সোমবার, ২৫ এপ্রিল, ২০১৬

দেবেশ রায়ের গল্প নিয়ে আলাপ | মানচিত্রের বাইরে

অমর মিত্র
দেবেশ রায়ের একটি গল্পের বই বেরিয়েছিল সারস্বত লাইব্রেরি থেকে। সেই আটষট্টি-উনসত্তরের কথা। এলা রাঙের উপর লাল একটি অঙ্কন, এখনো স্পষ্ট মনে আছে। তখন অন্যরকম যাঁরা লিখতে চান, দেবেশ রায় ছিলেন তাঁদের অতি আগ্রহের লেখক। তিনি থাকতেন জলপাইগুড়ি। কখনো কলকাতায় এলে তরুণ অতি তরুণ লেখকদের কাছে তা ছিল খবর। দেবেশ রায়ের সেই সেই বইটির নাম, দেবেশ রায়ের গল্প। সেখানে ছিল দুপুর, নিরস্ত্রীকরণ কেন, কলকাতা ও গোপাল, আহ্নিকগতি ও মাঝখানের দরজা এই সব আলাদা গল্প। মনে পড়ে ওই গল্পের কথা যা প্রচলিত গল্পের বাইরে থেকে দেখা। দুপুর গল্প তো এখন মিথ হয়ে গেছে। তারও পরে আপাতত শান্তি কল্যান হয়ে আছে, যৌবনবেলা, মানচিত্রে নেই কত গল্প।


দেবেশ রায়কে প্রথম দেখি ১৯৭৫-এর প্রথমে। সেই সময়ে পড়ি তাঁর বড় উপন্যাস, মানুষ খুন করে কেন। সে ছিল উপন্যাস পাঠের নতুন অভিজ্ঞতা। আর সেই উপন্যাসের মূল চরিত্র ছিল একটি অসৎ ব্যক্তি। উত্তরবঙ্গ, চা বাগান, মানুষের লোভ, পাপ নিয়ে ছিল সেই মহা উপন্যাস। তারপর থেকে তাঁকে পড়ছি। মিশেছি অনেক। মূল্যবান পরামর্শ পেয়েছি। তিনি শিক্ষকের মতো। তাঁর গদ্য প্রথমে থমকে দেয়। প্রবেশ করলে তা অতি উচ্চাঙ্গের সঙ্গীত। কবিতা। তার চিহ্ন তিস্তাপারের বৃত্তান্ত থেকে অতি সম্প্রতি লেখা আলিফ লায়লার পুরাণ কথা নিয়ে উপন্যাসেও রয়েছে। ছিল দুপুরেও। গ্রীষ্মের সেই দুপুরে বাতাসে ভেসে আসা বেহালার সুর এখনো কানে আসে। 
মনে পড়ে ‘নিরস্ত্রীকরণ কেন’ গল্পে মধ্য রাতে চলন্ত ট্রেনের বন্ধ দরজার বাইরে অবিরাম করাঘাত। কেউ ঊঠতে চায় ভিতরে। স্টেশনেও দরজা খোলে নি। এই সব গল্প আমাদের প্রচলিত গল্পের থেকে আলাদা। মেধাবী মননের লেখক দেবেশ রায়। আমি এখানে তাঁর একটি অচেনা গল্প ‘মানচিত্রের বাইরে’ নিয়ে কথা বলছি। 
দেবেশ রায় কাহিনি লেখেন না, গল্প লেখেন। চারদিকে কাহিনি কথকের কথাই শুনতে পাই আমরা। এই গল্প কোনো এক খবরের কাগজের কলম লিখিয়ে পরমহংস ও ফ্রিল্যান্স ফোটোগ্রাফার বিনয়ের। আবার এই গল্পে জড়িয়ে আছে পরমহংসের সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটে যাওয়া তার স্ত্রী অনু আর কন্যা বাবিও। 
কোনো এক দোসরা শ্রাবণের জন্য অপেক্ষা করছিল পরমহংস। সেদিন সে অনুর কাছে যাবে। অনুর জন্মদিনের উইশ করতে। এই গল্প সেই দোসরা শ্রাবণের। সেই দিনের বিকেলটিকে পরমহংস খোলা রাখতে চায়। তার কাগজের নিউজ এডিটর পরদিন থেকে একটি লেখা ছাপতে যাচ্ছেন, ক্যালকাটাজ ইজি ডেথ, ‘কলকাতার সহজ মৃত্যু’ এই শিরোনামে। লেখা দেওয়া হয়ে গেছে পরমহংসের। বিনয় দেবে ছবি। বিনয় যদি বিকেলের মধ্যে না আসে, আর ছবি যদি সন্ধের ভিতরে ঠিক না করে নিতে পারে পরমহংসের যাওয়া হবে না গলফ লিংক। 
বিচ্ছেদের পর অনুর সঙ্গে বা মেয়ে বাবির সঙ্গে তার দেখা হয় নি। বাবি একটি চিঠি তাকে দিয়েছিল, কিন্তু সেই চিঠির ভিতরে বাবির সম্বোধনে ছিল আড়ষ্টতা। পরমহংস টের পাচ্ছে এক নিষ্পত্তিহীন যৌন তাকে প্রবল টানছে। তার কোনো তৃপ্তি অন্যত্র নেই। এমন কী অনুতেও নেই। কিন্তু যৌন টান রয়েছে প্রবল। সকাল দশটায় জানালা দিয়ে দেখা পাশের বাড়ির দেওয়াল, জানলায় নিমের ছায়ার দোলায় সেই যৌন মিশে যায়। মানিকতলা মোড়ে হঠাৎ বৃষ্টি ঝেঁপে আসার ভিতরে, রাস্তার আকস্মিক জনহীনতার ভিতরে......পরমহংসের দিন যাপনের ভিতরে, দোতলা বাসের উপর থেকে দেখা শহর, এয়ারপোর্টের ভি।আই।পি। লাউঞ্জে, দুরগাপুর ব্রিজের মাঝখান থেকে দেখা পশ্চিমমুখো রেললাইনগুলোর ধাবমান প্রান্তরে বয়ে যায় অনুর শরীরের শাণিত ইস্পাত। 
দেবেশ রায় লিখছেন, “ এই শহর কলকাতার অনুপ্রাসহীন সীমান্তহীন কলকাতার নাগরিক বিস্তার জুড়ে অনুর শরীর নিয়ত অন্বিত হয়ে থাকে পরমহংসের কাছে যৌনের আসঙ্গে।“ ওই যৌনই তাকে টানছে অনুর কাছে। টানছে অনেক দিন, কিন্তু সে এড়িয়ে থাকতে পেরেছে দোসরা শ্রাবণকে সামনে রেখে। যে স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ হয়ে গেছে, সেই স্ত্রীর প্রতি এই টান বোধ করার কোনো আইনি অধিকার, সামাজিক অধিকার তার নেই। গল্পের চালচিত্রে এই। আর গল্প হয় বিনয়ের ছবি আর তার নিবার্চন নিয়ে। 
পরমহংসের দ্বিধা আছে গলফ লিংক যাওয়ায়। তাই সে অনুর জন্মদিন এই দোসরা শ্রাবণ পযর্ন্ত তা পিছিয়ে রেখেছিল। আজ বিনয় কখন ছবি দেবে, তার উপর নির্ভর করছে তার যাওয়া। বিনয় কত ছবি নিয়ে বসে আছে তার নিজের ঘরে। পরমহংস যায় দুপুরে সেখানে। ফিরেও আসে। হাওড়া ব্রিজের একটা গর্ত থেকে আচমকা গলে গিয়ে মৃত্যু হয়েছে এক পথচারীর। তা নিয়ে খুব হৈ চৈ হয়েছিল। তারপর এই শহরে যে যে সহজ মৃত্যুর বিষয় আছে, উপায় আছে সেই কাহিনি বেরোবে পরমহংসের পত্রিকায়। বিনয়ের সঙ্গে পরমহংস ছবির কথা বলতে থাকে। ঘেস চুরি করতে গিয়ে ঘেসের গুহার ভিতরে শিশুর মৃত্যু,

রাস্তায় ঘুমন্ত পথচারীর উপর মাতাল লরি, গঙ্গার তীরে শত বছরের পুরোন বাড়ির ছাদ ভেঙে মৃত্যু সেখানে আশ্রয় নেওয়া মানুষের। সেই ছবি নেওয়া হয়েছিল গঙ্গার ভিতর থেকে। মৃত্যুর খবরও সাজিয়ে পরিবেশন করতে হয়। তারা মৃত্যু নিয়েই কথা বলে যায়। গল্পের ভিতরে চলে আসে ঘেসের গুহার ভিতরে ঢুকে শিশু মৃত্যু। খোলা হাইড্রান্টে পড়ে শিশু মৃত্যু কমন, কিন্তু ক্রমাগত গর্ত খুঁড়ে ঘেসের ভিতরে ঢুকে গিয়ে পনের বিশটি বাচ্চার মৃত্যু স্টোরি হিসেবে অভিনব নিশ্চয়। আসলে এই গল্প মৃত্যুর গল্প। সহজ মৃত্যু সব সময় রহস্যময়। ঘেস দিয়েই এই মৃত্যুর কাহিনি খবরের কাগজে শুরু হবে। কলকাতার সব হাউজিং প্রজেক্টই ঘেস দিয়ে ভরাট করা জমিতে মাথা তোলা। ঘেস আসলে কবরখানা। 

“ক্যালকাটা ইজ গোয়িং হাই অন গ্রেভস—“ আসলে মৃত্যুর কথাই বলতে বসেছেন দেবেশ রায়। সহজ মৃত্যু। এই যে সময় যায়, বিকেল গড়িয়ে সন্ধে হয়ে যায়, গলফ লিংক যাওয়ার সময় পেরিয়ে যায়। পেরিয়ে যাওয়া মানে আবার কোনো এক চৈত্র বা ফাল্গুনের জন্য অপেক্ষা করা। পরমহংসের কাছে বিনয় শুনতে চায় মৃত্যুর এক ধারাবিবরণ। পরমহংস তা শোনাতে আপত্তি করে নি। শোনাতে শোনাতে সে বোঝে অনু দূরে সরে যাচ্ছে। বিনয় তার কোলে ফেলে দিয়েছে অনেক মরা মানুষের ছবি। পরমহংস ঘাড় নামিয়ে দ্যাখে, থালাভরা জলে যেম গ্রহণের সূর্য দ্যাখে---মৃতদেহ ভাসা স্রোতে আরো যুগ-যুগান্তরের পারে চলে চলে যাচ্ছে দোসরা শ্রাবণ। আসলে একটি সম্পর্কের সহজ মৃত্যুর গল্প বললেন দেবেশ।

1 টি মন্তব্য:

  1. চমৎকার। আরো লিখুন। দেবেশ রায় আমারও অন্যতম প্রিয় লেখক। সম্প্রতি ওনার নন ফিকশন বই 'উপন্যাস নিয়ে' আমার সাহিত্য পাঠের দৃষ্টিভঙ্গী বদলে দিয়েছে। ওনার গলপসংগ্রহ দেজ থেকে সংগ্রহ করতে হবে....ধন্যবাদ

    উত্তরমুছুন