সোমবার, ২৫ এপ্রিল, ২০১৬

রম্য গল্পের রাজা | শিব্রাম চক্কোত্তিমশাই

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

শিবরাম চক্রবর্তী, তিনি বলতেন বা লিখতেন শিব্রাম চক্কোত্তি। নিজের নাম নিয়েই খেলা করতেন।

যখন আমি স্কুলে পড়ি তখন শিবরাম চক্রবর্তীর লেখা পড়ার জন্য আমরা সকলেই খুব উতলা হতুম।

পরশুরাম বালকদের তেমন বোধগম্য হতেন না। কারণ তাঁর ব্যঙ্গাত্মক লেখা, স্যাটায়ার ছিল বড়দের জন্য। আর ত্রৈলোক্যবাবুর কোনও কোনও লেখা ছোটদের হাত ধরতে চাইলেও তেমন জোরে ধরতে পারতেন না।


শিবরাম চক্রবর্তীর লেখা যেমন ছোটদের জন্য, সেই রকম বড়দের জন্যও। এমনটা অনেকের ভাগ্যে ঘটে না।

তিনি তো কবিতা দিয়ে শুরু করেছিলেন। গম্ভীর বিষয়ে প্রবন্ধও লিখেছেন। কিন্তু ব্যক্তি শিবরামের অবস্থান ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন মেরুতে। একেবারে অন্য রকমের মানুষ, অন্য রকমের লেখা। কারও সঙ্গে মিলবে না। যদি কেউ প্রশ্ন করেন, তাঁর লেখার আকর্ষণটা কোথায়? তাহলে একটিই উত্তর বলতে পারব না। ভাল রাঁধুনি যেমন বলতে পারবেন না, ঠিক কীসের সঙ্গে কীসের সংযোগে এমন সুস্বাদু একটি পদ তৈরি হল।

তাঁর লেখার মধ্যে একজন মানুষকে দেখতে পাওয়া যেত। না সাধু, না গৃহী সম্পূর্ণ মুক্তমনের একজন। পরবর্তী কালে যখন তাঁর ঘনিষ্ঠ হয়ে পত্রিকায় লেখার সূত্রে একটা অন্য রকম সম্পর্ক হল, তখন দেখলুম মানুষটি যেন রাজাধিরাজ। একেবারে বন্ধনমুক্ত। নিজের জীবন নিয়েই কত রসিকতা।

গদ্যে তাঁর অভাবনীয় দখল ছিল। যার ফলে বাক্যকে এমন মোচড় দিতেন যা বিস্ময়কর। তাঁর প্রতিভার এটা একটা মস্ত দিক। সাফল্যের নব্বই ভাগ এরই উপর দাঁড়িয়ে আছে। ইংরেজিতে যাকে বলে ‘পানিং’। তিনি বলতেন, মুক্তারামবাবুর মুক্ত আরামে আছি। জমিদারের ছেলে। পরিবার-পরিজনের কী হল তা কখনও বলতেন না। একটি প্রাচীন মেসবাড়ির একটি ঘরেই তাঁর সাম্রাজ্যের বিস্তার।

ছেলেবেলার আকর্ষণ দিয়ে লেখার শুরু। হঠাত্‌ একদিন তাঁর সঙ্গে সারাটা দিন কাটাবার সুযোগ হল। নানা রকম খেতে ভালবাসতেন। বন্ধুত্ব করেছিলেন কিশোরদের সঙ্গে।

আমার এক বন্ধুর মা অসাধারণ ভাল রান্না করতে পারতেন। একদিন খবর এল আমার এই বন্ধুর বাড়িতে তিনি দুপুরবেলা আসবেন, আহারাদি করবেন, থাকবেন অনেক ক্ষণ।

জমিদারের ছেলে। সংস্কারে সেই বীজটি রয়েছে। সিল্কের পাঞ্জাবি, সাদা ধবধবে ধুতি। উজ্জ্বল মূর্তি, মাথার চুল বিচিত্র কায়দায় আঁচড়ানো। ফর্সা টকটকে কপালের উপর ঝুলে আছে এক গুচ্ছ চুল। তিনি এলেন। বৈঠকখানায় বসলেন আমাদের নিয়ে। বড়দের খুব একটা পাত্তা দিলেন না।

একটি তাকিয়ায় ঠেসান দিয়ে আধশোয়া হয়ে মজলিসি ঢঙে শুরু হল নানা গল্প। শ্রোতা আমরা কয়েক জন অল্পবয়সি। মাঝে মাঝে বলতে লাগলেন, তোমাদের খুশি করতে পারলে খাওয়াটা জমবে। গন্ধ নাকে আসছে, প্রাণ বড় উতলা। চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। ফর্সা মুখে বুদ্ধির আভা। একজন একশোভাগ ইন্টেলেকচুয়াল মানুষ।

সময় সময় কিছু কথা বুঝতে অসুবিধা হলেও বেশির ভাগই বেপরোয়া মজা। অশালীন নয়, ভাঁড়ামি মুক্ত। এই দেখার স্মৃতিটি রয়ে গেল। এর পর জীবনপথে ঘুরতে ঘুরতে দেশ পত্রিকার দফতরে তাঁকে পেলুম একেবারে অন্য ভাবে। এর আগে তিনি অনেক লিখেছেন। সে সব লেখা সোশ্যাল স্যাটায়ার। যার সঙ্গে অনেক তাবড় তাবড় ইংরেজ লেখকের তুলনা করা যায়। সেই সব লেখায় মজার কোনও গল্প থাকত না, থাকত আঘাত। কায়দাটি খুব সুন্দর। এক একটি কথাকে ধরে ধুনুরির কায়দায় তুলোধোনা করা। দেশ পত্রিকায় তখন তিনি লিখছেন, ‘ঈশ্বর পৃথিবী ভালবাসা’। কী সুন্দর নাম। এটিকে বলা যেতে পারে তাঁর আত্মজীবনী।

একটি কথা এখানে বলা উচিত, তিনি ছিলেন অতি অভিজ্ঞ, অতি সুদক্ষ এক সারথি। নিজের রথ কী ভাবে কোন কায়দায় চালাতে হবে তা তিনি জানতেন। এটা সম্ভব হয়েছিল তাঁর কোনও উচ্চ অ্যাম্বিশন ছিল না বলে। জীবনদর্শন ছিল এই রকম কয়েক দিনের জন্য এসেছি, আনন্দ করতে করতে চলে যাব। এই আনন্দটাও ছিল রিবাউন্স করা। তোমাদের আনন্দ আমার আনন্দ। তোমাদের সঙ্গে খানিক মজা করব। জীবন নিংড়ে এমন কোনও লেখা বের করতে চাই না যার মধ্যে কোনও ইজম আছে।

অথচ একসময়, জীবনের প্রথম দিকে তিনি রাজনীতি ঘেঁষা অবশ্যই ছিলেন। ঈশ্বর-পৃথিবীর ভালবাসা-র শুরুটাই করেছেন এইভাবে “প্রায় লেখককেই নিজের কবর খুঁড়তে হয় নিজের কলম দিয়ে। গায়কের মতো লেখকেরও ঠিক সময়ে থামতে জানা চাই। সমে এসে যথাসময়ে না থামলেই বিষম, সবটাই বিষময় হয়ে দাঁড়ায়। এমনকী কালজয়ী লেখকও যদি যথাকালে না থামেন তো জীবদ্দশাতে জীবন্মৃতের অন্তর্দশা তাঁর বিধিলিপি।

অবশ্য মহাকাল কারও কারও প্রতি একটু সদয়। সময় থাকতে থাকতেই তাঁদের নিরস্ত করেন, নিজের পুনরাবৃত্তির পথে আত্মহননের ভোগান্তি তাঁদের আর পোহাতে হয় না। যেমন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ, শরত্‌চন্দ্র। বিস্ময় থাকতে থাকতেই, রাখতে রাখতেই তাঁরা অস্ত গেছেন।”

এই দুটি প্যারা পড়লে বোঝা যায় গদ্যের ওপর তাঁর বাঁধুনিটা কত মজবুত ছিল। এই আত্মজীবনীতেই দেখতে পাওয়া যাবে সব লেখকই যে যে দুস্তর বাঁধা অতিক্রম করেন তাঁকেও তা করতে হয়েছে। যেমন, জীবনের প্রথম দিকে প্রবাসীতে একটি কবিতা পাঠিয়েছিলেন। এবার নিজেই লিখছেন, দিন কতক বাদে লেখাটা ফেরত এল। সঙ্গে চারুদার এক চিরকুট। এই হলেন শিবরাম। চারুদার চিরকুট। শব্দ যেন তাঁর সঙ্গে খেলা করত।

চিঠির বক্তব্য, কবিতাটি মন্দ হয়নি কিন্তু এটি প্রবাসীতে ছাপিয়ে তোমাকে উত্‌সাহ দিতে চাই না। সম্পাদক উপদেশ দিয়েছিলেন, এই বয়সে লেখাপড়া করে মানুষ হও আগে। তারপর না হয় লিখো। সঙ্গীত, কবিত্ব আর ল্যাজ কারও ভিতরে থাকলে তা আটকানো যায় না। তোমার মধ্যে যদি তা থাকেই তা প্রকাশ পাবেই। যথাকালে দেখা দেবে অযথা জোর করে অসময়ে তাকে টানাটানি করে বার করার কোনও দরকার নেই। শিবরাম লিখছেন, কথাগুলো আমার মর্মে মর্মে গাঁথা হয়েছিল অনেক দিন।

এই সময় একদিন দেশ পত্রিকার অফিসে একজন লেখক এসে জানালেন, সেন্ট্রাল এভিনিউ-এর ফুটপাথে শিবরামবাবু চিত হয়ে শুয়ে আছেন।

সম্পাদক শ্রদ্ধেয় সাগরদা আমাকে ডেকে বললেন, ওর তো আজ লেখা দিতে আসার কথা। ফুটপাথে শুয়ে আছে কেন! দেখে এসো তো।

আমি গিয়ে দেখি, ‘চাংওয়া’র সামনে তিনি আরামে শুয়ে আছেন। একটা হাত কপালে, আর একটা হাত সিল্কের পাঞ্জাবির পকেটে। একটু আড়ালে দাঁড়িয়ে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করছি। ডান হাতটা পাঞ্জাবির পকেটে। পকেট থেকে তেলেভাজা বের করে মাঝে মাঝে মুখে দিচ্ছেন।

এই বার আমি গিয়ে ঝুঁকে পড়ে জিজ্ঞেস করলুম, এইখানে এইভাবে শুয়ে আছেন কেন! আমাকে নিচু হতে ইশারা করলেন।

ফিসফিস করে বললেন, চলন্ত বাস থেকে নামতে গিয়ে কোঁচা জড়িয়ে পড়ে গেছি। একটা ধেড়ে মানুষের পড়ে যাওয়াটা লজ্জার, না শুয়ে থাকাটা লজ্জার! আমি বললুম, এর উত্তর দেবেন সাগরদা। আপনি এখন উঠুন। সিল্কের পাঞ্জাবির পিছনে ধুলো। মাথার পেছনে ধুলো। আমি ঝাড়ার চেষ্টা করতেই বললেন, তুমি কিছুই জান না। এক সময় কলকাতার বাবুরা ভোরবেলায় খানা থেকে উঠে প্রাসাদে প্রবেশ করত। পাঞ্জাবির পেছনে ধুলো এটা একটা অ্যারিস্টোক্রেসি।

একদিন মুক্তারামবাবুতে গেছি। একটা সভায় যাওয়ার কথা। আমাকে বললেন, আমার এই তক্তাপোশে পা তুলে বসো। কারণ এর তলায় কী কী জন্তু জানোয়ার আছে তা আমি জানি না। ঘাঁটাইনি কোনও দিন। সাপও থাকতে পারে। আমি আমার ড্রেসিং রুম থেকে আসছি। জিজ্ঞেস করলুম সেটা কোথায়? বললেন, ওই যে রাস্তার ওপারে যে লন্ড্রিটা রয়েছে ওইটা। আমি ওখানে গিয়ে আমার এই ধুতি আর পাঞ্জাবিটা ছেড়ে দেব। আর যেটা কেচে এসেছে সেটা পরে চলে আসব। দুটো সেট। কোনও ঝামেলা নেই। বাক্সপ্যাঁটরা নেই। বুঝলে, একেই বলে আপনি আর কোপনি। জীবনটাকে হালকা করো। রেল কোম্পানির বিজ্ঞাপন দেখেছ? ট্রাভেল লাইট।

হাসির লেখার একটা অ্যানাটমি আছে। প্রথম কথা, ‘হাসির লেখা’ এই চিহ্নিত কথাটা আমার ভাল লাগে না। শ্রদ্ধেয় বিমলদা আমাকে বলেছিলেন, শোন! লেখা হাসিরও নয়, কান্নারও নয়। লেখা হল লেখা। তবে মজার লেখা উপভোগ্য লেখার একটা গঠন আছে। চরিত্রকেন্দ্রিক।

শিবরামবাবুর লেখায় আমরা সেই সব চরিত্রদের পাই। যেমন হর্ষবর্ধন, গোবর্ধন, পিসিলা, জহর ইত্যাদি। এই চরিত্রদের তিনি খেলিয়েছেন। গল্প অনেক ক্ষেত্রেই সামান্য। রস তৈরি হয়েছে কথার পিঠে কথা আর সিচ্যুয়েশনের মাধ্যমে। কত নাম করব। গন্ধচুরির মামলা, খোলাখুলি ইত্যাদি ইত্যাদি। কোনও দিন তাঁকে দেখিনি নিজের লেখা, বই আর প্রাপ্যের হিসাব রাখতে। সংস্কারটা যে ছিল জমিদারের আর ত্যাগীর। সেই জন্যই বইটির নাম প্রথমে ঈশ্বর, তারপর পৃথিবী এবং সব শেষে ভালবাসা। এই মানুুষটিকে আমরা চিরকাল ভালবাসতে বাধ্য।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন