন, ভূতের কিল খাওয়ার কোনো দরকার আছে?’ তুরিন আপাকে কোনোদিন ‘তুমি’ বলেনি। তুরিন আপা প্রতিদিনই বলে,‘ তোর আরো ছবি পাঠা। আগের গুলি আবছা তো।’ দীপন এরপর স্পষ্ট কয়েকটা পাঠায়। তারপর শুরু হয় তুরিন আপার চুমুর ¯্রােত। এরপর বলা নেই কওয়া নেই তুরিন আপা হঠাৎ উধাও। দুটো ফোন নম্বার দিয়েছিল। একটাতেও তাকে পেল না। দীপন কদিন ভুগলো। এসব নিয়ে কারো সঙ্গে কোনো আলাপ করে না। একবার মনে হল পূরবীকে যদি এসব ছবি দেখাতে পারতো। তুরিন আপা বলেছিল, অ্যাপেলোর চেয়েও সুন্দর শরীর দীপনের। ‘তুই তো আমার দেবতা হয়ে গেলি রে। আহা তোকে যে কেন ছেড়ে এলাম। তোমার জন্যই তো আমার আবার দেশে ফিরতে ইচ্ছা করছে।’ দীপন এসব শুনে হা হা করে হাসি লিখছিল ফেসবুক-চ্যাটে। তুরিন আপা তার সঙ্গে সেক্সচ্যাট করতে চায়। দীপন বলে, ‘এসব আমার ভালো লাগে না। খুব কৃত্রিম মনে হয়।’ অকৃত্রিম কিছু যে তার নাগালে ভেতরে তাও নয়। বরং তার মনে হয়, সবই তার নাগালে বাইরে। নিজে একটা কৃত্রিম জীবনযাপনই তো করছে। বছর ছয়েক হল এই চাকরিটা সে করছে। লোভনীয় চাকরিই বলা যায়। নতুন এই বিদেশি কোম্পানিতে তারা একসঙ্গে অনেক ছেলেমেয়ে ঢুকেছিল। তার সঙ্গে যারা ঢুকেছিল তাদের প্রায় সবাই বিয়ে শাদি করে ফেলেছে। কেউ কেউ বান্ধবী জুটিয়ে নিয়েছে। দুয়েকজনের সম্পর্ক বিছানা অব্দি গিয়ে ভেঙে গেছে। তার এসবের কোনোটাই হয়নি। এই যে এতদিন পর পূরবীকে পছন্দ হলো সে আর কোনোভাবেই কোনো দিকে যেতে পারছে না। আবার পূরবীকে যে পাবে তারও কোনো আশা দেখে না। ইচ্ছা করে প্রায়ই তাকে নিয়ে দূরে কোথায় যায়, কোথাও কোনা নদীর ধারে, বা লং ড্রাইভে। তার তো নিজের গাড়িও নেই। আর সে গাড়িও চালাতে জানে না। কলিগের গাড়ি নেওয়া যায়, সেখানে ড্রাইভার থাকবে। লং ড্রাইভের মজাটাই তো হবে না। মাঝে মাঝে মনে হয়, কেন? ভোগ! আহারে ভোগ! ছোটবেলায় বাবাকে দেখেছে প্রেস থেকে ফিরে ঘামছেন। মা পাখা নিয়ে বাতাস করেছেন। বাবা পাখার বাতাস খেতে খেতে পরনের ফতুয়া বা পাঞ্জাবি খুলছেন। খালি গা হয়ে হাতে মুখে জল দিয়ে কোনোমতে একটু খেয়ে আবার ছুটছেন প্রেসে। দুটো ঘরের ছোট্ট একটা বাসা। দুই দিদির সঙ্গে একটা ঘরে ভাগাভাগি করে থাকা। বোন দুটোর একটা নীলা, কলকাতার ছেলে সঙ্গে বিয়ে হয়ে এখন সেখানের মধ্যগ্রামে থাকে। আরেকজন অস্ট্রেলিয়ায়। একবার শুনেছিল স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হবে হবে, শেষ পর্যন্ত আর হয়নি। লীলাই থাকতে চায়নি, স্বামীটাই বলে ধরে রেখেছিল। দীপনকে এজন্য অস্ট্রেলিয়ায় নিতে চেয়েছিল জামাইবাবু। তারপর তো একটা বাচ্চা নিয়েই নাকি সম্পর্কটা বাঁচিয়েছে। আসলে বলে বাচ্চা নিতে চাইছিল না বলে লীলা ওইসব শুরু করেছিল। কিন্তু মুখে বললেই হতো, বাচ্চা নেব। নইলে থাকবো না। কিন্তু সেটা একদিনের জন্য বলেনি। মানুষ যে কত আশ্চর্য। আসল আর সবচেয়ে সহজ কথাটা কেউ বলতে চায় না। এসব কাউকে বলে না, পূরবীকেও না। আসলে একটু দয়া যদি করতো তাকে তাহলেও হয়তো অনেক বাধ ভেঙে যেত। এই যে এত কিছু চেপেচুপে চলা, কথার বলার কোনো মানুষ নেই পূরবী ছাড়া, যদিও আছে, তাও তাকে কিছু বলা যায় না। সবকিছু ওই ঘুরে ফিরে শরীর, সেক্স এসব নিয়েই হয়। দীপন দেখেছে কারো সঙ্গে সে হোক নারী কি পুরুষ, ঘনিষ্টতা ও আলাপ একটু গাঢ় হলেই এতে ওইসবই ঢুকে পড়ে। পূরবীর সঙ্গে আর হয়, ‘কী খেয়েছো?... আজ কী কী হল?’-- এই সব গল্পই পরে ওই নিয়ে নানান দিকে যায়, নয়তো কোনো সিরিয়ালের গল্প বা সিনেমার গল্প হয়। আসল কথা হয় না। মেসে যখন থাকত মুকিত কথায় কথায় বলতো,‘এটা ঢাকা শহর। কেউ দয়া করে না।’ ‘এই শহর সন্ন্যাসীর শিশ্নের মতো উদাসীন।’ সাবদার সিদ্দিকী নামটা লিখে কাগজটা মেসের দরজায় অনেক দিন চোখে পড়ছে। মানে বুঝলেও খেয়াল হতে না এর আসল অর্থের দিকে। সেই সময়টায় আহা, কী অবস্থা-- আজকে চলছে, আগামীকাল কী করে চলবে, তার কোনো ঠিকঠিকানা ছিল না। টিউশনির টাকা সময় মতো না পেলে কতদিকে সমস্যা হতো। বাবা কোনোমতে দুটো বোনকে পার করে দিয়ে চোখ বুজলেন। মা আছেন বেঁচে। খুলনায়ই থাকেন। তাদের সেই ছোট্ট টিনের ঘরটায়। বাবা শেষ জীবনে সব সম্বল দিয়ে করা। মা একটা কাজের মানুষ নিয়ে এসেছেন সাতক্ষীরা থেকে। বোনেরা কিছু টাকা পাঠায় আর বাবা সামান্য কিছু রেখেছিলেন। তাই দিয়ে কোনো মতো চলে। মাকে টাকাটা না পাঠালে তার নিজের মোটামুটি চালিয়ে নিতে কষ্ট হতো না। এমবিএ পাশ করে একটা চাকরির জন্য কত দৌড়াদৌড়ি। হঠাৎ করে রোকন ভাই তাকে নিয়ে এল এই কোম্পানিতে। টিউশনিগুলি ছেড়ে দিয়েছিল। কারণ এদিয়ে জীবন চলে না। একটা প্রেমও হল না। এখনও অনেকে মনে করে, রোকন ভাইতো শুরুর দিনই বলেছিল, ‘তোমার মতো হ্যান্ডসম ছেলের একটা বান্ধবী নেই, বিশ্বাসই হয় না। অতি বড় সুন্দর/ না পায় ঘর। অতি বড় সুন্দরীরটা সবাই জানে, কিন্তু উল্টাটা কেউ খেয়াল করে না। হা হা হা।’ দীপনের দিন তবু কেটে যাচ্ছে। মেয়েমানুষের জন্য তার যে খুব নেশা আছে বা গা-পোড়ায় তাও তো না। যা ঘটে কেবল কল্পনায়। তুরিন আপাই অভ্যাসটা খারাপ করে দিয়ে গেছে। এখন পূরবী তার দিকে একটু চাইতো। তার জন্য আসলে তো পূরবীর দিক থেকে কোনো টান নেই। এটাই মনে হয় বার বার। তার দুবাহুতে ধরা দিলে, তার ঠোঁটে ঠোঁট মেশালে এমন কি মহাক্ষতি হয়ে যাবে? আর শেষ পর্যন্ত তো বিয়েই তো করবে। পূরবী ভালো করেই জানে সে সিডিউস করার লোকই না। বর্ণেগোত্রেও কোনো সমস্যা নেই। রাগ হয়। কিন্তু রাগ দমন না করে সে দেখতে চায়, কেন তার রাগ হয়। আর এই রাগের পরিণাম কী? কোনো কিছু তো দিনের পর দিন বহন করা যায় না। রাগ হোক কি অনুরাগ, বা কোনে কিছুই তো মনের ভেতরে অনেক দিন ধরে একই তীব্রতায় থাকে না। দীপনকে একদিন পূরবী বাড়ি ছেড়ে দেওয়ার কথা বলে। ‘সামনের মাসে এখন থেকে চলে যেতে হচ্ছে।’ জানায়, তাছাড়া নিজের জীবনে কাউকে সে নতুনভাবে ভাবতে পারছে না। কথাগুলি ঘাই দিল খুব, কিন্তু দীপন শান্ত মতো শুনলো। সেদিন রাতে ভালো ঘুম হলো না। কিন্তু পরের দিন থেকেই একটু একটু করে থিতিয়ে যেতে শুরু করল। তারপর সব উধাও কোথায় দূর সমুদ্দুরে।

তবু দীপন কোনো কোনো সন্ধ্যায় এই বারান্দায় দাঁড়ালে পাশের বাড়িতে পূরবী থাকার স্মৃতিটা ঘাই মারে। পূরবীর স্বামী সঞ্জয় অবশ্য একটা কথা বলেছিল, আমি মরে গেলে আর যাই করো দেশ ছেড়ে যেও না। কিন্তু এই দেশে সে কী নিয়ে থাকবে? অসুস্থ শ্বশুরের দেখাশোনাও একদিন হয়তো শেষ হবে। তিনিও পরপারে চলে যাবেন। তারপর? দীপন বলেছিল, ‘তখন আমাকে খবর দিও।’ পূরবী বলেছিল, ‘আচ্ছা, তখন দেখা যাবে তুমিই আসবে না।’

পূরবী এখন নেই। তার অসুস্থ শ্বশুরকে নিয়ে সে বসুন্ধার ওই ফ্ল্যাটে চলে গেছে না কোথায় গেছে দীপন আর তা ঠিক মতো জানতেও চায়নি। পূবরী চলে গেছে তার শ্বশুরকে নিয়ে। কিন্তু তাও ওই ঘর থেকেই কাশির শব্দ আসছে। কাশির শব্দ শুনে বাবার কথা মনে পড়ছে আর কল্পনায় দেখছে পূরবীর হাসিমুখ। হয়তো একদিন তার ফোনটা বেজে উঠবে। পূরবীর নম্বরটা ভেসে উঠবে। সে বলবে, ‘হ্যালো। মনে পড়ল তাহলে!’



দীপন সিগারেটে একটা লম্বা টান দেয়। কীসের একটা আবেশে তার চোখ বুজে আসে।#

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন