সোমবার, ২৫ এপ্রিল, ২০১৬

স্মরণ | ভুলে যাওয়া সম্বুদ্ধ

সুদেষ্ণা দাশগুপ্ত

‘অমূল্য দাশগুপ্ত ওরফে সম্বুদ্ধ আজকে ভুলে যাওয়া নাম।পরশুরামের মন্ত্রশিষ্য, ত্রৈলোক্যনাথের উত্তরাধিকারী ও সজনীকান্তের সুহৃদ সম্বুদ্ধ তিরিশ থেকে ষাট দশক পর্যন্ত গোমড়ামুখো বাঙ্গলিদের হাসিয়েছেন, প্রয়োজনে চাবুক মেরেছেন। শিশু ও বড়দের কাছে তিনি সমান প্রিয় ছিলেন, একাধারে ‘শিকার কাহিনী’ ও ‘ডায়লেকটিক’-র মতো বই লিখেছেন। তাঁর কান্তিবাবু ডমরুর উত্তরসূরী এবং গাল্পিক টেনিদা ও ব্রজদার পূর্বসূরী।’

---সম্বুদ্ধ রচনাবলী


সেকালের সম্বুদ্ধ’কে একালে হয়ত কেউ তেমন চেনেনই না। অনেকে নাম শোনেননি কল্লোল-যুগের এই লেখকের। একটু পরিচয় করিয়ে দিই। পুরো নাম অমূল্যকুমার দাশগুপ্ত। বাবা অতুলচন্দ্র দাশগুপ্ত, মা কিরণময়ী দেবী। অতুলচন্দ্র দাশগুপ্ত ছিলেন বরিশাল বি এম কলেজ বা ব্রজমোহন কলেজের সংস্কৃতের অধ্যাপক। অমূল্যকুমার দাশগুপ্ত বা ‘সম্বুদ্ধ’ স্বাভাবিকভাবেই ‘বরিশাইল্যা কাঠ-বাঙাল’ ছিলেন।

তাঁর শৈশব কাটে বরিশাল শহরের নদীর ধারের বাজারের কাছে মহিমবাবুর কাছারির লাগোয়া একটি বাড়িতে। হাতে খড়ি বরিশালের শ্রীচৈতন্য গোবিন্দমোহন স্কুলে। দুই বাংলাতেই পড়াশুনো তাঁর। যদিও বরিশালের অনুশীলন সমিতির সাথে যোগাযোগ ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছিল বলে বাবা অতুলচন্দ্র দাশগুপ্ত, বি এম কলেজ থেকে আই এ পাশ (প্রথম বিভাগে) করার পরেই ছেলেকে সোজা কলকাতা পাঠিয়ে দেন মামাবাড়ি।  কলকাতায় এসেও তিনি অনুশীলন সমিতির বিপ্লবী কাজকর্মের সাথে নিজেকে জড়িয়ে রাখেন। সঙ্গে চলে পড়াশুনো। যথেষ্ট মেধাবি ছাত্র ছিলেন। বিদ্যাসাগর কলেজ থেকে বি এ পাশ করেন ১৯৩১-এ। তারপর ডাবল এম এ করেন রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতিতে। আর সেই সময়েই আন্তঃপ্রাদেশিক ষড়যন্ত্র মামলার আসামী হিসেবে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। যৌবনের বেশ কিছুটা সময় কাটে রাজস্থানের দেউলি আর কলকাতার প্রেসিডেন্সি জেলে। 

পড়াশুনোর মত সম্বুদ্ধ’র কর্মজীবনও ছিল দুই বাংলা ঘিরেই। তিনি অধ্যাপনা করেছেন বরিশালের বি এম কলেজে, খুলনার দৌলতপুর বি এম কলেজে, ফরিদপুর রামদিয়া কলেজে, পাবনার এডোয়ার্ড কলেজে, খুলনার আর কে গার্লস কলেজে এবং শেষে মেদিনীপুরের কাঁথি মহকুমার প্রভাতকুমার কলেজে। ১৯৪৩ সালে তাঁর বিয়ে হয় বরিশালের বেলদাখানের প্রসিদ্ধ চিকিৎসক নরেন্দ্রনাথ সেনের মেয়ে মঞ্জুরী দেবীর সঙ্গে। সম্বুদ্ধে’র শেষ জীবন কেটেছিল অবসাদে, মানসিক অস্থিরতায়। ১৯৫০ সালে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার পর তিনি পূর্ববঙ্গ ছাড়তে বাধ্য হন। মানুষজন মালপত্র সমেত জীবনকে বরিশাল থেকে তুলে এনে কলকাতার বৈষ্ণবঘাটাতে বসাতে হল। ভগ্নহৃদয়ে দেশ ছেড়ে আসার জ্বালা তিনি শেষ জীবন অব্দি ভোগ করেছেন এবং অবসাদগ্রস্ত হয়ে ভগ্নস্বাস্থ্যে মাত্র ৬২ বছর বয়েসেই মারা যান।

আসি তাঁর রচনা প্রসঙ্গে । ‘পরশুরাম জাতে বামুন, বেশ কয়েকবার ক্ষত্রিয়দের সাবাড় করেছিলেন। আর পরশুরামের মন্ত্রশিষ্য তো প্রাজ্ঞ সম্বুদ্ধ, ক্ষত্রিয় হয়েও বোধি লাভ করে বামুনদের জাত ব্যবসার ভিতটি কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। এই দুই গুরুশিষ্য একসময় বাঙলার সাময়িক পত্রিকা দাপিয়ে বেড়াতেন, এই কথা কি আজ কেউ বিশ্বাস করবে?’ (গৌতম ভদ্র)। 
তাঁর এই ‘সম্বুদ্ধ’ ছদ্মনামটি দিয়েছিলেন ‘শনিবারের চিঠি’র সম্পাদক সজনীকান্ত দাস। পরিহাসপ্রিয়তা ছিল সম্বুদ্ধর স্বভাবজাত। কোনো সিরিয়াস কিছু দেখলেই  তাঁর বিরক্তির উদ্রেক হত। প্রচার-বিমুখ এই মানুষটিকে সজনীকান্ত দাসই প্রায় বাধ্য করেছিলেন লিখতে। সম্বুদ্ধ নিজেও কিছুদিন ‘শনিবারের চিঠি’র সহ-সম্পাদকের কাজও সামলেছেন।

সম্বুধের সাহিত্য জীবনে আর যে দু’জন সাহিত্যসঙ্গী ছিলেন তাঁরা হলেন রাজশেখর বসু (পরশুরাম) ও বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)।পরশুরামের লেখার স্টাইলে সম্বুদ্ধ খুবই অনুপ্রাণিত হয়েছেন। এমনকি পরশুরাম তাঁকে তাঁর দুটি গল্পের প্লটের আইডিয়াও দিয়েছিলেন। সম্বুদ্ধের প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘ডায়লেকটিক’(১৯৪৭ বঙ্গাব্দে)। সম্বুদ্ধ সারা জীবন মূলত হাসির গল্প লিখেই পাঠকদের আনন্দ দিয়েছেন। কিন্তু আপাত হাস্যরসের আড়ালে বেশ একটি খোঁচাও থাকত যা সহৃদয় পাঠককূলের দৃষ্টি এড়িয়ে যাবার নয়। 

তাঁর গল্পগ্রন্থ ‘বাঘ-সাপ-ভূত’ এর মালমশলা তিনি বরিশালের লোকের মুখ থেকে সংগ্রহ করেছিলেন। রহস্য গল্পের দিকেও তাঁর ঝোঁক ছিল। বেশ কয়েকটি রহস্য উপন্যাস ও গল্প সাময়িক পত্রে ছাপা হয়েছিল। ‘ছেলেধরা জয়ন্ত’ রহস্যোপন্যাস। বই আকারে প্রকাশ পায় ১৩৭৩ বঙ্গাব্দে। তাঁর পাঁচটি প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে ‘ছেলেধরা জয়ন্ত’ শেষ ছাপা বই। বিদেশি গল্প-উপন্যাস’র অনুবাদ কাজও তিনি করেছেন। ‘শিকার-কাহিনী’(১৯৫৩ বঙ্গাব্দে) সম্বুদ্ধর দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ। নানা পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর গল্পগুলি প্রকাশের সঙ্গে সংগেই জনপ্রিয়তা পায়। ইংরেজি ভাষাতেও অনূদিত হয়। ‘বাঘের থাবা’ এবং ‘ভালুকের আলিঙ্গন’ গল্প দু’টি যথাক্রমে ‘The Tiger’s Paw’ এবং ‘The Bear’s Embrace’ নামে নীলিমা দেবী কর্তৃক অনূদিত হয়ে ‘Shikar Kahini OR SHIKAR STORIES’ শিরোনামে একটি ইংরেজি সংকলনে গ্রন্থভুক্ত হয়। (Best Stories of Modern Bengal, নীলিমা দেবী অনূদিত দ্বিতীয় খণ্ড, সিগনেট, কলকাতা, ১৯৪৫, ২৭৩-২৯২)। ‘শিকার-কাহিনী’র দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশিত হয় ১৩৬৮ বঙ্গাব্দে, ১৯৬১ খৃষ্টাব্দে। 

শিকারের গল্পগুলি সবই এক শিকারী এবং অবশ্যই গোপ্পে কান্তি গাঙ্গুলির মুখ দিয়ে বলানো। এমন বিচিত্র ঢঙে শিকারের গল্পগুলি বলা হয়েছে যে সেগুলি যেরকমই খেয়ালি রস-বাত্তেল্লা (এক ধরনের অবাস্তব গল্প) ভিত্তিক হোক না কেন, তার বীজটি কিন্তু বাস্তব থেকেই নেওয়া। সেগুলি পাঠকের রসোত্তীর্ণ তো করেই, সাথে সাথে আপাত যৌক্তিকতার ক্রমকে ক্ষুন্নও করে না।


‘বাঘের থাবা’ গল্প পড়ে হেসে আর কূল পাই নে।

এক বাঘ শিকারি’র এক সাকরেদ। মুশকো জোয়ান সে। নাম তার কেতুলাল। ভয়-ডর যে কাকে বলে তা সে জানেই না। তাই সবাই ডাকে কালকেতু। খেজুরগাছ-কাটা হেঁসো দিয়ে বাঘ মারতো সে। কিন্তু তা সত্ত্বেও একবার এক চোদ্দ হাত লম্বা (না না ল্যাজসুদ্ধু) বাঘের সাথে ধস্তাধস্তিতে তার মাথার খুলির ওপর দিকের খাগড়াটা বাঘের থাবার আঘাতে একেবারে উড়ে যায়। এখন উপায়? জ্ঞান ফিরতেই সে বলে তার বউ ভাত রেঁধে বসে আছে, সে খোলা খুলিতেই (মাথার ওপর দিকে তো ভোঁ ভাঁ) বাড়ি যাবে। এদিকে ঠা ঠা রোদ্দুরের তাপে ঘিলু গলে যাবে বলে ওকে কেউ বেরোতে দিচ্ছে না। শেষে একটা ডাব কেটে তার মালার আধখানাকে চেঁছে ঠিক করে কেতুর মাথায় বসিয়ে দেওয়া হল, দিব্যি খাপে খাপে বসে গেল। তারপর সুজি ভিজিয়ে রোলাম করে কেতুর নতুল খুলি জুড়ে দেওয়া হলো, মাথা বেমালুম আস্ত হয়ে গেল। আর তাকে প্রেসক্রাইব করা হল সরষের তেল মাখতে যাতে তেলে পেকে খোলা পোক্ত হয়ে যায়। বছরখানেকের মধ্যেই তার একটা দিব্যি তেল-চুকচুকে টাক হলো। ওঃ সে যা তার টাক কোথায় লাগে “ক” বাবু “খ” বাবুর টাক। যেন তাজমহলের গম্বুজ, অবশ্যই কালো রঙের।

এত কিছু করার পরেও লোকে বলে, কিন্তু টাক হয়ে রইল বেচারীর, কেশরঞ্জন মাখিয়ে দেখলে হত না?

...মেখেওছিল তা কেতু কিছুদিন নাকি, ওই কেশরঞ্জন তেল। তা গজাল গুচ্ছের নারকোলের আঁশ। তাই শেষটা আর কেতু মাখেনি। বলেছে, থাক, আমার টাকই ভাল।

‘ভোলানাথ দাশের গল্প’ শিরোনামে তেরোটি অগ্রন্থিত গল্প সংকলিত হয়। ভোলানাথ দাশের সমস্ত গল্পই বরিশালের লোকমুখে ‘ভোলানাথ দাশী গল্প’ নামে প্রচলিত ছিল এবং গল্পের চরিত্রটিও নাকি বাস্তব। সম্বুদ্ধ’র পিতামহী এই ভোলানাথ দাশ(দাশগুপ্ত)-কে দেখেছেন ও তাঁর নিজের মুখ থেকে গল্প শুনেছেন। সম্বুদ্ধ সেসব গল্প শুনেছেন পিতামহীর মুখে, নিজের শৈশবে। সম্বুদ্ধের কথায়-“... ‘ভোলানাথ দাশের গল্প’ নামেই এগুলি বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হইয়াছিল। ১নং(কইমাছ), ২নং(কাঁঠাল), ৪নং(বাঘ) ও ৭নং(কবিরাজ গল্পের মূল গল্পটি বড়ি খাইয়া গুরুঠাকুর হজম হইয়া যাওয়া) এই চারিটি গল্প ভোলানাথ দাশের নিজস্ব। ভাষা আমার, তাহাতে কারিকুরি বেশি করি নাই। বরিশালের ভাষাকেই ব্যাকরণ ও বানান-সম্মত করিয়া আমি লিখিয়াছি। ভোলানাথ দাশের গল্প এখনকার লোক জানে না। একদা বরিশাল জেলায় এগুলি বহুল প্রচলিত ছিল। গুল-গল্পের নিদর্শন বলিয়া এগুলি উল্লিখিত হইত। বরিশালে গুল-গল্পের ইডিয়মেটিক নামই ছিল ‘ভোলানাথ দাশী গল্প’। যাহারা ইহা শুনিয়াছিল, ভুলিয়াছে, যাহারা শুনিতে পারিত তাহারা আর শুনিবে না। সেই বরিশালচ্যুত বরিশালীয়দিগের জন্য এগুলি লিখিয়া রাখিয়া গেলাম।”

সম্বুদ্ধ রচিত কিছু গল্পের উল্লেখ নিচে করা হল।


১ । বাঘের থাবা : প্রকাশিত হয়েছিল শনিবারের চিঠি পত্রিকায় , আষাঢ়, ১৩৪৬ ।

২। সাপের ছোবল : প্রকাশিত হয়েছিল শনিবারের চিঠি পত্রিকায় , আষাঢ়, ১৩৪৬।

৩ । ভালুকের আলিঙ্গন :  প্রকাশিত হয়েছিল শনিবারের চিঠি পত্রিকায় , আষাঢ়, ১৩৪৬।

৪। বাইসন ও বায়োস্কোপ :  প্রকাশিত হয়েছিল শনিবারের চিঠি পত্রিকায় , কার্তিক, ১৩৪৬।

৫ কুমীরের কীর্তি : প্রকাশিত হয়েছিল প্রবাসী পত্রিকায় , শ্রাবন, ১৩৪৬।

৬ । হাতীর হিম্মৎ : প্রকাশিত হয়েছিল শারদীয়া আনন্দবাজার পত্রিকায় , ১৩৫৬।

৭ । ক্যামেরার কামড় : শারদীয়া আনন্দবাজার পত্রিকা , ১৩৬২।

৮ । বন-তুলসীর বাণী , প্রকাশিত হয়েছিল গল্পভারতী পত্রিকায়, ১৩৬৫।

৯ । মানুষের মীননেস, প্রকাশিত হয়েছিল অলকা পত্রিকায়, আশ্বিন ১৩৪৬।

১০ । কাঁঠাল, প্রকাশিত হয়েছিল সচিত্র ভারত পত্রিকায়, চৈত্র ১৩৪৬।

সূত্রঃ সম্বুদ্ধ রচনাবলী, প্রথম খণ্ড, প্রকাশকঃ অবভাস, ২০০৭


লেখক পরিচিতি
সুদেষ্ণা দাশগুপ্ত

1 টি মন্তব্য:

  1. ছোটবেলায় পড়েছিলাম, এখন আবার পড়ছি এত ভালো লাগলো, যে শেষ করতেই ইচ্ছে করছে না। অদ্ভুত!

    উত্তরমুছুন