বুধবার, ২৯ জুন, ২০১৬

‘আমার কোনও নির্দিষ্ট দেশ নেই’

ঝুম্পা লাহিড়ীর ‘দ্য লোল্যান্ড’ বইটির বাংলা অনুবাদ ‘নাবাল জমি’ সম্প্রতি প্রকাশিত হল। প্রকাশ করলেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। প্রকাশকালে লেখিকার সঙ্গে আলাপচারিতায় অনুবাদক পৌলোমী সেনগুপ্ত।


পৌলোমী: ঝুম্পা, আপনি বইটির নাম দিয়েছেন ‘দ্য লোল্যান্ড’। বাংলায় নাম দেওয়া হয়েছে ‘নাবাল জমি’। পাঠকরা বা সাহিত্য-সমালোচকরা এর সিম্বলিক ভ্যালু নিয়ে নানারকম আলোচনা করেছেন। বিভিন্ন ইন্টারপ্রিটেশন দিয়েছেন। আপনি যদি নিজে বলেন, বইটাকে এই নাম দিলেন কেন?

ঝুম্পা: এই বইটার নামটা বেশ অনেকদিন লেগেছে আবিষ্কার করতে। বইটার প্রথম নাম দেওয়া হয় ‘রিটার্ন’, কারণ, বইটায় অনেক দিক থেকে চরিত্ররা একটা জায়গা থেকে অন্য একটা জায়গায় গিয়ে যা দেখে, তা অনেকটা ফিরে আসার মতো। ওটাই একটা ওয়ার্কিং টাইটেল মতো ছিল অনেকদিন।

পৌলোমী: হ্যাঁ, দেয়ার ইজ় আ প্রসেস অফ রিটার্নিং।

ঝুম্পা: তারপর ওই নামটা ঠিক ভাল লাগল না। তারপর অনেককিছু দেখলাম। ‘ফোর মাউন্টেন্স’। এরকম অনেক কিছু, কিন্তু কিছুই ঠিক ভাল লাগছিল না। তারপর ভাবলাম বাবা যখন ঘটনাটা আমাকে বলেছিলেন, বেশ কয়েকবারই জিজ্ঞেস করেছিলাম, আবার বলো, আবার বলো, কারণ ঘটনাটা যেন ঠিক ভিতরে ঢুকছিল না। বাবা বলতেন ‘বাদা’। ‘বাদা’ মানে ইংরেজিতে ‘লোল্যান্ড’ অর্থাত্‌ নিচু জমি, যেখানে বৃষ্টির জল জমে থাকে। তাই হঠাত্‌ ভাবলাম যদি ‘লোল্যান্ড’-ই দিই। সেখান থেকে বুঝলাম জায়গাটাই যেন একটা ক্যারেকটার। পুরো গল্পটা ওখানেই শুরু হয় এবং শেষ হয়। আর ক্যারেকটাররা ওই জায়গাটার থেকে অনেক দূরে চলে যায়। একজন মারা গিয়ে একদম পৃথিবীর বাইরে চলে যায়, আর অন্য ক্যারেকটাররা অনেক দূরে চলে যায়, কিন্তু জায়গাটা ওদের মনের মধ্যে সবসময় থাকে। একদিক থেকে আমার মা-বাবার জীবনটা ওটাই। ওঁদের জীবনে ওইরকম কিছু ঘটেনি কিন্তু ওই পাড়াটায়, মানে আমার বাবার পাড়ায়, একটা লোল্যান্ড আছে। জায়গাটার প্রতি টান যেন আমিও ছোটবেলা থেকে দেখছি। তারপর বইটার জন্য একটু রিসার্চ করতে শুরু করলাম। ছোটবেলা থেকে টালিগঞ্জে যাচ্ছি, ঠাকুরদার বাড়ি, জায়গাটাকে একরকম করে জানতাম, কিন্তু ঠিক বুঝতে পারতাম না টালিগঞ্জ জায়গাটা কী, কেমন। নর্থ ক্যালকাটা থেকে ট্যাক্সি চড়ে টালিগঞ্জ আসার সময়টা, আমার ভীষণ অন্যরকম লাগত টালিগঞ্জের বাড়িটা। আমরা কলকাতা এসেছি ’৭২, ’৭৩, ’৭৫-এ, আমার পাঁচ-ছ বছর বয়স। মানে, ওই নকশাল পিরিয়ডের পরেই আমরা খুব ঘন ঘন আসতাম। পুরোপুরি বুঝতে পারতাম না, কিন্তু কীরকম একটা ফিলিং হত। আন্দাজ করতাম মানুষের মনে কোনও একটা টেনশন কাজ করত। কেমন যেন সকলে ভয়ে ভয়ে থাকত। সেগুলো ওইসময় বুঝতাম না। পরে বইটা নিয়ে রিসার্চ করতে শুরু করে বুঝলাম, ওই পাড়াতে কিছু একটা ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে। যেগুলো পাশের পাড়ায় ছিল না। ছোটরা এগুলো খুব সেন্স করতে পারে। আমারও ওই ফিলিংটা খুব হত। তাই টাইটেলটা আমি ভাবলাম... আশা করি ঠিকই দিয়েছি। কারণ, পুরো বইটাকে ওই টাইটেলটাই ধরে আছে। মানে, একটা অ্যাকশন থেকে পুরো বইটা আস্তে আস্তে খুলতে শুরু করে। ওই পুজোর রাত। বাবা আমাকে ওইভাবেই ঘটনার বিবরণ দিয়েছিলেন। মা ফিরছেন পুজোর বাজার করে আর পাড়াতে ঢুকে দেখেন যে, পুলিশ এসেছে আর ছেলেকে জল থেকে তুলছে। তাই ওই জায়গাটা না থাকলে বইটা থাকত না। আমার আমেরিকান সম্পাদকেরও এই টাইটেলটা খুবই পছন্দ।


পৌলোমী: তাহলে এই লোল্যান্ডটা আপনার বইয়ের প্রাণকেন্দ্র। কী বলব, দ্য সেন্টার অর সোল অফ দ্য বুক। সেই হিসেবেই নামটা দিয়েছেন। আপনি যে বললেন ওয়ার্কিং টাইটেল ‘রিটার্ন’, সেটা নিয়েও আমার একটা প্রশ্ন আছে। এখানে প্রত্যেকটা চরিত্রই, ক্যারেকটারগুলো, ঘুরে ঘুরে ফিরে আসছে। ওইখানে ফিরে আসার একটা ব্যাপার আছে। শেষে, ওই গৌরী, ও অনেকদিন আসেনি, কিন্তু শেষে ও ফিরে আসছে, শি ইজ় বাউন্ড টু রিটার্ন দেয়ার। ওইখানে একবার না গিয়ে বইটা শেষ হচ্ছিল না। আপনি তো বললেন যে, দুই ভাইয়ের গল্পটা আপনি আপনার বাবার মুখে শুনেছেন, গৌরীর চরিত্রটা কি পুরোপুরি আপনার কল্পনা?

ঝুম্পা: হ্যাঁ। তবে ঠিক জানি না কোথা থেকে এসেছে গৌরী। গৌরী না আসা পর্যন্ত গল্পটা ঠিক জমছিল না। ক্যারেকটারগুলো ছিল, টালিগঞ্জ সেটিংটা ছিল, নকশাল আমল ছিল, ঘটনাটা ছিল, কিন্তু কী যে করি এইগুলোকে নিয়ে সেটাই বুঝতে পারছিলাম না। গৌরী যখন আমার সামনে আসে, তখন থেকেই গল্পটা আসলে শুরু হয়। আর আমি জানি যে, বইটা এখন বেরিয়ে গেছে, আমেরিকাতে, ইংল্যান্ডে, এখানে জানি না কেমন রিঅ্যাকশন হবে। ও (গৌরী) যে-যে জিনিসগুলি করে বইটাতে, আমি স্বীকার করব, তার অনেকগুলোই খারাপ। আমি ওকে বুঝতে চেষ্টা করেছি। ওকে জাজ করতে চাইনি। করিনি, আর করতে পারিনি। ও ভীষণই একটা কমপ্লেক্স ক্যারেকটার। ওকে আমি চিনি না, ও কোথা থেকে এসেছে জানি না। ওর পাড়াটা শুধু জানি, নর্থ ক্যালকাটা। কারণ, ওখানেও আমি জীবনের অনেকটা সময় কাটিয়েছি।

পৌলোমী: সেখানেই কি আপনার মায়ের বাড়ি?

ঝুম্পা: আমার মা, হ্যাঁ, নর্থ ক্যালকাটাতেই থাকতেন। আমার মামারবাড়ি ওখানে। তাই ভারতে, কলকাতায় এলে ওখানেই বেশির ভাগ সময় কাটাতাম। মানে, ওই দুটো বাড়িতে (টালিগঞ্জ ও নর্থ ক্যালকাটা), আমার বাবার বাড়ি, মামার বাড়ি ওখানেই আমরা থাকতাম। গৌরীও যে ওখানেই থাকত, প্রেসিডেন্সিতে গেছে সেগুলো জানতাম। কিন্তু ওর ভেতরে কী আছে সেগুলো আমি আস্তে আস্তে আবিষ্কার করলাম, বইটা লিখতে-লিখতে। ও কোনসময়ে জন্মেছে, কীভাবে বড় হয়েছে, বিয়ে করেছে। বিয়ে করা... ও যখন বিয়ে করে তখন মেয়েদের কীরকমভাবে থাকতে হত, এসব আমি, মানে, আমাকে খুব ইন্টারেস্ট করে। কারণ, আমি তো অন্যভাবে বড় হয়েছি, অন্য জায়গাতে বড় হয়েছি, আমার জীবনটা পুরোপুরি অন্যরকম। কিন্তু আমার মায়ের জেনারেশনের অনেককে, একদম অন্যভাবেই ওদের জীবনটাকে নিতে হয়েছে। ওদের বাচ্চা হওয়া, মানে সবকিছুই, পুরো সংসারটা। সে কথা মাথায় রেখেই ওকে (গৌরী) তৈরি করতে শুরু করলাম। তারপর ওকে পাঠিয়ে দিলাম আমেরিকাতে। দেখলাম, ওখানে ওর কী হয়। কিন্তু আমি সত্যিই বোঝাতে পারব না, আমি জানি ও আমার মন থেকেই এসেছে, কিন্তু অ্যাজ় ইফ ও আকাশ থেকে পড়ে আস্তে আস্তে স্পষ্ট হয়।

পৌলোমী: আমার যেটা শুনে মনে হচ্ছে যে, এক হিসেবে এই ক্যারেকটারটা নিজে-নিজেই প্রাণ পেয়েছে। যতটা আপনি একে তৈরি করেছেন, ততটাই ও নিজে থেকে উঠে এসেছে।

ঝুম্পা: হ্যাঁ, সবদিক থেকেই ভীষণ ইন্ডিপেন্ডেন্ট ক্যারেকটার। ওর পার্সোনালিটি খুবই ইন্ডিপেন্ডেন্ট। লেখক আর ক্যারেকটারের মধ্যে যে-সম্পর্ক থাকে, সেই দিক থেকেও ও ভীষণ ইন্ডিপেন্ডেন্ট। মানে, আমার বাইরে থাকে। প্রত্যেকটা ক্যারেকটারেরই আমার মনে হয় একটা দিক থাকে। ওরকমই তো হয়। একটা ছোট্ট কিছু, বড় করতে করতে একটা ক্যারেকটার শুরু হয়ে যায়। তাই গৌরীও হয়তো বই পড়তে ভালবাসে, লেখাপড়া করতে ভালবাসে। বই পড়া আমারই একটা অ্যাসপেক্ট। তারপর সুভাষ ক্যারেকটারটাও আমার একটা দিক। তারপর উদয়নের ক্যারেকটারটা অত আমার মতো নয়, তবু আমি ওকে ভাল করে বুঝি। বুঝি যে, ও কী। ওর রাগ এত কেন, ও যেগুলো করে কেন করে, যেগুলো করেছে সেগুলো ভাল কাজ নয় হয়তো। কিন্তু কেন করেছে আমি হয়তো বুঝতে পারি। আমি একটা বই লিখতে চেষ্টা করলাম, যেখানে প্রত্যেকটা ক্যারেকটারের কিছু না কিছু ভুল হয়। সেটা আমার খুব ইন্টারেস্টিং লাগে, আমরা তো সবাই মানুষ, আমরা সবাই তো ভুল করি। ভুল না করলে আমরা মানুষ হতে পারি না।

পৌলোমী: তবে আপনার সিমপ্যাথি কি বেলার দিকে একটু বেশি ছিল?

ঝুম্পা: সত্যি না। মানে, বেলা হচ্ছে ওদের মেয়ে। চারজন মেন ক্যারেকটার। তারপর একটা মায়ের ক্যারেকটারও আছে। মানে, পুরো বইটাতে মাত্র পাঁচটাই ক্যারেকটার।

পৌলোমী: মায়ের ভিউ পয়েন্ট থেকেও কিছু অংশ বলা আছে।

ঝুম্পা: দুই ভাই, বউ, একটা মেয়ে আর দুই ভাইয়ের মা। এই পাঁচজনের পয়েন্ট অফ ভিউ আছে বইটার মধ্যে। আমি প্রত্যেকটা ক্যারেকটারের... আমি এখন নিজে মা, তাই দুই মায়ের মধ্যেই আমি যেতে পেরেছি।

পৌলোমী: মানে গৌরী আর বিজলী।

ঝুম্পা: বিজলী দুই ভাইয়ের মা। আমি যখন গল্পটা প্রথম লিখতে শুরু করি, আমার তখন তিরিশ বছর বয়স। সেসময় গল্পটা আমি শেষ করিনি। আমি তখনও মা-ও হইনি। কিন্তু আমি তখন অলরেডি বুঝতে চেষ্টা করছিলাম মা-বাবা কী করে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে এরকম একটা জিনিস (ছেলের মৃত্যু) দেখে। এখন আমি বইটা লিখেছি সেবারের প্রায় দশ বছর পর। মা হয়ে যাওয়ার পরে আরও ডিপলি ওটা আমাকে অ্যাফেক্ট করবে তো? কারণ, মা হওয়ার পরে আমি একটা অন্য দিকে চলে যাই। আর সবকিছুই আমার ছেলে-মেয়ের থ্রু দিয়ে। তাই আমার মনে হয় সেইদিক থেকে অপেক্ষা করা ভাল হয়েছে। তাই বলছিলাম, গল্পটা মনে হচ্ছিল আমার বাইরে। আমি ঠিক ধরতে পারছিলাম না গল্পটাকে। তাই দশ বছর আমি অপেক্ষা করেছি। মা হই, তারপরে পুরোটা লিখি। আমি এসব নিজে তো কোনওদিনও দেখিনি, আর আশা করি দেখবও না। ওই দু’ভাইয়ের মা, আমি চেষ্টা করি ওঁর মধ্যে একটু যেতে। ওঁকে একটু বুঝতে চেষ্টা করি। এটাই আমার লেখার কাজ।

পৌলোমী: আপনি মাতৃত্বের কথা বললেন, মা হওয়ার কথা, আপনি এখন নিজে যখন লিখছেন, অনেক জায়গা থেকে হয়তো আমন্ত্রণ আসছে, কোথাও হয়তো আপনাকে যেতেও হয়, বিভিন্ন জায়গায়। আপনি লিখছেন যখন, লেখাটা ইটসেল্ফ তো আপনার অনেকটা সময় নেয়। আমার জানতে ইচ্ছে করে, আপনার ছেলে-মেয়ে-পরিবার, আপনার অনেক কাজ, সব কিছুর মধ্যে দিয়ে লেখাটাকে চালিয়ে যাচ্ছেন। কী করে ব্যালান্স করেন? এটা কি আপনার কঠিন মনে হয় নাকি সহজভাবেই নেন?

ঝুম্পা: কঠিন। কিন্তু অন্যরা যেভাবে লিখেছেন, যেমন ধরুন আশাপূর্ণা দেবী, বাচ্চা মানুষ করতে করতে, সংসার চালাতে চালাতে। ওগুলোই আমি ভাবি। ঠিক আছে, আমার দুটো বাচ্চা আছে, বাজার করতে হয়, স্কুলে যেতে হয়। তার মধ্যেই লেখার চেষ্টা করি। আর আমি কত ফরচুনেট তা আমি নিজেই জানি, মনে রাখি। মাঝে মাঝে মনে হয়, ভাল হত যদি একজন উঠে চা করে দিত, বাচ্চাদের তৈরি করে স্কুলে পাঠিয়ে দিত। আমি বেশ একা একা লিখতে পারতাম। কিন্তু আমার বাচ্চারা যে আমাকে কী দেয়! সেটাই আমার সব। ওরা না থাকলে কিছুই করতে ইচ্ছে করত না। তাই চেষ্টা করি। সবই একটু একটু করে করি, আস্তে আস্তে বাচ্চাদের মানুষ করছি। আর আস্তে আস্তে বইগুলোকেও তৈরি করছি।


পৌলোমী: আপনাকে আমাদের অনেক শুভেচ্ছা থাকবে, যাতে আপনি সবকিছুই করতে পারেন একসঙ্গে। আমার আর একটি প্রশ্ন কলকাতাকে নিয়ে। কলকাতা তো আপনার গল্পে একটি ক্যারেকটারের মতো অনেক সময় উঠে আসছে। এমনকী, এই বইটিতেও। আপনি তো আমেরিকায় বড় হয়েছেন। ওইটা যখন আপনি ন্যারেট করছেন, আমেরিকার জীবন তখন আপনার কাছে ইজ়িলি আসছে। আমি ধরে নিচ্ছি সেটা। কিন্তু কলকাতার ব্যাপারটা লেখার জন্য আপনাকে রিসার্চ করতে হচ্ছে, কথা বলতে হচ্ছে, ডিটেল্স নিতে হচ্ছে, তবু বারবার আপনি কলকাতার কাছেই ফিরে আসছেন। এই যে একটু আগে আপনি বললেন যে, বাংলায় বইটা অনুবাদ হওয়ার পরে একটা সার্কেল কমপ্লিট হচ্ছে। আমি সেই জায়গা থেকেও আসছি যে, আপনি বারবারই ফিরে আসছেন কলকাতায়। কলকাতা আপনার জীবনে বা আপনার কনশাসনেস-এ কতটা জায়গা নিয়েছে, কীভাবে আছে?

ঝুম্পা: এটা এমন একটা প্রশ্ন যে, এক দিক থেকে হয়তো কয়েক ঘণ্টা লাগবে উত্তর দিতে, আবার আর এক দিক থেকে খুব অল্প কথাতেই বোঝাতে পারব। আমি কলকাতাতে আসতাম, আসি, সারা জীবন এসেছি। কলকাতা আমি নিজে থেকে দেখেছি অনেকবার। কিন্তু আসল আমার কলকাতা আমার মা-বাবা। কারণ, ওঁরাই আমাকে কলকাতা চিনিয়েছেন। কলকাতায় তো বড় হইনি, কলকাতার স্কুলে যাইনি। আমি আসতাম, থাকতাম কয়েকদিন, তারপর চলে যেতাম। তবে আমি বড় হয়েছি যেভাবে অনেক দূরে, ওঁরাই (মা-বাবা) কলকাতাকে রিপ্রেজ়েন্ট করতেন আমার কাছে। ওঁরাই আমাকে বাংলা ভাষায় বড় করেছেন। রোজ ভাত খেতাম হাত দিয়ে। যাঁরা আমাদের বাড়িতে আসতেন, ওঁরা অনেককিছু আলোচনা করতেন। ওঁরা খবরের কাগজের ছোট ছোট বাংলা আর্টিক্লগুলো পড়তে চেষ্টা করতেন। এগুলো একদিক থেকে ভারী ইমপ্রেসিভ ছিল। কারণ, ওঁদের অনেক স্ট্রাগ্ল করতে হয়েছিল, ওঁদের জীবনের মধ্যে কলকাতাকে সবসময় জ্যান্তভাবে রাখতে। কারণ, আমেরিকাতে তো কলকাতা নেই (হাসি), কলকাতা কলকাতাতেই। কিন্তু এঁরা সবাই যে গেছেন ওখানে, ওঁরা সবাই, অ্যাজ় ইফ সবাই হাতে করে একটু কলকাতার মাটি নিয়ে চলে গেছেন। আর ওই মাটির টুকরোটুকু ওঁরা কোনওদিন ফেলে দেননি। তাই ওঁরাই কলকাতা। তাই এখনও অবধি প্রত্যেকটা বই, মানে, ভাবছিলাম আপনার প্রশ্নটা নিয়ে, মানে, আমার চারটে বইয়ের মধ্যে এটায় হয়তো সবচেয়ে বেশি কলকাতা আছে। কিন্তু প্রত্যেকটা বইয়ের মধ্যে সামহাউ কলকাতা রয়ে গিয়েছে। কারণ, কলকাতায় এসে আমি লিখতে শুরু করি। ওখানেও লিখতাম ছোটবেলায়, স্কুলে এটা-ওটা লিখতাম। কিন্তু কলকাতায় মা-বাবা নিয়ে আসতেন, তখন মনে হত অনেকদিন থাকতাম। হয়তো এক-দু’মাসই থাকতাম। ছোটবেলায় ওটা অনেকটা সময় মনে হত, কারণ, আমি তো স্কুলে যেতাম না, বাড়িতেই থাকতাম। মা-বাবারা সব বাজার করছে, কেনাকাটি করছে, লোকের বাড়ি যাচ্ছে। আমি ঘরেই বসে একটা খাতা নিয়ে এটা-ওটা লিখতাম। তাই কলকাতার সঙ্গে লেখার একটা সম্পর্ক আছে। আমেরিকাতে আমার রুটিন ছিল, স্কুলে যেতাম, বন্ধুবান্ধব ছিল। কিন্তু এখানে আমার কোনও রুটিন ছিল না। এখানে অনেক লোকজন ছিল, কিন্তু অনেকটা সময় আমি একাই স্পেন্ড করতাম। ছাদে যেতাম, জিনিসপত্র অবজ়ার্ভ করতাম। লোকজনের কথাবার্তা শুনতাম। লোকের বাড়িতে যেতাম, ওখানকার গল্প, কথা, আলোচনা ওগুলো শুয়ে শুয়ে শুনতাম, বসে বসে শুনতাম। ওগুলো সব আমার মধ্যে আস্তে আস্তে ঢুকে যায়। তাই ওদিক থেকেও কলকাতা আর আমার লেখা, এই দুটো জিনিস সবসময় একসঙ্গে চলেছে।

পৌলোমী: ছোটবেলায় আপনার কখনও, ধরুন ছোটবেলায় এসেছেন, কখনও বিরক্ত লাগেনি কলকাতাকে? মনে হয়নি আমি যেতে চাই না, ওখানে গিয়ে কী করব? মনে হয়নি কখনও?

ঝুম্পা: মাঝে মাঝে মনে হত, যখন একটু বড় হলাম। মনে হত বারবার কলকাতায় যেতে হচ্ছে কেন। দিল্লি গেলে ভাল হয়, মুম্বই দেখলে একটু ভাল হয়। কারণ, কলকাতা মানে লোকজন, খাওয়াদাওয়া, বাজার একঘেয়ে লাগত। কিন্তু বড় হয়ে গিয়ে বুঝতে পেরেছি কেন আমরা কলকাতাতে আসতাম। এখন আমিও একটা অন্য দেশে থাকি। মা-বাবার কাছ থেকে আমি একটু দূরে আছি। আমি ইতালিতে আছি কয়েক বছরের জন্য, তাই সামান্য হলেও এখন আমিও বুঝতে পারি ওঁদের যে-রিয়্যালিটি, সবাইকে ছেড়ে অন্য একটা জায়গায় যাওয়া। বাচ্চাদের একটা অন্য দেশে মানুষ করছি, একটা অন্য ভাষা বলছি, ওটা আমার নিজের ভাষা নয়, ওই ছোট ছোট বিষয়গুলো এখন আমি এক্সপিরিয়েন্স করছি। আমি এটা চাইছিলাম-ও। জানি, মা-র হয়তো ভাল লাগছে না যে, আমি এতটা দূরে আছি ওঁদের থেকে। সেদিক থেকে দেখতে গেলে আমি দূরেই আছি, আটলান্টিকের একদিকে আমি, আর ওঁরা অন্যদিকে। কিন্তু মনে হয় আর-এক দিক থেকে এই দু’-এক বছরে মা-বাবার সঙ্গে আমি আরও ক্লোজ়। কারণ, ইতালিতে আমার প্রতিদিনের লাইফের মধ্যে দিয়ে, আমি মা হয়ে বুঝতে পারি ওঁরা কী করেছেন তাঁদের সন্তানের জন্য, আমাদের জন্য। একটা অন্য দেশে গিয়ে তাঁরা আমাদের বড় করেছেন। ইতালিতে মাঝে মাঝে এরকম হয় যে, আমি ভুল ভাষায় কথা বলি। কেউ একটা কথা বলল, আমি ভুল শুনলাম বা বুঝতে পারলাম না। ডাক্তারের কাছে গেলাম, কিন্তু ঠিক বুঝতে পারলাম না উনি কী বলতে চাইলেন। ওঁরাও আমাদের এভাবে বড় করেছেন। সবসময় একটা অনিশ্চয়তা নিয়ে। এমনিতে আমার খুব ভাল লাগে ইতালিতে থাকতে। কিন্তু ডে-টু-ডে লাইফে অনেককিছু বিদেশিরা যেমন বোঝে না, আমিও সেগুলো এখন এক্সপিরিয়েন্স করছি, আমিও সেভাবেই থাকি। আমি যখন ছোট ছিলাম, কলকাতায় যেতাম, আমি মাঝে-মাঝে কমপ্লেন করতাম যে, আগ্রায় নিয়ে চলো, অন্য কোনও জায়গায় বেড়াতে নিয়ে চলো, কিন্তু এখন আমি বুঝি, এখন আমি যদি আমেরিকায় যাই, আমি কিন্তু যাব আমার মা-বাবা-বোনের জন্য। অন্য কিছুর জন্য নয়। ওঁরা যে, প্রায় পঞ্চাশ বছর হয়ে গেল, এখনও এখানে (কলকাতায়) আসেন, এখনও এতজনের সঙ্গে ওঁরা এতভাবে জড়িয়ে আছেন, এটা আমার কাছে সাংঘাতিক একটা মুভিং জিনিস। কারণ, খুবই ইজ়ি চলে যাওয়া, ছেড়ে দেওয়া, কিন্তু ওঁরা সেটা করেননি। আর করবেনও না। খুব শক্ত এটা করা। খুব শক্ত। আমেরিকায় দেখেছি অনেকে চলে যায় বাইরে, ওরা জাস্ট চলে যায়, মাঝে-সাঝে আসে আর লিঙ্কটা উইক হয়ে যায়। মা-বাবার ক্ষেত্রে যেন ক্রমশ আরও স্ট্রং হচ্ছে ব্যাপারটা।

পৌলোমী: আচ্ছা, আমেরিকায় চলে যাওয়ার পর, আপনি যখন বিদেশে বড় হচ্ছেন, আপনার ‘নেমসেক’ বইতে এর কিছুটা উল্লেখ আছে, ব্যক্তিগতভাবে আপনি কখনও ফিল করেছেন দ্যাট, ইউ আর অ্যাওয়ে ফ্রম দ্য রুটস, এখানেও না, ওখানেও না, এটা নিজে কখনও, কোনওভাবে ফিল করেছেন কি?

ঝুম্পা: এটা আমার জীবন। জন্ম থেকে শুরু করে যেদিন মারা যাব, সেদিন অবধি এটা আমি ফিল করব। ছোটবেলায় ভাল লাগত না এই ফিলিংটা। মনে হত, আমি কোনও জায়গার মানুষ নই। এখন আমার মনে হয়, আচ্ছা ঠিক আছে, আমি স্পেসিফিক কোনও জায়গার মানুষ নই, আমি ঠিক আমেরিকানও নই, আমি কলকাতারও মানুষ নই। আমি কোনও এক জায়গার মানুষ নই। কিন্তু অন্যদিক থেকে দেখি এখন ব্যাপারটাকে। আমি লেখিকা, আমার কাজ একটা স্টেবিলিটি দেয়, একটা গ্রাউন্ডিং দেয়। আর একটা আমার পরিবার। আমার স্বামী আর দুই ছেলেমেয়ে। আমি যখন ছোট ছিলাম, বড় হচ্ছিলাম, তখন আমার মনে হত আমি কোনও দেশ থেকে আসিনি, আমি আমার মা-বাবার কাছ থেকে এসেছি। কারণ, যেখানে বড় হয়েছি ধারে-কাছে কোনও আত্মীয়স্বজন নেই, কেউ নেই, শুধু আমরা তিনজন। ‘নেমসেক’-এ লিখেওছিলাম এটা, যেন তিনজন লাহিড়ী-ই পৃথিবীতে শেষ নাম। ছোটবেলায় মা-বাবাই ছিল আমার দেশ। আর এখন আমি বড় হয়েছি, নিজের পরিবার তৈরি করেছি, ওরাই এখন আমার দেশ। এখন রোমে আছি, এখন রোম আমার অল্পসময়ের দেশ, এরপরে যদি আবার আমেরিকায় যাই, আর আমার পরিবার আমার সঙ্গে থাকে, তখন ওটা আমার দেশ। আর আমার স্বামীও এটা জানে। পৃথিবীর বহু দেশে ও বড় হয়েছে। থাইল্যান্ডে ও বড় হয়েছে, মেক্সিকোতে ওর জন্ম। ও আমেরিকায় বড় হয়েছে, গুয়াতেমালাতে বড় হয়েছে। ওর সঙ্গে যখন আলাপ হল, ও বলল যে, আমি জানি না আমি কোথাকার। কিন্তু আমি, আমার মা-বাবা-ভাই-বোন, আমরাই একটা ছোট দেশ। শুনে মনে হল ঠিক, এটাই তো আমারও মনে হয়। ছোটবেলায় মনে হত আমি-মা-বাবা একটা ছোট দেশ, তারপর বোন জন্মাল, তখন আমরা চারজন যেখানেই যাই, আমাদের চারজনের ছোট দেশ। এখন মনে হয় স্বামী-সন্তানকে নিয়ে অন্য চারজন আমরা, আমরা একটা ছোট দেশ তৈরি করি। যেখানেই থাকি না কেন, আমরা ঠিক আছি। আগে যেমন এখানে এলে বলত আমেরিকান, আবার ওখানে, আমেরিকায় বলত তুমি ইন্ডিয়ান নাকি? এসব কথাকে এখন সত্যি আর আমি ইমপর্ট্যান্স দিই না। আমি বরং অন্যভাবে দেখতে চেষ্টা করি এটাকে। এই যে আমি লিখি, আমার লেখার জন্যও এটা খুব দরকার যে, আমি এখানে-ওখানে যেতে পারি। প্রয়োজনে এই দেশের মানুষ হতে পারি, আবার অন্য দেশেরও। এতে আমার উপকারই হয়।

পৌলোমী: আপনি এখন রোমে আছেন, অর্থাত্‌ ইতালি। ইতালি, দ্য বেড অফ সিভিলাইজ়েশন ইন আ ওয়ে। ওখানে আপনার কী ভাল লাগছে? আপনি যে-কথাটা বললেন সেটা থেকে বেরিয়ে এসে আমি জানতে চাইছি, নতুন দেশ দেখছেন, নতুন ভাষা শিখেছেন। আপনার বইয়ে আপনি একটি ইতালিয়ান উদ্ধৃতিও ব্যবহার করেছেন। ইতালির সভ্যতা, প্রাচীন সব নিদর্শন, সেখানকার যে-সমাজ, তা হয়তো আমেরিকার থেকে আলাদা, সে বিষয়ে কিছু বলুন।

ঝুম্পা: আমি প্রথম ইতালি গিয়েছিলাম আমার বোনের সঙ্গে, প্রায় কুড়ি বছর আগে। জানি না কেন, ওখানে আমার কোনও আত্মীয়-বন্ধু-পরিচিত কেউই নেই, কাউকে চিনি না। তবু জায়গাটা আমার খুব ভাল লেগে গেল। জায়গাটার থেকেও ভাল লেগেছিল ভাষাটা। ভাষাটা যেই শুনতে শুরু করি, ওটা আমার ভিতরে ঢুকে যায়। আমেরিকায় ফিরে গিয়ে আমি আস্তে আস্তে ভাষাটা শিখতে শুরু করি। ভাষা শেখা এমনিতে শক্ত। মা-বাবার কাছ থেকে না শিখলে, স্কুলে না শিখলে বা ওই জায়গাতে না থাকলে ভীষণই শক্ত। তবুও আমি শিখতে চেষ্টা করেছিলাম। আর কোনওরকমে শিখলামও। ভাষাটা কেন জানি না, আমি খুব ভালবাসি। কয়েকবছর আগে ভাবলাম, সারা জীবনই আমেরিকাতেই থেকেছি, লন্ডনে জন্মেছি, কিন্তু মাত্র দু’বছর বয়সে লন্ডন ছেড়েছি। আমার মা-বাবা যেটা করেছিলেন, সেটা তো আমি জানতাম না। হয়তো ওঁদেরকেও আর-একটু বুঝতে চেয়েছিলাম। অনেক মোটিভেশন ছিল। তার মধ্যে একটা ছিল এই যে, আমার ছেলে-মেয়ে বুঝুক বিদেশি হওয়ার মানেটা কী। কারণ, একদিক থেকে আমি তো বিদেশিদের মতোই বড় হয়েছি। আমেরিকাতে বড় হয়েছি, কিন্তু আমেরিকান ছেলেমেয়েরা আমাকে আমেরিকান ভাবত না। এখন বদলে গেছে অনেককিছু, আমেরিকা আর আগেকার মতো নেই, কিন্তু আমার ছোটবেলায় ওরকম ছিল না। আমার নাম জেনে, আমার মুখচোখ দেখে আমার স্কুলের বন্ধুবান্ধবরা বলত মেয়েটা আমেরিকান নয়, ইন্ডিয়ান। আমার স্বামীও অনেক জায়গায় ঘুরেছে, তাই আমরা দু’জনেই চেয়েছিলাম, আমাদের ছেলেমেয়েরাও এটা বুঝুক। একটা জায়গার ভিতরে থাকলে সেই জায়গাটাকে সেভাবে বোঝা যায় না, বাইরে থাকলে যেভাবে বোঝা যায়। বাইরে থাকলে, সবকিছুকে, পুরো সমাজটাকেই অন্যভাবে দেখা যায়। এটা খুব দরকার। মনে হয় বড় হলে ওরাও এটাকে অ্যাপ্রিশিয়েট করবে। আমরা চাইনি যে, ওরা সারাজীবন শুধু আমেরিকাতেই বড় হোক। এই পিরিয়ডটা আমরা ওদের জীবনে দিতে চেয়েছি। আর একটা মোটিভেশন পুরোপুরি আমার নিজের জন্য। ভাষাটা আমার এত ভাল লেগেছে, ভাষাটার জন্যই আমি গেছি। প্রায় দু’বছর হল, আমি ইংরেজি পড়া ছেড়ে দিয়েছি। আমি শুধু ইতালিয়ানই পড়ছি। ভাষাটার মধ্যে আমি পুরো ঢুকে গেছি। সেটা আমাকে অন্য একটা দিক দিয়ে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। সেটা আমার খুব ভাল লাগছে। কারণ, সবকিছুই এখন নতুন। অল্প অল্প ইতালিয়ান লিখছিও। একটা ছোট বই লিখছি ইতালিয়ান ভাষায়, বইটা ভাষার উপরেই। বইটা লিখতে লিখতে অনেক কিছু আবিষ্কারও করছি। তার মধ্যে একটা হচ্ছে যে, আমি লেখিকা কিন্তু আমার আসল কোনও ভাষা ঠিক নেই। আমার মাতৃভাষা বাংলা ঠিকই, কিন্তু সেটা তো খুব ভাল নয়, ইংরেজি মেশানো বাংলা, আপনাদের মতো নয়, আমার বাংলাটা মৌখিক হয়েই আছে। বাংলায় লিখতে পারি না, খুব ভাল বুঝতে পারি না। আমার মা-বাবার মাতৃভাষা বাংলা, ওই ভাষাটা নিয়েই ওঁরা জন্মেছেন, বড় হয়েছেন, স্কুলে গেছেন, বাংলার সঙ্গেই ওঁদের জীবন কেটেছে, কাটছে। আমার ক্ষেত্রে তেমনটা নয়। আমি ছোটবেলা থেকে বাংলা শুনছি, বলতে পারি, কিন্তু বাংলা ভাষা তো পুরোপুরিভাবে আমার জানা নয়, তা হলে তো আমি বাংলাতেই লিখতাম, সেটা আমি পারি না। ইংরেজি ভাষাটা আমি ভাল জানি, কারণ, আমার পড়াশোনাটা ইংরেজিতে। তবুও আমার মনে হয়, ইংরেজি আমার ভাষা নয়। কারণ, ইংরেজি আমার মা-বাবার ভাষা নয়। বাংলা আমার মা-বাবার ভাষা। আমার আছে দুটো অর্ধ ভাষা। তাই আমি যখন এখন ইতালিয়ান ভাষায় বই লিখছি, আমার খুব মনে হচ্ছে যেভাবে আমার কোনও নির্দিষ্ট একটা দেশ নেই, ঠিক সেভাবেই আমার কোনও নির্দিষ্ট একটা ভাষাও নেই। যে লেখে তার জন্য ভাষাই দেশ। ভাষা আর দেশ কি আলাদা কিছু? একই জিনিস। তাই জন্যেই হয়তো একটা তৃতীয় ভাষা আমাকে টানছে। কারণ, আমি সবসময় খুঁজছি আমার ভাষাটা কী, দেশটা কী। আমি জানি ইতালিয়ানও আমার ভাষা নয়। তবুও। জানি না কী হবে। ভাষার জন্য, ছেলেমেয়েদের জন্য, মা-বাবাকে বোঝার জন্য ইতালিতে আছি এখন। তাছাড়া ইতালি খুব সুন্দর দেশ। যাঁরা গেছেন, তাঁরা জানেন ভারতের মতোই ওদের অনেক ইতিহাস। আর কলকাতা আর রোমের মধ্যে খুব ইন্টারেস্টিং একটা কানেকশন আছে। রোমে হাঁটতে হাঁটতে অনেক সময়ই মনে হয়, উত্তর কলকাতার কোনও একটা জায়গায় হারিয়ে গেছি। রোম আমেরিকা আর ভারতের মাঝামাঝি একটা জায়গা। দু’দিকেই প্লেনে যেতে প্রায় আট ঘণ্টা মতো সময় লাগে। আমার পক্ষে এখন রোম খুব ভাল জায়গা। সবকিছুই আমি নতুনভাবে দেখছি। আমেরিকা ও ভারত, দুটো জায়গাকেই নতুনভাবে চিনছি।

পৌলোমী: আপনি যদি একটু বলেন, যে-ইতালিয়ান কবিতার উদ্ধৃতিটি আপনি বইতে ব্যবহার করেছেন, সেটা ব্যবহার করার কথা আপনার মনে হল কেন? কী আছে ওর মধ্যে?

ঝুম্পা: শেষ দু’বছর ধরে তো ইংরেজি পড়া ছেড়েই দিয়েছি। দু’বছর আগে, গরমকালে, তখন আমি আমার বইয়ের পাণ্ডুলিপির কাজ শেষ করছিলাম। কেপকডে একটা বাড়িতে ভাড়া ছিলাম তখন। প্রতিদিন সকালে আমি একটু ইতালিয়ান কবিতা পড়তাম। তারপর সারাদিন ইংরেজিতে, বইটার কাজ করতাম। একদিন কবিতার বইটা পড়ে দেখি, একটা কবিতা, নাম ‘স্যালুট টু রোম’, কবিতার মধ্যে যে-বর্ণনাটা আছে, আমার বইয়ের মধ্যেও সেই বর্ণনাটা আছে। কবিতায় আছে, ঘাসটা একটা সমুদ্রের মতো। যে কবিতাটা বলছে, সে যেন সেখানে ঢুকে যাচ্ছে, ওই সমুদ্রে ভেসে যাচ্ছে। আমার লেখায়, একটা মুহূর্তে ওই বর্ণনাটা আছে।

পৌলোমী: যেখানে বেলা আর বেলার বাবা আমেরিকার বাড়িতে এসে পৌঁছচ্ছেন, আর গৌরী বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে।

ঝুম্পা: হ্যাঁ, সেই সময় বেলা বাড়ি এসে দ্যাখে, ঘাস অনেক বড় হয়ে গেছে। ও এখনও বুঝতে পারছে না, মা আর নেই। আমার মনে আছে, ছোটবেলায় বোধহয় একবার আমরা কলকাতা থেকেই ফিরছিলাম, আর আমাদের বাড়িটা দেখাই যাচ্ছিল না, ঘাস এত লম্বা হয়ে গিয়েছিল। একটা ভাসা ভাসা স্মৃতি আমার এতদিন ধরে ছিল। বইটা লিখতে লিখতে আমি ফিরলাম ওই স্মৃতির কাছে, ঘটনাকে তৈরি করলাম। ইতালিয়ান কবিতাতেও ওই একই বর্ণনা। ব্যাপারটা হল, আমার দেশের কাছে আমি ফিরে আসছি। ইংরেজিতে, প্রথম লাইনটা ছিল, ‘লেট মি রিটার্ন টু মাই হোমল্যান্ড’। হোমল্যান্ডের ব্যাপারটা আমার বইতেও আছে। কেউই বুঝতে পারছে না হোমল্যান্ডটা কী, কোথায়। আর তাছাড়া কবিতাটা আবিষ্কার করার পরের মাসেই বোধহয় আমরা রোমে চলে যাই। তাই সবমিলিয়ে আমার কীরকম মনে হয়েছিল কবিতাটার উল্লেখ থাকাটা খুব দরকার।

পৌলোমী: হ্যাঁ, কবিতার প্রয়োগটা খুব ভাল। খুব সুটেবল হয়েছে বইটার জন্য। ঝুম্পা, খুব ভাল লাগল আপনার সঙ্গে কথা বলে। আপনাকে তো সহজে পাওয়া যায় না।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন