বুধবার, ২৯ জুন, ২০১৬

চির উন্নত এক অতল ♦ দি থিফ’স জার্নাল

জাঁ জেনের উপন্যাস নিয়ে আলোচনা

বিপাশা চক্রবর্তী

ফরাসী নাট্যকার, কবি ও ঔপন্যাসিক পরবর্তীকালে রাজনৈতিক কর্মী জাঁ জেনের অভূতপূর্ব কাজ হল তার আত্মজৈবনিক উপন্যাস ‘দি থিফ’স জার্নাল’ বা চোরের জার্নাল। এই উপন্যাসটির অর্ধেক হল তার নিজের অভিজ্ঞতা আর বাকিটা কল্পনা। তিরিশের দশকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যখন গোপনে ভবঘুরেদের মতো জীবনযাপন করেছিলেন সে সময়কার আখ্যান।

বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৪৯ সালে ফ্রান্সের গালিমার প্রকাশনী থেকে। ১৯৬৪ সালে ২৬৮ পৃষ্ঠার ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করে গ্রোভ প্রকাশনী। ইংরেজিতে অনুবাদের কাজটি করেন বার্নাড ফ্রেৎমান। 
দি থিফ'স জার্নালের একটি স্তবকে লেখা আছে--

1932. SPAIN AT THE TIME WAS OVER-RUN WITH VERMIN, ITS beggars. They went from village to village, in Andalusia because it’s hot, in Catalonia because it’s rich, but the whole country was ripe for us. So I was a flea, and well aware that I was one. In Barcelona we preferred calle Mediodía and calle Carmen. Sometimes six of us would sleep on a mattress without sheets and we’d beg in the markets from dawn. A gang of us would leave the barrio chino and spread out along the Parallelo, carrying baskets, because housewives were more likely to give us a leek or turnip than a few cents. At midday we’d go back and make soup with what we’d collected. I am going to describe the customs of that vermin.’ 
--Jean Genet, The Thief’s Journal 

১৯৩২ সাল। স্পেনকে তখন ফকিন্নী নামক পোকায় খেয়ে শেষ করে ফেলেছে। মিসকিনগুলো এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যেত কারণ আন্দালুসিয়ায় খুব গরম, আর কাতালোয়নিয়ায় যেত কারণ ওই জায়গাটা ছিল পয়সাওয়ালা। তবে গোটা দেশটাই আমাদের জন্য ছিল একেবারে যুতসই।আমি তো একটা ডাঁশপোকা ছিলাম, এই ব্যাপারে আমি যথেষ্ট ওয়াকিবহালও ছিলাম। বার্সেলোনায় আমার পছন্দ ছিল কাইয়ে মেদিওদিয়া আর ঐ কাইয়ে কার্মেন সড়কটা। মাঝেমধ্যে আমরা ছয়জন বিছানার চাদর টাদর ছাড়াই মাদুর পেতে শুয়ে পরতাম। ভোর থেকেই বাজারে বাজারে ভিক্ষা শুরু করে দিতাম। আমাদের দলটা বাররিও চিনো থেকে হাতে ঝুড়ি নিয়ে ছড়িয়ে পরতাম পারাইয়েলোর দিকে কারণ গৃহিনী দু’এক পয়সা দেয়ার চেয়ে বরং শাকসবজি দিতেন । দুপুরবেলা আমরা ফিরে আসতাম আর যা পেয়েছি তা দিয়ে স্যুপ বানাতাম। আমি পোকাদের আচার আচরণ বর্ণনা করতে যাচ্ছি”।

 -‘দি থিফ’স জার্নাল’- জাঁ জেনে। 

দুর্দশার চরমে পৌঁছে জাঁ জেনে সিদ্ধান্ত নিলেন তাঁর এই অবস্থাকে সবচেয়ে মহৎ উচ্চতায় নিয়ে যাবেন। হীনতা নীচতা অমঙ্গল আর দুর্দশার তলানিতে ঠেকে যাওয়া জীবনটাকে তিনি রূপান্তরিত করবেন অসামান্য এক সম্পদে। সমাজের স্বাভাবিক ধর্ম বা নিয়মকে তিনি পরিত্যাগ করলেন। যাজকীয় রীতিনীতি, ধর্মীয় আরোপিত সকল সংস্কার আর কানুনের বিপরীতে অবস্থান নিয়ে তিনি নিজের জীবনকে রূপায়ন করলেন যার ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল এমন কিছু যা সত্যিকার অর্থেই মহৎ । 

জেনের ভেতরের রূপান্তরিত রূপটি বৈধতা পায় আরও পরে। বার্সোলনার বাররিও চিনো’তে কাটানো জীবন ছিল দীর্ঘ ও এলোমেলো। পরের দশটি বছর সে তাঁর অভিব্যক্তি প্রকাশের ভাষা খুঁজছে । অতঃপর সে ভাষা খুঁজে পায় প্যারিসের ‘লা সান্তে’ কারাগারে। একজন কয়েদির লেখা হিসেবে। যার ভাষা ও বর্ণনা ছিল অত্যন্ত কাব্যময়। দারিদ্রপীড়িত শৈশব, এতিম হিসেবে বেড়ে ওঠা, জন্ম-সনদে পিতার নাম না থাকা, অভাব, ক্ষুধা এসব কিছু তাঁকে ছুঁড়ে ফেলে চুরি, পতিতাবৃত্তি, সমকামিতা আর ভিক্ষার মতো সেই সব কর্মে যা সমাজের চোখে কলুষিত। অথচ যা সমাজ দ্বারাই নির্মিত। ক্ষুধা দারিদ্র্যর সাথে সংগ্রামরত একজন দাগী অপরাধীর প্রচণ্ড কঠোরতা ছাপিয়ে নিজেই নিজেকে চিনিয়ে দেন নিগূঢ় এক সত্যের সঙ্গে। অনেকটা স্ব-অভিষেকের মতোই নিজেকে দীক্ষা দেন রহস্যময় গোপনীয় এক মন্ত্রে। যে মরমী বিশ্বাসের আত্মিক পরিপূর্ণতা অর্জনের জন্য তাঁকে পাড়ি দিতে হয় দীর্ঘ পাথুরে পথ।

দি থিফ’স জার্নাল-এ জেনে নিজেকে একটি মাছি বা ডাঁশপোকার সাথে তুলনা করেছেন। যা স্পষ্টতই তাঁর অনুপযোগিতাকে নির্দেশ করে। একজন জাতিচ্যুত হিসেবে তিনি যেন সমাজের মণিমুক্তায় বিভূষিত অভিজাত বুর্জোয়া শ্রেণীর দেখতে সুন্দর ও নরম-কোমল মানুষগুলোর লজ্জাকে গর্বের সাথে নিজের ভেতর ধারণ করেন। যে গর্ব অন্য এক মূর্তি ধারণ করে প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে সমাজ থেকে ছিটকে পড়া ঐসব মানুষদের জন্য, তাদের পাশে থাকার জন্য। ঠিক একটি নিরেট প্রতিরোধকারী শিলাখণ্ড হয়ে। যে পাথর নদীর স্রোতকে বিভাজন করে নদীর সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে তোলে। অনেকটা আত্ম-অপমানের মতো যে অপমান তিনি নিজেই বেছে নিয়েছেন কিন্তু আসলে তা তাঁর দেশের সবচেয়ে লজ্জাজনক দিক। তাঁর দেশটি হয়ে ওঠে ‘পৃথিবীর গাদ’ একদলা নোংরা ময়লা।এবং জেনে হয়ে ওঠেন সেই ময়লার কবি, বোদলেয়ারের ভাষায় ক্লেদজ কুসুম যিনি একই সাথে কখনো হয়ে ওঠেন কাহিনীকার। 

শিক্ষার্থী বা অধ্যাপক কিংবা সমাজের যেকোনো মানুষ , কোন একটা সময় পথভ্রষ্ট হয়ে অস্বাভাবিক আচরণ করতে পারে। একটি পথভ্রষ্ট জীবনধারা ও সমাজে তার ভূমিকার চিত্ররূপকে আমরা আমাদের ভাষা ও বিশ্লেষণে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে থাকি। অপরাধকে একটি আলাদা জাত অথবা গুপ্ত কেতাবি বিদ্যা হিসেবে বিবেচনা করি। জাঁ জেনের দি থিফ’স জার্নাল এক পথভ্রষ্ট জীবনধারার অসাধারণ বর্ণনার একটি বই। বইটিতে জীবনের ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশের চিত্রায়ন করা হয়েছে। জীবনের অর্থ কি? এর ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশের চিত্র কেমন? এসব কিছু ফুটে উঠেছে।

 বইটি পাঠকের কাছে প্রচলিত নৈতিকতার প্রতি অমর্যাদা, লজ্জাজনক ও অনৈতিকতার বিরোধসমূহ অসাধারণ কাব্যিকতায় বিকল্প জীবন ব্যবস্থাকে উপস্থাপন করেছে। জাঁ জেনে লিখেছেন-- “দণ্ডিতরা ডোরাকাটা গোলাপি ও সাদা পোষাকে সাজে। যদিও এটা আমার হৃদয়ের কথা যে আমি মহাবিশ্বকে বেছে নিতে পেরেছি যেখানে আমি উৎফুল্ল/পুলকিত হতে পারি” (পৃঃ ৯)।
বইটি শুরু হয় জেনের চৌর্য জীবনের ঘটনার মাধ্যমে। তখন তিনি ফরাসী কারাগারে কয়েদি ছিলেন। জেনে কয়েদিদের “নিষিদ্ধ” জগৎ নিয়ে লেখেন। যে জীবন তিনি নিজে বেছে নিয়েছিলেন সেখানে বাস করবেন বলে। সমাজের চিরায়ত মূল্যবোধ ও নৈতিকতা পরিত্যাগ করেছিলেন। সেই সমাজকে তিনি বলতেন “তোমাদের পৃথিবী”। জেনের কাছে অপরাধ ও অপরাধীর মধ্যে পরম সখ্যতা ছিল। সেটি অবিচার বা বিদ্রোহ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়না, . . .“ ঠিক সেভাবে ঘৃণা, তিক্ততা, রাগ বা ঐ ধরনের কোন অনুভূতি আমার বোধ হয় না।” (পৃঃ ৯) 

সমকামিতা, লাম্পট্য, চৌর্যবৃত্তি, চরম দারিদ্র, বিশ্বাসঘাতকতা, প্রতারণা হেন কোন কু-কর্ম নাই যা জেনের জীবন দর্শনে, জীবনযাত্রায় দেখা যায়নি। তিনি যেকোনো পেশার একজন শিক্ষানবিস হিসাবে এ কুকর্মগুলিকে পরিপূরক হিসাবে বিবেচনা করতেন। নিজে তা বাস্তবে পরিণত করেছেন। সমগ্র বইতেই জেনে একজন অবিসংবাদিত নায়ক রূপে অজানা সব রোমহর্ষক ঘটনা চিত্রায়ন করেছেন। বইতে নিষিদ্ধ জগতের তাঁর অনেক বন্ধুর চরিত্রকে নিয়ে এসেছেন। অপরাধীর মনস্তাত্ত্বিক বিবরণের সাথে জেনের ব্যক্তি জীবনের উন্নয়ন যেন সামাজিক বইয়ের কোন অপরাধ তত্বকেও হার মানায়। 

ঘন সন্নিবদ্ধ সুললিত গদ্যে লেখা এই উপন্যাসটি পড়েই জাঁ পল সার্ত্রে তাঁর ভক্ত বনে যান। তাঁকে নিয়ে লেখেন ছয়শো পৃষ্ঠার বিশাল এক বই, ‘সন্তু জেনে- অভিনেতা এবং শহীদ। জাঁ পল সার্ত্রে এই বই সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন- “The mist beautiful book that Genet has written.” 

তাঁর লেখায় মুগ্ধ হন জাঁ ককতো, পাবলো পিকাসোর মত ব্যক্তিত্বরাও। দ্য নিউ ইয়র্ক পোস্টে বলা হয় -One of the strongest and most vital accounts of a life ever set down on paper. . . . Genet has dramatized the story of his own life with a power and vision which take the breath away. The Thief’s Journal will undoubtedly establish Genet as one of the most daring literary figures of all time.”            —The New York Post

এই উপন্যাসটিকে জাঁ জেনের আত্ম-আবিষ্কারের একটি অভিযাত্রা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। নৈতিকতার প্রতি উপহাসমিশ্রিত চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অবক্ষয়ের একটি নান্দনিক শিল্প হয়ে উঠেছে জাঁ জেনের ‘দি থিফ’স জার্নাল’। এ ধরনের বই লেখা হতে পারে এমন ধারণা সেকালে কারো ছিল না। আর একালেও যে এধরনের বই রচিত হচ্ছে তারও বিশেষ কোন নজির নেই। এই রচনার জন্য যে বিশেষ অভিজ্ঞতা প্রয়োজন তা জাঁ জেনের ছিল। বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে লেখা আর বানিয়ে লেখার মধ্যে পার্থক্য বুঝতে হলে পড়তে হবে ‘দি থিফ’স জার্নাল’। বইয়ের শেষে এসে জেনে ঘোষণা দিয়েছিলেন এর দ্বিতীয় খণ্ড রচনার। কিন্তু তাঁর এই ইচ্ছে কখনো পূরণ হয়নি। বইটি তিরিশের দশকের প্রেক্ষাপটে রচিত হলেও বইতে বলা বাস্তবতার চিত্র এখনকার সমাজেও বর্তমান। ‘দ্য থিফ’স জার্নাল’ তাই কালোত্তর এক আখ্যান হিসেবেই আমাদের কাছে ধরা দেয়। 

1 টি মন্তব্য:

  1. শিল্পীর সৃষ্টিকে বুঝতে হলেও শিল্প সত্ত্বা জরুরী। সরল, শৈল্পিক এবং নান্দনিক উপস্থাপনা। জাঁ জেনে এর সম্পর্কে জানিনা। তবে আপনার লিখা গুলোর মাধ্যমে বিখ্যাতদের সম্পর্কে ছোট্ট পরিসরে সুন্দর ধারনা পাচ্ছি।
    গল্পপাঠ এর প্রচ্ছদ এবং লিখা প্রকাশের স্টাইল সুন্দর। টেসলাকে চাই! ধন্যবাদ।

    উত্তরমুছুন