রবিবার, ২৯ মে, ২০১৬

ভাষারাজনীতি এবং ভাষার রহস্যময়তা

ইমতিয়ার শামীম

আমরা যারা এই সময়ে সাহিত্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত আছি, চেষ্টা চালাচ্ছি লেখালেখি করার, তারা প্রত্যেকেই জেনে হোক বা না জেনে হোক, বুঝে হোক বা না বুঝে হোক, একটি ভাষারাজনীতির অংশও হয়ে পড়েছি। আর রাজনীতি কাউকে ছাড় দেয় না; তাই আমাদের সাহিত্যের ভাষা, ভাষারীতি ও শৈল্পিকতা নির্মাণের ক্ষেত্রে এবং ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখছে এ ভাষারাজনীতি। লেখার অপেক্ষা রাখে না, পূর্ব বাংলায় ভাষা নিয়ে একটি পরিকল্পিত রাজনীতি ছিল এবং ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ হওয়ার পর স্বাধীন বাংলাদেশেও তা অব্যাহত আছে। যদিও অনেকেরই ধারণা ছিল বা আছে যে তার অবসান ঘটেছে।
বাস্তবে মুক্ত বাংলাদেশে ভাষারাজনীতি সূক্ষ্ম এক রূপ পেয়েছে, প্রলেপের পর প্রলেপ তাকে আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ করে তুলেছে এবং অদৃশ্য করতে সক্ষম হয়েছে এর জটিল রাজনৈতিকতাকে। সাহিত্যের ভাষা আর মুখের ভাষা, লেখার ভাষা আর বলার ভাষা,-- যেভাবেই বলা হোক না কেন, তা আসলে ওই রাজনীতিজাত। যার প্রকাশ আমরা বিভিন্ন সময়ে দেখছি বিভিন্নভাবে।

আমাদের প্রাজ্ঞ পথিকৃৎরা বিভিন্ন সময় এ ব্যাপারে এত কিছু লিখেছেন বা বলেছেন যে নতুন করে কিছুই বলার নেই। তারপরও মাঝেমধ্যে পুরানো কথাগুলোই দরকার হয় নতুন করে বলার -- কেননা পুরানো রোগ নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, কেননা রাজনৈতিকতার ফাঁদে ফেলে আমাদের নতুন করে পুরানো বিতর্কে আবর্তিত করার প্রচেষ্টা এখনও অব্যাহত আছে। মাঝেমধ্যেই পুরানো বিতর্ককেই এমনভাবে দৃশ্যমান করে তোলা হয় যে মনে হতে পারে, কেবল বাংলা ভাষায় কেন, পৃথিবীর কোনও ভাষাতেই কোনওকালে এরকম কোনও আলোচনা হয়নি, তর্ক-বিতর্ক হয়নি--এবারই বোধহয় কেউ এ দিকটাকে প্রথম আমাদের সকলের দৃষ্টির সামনে নিয়ে এলেন! এরকম হয়--কেননা একদিকে আমাদের অনেকেরই রয়েছে বুঝেও না বোঝার ভঙ্গিতে নতুন করে আলোচনা শুরু করার ক্ষমতা, অন্যদিকে রয়েছে কোনো বিষয় হৃদয়ঙ্গম হলেও সক্রেটিসের সত্যে পৌঁছানোর বা নিজেকে জানার পদ্ধতিকে বদহজম করার কারণে নানা রকম অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করার মাধ্যমে কাক্সিক্ষত বিষয়ের অবতারণা করার অসাধারণ ক্ষমতা; ‘কুয়োর ব্যাঙদের সমুদ্র দেখানোর মহান কতর্ব্য’ পালন করতে এরা এত উদগ্রীব যে, কখনও এদের মনে হয় না, তারা নিজেরাই আসলে অগ্রসরমান পরিবর্তনশীল ভাষার সঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার বদলে কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার কূপম-ুকদের মতো সীমাবদ্ধ জলে ‘বিবি তালাকের ফতোয়া’র ব্যাখ্যা করতে ব্যস্ত আছেন। আমাদের কারও কারও আবার রয়েছে পূর্বসূরিদের রেখে যাওয়া জ্ঞান উপলব্ধি করার অপার অক্ষমতা। এই অপ্রাসঙ্গিক ক্ষমতা ও অক্ষমতাকে আমরা যুক্তিসিদ্ধ করছি নানা কিছু বলে। কখনও বলছি, ভাষা প্রতিনিয়ত বদলায়, আমাদের ভাষাও সেরকমভাবে বদলাচ্ছে; কখনও বলছি, পশ্চিম বাংলার সঙ্গে পূর্ববাংলার বাংলা ভাষার পর্যাপ্ত দূরত্ব রয়েছে; কখনও আবার আমাদের আতিশয্য এত বেড়ে যাচ্ছে যে পশ্চিমবঙ্গবাসী বিভিন্ন লেখক এদেশে এসে কল্কে পাওয়ার জন্যে ঢাকাকে ‘বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ রাজধানী’ বলায় পুলকিত হচ্ছি। তো ভাষা যে প্রতিনিয়ত বদলায়, এটি যে-কেউ বোঝেন; কিন্তু এই যে-কেউরা এটিও বোঝেন-- এই বদলানোর অর্থ এই নয় যে, ভাষা আমাদের প্রতিদিন গোসল করে উঠে কাপড় পাল্টানোর মতো করে পাল্টে যেতে পারে কিংবা পাল্টে নেয়া যায়। যুক্তরাজ্যের ইংরেজি ভাষার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ইংরেজির দূরত্ব থাকার মানে এই নয় যে, তারা সচেতনভাবে এক কষ্টকর প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে ওই দূরত্ব প্রতিষ্ঠা করায় সচেষ্ট ছিলেন। অথবা এর মানে এই নয় যে একটি ভাষার, উদাহরণত ব্রিটেনের মান ইংরেজির সঙ্গে আইরিশ আর স্কটিশদের মুখের ভাষার পার্থক্যগুলোকে উপেক্ষা ও উপহাস করা হয় কিংবা পার্থক্যগুলোকে জোর করে টেনেহিঁচড়ে বয়ে বেড়ানো হয়, বাঁচিয়ে রাখা হয়। ডায়লেক্টকে জোর করে মান ইংরেজির জায়গায় বসানোর তথাকথিত সৃজনশীলতা থাকলে ইংরেজি ভাষার পক্ষে কখনোই সম্ভব হতো না সারা বিশ্বের মানুষের কাছে আসার। আবার মান ইংরেজির বিকাশের ক্ষেত্রেও অঞ্চলআধিপত্যের ভূমিকা আছে--অর্থনৈতিকভাবে অগ্রসর হওয়ায় দক্ষিণ অঞ্চলের ইংরেজি আধিপত্য বিস্তার করেছে পুরো ইংরেজি ভাষার বিকাশের ওপরে।

এ কথাগুলো আসছে এ কারণেই যে, পরিকল্পিতভাবে নয়, বরং সমাজ ও অর্থনীতির স্বতঃস্ফূর্ত তাগিদই একটি জনগোষ্ঠীর ভাষাকে যেমন বৈভিন্নতা দেয়, তেমনি প্রমিতকরণের মধ্যে দিয়ে ঐক্যবদ্ধও করে। কিন্তু আমাদের অনেকে এ সত্য বার বার অস্বীকার করার উদ্যোগ নিয়েছেন। আহমদ শরীফ তার ‘বাঙলাভাষা-সংস্কার আন্দোলন’ বইয়ের ভূমিকাতেই লিখেছিলেন, দুই পর্বে দুই রকম উদ্দেশ্যে বাংলা ভাষার বর্ণ ও বানান-সংস্কার ‘আন্দোলন’ শুরু হয়েছিল। এর একপর্বে আবুল হাসনাত মোহাম্মদ ইসমাইল ও আবুল কাসেমরা চেয়েছিলেন ‘হিন্দু বাংলা’র সঙ্গে ‘মুসলিম জবানের’ পার্থক্য সৃষ্টি করে বাংলাকে ‘ইসলামী স্বাতন্ত্র্য’ দিতে। দ্বিতীয় পর্বে লক্ষ্য ছিল বর্ণে, বানানে, লিখনে জটিলতা, অসঙ্গতি ও অনিয়ম দেখানোর নামে বাংলাকে শিক্ষা ও প্রশাসনিক কাজের অনুপোযোগী প্রমাণ করে একে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদার বাইরে রাখা। আহমদ শরীফ অবশ্য ভেবেছিলেন, দুই পর্বেই কথিত এ ‘আন্দোলন’ ‘বৃথা ও ব্যর্থ’ হয়েছে, তাই এগুলো নিয়ে ‘টীকাভাষ্যসম্বলিত তথ্যবহুল মোটা বই’ লেখার সুযোগ থাকলেও প্রয়োজন নেই; ভেবেছিলেন কেবল এদের ‘মতলবের নমুনা’টুকু তুলে ধরাই যথেষ্ট হবে। আর সেই ‘মতলবের নমুনা’ হিসেবেই তিনি ১৯৮৬ সালে লিখেছিলেন ছোট আকারের একটি বই ‘বাঙলাভাষা-সংস্কার আন্দোলন’। কিন্তু কার্যত ওই কথিত আন্দোলনের নতুন এক পর্ব প্রায়ই আমাদের সামনে প্যারেড করে ‘সাহিত্যে মুখের ভাষা’ ব্যবহারের আন্দোলনের ছদ্দবেশে। ভাষাকে জীবন্ত রাখার কিংবা বিকাশ করার অথবা ক্রিয়াপদকে সৃজনশীলভাবে ব্যবহারের ফেস্টুন, প্লাকার্ড সামনে রাখা হলেও ‘মুখের ভাষা’র নামে আবুল হাসনাত মোহাম্মদ ইসমাইল আর আবুল কাসেমদের চিহ্নিত ‘মুসলিম জবান’কে ফিরিয়ে এনে, ‘নদীয়াকেন্দ্রিক কোলকাতার ভাষার’ বিপরীতে ‘ঢাকাইয়া স্বাতন্ত্র্যের’ নামে ‘ইসলামী স্বাতন্ত্র্য’ চাপিয়ে দিয়ে বাংলা ভাষার স্বাভাবিক গ্রহন-বর্জনের প্রক্রিয়াকে কিছুদিনের জন্যে তছনছ করা ছাড়া এই প্রচেষ্টার অন্য কোনও উপসংহার বা ফল পাওয়া যাবে বলে অন্তত আমার নিজের মনে হয় না। আহমদ শরীফ প্রথম দুই পর্বের সংস্কারপ্রচেষ্টার অন্তর্নিহিত ভাষারাজনীতির দিকে ইঙ্গিত করতে গিয়ে লিখেছিলেন, ‘‘কোলকাতার ভাষা, বর্ণ, বানান অবিকৃত রাখলে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাই যেন বৃথা হয়ে যায়।’’ কথাটিকে এখন একটু পরিবর্তন করে বলা যায়, ‘বাংলাদেশের অস্তিত্বকে কিংবা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে তো আর অস্বীকার করার উপায় নেই, অতএব ভাষাকে এমন এক নৈরাজ্যকর পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে, যাতে তা সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্বের মালমশলা ও উন্মাদনা যোগাতে পারে। যাতে তা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আস্বাদ ফিরিয়ে আনে।’ পাকিস্তান নেই, কিন্তু বাংলাদেশকেই পাকিস্তানকাঠামোর রাষ্ট্রে পরিণত করার চেষ্টা যেমন অব্যাহত রয়েছে, ঠিক তেমনি অব্যাহত রয়েছে কখনো ‘কোলকাতার ভাষা’ খেদিয়ে ‘বাংলাদেশের’ ভাষা প্রতিষ্ঠার নামে,কখনো মুখের ভাষাকে সাহিত্যের ভাষা করে তোলার নামে একধরণের জেহাদী জোশ তৈরি করার। আর এইসব অপচেষ্টা কল্কেও পায় বটে। তার প্রধান কারণটিকে আহমদ শরীফের ভাষায় বলা যায়, ‘‘শাস্ত্রানুগত্যবশেই মুসলিমেরা কেবল আরব ও আরবীকে নয়, ইরানকে ও ইরানীভাষাকেও এমনকি আরবী হরফে লিখিত বলে ফারসী শব্দবহুল উর্দুকেও ইসলামী ভাষার মর্যাদা ও গৌরব দান করে। কিন্তু তাদের মাতৃভাষা বাঙলাকে তারা হিন্দুর ও হিন্দুয়ানীর দান বলে জানে এবং মনেও মানে।’’ সাম্প্রদায়িক মানুষজনও এখন অনেক ধোপদুরস্ত আধুনিক হয়েছেন, ‘হিন্দু বা হিন্দুয়ানিত্বের’ দোহাই টেনে নিজেদের গায়ে দাগ ফেলার দরকার কী, তাই অনেক গাম্ভীর্যের সঙ্গে তারা ওসবের চিহ্নায়ন ঘটান কখনও ‘কোলকাতার ভাষা’র নামে, কখনও বা ‘সাহিত্যের ভাষা’র নামে।

বাংলা ভাষার বিকাশে কলকাতাকেন্দ্রিক সাহিত্যচর্চার অবদান কখনোই অস্বীকার করা যাবে না-- এ বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে ধর্মবাদী রাজনীতিক-সাহিত্যিকরা কয়েক দশক ধরে কৌশল পাল্টেছেন, এখন জোরেশোরে তাদের সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে ‘ইসলামী শাসকরাই’ মধ্যযুগে বাংলা ভাষার পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন--যদিও প্রাক-মধ্যযুগ ও মধ্যযুগের ধর্মান্তরিত অন্ত্যজ বাঙালির সেই ভাষাকে এরাই এখন চেষ্টা করছেন জমজমের পানি দিয়ে ভালো করে ধুইয়ে পরিশুদ্ধ করার! মধ্যযুগে এ অঞ্চলে নিজেদের শাসনকে পাকাপোক্ত করার স্বার্থে ইসলামি শাসকদের অন্ত্যজ বাঙালির ভাষাকে স্বীকৃতি দেয়ার কারণ ছিল যত না শুভবুদ্ধি, তারও বেশি রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক; নিজেদের পায়ের নিচে ভিত খুঁজে পাওয়ার তাগিদ। বাংলা ভাষার প্রতি প্রেম এখানে কতটুকু মুখ্য ছিল, তা গবেষণার বিষয়। বহিরাগত শাসক মুসলমানদের কী জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে, কী জীবনযাপনের ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার ভূমিকা ছিল না বলেই ঔপনিবেশিক শাসনামলে এসে তাদের উত্তরসূরি মুসলমানদের নেতা নওয়াব আবদুল লতিফের মুখ থেকে আমাদের শুনতে হয়েছে ‘বাংলা ছোটলোক মুসলমানের ভাষা’। পরিষ্কারভাবে বলতে গেলে, বাংলা যেমন ছোটলোক মুসলমানের ভাষা, তেমনি ম্লেচ্ছ হরিজন হিন্দুরও ভাষা। কেননা উচ্চ বর্ণের হিন্দুরাও ভাষা হিসেবে বাংলাকে তখন কোনও মর্যাদাই দিতেন না। উচ্চবর্ণের হিন্দুরাও নিজেদের বর্ণচ্ছটা প্রকাশের জন্যে সংস্কৃতি তো অবশ্যই, ফারসিও শিখতেন। বাংলা ভাষার মূল ব্যবহারকারী ছিলেন বরাবরই অন্ত্যজ বাঙালি, যাদের একটি অংশ আবার ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলমান হয়েছিলেন।

অবশ্য এ কথাও মনে রাখা ভালো, যাকে আমরা প্রায়শই ‘কৃত্রিমতা’ বলে সমালোচনা করার চেষ্টা করি, সেই ‘কৃত্রিমতা’র দায় পৃথিবীর সব ভাষাকেই (এমনকি মুখের বা আঞ্চলিক ভাষাকেও) বয়ে বেড়াতে হয়। আহমদ শরীফ যৌক্তিকভাবেই লিখেছেন, ‘‘লিখিত কৃত্রিম সংস্কৃত ভাষা যেমন ভারতীয়দের রসুনের মতো অভিন্নমূল শাস্ত্রিক-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যচেতনায় গোষ্ঠীবদ্ধ রেখেছে, তেমনি লিখিত কৃত্রিম বাঙলা ভাষাই বাঙলা বিহার উড়িষ্যা আসামের বাঙলাভাষীদের বুলির দুর্লঙ্ঘ্য বাধা সত্ত্বেও অভিন্ন জাতিসত্তা বোধ তথা জ্ঞাতিত্ব চেতনা জিইয়ে রেখেছে।’’ আসলে ভাষা তার সংজ্ঞা আর চরিত্রের কারণেই সামনের দিকে এগিয়ে চলে, নিজের জন্যে যা সে সবচেয়ে ভালো মনে করে সেদিকেই এগিয়ে যেতে থাকে, কৃত্রিম হলেও কোনো শব্দ বা বাক্যের গঠন ও নিয়মরীতি যদি লাগসই মনে হয় তবে সেসব টুপ করে গিলে ফেলে। রাজনীতিক বলেন আর একাডেমিকই বলেন, কেউই তার সেই গতিকে প্রতিহত করতে পারে না। পূর্ব বাংলার কথা কমবেশি আমরা সবাই জানি, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই, উদাহরণস্বরূপ ইতালিতে ফ্যাসিস্টরা অনেক চেষ্টা করেছেন জনগণকে বার-এর বদলে মেসিটা বলাতে, ককটেল-এর বদলে কোডা ডি গ্যালো বলাতে, গোল-এর বদলে রেতে বলাতে, ট্যাক্সির বদলে অটো পাবলিকা বলাতে, কিন্তু সেসব সম্ভব হয়নি। তেমনি এখন বুদ্ধিদীপ্ত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আলোচনা ফেঁদে যত চেষ্টাই চালানো হোক না কেন ‘আল্লাহ’ ও ‘খোদা’কে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তোলার, ইসলামের বদলে এছলাম বলার, এসব কোনও কাজেই আসবে না। রাজনীতিক ও শাসকদের তুলনায় সাহিত্যিকরা অবশ্য প্রবল ক্ষমতাধর, তাই ভাষার সেই নিজস্ব গতিধারার সঙ্গে তাদেরও একটি যোগাযোগ থাকে, তাদেরও একটি ভূমিকা থাকে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ছাড়া বাংলা ভাষার বিকাশ কত বছরে একটি পরিণত আকার পেতো তা বলা কঠিন। যেমন কঠিন বলা, দান্তে ছাড়া কোনও ঐক্যবদ্ধ ইতালি ভাষা দাঁড়াতো কি না। দান্তে তার ডি ভালগারি ইলোকুয়েন্টিয়া (অন ভারনাকুলার ইলোকুয়েন্স) বইয়ে বিভিন্ন ইতালিয় ডায়ালেক্টকে বিশ্লেষণ করেন, প্রত্যাখ্যান করেন, ঘোষণা দেন নতুন এক ‘বিশিষ্ট স্বদেশী ভাষা’ নির্মাণের। দান্তের ওই প্রচেষ্টা নিয়ে আশান্বিত হওয়ার কোনও কিছু ছিল না, কিন্তু এর পরপরই তিনি লিখলেন ‘ডিভাইন কমেডি’ আর কালক্রমে কয়েক শতাব্দীর মধ্যে সে ভাষাই হয়ে উঠল ইতালির মানুষের ভাষা। কিন্তু দান্তের ওই প্রচেষ্টাই পরবর্তী সময়ে ইতালির ফ্যাসিস্ট শক্তিকে প্রেরণা দিয়েছে, এমন ভাবার কোনও কারণ নেই। দান্তে সফলতা পেয়েছেন, কেননা সেখানে এমন এক জনগোষ্ঠী ছিল, যার সদস্যরা দান্তের মডেলে প্রবহমান সাহিত্যের শক্তিতে বিশ্বাস রাখতেন। সাহিত্য একটি ভাষা বিনির্মাণের মধ্যে দিয়ে সৃষ্টি করে আত্মপরিচয় ও সম্প্রদায়সম্প্রীতির অনুভূতি--দান্তের ছিল সেই শক্তি। হোমারকে ছাড়া গ্রীক সভ্যতা চিন্তা করা অসম্ভব, যেমন অসম্ভব লুথারের অনুবাদ করা বাইবেল ছাড়া জার্মানির আইডেনটিটি বা স্বকীয়তা কিংবা পুশকিনকে ছাড়া রাশিয়ার ভাষাকে চিন্তা করা। এবং একইভাবে অসম্ভব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ছাড়া বাংলা ভাষাকে চিন্তা করা। কিন্তু ষাটের দশকে আমরা যেমন দেখেছি-- রবীন্দ্রনাথকে পরিত্যক্ত করার অপচেষ্টা। ঠিক তেমনি এখন দেখছি, পরিত্যক্ত করা যেহেতু সম্ভব নয় সেহেতু সত্যিকারের ৯৯ ভাগ রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে একভাগের মিথ্যামিথ্যি রবীন্দ্রনাথকে সজোরে উপস্থাপন করা--যাতে ওই একভাগের চাপেই পুরো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে অন্যরকম লাগে, তাকে নিয়ে বিদ্রুপ করাটাও তাই সহজ হয়ে যায়।

বাংলাকে বিভক্ত করা হয়েছে বলেই এ ভাষাকে কেন্দ্র করে এমন রাজনীতির শুরু, সেরকম নয়। যে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির জালে ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী আন্দোলন বন্দি হয়েছিল, তা থেকেই সূত্রপাত এমন রাজনীতির। আহমদ শরীফ জানাচ্ছেন, ওই সময় হুগলী-হাওড়া-কোলকাতার উর্দুভাষী বাঙালির হিন্দিমেশানো বাংলায় লেখা বটতলার ‘দোভাষী’ সাহিত্যই হয়ে উঠেছিল ইসলামী ভাষা-সাহিত্যের নিদর্শন। বাংলা ভাগের ফলে শুধু এলাকার পরিবর্তন হলো মাত্র। আমরা দেখলাম, আবুল মনসুর আহমদ বলছেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানে সাহিত্যের ভাষা হবে ঢাকা-ময়মনসিংহে চালু বুলি-ঘেঁষা’ আর তমদ্দুনওয়ালারা বললেন, ‘ভাষার ‘এবারত’ হবে ইসলামী আর লেবাজ হবে আরবী-ফারসী শব্দবহুল’। আবুল মনসুর আহমদের বই ‘আয়না’ ও ‘ফুড কনফারেন্স’ আরবি-ফারসি শব্দে এবং হিন্দুস্থানী বাক-ভঙ্গির মিশ্রণে ওই রচনারীতির প্রকাশ ঘটায় এবং ব্যঙ্গ বিদ্রুপের মাধ্যমে মুসলিম সমাজের চালচিত্র তুলে ধরে দীর্ঘমেয়াদী আবেদনও সৃষ্টি করে--যদিও ওই ব্যঙ্গবিদ্রুপ এখনকার ধর্মবাদী রাজনীতিকদের পছন্দ নয় বলে তারা এবং ধর্মজ সংস্কৃতি চর্চাকারীরা এসব সাহিত্য ক্রমশ বাতিলের খাতায় ফেলে দিচ্ছেন। অনেকটা আবুল মনসুর আহমদের মতো যুক্তিতেই এখন আবার বলা হচ্ছে, ঢাকার শোভন কথ্য বা নাগরিক ভাষাকে সাহিত্যের ভাষা করে তোলার। আর তাদের এ আকাক্সক্ষার প্রধান শত্রুটি হলো হলো প্রমিত বাংলা। যে পরিস্থিতি এই শত্রুতার মধ্যে দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে তা আসলে পুরানো এক পরিস্থিতি-- যার মধ্যে পড়ে আহমদ শরীফকে একসময় লিখতে হয়েছিল, প্রশ্ন তুলতে হয়েছিল, ‘‘ইহুদী, খ্রীস্টান ও পৌত্তলিক ঐতিহ্যের ও তমদ্দুনের ধারক-বাহক আরবী যদি রাতারাতি ইসলামী তাহজীবের ধারক, বাহক আর প্রচারক হতে পারে, তা হলে কোলকাতার লেখ্য বাঙলাই বা পূর্ব পাকিস্তানের ইসলামী তমদ্দুনের ধারক হতে পারবে না কেন?’’

অবশ্য আমার নিজের যত সংশয়ই থাক না কেন, চেনাজানা অনেকেই রয়েছেন যারা মুখের ভাষায় সাহিত্যচর্চায় বিপ্লব ঘটাতে মুখিয়ে আছেন। এদের এই পক্ষপাতিত্ব দেখলে মনে পড়ে ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক, মুহম্মদ আবদুল হাই ও মুনীর চৌধুরীদের কথা--১৯৬৭ সালে যারা মানুষের কথনের ক্ষেত্রে তেমন কোনো হেরফের হয় না বলে কোনও কোনও বর্ণ বর্জনের পক্ষে ছিলেন। পার্থক্য এই, শেষ পর্যন্ত তারা সকলেই পাকিস্তান সরকারের মূল পরিকল্পনা আঁচ করতে পেরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োজিত সদস্য হিসেবে কমিটিতে দ্বিমত পোষণ করেন। জানিয়ে দেন, বাংলা বানান-সংস্কার ও সরলায়ন, বাংলা ভাষার ব্যাকরণ সংস্কার ও সরলায়ন এবং বাংলা বর্ণমালা সংস্কার ও সরলায়ন বাঞ্ছনীয় নয়। হয়তো আমাদের পরিচিতজনরাও একসময় বুঝতে পারবেন মাদ্রাসা শিক্ষার প্রভাবে শওকত ওসমান শৈল্পিক উৎকর্ষতার লক্ষ্যে কিংবা আলাউদ্দিন আল-আজাদ বাস্তব সংলাপের জগতে নিয়ে যাওয়ার জন্যে আরবী-ফারসী শব্দ ও আঞ্চলিক বুলি নিয়ে যে সৃজনশীলতা দেখিয়েছেন, তার সঙ্গে আবুল মনসুর আহমদ, ফররুখ আহমদ, খান মোহাম্মদ মঈনুদ্দীনদের ভাষাব্যবহারের পার্থক্য রয়েছে।

মুখের ভাষার কথা যখন বলা হয়, বিশেষ করে সেই ভাষার সপক্ষে যখন আজকাল আবার শহীদুল জহিরকে টেনে আনারও প্রবণতা দেখা যায়, তখন এটি আর মনে রাখা হয় না যে, শহীদুল জহির পাঠকপ্রিয় হয়ে উঠেছেন ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ এবং ‘সে রাতে পূর্ণিমা ছিল’ বই দুটির পাশাপাশি বেশ কিছু গল্পের মধ্যে দিয়ে--যেগুলোর কোনওটির ভাষার সঙ্গেই পূর্ব বাংলাকালীন সময়ে আবুল মনুসর আহমদ নির্দেশিত ঢাকা-ময়মনসিংহের চালু বুলিঘেঁষা কিংবা পরবর্তী সময়ে শহীদুল জহিরের লেখায় উপস্থাপন করা ঢাকাইয়া শোভন কথ্যরীতির কোনও ব্যবহার নেই। শহীদুল জহির ‘হয়ে’ না লিখে ‘হয়্যা’ লিখেছেন, কিন্তু কখন থেকে লিখেছেন, সেটিও বলতে হবে। এসব কথা এ কারণেই আসছে যে, শহীদুল জহির এমনকি আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের লেখার বিশালত্বকেও ইদানিং আমরা ডায়ালেক্ট-এর সীমিত পরিসরে আটকে ফেলতে চাইছি; তাদের সাহিত্য পাঠ করার সময় আমাদের এটি মনে থাকছে না যে বিশেষ ডায়ালেক্টভিত্তিক সাহিত্য পৃথিবীর কোনও দেশেই, কোনও ভাষাগোষ্ঠীতেই প্রধান ধারা হয়ে উঠতে পারেনি। সৈয়দ শামসুল হক, আলাউদ্দিন আল আজাদ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, হাসান আজিজুল হক এমনকি শহীদুল জহিরও যখন বিশেষ ডায়লেক্ট ব্যবহার করেছেন, তা তারা মুখের ভাষা ব্যবহারের সস্তা উদ্দেশ্য নিয়ে করেননি, বরং শিল্পের তাগিদেই করেছেন, নিজেদের সৃজনশীলতার ক্ষমতার পাশাপাশি ভাষার অন্তর্গত সৃজনশীলতা দেখানোর সদিচ্ছা থেকেই করেছেন। এই সৃজনশীলতার পরিধি এত অপরিসীম যে কোনো কোনো সাহিত্যিক কল্পিত ডায়লেক্টকেও শৈল্পিক করে তুলেছেন। আরেকটি ব্যাপারও আমরা খেয়াল করি না যে, যারা আমাদের পথিকৃৎ সাহিত্যিক হয়ে উঠেছেন, তাদের কেউই ভাষা পরিবর্তনের সাহিত্যিক এজেন্ডা নিয়ে লিখতে শুরু করেন নি। বরং চিন্তা ও চর্চার ধারাবাহিক পরিবর্তনশীলতা, পরিবর্তনশীলতার মননশীলতাই তাদের ভাষাকে পরিবর্তন করেছে, বিষয়বস্তু ও পরিপ্রেক্ষিতের কারণেও কারও কারও ভাষার ক্ষেত্রে পরিবর্তন ঘটেছে, এমনকি কারও কারও ক্ষেত্রে এরকম পরিবর্তন একাধিকবার ঘটেছে।

এসব কথা বলার অর্থ, মুখের ভাষা ব্যবহারের বিরোধিতা করা নয়। বরং এসব বলার অর্থ হলো, মুখের ভাষা নিয়ে বিভিন্ন সময় যে তোড়জোর তোলা হয়েছে এবং যার ঢেউয়ে আমরাও ভেসে যাওয়ার চেষ্টা চালিয়েছি, সেই ভাষাপ্রয়োগের সীমাবদ্ধতা ও প্রতিক্রিয়াশীলতার দিকগুলিও চিন্তা করতে হবে। ‘মুখের ভাষা’ হোক, আর ‘সাহিত্যের ভাষা’ই হোক, লেখাকে তা যদি প্রাণবন্ত, গতিশীল ও শৈল্পিক করে তুলতে না পারে, তা হলে তার কোনও গুরুত্বও নেই। যেমনটি আমরা দেখি কমলকুমার মজুমদারের ক্ষেত্রে। মুখের ভাষা না হওয়ার পরও কিংবা প্রচল সাহিত্যের ভাষা না হওয়ার পরও কমলকুমারের লেখা কালোত্তীর্ণ সৃষ্টির মর্যাদা পেয়েছে। আবার, মুখের ভাষায় লেখার পরও হাসান আজিজুল হকের ‘আগুনপাখি’ ভবিষ্যতের ¯্রােতে সংযুক্ত হয়েছে। আমরা দেখেছি, পাঠকই কমলকুমার মজুমদার কিংবা অমিয়ভূষণ মজুমদারের একমাত্র উত্তরাধিকার। কেননা পরবর্তী কোনও লেখক তাদের ভাষায় পরিভ্রমণ কতটুকু করবেন, তাদের ভাষাকাঠামোয় কতটুকু আশ্রয় নেবেন তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে মানিক বন্দোপাধ্যায় হয়ে এমনকি আখতারুজ্জামান ইলিয়াস অবধি বিভিন্ন সাহিত্যিকের ভাষাকে বিবেচনায় নিয়ে আমরা এক কথায় বলতে পারি,-- তাদের সাহিত্যের ধারাবাহিকতা সৃষ্টি হয়েছে, কেননা তারা এমন অনেক লেখকই পেয়েছেন যারা তাদের বিষয়ের ধারাবাহিকতার মধ্যে জীবনযাপন করছেন, এমনকি তারা এমন প্রচুর পাঠকও পেয়েছেন যারা জীবনযাপন করছেন ওই ধারাবাহিকতার মধ্যে। কমলকুমার মজুমদার, অমিয়ভূষণ মজুমদার কিংবা কবিতার ক্ষেত্রে যেমন বিষ্ণু দে--এরকম সাহিত্যিকরা বোধহয় তেমন কোনও লেখক ও কবি পাননি, যারা তাদের উত্তরধারাবাহিকতায় যুক্ত আছেন। কিন্তু তারপরও লক্ষ্য করার বিষয় হলো, দিন যত যাচ্ছে, পাঠকদের কাছে তাদের কিন্তু গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে চলেছে। এটি সম্ভব হচ্ছে কেবল এ কারণে যে, সাহিত্যে তারা তাদের যে কল্পনাশক্তি যুক্ত করেছেন, ওই কল্পনাশক্তির কারণে বাস্তবতাকে তারা যেভাবে শৈল্পিক করে তুলেছেন, তা পড়–য়াদের কাছে তাদের গুরুত্বপূর্ণ করে তুলছে। উত্তরাধিকার না থাকার পরও তাদের সাহিত্য তাই জীবন্ত রয়েছে অনেকের ধারণার চেয়েও অনেক অনেক বেশিদিন ধরে। বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর লিখেছিলেন, ‘সাহিত্যের ইতিহাস প্রধানত বড়ো কবি এবং দুর্বল কবি, বড়ো কবি এবং সুকবির মধ্যকার নাটকীয় সংগ্রাম নয়। সাহিত্যের ইতিহাসের একটা বড়ো অংশ নেহাৎ বৈপ্লবিক নয়, বরং রক্ষণশীলতা, সকল সময় বড়োরা কিংবা র‌্যাডিক্যালরা সাহিত্য তৈরি করেন না, তৈরি করেন অনামা আন্দোলনকারীরা, যাদের কাজ হচ্ছে সাহিত্য ভরা, সাহিত্যকে প্রবহমান করা।’ আমাদের বাস্তবতা এবং ভবিতব্যও আসলে তাই। মুখের ভাষা, সাহিত্যের ভাষা, প্রমিত ভাষা ইত্যাদি বিষয়গুলি নিয়ে অনেককেই আমরা র‌্যাডিক্যাল হয়ে উঠতে দেখছি--যদিও তাদের সাহিত্যে তা অনুভব করা যাচ্ছে না, র‌্যাডিক্যাল হওয়ার মোহে তারা সাহিত্যকে ভরতে পারা ওই অনামা আন্দোলনকারীর চেয়েও ক্রমশ গুরুত্বহীন হয়ে পড়ছেন। অথচ এখনও মাঝেমধ্যেই পুরানো কোনো লেখকই হয়তো র‌্যাডিক্যাল সাহিত্যের বর্ণচ্ছটা নিয়ে উদ্ভাসিত করছেন পড়–য়ার মনকে।

কৈশোরে, মনে আছে আস্ত একটি গল্প লিখে ফেলি আমাদের মুখের ভাষায়। বোধহয় সাপ্তাহিক সচিত্র সন্ধানীতেই তখন ছাপা হচ্ছে ‘পরানের গহীন ভেতর’, ওদিকে রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ আর তার বন্ধুকুল তাদের লেখাজোখায় তখন নিজেদের বাংলা বানানরীতির ব্যবহার শুরু করেছেন কিংবা বলা যায় চাপিয়ে দিচ্ছেন। মুখের উচ্চারণের হুবহু লিখন তাদের সে বানানরীতির মূল ভিত্তি। বোধকরি এসবেরই চাপতাপে লেখা হয়েছিল ওই গল্প। আমাদেরই সমবয়সী এক রাজশাহীবাসী তখন এক সংকলন সম্পাদনা ও প্রকাশনার কাজে ব্যস্ত, গল্পটি যায় তার হাতে। আর গল্পটি পড়ার পর হিতোপদেশ দেয়ার এমন সুযোগ সে হাতছাড়া করে না। এইসব ‘আঞ্চলিকতা’ বা ডায়ালেক্ট সাহিত্য-পদবাচ্য কি না সে ব্যাপারে নাতিদীর্ঘ একটি উপদেশমূলক চিঠি আসে তার কাছ থেকে। সম্ভবত সেই প্রথম ভাষা নিয়ে চিন্তাভাবনা করার দায়ভাগী হই আমি। কিন্তু প্রতিটি ঘটনারই ট্র্যাজেডি ও কমেডি থাকে--এ ঘটনার কমেডি হলো, কিছুদিন পরে আবারও একটি চিঠি আসে তার কাছ থেকে। গল্পটি ছাপতে চলেছে সে--তার চিঠি পড়ে জানতে পারি--তার বড় ভাই ছুটিতে বাড়ি এসেছেন, গল্পটি পড়ে সম্পাদক ছোটভাইকে তিনি পরামর্শ দিয়েছেন সেটি ছাপতে। কেননা এখনকার গল্প এরকমই হয়--গল্পে নানা ভাঙচুর হয়, সমাজের নানা স্তরের মানুষের জীবন ও কথার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বাক্যগঠনের রীতিও সেরকম হয়ে যায়। হুবহু এ ভাষায় নয়, তবে এরকম কথাই লিখেছিল সে। আগের চিঠির হিতোপদেশ যেমন আমার কাছে যুৎসই লাগেনি, তেমনি পরের চিঠির ‘বড়ভাই বলেছে...’ মার্কা গদগদ স্বরও ভালো লাগেনি। আমাদের মতো দেশে, ভাষারীতি ও বানানের ক্ষেত্রে কখনো রাজনৈতিক দিক যুক্ত হতে থাকে, কখনো বা পরিত্যক্ত রাজনৈতিক দিক ফিরে আসে বড়ভাইদের এই পরামর্শের কৌতূককর জগত থেকে। ফলে একটি গল্পের কি ভাষা, কি লেখার স্টাইল-ফর্ম-কনটেন্ট সব কিছুই একসময় আবার কৌতূককরভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। একটি গল্পের স্টাইল, ফর্ম, কনটেন্ট, টেকনিক এমনকি সৃজনশীলতার দিক নিয়ে নিশ্চয়ই অনেক কিছুই বলা সম্ভব; কিন্তু স্কটল্যান্ডের বিখ্যাত গল্পকার এলস্পেথ ডেভি যেমন বলেছেন, গল্পকারের প্রকৃত কল্পনাশক্তি কোথা থেকে আসে, সেটি একটি অপাররহস্য। আমার মনে হয় এই রহস্যময়তা যত বেশি ভেঙে পড়তে থাকে এবং ভেঙে পড়তে পড়তে আরও রহস্যময় হয়ে উঠতে থাকে, ততই সে শিল্পোত্তীর্ণ হয়ে উঠতে থাকে। ব্যবহৃত শব্দ ও বাক্যের গঠনের ওজন থেকে আমরা এই নিরাকার রহস্যকে ক্রমশ ভাঙার চেষ্টা করি, যেমন প্রযুক্তিবিদরা কোডকে ক্রমাগত ডিকোড করে রহস্যের একেকটি ধাপ ভাঙতে থাকেন। কিন্তু এত কিছুর পরও যে-সীমাবদ্ধতার অনুভূতি নিয়ে লেখক বাক্যের নির্মিতি দাঁড় করাতে থাকেন, সেই সীমাবদ্ধতা থেকে জন্ম নেয় এক রহস্যময় স্বাধীনতা, যা খুব সরল শব্দকেও নানা দ্বন্দ্বাতক, অনুভূতিময়, গভীর পরিসর দিয়ে থাকে। অথবা এমন সব অব্যবহৃত শব্দকে নিয়ে আসে, যা আমাদের ভীষণ অজানা, অচেনা হওয়ার পরও বাক্যের গতিময়তার কারণে আমাদের বাল্যকালের মতো আধেক বোঝা- আর আধেক না বোঝার আনন্দে ডুবিয়ে দিতে থাকে। রবীন্দ্রনাথ তার বাল্যকালে এই আনন্দ অর্জন করেছিলেন বোঝা না-বোঝার ঘোরে শ্রুত উপনিষদ থেকে এবং সারা জীবন এই সত্য মেনে চলার চেষ্টা করেছেন যে, সব কিছু কড়ায়গ-ায় বোঝার চেষ্টা করা মানে আনন্দ, সুখ প্রশান্তিকে মাটি করা। তা যেমন সত্য শিল্পসৃজনের ক্ষেত্রে, তেমনি সত্য শিল্পসৃজন উপলব্ধির ক্ষেত্রেও।



কাজেই, ভাষারাজনীতির দিকটি বোঝা কিংবা বয়ান করা যত সহজ, সাহিত্যের বা শিল্পের ভাষার টিকে থাকার কিংবা লোপ পাওয়ার, ভাষার গতিময়তা ও রহস্যময়তার ব্যাখ্যা ততই কঠিন। পৃথিবীতে এর আগেও এসব নিয়ে অনেক লেখা হয়েছে, নিশ্চয়ই ভবিষ্যতেও হবে; কিন্তু সেই গতিময়তার ব্যাখ্যা, রহস্যময়তার আখ্যান, আধেক বোঝা না-বোঝার আনন্দ রয়ে যাবে আমাদের ব্যাখ্যার অতীত, রয়ে যাবে অজানাই।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন