বুধবার, ২৯ জুন, ২০১৬

লাতিন আমেরিকার ‘কুহকী বাস্তববাদে’র প্রেরণা ও প্রভাব

হামীম কামরুল হক

ইউরোপে উদ্ভূত হলেও জাদুবাস্তববাদের বিকাশ লাতিন আমেরিকায় এবং পরে এটি ছড়িয়ে পড়ে আফ্রিকা ও এশিয়ার সাহিত্যে। বর্তমান অব্দি এর যে প্রভাব ম্রিয়মাণ হয়নি, কারণ পেছনে রয়েছে এর অভিযোজিত হওয়ার ক্ষমতা। কী সে ক্ষমতা? সেটি নিহিত আছে উত্তর-ঔপনিবেশিক বাস্তবতায় এবং উত্তরাধুনিক চিন্তা-প্রতিবেশে।


ফ্রানৎস রোহ-র শনাক্তকৃত জাদুবাস্তবতা স্পেন হয়ে লাতিন আমেরিকায় পৌঁছানোর ভেতর দিয়ে এর নতুনমাত্রা পায়। দুজন কূটনীতিবিদ ও লেখক, এর একজন হলেন পিতা-মাতার দিক থেকে ফরাসি-রুশ এবং জাতীয়তা ও সাংস্কৃতির দিক দিয়ে কিউবান আলেহো কার্পেন্তিয়ের (১৯০৪-১৯৮০) এবং অন্যজন ভেনিজুয়েলীয় আর্তুরো উস্লার-পায়েত্রি (১৯০৬-২০০১)-- এঁরা দুজনে ১৯২০ থেকে ১৯৩০ পর্যন্ত প্যারিসে বাস করার সময় ইউরোপীয় শিল্পআন্দোলনের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হন। ইউরোপীয় শিল্প ও সাহিত্যে গভীরভাবে নিবিষ্ট কার্পেন্তিয়ের মূলত লাতিন আমেরিকার জাদুবাস্তবতার প্রধান উদ্গাতা হিসেবে স্বীকৃত (Bowers,2007:14) । ইউরোপ থেকে কিউবায় ফিরে তিনি হাইতি ভ্রমণে গিয়েছিলেন, তিনিই হয়ে ওঠেন লাতিন আমেরিকার আলাদা রকমের জাদুবাস্তববাদের ইন্ধন দানকারী ও প্রচারকারী। তিনি ১৯৪৯ সালে তাঁর ‘এল্ রেইনো দেল্ এস্তে মুন্দো’ (এই মর্তের রাজত্ব) উপন্যাসের সূচনায় উল্লেখ করেন লাতিন আমেরিকার ‘লো রেয়াল মারভিয়োসো’ বা অলৌকিক বাস্তবতার কথা। সেই ইন্দ্রজালে আচ্ছন্ন বাস্তবতার বর্ণনা প্রসঙ্গে সেখানে তিনি জোর দেন লাতিন আমেরিকার ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার ওপর। পরে অবশ্য ‘তিয়েন্তোস্ ই দিফারেন্সয়াস্’ (১৯৬৪; স্পর্শ ও ভিন্নতা) বইতে তিনি স্বীকার করেন যে বাস্তবের এই অলৌকিক দিক শুধুমাত্র লাতিন আমেরিকাতেই সীমাবদ্ধ নয়, তৃতীয় বিশ্বের অন্যান্য দেশেও তার নির্দশন রয়েছে। ‘এল্ রেইনো দেল্ এস্তে মুন্দো’ প্রকাশিত হওয়ার বছরেই গুয়াতেমালার মিগেল আন্হেল আস্তুরিয়াসের ‘ওম্ব্রেস্ দে মাইজ্’ (জনারের মানুষ) প্রকাশিত হয় যেখানে তিনি ‘কুহকী বাস্তববাদে’র কথা তোলেন (সুধীর,২০১১:৩৮২)।

কারো কারো মতে, ইউরোপের বাইরে জাদুবাস্তববাদের প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় হোসে ওর্তে-গা-ই গাসেত (১৮৮৩-১৯৫৫)-এর অবদানই সর্বাগ্রে। তাঁর সম্পাদিত Revista de Occidente নামে পত্রিকায় ১৯২৭ সালে তিনি জাদুবাস্তববাদের ওপর ফ্রানৎস রোহ-র লেখা রচনাটি অনুবাদ করেন। একই বছর মাসিমো বোনতেমপেই (১৮৭৮-১৯৬০) বিখ্যাত পত্রিকা ‘নোভেসেন্তো’-তে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধের মাধ্যমে জাদুবাস্তববাদ শব্দটি ইতালি ও ফ্রান্সে জনপ্রিয় করে তোলেন (ড. মোঃ মুহসিন, ২০১৪:৫)। ফলে আমরা দেখতে পাই জাদুবাস্তববাদের রেণু ইউরোপেরই ভেতরে ও বাইরে প্রায় কাছাকাছি সময়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ইউরোপে সাহিত্যের প্রকরণ হিসেবে জাদুবাস্তববাদের চর্চায় অস্ট্রিয়ান লেখক আলফ্রেড কুবিন (১৮৭৭-১৯৬৯), জার্মান লেখক আর্নেস্ট জুঙ্গার (১৮৯৫-১৯৯৮) এবং উইলহেম ইমানুয়েল সুশকিন্ড (১৯০১-৭০) প্রমুখের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো (ড. মোঃ মুহসিন, ২০১৪: ১৪)।

১৯৫৫ সালে সমালোচক আন্হেল ফ্লোরেস তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ Magical Realism in Latin American Fiction -এর মাধ্যমে ‘জাদুময় বাস্তববাদ’ (ম্যাজিক্যাল রিয়ালিজম) শব্দটিকে সমালোচক মহলে বিশেষভাবে পরিচিতি লাভ করান। পরবর্তীকালে ম্যাজিক রিয়ালিজম (জাদুবাস্তববাদ), ম্যাজিক্যাল রিয়ালিজম (জাদুময় বাস্তববাদ) এবং কুহকী বাস্তবতাবাদ (মার্ভেলাস রিয়ালিজম) তিনটি স্বতন্ত্র রীতি হিসেবে চিহ্নিত হয় ( Bowers,2007:16)|

‘জাদুময় বাস্তবতাবাদ’ বা ম্যাজিক্যাল রিয়ালিজম হল যাতে কোনো রচনায় আশ্চর্য ঘটনার বিবরণ উঠে আসবে প্রতিদিনের বাস্তবতা থেকে। ‘জাদুবাস্তববাদ’ বা ম্যাজিক রিয়ালিজম হল যেখানে একই সঙ্গে জাদু ও বাস্তবতা একই ক্যাপস্যুলের মধ্যে আঁটানো (encapsulate) থাকে। এবং ‘কুহকী বাস্তবতাবাদ’ বা ‘মার্ভেলাস রিয়ালিজম’ বিশেষভাবে লাতিন আমেরিকার জাদুবাস্তববাদ লগ্ন, এটি সেখানকার দৈনন্দিন জীবনে নিহিত জাদু ও বাস্তবতার উপস্থাপন। ফলে ‘জাদুময় বাস্তববাদ’কে আমরা বৈশ্বিকভাবে দেখতে পারি, ‘জাদুবাস্তববাদ’ মূলত ইউরোপীয় এবং ‘কুহকী বাস্তববাদ’ লাতিন আমেরিকার জন্য প্রযোজ্য পরিভাষা (term) হয়ে ওঠে (Bowers,2007:131)। যদিও সবদিক থেকে এর উৎস যেহেতু ইউরোপীয় এবং তা জাদু ও বাস্তবতাবাদের নিবিড় মিশ্রণে নির্মিত, তাই আমরা ‘জাদুবাস্তববাদ’ শব্দটিকেই সুবিধাজনক বলে বেছে নিয়েছি।

ফ্লোরেস অবশ্য জাদুবাস্তববাদের প্রথম কৃতিত্ব দিতে চান হোর্হে লুই বোর্হেস (১৮৯৯-১৯৮৬)কে। ১৯৩৫ সালে প্রকাশিত তাঁর গল্প সংকলন Historia universal de la infamia ইংরেজিতে A Universal History of Infamy (অপরাধের এক সর্বজনীন ইতিহাস )-- এর ভেতরে দিয়েই ইউরোপীয় সাহিত্য-প্রভাবিত কিন্তু সম্পূর্ণভাবে স্বতন্ত্র ও প্রকৃত লাতিন আমেরিকার এই জাদুবাস্তববাদের দেখা মিলেছে বলে ফ্লোরেস মনে করেন। ফ্লোরেস আরো মত প্রকাশ করেন যে, জাদুবাস্তববাদ উৎসগতভাবে ষোড়শ শতকের স্প্যানিশ লেখক মিগুয়েল দ্য সার্বেন্তেস (১৫৪৭-১৬১৬) এবং বিংশ শতকের চেক-অস্ট্রিয়ান লেখক ফ্রানৎস কাফকার (১৮৮৩-১৯২৪) (এর সঙ্গে অংশীদার হলেন চিত্রসমালোচক ফ্রানৎস রোহ-ও) প্রভাবে প্রভাবিত (Bowers,2007:17)। আমরা সার্বেন্তেসের নায়কের কল্পরাজ্য ও বাস্তবতার সংঘাতময়তার কথা জানি। তাঁর নায়ক দন কিহোতে মনে করে উইন্ডমিলের সঙ্গে নাইটকে অবশ্যই যুদ্ধে লিপ্ত হতে হয়। তিনি এক স্বপ্নতাড়িত মানুষ, কিন্তু তার সাগরেদ সাঙ্কো পাঞ্জা দেখে বাস্তবতার স্বরূপ; এবং এই দুয়ের কীর্তিকা- দেখে পাঠকের দেখতে পান, আধুনিক ব্যক্তি-মানুষের বাস্তবতা ও বিশ্বাসের সংকটের স্বরূপ। ফ্লোরেস বিশেষভাবে জোর দিয়েছেন কাফকার ‘মেটামরফোসিস’(১৯১৫) বা ‘রূপান্তর’ গল্পের ওপর। এই গল্প বাস্তববাদী রচনাশৈলীতে একজন মানুষের পোকা হয়ে যাওয়ার কাহিনি। এছাড়া তিনি ইতালীয় চিত্রকর জিয়ের্জিও ডি সিরিকো (১৮৮৮-১৯৭৮)-কে জার্মানিতে সৃষ্ট জাদুবাস্তববাদী চিত্রকরদের অগ্রদূত বলে উল্লেখ করতে চান। বোর্হেসের ওপর কাফকার প্রভাব ((Kafka,1993:6) বিশেষভাবে পড়েছিল-- সেটি তো বলা বাহুল্য। সবমিলিয়ে আমরা দেখতে পাই, জাদুবাস্তবতা নানান সংস্কৃতি থেকে মিশ্রিত একটি শিল্পকৌশল। এজন্যই ম্যাগি অ্যান বাউয়ার্স বলেছেন,‘‘ The mixture of cultural infuences has remained a key aspect of magic realist writing.Ó (Bowers,2007:18) ফলে পরবর্তীকালে জাদুবাস্তববাদী লেখকদের দেখা মিলতে থাকে ভারত, কানাডা, আফ্রিকা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। বর্তমানে বিশেষভাবে খ্যাতিমান লেখকদের একজন যে সালমান রুশদি তিনি মূলত গ্যুন্টার গ্রাস ও গাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেস দ্বারা প্রভাবিত। জাদুবাস্তবতাবাদে বিভিন্ন দেশ ও সাংস্কৃতিনির্ভর জটিল উদ্ভাস তৈরি হয়, কারণ এর প্রভাব আন্তঃর্সম্পর্কিত (ইন্টার-রিলেটেড) এবং সাহিত্যের নানান শাখা-প্রশাখা হতে ছড়িয়ে পড়ে।

