বুধবার, ২৯ জুন, ২০১৬

রুমা মোদকের গল্প : অনিরুদ্ধ আগুন

প্রস্তুত অঘোর গায়েন। আজ সারাদিন কোন দুর্বিপাকের চিন্তা আক্রমণ করেনি তার দৈনন্দিন কর্মব্যস্ততাকে। অথচ রাতে ঘোরটি তাকে তাড়া করে হঠাৎ। ঠিক যেমন অমাবস্যার অন্ধকারে চিরচেনা আঁকাবাঁকা সুনির্দিষ্ট গন্তব্যের পথটুকু পাড়ি দিতে গেলে আক্রমণ করে ভয়। রাত-বিরাতে ঘরে ফেরার সময় টের পায় অঘোর গায়েন।
গা ছমছম করা ভীতি, পিছনে অদৃশ্য কারো উপস্থিতির তাড়া, হৃৎপিণ্ডে হাতুড়ি পেটা নিয়ে ত্রস্ত দৌড়াতে থাকে চেনা পথে, গন্তব্যের দিকে। চেনা পথও তখন অচেনা লাগে। ফুরায় না। ঠিক তেমনই এই অতর্কিত ঘোরটির আক্রমণে, ভয়ঙ্কর কোন ভয়ে কেমন হাত পা কাঁপতে থাকে তার, নিরুপায় অসহায় লাগে নিজেকে, পালাবার যেন পথ নেই এই তাড়া থেকে। আবাল্য আবাসটিকেও অচেনা ঠেকে তার। মাচাঙহীন-জংধরা টিনের চাল, আধা টিন আধা বেতের বেড়ার আড়াল, ঘরের কোণে জীর্ণ চারপেয়ে চেয়ার, পাটের রশিতে ঝুলানো মলিন পরিধেয়, সব-সবকিছু বড় অচেনা লাগে। নিজেকে মনে হয় সম্পূর্ণ অচেনা অপ্রস্তুত কোন পরিবেশে।

ঘোর তাকে তাড়িয়ে আনে। দরোজা খুলে বাইরে কৃষ্ণপক্ষের রাত দেখে। চোখের পলক ফেলতে ভয় হয় অঘোর গায়েনের। পলক ফেললেই দাউ-দাউ আগুন। অঘোরের চেতনা গ্রাস করে। পলক ফেলে না সে, কিন্তু টের পায় সর্বগ্রাসী আগুন ধীরে ধীরে উঠে আসছে। চোখের সামনে সবকিছু অদৃশ্য করে কেবল আগুন জ্বলে দৃষ্টির মাঝখানে। উৎস কোথায় আগুনের, শেষই বা কোথায়, আঁচ নেই তাপ নেই অথচ কী ভীষণ বীভৎস সে আগুন জ্বলছে দাউদাউ। আলোহীন আগুনে কাটছে না কৃষ্ণপক্ষের গভীর-ছিদ্রহীন অন্ধকার। প্রচণ্ড ঘোরের তীব্র আগুনে হঠাৎ চোখে পড়ে অঘোরের-- ভয়ঙ্কর প্রজ্জ্বলিত আগুনের ঠিক মাঝখানে পুড়ছে অপরূপ এক নারী। ভাবে অঘোর গায়েন, এ সীতা, অশোক কাননের বন্দীত্ব শেষ, এবার শুরু তার অগ্নিপরীক্ষা। পরীক্ষা সতীত্বের। আর্যসন্তান শাসক রাম, অযোধ্যার রানীর আসন পাবার আগে অগ্নিপরীক্ষায় যদি পুড়ে যায় সীতা, পুড়ে ছাই-ভস্ম হয়ে মিশে যায় যদি ধুলার সাথে? 

কিন্তু সতী সীতার পুড়বে না কেশাগ্র। অথচ অঘোরের চোখের মণির মাঝখানে দাউদাউ আগুনে অদগ্ধ থাকতে পারছে না সীতা, পুড়ে অঙ্গার হচ্ছে, ছাই হচ্ছে। অস্থির উৎকণ্ঠা গ্রাস করছে তাকে, সীতা পুড়ে যাচ্ছে। সীতা সতী, বাঁচাতে হবে ওকে। অক্ষিগোলকের ঠিক মাঝখান থেকে তাকে উদ্ধার করতে চায় অঘোর গায়েন, দু’হাত বাড়ায়- ধরতে চায় সীতাকে। বাঁচাতে হবে ওকে, মাটি খুঁড়ে বের করে আনা শস্যশ্যামলা ধরণী-সীতা, লাঙলের ফলার আঘাতে জেগে ওঠে শস্যের বার্তা সীতা। সীতা পুড়লে ছাই হবে ধরণী, হবে শস্যহীন উষর। বিড়বিড় করে কাঁদে অঘোর গায়েন। 

সীতার দুঃখে আজীবন কেঁদেছে সে। চৈত্রের দাহকালে মাটির দোচালার নিচে রোগজীর্ণ পিতামহের অবাধ্য কাশির সাথে সীতার করুণ জীবনগাথা শোনার স্বপ্নাতুর কৈশোর থেকে আজো পর্যন্ত, যখন প্রৌঢ় গায়েন গাঁয়ে গাঁয়ে বায়না নিয়ে উৎসবে পার্বণে গায় সীতার বনবাস-পালা, তখনো সীতার দুঃখে অশ্রুতে ভাসতে থাকে তার সুর-কথা। সেইসাথে গভীর রাত উপেক্ষা করা ছেলে-বুড়ো-কুলবধুরাও কাঁদে। 

আশ্চর্য! এই সীতার মুখ যে তার কন্যা চন্দ্রাবতীর মুখের আদল! সীতা পুড়ছে নাতো চন্দ্রাবতী পুড়ছে, পুড়ে অঙ্গার হচ্ছে। ছাই হচ্ছে। চন্দ্রাবতী। এমন অসহায়ভাবে কেন পুড়ছে সে দুর্বিষহ আগুনে? মেয়ের মুখাবয়ব অঘোরের পালা বান্ধার প্রেরণা, অভাবী জীবনের পাথেয়, তার অবলম্বন। চন্দ্রাবতী কেন পুড়ছে আগুনে! তাকে কে নিক্ষেপ করেছে জ্বলন্ত অগ্নিতে? অস্থিরতায়-উৎকণ্ঠায়, ভীষণ যন্ত্রণায় উলোট-পালোট হয় তার অন্তরাত্মা। সমস্ত ভয় ঠেলে আসে তার কণ্ঠনালি দিয়ে। চিৎকার করে সে ‘চন্দ্রাবতী.....’। 

ঠিক তখন ঘোর কাটে তার। অস্থির দুশ্চিন্তায় ঘরে ঢোকে সে। স্যাঁতস্যাঁতে মেঝের এক কোণে তালি দেয়া চাটাইয়ে ঘুমাচ্ছে তার কন্যা চন্দ্রবতী। দীর্ঘসময় ঘোরাচ্ছন্নতায়, ঘেমে-নেয়ে নিজেকে খুব হাল্কা বোধ করে গায়েন। থামেনি বুকের কম্পনটাও, তবু ঘোর কেটে গেলে নিজেকে খুব নির্ভার লাগে। কন্যা চন্দ্রাবতী অক্ষত-অদগ্ধই ঘুমাচ্ছে নিশ্চিন্তে।

ক’দিন থেকেই গাঁয়ের উঠতি ছেলেগুলো বড় যন্ত্রণা করছে তাকে। রাজনৈতিক পার্টি অফিসে আড্ডা মেরে ক্যারাম খেলে, উঁচুস্বরে অশ্লীল গান গেয়ে, এ-দোকানে ও-দোকানে চাঁদা তুলে দিন কাটে তাদের। গায়েনকে দেখলেই পথ আটকায়, ‘কাকা গান গাইবা না? ময়না মিয়া খবর দিছে তোমারে। চন্দ্রারে লইয়া যাইও না, সাবধান। ময়না মিয়ার নজর ভালো না। আমরা ওরে পাহারা দিমুনে’, ইত্যাদি নোংরা কথাগুলো শুনে গা ঘিন ঘিন করে গায়েনের। 

দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে সে, আর সারাক্ষণ উৎকণ্ঠা তাড়া করে তাকে, কোথাও কোনো আসরে স্বস্তি পায় না গায়েন। কি পাপ যে করেছিল ইলেকশানের সময় ময়না মিয়ার জন্য গান বেঁধে। তার জন্য কি মেয়েটা বিপদে পড়বে এখন? বিপদে বুঝি ঠেলে দিল সে নিজেই? সংগ্রামের সময় ৬টা মাস আশ্রয় দিয়েছিল ময়না মিয়া। কালেমা শিখিয়ে, টুপি কিনে, নিজের আত্মীয় পরিচয়ে প্রাণ রক্ষা করেছে সহপাঠী ময়না মিয়া। ময়না মিয়ার ঋণ কোনদিন কোনভাবেই শোধ করা হয় না গায়েনের, মনে মনে কৃতজ্ঞতায় মাথা নত হয়ে থাকে তার। এতগুলো বছর পরে ইলেকশনে ময়না মিয়া ক্যান্ডিডেট হয়ে যখন ডাকে তার ক্যানভাসে গান গাওয়ার জন্য, না-করতে পারে না সে। গণ্ডগোল বেধেছে ময়না মিয়া পাশ না করাতে, ময়না মিয়ার দল ক্ষমতায় না যাওয়াতে। কে জানতো এমনটা হবে! এমন সর্বনাশ তাড়া করবে চন্দ্রাবতীকে। উৎকণ্ঠায় বাকি পুরোটা রাত দু’চোখের পাতা এক করতে পারে না গায়েন, স্নায়ু অবশ করে ঘুম এলেই বুকে হাতুড়ি পেটায়, হৃৎযন্ত্র ধড়ফড়িয়ে উঠে। বারবার দেখে মেয়ে তার অক্ষত আছে কি না। 

পাশ করা এম.পি সাহেবের বন্দনা করেও সম্প্রতি গান বেঁধেছে অঘোর গায়েন। এ সবই সে করেছে চন্দ্রাবতীর জন্য, ওকে নিরাপদ রাখার জন্য। খুব বাহবা দিয়েছেন এম.পি সাহেব। বলেছেন পিঠে হাত দিয়ে, ‘কিচ্ছু দরকার হইলে কইও...।’ কিন্তু কওয়া হয় না গায়েনের। ভয় আর লজ্জা এসে আটকে থাকে তার জিবের ডগায়, বলতে পারে না চেনা বখাটেগুলির উৎপাতের কথা। এম.পি সাহেবের ডান হাত এরা, যদি বিশ্বাস না করেন? অথবা চেয়ারম্যান সাহেবের মতো বলেই বসেন, ‘ছেলেদের দোষ দিও না, নিজের মাইয়ারে সামলাও’।

ভীষণ অসহায় লাগে গায়েনের, কী করবে সে যুবতী কন্যাকে নিয়ে, কার কাছে বিচার জানাবে, কোথায় নিরাপদ আশ্রয় পাবে! সারাটা রাত কাটে তার বিনিদ্র দুশ্চিন্তায়।

সে রাত থেকেই ঘোরগ্রস্ততার তাড়াটি যে স্থায়ি যন্ত্রণা হয়ে অঘোর গায়েনের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে মিশে গেছে, সেটি বোঝার মতো বোধবুদ্ধি যোগায় না অঘোর গায়েন আর চন্দ্রাবতীর। গ্রাম্য বাজারে ভিসিডি, পর্নোর রমরমা ব্যবসা, ডিশ এ্যান্টেনার উদ্দাম নাচ, জুয়া-লটারির সর্বগ্রাসী জোয়ার ভেদ করে অঘোর গায়েন পদ বান্ধে, গলার সবটুকু দরদ ঢেলে গান গেয়ে শোনায়। ক’জনই বা তারা শোনে সে পদ? আদ্যিকালের পালা? অঘোর গায়েনের তো শ্রম-ঘাম-মেধার কমতি থাকে না পালা বান্ধায়, কিন্তু উন্মত্তকালে কি মূল্য শ্রম, মেধার? কে বোঝে এসবের মূল্য, কে দেয় মর্যাদা? তার পরও পালা শুনতে এখনো যে কিছু জনসমাগম হয় অঘোর গায়েনের আসরে, তার জন্য তাদের কাছে কৃতজ্ঞতায় নত হয় গায়েন। অর্ধনগ্ন যুবক-যুবতীর নর্তন-কুর্দন ফেলে তার আসরে যারা আসে কেবল পালা শুনতে তাদের জন্যই গান গায় অঘোর, লুপ্তপ্রায় এ পেশাতেই জীবন চলে তার কষ্টেসৃষ্টে। টিমটিমে হারিকেনের আলোর মতো ম্রিয়মান পেশাটিকে নিয়ে প্রতিযোগিতাও করতে হয় তার অন্য গায়েনের সাথে। মেলা কিংবা পালা-আসরের মৌসুমে ধর্না দিতে হয় উদ্যোক্তাদের কাছে। শিল্পীসুলভ অহমিকা বাধ সাধে, অথচ এই আকালে পেটের ভাত যোগাড়ের অন্য ধান্ধা জানা নেই তার। পালা শুরুর আগে মঞ্চে নর্তক-নর্তকীর অর্থহীন উন্মত্ত নৃত্য দেখে রাগে ক্ষোভে ঘৃণায় অনেকবার এ পেশা ছেড়ে দিতে চেয়েছে সে। কিন্তু অঘোর আবিস্কার করে, কেবল পেটের ধান্ধা নয়, তাকে এ পেশায় টিকিয়ে রাখে অন্য নেশা- অন্য স্মৃতি। 

ধর্না দেয়াটা নিশ্চয়তার জন্য। মূলত সে জানে, অঘোর গায়েন পালা না গাইলে জাতে উঠে না কোনো আয়োজন। মৌসুমে তাকে নিয়ে টানা হেঁচড়াও হয় গ্রামে গ্রামে। উন্মত্ত নৃত্যের পরপরই সুর-পদের অপূর্ব সমন্বয়ে দর্শক-শ্রোতৃমণ্ডলীকে এমন মুগ্ধ করতে কে পারে অঘোর গায়েনের মতো? নিজের কৃতিত্বে নিজেরই অবাক হয়ে যাওয়ার নেশাটা তাকে জাপটে ধরে রাখে এ পেশায়, নইলে সে অনায়াসে হয়ে যেতে পারে মুন্সীর চালের আড়তের ম্যানেজার। আর মেয়েটা মুন্সীর ছেলের গার্মেন্টের সুপার ভাইজার।

আর সংসার ভেঙে পালিয়ে যাওয়া স্ত্রী সুলেখার স্মৃতিটা? আধপেটা দিন যাপন আর ছিন্ন পোশাকের আড়ালে গোপন গভীর এ স্মৃতিটা তাকে ক্লান্ত করে। কষ্ট ওকি দেয়? না, কষ্ট দেয় না। স্বস্তিবোধ তার মধ্যে কষ্টের জন্মই হতে দেয় না। সম্পন্ন গৃহস্থ কন্যার যদি দারিদ্র্যের নিষ্ঠুর কষাঘাত সহ্যের ক্ষমতা নাই থাকে, তবে এর জন্য তো তাকে দোষ দেয়া যায় না। পরাজিতের এমন সান্তনা অনুভব করে সে। এ যেন অক্ষমের সুখ। ক্ষমতাহীনের আত্মসমর্পণ! পেটপুরে বাপের ঘরে দুধভাত খেয়ে যে মেয়ে মানুষটা এককালে বড় হয়েছে, আড়তদার রহম আলীর ঘরে দুবেলা ভাতের নিশ্চয়তা, প্রিন্ট-করা শহুরে শাড়ি আর দু’চার পদ গয়নায় সেই সুলেখা আজ ভালো আছে। সুখে আছে, ভাবলে ঈর্ষা নয়, বরং অর্থহীন নির্বোধ সুখ আর স্বস্তিবোধ করে অঘোর গায়েন। 

চন্দ্রাবতী মায়ের প্রসঙ্গ তুলে খোঁটা দেয়, ‘বাবা তুমি কাপুরুষ’। এ শব্দটা মেয়ে শিখলো কোত্থেকে? মা ছাড়া বড় হওয়া গাঁও-গেরামের মেয়ে, কৈশোর না-পেরোনো বয়সেই অনেকখানি পরিণত। প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করা হয় না চন্দ্রাবতীকে, বরং আত্ম-আবিস্কারে মগ্ন হয় অঘোর গায়েন, সত্যি কি কাপুরুষ সে? দোষতো তার নিজের। কেন নিজের অবস্থা বিবেচনা না করে সে আত্মসমর্পণ করেছিল প্রেম আর মোহের কাছে? তার বান্ধা পালা শুনে সুলেখা পাগল হয়েছিল বলেই কি নিজের অভাবী-আধপেটা জীবনে ওকে জড়ানো কোনো বিবেচনাসম্পন্ন কাজ ছিল? কিন্তু কিই-বা করার ছিল? বয়সটা মোহাচ্ছন্নতার, অবাধ্য যৌবনের। কাপুরুষের মতো তখনো সুলেখার বারবার বিয়ে করার তাগিদকে অগ্রাহ্য করেছে সে, কালক্ষেপণ করেছে, ভৎর্সনা করেছে সুলেখাকে, ‘পাগলরে যদি বল নিজের ঘরে আগুন লাগাইয়া দিতে সে কি লাগাইবো?’ সুলেখাকে নিজের দুর্বহ জীবনের সাথে জড়াতে ঠিক বিবেক থেকে সায় পেতো না অঘোর -হয়তো এটা কাপুরুষতা। তবু সুলেখার সুখের কথা ভেবে কাপুরুষই থাকতে চেয়েছে সে, কিন্তু পারলো কই? ভালোবাসার ক্রমাগত আহবানের কাছে কত সময় কাপুরুষ থাকা যায়?

সুলেখা একসময় সুখের খোঁজে পালিয়েছে অঘোর গায়েনের অভাবী অনিশ্চিত জীবন থেকে। তাই বলে কি মিথ্যে ছিল সুলেখার কামনা আর ভোগের আবেগ? সে-আবেগের ফসল তার ‘চন্দ্রাবতী’। প্রাচীন কবি, ‘চন্দ্রাবতী’ প্রথম নারী, রাম-সীতাকে আশ্রয় করে কবি হয়ে উঠেছিল যে, গঞ্জের কলেজের নিরঞ্জন স্যার বলেছিলেন কাহিনীটা। সেই থেকে নামটা গেঁথে ছিল তার হৃদয়ে, বড় সাধ ছিল ‘চন্দ্রাবতী’র কাব্যখানা পড়ার। সত্যি কি এক নারী উপলব্ধি করতে পেরেছিল অন্য নারীর বঞ্চনার যন্ত্রণা? নিজের ঔরস আর সুলেখার গর্ভজাত চন্দ্রাবতীকে নিয়ে বড় স্বপ্ন তার। না, কোন সম্পন্ন ঘরের বউ কিংবা জজ-ব্যারিস্টার বানানোর স্বপ্ন নয়। কবি হবে চন্দ্রাবতী, পালা বাঁধবে। তার চেয়ে অনেক ভালো পালা। সাতগাঁয়ের মানুষ ছুটে আসবে তার সংকীর্ণ উঠোনে চন্দ্রাবতীর বান্ধা পালায় সীতার বঞ্চনার দুঃখে কাঁদবে বলে। এই স্বপ্নই তাকে বাঁচিয়ে রাখছে। কিন্তু ইদানিং ভয় তাড়া করে তাকে, বাস্তবের রূঢ়তা কি কেড়ে নেবে তাঁর স্বপ্নের আকাঙক্ষা? কেননা সুলেখা তো সেই ভয়ংকর বাস্তব। ঘর ভেঙে নতুন ঘরে আশ্রয় নেয়ার নির্দয় বাস্তব। 

বাজারের পথে হাঁটে গায়েন। পুরো বাজারে ভিড় প্রায় নেই বললেই চলে, সকাল থেকে অঝোর ধারায় বৃষ্টি হয়েছে, থেমেছে এই কিছুক্ষণ। ছনের ছাউনি বেয়ে টুপটাপ জলের ফোঁটা পড়ছে তখনো। গোমড়া-মুখো আকাশ কখন আবার ঝরতে বসে অঝোরে, ঠিক নেই। বাজারে কোলাহল সেই, দু-চার-আটজন মানুষের বিচ্ছিন্ন আলাপচারিতা। চারপাশ কাদায় থিকথিক করছে। দোকানে দোকানে ঝাঁপ ফেলা, পার্টি অফিসেরও। কাদা-পানি মাড়িয়ে তারাই হাটে এসেছে যাদের প্রয়োজনটাও অনিবার্য। এই বর্ষায় আগামী দু’মাসে কোথাও বায়না নেই গায়েনের। ঘরে খাবারের টানাটানি। মৌসুমে শোধ করে দেবার প্রতিশ্রুতিতে ধার-দেনা ছাড়া গত্যন্তর থাকে না এ সময়টাতে। কেউ খুব বেশি ফেরায় না। কেন না সময় মতো শোধ করতে অন্যথা হয় না তার। তাছাড়া অনেকেই তার পালার ভক্ত, বিশেষ সমীহ করে তাকে। এই ভরসাতেই বাজারে আসা। 

চায়ের দোকানে ব্যাটারি চালিত রেডিওতে উচ্চস্বরে বাজে গান। ভালো লাগে না গায়েনের। কী-বা সুর, কি-বা কথা, মানুষের মন কিসে ভুলবে! তবু গানটা শুনতে হচ্ছে। এ দোকানটাই তার বসার জায়গা। টেবিলের ওপরে গতকালের বাসি দৈনিক পত্রিকাটা-‘রাজধানীতে গার্মেন্টসে ভয়াবহ আগুন, শত শ্রমিকের মৃত্যু’ সংবাদটা চোখে পড়ে হঠাৎ গায়েনের। আর তখনই আবারও ভুলে যায় সে নিজের অস্তিত্ব-অবস্থান। ভুলে যায় এই দুর্যোগের দিনে হাটে আগমন হেতু, নিমিষে ঘোর পুনরায় গ্রাস করে তাকে। তার চোখের মণির ঠিক মাঝখানে আবার দাউদাউ জ্বলে সর্বগ্রাসী আগুন। ভয়ঙ্কর সে আগুনে পুড়তে থাকে সীতা-চন্দ্রাবতী। বাজারের ঘরগুলো অদৃশ্য হয়ে যায় অঘোর গায়েনের দৃষ্টিসীমা থেকে। হৃৎযন্ত্রে আবার হাতুড়ে পেটায়। অঘোর গায়েন ঘোরগ্রস্ত। এক হাঁটু কাদা মাড়িয়ে ত্রস্ত দৌড়ায় সে। দৌড়াতে থাকে চন্দ্রাবতীর দিকে। দু’চারজন পথচারী থমকে তাকিয়ে থাকে অবাক দৃষ্টিতে, দোকানী হাঁক ছেড়ে ডাকে, ‘গায়েন, কি অইলো, যাও কই, চা-ডা খাইয়া যাও’। গায়েনের শ্রবণ ক্ষমতা রুদ্ধ, তার দৃষ্টির মতোই। কিছুই শোনে না সে, কেবল দৌড়ায়, পুড়ে যাচ্ছে তার কন্যা সীতা সতী, চন্দ্রাবতী, পুড়ে যাচ্ছে কামের আগুনে। ধ্বংসের আগুনে। লোভের আগুনে। 

তারপর থেকে ঘটনাটা ঘটতেই থাকে ক্রমাগত। ঘোর গ্রাস করতে থাকে তাকে প্রতিদিন। বর্ষার অনটনের সময় মিলিয়ে যায় শরতের আগমনী ঢাকে, ভিড় বাড়তে থাকে হাটে, উদ্যোক্তারা নড়েচড়ে বসে। সব গায়েনরা ধর্না দেয়, অথচ অঘোর গায়েন কই? উদ্যোক্তারা জানে সুর-পালা-পদে যেভাবে মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধ করতে পারে অঘোর গায়েন, আর কেউ তা পারে না। অঘোর গায়েনের পালা না থাকলে ঠিকঠাক জমে উঠে না আসর। উদ্যোক্তারা এবার নিজেরাই ধর্না দেয় অঘোর গায়েনের ভাঙা ছাউনিতে। চন্দ্রাবতী ততদিনে বুঝে গেছে, এখন অস্বাভাবিক এক ঘোরের সাথে বসবাস তার পিতার, সুর উঠে না, পদ তৈরি হয় না। 

চন্দ্রাবতী উদ্যোক্তাদের জানায় তার পিতার অপারগতার কথা, যদিও কারণটা অবোধ্য। সহজে হাল ছাড়তে রাজি নয় উদ্যোক্তারা। এতোদিনের বাধা গায়েন, জোর করেই মঞ্চে উঠায় বার কয়েক। অভ্যাস বশে দু’একপদ গেয়ে ফেলে অঘোর গায়েন। তারপরই খেই হারিয়ে যায় তার। চোখের ভিতরে দাউদাউ জ্বলতে থাকে আগুন। সে আগুনে পুড়তে থাকে তার পদ-পালা-সুর, চন্দ্রাবতী, সীতা, পালিয়ে যাওয়া স্ত্রী সুলেখা। স্থান-কাল ভ্রষ্ট অঘোর গায়েন চিৎকার করে, ‘চন্দ্রাবতী সতী। সীতার মতো সতী। পুইড়ে ছাই হইয়া যাইতেছে কইন্যা আমার। অরে বাঁচাও......!’

হতচকিত দর্শককুল প্রথমে স্তব্ধ হয়ে যায়। তারপর হেনস্থা হয় উদ্যোক্তারা। চন্দ্রাবতী বার কয়েক পিতার সামনে দাঁড়িয়ে সাক্ষ্য দেয় তার উপস্থিতি, ‘এই যে বাবা আমি, পুড়ি নাই তো। যে পুড়ছে সে ফাতেমা, গার্মেন্টসে কাজ করে, আমি না বাবা’।

চন্দ্রাবতীর কথা ভেসে যায়, অর্থহীন। অঘোর গায়েন জাপটে ধরে চন্দ্রাবতীকে, ‘পুইড়ে যাচ্ছে আমার চন্দ্রাবতী!’

চন্দ্রাবতীর দীর্ঘশ্বাস ভেসে যায় অনিশ্চিত কালের বাতাসে। পুড়ে যাচ্ছে সতী সীতা, ফাতেমা কিংবা চন্দ্রাবতীর শরীর। ক্ষুধা, দারিদ্র্য আর যৌবনের অগ্নিপরীক্ষায় হেরে যাওয়া নারীরা। যেমনটা হেরেছে সুলেখা।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন