বুধবার, ২৯ জুন, ২০১৬

ধারাবাহিক উপন্যাস : মন্টু অমিতাভ সরকার--পর্ব ৩

কল্লোল লাহিড়ী

এই ধারাবাহিক উপন্যাসের আগের পর্ব দুটির লিঙ্ক--
পর্ব-১, 
পর্ব-২

----------------------------------------------------------------
তৃতীয় পর্ব
স্নেহের বরেণ, 

মানিকচকের বাজারসরকার মারফৎ সংবাদ পেলাম তোমার একটি পুত্র সন্তান হয়েছে। বংশের পিদিম জ্বালাবার লোকের যে অভাব ছিল তা বুঝি এবার ঘুঁচলো। সঙ্গে একটি দুঃসংবাদে হতবাক হলাম।
সন্তান প্রসবকালে তোমার স্ত্রী রানীর অকাল মৃত্যু। তুমি আর কি করবে বাবা? সবই বিধির বিধান। শোকে পাথর হবার সময় এটা নয়। বুক বেঁধে আবার গড়ে তোলো সংসার। পত্র মারফৎ বাজার সরকারের কনিষ্ঠা কন্যা শিউলী রানীর একটি ফটো তোমাকে পাঠালাম। কন্যা রূপবতী না হলেও গুণবতী বটে। সেলাই ফোড়াই, রান্না-বান্নার কাজে সিদ্ধহস্ত। প্রাথমিক শিক্ষার ব্যাপারেও সে দড়। নিজ নাম সহী সহ অক্ষর জ্ঞানের পরিচিতি তার আছে। তোমার ভাঙা সংসার জোড়া লাগলে সবচেয়ে খুশী হব আমি। এই বয়েসকালে সব কিছু জোড়া এবং গোটায় গোটায় দেখতে চাই। আজকাল চোখে ভালো দেখি না। অদ্যাবধি লেখার অভ্যাসটাও গেছে। পোষ্ট অফিসের এই কেরানী ছোকরাটিকে চার-আনা বকশিস দিয়ে পত্র লেখাতে হয়। পত্র-পাঠ উত্তর দেবে। আমি তোমার বিয়ের দিনক্ষণ নির্ধারণ করবো। 

আশীর্বাদান্তে

সকল মঙ্গল সূচক খবরের আশায়
তোমার জ্যাঠামশায়


পুনশ্চঃ তামাকুর ভালো তামাক পাইলে একটু পাঠিও বাবা। বর্তমানে ওই নেশাটিই বিদ্যমান। আর সব তো সঙ্গ ছেড়েছে। গাঁয়ে গঞ্জে কলকাতার মতো ভালো তামাক পাই কোথা? শুনলাম শহরে নাকি বিস্তর গন্ডগোল। ধড় পাকড় চলছে। যদিও এখানে তার লেশমাত্র নেই। তোমার বসানো সাদা গোলাপে কুঁড়ি এসেছে। ভালোকথা দাদাভাইয়ের নামকরণে তাড়াহুড়ার দরকার নাই। উহার জন্মছক মিলিয়ে নামকরণ করা লাগবে। জন্মের সময় দিনক্ষণ শীঘ্রই পাঠাবা। ওর জন্যে তো আর কিছু রেখে যেতে পারবো না। নামটাই না হয় আমার দেওয়া থাকলো।

বৃদ্ধ পুরুষের বজ্র গম্ভীর কন্ঠে অফ ভয়েজে এই চিঠিটা পড়া শেষ হওয়া মাত্রই আসবে ছবির টাইটেল কার্ড। সেখানে স্পষ্টভাবে বাংলায় গোটা গোটা অক্ষরে লেখা থাকবে... 

রানী ফিল্মস প্রযোজিত 
মন্টু সরকার পরিচালিত
বাংলায় প্রথম গ্যাঙস্টার মুভি

অমিতাভ। 

ছবিটা শেষ পর্যন্ত হয়নি। তার আগেই মন্টু মারা গিয়েছিল। মেরে ফেলা হয়েছিল লালবাজারের সাজানো চিত্রনাট্য অনুযায়ী। দাদুর চিঠিটা অনেকদিন পড়েছিল সেই কবেকার ছোট্টবেলার মন্টুর রাঙতা জমানো খেলার বাক্সে। তার সাথে ছিল হলদেটে হয়ে যাওয়া সাদা কালো একটা মেয়ে। ক্যামেরার দিকে ভয়ের চোখে তাকিয়ে। নাকে নোলক ছিল। কানে সোনার রিং ছিল। আর চোখ দুটো ছিল হরিণের মতো সরল। 

চিঠি পেয়ে বরেণ আর অপেক্ষা করেনি। আরও একটু গুছিয়ে বললে বলা ভালো, করতে দেওয়া হয়নি বরেণকে। ঘাড় ধরে মরা বউয়ের শ্বশুর বাড়ি থেকে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল মানিকচকে। প্রথম বৌয়ের পারলৌকিক নমো নমো করে সেরেই শিউলী রানীর সাথে বিয়ে হয়েছিল তার। ফুল শয্যার রাতে শুতে এসে বরেণ আবিষ্কার করেছিল শিউলির উন্মুক্ত বুকে মুখ ডুবিয়ে বসে আছে জন্মের সময়ে মা খাওয়া দিন পনেরোর এক ছেলে। সেদিন থেকেই মনে হয় চক্ষুশূল হয়েছিল ছেলেটি তার। পারতপক্ষে মন্টুকে দেখতে পারতো না তার বাবা। মন্টুও দেখতে চায়নি তার বাবাকে। সেই আক্রোশেই কিনা ঠিক জানা যায় না নব বিবাহিতা যুবতী মেয়েটির স্তনদুটি ছিঁড়ে খেয়েছিল মন্টু সেই পনেরো দিনের বয়স থেকে বছর সাত পর্যন্ত। দু-হাত দিয়ে চেপে ধরে ডলে ডলে সে দুধহীন স্তন থেকে দুধ বার করার চেষ্টা চালিয়ে যেত। আর একটু বড় হলে সেই মেয়েটিকে দেখতো নিরাভরণ হয়ে বাবার সাথে সাপের মতো পেঁচিয়ে শুয়ে থাকতে। মাঝে মাঝে সেই প্যাঁচানো শরীরের ওম পেতে মন্টু জেগে উঠতো। হামা দিয়ে এগিয়ে যেত খাটের শেষপ্রান্তে। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতো মেঝের দিকে। একদিন মিলন যখন তুঙ্গে সেই সময় মন্টু খাট থেকে পড়ে গিয়েছিল। এক ফোঁটাও কাঁদেনি সে। দুধহীন মুখে নিজের রক্তের স্বাদটা সেই প্রথম পেয়েছিল সে। বাঁদিকের ভুরুর ওপরে কাটা দাগটা তখন থেকেই। যে কাটা দাগটার ওপরে চুমু খেয়েছিল ডোমটা মন্টুর প্রাণহীন কপালে সেলাই করার সময়ে। ততদিনে এইসবে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল সে। 

বাংলা ব্যাকরণের লিঙ্গ হিসেবে কার শরীর যে মন্টুকে বেশি প্রলুব্ধ করতো তা নিয়ে বিশেষ মাথা ব্যাথা ছিল তার সেই বয়ঃসন্ধির সময় থেকেই। মেয়েদের শরীর তাকে টানতো না। একথা হলফ করে বুঝেছিল মন্টু। বুক দেখলেই দুধহীন শিউলীরানীর স্তন গুলোর কথা মনে পড়তো। সাপের মতো জড়ানো পেঁচানো দুটো শরীরের শিৎকারের শব্দ কানে আসতো। ক্লাস এইটে দুবার ফেল করার পর হেডস্যার যখন শেষবারের মতো তাকে সুযোগ দিলেন আর একবার ক্লাসে থেকে পাশ করার কঠিন শপথের দিকে ঠিক সেইদিন বিকেলে রাস্তা দিয়ে খেলতে যাওয়ার সময় বিশু তাকে ডেকেছিল পাতকো তলার পাশ থেকে। মন্টু একটু একটু করে এগোচ্ছিল। বিশু চান করছিলো বালতি বালতি জল তুলে। সাদা একটা ফিনফিনে গামছায় ফুটে উঠছিলো তার শরীরের সব লেখা, আঁকা-জোকা। তার শরীরের স্তুপ এবং ভঙ্গিল পর্বত গুলো। “আমি যখন স্নান করি হাঁ করে তাকিয়ে থাকিস কেন রে তোদের দোতলার জানলা থেকে?” বিশুর প্রশ্নে শিরদাঁড়া দিয়ে জল নামতে শুরু করেছিল মন্টুর। মনে হচ্ছিল তার শরীরের রক্ত প্রবাহে শীতলতার মাত্রা বেড়ে গেছে। পাশের বাড়িতে ভাড়া থাকা ফর্সা লম্বা বিশুকে দেখতে ভালো লাগতো মন্টুর। কেন ভালো লাগতো সে জানতো না। জানার কারণ ছিল যদিও অনেক। কিন্তু মন্টু মানব মনের গভীর গহনে ঝাঁপ দিতে ভয় পেতো। বিজ্ঞান স্যার বর্ষাকালে ব্যাঙের মিলন পদ্ধতি ব্যাখ্যা করলে শেষ বেঞ্চে বসে মন্টু ঘামতো। বাড়ি ফিরে বাথরুমে কেটে যেত কয়েকঘন্টা। শুধু চোখ থাকতো বিজ্ঞান বইয়ের লাইন দুটোর ওপর। দমবন্ধ হয়ে আসতো তার। হাত ব্যাথা করে উঠতো। অসুস্থ শিউলী রাণী দরজায় ধাক্কা দিতো “ও মন্টু...ও বাবা...কী করিস? অবেলার ভাত যে ঠান্ডা হয়ে যায়”। তারও অনেক পরে চোখ লাল করে মন্টু বাথরুম থেকে বেরোতো। মনে হতো অনেকক্ষণ ধরে ছেলেটা হয়তো কেঁদেছে। বিশু গালটা টিপে এক হ্যাঁচকায় মুখটা তুলেছিল মন্টুর। “শুনলাম এইবারও নাকি ডাব্বা খেয়েছিস? হেডু নাকি লাস্ট বার তোকে চান্স দিয়েছে?” মন্টু কোনো কথা বলতে পারে না। বিশুর প্রশ্নে নিরুত্তর সে। তার চোখ তখন বিশুর শরীরে। একটা ক্ষীণ জলের ধারা ফর্সা বুকের মাঝ বরাবর জন্ম নিয়ে সটান গড়িয়ে যাচ্ছে পেটের ওপর দিয়ে এক্কেবারে নাভির নীচে। “শালা ষোলো বছর বয়েস হয়ে গেল এখনও গোঁফের চুল গজালো না।” চুক্কি দেখিয়ে প্যান্টের ওপর দিয়ে টিপে দিয়েছিল বিশু। ব্যাথায় কনকনিয়ে উঠেছিল মন্টু। যে জায়গায় হাত দেওয়া ব্যক্তি স্বাধীনতার পরিপন্থী সেই জায়গায় প্রথম হাত পড়লো মন্টুর।

পাড়ার ক্লাবে। পার্টির মঞ্চে। চাঁদা তোলার সময়। ছোট-খাটো ঝামেলায়। গভীর রাতে অন্ধকার কোনের ঘরে ছোট্ট খাটে কলেজের ফাস্ট ইয়ারে পড়া বিশুর সাথে এরপর থেকে প্রায়ই দেখা যেতে থাকলো ক্লাস এইটে দুবার ফেল করা মন্টুকে। বিশু শুধু মন্টুর মস্তিষ্কে প্রবেশ করলো না, তার হাত গিয়ে পৌঁছোলো সবে ষোলোতে পড়া কৈশোরিক শরীরের নিষিদ্ধ স্থানে। সেগুলো উপভোগ করে তোলার নানা রকম এক্সপেরিমেন্ট করতে থাকলো বিশু। মন্টুর কোনো ভাব বিকার হলো না তাতে। ভেসে আসলো না সাপের মতো পেঁচিয়ে থাকা শরীরের শিৎকার। রক্ত মাংসের হাড় মজ্জায় যখন বিশুর শরীরের প্রত্যেকটা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ভেদ করতে চাইছিলো ঠিক তখন হাতে টর্চ জ্বালিয়ে একটা বইয়ের দিকে তাকিয়ে ছিল মন্টু। ‘লেলিনের বক্তৃতা সংকলন’। কুচোকুচো বরফ বৃষ্টির মধ্যে সমবেত জনগণের সামনে এইমাত্র বক্তব্য রাখলেন কমরেড ভ্লাদিমির ইলিচ লেলিন। চিৎকার করে বললেন “দুনিয়ার মজদুর এক হও”। লেলিনের কোটে, টুপিতে, উদ্ধত তর্জনীতে তখন শুধু বরফের কুচি। চারিদিকে নীল সাদা বরফের স্বপ্ন দেখতে দেখতে সেদিন বিশুর খাটে ঘুমিয়ে পড়েছিল মন্টু। সকালে লাথি মেরে বিশু যখন মন্টুকে ঘুম থেকে তুলে দিয়েছিলো তখন সে বিশ্বাসই করতে পারেনি তাদের খাটে শোওয়ার চাদরটা হয়ে গেছে রক্তে রাঙা এক পতাকা। মাঝে শুধু কাস্তে হাতুড়ি আর তারাটাই নেই। দূর থেকে ভেসে আসছে তীব্র হুইসিল। বরফের ওপর দিয়ে অসংখ্য বুটের এগিয়ে চলার আওয়াজ। হাজার শ্রমিকের পাশে নীল সাদা বরফের বৃষ্টি। এইমাত্র বক্তৃতা দিতে উঠলেন সবার প্রিয় কমরেড লেলিন। 

শুধুমাত্র এই বরফ বৃষ্টির স্বপ্ন দেখার জন্য প্রতিরাতে মন্টু বীশুর ছোট খাটটাতে আশ্রয় নিতো। যদিও আর রাঙা হয়ে উঠতো না বিছানার চাদর রক্তে ভেজা লাল রঙে। একদিন ঝুরঝুরে বরফ পড়ার স্বপ্নটাও যখন চলে গেল তখন ব্ল্যাক পয়েন্ট রেঞ্জ থেকে গুলি করেছিল মন্টু বিশুকে। 

খুলিটা উপড়ে গিয়েছিল তার। 

ছিটকে পড়েছিল ঘিলু। 

নীল-শাদা বরফের মধ্যে দিয়ে রক্তের রঙকে মনে হয়েছিল লালচে কালো।

ঘটনাটির কথা কেউ টের পায়নি। পাওয়া সম্ভব ছিলো না।

কারণ ঠিক সেই সময়ে সিকিমের বরফ ধূষর প্রান্তে কোনো ট্যুরিস্ট ছিল না। শুধু সাক্ষী ছিলো হাতের রিলভবার। ঝুরঝুরে শাদা বরফ যা দ্রুত ঢেকে ফেলছিলো ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া বিশুকে। আর একটু দূরে নীরবে দাঁড়িয়ে ছিলেন কমরেড ভ্লাদিমির ইলিচ লেলিন তার বক্তৃতা সংকলনের মধ্যে। তর্জনী উঁচিয়ে, জনতার দিকে তাক করে। ঠিক সেই মুহূর্তে খবর পেয়েছেন তিনি। সেদিনই পশ্চিমবঙ্গে প্রথম প্রবেশের অনুমতি আদায় করেছে পশ্চিমী দুনিয়ার বিখ্যাত বহুজাগতিক সংস্থার একটা ঠান্ডা পানীয়। 

মন্টু সেই ঠান্ডা পানীয় খেতে গিয়ে দেখেছে তার রঙও লালচে কালো।

যদিও সেই বহুজাগতিক পানীয়ে কোথাও সে খুঁজে পায়নি নীল-শাদা বরফ।

পেয়েছিল শুধু নিজের হাতে প্রথম খুন করা কমরেডের লালচে কালো রক্তের স্বাদ। (ক্রমশ)...

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন