সোমবার, ২৫ এপ্রিল, ২০১৬

হামীম কামরুল হকের ধারাবাহিক প্রবন্ধ | জাদুবাস্তববাদ : পর্ব--১

১. আভাস ও প্রকাশ:

জাদুবাস্তববাদের বৈশিষ্ট্যগুলিকে প্রায়শই অলৌকিক, অতিপ্রাকৃত, পরাবাস্তব এবং ফ্যান্টাসি, কখনো কখনো রহস্যময়তার সঙ্গে একাকার করে দেওয়া হয়। সবচেয়ে যেটি বিস্ময়কর তা হলো কোনো রচনার কোন অংশটিতে স্পষ্টভাবে জাদুবাস্তববাদ স্পষ্ট হয়ে দেখা দিয়েছে, সে-সম্পর্কে এর কোনো কোনো আলোচক যে যে দৃষ্টান্ত হাজির করেন, তাতে জাদুবাস্তববাদের বদলে রহস্য, অলৌকিক পরিস্থিতি, ভূত-প্রেত, জ্বিন-পরিদের সহাবস্থান এবং চমকই প্রধান হয়ে ওঠে। ফলে কাকে বলে জাদুবাস্তববাদ, কোন কোন লক্ষণের আলোকে সেটি চিহ্নিত করা যাবে-- সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট সংজ্ঞায়নের অভাব চোখে পড়ে।
আবার যে যে লেখককে জাদুবাস্তববাদী বলে আখ্যায়িত করা হয়, তাঁদের রচনায় প্রতিপদে এই লক্ষণ দেখা যাবে তাও নয়। প্রতিপদে অলৌকিকত্ব, অবাস্তবতা যেখানে, সেটি যেমন মায়াপুরী তৈরি করে, প্রতিক্ষণে জাদুবাস্তববাদের উপস্থাপন জীবনের বাস্তবতাকে বরং আড়াল করে দেয়। J.A. Cuddon জাদুবাস্তববাদী রচনার বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করতে গিয়ে বলেন--

'' Some of the characteristic features of this kind of fiction are the mingling and juxtaposition of the realistic and the fantastic of bizarre, skilful time shifts, convoluted and even labyrinthine narratives and plots, miscellaneous use of dreams, myths and fairy stories, expressionistic and even surrealistic description, arcane erudition, the element of surprise of abrupt shock, the horrific and the inexplicable. '' (Cuddon, 2013: 417)

(ভাষান্তর :“এই জাতীয় কথাসাহিত্যে কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য যেমন বাস্তবতা এবং উদ্ভট কল্পনা, দক্ষভাবে সময়ের অদল বদল, জটিল এবং এমনকি গোলকধাঁধাতুল্য আখ্যান এবং পটভূমির মিশ্রণ ঘটে , পাশাপাশি অবস্থান করে স্বপ্ন ও কল্পনার পাঁচমিশালী ব্যবহার, পুরাণ ও রূপকথারা, অভিব্যক্তিবাদিতা এবং সমানভাবে পরাবাস্তবিক বর্ণনা, গুপ্তবিদ্যা এবং আকস্মিক অভিঘাত সৃষ্টি করার উপাদান যা ভয়ংকর এবং ব্যাখাতীত”। ভাষান্তর--বিপাশা চক্রবর্তী)

এতে জাদুবাস্তববাদকে রূপকথা, পুরাণ, ফ্যান্টাসি, গোলকধাঁধা, অভিব্যক্তিবাদ, পরাবাস্তবতা এবং আতঙ্ক-বিস্ময়ের সঙ্গে মিশিয়ে একাকার করে দেওয়া কারণে এর মূল দিকটি সুনির্দিষ্ট হয়নি এবং এধরনের শনাক্তকরণের ফলে বিষয়টি সম্পর্কে স্পষ্টতা তৈরির চেয়ে বিভ্রান্তিই বেড়েছে। আরো একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, কথাটি হল-- ‘জাদুবাস্তববাদ’ (Magic Realism), কিন্তু প্রায়ই ক্ষেত্রে এটিকে বাংলায় ‘জাদুবাস্তবতা’ (Magic Realism)হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। দুটোর ভেতরে পার্থক্য আছে। জাদুবাস্তবতাকে উপস্থাপন করার একটি শৈল্পিক পদ্ধতি হলো জাদুবাস্তববাদ। আর সেটিকে ভুলভাবে কখনো কখনো ‘জাদুবাস্তবতাবাদ’ও বলা হয়ে থাকে। অথচ (Magic Realism) ‘জাদুবাস্তবতা’ যদি হয়, ‘জাদুবাস্তবতাবাদ’ কি ‘ম্যাজিক রিয়ালিটিজম’ হবে? যেমন হয় না ‘আধুনিকতাবাদ’। ‘মর্ডানিটি’র বাংলা ‘আধুনিকতা’ হলে ‘আধুনিকতাবাদ’ কি ‘মর্ডানিটিজম’? ফলে সেটি যথার্থ নয়। এজন্য একটু সর্তক হওয়া প্রয়োজন। সবচেয়ে বড় কথা ‘জাদুবাস্তববাদ’ কী, কোনো রচনাকে কীসের ভিত্তিতে এই আখ্যা দেওয়া হবে, সেটি দৃষ্টান্ত সহযোগে বুঝে নেওয়া দরকার।

জাদুবাস্তববাদ সম্পর্কিত প্রবন্ধ-নিবন্ধে প্রায় ক্ষেত্রে এর কোনো দৃষ্টান্ত তেমন করে হাজির করা হয় না। সেখানে আমরা দৃষ্টান্ত দিয়েই জাদুবাস্তববাদের প্রকৃতিটাকে হাজির করতে চাই, এবং স্পষ্ট করতে চাই, কোনো লেখায়, কোনো ঘটনাকে, কীভাবে বললে সেটি জাদুবাস্তববাদী হয়ে ওঠে। মনে রাখা দরকার-- ঘটনাটা উপকরণ মাত্র, আর জাদুবাস্তববাদ ঘটনা উপস্থাপনের একটি প্রকরণ।

ধরা যাক, একটি লোক চট্টগ্রাম থেকে হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে গেল। কয়েক মাস পরে তার সন্ধান মিললো দার্জিলিংয়ে, কিন্তু তখন তার নিজের স্মৃতি হারিয়ে গেছে। অন্য এক ব্যক্তির স্মৃতির তার ভেতরে ভর করেছে যে-ব্যক্তি মৃত এবং তার সঙ্গে এই ব্যক্তির কোনো যোগসূত্র থাকার কথাই নয়। সে নিজেকে অন্য নামে পরিচয় দিচ্ছে, এবং এমন সব কথা বলছে যা অনেক আগে মৃত সেই ব্যক্তির সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। সংবাদপত্রে খবর পেয়ে তাঁর স্ত্রী ও আত্মীয়-স্বজন লোকটিকে শনাক্ত করতে পারল। ডাক্তারি পরীক্ষায় দেখা গেল সে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং অথচ তার স্মৃতিতে অন্য এক লোকের অতীত পুরো ভর করেছে। তার নিজস্ব অতীত নেই, স্মৃতি নেই, অথচ সে উন্মাদও নয়, বা পাগল ব্যক্তিও নয়। মূল ঘটনাটি কেউ আসলে নিশ্চিত করতে পারছে না, তার কেন এমন পরিণতি হল সেটি চিকিৎসাবিজ্ঞান শনাক্ত করতে পারছেন না। অন্যদিকে তার স্ত্রী আত্মীয়স্বজনরা, তাকে নানান কিছু মনে করানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন, তাকে তাদের সঙ্গে তোলা আলোকচিত্রও দেখাচ্ছে, পারিবারিক অ্যালবাম দেখাচ্ছে, কিন্তু কোনোটাই কাজে আসছে না, বরং আয়নায় সে নিজের চেহারা দেখে বলছে, এটি তার চেহারাই নয়। অর্থাৎ বিজ্ঞান ও সেই ব্যক্তির অতীত বা ইতিহাস কোনোটাই এখানে কাজে আসছে না, এতে দেখা যাচ্ছে এই ব্যক্তির বর্তমান পরিস্থিতিই তার একমাত্র বাস্তবতা, এছাড়া তার আর কোনো সত্য নেই। এর ভেতরে হঠাৎ কোনো এক প্রসঙ্গে লোকটি জানালো, সেই আগের লোকটির, যে-লোকটির স্মৃতি-শরীর তার ভেতরে ভর করেছে, সেই লোকটির স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি, তাকে হত্যা করা হয়েছে। শুরু হল কাহিনির নতুন এক পর্ব।-- এই ঘটনাটিতে জাদুবাস্তবতা আছে, জাদুবাস্তববাদের মাধ্যমে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গল্প-উপন্যাস রচনা করা যেতে পারে। কিন্তু তার বদলে যদি এতে রহস্য, অতিপ্রাকৃত বা ভূত-প্রেতের সমাবেশ ঘটানো হয়, বা দেখানো হয় যে, তাকে উড়ন্ত চাদরে চট্টগ্রাম থেকে দার্জিলিংয়ে নেওয়া হয়েছিল-- তাহলে সেটি জাদুবাস্তববাদ থেকে চ্যুত হয়ে যায়।

বর্তমান আলোচনায় আমরা প্রথমেই দেখে নিতে চাই সংজ্ঞায়িত করার দিক থেকে জাদুবাস্তববাদের মূল বিষয়টি আসলে কী রকম এবং পরে পরেই আমরা কয়েকটি দৃষ্টান্তের ভেতর দিয়ে উপস্থাপন করতে চাই সেই জাদুবাস্তববাদী পরিস্থিতিগুলিকে।

প্রথমে যে-লেখকের পাঠ্যবস্তু বা টেক্সটকে জাদুবাস্তববাদী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে তেমন প্রতিনিধিত্বশীল লেখকের রচনার ভেতর দিয়ে বিশ্লেষণটা করতে চাই। পরে এর উদ্ভব, ভূমিকা ও প্রভাব সম্পর্কে আমরা দৃষ্টি দেওয়ার চেষ্টা করব। সেই সঙ্গে আমরা দেখব এর তিনটি রূপ আছে, একটি ইউরোপীয়, অন্যটি লাতিন আমেরিকাজাত এবং আরেকটি বৈশ্বিক। জাদুবাস্তববাদ চিত্রকলা, সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে প্রভাব ফেলেছে। বর্তমান রচনায় কথাসাহিত্যে এর ভূমিকা, বৈশিষ্ট্য ও প্রভাবই আমাদের দ্রষ্টব্য।

সমকালীন বিশিষ্ট ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক ও সমালোচক-গবেষক ডেভিড লজের মতে, যখন কোনো অন্তর্নিহিত বিষয়কে কার্যকরভাবে উপস্থাপনের জন্য বাস্তববাদী আখ্যানের ভেতরে বিস্ময়কর বা চমকপ্রদ ঘটনা ঘটে তাকেই জাদুবাস্তববাদ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়-- যার বিশেষ সংশ্লিষ্টতা আছে লাতিন আমেরিকার কথাসাহিত্যের সঙ্গে (যেমন কলম্বীয় ঔপন্যাসিক গাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের লেখায়), যদিও এর দেখা পাওয়া যায় অন্যান্য মহাদেশের লেখকদের গল্প-উপন্যাসে, যাঁদের মধ্যে আছেন গ্যুন্টার গ্রাস, সালমান রুশদি এবং মিলান কুন্দেরা। এই লেখকদের প্রত্যেকেই নানান ঐতিহাসিক ঘটনার সহিংস আলোড়ন এবং ব্যক্তিগত জীবনেও নানান উত্থান-পতনের তীব্র সংক্ষোভের ভেতর দিয়ে গিয়েছেন, তাঁদের সেই অনুভূতি ও অভিজ্ঞতাকে প্রকাশের জন্য বাস্তববাদ যথেষ্ট ধারণক্ষম নয় বলেই তাঁরা মনে করেছেন (Lodge,1992:114)। লজ আরো মনে করেন, অপেক্ষাকৃত স্বল্প পরিমাণ ব্রিটিশ লেখকের মধ্যে এর প্রভাব রয়েছে এবং বাইরে থেকে এর আগমন ঘটলেও কয়েকজন একে স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করেছেন; তাঁদের মধ্যে আছেন ফে ওয়েল্ডন, অ্যাঞ্জেলা কার্টার এবং জেনেটি উইন্টারসন (Lodge,1992:114)। লজ জাদুবাস্তববাদের দৃষ্টান্ত হিসেবে মিলান কুন্দেরার ‘দ্যা বুক অব লাফটার অ্যান্ড ফরগেটিং’(১৯৭৮)-এর একটা অংশ উপস্থাপন করেন। আমরা সেই অংশটিতে দেখি একদল নৃত্যরত মানুষ নাচতে নাচতে মাটি থেকে হাওয়ায় ভাসতে থাকে এবং ভাসতে ভাসতে আকাশে উড়ে যায়।--

''And then everyone abruptly began again to sing the three of four simple notes, speeding up the steps of their dance. They were fleeing rest and sleep, outrunning time, and filling their innocence. They were all smiling, and Eluard leaned over a girl he had his arm around:

‘‘A man possessed by peace is always smiling.’’

And the girl started laughing and stamping her feet harder so that she rose a few centimeters above the pavement, pulling the others up after her, and a moment later not one of them was touching the ground, they were all taking two steps in place and one step forward without touching the ground, yes, they were soaring over Wenceslaus Square, their dancing ring resembled a great wreath flaying off, and I ran on the ground below and looked up to see them, as they soared farther and farther away, raising the left leg to one side and then the right to the other, and there below them was Prague with its cafes full of poets and its prisons full of betrayers of the people, and from the crematorium where they were incinerating a Socialist deputy and a surrealist writer the smoke ascended to the heavens like a good omen, and I heard Eluard’s metallic voice:

‘‘Love is at work it is tireless.’’

And I ran after that voice through the streets so as not to lose sight of the splendid wreath of bodies gliding over the city, and I realized with anguish in my heart that they were flying like birds and I was falling like a stone, that they had wings and I would never have any. '' (Kundera,1996:94-95)

ভাষান্তর : “এবং অতপর আচমকা সবাই তিন চারটি সহজ সুরে গাইতে শুরু করল, তাদের নাচের গতি ক্রমশ বাড়তে লাগল। ঘুম আর আরাম থেকে পালিয়ে সময়কে ছাড়িয়ে তারা তাদের সরলতা দিয়ে পূর্ণ হচ্ছিল। হাসছিল সবাই, আর এলুয়ার্ড হেলান দিল সে মেয়েটির উপর যে তার বাহুলগ্না হয়েছিল।

“শান্তিতে আবিষ্ট মানুষটি সব সময়ই সদা হাস্যময় থাকেন”।

এবং মেয়েটি হেসে উঠে তার পা দিয়ে মাটিতে এমনভাবে সজোরে একটি চাপ দিল তাতেই সে রাস্তা থেকে কয়েক সেন্টিমিটার শুন্যে উঠে গেল,পরমুহূর্ত থেকে কেউই আর মাটিতে থাকল না, তারা সবাই দুই ধাপ করে জায়গা করে নিয়ে এক ধাপ করে মাটিতে থেকে এগুতে লাগল মাটি স্পর্শ না করেই, হ্যাঁ উইনস্লায়াস স্কয়ারের উপরে ওরা সবাই উড়ছিল, তাদের নৃত্যরত বৃত্তটি বিশাল এক জয়মালার মতো লাগল, আর তা দেখার জন্য আমি নিচে মাটিতে থেকে তাদের পিছু পিছু দৌড়াতে লাগলাম, আর তারা বাম পা একপাশে আর ডান পা আরেক পাশে উঠিয়ে উড়তে উড়তে যেন আরো উপরে উঠে যেতে লাগল, তাদের নিচে পড়ে থাকল প্রাগ শহরের সেই ক্যাফে আর কয়েদখানাগুলি যা পরিপূর্ণ ছিল কবি আর জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করা বিশ্বাসঘাতকে, আর শুভ ইঙ্গিতের মতো শ্মশান থেকে নভোমণ্ডলের দিকে উড়ে যাচ্ছিল ধোঁয়ার কুণ্ডলী যেখানে ভস্মীভূত করা হয়েছিল একজন সমাজতান্ত্রিক উপসচিব আর পরাবাস্তববাদী লেখককে, এবং আমি শুললাম এলুয়ার্ডের সেই ধাতব কণ্ঠস্বর “ কার্যত ভালবাসা ক্লান্তিহীন”। আমি রাস্তা ধরে দৌড়াচ্ছিলাম সেই কণ্ঠস্বর লক্ষ্য করে যেন আমি হারিয়ে না ফেলি মৃতশরীর দিয়ে তৈরি সেই জমকালো গৌরবমন্ডিত জয়মাল্যকে যা শহরের উপর দিয়ে উড়ে চলছিল ,আমি যন্ত্রনাদায়ক অনুভূতিটা হৃদয় দিয়ে অনুভব করেছিলাম, যে ওরা উড়ছিল ঠিক যেমন বিহঙ্গ উড়ে যায় আর আমি পতিত হচ্ছিলাম ঠিক যেন পতনশীল পাথর পড়ে যায়, যেন তাদের পাখা আছে যা আমার কখনোই ছিল না”। (কুন্দেরা, ১৯৯৬ঃ৯৪-৯৫, ভাষান্তর--বিপাশা চক্রবর্তী)

এর পশ্চাদপটে আছে কুন্দেরার অভিজ্ঞতা। ১৯৪৮ সালে কমিউনিস্ট ক্যু ঘটলে চেক তরুণ কুন্দেরা একে স্বাগত জানিয়েছিলেন। তিনি মনে করেছিলেন, এর ভেতর দিয়ে মানুষের মুক্তি আসবে, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হবে। কিন্তু অচিরেই তাঁর মোহভঙ্গ হয়। তাঁকে পার্টি থেকেও বহিষ্কার করা হয়। এই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দ্যা জোক’ (১৯৬৭) লেখেন। তাঁর উপন্যাস ‘দ্যা বুক অব লাফটার অ্যান্ড ফরগেটিং’(১৯৭৮)-এর পটভূমিতে আছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী চেকোশ্লভাকিয়া। সময়ের যে বক্রাঘাত ((Irony)গুলি ওই দেশের জনগণের জীবনে এবং তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে যে-ট্রাজেডি নেমে এসেছিল, এই উপন্যাসে কুন্দেরা সেসব হাজির করেছেন। ঢিলেঢালা ভঙ্গিতে, খণ্ড খণ্ড ভাবে এর আখ্যান হয়ে ওঠে তথ্যচিত্র বা ডকুমেন্টারি, আত্মজীবনী এবং ফ্যান্টাসির মিশ্রণ।

উদ্ধৃত অংশটির মনে করায় ১৯৫০ সালে স্যোশালিস্ট রাজনীতিবিদ এবং পরাবাস্তববাদী লেখক জাভিস কালান্দ্রাকে ‘রাষ্ট্রের শত্রু’ হিসেবে আখ্যায়িত করে ফাঁসি দেওয়ার ঘটনা। তিনি ছিলেন পশ্চিমা বিশ্বের সেই সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় কমিউনিস্ট কবি পল এলুয়ারের বন্ধু। পল এলুয়ার চাইলে হয়তো এই ফাঁসির হাত থেকে তাঁকে বাঁচানোর উদ্যোগ নিতে পারতেন, কিন্তু তিনি এ বিষয়ে নাক গলাতে চাননি। অন্যদিকে, ওই ফাঁসির পরের দিনই প্রাগের রাস্তায় পার্টির অনুমোদনে তরুণদের বিশাল নাচের অনুষ্ঠান হয়। সেখানে সারা বিশ্বের সমাজতান্ত্রিক ও কমিউনিস্ট দেশ থেকে আসা লোকজন বিশাল বৃত্ত তৈরি করে বৃত্তাকারে নাচতে থাকে। পল এলুয়ার সেখানে প্রচ- উদ্দীপনায় জীবনের আনন্দ ও ভ্রাতৃত্ব নিয়ে কবিতা আবৃত্তি করেন। এক সময় সেইসব নৃত্যরত মানুষের বৃত্তটি মাটি থেকে হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে আকাশে উড়ে যায়, আর এর বর্ণনাকারী কথক রয়ে যান ডানাহীন। তারা যত দূরে উড়ে যেতে থাকে, তিনি ততটাই পাথরের মতো নিচের দিকে পড়তে থাকেন। -- এ ঘটনাটি থেকে আমরা বুঝতে পারি সম্পূর্ণ অবাস্তব হলেও এর ভেতর দিয়ে প্রকাশ করা হল যে, চেকরা সেসময় তাদের কঠিন বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, রাজনৈতিক ব্যবস্থার সন্ত্রাস ও ন্যায়নীতিহীনতার ভেতরে কমিউনিজমের স্রোতে গা ভাসিয়ে তাদের বিশুদ্ধতা ও নিষ্পাপতা নিয়ে শূন্যতার ভেতরে বসবাস করছে। তারা জানে না এই সময়টা তাদের কিছুই দেবে না এক মহা-‘শূন্য’ ছাড়া। অন্যদিকে এক গভীর হতাশা ও ক্ষোভের উপস্থাপনা এতে দেখতে পাই, সেইসঙ্গে পাই সুগভীর এক বেদনামিশ্রিত কৌতুকবোধ।

ডেভিড লজ এটিকে জাদুবাস্ততাবাদের দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এছাড়া মার্কেসের ‘ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিচ্যুড’, সালমান রুশদির ‘দ্যা স্যাটানিক ভার্সেস’, অ্যাঞ্জেলা কার্টারের ‘নাইট অ্যাট দ্যা সার্কাস’, জেনেটি উইন্টারসনের ‘সেক্সিং দ্যা চেরি’ থেকে তিনি যে-বিষয়গুলি উপস্থাপন করেন, তার প্রত্যেকটিতেই হাওয়ায় ভেসে থাকা বা ভাসমান ব্যাপারটির উল্লেখ করা হয়েছে। এর থেকে আদতে সবচেয়ে বড় যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, সেটি হল জাদুবাস্ততাবাদকে ফ্যান্টাসির সঙ্গে মিলিয়ে ফেলা; এবং সেই সঙ্গে এমন সব ঘটনাকে জাদুবাস্তববাদের নমুনা হিসেবে দেখানো যা সচরাচর ঘটে না। কিন্তু জাদুবাস্ততাবাদের মূল বিষয়ই হলো: দৈনন্দিন বাস্তবতার ভেতরে এমন ঘটনার উপস্থাপন করা যা প্রশ্নহীনভাবে সবাই মেনে নেবে এবং কেবল মেনেই নেবে না-- তাৎক্ষণিকভাবে এর অন্তর্নিহিত বিষয়টি বুঝতে পারবে। কীভাবে সেটি বুঝতে পারবে?

গাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের বিখ্যাত গল্প ‘সরলা এরেন্দিরা আর তার নিদয়া ঠাকুমার অবিশ্বাস্য করুণ কাহিনী’ থেকে ছোট্ট একটি পরিস্থিতির বর্ণনা তুলে দিলেই বোধ করি স্পষ্ট হবে, কোন ধরনের ঘটনা ঘটলে তাকে জাদুবাস্তবতা বলতে হয় এবং কীভাবে সেটি বর্ণনা করলে সেটি জাদুবাস্তবাদের পর্যায়ে উপনীত হয়।

ঘটনাটি ঘটার আগের পরিস্থিতি হল: উলিসেস বাবার কমলালেবুর বাগান থেকে কমলা চুরি করার জন্য সারাটা বিকাল নষ্ট করেছে, কিন্তু সফল হয়নি। যখন বাড়ি ফিরে আসে তখন তার মা তাকে সামনের টেবিল থেকে বিকাল চারটার ওষুধগুলি দিতে বলেন। মা একটা রকিং চেয়ারে গা এলিয়ে বসেছিলেন। উলিসেস ওষুধ ও জলের গ্লাসটা স্পর্শ করতেই সেগুলির রঙ পালটে যায়। এবার মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুবাদে দেখা যাক বাকিটা--



‘‘তারপর, শুধু খেলার ছলেই, সে টেবিলের ওপর কতগুলো কাচের বাটির পাশেই যে কাচের কুঁজোটা ছিলো সেটা ছুঁলো আর অমনি তারও রং নীল হ’য়ে গেলো। মা ওষুধ খেতে-খেতে ছেলেকে ভালো ক’রে নিরীক্ষণ করলেন, তারপর যখন বুঝলেন যে এ তাঁর কোনো বিকারের ঘোর নয়, তখন তাকে তিনি গুয়াহিরা ই-িয়ান ভাষায় জিগেশ করলেন:

‘কতদিন ধ’রে তোর এ-রকম হচ্ছে?’

‘সেই যখন আমরা মরুভূমি থেকে ফিরে এলাম তখন থেকেই,’ উলিসেস বললে, তেমনি গুয়াহিরা ভাষায়। ‘এ শুধু কাচের জিনিশ ছুঁলেই।’

দৃষ্টান্ত দিয়ে বোঝাবার জন্য সে টেবিলের ওপর যত বাটি-গেলাশ ছিলো সব এক-এক ক’রে ছুঁলো আর তারা সব নানান রঙে ঝলমল ক’রে উঠলো।

‘ও-রকম হয় শুধু প্রেমে পড়লেই,’ তখন মা বললেন। ‘কে সে?’ ” (মানবেন্দ্র; ১৩৯৭: ৩১)



--এই যে ঘটনাটি এখানে দেওয়া হল, এতে আমরা দেখছি, উলিসেসের স্পর্শমাত্র কাচের জিনিসগুলি রঙিন হয়ে উঠছে, তা দেখে মা তাকে প্রশ্ন করলেন, সে প্রেমে পড়েছে কিনা।-- এই যে একটি আশ্চর্য ঘটনা, জাদুর ঘটনা, তা থেকে মা বুঝতে পারছেন, ছেলের মনে রঙ লেগেছে, প্রেমের রঙ, আর তাতে যা কিছু সাদা-স্বচ্ছ সব রঙিন হয়ে যাচ্ছে। প্রেম যে এভাবে জীবনকে রাঙিয়ে দেয়,-- সেটি জাদুময় এই ঘটনার ভেতর দিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে, এটাই হল জাদুবাস্ততার মুহূর্ত এবং এই পদ্ধতি হল জাদুবাস্তববাদ। এছাড়াও অশুভ কোনো ঘটনা, কোনো হত্যা বা মৃত্যু যে মীমাংসাহীন হলে তা এক স্থান থেকে আরেক স্থানে ছড়িয়ে পড়ে সেটি জাদুবাস্তবতাবাদে যেভাবে দেখা দেয়, মার্কেসের ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ থেকে এর একটি দৃষ্টান্ত --



‘‘ রেবেকা পরে জানায় তার স্বামী যখন শোবার ঘরে ঢোকে সে তখন ছিটকিনি বন্ধ অবস্থায় গোসলখানার ভেতরে, কিছুই তার কানে আসেনি। কথাটা বিশ্বাস করা কঠিন, কিন্তু এর চেয়ে বিশ্বাসযোগ্য আর কোনো বর্ণনা পাওয়া যায়নি, আর তাছাড়া যে লোকটা তাকে সুখেই রেখেছিল তাকে রেবেকা কেন খুন করতে যাবে সেটাও কেউ খুঁজে পায়নি। এটাই সম্ভবত মাকোন্দোর একমাত্র রহস্য কোনোদিন যার জট খোলেনি। তো, হোসে আর্কাদিও শোবার ঘরের দরজাটা বন্ধ ক’রে দেবার পরই সারা বাড়ি প্রতিধ্বনিত হয়ে ওঠে পিস্তলের একটা গুলির শব্দে। দরজার নিচ দিয়ে বেরিয়ে আসে রক্তের একটা ধারা, পার হয়ে যায় বসার ঘরে, বেরিয়ে যায় রাস্তায়, উঁচুনিচু চত্বরগুলোর ওপর দিয়ে আড়াআড়ি চলতে থাকে একটা সরলরেখা তৈরি ক’রে, নেমে যায় সিঁড়ির ধাপগুলো বেয়ে, উঠে পড়ে বেড়ার ওপর, তুর্কীদের রাস্তা ধরে এগিয়ে চলে, এক কোনায় এসে ঘুরে যায় ডান দিকে, তারপর বাঁয়ে, বুয়েন্দিয়াদের বাড়ির কাছে এসে একটা সমকোণ তৈরি ক’রে ভেতরে ঢুকে পড়ে বন্ধ দরজার নিচ দিয়ে, মাদুরে যাতে দাগ না লাগে সেজন্য দেয়াল ঘেঁষে ঘেঁষে বৈঠকখানা পেরিয়ে যায়, পড়ে গিয়ে আরেক বৈঠকখানায়, খাবারঘরের টেবিল এড়ানোর জন্য বাঁক নেয় একটা বেমাক্কা রকমের, বেগনিয় ভরা ঝুলবারান্দা ধরে এগিয়ে চলে গড়িয়ে, আরেলিয়ানো হোসেকে পাটিগণিত শেখানোয় ব্যস্ত আমারান্তার অলক্ষ্যে চলে যায় চেয়ারের নিচ দিয়ে, ভাঁড়ার ঘর পেরিয়ে, তারপর বেরিয়ে আসে রান্নাঘরে, যেখানে রুটি তৈরি করার জন্য ছত্রিশটা ডিম ভাঙার জন্য তৈরি হচ্ছিল উরসুলা।’’(জি এইচ, ২০০০: ১২৬)





বর্ণনাটি অনুসরণ করলে মনে হবে এটি একটি চলচ্চিত্রের দৃশ্য। একটি অশুভ মুহূর্ত তৈরি হল এই রক্তের ধারা গড়িয়ে যাওয়ার ভেতরে দিয়ে, যা আমাদের নিয়ে যাবে একের পর এক মৃত্যু আর হত্যার দিকে। জাদুবাস্তববাদকে বুঝতে হবে এই রকম জাদুময় মুহূর্ত দিয়ে। কারণ পুরো কাহিনি জুড়েই অবিরাম জাদুময় ঘটনা ঘটে না, প্রতিটি বাক্যে ঘটে না। সেটি ঘটে দৈনন্দিন বাস্তবতার ভেতরে-- এটাই জাদুবাস্তববাদের মূল দিক। এজন্য একেবারে সাদামাটা জীবনের ভেতরে ঘটে যাওয়া, এই সব চট করে দেখা দেওয়া ঘটনাগুলিই দেখাতে পারে সাহিত্যে জাদুবাস্তববাদ কীভাবে হাজির করা হয়। তবে এর অন্যসব মাত্রাও আছে। আরো একটি কথা যে, লাতিন আমেরিকার সাহিত্যমাত্রই জাদুবাস্তববাদী সাহিত্য নয় এবং সেখানকার সব লেখকই জাদুবাস্তববাদী নন। সেখানে অন্যান্য ধারায়ও শিল্পসাহিত্যের নানান কাজ হয়েছে এবং হচ্ছে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন