রবিবার, ২৯ মে, ২০১৬

জ্যাক দেরিদার নেতি এবং ইতি*

কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়

সমাজে বাস্তব পরিবর্তন যখন দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে, ধারণার জগৎ তখন অধিকতর গুরুত্ব পায়, মনোযোগ পায়। সাম্প্রতিক পৃথিবীতে নানা তত্ত্ব এবং বাচনের (discourse) উদ্ভবকে এভাবে ব্যাখ্যা করা চলে। এসবের মধ্যে পরিবর্তনের পথ খোঁজার প্রয়াসমতো দেখা যায়। এই সুযোগে কোনো-কোনো তত্ত্ব আবার উদ্ভূত সাময়িক পরিবর্তনহীনতা-গতিহীনতাকেই সত্য এবং সঙ্গত বলতে চায়। কিন্তু, এগুলোর প্রবক্তারা শেষ বিচারে কায়েমি স্বার্থের পক্ষভুক্ত এবং সেজন্যই পরিবর্তনের পরিচালক যে জ্ঞান, তাকে তারা অসম্পূর্ণ, ত্রুটিপূর্ণ, এমনকি তা অর্জন অসম্ভব বলার প্রয়াস পান। বিভিন্ন যুগসন্ধিক্ষণে কমবেশি এই একই ব্যাপার দেখা গেছে।

এসব তত্ত্বের ফলে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মানুসরণের মতো একটি নিষ্ক্রিয়তা, অসহায়ত্ব এবং ব্যর্থতার পরিবেশই তৈরি হয়। এগুলোর গভীরতর নিয়ামক হিসেবে সামাজিক, আর্থ-রাজনৈতিক ইত্যাদি পরিস্থিতি যেমন থাকে, ব্যক্তি বুদ্ধিজীবীর সচেতন অবস্থান এবং প্রতিক্রিয়াশীল মতাদর্শও তেমনি সত্য। তত্ত্ব, যুক্তি, ইত্যাদি নিয়ে বাগবিস্তার, লেখালেখি, প্রচার-প্রচারণার ধূম্রজাল পেরিয়ে বর্তমান যুগের বাচন বা থিওরিগুলো সম্পর্কে এসব স্পষ্টতর-গভীরতর সত্যে পৌঁছানো অবশ্য কঠিন।

সম্প্রতি ফরাসি দার্শনিক জ্যাক দেরিদার প্রয়াণলাভের খবর এসেছে। একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী তত্ত্বকার হিসেবে তাঁর এবং তাঁর তত্ত্ব ডিকনস্ট্রাকশন বা অবিনির্মাণের নামের সঙ্গে আমরা অনেকেই পরিচিত। মৃত্যুর এই উপযোগী উপলক্ষে আমরা প্রথমে তাঁর ব্যক্তিজীবনের দিকে খানিকটা তাকাতে পারি।

১৯৩০ সালে জ্যাক দেরিদা আলজেরিয়ার এক ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। লক্ষ্য করা দরকার যে, খানিক বৈষম্যের পরিবেশেই তিনি জন্ম নিয়েছিলেন। শুধু ইহুদি হওয়ার কারণে দু’দুটো স্কুল থেকে হয় তাঁকে চলে আসতে হয় কিংবা বের করে দেয়া হয় তাঁকে। এর মধ্যে একটি স্কুলে ছিল ইহুদি জনসংখ্যা থেকে ৭% ভর্তি করার সীমারেখা; অপরটিতে সেমেটিজম-বিরোধিতা। বলা হয়েছে যে, এ ঘটনা দু’টোর অন্য বড় কোনো প্রভাব-না পড়লেও, দেরিদার মধ্যে প্রান্তবর্তী ব্যক্তি বা বস্তুর মূল্যের ওপর জোর দেয়ার ব্যাপারটির সঙ্গে এ ঘটনা দু’টোর সম্পর্ক থাকতে পারে। ফ্রান্সের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান Ecole Normale Superieure-এ ভর্তি নিয়েও দেরিদার দু’বার সমস্যা হয়। পরবর্তী সময়ে, ১৯ বছর বয়সে, তিনি এখানে ভর্তি হতে পারেন। এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিখ্যাত ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন সার্ত্র, সিমন দ্যবুভ্যর এবং প্রতিথযশা আরো অনেক ফরাসি বুদ্ধিজীবী।

Tel Quel নামে একটি বামপন্থী জার্নালের সঙ্গেও দেরিদা যুক্ত হন। দর্শনে তাঁর প্রাথমিক কাজ ছিল ফেনোমেনোলজি কিংবা বস্ত্ররূপবিদ্যা বিষয়ে, হুসার্ল ছিলেন তাঁর প্রথম জীবনের পথপ্রদর্শক। আর যাঁদের প্রভাব পড়েছিল তখন, তাঁরা হলেন নিৎসে, হাইডেগার, সস্যুর, লেভিনাস এবং ফ্রয়েড। এসব দার্শনিক-বুদ্ধিজীবীর মতাদর্শ সম্পর্কে আমাদের যে সাধারণ ধারণা, দেরিদা এবং তাঁর ‘ডিকনস্ট্রাকশন’ কী তা থেকে খুব ভিন্ন কিংবা দূরবর্তী হতে পারেন, পারে?

এড্মান্ড হুসার্লের সঙ্গে জ্যাক দেরিদার প্রথম জীবনের বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। দেরিদার প্রথম প্রকাশনাটি ছিল হুসার্লের Origin of Geometry (1962) বইটির ভূমিকাসহ একটি ভাষান্তর, এডমান্ড হুসার্ল ওরিজিন অব জিওমেট্রি : ইন্ট্রোডাকশন (১৯৬২)। তাঁর গবেষণাকর্মও ছিল ওই বইকে কেন্দ্র করেই। ঠিক ডিকনস্ট্রাকশন ব্যাপারটি দেরিদার এই অভিসন্দর্ভের কোথাও উল্লিখিত হয়নি, কিন্তু এতে মূল মনোযোগ যে ছিল হুসার্লের রচনার উদ্ভব ও বিকাশের নানা সমস্যার ওপর, তাতে অনুমান করা যায় যে ডিকনস্ট্রাকশন বা অবিনির্মাণবিষয়ক দেরিদার চিন্তাভাবনার শুরু এ সময়েই ঘটে। 

হুসার্ল, আমরা জানি, বস্তুরূপবিদ্যার বা ফেনোমেনোলজির দার্শনিক, যেখানেও একটি বড় বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে--জ্ঞানার্জনের প্রশ্ন, বস্তু এবং চেতনার মধ্যকার সম্পর্কের প্রশ্ন। কিন্তু, দেখা গেল যে, দেকার্তের খানিকটা উত্তরসূরি বিবেচিত হতে পারেন যে হুসার্ল, চিন্তা বা যুক্তির সত্যতার দাবির পক্ষভুক্ত একজন চিন্তক হিসেবে তাঁর বিভিন্ন রচনার মধ্যে বিষয়ীত্বের (Subjectivism) উপাদানগুলোর দিকেই নজর জ্যাক দেরিদার। জ্ঞান বা চেতনার নির্ভরযোগ্যতার যে দাবি হুসার্লের, তার ভিত্তি হিসেবে প্রচলিত ভ্রান্তি, অনিশ্চয়তা, ইত্যাদির প্রতিষেধক প্রশিক্ষণ কতটা নেয়া হয়েছে, সেগুলো থেকে সম্পূর্ণ মুক্তিলাভ ঘটেছে কি না, ইত্যাদি বিষয়ে সন্দেহ দেরিদার। এক্ষেত্রে পাশ্চাত্য বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত পূর্বধারণাগুলো থেকে হুসার্ল মুক্ত হতে পেরেছেন কি না, সন্দেহ তাও। চিন্তা এবং ভাষার মধ্যকার সম্পর্ককে হুসার্ল কি চোখে দেখেছেন? হুসার্লের বস্তুরূপবিদ্যা তো চেতনা এবং তার ভাষিক প্রকাশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ এক সম্পর্কের ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত বলেই ভাবা হয়। হুসার্ল তো নির্দেশমূলক (indicative) এবং প্রকাশকারী (expressive)—এই দু’ধরনের চিহ্নের মধ্যে খুব বড় পার্থক্য করেছেন। রুশো এবং লেভি-স্ট্রসের রচনাগুলোর ক্ষেত্রে দেরিদা একই রকম বিরোধ দেখেছেন, কথা (speech) এবং লেখার (writing) মধ্যে।Of Grammatology-তে দেরিদা রুশোর কনফেশনস্-এ কীভাবে রুশো এ দুয়ের বিরোধ এবং ব্যবধান সম্পর্কে পরিষ্কার একটি অবস্থান নিয়েছিলেন—তা দেখান।

‘নোব্ল স্যাভেজ’ ধারণাটির প্রবক্তা এই আদর্শবাদী দার্শনিক সেখানে ভাষার লেখ্য রূপকে বলেন ‘পুনরুপস্থাপন’ (representation) মাত্র। বলার তুলনায় লেখা যেন ভয় এবং ক্ষতির অনেক বড় উৎস! পাশ্চাত্য বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যে বিরোধিতায় দেখা এবং অগ্রাধিকার প্রদানের এই প্রবণতাকে দেরিদা চিহ্নিত এবং আক্রমণ করলেন, হুসার্লের ক্ষেত্রে তিনি ১৯৭৩ সালে লিখলেন, ‘যদিও মৌখিক ভাষা একটি অত্যন্ত জটিল কাঠামো, এর মধ্যে সর্বদাই একটি সত্য নির্দেশনামূলক কাঠামো রয়েছে, যাকে আমরা দেখতে পাব, এর গণ্ডির মধ্যে সীমিত রাখা কঠিন। হুসার্ল তথাপি এই জন্য সংরক্ষিত রেখেছেন প্রকাশের ক্ষমতা এবং বিশুদ্ধ যুক্তিসিদ্ধতা।’ (দেরিদা, ১৯৭৩, পৃ. ১৮)। 

প্রকাশ এবং যুক্তির মধ্যে সম্পর্কের হুসার্লীয় দাবিকে প্রশ্ন করে দেরিদা আরো লিখলেন, ‘যদিও কথা ছাড়া কোনো প্রকাশ কিংবা অর্থ হয় না. অপরপক্ষে কথার সবকিছুই প্রকাশক্ষম নয়। যদিও একটি প্রকাশক্ষম অভ্যন্তর (core) ছাড়া আলাপ-আলোচনা সম্ভব হবে না, কেউ অনেকটাই এ-কথাটাও বলতে পারে যে কথার সমগ্রতাই একটি নির্দেশনামূলক জালে ধরা থাকে। (দেরিদা, ১৯৭৩, পৃ. ৩১)

হুসার্ল থেকে যাত্রা শুরু করে উপরোল্লিখিত এবং আরো নানাভাবে তাঁকেই খুব বড়ভাবে প্রশ্ন করার অবস্থানে দেরিদার এই পৌঁছে যাওয়া-এটাই বুঝি তাঁর ‘ডিকনস্ট্রাকশন’ তত্ত্বেরও আদল/কাঠামো। তবে, দেরিদা সম্পূর্ণ খারিজ করেন না শুধু হুসার্লকে নয়, সস্যুরকে এবং লেভি-স্ট্রসকেও। স্ববিরোধী বক্তব্য কিংবা এক ধরনের বিভক্তি তিনি দেখতে পান এঁদের সকলের রচনায়, এগুলো সবই বুঝি তাই অবিনির্মাণমূলক পাঠের জন্যে চমৎকার উপযোগী। সস্যুর এবং লেভি-স্ট্রসকে এখানে খানিকটা হাজির করাও খুবই জরুরি। কারণ, এঁদের কাঠামোবাদ (structuralism) থেকেই যে একটি পরিষ্কার বৈশিষ্ট্যসূচক ধারার সূত্রপাত হয়, উত্তর-কাঠামোবাদ সত্য-সত্য কিন্তু তা থেকে কোনো উত্তরণ ঘটায় না। আমরা এখানে স্ট্রাকচারালিজম সম্পর্কে চুম্বক এই ধারণা পেশ করেই আরো এবং দ্রুত এগিয়ে যেতে চাই যে এই আন্দোলন, এর নামের সঙ্গে মিল রেখেই সাহিত্যকে বিবেচনা করেছে কতগুলো পার্থক্যের (difference) কাঠামো হিসেবেই। এ তত্ত্বের আর একটি বড় বক্তব্য হচ্ছে যে নিজের এবং মূলত নিজের আঙ্গিকের প্রতি এবং বার্তার অভিসম্বন্ধের (reference) কারণেই একটি সাহিত্যিক রচনা অন্য রচনা থেকে আলাদা। অর্থাৎ, সাহিত্যের বার্তার প্রাথমিক অভিসম্ব^ন্ধ এর বহির্ভূত বাস্তব পৃথিবী কিংবা সম্ভাব্য পাঠকের দিকে নয়। আমরা আশা করি, শিল্প-সাহিত্যের কাঠামোবাদী ধারার আদর্শিক ধোঁকাটি সম্পর্কে এ থেকেই যথেষ্ট ভালোভাবে বুঝে নেয়া যায়, কতটা তা মানুষের দিকে কিংবা মানবিক। কাঠামোবাদের কাঠামোকে যে প্রাধান্যকারী (dominant) বলা হয়েছে, তার প্রতি ঝোঁকের ভূমিকার মাধ্যমেই টিকে থাকে, সে-কথাও এখানে বলা দরকার। 

স্ট্রাকচারালিজমে ফার্ডিনান্ড-এ সস্যুরের অবদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর তৈরি শব্দ parole কিংবা কথা হচ্ছে ব্যবহারাধীন ভাষা, যা ছিল অতীতের ভাষাবিদদের আগ্রহের কিংবা কর্মের ক্ষেত্র। তবে, সস্যুরের নিজের আগ্রহ ছিল যে তাত্ত্বিক ব্যবস্থা সব ভাষাকে গড়ে তোলে, তাতে, ভাষার নিয়ম-নীতিতে। এ থেকেও সস্যুর-দেরিদাদের, কাঠামোবাদ-উত্তরকাঠামোবাদের আদর্শিক ঝোঁক আরো পরিষ্কার হতে পারে। কারণ, জীবন সম্পর্কে বলার জন্যেই আমরা ভাষা ব্যবহার করি। সস্যুর সেখানে ভাষার মাধ্যমে প্রকাশিত এই বাস্তব জীবনে অর্থাৎ ভাষার বিষয়বস্তুর তাৎপর্যে আগ্রহী ছিলেন না। তিনি বলতে চেয়েছেন যে, ভাষা অভ্যন্তরীণ নিয়ম-কানুনের সাহায্যে পরিচালিত একটি স্বয়ম্ভর ব্যবস্থা। পৃথিবীতে বিরাজমান বাস্তব কোনোকিছু নাকি ভাষার প্রকৃতি নির্ধারণ করে না। বরং, কোনো শব্দ হচ্ছে একটি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক চিহ্ন, অন্য শব্দের সঙ্গে তার পার্থক্যই তাকে সংজ্ঞায়িত করে। গঠনকারী শব্দগুলোর মধ্যকার সম্পর্কগুলোর একটি ব্যবস্থা বৈ ভাষাও যেন অন্য কিছু নয়, এর রূপ রয়েছে, বিষয়বস্তু কিছু নেই। সস্যুর এ জন্যই বলেছিলেন যে কোনো শব্দ হচ্ছে দ্যোতক (signifier), যে বাস্তবের দিকে তা নির্দেশ করে, তা হচ্ছে দ্যোতনাকৃত (signified)। বাস্তবে কি এদেরকে আলাদা করা চলে? কিন্তু, কাঠামোবাদ ব্যস্ত শুধু শব্দগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক অর্থাৎ ভাষার আভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা নিয়েই, শব্দ অর্থাৎ signifier এর বহির্ভূত যে বাস্তব বা ংরমহরভরবফ, তাতে তার কোনো আগ্রহ নেই। সস্যুরের এই মূল অবস্থানকে অনুসরণ করেই কাঠামোবাদী সাহিত্যসমালোচকরা বলতে চান যে, টেক্সট বা সাহিত্যকর্ম একটি স্বয়ম্ভর ব্যবস্থা। জীবনের প্রতি তাকিয়ে, তার সঙ্গে যুক্ত করে সাহিত্যকর্মের অর্থ সন্ধানের যে প্রচলিত রীতি, তাকে কাঠামোবাদীরা মানেননি। জীবনের বাইরে দাঁড়িয়ে টেক্সট কীভাবে কাজ করে তার তত্ত্ব উদ্ভাবনের প্রয়াস পেয়েছেন তাঁরা। তবে, এই জীবন--তথা-বাস্তববিরোধী অবস্থানে সবটা এবং দীর্ঘকাল থেকে যাওয়া বোধ করি, জীবনের দাবির চাপেই, সম্ভব হয়নি। টেক্সট-বিচারের ওপর গুরুত্ব রাখার প্রশ্নে তারা, সনাতন সমালোচকরা যেভাবে অনেক সময় নিজ-নিজ জীবনদৃষ্টির সাহায্যে কোনো সাহিত্যকর্মের সামাজিক কিংবা সাংস্কৃতিক প্রসঙ্গ/পরিপ্রেক্ষিত সৃষ্টি করেন, তার ত্র“টি নির্দেশ করতে চাইলেন। এভাবেই তারা বিরোধিতার একটি ভূমিকা থেকে সমাজের তথা বাস্তবের সঙ্গে পুনরায় সংযুক্ত হলেন। সাহিত্যের বা টেক্সটের কাঠামো-বিচার থেকে শুরু করলেও কাঠামোবাদী সমালোচকরা একটা পর্যায়ে প্রচলিত ধারার সমালোচকদের বিশ্বাস এবং মূল্যবোধের কাঠামোকেই বিচার এবং প্রত্যাখ্যান করতে শুরু করলেন। এ অবস্থাটা এ সত্যের প্রতিই দৃষ্টি আকর্ষণ করে যে, সকল লেখালেখিই ভাষার সাহায্যে পৃথিবীতে শৃঙ্খলাবিধানের প্রয়াস। এ-ক্ষেত্রে ভাষার এবং কাঠামোবাদীদের ভাষার সীমাবদ্ধতাও অনস্বীকার্য। এরূপ এক পর্যায়ে এসে রোঁলা বার্থ প্রমুখের সূত্রে, ১৯৭০-এর দশকে, কাঠামোবাদ প্রবেশ করে উত্তরকাঠামোবাদ কিংবা পোস্টস্ট্রাকচারালিজমের যুগে--যখন শুরু হয় আরো বেশি বিভ্রান্তি, একেবারে ছত্রখান এক অবস্থা। কিন্তু, তৎসত্ত্বেও এ কথা বলা যায় যে পৃথিবীতে এবং সাহিত্যে উপস্থিত সমস্যা এবং বিশৃঙ্খলার প্রতিবিধানে সমালোচকদের প্রয়াস অব্যাহত থাকার প্রমাণও তো এরূপ সবকিছুই।

এই উত্তরকাঠামোবাদের যুগের প্রথম বড় তত্ত্বকারই হচ্ছেন আমাদের আলোচ্য জ্যাক দেরিদা। বিংশ শতাব্দীর শেষ অর্ধেকের তত্ত্ব ও বাচনগুলোর ইতিহাস ও মূল্যায়ন এখন যাঁরা লিখছেন, তার মধ্যে এক বড়সংখ্যক এ ক্ষেত্রে দেরিদার ভূমিকাকে খোলামেলাই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। তাঁরা কেউ-কেউ তাকে মানবিকতাবিরোধী কিংবা anti-humanist বলেছেন। বলেছেন তারা তা এ কারণে যে উত্তরকাঠামোবাদ বা দেরিদার অবিনির্মাণ কাঠামোবাদীদের তুলনায় আরো অনেক এগিয়ে গিয়ে সাহিত্যের সকল পাঠকেই অপর্যাপ্ত কিংবা ভ্রমপ্রবণ বলতে চেয়েছে। কোনো সাহিত্যকর্ম বা টেক্সট সম্পর্কেই নির্ণয়যোগ্য যেন কিছু নেই! কাঠামোবাদীদের মতোই দেরিদাও শুরু করেন ভাষার সমস্যা সম্পর্কে এ-বক্তব্য থেকে যে শব্দের কোনো ভাষা-বহির্ভূত উদ্ভব বা ফল নেই। শব্দ যে এরূপ নিরাবলম্ব এবং অন্তহীন একটি শেকল, তার বিবরণ দিতে গিয়েই দেরিদা প্রবর্তন করেন তাঁর বিখ্যাত differance--এর প্রত্যয়টি। differance- অর্থ প্রথমত অন্য শব্দের সঙ্গে পার্থক্যের ভিত্তিতেই শব্দের সংজ্ঞা নির্ধারিত হয়, এবং দ্বিতীয়ত শব্দের অর্থ অন্তহীনভাবে বিলম্বিত (differed) হয়। কারণ, অর্থ-নির্ধারণব্যবস্থায় প্রতিটি শব্দই টেনে নিয়ে যায় আর একটি শব্দে। দেরিদার মত হচ্ছে শব্দের নিজস্ব বা চূড়ান্ত কোনো অর্থ নেই। ভাষার অর্থ হয় শুধু যদি পাঠক শব্দসমূহের ওপর কোনো স্থায়ী অর্থ চাপিয়ে দেয়। পাঠকেরা নাকি তেমন অর্থ খোঁজেন; কারণ, উপস্থিতির (presence) ধারণার প্রতি নাকি তাদের অঙ্গীকার রয়েছে, অঙ্গীকার রয়েছে যে শব্দের অভিসম্ব^ন্ধিক কোনো কিছু (referent) থাকা উচিত এবং তাদের নাকি আরো অঙ্গীকার রয়েছে যে টেক্সট-বহির্ভূত কোনোকিছুর উপস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কের সূত্রেই শব্দের অর্থ হওয়া উচিত। দেরিদার নিজের অমন কোনো অঙ্গীকার নেই।

অমন অঙ্গীকার না-থাকা অবস্থায় দেরিদা কমনসেন্স, যুক্তি, ইত্যাদি ধারণাকে সাহিত্যের ওপর পাঠকদের চাপিয়ে দেয়া নিয়ন্ত্রণমূলক কৌশল বলেছেন এবং প্রত্যাখান করেছেন। এভাবেই পাঠক নাকি টেক্সটকে নিজ-নিজ অভিসান্বন্ধিক কাঠামোর মধ্যে টেনে নিয়ে যেতে চেয়েছে। তারও আগে এই একই কাজ করেন লেখকগণ, কিন্তু তাদের সে চেষ্টাও হয়েছে ব্যর্থ। এক্ষেত্রে দেরিদার অবিনির্মাণ অত্যন্ত সংশয়বাদী একটি পদ্ধতি; লেখক তাঁর অভিজ্ঞতাকে সংগ্রন্থিত এবং পরিচালিত করার জন্য যা কিছু কৌশল ব্যবহার করেন অবিনির্মাণ সেগুলোর পরিচয় উন্মোচন করে এবং এভাবেই প্রমাণ করার চেষ্টা করে যে ভাষার সাহায্যে পৃথিবী তথা বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ কোনো সম্পর্ক স্থাপন সম্ভব নয়। আমরা এ প্রবন্ধের শুরুতেই বলেছিলাম যে, ইতিহাসে কখনো-কখনো কোনো-কোনো তত্ত্ব বলতে চেয়েছে যে, পৃথিবী বা অভিজ্ঞতা নির্ণয়যোগ্য নয়, জ্ঞানার্জন সম্ভব নয়। প্রকারান্তরে এটা মানুষের পরাজয়ের ঘোষণা। ডিকনস্ট্রাকশন তত্ত্বের রূপকার দেরিদার অবস্থানকে এ বিবেচনায় মানবতাবিরোধী বলা বোধকরি ভুল নয়। ক্লিষ্ট, লাঞ্ছিত যে মানুষ, এ ঘোষণা তার লাশের কফিনে শেষ পেরেক ঠোকার শামিল। ভাষা-বহির্ভূত এলাকা অর্থাৎ বাস্তব জগৎ থেকে প্রাপ্ত শব্দার্থের স্থিতিশীলতার জন্য পাশ্চাত্য জ্ঞানের জগতে যে আকাঙ্ক্ষা দেখেছেন দেরিদা, তাকে আক্রমণ করেই তিনি পাশ্চাত্যের বিরুদ্ধে হাজির করেছিলেন তাঁর logo-centrism অর্থাৎ অর্থকেন্দ্রিকতার অভিযোগ, উপস্থিতির তথা উপস্থিত সময়ের ভাষা হিসেবে কথ্য ভাষাকে লিখিত ভাষার অধিক অগ্রাধিকার দিয়ে পশ্চিমা জ্ঞান যে একটি কেন্দ্রীয় অন্যায় কেন্দ্র নির্মাণ করেছিল, তার অভিযোগ ছিল এও; কিন্তু, অবিনির্মাণের তত্ত্বের বা এর অব্যাহত প্রয়োগ-শেষে যখন জ্ঞানার্জনই একটি অসম্ভব প্রকল্প হয়ে দাঁড়ায়, তার খারিজকারী ফল তো প্রত্যেক লেখক, পাঠক, এমনকি স্বয়ং দেরিদাকেও ছুঁয়ে যায়, গ্রাস করে। না কি, ইতিহাস-অবশিষ্ট মানবের হাতে অবশিষ্ট থাকবে শুধু অন্তহীন ‘অবিনির্মাণ’ মাত্র?

কাঠামোবাদ বলেছিল যে, সত্য অর্থ কিছু নেই। কারণ, কতগুলো অধিক্রমণকারী (overlapping) কাঠামোয় মানুষ এমনভাবে হাজির হয়, যেগুলো আগে থেকেই কাজ করছিল। সুতরাং, মানুষ যা বলে, কাঠামোগুলোই তার মাধ্যমে তা বলিয়ে নেয়; সেগুলোর উদ্ভব তার নিজের মধ্যে ঘটেনি। কিন্তু, উত্তরকাঠামোবাদ তথা দেরিদার অবিনির্মাণ তত্ত্বের differance ধারণাটি এসে যাওয়ার পরে, ভাষার শব্দের উপস্থিত অর্থ কিংবা শব্দের সঙ্গে বাস্তবের সংযোগ চলে যাওয়ার কথা বলা হওয়াতে অবস্থার আরো অবনতি হয়। কাঠামোর মুখপাত্র মাত্র হওয়া সত্ত্বেও কাঠামোবাদ তত্ত্বের সান্ত্বনা ছিল যে ঐ কাঠামো স্থিতিশীল এবং তাকে জানা সম্ভব। কিন্তু শব্দের ‘উপস্থিতি’ চলে যাওয়াতে, দেরিদার নিজের কথায়, যেহেতু ‘টেক্সট-বহির্ভূত কোনোকিছু নেই’, ভাষার মধ্যে অবশিষ্ট থাকলো শব্দগুলোর মধ্যস্থ differance শুধু। এ অবস্থায় দেরিদার তত্ত্ব বলল, লিখিত ভাষার সঙ্গে কথ্যভাষার কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই; কারণ, এরূপ কোনো ভাষারই বাস্তব কোনো ভিত্তি (‘উপস্থিতি’ কিংবা ‘অভিসন্বন্ধ’) নেই। কথ্যভাষারও সত্য অর্থ ক্রমশ পিছিয়ে যেতে (deferred) থাকে। ভাষার অন্তর্নিহিত অবিশ্বস্ততা থেকে (unreliability) এর কোনো ব্যবহারকারীরই কোনো রেহাই নেই। ভাষার স্বাধীন ‘খেলা’-উদ্বৃত্ত অর্থ, ইত্যাদি নাকি সৃষ্টি হয় শব্দরাজির মধ্যকার পূর্বোল্লিখিত differance থেকেই, ভাষা-ব্যবহারকারীর এখানে কিছু করার নেই। বক্তা, লেখক--সকলেই অসহায়।

দেরিদা বলেছিলেন যে, ভাষার এই ‘খেলা’, অবিশ্বস্ততা, নিয়ন্ত্রণোর্দ্ধতা, ইত্যাদির কারণেই সাহিত্যকর্র্মের মধ্যে নিষ্পেষিত কিংবা প্রান্তিক অনেক অর্থ থেকে যায়। সাহিত্যকর্মকে অবিনির্মাণের অবকাশও সেখান থেকেই পাওয়া যেতে পারে। দেরিদার মতে, কথ্যভাষাকে দেয়া পাশ্চাত্যের অন্যায় বিশেষাধিকারের আদলেই টেক্সটের মধ্যে কোনো-কোনো চিন্তা, ধারণা বা শক্তিকে লেখক একটি কেন্দ্রীয় অবস্থান দিয়ে থাকেন; এভাবেই লেখক সাহিত্যকর্মের একটি স্থিতিশীলতা সৃষ্টি করেন, ভাষার প্রবল-অশেষ অর্থস্রোতের বিরুদ্ধে। এভাবেই যা কিংবা যা-যা কেন্দ্রীয় অবস্থান লাভ করে, বাকি ব্যাপারগুলো হয়ে পড়ে প্রান্তিক(marginal) , একটা স্তরবিন্যাস সৃষ্টি হয়। এই কেন্দ্র এবং প্রান্তগুলো মিলে সৃষ্টি হয় কাঠামোবাদেও যাকে বলা হয়েছিল যুগ্ম বিরোধ (binary opposition), যেমন; ভালো-মন্দ, সত্য-মিথ্যে, পৌরুষ-রমণীয়তা, যৌক্তিকতা-যুক্তিহীনতা, চিন্তা-অনুভূতি, মন-বস্তু, প্রকৃতি-প্রকর্ষণ ইত্যাদি, ইত্যাদি। এই যুগ্ম বিরোধের একটি বিষয়কে বিশেষাধিকার দিয়ে কেন্দ্রে পরিণত করা হয়। ডিকনস্ট্রাকশন কিংবা অবিনির্মাণের লক্ষ্য হল এই বিশেষাধিকার-প্রাপ্ত কেন্দ্রগুলোকে উন্মোচন করা, চূর্ণ করা--যাতে করে স্থিতিশীল অর্থের দাবি বা ভান করার কোনো সুযোগ কেউ না পায়। এজন্য অবিনির্মাণ সাহিত্যকর্মের অভ্যন্তরস্থ অসঙ্গতি এবং বিরোধগুলো চিহ্নিত করার পথে এগোয়।

মজার ব্যাপার হল অবিনির্মাণের উদ্দেশ্যেও তো সেই ভাষাকেই ব্যবহার করা হয়, যার অবিশ্বস্ততার সমস্যা সম্পর্কে অবিনির্মাণ বলে। দেরিদার সমালোচনার ভাষা তো তার নিজের উদ্ভাবিত কিছু নয়। এ সমস্যার সমাধান কী? দেরিদা কি এই ত্র“টিপূর্ণ ভাষা ব্যবহার না করে পেরেছেন? সুতরাং হয়/নয় এর পথে নয়, অবিনির্মাণও এগিয়েছে নয়/তথাপির পথে। জ্ঞানার্জনের অসম্ভাব্যতা, বাস্তবের অনির্ণেয়তার পর, অবিনির্মাণ তত্ত্বের অপর এই গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি হচ্ছে টেক্সট বা সাহিত্যেও হয়/নয় (either/or) পরিস্থিতির অন্তরালে বিরাজ করছে উভয়/এবং (both/and) কিংবা নয়/তথাপির (not/still) পরিস্থিতি। এটা একটি মৌলিক সিদ্ধান্তহীনতার পরিস্থিতির বার্তা। কোনো সাহিত্যকর্মে অনেক সম্ভাবনা থাকে, কিন্তু কোনো শেষ কথা (closure) নয়, কোনো চূড়ান্ত অর্থও নয়। জেরেমি হর্থন যেমন বলেছেন, ‘এভাবেই দেরিদার মতে কোনো টেক্সটের অর্থ তার ব্যাখ্যাকারীর সামনে-সামনে প্রকাশ পেতে থাকে, খুলতে-খুলতে যেতে থাকে, যেন একটি অশেষ কার্পেট। যার শেষ কিনারটিকে কখনো দেখা যায় না।’ (হর্থন, ১৯৯৮ : ৩৯)

অবিনির্মাণ তত্ত্বের এই নেতিবাচক চূড়ান্ত তাৎপর্য নিয়ে আমরা ইতোমধ্যেই কিছুটা বলেছি, কিন্তু তা সত্ত্বেও এ সত্য অস্বীকার করা যাবে না যে এই চূড়ান্ত এবং দার্শনিক তাৎপর্যে পৌঁছবার পূর্বে কিন্তু বেশ কিছু ইতিবাচক প্রাপ্তিও ঘটে। টেক্সট কিংবা রচনাকর্মের মধ্যে ক্রিয়াশীল কাঠামো কিংবা বিরোধীয় বিষয়গুলোকে কিন্তু ইতিমধ্যেই চিহ্নিত এবং সে-অর্থে মূল্যায়ন করা সম্ভব হয়েছে, এবং টেক্সটের মধ্যকার উপাদানের সাহায্যেই তা সম্ভব হয়েছে। সাহিত্যকর্মের অত্যন্ত নিকট নিরীক্ষণকে সম্ভব করে তোলে অবিনির্মাণ পদ্ধতি, সেখানকার এবং সে-অর্থে বাস্তবতার ভেতরকার লুকনো ক্ষমতা-সম্পর্কগুলোতে অত্যন্ত কার্যকর আলো ফেলে তা। নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বড় প্রাপ্তি, বড় সাফল্য। তবে, জে. হিলিস মিলারের দাবি-অনুযায়ী এভাবে টেক্সট ব্যাপারটিরই সম্পূর্ণ কোনো বিলয় ঘটে, এমন অতিনেতিবাদী কথা আমরা বলব না। এক্ষেত্রে এ-মন্তব্যও করা হয়েছে যে, শব্দের মধ্যকার পার্থক্য এবং বাস্তবতাকে ধারণে ভাষার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে দেরিদার বক্তব্য সত্ত্বেও, উদ্বৃত্ত অর্থ কেন সাহিত্যকর্মকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করবে। উদ্বৃত্ত অর্থের এমন সাংঘাতিক ফল নাও হতে পারে। ভ্রান্ত পাঠ যেমন সম্ভব, সফল যোগাযোগের দৃষ্টান্তও অনেক দেখানো যাবে। ভাষার ওপর উত্তরকাঠামোবাদী বিশ্বাস হারানো হয়তো এক্ষেত্রে বিপরীত একটি আকাক্সক্ষার--ভাষার মাধ্যমে সম্পূর্ণ এবং নিশ্চিত যোগাযোগের আকাক্সক্ষারই--ফল কিংবা প্রতিক্রিয়া। এখানে আমরা এ কথাটাও খুবই বলতে চাইব যে অবিনির্মাণ তত্ত্বে হয়তো বাড়াবাড়ি রয়েছে, নিখিল নাস্তির ঘোষণা, কিন্তু বিপরীত দিকে তো রয়েছে সরলীকরণ, স্থূলবুদ্ধি, কপট সারল্য, সহজমনষ্ক, সস্তা এবং অগভীর আশাবাদের মতো অধিকতর না-হলেও সমান ক্ষতিকর অনেক অবস্থান এবং মনোভাবও। দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের প্রবক্তাদেরও দেখা গেছে যান্ত্রিক বস্তুবাদ কিংবা মূল দ্বন্দ্বের ধারণার মধ্যেই সবটা সীমাবদ্ধ থাকতে। তাঁদের দিক থেকে প্রয়োজনীয় জটিলতা, গভীরতা কিংবা খুঁটিনাটিতে সবকিছুকে দেখতে না যাওয়ার ব্যর্থতার শূন্য স্থানেই যে দেরিদাদের উত্থান ঘটেনি—এ কথা কীভাবে বলা যাবে? এবং সে-বিবেচনায় অবিনির্মাণের নিখিল নাস্তিরও হবে প্রয়োজনীয় অশুভের যা শুভ পরিণতি। মার্ক্সে এসে হেগেলের ভাববাদের ডায়ালেকটিক্সও যেমন বাস্তব পরিবর্তনের বিপ্লবী দর্শন হয়ে উঠেছিল, অনেকটা একই রীতিতে কাঠামোবাদ এবং উত্তরকাঠামোবাদের তত্ত্ব দ্বন্দ্বময় বাস্তবের অনেক এ-যাবৎ অচিহ্নিত বা কমচিহ্নিত ক্ষেত্রকে পর্যাপ্তভাবে চিহ্নিত করেছে। দ্বন্দ্ব নিরসনের ক্ষেত্রেও সামগ্রিকতাকে নিশ্চিত করার কমবেশি প্রয়োজন রয়েছে বলেই বলা হয়। দর্শন দাঁড়িয়ে আছে যে যৌক্তিকতার (reason) ওপর, তাকেই চ্যালেঞ্জ করায় দেরিদার ওপর যাঁরা ক্ষুব্ধ, তাঁরাও এটা লক্ষ্য না-করে পারেন না যে, বিংশ শতকের শেষ দশকগুলোতে সমালোচনা এবং তত্ত্ব অবিনির্মাণকে যেমন প্রত্যাখ্যান করেছে, তেমনি একে আংশিকভাবে আত্মীকরণ ক’রে এবং এখান থেকে শুরু করেও বিভিন্ন দিকে এগিয়েছে। অবিনির্মাণ তত্ত্বের ভয়াবহ নেতিবাচকতা সত্ত্বেও একে সম্পূর্ণ অস্বীকার ক’রে, পুরনো সহজমনস্কতা কিংবা আত্মসন্তোষ নিয়ে চলা বোধকরি কারো পক্ষেই সম্ভব হয়নি। মার্ক্সবাদীরা যেমন দ্বন্দ্বের অনেক ক্ষেত্রকে এতকাল মনোযোগ না-দেয়ার অকর্তব্যকে, ব্যর্থতাকে বাধ্য হয়ে উপলব্ধি করেছেন, যুগ্ম বিরোধের ধারণা তাদেরকে, নারীবাদী এবং উত্তর-উপনিবেশিকতাবাদী সমালোচকদেরও মূল্যবান সব ধারণার আলোয় দীক্ষিত-সমৃদ্ধ করেছে। এই অন্যসব উত্তরকাঠামোবাদীদের লেখালেখি হয়তো অনেক বেশি সম্পৃক্ত, রাজনৈতিক, এবং তা হয়তো অবিনির্মাণের চূড়ান্ত নাস্তি এবং নির্লিপ্ততার প্রতি এক ধরনের প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা। কিন্তু, অবিনির্মাণের তত্ত্বের পক্ষ থেকে প্রচলিত ছককে অতিক্রম করার কৃতির ধারাবাহিকতা বৈ অন্য কিছুও এরা নয়। অবিনির্মাণের তত্ত্বের প্রতি এই ঋণ মনোবিশ্লেষণবাদী সমালোচনার, নিওহিস্টরিসিস্টদেরও। উত্তরকাঠামোবাদী সমালোচকরা রচনাকর্মের মধ্যে অসংবদ্ধতা, দ্বন্দ্ব এবং উদ্বেগ—যা দেখেছেন, সমাজের আদর্শিক শৃঙ্খলার যে ভঙ্গুরতাকেও, তার ফল শেষ বিচারে পরিবর্তন-প্রয়াসের পক্ষে না-গিয়ে পারে না।

শুধু দেরিদার নয়, সাম্প্রতিক সব তত্ত্বের (Theory) রাজনীতি এবং মতাদর্শের দিকটির প্রতি আমরা দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছি। বইপত্রে আমাদের এ-প্রয়াসের প্রতি অনেক অনুমোদনও দেখেছি। ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত আইজাজ আহমদের লিনিয়েজেস অব দ্য প্রেজেন্ট--প্রবন্ধগ্রন্থের অন্যতম প্রবন্ধ ‘রিকনসাইলিং ডেরিডা’তেও প্রবন্ধকার দেরিদার রাজনীতিই মূলত আলোচনা করেছেন। ১৯৯৪ সালের মে-জুন সংখ্যা নিউ লেফট রিভিউ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছিল দেরিদার প্রবন্ধ ‘এ লেকচার অন মার্ক্স।’ আইজাজ আহমেদ ১৯৯৪-র ২০ জুন তারিখে ইউরোপিয়ান ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অফ হিউম্যানিটিজ কর্তৃক আমন্ত্রিত হয়ে যে বক্তৃতা দেন, তা ছিল দেরিদার উল্লিখিত প্রবন্ধের একটি খুব দ্রুত কৃত মূল্যায়ন। এই বক্তৃতাই আইজাজ ‘রিকনসাইলিং ডেরিডা : স্পেকটারস্ অব মার্ক্স অ্যান্ড ডিকন্সট্রাকটিভ পলিটিক্স’ নামে পরে প্রকাশ করেন। তখন তিনি জানাচ্ছেন যে ২০ জুন তারিখে প্রদত্ত বক্তৃতাটি উল্লিখিত প্রবন্ধাকারে প্রকাশের আগেই তিনি পাণ্ডুলিপি আকারে ‘দেখার’ সুযোগ পেয়েছিলেন দেরিদার বিখ্যাত বই, স্পেকটারস অব মার্ক্স : দ্য স্টেট অফ ডেট, দ্য ওয়ার্ক অফ মৌর্নিং, অ্যান্ড দ্য নিউ ইন্টারন্যাশানাল।

‘এ লেকচার অন মার্ক্স’ প্রবন্ধে, আইজাজ বলেন, দেরিদার বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে উত্তরাধিকার, শোক এবং সংকল্প। আইজাজ দেখতে পান যে কীসের জন্য শোক সে বিষয়ে আবার দেরিদার কোনো পরিষ্কার ধারণাই নেই। তাঁর আরো প্রশ্ন: শোক ঠিক এ সময়েই কেন, যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেছে? মুক্তবাজারীদের মতোই, যাদের বিরোধিতা দেরিদা তাঁর প্রবন্ধে করেছেন, কেন তিনিও কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলোর ভেঙে যাওয়াকে মার্ক্সবাদের মৃত্যুর সঙ্গে এক করে দেখছেন? অতীতে তো দেরিদা কখনো সোভিয়েত ইউনিয়নকে মার্ক্সবাদের সঙ্গে এক করে দেখেননি। দেরিদা তো খুব মোটা দাগে এ কথাই বলে দেন যে চল্লিশ বছর যাবৎ তিনি তাদের একজন যারা ‘নিশ্চিতভাবেই বাস্তব’ মার্ক্সবাদ কিংবা ‘কমিউনিজম’ (সোভিয়েত ইউনিয়ন, কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর ইন্টারন্যাশনাল এবং সেগুলো থেকে উদ্ভূত সবকিছু) এর বিরোধী ছিলেন। আইজাজ মন্তব্য করেন যে, দেরিদার শোক এ কারণে যতটা নয় যে স্বয়ং পিতা মৃত্যুবরণ করেছেন, তারচেয়ে বেশি তাঁর মৃত্যুটা যেরকম ছিল সে কারণে--রাজ্যটির উত্তরাধিকারী হয়েছে অবিনির্মাণের যুবরাজ নয়, দক্ষিণপন্থী আত্মসাৎকারীরা। ‘এ লেকচার অন মার্ক্স’ প্রবন্ধের শুরু ও শেষে হ্যামলেট নাটক থেকে উদ্ধৃতি দেন দেরিদা, আইজাজ স্মরণ করিয়ে দেন যে, শেষ পর্যন্ত সে-নাটকেও মৃত পিতার রাজ্য হ্যামলেট ফিরে পাননি, পেয়েছিল একজন পার্শ্বচর, ফোর্টিনব্রাস। আইজাজ এরপর দেরিদার প্রবন্ধ থেকে দীর্ঘ উদ্ধৃতি দেন যেখানে দেরিদা দ্বিধাহীন এবং ওজস্বী ভাষায় চরম দক্ষিণপন্থীদের পক্ষ থেকে ইউরোপীয় কমিউনিস্ট দেশগুলোর দখল নেয়া সম্পর্কে বলেছেন : ‘এই আধিপত্যকারী বাচনের প্রায়ই থাকে একটি উন্মাদ, ফুর্তিবাজ এবং মন্ত্রোচ্চারণকারী রূপ যাকে ফ্রয়েড বলেছেন শোক প্রকাশের বিজয়ী পর্যায়ের ব্যাপার। ছন্দিত মার্চের তালে-তালে তা বলছে : মার্ক্স মৃত, কমিউনিজম মৃত, অত্যন্ত মৃত এবং এর সঙ্গে সঙ্গে এর আশাগুলোও, এর বাচনগুলো, তত্ত্বগুলো, চর্চাগুলো।... এই আধিপত্য অস্বীকার করতে চাচ্ছে এই সত্য এবং তা থেকে লুকোতে চাচ্ছে যে ইতিহাসের আর কখনো এরূপ ঘটেনি, কখনো ঘটেনি যে যার (পুঁজিবাদী এবং উদার পৃথিবীর যাবতীয় পুরনো ধাঁচের) যে বেঁচে যাওয়াকে উদযাপন করা হচ্ছে তা ছিল এত অশুভ, হুমকিদানকারী এবং হুমকিগ্রস্ত।’

দীর্ঘ উদ্ধৃতি-প্রদান শেষে আইজাজ সেখানে দেরিদার বক্তব্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত প্রকাশ করেন যে, এভাবে কমিউনিজমের ভেঙে পড়ার প্রশ্নে ‘উন্মাদ বিজয়োল্লাস’ ইতিহাসের এমন একটি সময়ে করা হয় যখন পুঁজিবাদ নিজেই বদ্ধতায় ক্লেদাক্ত এবং তার নিজের বিভক্তিতে দীর্ণ। এভাবে পুঁজিবাদ যেমন হয়ে উঠেছে আরো বেশি হুমকিগ্রস্ত এবং হুমকিদানকারী, সমগ্র পরিস্থিতিটিই তেমনি স্ববিরোধাত্মক। মানুষের স্বাধীনতা কিছু বাড়েনি, সম্পদ জড়ো করায় ব্যস্ত রয়েছে অনেক বেশি পাশবিক সব সরকার, চারদিকে পুনরুত্থিত বর্ণবাদ এবং ফ্যাসিবাদ। আইজাজ প্রশ্ন করেছেন পৃথিবীব্যাপী চরম দক্ষিণপন্থাকে সম্ভব করেছে কি কমিউনিজমের ভেঙে পড়া ছাড়া অন্য কোনো কিছু? কিন্তু, ‘এ লেকচার অন মার্ক্স’ প্রবন্ধে শ্রেণী-রাজনীতির প্রতি দেরিদার অস্বীকৃতি এবং কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর সকল কাজের প্রতি তাঁর নিন্দাজ্ঞাপন এতই চূড়ান্ত, যে একদিকে কমিউনিজমের পরাজয় এবং শ্রমিক আন্দোলনের অসংগঠিত অবস্থা এবং অন্যদিকে পাশবিকতর পুঁজিবাদের উত্থান এবং ইউরোপব্যাপী ফ্যাসিবাদের উত্থান যে একই প্রক্রিয়ার অংশ দেরিদা তা মানতে পারেন না। বিশ্বপ্রক্রিয়ার ঐক্যকে দেরিদা স্বীকার করেন না, কিন্তু এর ফল সম্পর্কে খবর রাখেন, সঙ্গত ঘৃণার সঙ্গে তিনি নির্দেশ করেন সেই বাস্তব বৈশ্বিক সমমতের প্রতীক্ষা ‘ঘিরে রেখেছে ফ্রান্সে যাকে বলা হয় শ্রেণীরাজনীতির বক্তৃতা ও বাগ্মিতা’-যোগাযোগ এবং গণমাধ্যমকে এবং ‘পাণ্ডিত্য এবং শিক্ষাপ্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিকে। বিশেষত ইতিহাসবিদ, সমাজবিজ্ঞানী এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সাহিত্যের তত্ত্বকার, নৃতত্ত্ববিদ, দার্শনিক, বিশেষ রাজনৈতিক দার্শনিক যাদের বাচনকে সরাসরি বহন করে নিয়ে যায় শিক্ষাপ্রাতিষ্ঠানিক এবং বাণিজ্যিক সংবাদপত্র।’ (পৃ. ৩৯) এসবের মিলিত প্রবাহটি সম্পর্কে দেরিদা যেখানে সারসংক্ষেপ ক’রে তাঁর ÔA Lecture on MarxÕ’ প্রবন্ধে লিখেছেন, আইজাজ আহমদ তাকে সরাসরি উদ্ধৃত ক’রে মন্তব্য করেন যে রাজনীতি, সংবাদমাধ্যমে এবং শিক্ষাপ্রাতিষ্ঠানিক বাচনের(discourses) তিনটি কাঠামোকে যে ‘একক’ যন্ত্র একত্রে ধরে রেখেছে সে সম্পর্কে দেরিদার সঙ্গে তাঁর সহমতই তিনি লিপিবদ্ধ করতে পারেন। সহমত দেরিদার এই বক্তব্যের সঙ্গেও যে এই একক যন্ত্র ইউরোপে শুধু ব্যাপকবিস্তারী নয়, সকল সরকারি এবং বেসরকারি ক্ষেত্রে এরা ‘প্রযুক্তিগতভাবে আগ্রাসী।’ অন্যত্র দেরিদা মন্তব্য করেছেন যে পশ্চিমা বাচনসমূহের এই মিলিত কাঠামোর প্রাধান্য অর্জন বিরাজমান সমাজতান্ত্রিক সরকারগুলোর পতনের একই সময়ে ঘটেছে এবং তাতে অবদান রেখেছে। আইজাজ আহমদ দেরিদার মন্তব্যের সঙ্গে যোগ দিয়ে আরো কিছু যা বলেন, দেরিদা অবশ্য কখনোই সেসব নিয়ে ভাবতে যাননি। ’৬৮ পরবর্তী সময়ের র‌্যাডিকাল মতবাদগুলোর মার্ক্সবাদ-বিরোধিতা অন্তত শিক্ষাপ্রাতিষ্ঠানিক এলাকায় মার্ক্সবাদের প্রভাব হ্রাসে যে ভূমিকা রেখেছে, দেরিদা তা বিবেচনা করেন না, কিন্তু এ সবের চূড়ান্ত পরিণতিতে মার্ক্সবাদের বিজ্ঞাপিত মৃত্যুতে তিনি পীড়িত বোধ করেন। আইজাজ আহমদ পরবর্তী বছরগুলোকে—সত্তর এবং আশির দশককে—বলেছেন বিশেষভাবে দুর্বোধ্য ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ এবং এ সময়টাতেই সাধারণভাবে উত্তরকাঠামোবাদ এবং বিশেষভাবে দেরিদার অবিনির্মাণ তত্ত্ব বুদ্ধিবৃত্তিক সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে হাজির হয়েছিল অদ্ভুতভাবে--রক্ষণশীলতা এবং মার্ক্সবাদ—উভয়ের বিকল্প হিসেবে। দক্ষিণপন্থার অন্তর্ভুক্ত না-হওয়াতেই ইউরোপ এবং আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষাপ্রাতিষ্ঠানিক বামের ওপর, অ-কমিউনিস্ট (এবং প্রায়শ কমিউনিস্টবিরোধী) ছাত্র-শিক্ষকের ওপর প্রভাব বিস্তার করাটা অবিনির্মাণ তত্ত্বের পক্ষে সহজ হয়। আইজাজ আহমদ দাবি করেন যে, মার্ক্সবাদের বিরুদ্ধে তার শর্তহীন যুদ্ধ, শ্রমিক শ্রেণীর সংগঠন এবং বামের সংগঠিত রাজনীতির প্রতি এর বিরূপ মনোভাব এবং সংশয়ের এক বিশ্ব হারমেনিউটিক্সের পক্ষে ওকালতির মাধ্যমে অবিনির্মাণ পূর্ণ-বিকশিত দক্ষিণপন্থী বুদ্ধিজীবীগোষ্ঠীর পুনরুত্থানে অবদান রেখেছে, অজ্ঞাতসারে। এই অজ্ঞানের শূন্য কী অধিক, আমরা শুধু সেটাই ভাবতে পারি।

পাঠক হয়তো আইজাজ আহমদ প্রদত্ত এর পরের তথ্য জেনে খুবই বিস্মিত হবেন। তার আগে আইজাজ এটা জানান যে, তিনি নিজে দেরিদাকে ‘দক্ষিণপন্থার মানুষ’ ভাবেন না। জ্যাক দেরিদা আইজাজকে বরং স্মরণ করিয়ে দেন রোমান্টিসিজম, নৈরাজ্যবাদ, সুররিয়ালিজম এবং রাজনৈতিক উদারতাবাদের আরো কিছু ধারা সম্পর্কে, রক্ষণশীল দক্ষিণপন্থা সম্পর্কে নয়। আইজাজ তার পরে জানান যে, ‘এ লেকচার অন মার্ক্স’ প্রবন্ধের এক পর্যায়ে দেরিদা অবিনির্মাণকে দাবি করেছেন মার্ক্সবাদের ‘র‍্যাডিক্যালাইজেশান’ হিসেবে। দেরিদার নিজের ভাষায়, ‘আমার দৃষ্টিতে অন্তত র‍্যাডিক্যালাইজেশান হিসাবে ছাড়া অবিনির্মাণের কোনো আগ্রহ বা অর্থ ছিল না, তার অর্থ এক নির্দিষ্ট মার্ক্সবাদ কিংবা মার্ক্সবাদের চেতনায়। অবিনির্মাণ নামে মার্ক্সবাদের তাহলে এই প্রয়াসকৃত র‍্যাডিক্যালাইজেশন হয়েছে।... র‌্যাডিক্যালাইজেশান সর্বদাই যাকে তা র‍্যাডিক্যালাইজ করে তার প্রতি ঋণী।’ (পৃ. ৫৬) কিন্তু এ সম্পর্কে আইজাজ আহমদ তাঁর কি মত জানিয়েছেন? এই আত্মীয়তা-স্থাপনকে কি তিনি গ্রহণ করেন? আমাদের এখানে বিস্তারিত বলার সুযোগ নেই, কিন্তু সংক্ষেপে এটা বলতে পারি যে, আইজাজ দেরিদাকে রাস্তা দেখিয়েছেন পর্যাপ্ত যুক্তিসহকারেই। আইজাজ যে দেরিদাকে ‘দক্ষিণপন্থার মানুষ’ ভাবেননি সেটাই তো যথেষ্ট। দেরিদা যে ডানে এবং বামে সমান মতান্ধতা (dogmatics) দেখতে পেয়েছেন, সেটা উল্লেখ করে আইজাজ বলেন, ‘আমরা এভাবে একটি খুব পরিচিত জমিনে দাঁড়িয়ে : তৃতীয় পথ হিসেবে অবিনির্মাণ, যা নিশ্চিতভাবে দক্ষিণপন্থার বিরোধী, কিন্তু যা ‘ইন্টারন্যাশনাল শব্দটি বোঝায় এমন সবকিছুরও বিরোধী।’ মজার ব্যাপার হচ্ছে দেরিদা তার ‘এ লেকচার অন মার্ক্স’ প্রবন্ধে নতুন একটি ইন্টারন্যাশনালের প্রস্তাবও করেন, যার কাজ হবে শুধু ‘ক্রিটিক’ তৈরি করা। এ প্রবন্ধে আইজাজ জানাচ্ছেন, দেরিদা অবিনির্মাণের কোনো আত্মসমালোচনায় (auto-critique-G) যান না, যা তিনি মার্ক্সবাদের জন্য সুপারিশ করেন। দেরিদা তাঁর অবিনির্মাণের বক্তব্যগুলোকে বর্ধিত দৃঢ়তা নিয়েই বরং পুনরায় উপস্থিত করেন। আইজাজও, আমরা দেখি, বিপরীতে, মার্ক্সবাদের পক্ষ থেকে, দেরিদার ‘নির্দিষ্ট একটি চেতনার’ সঙ্গে অবিনির্মাণধর্মী সংহতি প্রকাশ করেন--বিরুদ্ধ সকল বাতাসের মুখেও প্রকাশিত দেরিদার ইতিবাচক মনোভাবের সঙ্গে সংহতি। আইজাজ আহমদ লিখেছেন, ‘আমরা আনন্দের সঙ্গে বলব, যা তিনি বলেন যে, তিনি আমাদের লোক।’ কিন্তু, আইজাজ আহমদের মত হচ্ছে, তার অর্থ এটা নয় যে, অবিনির্মাণের কোনো প্রধান প্রকরণ আমরা গ্রহণ করব, আমরা শুধু কিছু অবিনির্মাণীয় পদ্ধতি দেরিদার বই পঠন-পাঠনের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করব। ঠিক যেমন মার্ক্সের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে দেরিদার আচরণগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক মার্ক্সবাদের কোনো প্রধান প্রকরণকে কিংবা এর ইতিহাসের কোনো ক্ষুদ্রতম অংশের দায়িত্ব গ্রহণ অন্তর্ভুক্ত নয়। আমাদেরও, আগেই আমি বলেছি, একটি অবিনির্মাণধর্মী সংহতি, আইজাজ লিখেছেন তার ‘দেরিদার সঙ্গে মীমাংসা’ প্রবন্ধের সব শেষে। পাঠক, আইজাজ আহমদের প্রবন্ধটি দেরিদা-বিচারের একটি দৃষ্টান্তমাত্র। নিশ্চয় এ-বিচারের প্রতি আমাদের অনেক অনুমোদন আছে। আমরা জ্যাক দেরিদার অনেক নেতি এবং কিছু ইতিকে দেখেছি। শেষে দেখলাম এক গুরুত্বপূর্ণ সমালোচক, আইজাজ আহমদের চোখ দিয়ে। জ্যাক দেরিদার মৃত্যুবরণের এই আবেগী মুহূর্তে আমরা তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। কিন্তু, যা বলে এ প্রবন্ধ শেষ করতে চাই তা হচ্ছে, শিক্ষাপ্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানচর্চায় দেরিদার অবস্থান/অবদান প্রগতির রাজনীতির জন্য বরং মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়েছে। এ কথা সাম্প্রতিককালের আরো অনেক বাচন এবং তত্ত্বের জন্যও সত্য। প্রগতিশীল ভাবুকের অবশ্য বাচন এবং তত্ত্বের প্রাধান্যের সর্বশেষ পরিস্থিতিকে অস্বীকার করা চলবে না। জ্যাক দেরিদার মতো তত্ত্বকারের যা কিছু মূল্যবান কৃতি, তাকে গ্রহণ না করাটা অন্ধত্বের শামিল।


উদ্ধৃত গ্রন্থাদি
আইজাজ আহমদ, লিজিয়ন্স্ অব দ্য প্রেজেন্ট-পলিটিক্যাল এসেজ, তুলিকা, নতুন দিল্লী, ১৯৯৬।

জেরেমি হথর্ন, অ’ অন্সাইজ গ্লোসারি অব কনটেম্পোরারি লিটারেরি থিওরি, তৃতীয় সংস্করণ, লণ্ডন, ১৯৯৮।

জ্যাক দেরিদা, “স্পীচ অ্যাণ্ড ফেনোমেনা” এ্যাণ্ড আদার এসেজ অন হুসারল’স থিওরি অফ সাইনস্ (অনুবাদ : ডেভিড বি এ্যালিসন) ইভান্স্টন : নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৭৩

------------------------------------------------------------------------
লেখকের নোট : প্রবন্ধটি সালাহ্উ‌দ্দিন আল্‌ ফারুকের সঙ্গে যুগ্মভাবে লিখিত।




লেখক পরিচিতি
কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়
কবি। প্রবন্ধকার।
অধ্যাপক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।


1 টি মন্তব্য:

  1. এই সুযোগে কোনো-কোনো তত্ত্ব আবার উদ্ভূত সাময়িক পরিবর্তনহীনতা-গতিহীনতাকেই সত্য এবং সঙ্গত বলতে চায়। কিন্তু, এগুলোর প্রবক্তারা শেষ বিচারে কায়েমি স্বার্থের পক্ষভুক্ত এবং সেজন্যই পরিবর্তনের পরিচালক যে জ্ঞান, তাকে তারা অসম্পূর্ণ, ত্রুটিপূর্ণ, এমনকি তা অর্জন অসম্ভব বলার প্রয়াস পান। বিভিন্ন যুগসন্ধিক্ষণে কমবেশি এই একই ব্যাপার দেখা গেছে। -- কাজল দা এই উপলব্দি টুকু দেয়ার জন্য অশেষ ধন্যবাদ , অনেকের জন্যে দরকারি, যারা গ্লাসনস্ত পেরেস্ত্রইকার অনুসারিদের জন্যে

    উত্তরমুছুন