কিন্তু লাতিন আমেরিকার ক্ষেত্রে এই জাদুবাস্তববাদ কেন সবকিছু থেকে আলাদা এবং জাদুবাস্তববাদ শব্দটির সঙ্গে লাতিন আমেরিকার সাহিত্য কেন প্রায় সমার্থক হয়ে গেছে তার একটি বিশেষ কারণ আছে। লাতিন আমেরিকায় জাদুবাস্তববাদী সাহিত্যরীতি প্রচলনের একেবারে শুরুর দিকে আলেহো কার্পেন্তিয়ের ইউরোপীয় জাদুবাস্তববাদের ভিন্নতাটি চিহ্নিত করেন এবং লাতিন আমেরিকার জাদুবাস্তববাদকে সংরক্ষিত করতে চান lo real maravilloso amricano নামে, যাকে বলা হচ্ছে আমেরিকার কুহকী বাস্তবতাবাদ। তিনি দেখেছিলেন যে, ইউরোপীয় জাদুবাস্তববাদের সঙ্গে এর সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের সংযোগ নেই। সেখানে এটি ‘কষ্টকল্পনার’ মতো। চরম যুক্তিবাদী ইউরোপে সেটি পরিণত হয়ে রূপকথা-পুরাণে, এবং এ মহাদেশের সাংস্কৃতির গহীন-ভেতর থেকে জাদুবাস্তববাদ উঠে আসে না। সেটি কেবল একটি রীতিকৌশল হিসেবে দেখা দেয়। এটি ইউরোপীয় লেখকদের সাহিত্য নির্মাণে এর ভূমিকা বাহ্যিক। অন্যদিকে লাতিন আমেরিকার জাদুবাস্তববাদ এর অন্তর্গত ‘সাংস্কৃতিক-স্বরে’ পরিণত হয়েছে (Carpentier,1995a:89 )|

হাইতিতে তিনি পরিচিত হন আফ্রিকার জাদুবিশ্বাস ভুডুর সঙ্গে, পশ্চিম আফ্রিকার পুরাণের সঙ্গেও-- যেগুলি আফ্রিকান-আমেরিকান ফোকলোরে উপস্থাপন করা হয়। এতে প্রভাবিত হয়ে তিনি তাঁর উপন্যাস ‘এই মর্তের রাজত্ব’-তে দেখান যে চরিত্রগুলি ইচ্ছামতো অন্যপ্রাণীতে রূপান্তরিত হতে পারে, যখন তারা মারা যায় তারা আকাশ পথে উড়ে যেতে পারে। যদিও এর কেন্দ্রীয় চরিত্র তি নোয়েল কিছুটা সংশয়ী ছিল ভুডু নিয়ে, কিন্তু তার গুরু মাকান্দাল তাকে আফ্রিকার পুরাণ ও জাদুবিশ্বাস সম্পর্কে শেখায়, যাতে সে দাসবিদ্রোহের সময় এর মাধ্যমে শক্তি অর্জন করতে পারে।

‘‘সবাই তারা জানতো যে সবুজ গিরগিটি, নিশিপোকা, অদ্ভুত কুকুর বা অবিশ্বাস্য গাংচিল আসলে নানারকম ছদ্মবেশ ছাড়া আর-কিছু নয়। আর মাকান্দাল যেহেতু নানারকম চেহারা নিতে পারে-- খুরওলা জন্তু, পাখি, মাছ আর পোকামাকড়ের-- অতএব সে রোজ রাতে আসে সমভূমির খামারে, তার বিশ্বাসী অনুচরদের ওপর নজর রাখতে, আর এটাও জেনে নিতে যে, সে যে একদিন ফিরে আসবে, এ-বিষয়ে এখনও তাদের পুরোপুরি আস্থা আছে কি না। এই-ঐ রূপান্তর, যাতেই হোক না কেন, এই একহাতের মানুষটির আছে সবাধানে, সবখানে-- বিশেষত এখন যখন তার জীবজন্তু ছদ্মবেশ পরার অতিলৌকিক ক্ষমতা আছে। একদিন ডানা নেড়ে, অন্যদিন খুরে ঠকাঠক তুলে, কদম-কদম বা বুকে হেঁটে, সে এবার প্রভু হ’য়ে উঠেছে পাতালের সব ¯্রােতগুলির আর এইভাবে সে এখন শাসন করে সারা দ্বীপ। অসীম তার ক্ষমতা। সে যেমন অনায়াসেই পারে কোনো মাদী ঘোড়ার সঙ্গে সংগম করতে, তেমনি পারে কোনো চৌবাচ্চার ঠা-ায় বিশ্রাম নিতে; যেমন দুলতে পারে কোনো দোদুল ডাল থেকে তেমনি গ’লে যেতে পারে কোনো চাবরি ফোকর দিয়ে; কুকুরে তাকে দেখে ঘেউ ঘেউ করে না; ইচ্ছেমতো সে বদ্লে ফেলতে পারে তার ছায়া। এই-যে এক নেগ্রো মেয়ে এমন-এক ছেলের জন্ম দিলো মুখটা বুনো বরার, সে তো তার জন্যে। রাত্তিরে সে দেখা দেয় রাস্তাঘাটে, গায়ে কোনো ছাগলের চামড়া, মাথায় দাউ দাউ আগুনের শিং। একদিন সে নিশ্চয়ই দেবে মহাবিদ্রোহের সংকেত, আর ঐ দূর অতীতের প্রভুরা-- যাঁদের পুরোভাগে আছেন পথের দেবতা দম্বোলা আর তলোয়ারের দেবতা ওগুন-- তাঁরা নিয়ে আসবেন বজ্র আর বিদ্যুৎ আর লাগাম ছিঁড়ে বার ক’রে দেবেন ঘূর্ণিঝড় যা মানুষের সব হাতের কাজ চুকিয়ে দেবে। সেই মহান লগ্নে-- তি নোয়েল বললে-- শাদাদের রক্ত ব’য়ে যাবে ঝরনা দিয়ে আর লোয়ারা-- আনন্দ উচ্ছল-- সেই ঝরনায় গুঁজে দেবে তাদের মুখ, আর যতক্ষণ না ফুশফুশ ভ’রে যাবে কানায়-কানায়, পান ক’রেই চলবে একটানা।’’ ( মানবেন্দ্র, ১৯৯১: ২৭-২৮)

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের খোয়াবনামায় কাৎলাহার বিল শাসন করেন যে-মুনসি বয়তুল্লা শাহ, তাকেও দেখা যায় এমন করে অন্ত্যজ মানুষের বিদ্রোহ-সংগ্রামের প্রেরণদাতা হিসেবে, এবং মাকান্দাল যেমন দ্বীপ শাসন করেন, বয়তুল্লা শাহও তেমন বিল শাসন করেন; এবং তিনিও মাকান্দালের মতো বহুরূপ ধারণ করতে পারেন--

‘‘এই সময় বেড়াজালের দড়ি টানতে টানতে বিলের মাঝখানে আসমানে এসে দাঁড়ায় বয়তুল্লা শাহ। তার আগে আগে সাঁতার কেটে চলে যায় ভেড়ার পাল। মুনসিকে এক নজর দেখার জন্য সুযোগটা নিতেই তমিজের বাপের এখানে আসা। মুনসি কখনোই বেশিক্ষণ থাকে না। ওপরে আসমান আর নিচে পানি ও জমিন একেবারে একাকার। সবখানে মুনসির ইচ্ছামতোন বিচরণ। সবাইকে এক লহমার জন্য এক জায়গা ঠাঁই করে দিয়ে জাল নিয়ে সে উড়াল দেবে উত্তরের দিকে। বাঙালী নদীর পথভোলা রোগা একটি ¯্রােত এসে মিশেছে সেখানে কাৎলাহার বিলে। বিলের শিওরে পাকুড় গাছে বসে সকাল থেকে শকুনের চোখের মণি হয়ে ঢুকে মুনসি সূর্যের আকাশ পাড়ি দেওয়া দেখবে, দেখতে দেখতে হঠাৎ রোদে মিশে গিয়ে রোদের সঙ্গে রোদ হয়ে ওম দেবে বিলের গজার আর শোল আর রুই আর কাৎলা আর পাবদা আর ট্যাংরা খলসে আর পুঁটির হিম শরীরে। আর হয়রান হয়ে পড়লে পাকুড় গাছের ঘন পাতার আড়ালে কোনো হরিয়াল পাখির ডানার নিচে ছোটো একটি লোম হয়ে নরম মাংসের ওমে টানা ঘুম দেবে সারাটা বিকাল ধরে।’’ (ইলিয়াস,১৯৯৬: ১০-১১)

এতে করে বোঝা যায়, ইলিয়াস তাঁর খোয়াবনামা রচনায় বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি, লোকজ বিশ্বাস, জীবজন্তু, পাখি, মাছের ভেতর দিয়ে রূপান্তরিত হওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন বয়তুল্লা শাহের যে অবয়ব নির্মাণ করেছিলেন, তা জাদুবাস্তববাদ প্রভাবিত এবং সেটি বাংলা উপন্যাসের প্রচলিত রীতিতে থাকা চরিত্রগুলির চেয়ে অনেকখানি ভিন্ন। তাঁর প্রেরণার পেছনে যা-ই থাক, রীতির দিক থেকে এতে জাদুবাস্তববাদের লক্ষণ আমাদের বিশেষভাবে খেয়াল করার আছে। যদিও দৈনন্দিন বাস্তবতার ভেতরে যে জাদুময়তা, যেটি লাতিন আমেরিকার ‘কুহকী বাস্তবতা’র প্রধানতম দিক-- সেটি ইলিয়াসের এই উপন্যাসে নেই, কিন্তু এর অলৌকিক আবহের প্রভাব তাঁর এ উপন্যাস যথেষ্ট পড়েছে-- কাৎলাহার বিল শাসনের লোকজ পুরাণকে নিজের মতো করে নির্মাণ করতে গিয়ে। কার্পেন্তিয়েরও কিন্তু এই রীতিটি কেবল ইউরোপ থেকেই পাননি, তার সঙ্গে মিশিয়েছেন ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার সংস্কৃতি ও প্রতিরোধের ঐতিহ্য। বিশেষ করে এসেছে ক্যারেবীয় অঞ্চলের প্রভাব, এবং এই মিশ্রিত বিষয়টিকে তিনি বলেছেন চেতনার দিক থেকে এটি ‘বারোক’ রীতি--


'' And why is Latin America the chosen territory of the baroque? Because all symbiosis, all mestizaje, engenders the baroque. The American baroque develops along with the criollo culture, with the meaning of criollo, with the self-awareness of the American man...; the awarness of being Other, of being new, of being symbiotic, of being a criollo. '' (Carpentier,1995b:100)

লাতিন আমেরিকার জাদুবাস্তবতাকে বুঝতে হলে বারোক রীতির মূল দিকগুলিতে দৃষ্টি দিতে হবে। কাহিনি, ঘটনা, চরিত্র নির্মাণ এবং সময়ের বিন্যাসের কলাকৌশল আর রূপক উপমা উৎপ্রেক্ষার যেসব রীতি বারোকে দেখা গিয়েছিল ষোড়শ-সপ্তদশ শতকের স্পেনে (মানবেন্দ্র: ২০০৩:২০), সেটি এক সময়ে বহু ব্যবহৃত হতে হতে জীর্ণ ও ক্লিশে হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু বর্তমানে সেই বারোক রীতিকে কাজে লাগিয়ে অসাধ্যসাধন করা যাচ্ছে। হাইতিতে গিয়ে কার্পেন্তিয়ের যে-সাহিত্যরীতি আবিষ্কার করেছিলেন, তাতে লাতিন আমেরিকার কুহকী বাস্তবতাবাদ শনাক্ত করতে বেগ পেতে হয়নি। কারণ লাতিন আমেরিকা হচ্ছে সেই পৃথিবী, যেখানে স্বপ্ন এবং বাস্তবের সীমানা কেমন যেন রহস্যসম্ভারে ‘চিরস্থায়ীভাবে’ অস্পষ্ট হয়ে আছে, কারণ সেখানে বাস্তবই চমৎকার এবং চমৎকারই বাস্তব-- সম্ভব অসম্ভবের সীমানা সেখানে যদিও থেকে থাকে কোথাও, তবুও তা চোখে পড়ে না (মানবেন্দ্র, ২০১৩:১৮)। কিন্তু সেটিকে সাহিত্যে নির্মাণের জন্য বারোক রীতি সবচেয়ে কার্যকর হয়ে উঠতে পারে বলে কার্পেন্তিয়ের মনে করেছিলেন।

‘‘কিন্তু কাকেই বা বলে বারোক রীতি? যদি বারোক কথাটি এসে থাকে পুর্তুগিশ র্বারোকো থেকে, তবে তার কোথাও নিশ্চিয়ই মূল অর্থের স্মরণে থেকেই যায় অসমাঙ্গ মুক্তোর প্রোজ্জ্বল ও বহুদ্যুতি বিচ্ছুরণ। আর যদি কথাটির উৎস হয় লাতিন র্ভেরুভা, তাহলে কোনো উৎরাইয়ের শিখর থেকে নেমে-আসা ঢলে নিশ্চয়ই মাথা ঘুরে যাবে পাঠকের। কিন্তু কথাটির মূল উৎস ও অর্থ যা হোক না কেন, লাতিন আমেরিকায় সাম্প্রতিক কথাসাহিত্যে তার তাৎপর্য বহুস্বর ও প্রতিধ্বনিময় হয়ে ওঠে। বারোক রচনারীতিতে ওতপ্রোত মিশে থাকে রূপক আর উৎপ্রেক্ষা, থাকে সময়ের গতি নিয়ে জটপকানো খেলা, কাহিনীর নাটকীয় পরিস্থিতি আর গূঢ় জটিল ঘোরপ্যাঁচ, আর অন্তর্লীন বিশ্ববীক্ষা। অপ্রত্যাশিত শ্লেষ-পরিহাস বা উপমায় বা ভাষার ধুমধাড়াক্কা মোচড়ে গড়ে ওঠে কল্পনার বিস্তার আর বাস্তবের কিম্ভূতকিমাকার মূর্তি। বারোক রীতি রচনার সময় হয়ে ওঠে কাঠামোরই অবিভাজ্য অঙ্গ-- কেননা সে যে শুধু স্পষ্ট করে সময়ের প্রকৃতি বা গতিবেগকেই খুলে দেখায় তা নয়, সে নিপুণভাবে পরিচালনা করে তাকে, সুদে-আসলে কাজে খাটায় তার আপাত-বিরোধী সব সম্ভবনা। নাটকীয়তা গড়ে ওঠে একাধিক চরিত্রের অনুভূতির তাড়নায় আর দৃষ্টিভঙ্গির টানাপোড়নে, আর ধীরে ধীরে সব এসে মিলে যায় এক জায়গায়। একটা নতুন দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে দেয় পাঠকের মনে। সুন্দর আর কদর্য, আত্মকেন্দ্রিকতা আর নৈর্ব্যক্তিকতা, ধর্মবোধের উৎসার আর যৌনতার প্রকোপ, তাৎক্ষণিক আর শাশ্বত-- সব সারাক্ষণ পর পর হানা দেয় লেখায়। যার উদ্ভাবনীনৈপুণ্যে নব-নব উন্মেষশালিনী কল্পনা ফুটিয়ে তোলে সেই শ্রী, সেই সুষমা আলোকজান্ডার পোপ যাকে দেখেছিলেন ‘সব শিল্পেরই, নাগালের বাইরে।’ (মানবেন্দ্র,২০০৩:২০)

অন্যদিকে জাদুবাস্তববাদের দুটো প্রধান দিক আছে বলে সমালোচকরা মনে করেন--

১. অস্তিত্বের স্বরূপ নির্ধারণী জাদুবাস্তববাদ বা Ontological Magic Realism.

২. জ্ঞানতাত্ত্বিক জাদুবাস্তববাদ বা Epistemological Magic Realism. (Bowers,2007:90-91)

কার্পেন্তিয়ের থেকে মার্কেস বা প্রায় বেশির ভাগ জাদুবাস্তববাদী লেখক তাদের লেখায় মানব-অস্তিত্বের নানা দিক তুলে আনতে চেয়েছেন, এটি আসলে পূর্বনির্ধরিত কোনো বিশ্বাস সংস্কার মেনে চলে না; অন্যদিকে জ্ঞানতাত্ত্বিক জাদুবাস্তববাদ কোনো এলাকার পূর্বনির্ধারিত ফোকলোর বা বিদ্যায়তনিক বা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বহু চর্চিত লোকজ বিশ্বাস ও পুরাণ থেকে নিষ্কাশিত হয়। ফ্লেমিশ লেখক হার্বাট লিওন ল্যাম্পো (১৯২০-২০০৬)-র সাহিত্য জ্ঞানতাত্ত্বিক জাদুবাস্তববাদের প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। জাদু প্রয়োগে নানান উৎস থেকে মালমশলা নিয়ে এলেও তাঁর রচনায় গ্রিক ও রোমান পুরাণই বিশেষভাবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু জাদুবাস্তববাদের এমন শ্রেণি বিভাগ এও স্পষ্ট করে দেয় না যে, অস্তিত্বের স্বরূপ নির্ধারণ বা চিহ্নিত করতে যে-লেখক কাজ করেন, তিনি জ্ঞানতাত্ত্বিক জাদুবাস্তবতা প্রয়োগ করতে পারবেন না। গাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেস এ জাতীয় তাত্ত্বিক মত মেনে নিতেই সম্মত নন। তিনি তাঁর লেখায় অস্তিত্বনির্ধারণী জাদুবাস্তবতা না কি লাতিন আমেরিকার পৌরাণিক বা অলৌকিক যেসব ঘটনা ঘটে তার ভেতর দিয়ে বাস্তবতা ছাড়িয়ে অন্য এক বাস্তবতায় যেতে চান, এ প্রসঙ্গে তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন,‘‘আমি একজন বাস্তববাদী লেখক... কারণ আমার ধারণা লাতিন আমেরিকায় সবই সম্ভব, সবই এখানে বাস্তব।’’(রফিক, ২০১৪:২৩)। তিনি সেইসঙ্গে মনে করেন বাস্তবতা অবাস্তবতার সীমা পার হয়ে যৌক্তিকতা অযৌক্তিকতাকে গ্রাহ্য না করে লাতিন আমেরিকান বাস্তবতাকে সাগ্রহে গ্রহণ করা যেতে পারে, আদতে যা বাস্তবতার একটা রূপ মাত্র এবং এটি বিশ্বসাহিত্যে নতুন কিছু যোগ করার সামর্থ্য রাখে (রফিক,২০১৪:২৫)। যদিও মার্কেস লেখায় জাদুবাস্তববাদকে ভিন্ন অর্থে দেখার কথা বলেন, কিন্তু তাঁর লেখায়ও যে সবসময় জাদুবাস্তববাদ শর্ত মেনে প্রয়োগ করা হয়েছে, তা নয়, কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রে বর্ণনা তার গভীরে সব সময় কিছু একটাকে বার বার ভেঙে দেয়, ভেঙে দেয় একেবারে তাৎক্ষণিকভাবে, যেমন তাঁর ‘‘ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিচ্যুডের’’ শেষ পর্যায়ে আমরা একটি শূকরের মতো লেজওয়ালা সন্তানকে ভূমিষ্ঠ হতে দেখি, যাকে নিয়ে আশা ছিল সে বত্রিশটি যুদ্ধে বিজয়ী হবে--
''ne Sunday, at six in the afternoon, Amaranta Ursula felt the pangs of childbirth. The smiling mistress of the little girls who went to bed because of hunger had her get on to the dining-room table, straddled her stomach, and mistreated her with wild gallops until her cries were drowned out by the bellows of a formidable male child. Through her tears Amaranta Ursula could see that he was one of those great Buendias, strong and wilful like the Jose Arcadios, with the open and clairvoyant eyes of the Aurelianos, and predisposed to being the race again from the beginning and cleanse it of its pernicious vices and solitary calling, for he was the only one in a century who had been engendered with love.

‘He’s a real cannibal ,’ she said, ‘We’ll name him Rodrigo.’

‘No,’ her husband countered . ‘We’ll name him Aureliano and he’ll win thirty-two wars.’

After cutting the umbilical cord, the midwife begun to use a cloth to take off blue grease that covered his body as Aureliano held up a lamp. Only when they turned him on his stomach did they see that he had something more than other man, and they leaned over to examine him . It was the tail of a pig.''(Marquez, 1978:332)

জাদুবাস্তববাদের আরেকটি দিক হল, সংখ্যায় কোনো কিছুকে বাড়িয়ে বলাটা এসে পড়ে; আর বর্ণনায় থাকে এমন এক অতিরঞ্জন যা বর্ণনার মাধ্যমে তাৎক্ষণিভাবে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। কোনো দিনক্ষণ বা স্থানের ক্ষেত্রেও এটা দেখা যায়। আর সঙ্গে থাকে তাৎক্ষণিক বিশ্বাস যা পরবর্তীকালে নস্যাৎ হয়ে যায়, বা তা নিয়ে দোলাচলের সৃষ্টি হলেও হতে পারে, বিষয়টি ব্যক্তি জীবন থেকে রাষ্ট্রীয় জীবন অব্দি বিস্তৃতি লাভ করতে পারে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন