সোমবার, ২৫ এপ্রিল, ২০১৬

সৈয়দ শামসুল হক | সংলাপ সতর্কতা

নাটক তো সংলাপ ছাড়া নয়; গল্প উপন্যাসও কি তাই ? আমার মনে হয়, আমরা ধরেই নিয়েছি মানুষ যেমন সমাজে বাস করলে গায়ে পিরান দেবে, কিছু না জুটুক এক টুকরো ছেড়া ন্যাকড়া তাকে পরতেই হবে, তেমনি গল্প লিখতে বসে চরিত্রের মুখে কিছু না হোক দু’টো সংলাপ দিতেই হবে লেখককে, এ নিয়ে যেন প্রশ্নের কোনো অবকাশ নেই।


আর আমার সন্দেহ, চারদিকের অধিকাংশ গল্প-উপন্যাস পড়ে আমার সন্দেহ হয়, লেখকেরাও সংলাপ নিয়ে, সংলাপ থাকবে কি থাকবে না, থাকলে কতটুকু থাকবে, গল্পের ঠিক কোন অংশটুকু সংলাপে দেয়া দরকার এ নিয়ে সচেতনভাবে তেমন একটা ভাবেন না। সংলাপ যেন কলমের টানেই চলে আসবে; যেন লেখকের দায় গল্প ভাবা, কলমের দায় সংলাপ লেখা। বাংলা ভাষায় লেখা, কি বাংলাদেশে কি পশ্চিমবঙ্গে, অধিকাংশ গল্প উপন্যাসেই দেখি লেখকের সংলাপ ব্যবহার করা মুহুর্তের অপরীক্ষিত প্রেরণায়– হয়তো বর্ণনার একঘেয়েমি দূর করবার জন্যে, অথবা, এমন কঠিন সন্দেহ করাও অমূলক হবে না যে, লেখক সংলাপ দিচ্ছেন লেখাটির দৈর্ঘ্য নিছক বাড়াবার জন্যে।

অথচ, আমরা এই বাংলা ভাষারই শ্রেষ্ঠ একজন গল্প লেখক রবীন্দ্রনাথের উদাহরণ লক্ষ না করে পারি না। তিনি তার একরার গল্পটিতে একটিও সংলাপ লেখেন নি; আবার ছুটি গল্পের কেবল শুরু ও শেষভাগে সংলাপ লিখেছেন; অতিথি গল্পে যেন পরিষ্কার রাতে নক্ষত্রপুঞ্জের মতো সংলাপ ছিটিয়ে দিয়েছেন কাহিনীর চৌদ্দ আনা জুড়ে, তারপর হঠাৎ যেমন একখণ্ড কালো মেঘ দিগন্তের এক কোণ ছেয়ে ফেলে তেমনি তিনিও এ গল্পের সমাপ্তি টেনেছেন বর্ণনা দিয়ে এবং সে বর্ণনার বাক্যগুলো দীর্ঘ, অতিদীর্ঘ, জটিল এবং তামস করতালিপূর্ণ। আমরা আরো না লক্ষ করে পারি না, রবীন্দ্রনাথ তার শেষ জীবনের গল্পগুলোতে কমিয়ে আনছেন বর্ণনা, সংলাপের ভাগ বাড়িয়ে দিচ্ছেন, এবং তার পক্ষে শুধু সংলাপ অবলম্বন করেই শেষের রাত্রি লেখা সম্ভব হচ্ছে; কেবল তাই নয়, তিনি গল্পগুচ্ছেই কর্মফল-এর মতো রচনা গ্রন্থিত করতে ইতস্তত করেন নি, যে-গল্প ষোলো আনাই সংলাপ নির্ভর, নাটকের মতো অভিনয়ও এর সম্ভব, কিন্তু এ নাটক নয়, গল্পই--কিংবা এখনকার তরুণেরা একে মিনি-চিত্রনাট্য বলতেও লুব্ধ হবেন; রবীন্দ্রনাথ কর্মফল-কে ছোট গল্পই বলেছেন, অন্তত তাঁর গদ্য নাটকের তালিকায় এই লেখাটিকে তিনি জায়গা দেন নি।

আর কাউকে না হোক রবীন্দ্রনাথকে সমুখে রাখলেই আমরা বুঝতে পারবো সংলাপ একটি গল্পকে এগিয়ে নিয়ে যেতে, আমাদের কল্পনার ভেতরে গল্পটিকে প্রবিষ্ট করাতে কীভাবে সাহায্য করে। অথবা, হাতের কাছে মানিক বন্দোপাধ্যায়ের পদ্মানদীর মাঝি থাকলে, শুধু এই একটি বইই আরো একবার সতর্কভাবে পড়লে, আমরা অনুভব করতে পারবো তিনি, মানিক, কতখানি প্রতিভা ও পরিমিতিবোধের পরিচয় দিয়েছেন সংলাপ ব্যবহার করতে গিয়ে।

বহুদিন থেকেই আমার মনে হয়েছে, আমাদের লেখকেরা সংলাপের বিষয়ে সবচেয়ে উদাসীন, তারা যেন ধরেই নেন, গল্পে বা উপন্যাসে যখন যেখানে দরকার কলমই এনে দেবে সংলাপ--এ নিয়ে আগে থেকে ভেবে রাখবার দরকার নেই। সে কারণেই বোধহয় দেখি, যেখানে সংলাপ দরকার নেই, যেখানে সংলাপ নতুন কোনো তথ্য আমাদের দিচ্ছে না, নতুন কোণ থেকে আলো ফেলছেন না, সেখানে পাচ্ছি বন্যার মতো সংলাপ। আর ঠিক যে জায়গাটিতে প্রয়োজন ছিলো সংলাপের, লেখক সেখানে বর্ণনার কাঁধে দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত আছেন।

বাংলা ভাষায় গত বিশ-তিরিশ বছরে যত গল্প উপন্যাস লেখা হয়েছে, তার ভেতর থেকে আপনি চাইলে নির্মমভাবে ছেটে ফেলতে পারেন না পথে হঠাৎ দেখা হবার পর সংলাপ -- চা খাবার আমন্ত্রণ -- কুশল জিজ্ঞাসা এবং এক ঘটনা থেকে আরেক ঘটনায় যাবার আগে অন্তবর্তী কালটুকু হরণের জন্যে যাবতীয় কথাবার্তা -- তরুণ-তরুণী বা দম্পতির রাগ অথবা বিরাগের বিরামহীন উচ্চারণ ?

আমার ধারণা--সম্ভব, খুবই সম্ভব; এবং আমরা দেখবো এই জাতীয় লক্ষ্যহীন সংলাপ আমাদের লেখা কতখানি জুড়ে আছে। বস্তুতপক্ষে এমন লেখার সন্ধান পাওয়া কঠিনও হবে না, যেখানে অর্থহীন, কারণহীন, পৃষ্ঠাসংখ্যা বৃদ্ধির সংলাপই লেখা হয়েছে ক্লান্তিহীন কলমে।

মনে পড়ছে, আমাদের অগ্রজ লেখক-সম্পাদক প্রয়াত ফজলে লোহানীর কথা।  আমরা তাকে প্রতিভাবান টিভি উপস্থাপক হিসেবে মনে রাখলেও পঞ্চাশের দশকে তিনি অগত্যার মতো একটি ব্যঙ্গনিপুণ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে পাকিস্তান, মুসলিম লীগ আর পাকিস্তানের দালালদের যে ন্যাংটো করে ছেড়েছিলেন, বাংলা ও বাঙালির স্বার্থে যে বিরতিহীন উচ্চকণ্ঠ ছিলেন, সে-কথা আমরা ভুলে গেছি। তিনি গল্প কবিতাও লিখতেন- -স্বনামে ও ছদ্মনামে; তার অনেকগুলো ছদ্মনামের ভেতরে দুটি এখন মনে পড়ছে-- অগত্যা-র পাতায় অনেক গল্প-উপন্যাসের লেখক হিসেবে পাওয়া যাবে--আবদুল্লাহ জয়নুল আবেদিন আর মনসুর মুসা। সেই তিনি তার এক গল্পে এক তরুণ এবং তার প্রেমিককে নিরালায় বসিয়ে এইরকম এক সংলাপ-শ্রেণী রচনা করেছিলেন- -মেয়েটি, মিলি, কথা বলতে চাইছে না-- ছেলেটি তাকে দিয়ে কথা বলাবেই--স্মৃ তি থেকে থেকে উদ্ধৃত করছি— -

-মিলিয়া-মিলিয়া ।

মিলি চুপ।

মিলি-মিলি,

মিলি এখনো চুপ।

–মিলি ।

মিলির সাড়া নেই।

-মি-মি-মি।

সাড়া নেই।

-মি ই ই ই ই।

এরপর লোহানি যে সংলাপটি মিলির মুখে বলিয়েছিলেন সেটি কম্পোজ করাবার জন্যে তাকে ছাপাখানায় কম্পোজিটরের পাশে বসতে হয়েছিলো। ছেলেটির একনাগাড়ে ডাক শুনে শুনে মিলি ছোট করে জবাব দিয়েছিলো- -ওপরে চন্দ্রবিন্দু, নিচেহ্রস্ব উ-অর্থাৎ প্রায় শোনা যায় না এমন একটি অনুনাসিক উচ্চারণ।

লোহানী আমাকে বলেছিলেন, ''উপন্যাস লম্বা করবার জন্যেই ওরকম সংলাপশ্রেণী আমি রচনা লিখেছিলাম, আর কোনো মহৎ উদ্দেশ্য ছিলো না।" এ থেকেই বোঝা যাবে, লেখার দৈর্ঘ বাড়বার জন্যে একজন লেখক কতদূর পর্যন্ত যেতে পারেন।

আসলে, গল্প আমরা লিখি বাহ্যিক দুটি উপাদান হাতে নিয়ে :  বর্ণনা--বাইরের এবং করোটির ভেতরের, এবং--সংলাপ। এই উপাদানগুলো ঠিক মাত্রায় মেশাতে না পারলে গল্প কখনোই সম্ভবে না, পৌঁছুবেও না। এই উপাদান দুটির পরিমাণ ও মাত্রা ঠিক করবার একটিই উপায়--গল্পের ব্যক্তিত্বটি বুঝে নেয়া। হ্যাঁ, মানুষের মতো প্রতিটি গল্পেরও ব্যক্তিত্ব আছে; রবীন্দ্রনাথের প্রায় সংলাপবিহীন ক্ষুধিত পাষাণ-এর পাশে পুরোপুরি সংলাপনির্ভর ‘শেষের রাত্রি ‘ গল্পটি মিলিয়ে দেখলেই আমাদের বুঝে নিতে দেরি হবে না যে, একেকটি গল্পের ব্যক্তিত্ব কীভাবে একজন লেখককে বলে দেয় “বর্ণনা ও সংলাপ" এই দুয়ের পরিমাণটি ঠিক কেমন হবে। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন