রবিবার, ২৯ মে, ২০১৬

রিজিয়া রহমানের গল্প : ইজ্জত

আকাশের রংটা কেমন অদ্ভুত কালচে। সাদা মেঘে ভরা সিসে রঙের আকাশ। হু হু উথাল-পাতাল হাওয়া। দূরে হাওয়ার ঝাপটার সঙ্গে যুদ্ধরত তালগাছের মাথায় একটা চিল। সিসে রঙের নিষ্ঠুর ঘোলাটে আকাশ। একটানা দমকা বাতাসের দাপটের সঙ্গে তালপাতার শোঁ-শোঁ গোঙানি। সেই সঙ্গে থেকে থেকে চিলটার অসহায় চিৎকার। হালিমনের ভয় করছিল। রাগ হচ্ছিল। ইচ্ছে হচ্ছিল তালগাছের ঝুঁটি চেপে ওই কান্নার মতো শব্দটাকে থামিয়ে দিতে। ইচ্ছে করছিল ধারালো দায়ের কোপে ওই হিংসুটে ঘোলাটে মেঘলা পরদা ছিঁড়ে নীল উজ্জ্বল দিনকে ছিনিয়ে আনতে।
সে নয় আকাশের বেঈমানীর শাস্তি হলো! কিন্তু, নিচে? হু হু করে বাড়ছে গাঙের পানি। বিল-চক পানিতে একাকার। রাঙা রাঙা ঘোলা রাক্ষুসে পানির তোড় বিরাট হাঁ নিয়ে গ্রাস করছে। সব ধান-পান তলিয়ে গেছে। ঘরের ভিটি ধুয়ে যাচ্ছে পানিতে। খুঁটি টলমল। কখন যেন হোগলাপাতা ছাওয়া ঘরটা হুমড়ি খেয়ে পড়ে। তবু পানি বাড়ছে আর বাড়ছে। কেবল বেড়ে ওঠা পানির হিংস্র কলবল খলবল। ছেঁড়া কাপড়ের কানি গায়ে জড়িয়ে হালিমন শিরশির করে কাঁপছে। শীত করছে তার। থেকে থেকে ঝিরঝিরে বৃষ্টির ঝাপটায় হয়তো শীত করছে। ঘরের দাওয়ার কোণায় মাটির চুলোয় টগবগ করে পানি উঠছে। এক পাশের ঝিক গলে পড়েছে পচা ঘায়ের মাংসের মতো। হালিমনের ভাত খাবার সানকিটা ঘরের পৈঠার কাছে এক হাঁটু বানের পানিতে ঘুরে ঘুরে ভাসছে। ভাসমান শূন্য সানকিটার দিকে তাকিয়ে হালিমনের শীতে ধরা শরীরটা কেমন করে উঠল যেন। পেটের মধ্যে অবুঝ মোচড়। সন্তান প্রসবের অবধারিত বেদনার মতো নিশ্চিত ক্ষুধার তাগিদ। ক্ষুধা! যাকে চোখ রাঙিয়ে ভয় দেখিয়ে বুঝিয়ে শান্ত করা যায় না। সেই অবুঝ বোধটা নিয়ে একা অসহায় উনিশ বছরের হালিমন কী করবে বুঝে পেল না। ঘোলাটে পানি আর সিসে রঙের আকাশের চেহারা ভুলে হালিমন ভাবল সানকি ভরা ঝরঝরে ফুরফুরে রৌদ্রোজ্জ্বল এক সানকি ভাতের কথা। সুন্দর সাদা রঙের ভাত। সোনা রঙের ডাল। আর কি? না, আর কিছু না। এক থালা ভাত আর ডাল, এর চাইতে বেশি বড় কিছু বুঝি এই মুহূর্তে হালিমনের স্বপ্নে আসতে পারে না। হালিমন ক্ষুধার্ত। একটানা চার দিন না খাওয়া। ভেসে যাওয়া খাল-বিল, ডুবে যাওয়া সুপুষ্ট ধানের চারা, ধ্বসে যাওয়া ঘরের ভিটি আর তলিয়ে যাওয়া বাগানের ধারে পড়ো পড়ো কুঁড়েতে উপবাসী নিঃসহায় হালিমনও বুঝি তলিয়ে যাবার আগে একটা তীব্র চেতনার উপলব্ধি নিয়ে নিজের অস্তিত্বকে ভুলতে পারে না। তা হলো পেটের অবুঝ তাগিদ। ভাত চাই, এক থালা ভাত। সেই হালিমন, মিলিটারির হামলায় যার বাপ-মা ভাই-বোন সব মরেছে। কেমন একরকম পাউডার ছিটিয়ে তাদের দো-চালা টিনের ঘরে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল সেই লাল হায়েনারা। সতের বছরের হালিমনকে মারেনি। সুপুষ্ট ডাগর-ডোগর হালিমনকে মেরে তারা ডেকেছিল—ইধার আ না ছোকরী। তু সে তো যেয়াদা ফায়দা উঠানা পড়েগা পহেলে। তাদের মুখের ভাষা বোঝেনি হালিমন। কিন্তু বুঝেছিল চোখের ভাষা। ঠোঁটের হাসি। তাতেই বুঝেছিল তার ইজ্জত বিপন্ন। গুলির আঘাতে লুটিয়ে না পড়ে, মরিয়া হয়ে আগুনে ঝাঁপ দিয়েছিল হালিমন।
এমন শিকার হাতছাড়া হবার আক্ষেপের চেয়ে এমন ভয়াবহ কাণ্ড দেখে তাজ্জব হয়ে গিয়েছিল নেশাসক্ত হামলাদাররা। তারপর ঘোর কাটিয়ে আগুনের ওপর কিছু গুলি খরচ করে চলে গিয়েছিল অন্য হানায়। আশ্চর্য! সে গুলি হালিমনের গায়ে লাগেনি। তার চেয়েও আশ্চর্য, আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়া হালিমন মরেনি।
বর্বর নিষ্ঠুর অত্যাচারে বিক্ষত জ্বলাপোড়া গাঁটা যেমন ধুঁকছিল, তেমনি শরীরের নিম্নাঙ্গে ঝলসে যাওয়া ক্ষত নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে ছিল হালিমন।
ইজ্জত বাঁচাবার জন্য যে মেয়ে আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়ে, সে মেয়ে অবশ্যই সহানুভূতি ও সম্ভ্রমের পাত্রী। অন্তত সেই নৃশংস শত্রু কবলিত দিনে। গ্রামের লোকেই হালিমনকে সেবা-শুশ্রূষা ওষুধ-পত্তর করে সুস্থ করে তুলেছিল। তারপর স্বাধীনতার পরে রিলিফের লোকেরা এসে তাকে গোলপাতা দরমা দিয়ে ঘরও তুলে দিয়েছিল। আত্মীয়-পরিজন হারানো হালিমনের ছবি তুলে নিয়ে গিয়েছিল শহরের খবরের কাগজের লোকেরা। কিন্তু তারপর? তারপর আর কি! দুপা পোড়া মেয়ে দরমার ঘরে থেকে লোকের বাড়ি কাজকর্ম করে। নিজের খাওয়াটা চালিয়ে নেবার জন্য কোনো লোক কিন্তু এগিয়ে এলো না। আড়ালে-আবডালে সন্দেহের ফিসফাস, ‘ও মেয়েকে মিলিটারি ছুঁয়েছে। আগুনে ঝাঁপ দিয়ে মরতে গিয়েছিল তাই।’ হালিমন সে ফিসফাসে অবিচলিত। মনে মনে গর্বই করত। নাই বা হলো তার ঘর, নাই বা জুটল স্বামী। কিন্তু সে তো ইজ্জত খোয়ায়নি। এ কথা সত্যি, পা পুড়ে একটা পা খাটো হয়ে তার চলার ছন্দে হয়তো বিকৃতি এসেছে, কিন্তু বিকৃতি আসেনি মনে, জীবনে। সে গতর খেটে পেটের ভাত রোজগার করে, গতর বেঁচে নয়—এ অহংকারী মূলধন ক’টা সহায় সম্বলহীন মেয়ের আছে? এর জন্য হালিমন নিজেকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্ভ্রমসম্পন্না মহিলা ভাবতেও কুণ্ঠিত নয়।
সেই তো সেবার কার্তিক মাসে, রিলিফের ঠকেদারির কাজ করা সেই লোকটা, যে নাকি এখন বাজারখোলার বড় আড়তদার, তাকে কেমন দাবড়ানি দিয়েছিল হালিমন। পোড়াকপালে বাহাত্তুরে মিনসে। ঘরে ঝি-বউ আছে। অথচ মাঝরাতে এসে টোকা দিয়েছিল হালিমনের ঘরের ঝাঁপে। কুয়াশামাখা জ্যোৎস্নায় বেড়ার ফুটো দিয়ে লোকটাকে দেখে নিয়েছিল হালিমন। সেই জালেম খুনি লোকগুলোর মতো শিকারলোভী নেকড়ে চেহারা নয়, যেন একটা মুরগি চোর শেয়ালের মতো রাত দুপুরে জিভের লালা ঝরাচ্ছে। ঘরের কোণা থেকে বড় আঁশবঁটিটা তুলে এক ঝটকায় ঝাঁপ খুলে ফেলেছিল হালিমন—কই গেলি ছিনালীর পুত! আয়। এক্কই কোপে তর কল্লাডা নামাইয়া থুই। আয় হারামি। জন্মের সাধ মিটাইয়া দেই। ঝকঝকে ধারালো বঁটি হাতে আঁচল লুটোন হালিমনের ভয়ংকর চেহারা দেখে লোকটা ক্রমে পিছু হাঁটতে হাঁটতে পালাবার পথ খুঁজছিল। যেন রাগী কুকুরের তাড়া খেয়ে লেজ গুটানো পলায়নপর শেয়ালের মতো দিশেহারা হয়ে গেছে। হি হি করে তীব্র হাসি হেসে উঠেছিল হালিমন। সেই প্রচণ্ড দুঃসাহসিক হাসির ঝাপটায় ঘরের পেছনের গাবগাছ থেকে ডানা ঝটপটিয়ে দুটো বাদুড় উড়ে গিয়েছিল। শিউরে উঠেছিল শীতাচ্ছন্ন মধ্যরাতের নিস্তব্ধতা।
লোকটা পালিয়েছিল। ঝাঁপ বন্ধ করতে করতে হালিমন হাসছিল আর বলছিল—অহন পলাছ ক্যান! পলাছ ক্যান রে কুত্তার বাচ্চা? হালিমনের ধারে আবার আইলে এহাবারে কল্লা থুইয়া যাবি কইলাম।
এর পর থেকে মাথার কাছে বঁটিটা নিয়েই ঘুমোত সে। কথাটা অবশ্য খুব একটা চাপা থাকেনি। গাঁয়ের লোক শুনে বলেছে—উরে, মা রে, ওইডা মাইয়া মানুষ নি। জ্বীন। হালিমন ঠোঁটে মোচড় দিয়ে হেসেছে। ভেবেছে এতে তার সম্ভ্রম বেড়েছে বই কমেনি।
পেটের মধ্যে আবার তীব্র মোচড়। ঘরের পেছনে আসমত মোল্লার মরিচ পালানের দিক থেকে কেমন একটা ছপছপ শব্দ আসছে। হালিমন উৎকর্ণ হলো। বোধ হয় আসমতের বিধবা মেয়েটা কোমরপানিতে তলিয়ে যাওয়া পালানের কানাচে কচুর লতি খুঁজছে। হালিমন নিজেও তো ক’দিন পালানের কচুর লতি আর আতাপাতা শাক সেদ্ধ করে কোনো রকমে ক্ষুধা নিবৃত্তি করেছে। গম কোটা ছাতু পানিতে গুলে খেয়েছে। এখন একদানা খুদ কি একমুঠো গমও সারা ঘরটার কোথাও অবশিষ্ট নেই। শূন্য ছাতাধরা হাঁড়ি কলসিগুলোতে রাজ্যের পিঁপড়ে আরশোলা কুনো ব্যাঙ আশ্রয় নিয়েছে। চাইবেই বা কার কাছে। বানে ডুবে যাওয়া ক্ষুধার্ত গ্রামটার সবার ঘরেই খুদকুঁড়ো বাড়ন্ত। শাকপাতা সেদ্ধ করে খাবার শুকনো জ্বালানিই বা কই?
ছপ ছপ শব্দটা ক্রমে এগিয়ে এলো হালিমনের ঘরের পাশে। বসে বসেই গলা উচাল হালিমন। গরুর জাব খাওয়া চাড়িতে বসে দুহাতে পানি কেটে এগিয়ে আসছে আসমত মোল্লার বার বছরের ছেলে রমিজ। চাড়ি বেয়ে হালিমনের ঘরের দাওয়ায় এসে নামল রমিজ। এক হাতে চাড়িটা ধরে রেখে আর এক হাতে হালিমনের ঘরের বেড়া ধরল। সঙ্গে সঙ্গে পানিতে ডুবে থাকা দুর্বল ভেজা ভিটির বেড়া দুলে উঠল। বেড়া ছেড়ে পা ফসকে ঝপ করে পানিতে পড়ল রমিজ। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে ছেঁড়া গামছা কোমরে জড়ানো রমিজ হেসে উঠল—খাইছে রে বুয়া। তর ঘর তো অহনই পড়ব। আমাগো পুবের ভিটির ঘর তো আইজ বিহানেই মুখঠাসা দিয়ে পড়ছে। বড় ঘরডারে আমি আর বাবায় সুপারি গাছ কাইটা ঠ্যাকনা দিছি। তুই আমাগো বাড়িতে লরে বুয়া।
বৃষ্টির ঝাপটা মারা ভেজা বাতাসে হালিমনের শীতবোধ আরো বাড়ল। বানের পানির মতো ঘোলা ঘোলা দৃষ্টিতে তাকিয়ে নিরাসক্ত জবাব দিল হালিমন—কই আর যামু! সবতেরই তো এক অবস্থা।
একটু থেমে আবার বলল—পানি কি কিছু টানছে না কি রে রমিজ?
চাড়িটা হাতে ধরে রেখে রমিজ মুখ বাঁকাল—এত জলদিই! মিলিটারি খাইয়া থুইয়া গ্যাছে আধখান। বাকি খাইল অভাবে। এইবার আজরাইল হইয়া আইছে বইন্যা। ধান-পান খাইছে অহন বাকিখান খাইয়া ঘর-দুয়ার তলাইয়া তয় না পানি নামব। হালিমন নিরুত্তর। নির্বাক দৃষ্টি বিপর্যস্ত তালগাছের ডালে। রমিজ বলল—তর লিগ্যা একটা জিনিস আনছি। খাবি?
হালিমন সচকিত হয়ে দৃষ্টি ফেরাল—কী? কী রে রমিজ্যা? চাচি বুঝি আমার লিগ্যা ভাত পাঠাইছে?
রমিজের ভেজা চুল বেয়ে টপ টপ করে পানি ঝরছে। গড়িয়ে পড়ছে বৃষ্টিতে কালচে হওয়া নীল ঠোঁটের ওপর দিয়ে। মুখের পানি মুছে রমিজ শুকনো হাসল—ভাত পাঠাইব কই থন? খুদের জাউ খাইছি পরশুগা বিহানে। দুই দিন তো হাবিজাবি দিয়া প্যাট ঠাণ্ডা করত্যাছি। আইজ বড় বুজি গেছিল বরইতলে শাক টোকাইবার। দ্যাহে এই মোডা এক সাপ বরই গাছের ডালে প্যাঁচ দিয়ে ঝুলতে আছে।
হঠাৎ কথা থামিয়ে ফেলল রমিজ। চাড়ির ভেতরে হাত দিয়ে এক মুঠো ভাজা কাঁঠালদানা তুলে আনল। হালিমনের দিকে বাড়িয়ে ধরে হাসল—নে বুয়া, খা। মায় কাইল রাইঙের চুলায় যহীর আগুনে ভাজছিল। আমি কয়ডা সামলাইয়া আনছি তর লিগ্যা, তুইও তো কয় দিন উপাস রইছস বুয়া।
হালিমনের চোখের দৃষ্টি ঝকঝকে হলো। প্রায় খামছে লুফে নিল দানা কটা রমিজের হাত থেকে। খোসা ছাড়িয়ে একবারে মুখে দিয়ে ফেলল। কাঁঠালদানা কটা খাওয়া হতে যেন আগুনে ঘি পড়ল। ক্ষুধার মোচড় একশ ছুরির ফলা হয়ে পেটে ঘাই মারতে লাগল। দুহাতে পেট চেপে ধরে বাঁকিয়ে ছোট হয়ে গেল হালিমন। মুখ দিয়ে গোঙানির শব্দ করে উঠল!
—উঃ রে। আর যে পারি না আল্লাহ। রমিজ ঘাবড়ে গেল। ওপরে উঠে এলো। দুহাতে হালিমনের বাঁকানো শরীরটা নাড়া দিয়ে বলল—ও বুয়া, কী হইল? এমুন ক্যান করতে আছস?
গোঙানির টানেই জবাব দিল হালিমন—খিদা, খিদা রে। পরানডা যে আর বাঁচে না। রমিজ্যা আমারে দুগা ভাত দে।
রমিজের মুখটা ম্লান হয়ে গেল। একটু ভেবে বলল—তুই সবুর কর বুয়া। আমি আইতের কালে দেখছি মরিচ পালানের পাশে ওই ধানের নালার পানিতে এক জোড়া নাইরল ভাসত্যাছে। আনিগা।
হালিমন সোজা হয়ে উঠে বসল। বলল—তুই একলা যাইস না, কোহানে আবার হাপ-খোপ বাইজ্যা রইছে। ল’ আমিও যাই লগে। উঠে দাঁড়ালো হালিমন। চাড়িটা ঘরের দাওয়ায় ঠেলে তুলে হাঁটু উপচানো পানি ভেঙে দু’জনে মরিচ পালানের দিকে চলল। আকাশের রং আরো হিংস্র হয়ে উঠেছে। এই আকাশ কোনোদিন নীল ছিল। এই আকাশে উজ্জ্বল সূর্য ছিল, তা বুঝি ভাবাও যায় না। তীক্ষ্ণ ফলার বৃষ্টির ঝাঁক নিয়ে বাতাস আরো জোরালো হয়েছে।
কোমর-ডুবান পানিতে এসে দুজনেই থমকে গেল। কোথায় নারকেল। কিছুই নেই। কেবল হু হু করে পানির তোড় নামছে। ভেসে চলছে পচা পাতা, খড়কুটো। রমিজ হতাশ চোখে চারদিকে তাকিয়ে দুর্বল গলায় বলল—এইহানেই তো দেইখ্যা গেছি। কই গেল!
হালিমন রেগে উঠল—দেখছিলি তো তহন ধরলি না ক্যান? এতক্ষণ কি আর থাকে। কই গ্যাছে গা ভাইস্যা।
রমিজ হঠাৎ চিৎকার করে উঠল—দ্যাখ বুয়া, চাইয়া দ্যাখ, নালা দিয়া কাগো পাতিলা ভাইস্যা যায়। তুই খাড়া। আমি সাঁতরাইয়া যাইয়া ধরি।
বুকপানি ঠেলে রমিজ নালার দিকে এগিয়ে গেল। হালিমনও দেখল। লাল রঙের একটা মাটির হাঁড়ি ভেসে চলেছে। বেশ বড়। কি আছে ওর মধ্যে! বিদ্যুৎ ঝলকের মতো অনেক আশার আশ্বাস ঝিলিক দিল মনে; টাকা, সোনা-দানা, অথবা চাল-ডাল বা গম? অর্ধেকটা এগিয়ে সাঁতরে গিয়ে রমিজ আবার ভয় পাওয়া চিৎকার দিল—বুয়া রে। সাপ।
কল্পনার সুখ পিছলে গেল। হালিমন ভয় পাওয়া হতাশায় প্রশ্ন করল—কই রে। কোহানে সাপ?
গলাপানি থেকে মুখ ফিরিয়ে রমিজ হাত তুলে দেখল—ওই যে পাতিলডার লগে লগে সাঁতরাইয়া যাইতে আছে।
হালিমনও দেখল। সত্যিই সাপ। মাথার কিছুটা অংশ ওপরে তুলে বিরাট এক সাপ নালার স্রোতে শরীর টান করে হাঁড়ির পাশে পাশে ভেসে চলেছে। যেন হাঁড়িটাকে পাহারা দিয়ে নিয়ে চলেছে। নিরুপায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল হালিমন। ঢোঁড়া নয়। মাথায় চক্র। সম্ভবত বিষাক্ত সাপ, হাঁড়িটা ধরতে গেলেই সাপের শরীরে হাত পড়বে। দুজনের নির্বাক নিরুপায় দৃষ্টির সামনে দিয়ে একটা সম্ভাবনাময় হাঁড়ি ভেসে চলেছে। ক্রমেই দূরে চলে যাচ্ছে। এতক্ষণ পানিতে ভিজে শরীর অসাড় হয়ে আসছে। পেটে ক্ষুধার মোচড়ের অবসন্নতা। হালিমনের মনে হলো, সে বুঝি এখন পানির নিচে তলিয়ে যাবে। সেই বোধটাই তাকে মরিয়া করে তুলল। হঠাৎ করে দুঃসাহসিক কাজ করে বসল হালিমন। সাঁতার কেটে এগিয়ে যাওয়া সাপটার লেজের দিকে লক্ষ করে নালায় ঝাঁপ দিল। সাপের ওপর দিয়ে হাত বাড়িয়ে হাঁড়িটা ধরে ফেলল। তারপর এক হাতে হাঁড়ি ধরে সাঁতরে চলে এল কম পানির দিকে। রমিজ স্তম্ভিত। হালিমন হাসছে। এখন সে প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী, সাহসী। হয়তো সে শুনেছিল বিপদের সময় সাপ মানুষকে কাটে না। অথবা চার-পাঁচ দিন অভুক্ত মানুষের চোখের সামনে দিয়ে খাদ্য-সম্ভাবনাপূর্ণ একটি পাত্র ভেসে চলে যাওয়া অসহনীয় বলেই হালিমন এমন ঝুঁকি নিয়েছে। হালিমন এখন এসব কিছুই ভাবছে না। পেটের ক্ষুধার মোচড়টা দাউদাউ আগুন হয়ে গেছে। পাতিলটা পালানের কানাচে এনে তার মুখের ঢাকনা সরাল হালিমন। আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল—রমিজ্যা রে, জলদি আইয়া দ্যাখ, কী ধরছি আমি!
পানি ঠেলে এগিয়ে এলো রমিজ—কী রে বুয়া! কী? ট্যাকা?
—না রে। চিঁড়া। এক পাতিল চিঁড়া।
—দেহি। দেহি। রমিজ ঝুঁকে পড়ল হাঁড়িটার ওপরে।
রমিজের খুশিভরা উৎসুক মুখে তাকিয়ে দৃষ্টি বদলে গেল হালিমনের। রমিজের সামনে থেকে হাঁড়িটা টেনে নিয়ে দুহাতে প্রাণপণে আঁকড়ে ধরল। আর এই মুহূর্তে চিঁড়েগুলোই তার একমাত্র অবলম্বন মনে হলো। বুকে হাঁড়ি আঁকড়ে বিরূপ দৃষ্টিতে রমিজকে দেখল হালিমন। না। এ চিঁড়ের ভাগ সে কাউকে দেবে না। এতগুলো চিঁড়ে খেয়েও কম করে পনের-বিশ দিন তার একার চলে যাবে। তত দিনে নিশ্চয়ই মেঘ কাটবে। রোদ উঠবে। বানের পানি টান ধরবে। হালিমন আবার কাজ পাবে। তার দুঃসময় কেটে যাবে।
হালিমন শক্ত ঠাণ্ডা গলায় কথা বলল—না, দেহামু না তরে।
রমিজ অবাক হলো—কেন রে বুয়া?
—না।
হালিমনের বিরূপ উতলা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রমিজ রেগে উঠল—দে বুয়া। পাতিলডা দে। দুইজনেই খাই।
হালিমন দু হাতে শক্ত করে চিঁড়ের হাঁড়ি ধরে বিশ্রী চিৎকার করে উঠল—দিমু না আমি। কিছুতেই দিমু না।
ক্লান্ত ক্ষুধার্ত রমিজ এক মুহূর্তে বোকা হয়ে গেল। তার পরই ঝাঁপিয়ে পড়ল হালিমনের ওপর।
ক্যান দিবি না! দিবি না ক্যান? কে আগে দেখছে পাতিল!
হালিমন অনড়, অচল। চিঁড়ার হাঁড়ি প্রাণপণে আঁকড়ে আছে বুকে। এলোপাতাড়ি কিলচড় মারছে রমিজ পানিতে আলোড়ন তুলে। চিৎকার করছে—চিঁড়া দে আমারে। চিঁড়া দে। আমি কিছু খাই নাই। আমার প্যাটে ভুখ।
রমিজের চিৎকার কান্না হয়ে গেল। এক হাতে চিঁড়ের হাঁড়ি ধরে আর এক হাতে রমিজের মাথার চুল খামছে ধরল হালিমন। শক্ত হাতে মাথাটা পানির তলায় ঠেসে ধরল। রমিজ দাপাচ্ছে। তবু মাথাটা ছাড়ল না হালিমন। এক হাঁড়ি চিঁড়ার অধিকার সে কিছুতেই ছাড়বে না।
এটাই হালিমনের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। পানির তলায় ধস্তাধস্তি করছে রমিজ। কয়েকবার টলে পড়ে যেতে যেতে নিজে সামলে নিল হালিমন। কিন্তু রমিজের মাথা থেকে হাত আলগা করল না। হঠাৎ হালিমনের তলপেটে একটা লাথি মারল রমিজ। তার পায়ের ধাক্কায় হালিমনের ছেঁড়া শাড়িটা খসে গেল কোমর থেকে। ভেসে গেল বানের পানিতে। এখন হাত বাড়ালে ধরা যায়। কিন্তু এক হাতে চিঁড়ের হাঁড়ি। আরেক হাতে বন্দি প্রতিপক্ষ। ধস্তাধস্তি হুড়োহুড়িতে শরীরটা আর দাঁড়াচ্ছে না। কী করবে হালিমন। চেষ্টা করল মুখ বাড়িয়ে দাঁতে কামড়ে শাড়িটা ধরতে, তখনি রমিজ আরেকটা ঘাই মারল। মুখটা চুবানি খেল পানিতে। মুখ তুলে হালিমন দেখল, শাড়িটা ভেসে চলে যাচ্ছে নাগালের বাইরে। হাত বাড়িয়ে ধরা ছাড়া উপায় নেই। অবসন্ন শরীরটাও যেন ক্রমশ তলিয়ে যাচ্ছে। শাড়ি আর চিঁড়ের হাঁড়ি দুটো একসঙ্গে বাঁচাতে গিয়ে বোধ হয় হালিমন বুঝল, এভাবে তলিয়ে যেতে যেতে দুটোকে একসঙ্গে বাঁচানো আর সম্ভব নয়। আপাতত মনে হচ্ছে শাড়ির চেয়ে খাদ্যের হাঁড়িটাই তার জীবনের সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত মূল্যবান দ্রব্য। কিন্তু শাড়ি? সারা বছরের রোজগার দিয়ে পেটের ভাত মিটিয়ে এই আক্রার দিনে সে একটা আব্রু রক্ষাকারী আচ্ছাদন কিনতে পারবে না। গায়ের পিরান নেই অনেক দিন। ছিল শুধু ছেঁড়া একটাই শাড়ি। এখন কোনটা রক্ষা করবে হালিমা। শরীরটা টলে উঠল। চিঁড়ার হাঁড়ি ধরা মুঠিও আলগা হয়ে গেল। আর কী যেন কেন এই ক্ষণিক অন্যমনস্কতায় হালিমন ধীরে ধীরে হাত আলগা করে রমিজের মাথাটা ছেড়ে দিল। নাকে-মুখে পানি আটকানো দম বন্ধ হয়ে আসা রমিজ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে লাগল। চিঁড়ার হাঁড়ি তখন তলিয়ে গেছে। রমিজ বড় বড় দম টেনে বলল—কী করলি তুই!
চিঁড়াগুলান ভাসাইয়া দিলি!
হালিমন নিরুত্তর। নিরাবরণ দেহ আর পেটের ক্ষুধা ছাড়া যেন কোনো কিছুরই উপলব্ধি নেই তার চেতনায়।
রমিজ ধমকে উঠল—কথা কস না ক্যান?
হালিমন ক্লান্ত পরাজিত উত্তর দিল—আমার একখানা ছিঁড়্যা কানি। তাও ভাসাইয়া দিলি! অহন ইজ্জত বাঁচামু ক্যামনে?
রমিজ খিঁচিয়ে উঠল—কিসের ইজ্জত! একবার মিলিটারির ডরে আগুনে ফাল দিছিলি! তহন বুঝি পেটে ভাত আছিল। তাই ইজ্জতের দাম আছিল। প্যাটের ভোকে বাঁচে না, তার আবার ইজ্জত। গলায় ফাঁস নিবার পারস না মাগি!
হালিমন জবাব দিল না। অসহায় চোখে তাকিয়ে দেখল তার শরীর আবরণী শতছিন্ন ন্যাকড়ার টুকরোটা বানের পানি ভাসিয়ে নিয়ে গেছে অনেক দূরে। ক্ষুধার্ত শরীর সাঁতরে সেটা ধরা আর সম্ভব নয়। সে কি এখন ডুবে মরবে? কিন্তু অভুক্ত শরীরে মনের সে জোর কোথায়? বরং শূন্য জঠরে যে বাঁচারই আকুলিবিকুলি। হালিমন ঘুরে দাঁড়াল। পানি ঠেলে, নালা সাঁতরে ওপারে কাচার উপরে গিয়ে উঠল হালিমন। সম্পূর্ণ নিরাবরণ দেহ। ক্লান্ত সিক্ত শরীর। এক বুক পানিতে দাঁড়িয়ে ঠক ঠক করে কাঁপতে কাঁপতে রমিজ চেঁচিয়ে উঠল—কই যাস। এই পানি-ডুবা দুনিয়ায় জ্বইলা মরবার আগুন পাবি কই?
নিজের পরার ছেঁড়া গামছাটা ছুড়ে দিল রমিজ।
—এই নে আমার গামছা ছিঁড়াডা। পিন্দা যাইয়া ফাঁসি দিয়া মর।
হালিমন এক পলক দাঁড়াল। না, গামছায় তার আর দরকার নেই। এই বারে পানি তার একমাত্র শেষ বস্ত্রখণ্ড নয়, বুঝি ভাসিয়ে নিয়ে গেছে তার ইজ্জত। এখন আছে শুধু ক্ষুধা। এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় কথা হলো, তার পেটের জ্বালার নিবৃত্তি চাই। কাচার শেষ মাথায় সেই ঠিকাদারের বাড়ি। সেখানে আছে কাঠের পাটাতন করা মজবুত ঘর আর মজবুত করা চালের ভাতের আশ্বাস।
হালিমন বলল—তুই বাড়িত যা গিয়া রমিজ। আমি সমসের ঠিকাদারের বাড়ি যাই। বাজারে ঘর নিমু।
রমিজ বজ্রাঘাতের মতো তাকিয়ে রইল। সহসা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। কাঁদতে কাঁদতে বলল—ছিনাল।


1 টি মন্তব্য:

  1. জানোয়ার উলঙ্গই থাকে। তার যৌন সংগীর বিচার থাকে না।
    কিন্তু যৌনতার বিনিময়ে আহার্য সংগ্রহ করে না।

    উত্তরমুছুন