বুধবার, ২৯ জুন, ২০১৬

সালেহা চৌধুরীর গল্প : বেলি বেলোয়ারি

বেলি খালাকে বিশ বছর পর আবার দেখলাম। এতদিন ওরা হংকংএ ছিলেন। বেলিখালা আর তার স্বামী -- রফিকুর রশিদ। ওখানে ব্যবসাপাতি করতেন ওর স্বামী। বাচ্চাকাচ্চা নেই। সে নিয়ে খুব একটা আফসোস আছে বলে মনে হয় না। থাকলেও তার প্রকাশ নেই।
ব্যবসা নিয়ে ব্য¯ত মিস্টার রশিদ আর বেলিবেলোয়ারি বই পড়েন আর লেখালেখি করেন, ঘোরেন, কেনাকাটা করেন। উনি আমার ছোটচাচি। শুনেছি ওর মা এমন একটা নাম দিয়েছিলেন মেয়ের। বেলি বেলোয়ারি। নামটা তিনি বদলাননি। বলতেন -- বেশ একটা আনউজুযাল নাম। বদলাব কেন? দু একটা গল্পটল্প বা ‘হংকংএর চিঠিতে’ ওই নামটাই ব্যবহার করতেন তিনি। মাঝে মাঝে ‘হংকংএর চিঠি’ পড়েছি। এরপর লেখাটেখা আর দেখিনি। শুনেছি স্বামীর কী এক ব্যধি তাকে শয্যাশায়ী করে রেখেছে। তিনি স্বামীর চব্বিশ ঘন্টার সেবাযতেœ ব্য¯ত। আমি কখনো হংকং যাইনি। যে দুএজন গেছেন তারা ওদের বাড়িঘর দেখে মুগ্ধ হয়ে ফিরে এসেছেন। তিন একর জমির উপর বাড়ি। গাছ,ফুল, পাখির ভেতরে ওরা বসবাস করেন। কোন হাইরাইজ ফ্লাটে নন। বুঝতেও পারে সকলে ভালোবাসা আছে ও বাড়িতে। তারপর চাচা যখন মারা যান তিনি ঠিক করেন দেশে ফিরে আসবেন। 

তিনি ফিরে এসেছেন দেশে। চট্্রগ্রামের পাহারতলিতে একটা বাড়ি নিয়ে থাকেন। খুলশি যখন তেমন সমৃদ্ধ হয়ে ওঠেনি তখন ছোটচাচা বাড়িটা কিনেছিলেন। ‘হানি ডিউ’ বা ‘মধুশিশির’ ওদের নিজের বাড়ি।। যখন দেশে আসতেন ওখানে থাকতেন। তবে বিশ বছরে দেশে এসেছেন বার দুয়েক। এবার ফিরে এসেই বাড়ির পেছনে লাগলেন। বাড়ি মনের মত হতে হবে এই ছোটচাচির মনের কথা। ছিমছাম বাড়িটার চারপাশে আবার বাগান হলো। পাখিদের যাতায়াত শুরু হলো। আমিও চট্টগ্রামে ডাক্তারি করছি পনেরো বছর হলো। ওর বাড়ি থেকে একটু দূরে আমার বাস। আগ্রাবাদে আমারও একটা নিজের বাড়ি আছে। আমি আমার স্ত্রী পারিজাত আর মেয়ে পাপিয়া। আমার বাড়িটার নাম ‘পারিজাতবাড়ি।’ 

এখন এখানে থাকবে ছোটচাচি?

থাকব। একা বিদেশে থাকা যায় না। যদিও অনেক প্রতিবেশি ছিল, বন্ধুবান্ধব তারপরেও। মনটা কেমন হু হু করে বিদেশে থাকলে। 

এখানেও তো একা। 

বেড়াল, পাখি, হাঁস, মুরগী, ময়ূর। এ ছাড়াও একটা কাজের মানুষ। একজন চব্বিশ ঘন্টার মালি। ড্রাইভার। একজন বাজারসরকার কাম কুক, একা কোথায়?

তা ঠিক। একা কোথায় তুমি। 

তারপরেও এতসব বইপত্র? কেটে যাবে সময়। 

লিখছো আবার?

একটু আধটু। শোন হাশিম তুমি কিন্তু বাবা মাঝে মাঝে এসে আমাকে দেখে যাবে।

তাতো যাবই। প্রেশার বেশ এরাটিক তোমার। আর কলোসটরোলটাও নিয়ন্ত্রনে থাকা জরুরি। 

কেবল ওই কারণে নয়। তোমার সঙ্গে কথা বলতে বেশ। তা ছাড়া একা একা এতসব বাগানের শাকসবজি, ওগুলো তোমার সঙ্গে শেয়ার করা দরকার। তুমি এসো, পারিজাত আর পাপিয়া আসবে। এগুলো নিয়ে যাবে। বেশ একটু গেটটুগেদার মাঝে মাঝে মন্দ হবে না হাশিম। পিকনিক, হৈ চৈ। বার্বাকিউ। একটু খাওয়া দাওয়ার আয়োজন। তুমি না হয় সেদিন একটা নতুন কিছু করলে। আমি করলাম। 

ওসবে তোমার আগ্রহ আছে? মনে হয় একা থাকতেই তোমার বেশি পছন্দ। তাইতো মনে হয় নিরিবিলি বাড়িটাতে তোমার একা থাকা দেখে।

ওসবে আগ্রহ থাকবে না কেন্। তবে বয়স এখন বাষট্টি। মন যা করতে চাইবে শরীর তা মেনে নেবে কেন হাশিম? পাহাড়ের উপরে বাড়ি। মাঝে মাঝে হাঁটুটা কেমন টন টন করে। তবে হাঁটুর কারণে বাড়ি ছাড়ছি না। দরকার হলে হাঁটু বদলাব। তবে বাড়ি নয়। বলেই হাসেন তিনি। 

ঢাকায় থাকলে না কেন? যেখানে পাহাড় নেই। 

তুমিওতো ঢাকাতে নেই।

আমার চাকরির ব্যাপার ছোটচাচি।

আমার এ জায়গাটা ভীষণ পছন্দ। তোমার ছোট চাচা অনেক আগেই বাড়িটা কিনে রেখেছিলেন। একজন বিদেশী বাড়িটা বানিয়েছিলেন। দেশে যাবার সময় পানির দামে বাড়িটা বিক্রি করে চলে যান। বিশ বছর এ ও এসে থাকত। কেয়ার টেকার ছিল। এখন এ ও কে আসতে মানা করে দিয়েছি। তবে কেয়ার টেকার তো থাকবেই। দেখেছো কেমন সমৃদ্ধ হয়েছে জায়গাটা? ভাবতেই পারিনি যখন প্রথম বাড়িটা কিনি। এতটা পশ ছিল না যখন কিনেছিলাম। 

কথা বলতে বলতে বাগানে আসি। নানাসব সবজি। ফুল। দেশি ও বিদেশী। এবং নানা সব বাহারি গাছ। বলি -- কোন সিনেমার পরিচালক জায়গাটা দেখলে এখানে সুটিং করতে আসবেন। বড়ই রোমান্টিক জায়গা। যেমন জায়গায় নায়িকারা গাছের ডাল ধরে গান করে। নায়ক নাচে। হাত ধরাধরি করে ঘনঝোপের ভেতরে হারিয়ে যায়। 

আগে নায়ক নাচত না। এখন নায়কেরা এত নাচে কেন বলতে পারো?

হিন্দি সিনেমার বাতাস। এ ছাড়া আবার কি? দেবে নাকি কোন পরিচালক সুটিং করবার জন্য যদি বাড়িটা চান?

অবশ্যই না। তিনি একটা বেতের ব্যাগে সবজি তুলছেন। বললেন -- যাবার সময় নিয়ে যেয়ো। কিছু ফুল তুলেও হাতে দেন। বেশ একটু কাফতানে তার স্লিম শরীরটা ভালোই দেখায়। একটা খোঁপা করেছেন। কাঁটা সাদা হাতির দাঁতের। আমি চেয়ে আছি। বলি -- ছোটচাচি তুমি কিন্তু দেখতে এখনো বেশ।

ছোটচাচি কথা বলেন না। ফুলগুলো তোড়া বেঁধে হাতে দেন। বলেন -- এবার পারিজাত আর পাপিয়াকে আনবে। তুমি বলছিলে না সামনের মাসে পাপিয়ার জন্মদিন? জন্মদিনের পার্টি এই বাড়িতেই হবে। বল পারিজাত আর পাপিয়াকে। 

তোমার জন্মদিন কবে?

সাতই এপ্রিল। আসতে দেরী নেই। তখন একেবারে তেষট্টি। 

আমি হাসি। তারপর বলি -- তুমি সুটিং করতে দেবে না পার্টি করতে দেবে?

দুটো কী এক হলো। আমরা বাগানে পার্টি করব। বার্বাকিউ হবে। কেক কাটা হবে। একটু গান বাজনা। কিন্তু নায়ক নায়িকা নাচানাচি করবে সেটা কী করে হয়? এর সঙ্গে থাকবেন পরিচালক, ক্যামেরা, অন্যসব মানুষ, বাপরে বাপ! প্রশ্নই ওঠে না। একেবারে বাজার হয়ে যাবে জায়গাটা। এখন বল পার্টি এখানে করবে তো?

অবশ্যই ছোটচাচি। খুবই খুশী হলাম এমন একটা পরিকল্পনা করেছো তুমি সে কথা ভেবে।

তোমার জন্য একটু না হয় করলাম। আমি এসেছিলাম তার ব্লাডপ্রেশার দেখতে। প্রেশারটা ঠিক থাকে না। বাড়ে কমে। বলি -- কতদিন থেকে প্রেশার তোমার? 

তা ধর পনেরো ষোল বছর। 

মানে চাচার অসুখের সময় থেকে। তখন তো তোমার বয়স কম ছিল।

চাচা অসুখে পড়েন তখন আমার বয়স চল্লিশ। মারা যান তখন আমার বয়স ষাট। এখন বাষট্টি। মেঘে মেঘে কত বেলা হলো। এই বলে হাত দুটো উঁচু করে জোরে একটু নিঃশ্বাস নেন। পিঠটা সোজা করেন। আমি আর একবার তাকে বলিনা -- বাষট্টি হলেও তাকে দেখতে বেশ লাগে। বোধকরি তার চুলের জন্য। কালো চুল। ঘণ। খোঁপাও বেশ ঘণ। হয়তো তিনি চুল রং করেন। মেয়েদের চুলই তাদের সৌন্দর্য। আর হালকাপাতলা শরীরটাও তেমন করে বয়সের কথা বলে না। পারিজাত চুল ববকাট করেছে। মানা করেছিলাম শোনে নি। এখন ববকাটের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তেমন আর খারাপ লাগে না। মনে হয় পারিজাত আর ববকাট অবিচ্ছেদ্য। এটাই ওকে মানায়। 

বলি চাচার অসুখের জন্যই বোধহয় ওখানে তেমন কিছু করনি?

তাই হবে। অসুখটাতো ওকে হুইলচেয়ারেই বসিয়ে রাখতো। কোম্পানি চালাতেন বাড়িতে বসে। তবে শেষের পাঁচ বছর সেটা পারতেন না। এই বলে ছোটচাচি থামেন।

আমি আর ছোটচাচার অসুখের গল্প করে এই চমৎকার সকালটা পার করে দিতে চাইনা। নীল আকাশ। শেষ ফেব্রুয়ারি শীতের ভেতরে বড় চমৎকার রোদ, শীতের ফুল, সবজি সেখানে, এসব গল্প? থাক। শুনেছি অনেকবার অসুখের নানা কথা। যখন ডাক্তার বলেছিলেন -- এ রোগ ভালো হবার নয়। তখনকার কথা। আরো নানা সমাচার।‘হংকংএর চিঠিতে’ অবশ্য অসুখের কথা থাকত না। কেবল কী আছে, কী দেখলেন সেসবই ছিল। তবে সেটা বেশিদিন লেখেননি। বাংলায় এম এ করে একটা কলেজে পড়াতেন। তখন বিয়ে হয় ওদের। পরীক্ষাটা দেওয়া হয়নি। ছেলেপুলেও নেই। 

এ বাড়ির পড়ার ঘরটা বেশ। জানালা দিয়ে দূরের পাহাড়। আকাশ। গাছপালা। বুঝি এ ঘরটা তারও পছন্দ। বলেন -- বই পড়তে যারা ভালোবাসে তারা কিন্তু কখনো নিঃসঙ্গ নন। 

আমি পারিজাত আর পাপিয়া না হলে বাঁচব না। বই দিয়ে কোনদিন নিজেকে ভোলাতে পারব না। 

কে তোমাকে সেটা করতে বলছে? পাপিয়ার পর একটা পল্লব বা পলাশ না হলে মানায়?

পারিজাত সেটা চায় না। পড়াতে হয় ওকে। ক্যারিয়ারটা বড় ওর কাছে। আমিও কিছু বলি না। তবে একটা পল্লব টল্লব হলে মন্দ হতো না। 

চাচি হাসতে হাসতে বলেন -- চেষ্টা কর। 


জন্মদিনেই লোকটাকে দেখলাম প্রথম। বয়স বোধহয় পঁয়ষট্টি। বেশ একটু ছিপছিপে মানুষ। বিদেশী। তবে সেটা কোন বিদেশ দেখলে বোঝা যায় না। ছোটচাচি আলাপ করিয়ে দিলেন -- রবার্ট। হংকংএর বন্ধু। আমাকে দেখতে এসেছেন। বই আর নিঃসঙ্গতার ভেতরে রবার্টএর আগমন তাকে বিলক্ষণ খুশী করেছে বুঝতে পারি। তার পরণে বেশ চমৎকার একটা কর্ডের ট্রাউজার। তার উপরে এদেশের কাজ করা টপ। চুলগুলো একটা রাবারব্যান্ডে পেছনে ঝুলে আছে। কাঁধে একটা হালকা চাদর। ঠোঁটে লিপস্টিক। আর চোখে? কাজল না ভালোবাসা বোঝা মুশকিল। চোখ দুটো কালকের চোখ নয়। 

রাবার্ট উঠে হাত বাড়ায় হ্যন্ডশেক করতে। হাসেন মন খুলে। বলেন -- বেলির সঙ্গে হংকং পাঁচ বছর আলাপ। পরে আমি কাজে চলে যাই অস্ট্রেলিয়ায়। তারপর ওখানেই ছিলাম। এখন ওর সঙ্গে দেখা করতে আসা। বাংলাদেশ যে এত সুন্দর জানতাম না।

মনে মনে বলি তা তুমি থাক খুলশিতে। পাহাড়ের উপরের একটা চমৎকার ব্যাংলোতে। একেবারে বেস্ট অব বাংলাদেশে। তাই বলে তাকে আমাদের গরীব মানুষ বা ব¯িতর গল্প করতে হবে কিম্বা ঢাকার জানজট বা ভেজালের কথা বলে মন খারাপ করে দিতে হবে তার কোন মানে নেই। আমাদের দেশকে একজন বিদেশী মানুষ ভালো বলছেন সেটা নিয়ে চুপ করে থাকাই দেশপ্রেম। -- এখানকার সমুদ্রও সুন্দর। আমরা একটু ঘুরব। কতসব জায়গা -- কক্সবাজার, টেকনাফ, ছেঁড়া দ্বীপ, প্রবাল দ্বীপ, সের্ন্টমার্টিন। 

থাকবেন তো কিছুদিন?

ঠিক কতদিন বলতে পারছি না। ছোটচাচি হেসে বলেন -- পিছুটান বলে তো কিছু নেই। থাকো না এখানে বাঁকি জীবন বব। 

তিনি কোন জবাব দেন না। ইস মানুষ কতভাবেই না নিজেকে ভোলায়। আমার বই আছে, আমার গান আছে, আমার গাছপালা আছে। রাবিশ। আর একজন মানুষের সঙ্গটা একেবারেই উপেক্ষা করবার মত নয়। ছোটচাচির বয়স বাষট্টি হতে পারে তাতেকী? একজন মানুষ তাকে ভালো সময় দিতে এসেছে তাতে দোষেরই বা কী। তখন ছোটচাচি বই টই আছে বলে একটা পছন্দের প্রাণকে অস্বীকার করবেন তাই কী হয়? আর বয়স বলেই কেবল দিনরাত্রির তসবিদানা? সবাই কী তা পারে? পারিজাত একটু বাঁকা চোখে সেসব দেখছে। ও হলো নম্বর ওয়ান খুঁতখুঁতে আর বিশ্বনিন্দুক। জানি বাড়ি ফিরতে ফিরতে কী শুনতে হবে আমাকে। গাড়িতে উঠেই নাক কুঁচকে বলবে -- বাষট্টি বছরে ভিমরতি ধরেছে তোমার ছোটচাচির। সেসব কমেন্ট শুনে আমার কখনো কিছু এসে যায় না। বেলি বেলোয়ারি আর বব। বেশতো। একসঙ্গে থাকুক না কিছুদিন। ক্ষতি করছে না তো কারো। 

পার্টি জমে যায়। হৈ চৈ দেখে মনে হয় ছোটচাচির বয়স বাষট্টি নয় চল্লিশ কিম্বা তারো কম। তিনিই নানা পার্টিগেমের ব্যবস্থা করেছেন। শেষ পর্বে বব ভায়োলিন বাজিয়ে শোনায়। যন্ত্রটাতে যাদু আনতে পারে এত সুন্দর সে বাজনা। বুঁদ হয়ে চাচি শুনছেন সে বাজনা। বলেন -- তুমি আগের চাইতেও সুন্দর করে যন্ত্রটাকে বশ করেছো। দুই বছরে।

বব হাসেন। যন্ত্র রেখে দেন। তিনি বাংলা বোঝেন কিন্তু বলেন না লজ্জায়। পাছে ভুল হয়। যেমন আমরা ইংরাজি বলতে গেলে ব্যকরণ নিয়ে ভাবি। ওর বোধহয় উচ্চারণের ভয়। যখন দুজনে একা, কথা বলেন বাংলায়। বুঝলাম ছোটচাচিই ভাষাটা তাঁকে শিখিয়েছেন। হংকংএর পাঁচ বছরের বন্ধুত্ব। বোধকরি ছোটচাচা যখন অসুস্থ বন্ধুত্বটা দানা বেধে উঠেছিল। কতদূর গিয়েছিল সে বন্ধুত্ব? ওসব নিয়ে ভেবে কী হবে। যার যেমন জীবন কাটানোর ইচ্ছা। আর সেটা ব্যক্তিগত ব্যাপার হওয়া ভালো। 



ঠিক তাই। গাড়িতে উঠেই পারিজাত বলে আমি যা ভেবেছিলাম। -- ওমা তোমার ছোটচাচির ভাব দেখে মনে হলো ওর বয়স ষোল। 

আর তোমার ভাব দেখে মনে হয় তোমার বয়স আশি। আমি উত্তর দেই।

ও তুমি তাহলে এসব বেল্লেলেপনা সমর্থন কর। ছোটচাচা অসুস্থ আর উনি তখন বন্ধু জুটিয়ে নিয়েছেন। কে জানে কী করেছেন ওরা?

কী করবেন আর। তুমি এত নিন্দুক কেন বলতো পারিজাত? এত সুন্দর একটা পার্টি দিলেন তারপরেও? 

পারিজাত কথা বলে না। পেছনের সিটে পাপিয়া ঘুমিয়ে গেছে। নতুন জামা, ডলপুতুল আরো নানা উপহারের ভেতর। 

তুমিতো ছোটচাচি বলতে অজ্ঞান। তুমি তো তার কোন দোষই দেখবে না। 

ঠিক তাই। আমার ওকে ভালো লাগে।

কবিতাও লিখেছেন। ‘তুমি ফিরে এসেছো তাই রোদের রং গেছে বদল্।ে’ কী যে সব কবিতা! আমি চুপ করে শুনি। একটুপর পারিজাত চুপ করে। বাড়ি এসে গেছে প্রায়। 



ছোটচাচির বাড়িতে এখন আর বেশি যাওয়া হয় না। শুনেছি দুজনে নানাসব সমুদ্র উপকুলের জায়গায় ঘুরছেন। পারিজাত বলে -- লজ্জা বলে তোমার ছোটচাচির কিছু নাই। 

তোমার আছে। তাতেই চলবে আমার। ছোটচাচির থাক আর না থাক। 

পারিজাত বলে -- আমি যেদিন ঘুরব সেদিন বুঝবে।

ঘোর না। কে না করছে।

আমি তোমার চাচির মত সিলি নই।

বুঝলাম। পারিজাত উঠে চলে যায়। 


একদিন ফোন আসে। বলেন ছোটচাচি -- হাশিম তুমি কী একবার ববকে একটু দেখতে আসবে। ওর শরীরটা খারাপ হয়েছে। বলি -- অবশ্যই। 

ওকে পরীক্ষা করে মনটা খারাপ হয়। অসুখটা বোধহয় বেশ একটা কঠিন কিছু। ছোটচাচি ঘর থেকে চলে যেতেই বব বলেন -- আপনি বলবেন তেমন কিছু না। এই একটু সর্দি।

কেন?

না বলবেন না।

তাহলে আপনাকে একবার হাসপাতালে আসতে হয়। ভালোমত পরীক্ষা করতে হবে। কতগুলো টেস্ট করা দরকার। রক্ত এবং অন্যান্য। 

সেটা কেবল আমার আর আপনার ব্যাপার। ওকে বলবার দরকার নেই আমাকে হাসপাতালে যেতে হবে এতসব পরীক্ষার জন্য। 

ঠিক আছে। বলি আমি। বুঝতে পারি রবার্ট অসুখের কথা গোপন রাখতে চান। 



পরীক্ষা হয়ে গেছে। যা ভেবেছিলাম তাই। ফোনে বলি -- আপনাকে আসতে হয়। ভয় হচ্ছে সংবাদটা খুব ভালো নয়। তিনি বলেন -- আমি আসছি। 

ছোটচাচিকে কী বলবেন?

বলব এই একটু ঘুরতে গেলাম। 



তখন আর কেউ নেই। আমার চেম্বারে আমি ও রবার্ট একা। জানালায় শেষ সন্ধ্যার আলো। তিনি বসে আছেন। চিšিতত দেখায় না তার মুখ। যেন মনে মনে জানতেন এমন কোন খবরই পাবেন। একটু হাসি লেগে আছে। বলেন -- কতদিন?

মানে?

মানে কতদিন বাঁচব?

এমন সোজাসুজি প্রশ্নে আমি বিব্রত। বলি -- খুব বেশি হলে এক বছর। তবে অভিধানে মিরাকল বলে একটা কথা থাকে।

সেটা অভিধানের কথা। তিনি ক্লান্ত ভাবে চোখ বন্ধ করেন। বললাম -- অস্ট্রেলিয়াতে কী কিছু জানতেন না?

না। জানলে ওর কাছে আসতাম না। 

কেন এইসময় নিজের কোন প্রিয়জনের কাছেই তো আসে লোকজন। তিনি কী ভাবছেন। একটু গরম পড়ে গেছে বলে এয়ারকন্ডিশনটা অন করা। তিনি জানালায় গিয়ে দাঁড়ান। তারপর এসে বসেন। তার পরনে ট্রাউজার আর এদেশের বাটিকের ফতুয়া। কাঁচাপাকা চুলে জানালার আলো। বেশ একটু মেদহীন ছিপছিপে শরীর। তিনি এসে বসেন আবার চেয়ারে। বলেন -- আমি ওকে হংকংএ দেখেছি। একজন অসুস্থ স্বামী নিয়ে দিনের পর দিন কষ্ট পেতে। একটা অনিশ্চিত জীবন। শেষ পাঁচবছর আজ আছেন কাল নেই। বাজারে যান একা। রা¯তায় হাঁটেন একা। কখনো কোন সিনেমাথিয়েটারে তাও একা। হাসেন একা, কাঁদেন একা। একা বসেন পার্কে, একা সমুদ্রের ধারে। তখনই একদিন আলাপ হয়েছিল। আমার বউ দশ বছর আগে আমাকে তালাক দিয়ে চলে গেছেন আর একজনের সঙ্গে। এরপর থেকে আমিও একা। বুঝলাম ওর এই একা থাকার স্মার্ট ভাবটা এক ধরণের ভাণ। আসলে ভেতরে ভেতরে বড়ই অসহায় একজন। ভাব হয়ে গেল। ভীষন কষ্ট লাগলো জীবনানন্দে পরিপূর্ন একজন কেবল ভাগ্যের হাতে মার খেয়ে বসে আছেন। যেন পাখির ডানা কেটে দিয়েছে কেউ। 

এরপর বন্ধুত্ব। সম্পর্ক। এইবার তিনি চুপ করেন। সর্ম্পকের ব্যাপারে বেশি কিছু বলেন না। 

আমি জানতে চাইনি। সেটা কতদূর গেছে বা কী হয়েছে।

বললাম -- আপনি অস্ট্রেলিয়া গেলেন কেন?

একটা অফার পেয়েছিলাম পড়ানোর। ভেবেছিলাম ও হয়তো একদিন অস্ট্রেলিয়া আসতে পারে। না হলে আমি এসে সময় কাটিয়ে যাব। 

আপনি ছোটচাচিকে বলুন আপনার অসুখের কথা। জীবনের এই একটা বছর ওর সঙ্গে কাটান। কেন বলছেন না?

তিনি মাথা নাড়েন। -- সেটা হয় না।

কেন?

কেন বার বার মৃত্যুকে মানতে হবে ওর। কতজনকে সেবা করবে ও? ওর এর চেয়ে ভালো কিছু হওয়া বা পাওয়া উচিত ছিল। সি ডিজার্ভস বেটার। 

কিন্তু আপনি চলে গেলে সেটা ওর জন্য কষ্টের হবে।

সেটা আমার মৃত্যুর চাইতে বেশি নয় নিশ্চয়? বিছানায় শুয়ে কেবল ওর যতেœর জন পড়ে থাকব? তারপর মারা যাব? না, নিষ্ঠুরতার একটা সীমা থাকা উচিত। 

তিনি আবার থামেন। এক গ্লাশ ঠান্ডা পানি ফ্রিজ থেকে এনে দেই। তিনি পান করেন। চেয়ারে মাথা রেখে কী ভাবছেন। তারপর বলেন -- ওর জীবনের প্রথম প্রেমের গল্পটা জানেন নাকি?

না।

য়ুনিভার্সিটিতে পড়তে একজনকে খুব ভালো বেসেছিল। একজন উঠতি শিল্পী। লোকটা হঠাৎ করে ড্রাগ ওভারডোজে মারা যান। বেশ কিছুদিন ও বিয়ে করেনি। তারপর একসময় ওর বিয়ে হলো। জীবনে এলো স্বামী। দুজনের চরিত্রগত খুব একটা মিল না থাকলেও ভালোবাসা ছিল। তাকে নিয়ে দুশ্চিšতা করলেন কুড়ি বছর। যৌবনটা প্রায় পার হয়ে গেল এই করতে করতে। যৌবনটা হয়তো তরুণীর মত নেই আর কিন্তু প্রাণ একেবারে আনন্দময়। ওর সঙ্গ আমাকে উদ্দীপ্ত করে। আমার সব ক্লাšিত চলে যায় ওর কাছে এলে। তাই বলে এই নয় আমি বাঁকিজীবন ওকে ইমোশনাল ব্লাকমেল করে যাব। আমি সেটা পারব না। 

আরো নানা কথা। হংকংএর কথা। কোথায় কোথায় গেছেন এমনি কিছু কথা। কেমন করে বাংলা শিখলেন। রবীন্দ্রনাথকে কেমন লাগে তার। জীবনানন্দও বোঝেন। তারপর বলেন -- ওকে কিছু বলবার দরকার নেই। 

আমাকে যদি প্রশ্ন করেন?

বলবেন কেবল একটু সর্দি। বাঁকি স্বাস্থ্য খুবই ভালো। মনে রাখবেন আপনি কিন্তু আমাকে কথা দিয়েছেন, বলবেন না।

বলব না। আমি তাকে আস্বস্থ করি। 

তিনি ওঠেন। গাড়িটা দাঁড়িয়েছিল বাইরে। তিনি হাত নাড়েন। সাদাকালো চুলের ভেতর একখানি হাস্যোজ্জ্বল মুখ। 

আমি কয়েকদিন পর একটা কাজে ওদিকে গেছি মনে হলো দেখে আসি কী ঘটছে ওই বাড়িতে। গাড়িটা অন্য জায়গায় পার্ক করা। ধীরে ধীরে উঠছি। আমার কিছু এক্সারসাইজ দরকার। ডাক্তার বলেই অসুখ যে দূরে থাকবে তাতো হয় না। একটু হাঁটাহাঁটি আবার শুরু করতে হবে। দূর থেকে ‘হানিডিউ’ দেখতে পাই। জানালায় পর্দা। চমৎকার লনের ভেতরে জাহাজের মত বাড়িটা। বাইরের বারান্দায় কেউ নেই। আস্তে আস্তে উঠে বাইরের বারান্দায় দাঁড়াতেই ঘরের ভেতর একটা প্রবল ঝগড়ার শব্দ শুনতে পেলাম। আমি থমকে দাঁড়াই। 



তুমি এলে কেন যদি অস্ট্রেলিয়াতে? ওখানে তুমি এমন একজনকে পেয়ে যাও যাকে মনে হয়েছে -- এরই জন্য তোমার আজন্ম প্রতিক্ষা? তারপরে?

তোমাকে একটু দেখতে। কেমন আছো। 

করুণা করতে। তারপর এই খবরটা দিতে আর একজন এসেছে তোমার জীবনে। তাহলে এসেই চলে গেলে না কেন?

জায়গাটা বেশ। তাই থাকলাম কিছুদিন।

তুমি এমন একটা প্রতারক বুঝতে পারিনি।

রবার্ট নিঃশব্দ। 

সে কি খুবই সুন্দর? বয়স কত তার? 

বয়স? ঠিক জানি না। মেয়েদের যত মেকআপ বেরিয়েছে বয়স বোঝে সাধ্য কার। 

তুমি তাহলে ওকে বিয়ে করবে?

এখনো জানি না।

তুমি একটা হার্টলেস কসাই। তোমার প্রাণে কোন দয়ামায়া নাই। তুমি ----। ছোটচাচি কাঁদতে শুরু করেন। অন্য সোফায় বসে থাকা রবার্ট বলেন -- বেলি দি সান্ডেলিয়ার এখানে আর একজন হয়তো এসে যাবে তোমার জীবনে। এই পরিবেশে প্রাণময় একজন। 

কী করে এমন কথা বললে? সারাজীবন আমি তিনজন মানুষকে ভালোবেসেছি। য়ুনিভার্সিটির জীবনে কাজল মাহমুদ। আমার স্বামী। এবং তারপর তুমি। আমার হ্রদয়ে আর কোন জায়গা নেই। আর কোনদিন অন্য কেউ স্থান পাবে না।

সময় বলবে সে কথা।

না। আর কেউ না। ছোটচাচির গলার স্বর কান্নার ভেতরে কঠিন। বোঝা যায় তিনি যা বলছেন সেটা সত্যি। 

অন্য সোফায় নিঃশব্দ রবার্ট। বলে -- তাহলে লেখালেখি, বই পড়া, বাগান, সেলাই, ছোটখাটো পার্টি এসব নিয়ে থাকো। কতজনই তো শেষ জীবন এই ভাবে কাটায়। না হলে ঈশ্বরšিতায় ডুবে যাও। 

এখন তো এইসব উপদেশই আমাকে দেবে। একজনকে পেয়ে গেছ । তাকে নিয়ে বিশ্বভ্রমণে যাবে আর আমাকে করুণা করে হাসবে দুজনে। আমি ভাবতে পারিনি তুমি এমন, এত বেশি স্বার্থপর। তুমি একটা হার্টলেস ম্যান। হার্টলেস! সত্যিই তুমি হার্টলেস। ছোটচাচির গলায় আবার একটু কান্নার আওয়াজ।

আমাকে উঠতে হয় স্যান্ডেলিয়ার। সকালে প্লেন। গোছগাছ করি। রবার্ট বলছে। ছোটচাচির কোন অভিযোগের উত্তর নেই। বলেন কেবল কোমল করে -- একদিন তোমার মন শাšত হবে। 

হঠাৎ ছোটচাচি চিৎকার করে ঝঁপিয়ে পড়েন একটা ক্রুদ্ধ বেড়ালের মত। তার সার্টটা ছিঁড়ে ফেলেন। মুখ খামচে দেন। রবার্ট কেবল বলেন -- ছি এমন করে না বেলি। দেখবে একদিন আমার কথা ভেবে আর কষ্ট পাবে না। সময় সবচাইতে বড় নিরাময়ী ওষুধ - সময়। টাইম ইজ দ্য বেস্টহিলার। ইউ সি স্যান্ডেলিয়ার ----

বলছো না কেন আমি বুড়ি।

কে বলেছে সে কথা। তুমি চির তরুণী। ইউ উয়িল নেভার গ্রো ওল্ড। নট ইয়োর হার্ট। 

মাই ফুট। তখনো কাঁদছেন বেলি বেলোয়ারি। 

আমি আর বাড়িতে ঢুকি না। নিঃশব্দে চলে যাই। 


জাহাজের পাল তুলে একজন চলে গেলেন। ছোটচাচি অনেকদিন সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়েছিলেন। উদাস হয়ে, ক্রুদ্ধ হয়ে, শাšত হয়ে। বাগানে কতগুলো অজানা গাছের জন্ম হলো। বছরও চলে গেল। 

একদিন দেখলাম -- বাগানে চেয়ার পেতে কী একটা বই পড়ছেন। খোলা বাতাস চুল নিয়ে খেলছে তার। সামনে একটা ছোট ল্যাপটপ। তিনি তাকিয়ে আছেন ফুলের দিকে, পাতার দিকে, গাছের দিকে, আকাশের দিকে। সারি বেধে এক সার পাখি উড়ে গেলে তিনি তাকান চারপাশে। উড়তে উড়তে কিছু পালক রেখে যায় পাখি। 

আমি বুঝতে পারি জীবনের সঙ্গে সন্ধি হয়ে গেছে তার।



লেখক পরিচিতি

সালেহা চৌধুরী
ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, অনুবাদক ও কবি। শিশুসাহিত্যিক হিসেবেও তাঁর সুখ্যাতি আছে। দীর্ঘদিন থেকেই লিখছেন। প্রথম গল্পগ্রন্থ নিঃসঙ্গ প্রকাশ পায় উনিশশ সাতষট্টি সালে। সত্তর সালে প্রকাশ পায় সাহিত্য প্রসঙ্গে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে কর্মরত থাকা অবস্থায়। তারপর বিদেশে চলে যান। বিশ বছর বাদে আবার লিখতে শুরু করেন। গ্রন্থসংখ্যা সত্তরের কাছাকাছি। লিখেছেন দুটি ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ। ২০১৫ সালে কলকাতার আনন্দ পাবলিশার্স থেকে ‘পঞ্চাশটি গল্প’ নামে তাঁর একটি বই বেরিয়েছে। সালেহা চৌধুরী অনন্যা সাহিত্যপুরস্কার ও বাংলা একাডেমির সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ সাহিত্যপুরস্কার পেয়েছেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন