রবিবার, ২৯ মে, ২০১৬

বিকল্প যৌনতার প্রত্যন্ত মহল্লার সযত্ন ছবি : হলদে গোলাপ

সুদীপ বসু

মেয়েটির নাম চায়না পাল৷ নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়েটির বাবা মারা যান ১৯৯৪ -এ৷ বাবা ছিলেন কুমোরটুলির মৃত্শিল্পী৷ আট দশকের বেশি পুরনো ব্যবসা তাঁদের৷ বাবার অকালমৃত্যুর এক বছর পর ১৯৯৫ -এ চায়না ঠিক করেন এই পারিবারিক পেশাকেই বেছে নেবেন তিনি৷ কিন্ত্ত খড় কাঠ আর বাঁশের প্রতিমার গায়ে মাটি লেপে তাকে জ্যান্ত করে তোলা সে তো পুরুষেরই একচেটিয়া অধিকার৷ চায়নাকে কাজ করতে দেবে কেন পুরুষকণ্টকিত কুমোরটুলি ? তা সত্ত্বেও কী তীব্র অদম্য জেদে কাজ করে চলেন চায়না , সে এক অন্য গল্প৷ সে গল্প আপাতত কুলুঙ্গিতে তোলা থাক৷ আমরা বরং অন্য একটি সত্যকাহিনির সড়কে পা রাখি৷


২০১৫ -র দুর্গা পূজার কিছু আগে যখন চায়নার বয়স ৪৩ , একটি অদ্ভুত আবদারের সম্মুখীন হতে হয় তাঁকে৷

তখন তাঁর গড়া সব প্রতিমাই প্রায় শেষের মুখে , একদল হিজড়ে ও রূপান্তরকামী মানুষ এসে ঘিরে ধরেন তাঁকে৷

না , কোনও জোরজুলুম নয়৷ বিনীত কণ্ঠে তাঁরা দাবি করেন তাঁদের নিজস্ব পূজার জন্য একটি অর্ধনারীশ্বরের মূর্তি বানিয়ে দিতে হবে , যার অর্ধেক জুড়ে থাকবে শিবের রূপ বাকি অর্ধেকে পার্বতীর গরিমা৷ ঠান্ডা মাথায় অনেক ভেবেচিন্তে , এই ঝুঁকি নিতে রাজি হয়ে যান চায়না৷ জীবনের এই বিপুল প্রতিস্পর্ধার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ক্রমে রূপ দেন অর্ধনারীশ্বরের মৃত্মূর্তির , যার বাঁ দিকটা জুড়ে শুধুই শিবের উপস্থিতি (অর্ধেক গোঁফ সমেত ) আর ডানদিক জুড়ে পার্বতী, বুকের ডান অংশে পরিপুষ্ট স্তনের আভাস৷ সঙ্গে একচালার মধ্যেই লক্ষ্মী সরস্বতী গণেশ ও কার্তিক৷ এই মূর্তিটি নিয়েই উত্তর কলকাতার জয় মিত্র স্ট্রিটে রূপান্তরকামীদের প্রথম দুর্গাপূজা সংঘটিত হয়৷ এর মূল উদ্যোগী ছিল প্রত্যয় জেন্ডার ট্রাস্ট নামক হিজড়ে , কোঠি ও অন্যান্য রূপান্তরকামীদের সংগঠন৷ এর আঠারো মাস আগেই সুপ্রিম কোর্ট তার ঐতিহাসিক রায়ে রূপান্তরকামীদের তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতি দেওয়ার কথা ঘোষণা করে দেশময় তোলপাড় ফেলে দিয়েছে৷ ২০১৫ -র প্রথম দিক থেকে পশ্চিমবঙ্গ সরকারও এই রায়কে কার্যকর করার ক্ষেত্রে এই জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য , শিক্ষা ও চাকরির (সিভিক পুলিশ ভলান্টিয়ার কোর্স) ক্ষেত্রে বিশেষ পদক্ষেপ নেয়৷

ইউরোপ আমেরিকার মতো উন্নত ধনতান্ত্রিক দেশগুলির পাশাপাশি লাতিন আমেরিকার দেশগুলিতেও সমকামী -উভকামী -রূপান্তরকামীদের আইনি ও সামাজিক স্বীকৃতির লড়াই আজ আর নতুন কোনও ঘটনা নয়৷ একটি সমীক্ষা বলছে এই বিষয় ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সবচেয়ে বেশি এগিয়ে থাকা পাঁচটি দেশ হল দ্য নেদারল্যান্ডস , সুইডেন , ডেনমার্ক, স্পেন ও আয়ারল্যান্ড (২০১৫ )৷ আগামী বছর মার্চের ভেতর ফিনল্যান্ডে সমলিঙ্গের বিবাহ আইনের শিরোপা পেতে চলেছে , মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শীর্ষ আদালতের ২৬শে জুন ২০১৫ -র যুগান্তকারী রায়ের (ওবারজেফেল বনাম হজেস্ কেস ) মাধ্যমে যা ইতিমধ্যেই লাগু হয়ে গেছে৷

পুঁজি বিকাশের স্বাভাবিক করোলারি হিসেবে জেগে ওঠা এই গোষ্ঠী স্বাধীনতার আন্দোলনের তুমুল তরঙ্গ আছড়ে পড়েছে এ দেশের সমুদ্ররেখাতেও৷ তৃতীয় লিঙ্গের ভোটাধিকারের আওতায় একমাত্র হিজড়েগোষ্ঠীকে আনা হয়েছিল সুদূর ১৯৯৪ -এ৷ এ দেশে প্রথমে তামিলনাড়ু ও তার পরে কেরালায় রূপান্তরকামীদের জন্য বিশেষ পরিকাঠামো গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়৷ সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ঠিক এক বছরের মাথায় (২৪ -০৪ -১৫ ) রাজ্যসভায় ‘রূপান্তরকামীদের অধিকার ’ বিলটি পাশ হয়ে যায়৷

এমনই এক সামাজিক পালাবদলের পরিপ্রেক্ষিতে নির্মিত হয় ‘হলদে গোলাপ ’ উপন্যাসটি৷ রাজনীতি আর আইনের অন্ধকার মারপ্যাঁচের বাইরে স্বপ্নময় চক্রবর্তী তাঁর এই প্রায় -এপিক আখ্যানে বড়ো যত্নে ও মায়ায় ফুটিয়ে তোলেন এইসব প্রান্তিক মানুষদের সঙ্কটসঙ্কুল যাপনকাহিনি , তাঁদের অনুভূতি, হাসি অপমান৷

‘তুমি আকাশের চন্দ্রের সমা /তুমি মম হূদয় মহিমা /তুমি রহিমা , তুমি গরিমা /তুমি মম হূদয়ের ঝিমঝিমা /কিন্ত্ত তুমি সত্যিই কি নারী ?’ প্রেমার্থ কবির কবিতার শেষ চরণের এই জীবনজিজ্ঞাসা একটি আঁচড়ে ফুটিয়ে তোলে লক্ষ লক্ষ পুরুষশরীরে নারী , সমকামী ও রূপান্তরকামীর লিঙ্গ -অস্তিত্বের দোলাচলকে৷ ‘ভদ্দরলোক ’ সমাজের গুন্ত কৌতূহলকে খাদের ধারে এনে দাঁড় করায়৷

স্বপ্নময়ের আখ্যানে কোনও একরৈখিক ন্যারেটিভ থাকে না৷ অনেকখানি সোজা হেঁটে আচম্বিতে অপ্রত্যাশিত বাঁক নেয় তাঁর বয়ান , ফিরে আসে , অজস্র চরিত্র আর তাদের দিনান্তের কোলাহলে নাজেহাল হয়ে যান পাঠক৷

কুমোরটুলির চায়না পাল যে বছর (১৯৯৫ ) মৃত্শিল্পীর জীবিকা বেছে নেন কাকতালীয় ভাবে সে বছরটিতেই ‘হলদে গোলাপ ’-এর কাহিনির সূত্রপাত৷ আকাশবাণীর স্বাস্থ্য ও বিজ্ঞান বিভাগের প্রযোজক ওরফে প্রোগ্রাম একজিকিউটিভ অনিকেতের টেবিলে এসে পৌঁছয় নানারকম উদ্ভট সব চিঠি , শরীর সম্পর্কে উত্কট জিজ্ঞাসা৷ আশ্চর্য নেশায় সেগুলো ফাইলবন্দি করে রাখে অনিকেত৷ কিশোর -কিশোরীদের নিজস্ব কিছু বিশেষ প্রশ্ন নিয়ে একটি রেডিয়ো ধারাবাহিক করার প্রোপোজাল নিয়ে সে স্টেশন ডিরেক্টরদের দোরে দোরে ঘোরে৷

তার পর কাহিনি তার নিজের গতিতে চলতে থাকে৷ আর অনিকেতের সন্ধানী হাত ধরে আমরা পৌঁছে যাই বিকল্প যৌনতার নিষিদ্ধ প্রত্যন্ত পেরিফেরাল মহল্লায়৷ সমকামীদের খোঁজে হন্যে হয়ে সে অন্ধকার কার্জন পার্কে ইতি উতি ঘোরে৷ কিন্ত্ত পিছনে হাত দেওয়া কাউকে দেখতে পায় না৷ একটা লোক হঠাত্ এসে বলে , ‘ঠেক ফিট আছে৷ ’ অনিকেত মাথা নাড়ে৷ মানে না , নেগেটিভ৷ ‘লোকটা বলে৷ ঠিক আছে আমিই নিয়ে যাচ্ছি৷ বাট্টু সালসা তো?... বাট্টু মানে বোধ হয় পায়ু৷ তার মানেটা দাঁড়াচ্ছে … যে সব মানুষজন চলাফেরা করছে তাদের মধ্যে হোমো আছে৷ ’লিঙ্গান্তর -কামী আইভি বলে , ‘কিন্ত্ত জানো অনিকেতদা , আমি এইসব থিওরি মানি না৷ অস্বীকার করি৷ মাই নেম মে বি আইভি৷ আইভি একটা লতানো গাছ৷ কিন্ত্ত আমি লতা না , পুতুপুতু না৷ মেয়েদের শরীর পেয়েছি বটে কিন্ত্ত মনে মনে তোমাদের অনেকের চেয়ে বেশি পুরুষ৷ সেই রোমান পুরুষদের মতো , একহাতে শিল্ড৷ সেই শিল্ড আমার বুক ঢাকার জন্যে নয় , সোর্ড প্রোটেক্ট করার জন্য … সেই অভিশন্ত চেরা জায়গাটায় মাঝে মাঝে গাজর -টাজর প্লেস করে দেখি কেমন লাগে দেখতে … ফিল করতে পারছ ? কষ্টটা ?’স্বপ্নময় আমাদের হাত ধরে নিয়ে যান ট্রান্সজেন্ডারের ধূসর নীল ‘ঠেকে ’, যেখানে পরি আড্ডা মারে৷ ‘আগের ছেলেগুলোর সঙ্গে আরও দু’জন যুক্ত হয়েছে এখন৷ একজন জিনসের সঙ্গে টাইট গেঞ্জি পরেছে৷ ওর নাম অলোক৷ … খুব সেজেছে৷ দু’কানেই চকচকে আমেরিকান ডায়মন্ড৷ ঠোঁটে চকোলেট রঙের লিপস্টিক৷ বুকটা বেশ স্ফীত৷ … আর একজন এসেছে তার নাম ছিল রতন৷ সে নিজেকে রত্না বলে প্রকাশ করে৷ সে কুর্তি-পায়জামা পরেছে৷ একটা বেগুনি ওড়নাও আছে৷ বারবার ও ওড়না দিয়ে বুক ঢাকার অছিলা করছে৷ ’--- বন্ধুদের কাছে অহঙ্কারী অলোক বুকটা নাড়িয়ে বলে ‘দেখলে হবে ? খরচা আছে৷ কত দিনের সাধনা জানিস ? সেই কবে থেকে হরমোন নিচ্ছি বল , মুদির দোকানের মালা ডি নয়৷ রীতিমতো এন্ডোক্রিনোলজিস্ট দেখিয়ে৷ ’ নিমেষে কথার ভাঁজে শব্দের পরতে পরতে এই ছদ্ম অহঙ্কারের ভেতর ঘাপটি মেরে বসে থাকা তুমুল বিষাদ ফাঁস করে দেন স্বপ্নময়৷

গোপন সঙ্কেতবাহী বহু নাম ও শব্দ এই উপন্যাসে ছড়িয়ে থাকে৷ এরা মেইনস্ট্রিম বাঙালি বাবুবিবির কথ্য ভাষার সমান্তরাল একটা ভাষা , সমাজের অবতলের ব্যবহূত ‘কোড ’৷ এ ভাবেই আমরা জানতে পারি কাদের বলে ‘কোতি’, কারা ‘ময়না ’, কাকে বলে ‘ধুরানিগিরি ’ করা , কারা ‘লহরী -ধুরানি ’, কারা ‘পৌনে আটটা ’ আর কারাই বা ‘বাট্টুখোর ’৷ জানতে পারি ‘আইসক্রিম ’-ই বা কী আর ‘জেলুসিল ’-ই বা কী৷ কারা ‘ডাবলডেকার ’৷ হিজড়েদের ভাষায় ‘খিলুয়া চামানো ’ মানে মদ খাওয়া , ‘ফুল চামানো ’ মানে ফুল তোলা , ‘পারিক চামনাচ্ছে ’ মানে প্রেমিক জোগাড় করেছে৷

শুধু ত্বক স্পর্শ করার অভিজ্ঞতা নয় , বহু রাতের নিদ্রাহীন গবেষণার ফসল এই উপন্যাস৷ তথ্যে ঠাসা৷ আর এখানেই প্রশ্ন জাগে মাঝে মাঝে তথ্যের ভার এসে জব্বর পাথর হয়ে বসে যায় না তো ফিকশনের শরীরে ? তার শ্বাসরোধ করে দিতে চায় না তো? সামলে নেন স্বপ্নময়৷ আবার কাহিনির অন্ধকার আনন্দে চলে যান৷ সেখানে দুলালীর ‘ছিন্নি ’ হওয়ার দিন এসে যায়৷ দু’জন দুই থাই চেপে ধরে৷ ঠোঁটের ওপর লিউকোপ্লাস্ট আটকে দেন ডাক্তার৷ ছুরিটাকে কপালে ঠেকান৷ দুলালী চোখ বুজে স্থির৷ ‘ঘোড়ুই ডাক্তার কালো শক্ত সুতো দিয়ে অণ্ডকোষটি বেঁধে ফেলেন৷ বাঁ-হাতে দুলালীর রোগা শালিখের ঠ্যাং -এর মতো লিকলিকে লিঙ্গটির শিরোদেশ দু’আঙুলে টেনে ধরেন যতটা সম্ভব৷ … এবার লিঙ্গর গোড়ায় (ছুরি ) বসিয়ে টেনে দেন৷ … গলগল রক্ত ঝরে৷ গুরুমা একটা নতুন মালসা তলায় ধরে৷ মালসায় পড়তে থাকা রক্তস্রোতে উলুধ্বনি মেলে৷ … ঘোড়ুই ডাক্তার টেনে ধরেন অণ্ডকোষ৷ ছুরিটা ধরেন শক্ত করে৷ প্রথম ইন্সারসানে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয় না৷ দু’বার৷ … এবার মালসায় পড়ে অণ্ডস্থলী৷ বিচ্ছিন্ন শিশ্নটি তখনও সামান্য কাঁপছে৷ … নির্বাণ হল দুলালীর৷ ’স্বপ্নময় আঙুলে আঙুল জড়িয়ে আমাদের দেখিয়ে দেন ‘জিগোলোদের ’ মুখর জগত্৷ তাদের বলা হয় ‘মডার্ন ময়না ’৷

নিয়ে যান ‘গে ’-দের ডেরায়৷ বলেন ‘গে ’ তিনপ্রকার --- ‘টপ’, ‘বটম ’ আর ‘ভার্সেটাইল’৷

পরম মমতায় তিনি সমাজের শরীরের খানাখন্দ চেনান৷ লেখার ভেতর ইতিহাস , ভূগোল , সমাজতত্ত্ব , বিজ্ঞান , মিথ , অপমান , হাসি , অভিমান আশ্লেষ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়৷ একটি বিবাহদৃশ্য দিয়ে কাহিনি শেষ হয়৷ ঢ্যাঁড়াচিহ্নের মতো জেগে থাকে একটাই প্রশ্ন, জন আপডাইকের ভাষা ধার করে একটু অন্য প্রেক্ষিতে বলতে হয় , ‘হু মেড ইয়েলো রোজেস ইয়েলো ?’রাজনীতি আর আইনের অন্ধকার মারপ্যাঁচের বাইরে স্বপ্নময় চক্রবর্তী তাঁর এই প্রায় -এপিক আখ্যানে বড়ো যত্নে ও মায়ায় ফুটিয়ে তোলেন এইসব প্রান্তিক মানুষদের সঙ্কটসঙ্কুল যাপনকাহিনি , তাঁদের অনুভূতি, হাসি অপমান৷

সমকামী -উভকামী -রূপান্তরকামীদের আইনি ও সামাজিক স্বীকৃতির লড়াই আজ বিশ্বজুড়ে৷ এ দেশেও৷ সেই প্রেক্ষিতেই একটি উপন্যাস৷ লেখক স্বপ্নময় চক্রবর্তী৷  সুদীপ বসু
হলদে গোলাপ স্বপ্নময় চক্রবর্তী৷ দে’জ পাবলিশিং৷ ৫০০ টাকা৷

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন