সোমবার, ১ আগস্ট, ২০১৬

বৈজ্ঞানিক লিখনের ক্রমবর্ধমান অসুবিধে

দেবপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়

২. ০.

অসুবিধে দু’রকমের: একটা খুচরো অশান্তি, আর একটা একটু বড়ো মাপের: ‘বৈজ্ঞানিক অশান্তি’ — ‘বিজ্ঞান’ নামক প্রাতিষ্ঠানিক অর্গানাইজড্ বা সুসংগঠিত ক্ষেত্রটি নিয়ে৷ খুচরো অশান্তিটা মনঃসংযোগের ক্রমবর্ধমান অসুবিধে৷ এনামের একটা নাটক লিখেছিলেন ভাৎস্লাভ হাভেল৷ করতেন আলন্দের থ্যাটার, তারপর বিভক্ত চেক রাষ্ট্রের নায়ক৷ অনুবাদে পড়েছি নাটকটা মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের সৌজন্যে৷ য়ুরোপীয় দেশের এক বৈজ্ঞানিক অধ্যাপক নানান খুচরো অশান্তিতে ভুগছেন৷
তাঁর যেসব খুচরো অশান্তির সঙ্গে আমার মতো তথাকথিত অধুনাগুপ্ত ‘তৃতীয়’ বিশ্বের অধস্তন বৈজ্ঞানিকের (?) ঝুটঝামেলার তুলনা করা মুশকিল৷ বাড়িতে সরকারি জল সরবরাহ নেই, রাস্তা পার হতে গেলে সিগন্যালের খামখেয়ালি ব্যবস্থাপনায় বিব্রত হই, অসুস্থ হলে পরিষেবা কোথা থেকে পাবো, তাও জানা নেই, বাচ্চাকে একটা নিয়ন্ত্রনহীন স্বাধীন ইস্কুলে পড়াবো, তার উপায় নেই .... থাক্‌গে নেই- এর লিস্টি বাড়বে আরো৷ যাপনের সমস্যাগুলো কোলকাতা শহরে সুগভীর৷ এখানে মুনিঋষির মতো আরণ্যক যাপনে মননের বিস্তার সম্ভব নয় এবং সে আশাও করি না৷ ক্যাচাল আছে, থাকবে এটা ধরে নিয়েই রোজগেরে পুং- হিসেবে বৈধ বৌ- এর কাঁধে এসব খুচরো পাপ চাপিয়ে সে একটু থিতু হয়ে বসে ভাবা প্র্যাকটিস করবো বিশ্বরাজনীতি নিয়ে গঁর জাগরণকে যা কইবো তারও জো নেই৷বারোমাসে তেরো পার্বণের জেরে কান ঝালাপালা হয়, অনুধ্যানের সুযোগ মায়ের ভোগে চলে যায়৷

এসব কথা ভাবতে ভাবতেই বসে বসে পাতা ওলটাচ্ছিলুম ভি. এস. নইপলের India: A Wounded civilization (১৯৭৯)- এর পাতাগুলো৷ বুঝতে চেষ্টা করছিলুম নইপলের সহজ বক্তব্য: ভারতবর্ষ একটা ক্ষতবিক্ষত সভ্যতা; এখানকার লোকজনদের ওনার মনে হয়েছে দোমড়ানো- মোচড়ানো শরীর নিয়ে বেঁচে থাকা মানুষ৷ জরুরী অবস্থার সময় নইপল ভারত- বেড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে এ আখ্যান লিখে ফেলেছিলেন৷

বইটা পড়তে- পড়তে মনে হল, একটা অলিখিত জরুরি অবস্থা লাগু আছে এখানে৷ বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানের সংগঠিত রূপের মধ্যে ‘কি কোথায় লিখিব/বলিব বা লিখিব/বলিব না’— তার একটা অলিখিত নির্দেশ থাকে৷ এই ঔচিত্য- অশৌচিত্যের আদেশে আমাদেরও সম্মতি থাকে৷ আমরা বুঝে ফেলি, আমার প্রতিষ্ঠান বা ফান্ডিং এজেন্সি কি চাইছে৷ আমার গবেষণার ক্ষেত্রে স্বরট সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তাই বেশ অসুবিধে আছে৷ এতো কথা কইছি কিন্তু ‘কথার এন্তেকাল’ তত্ত্ব বোঝানোর তাগিদেই৷ ধীরে ধীরে ‘বৈজ্ঞানিক’-ভাবে এ ব্যাপারটার উন্মোচন ঘটবে৷ তারপর হয়তো কোনো অন্তর্ঘাত পুরো ব্যাপারটাকেই পালটে দেবে৷


২. ১.

কিন্তু ‘বৈজ্ঞানিক’ ব্যাপারটা কি? তার লেখার ধাঁচাটা কি? সবচেয়ে বড়ো কথা: ‘বৈজ্ঞানিক’ পদ্ধতি কি?

এমনিতে বঙ্গীয় নিবন্ধ লিখন ধারায় সাহেবি ‘বৈজ্ঞানিক’ লিখন পদ্ধতি খুব অল্পই প্রয়োগ করা হয়৷ এই লিখন পদ্ধতির সুনির্দিষ্ট অথচ হরেক স্টাইলশিটস্ আছে৷ কুম্ভিলক বৃত্তি এড়াতে সাল তারিখ উল্লেখ করে কোনো মত বা উদ্ধৃতি লেখকের নাম সহ উল্লেখ করতে হয়৷ পাদটীকা বা অন্তিম টীকার ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট নিয়ম আছে৷ এ সব করতে হয় কাগজ বাঁচানোর তাগিদেও৷ সবশেষে গ্রন্থপঞ্জী দিতে হয়৷

সবচেয়ে বড়ো কথা পদ্ধতি তন্ত্রটা বিশদ করে বলতে হয়? কি পদ্ধতিতে আমি আমার প্রতিপাদ্য সমস্যার সমাধান বাৎলাচ্ছি৷ প্রথমে কয়েকটা পদ্ধতির কথা কই৷

একদল মানুষ আছেন, যাঁরা অনেকটা টাইপকাস্ট ইঞ্জিনিয়ারের মতোন৷ তাঁদের হাতে আছে চমৎকার নীল নকশা৷ আগে থাকতে পর্যবেক্ষণের সাহায্যে তথ্য জড়ো করে, তাকে নিয়ে পরীক্ষা- নিরীক্ষা করে তারপর সিদ্ধান্তে পৌঁছন৷ এঁদের বলা যায় ল্যাব- (ব্রেটরি)- বৈজ্ঞানিক৷ সমাজবিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও বৈজ্ঞানিকের কাছে মনে হয় সমগ্র সমাজটাই তাঁর ল্যাব৷ তাঁর গিনিপিগ সমাজের মানুষ জন৷ তাঁদের তিনি বিশ্লেষণ করেন৷ এই বিশ্লেষণের সময় এই গিনিপিগ মানুষজন বৈজ্ঞানিকে প্রশ্নতালিকা বা শিডিউলের উত্তর দেন৷ সেই শিডিউলের মধ্যে লুকোনো থাকে টেস্ট্‌ম৷ তারপর সমাজবিজ্ঞানীর টেবিলে তার বিশ্লেষণ করা হয়৷ কেতাবি ভাষায় একে বলা হয় অভিজ্ঞতাবাদী (এম্পিরিকাল) আরোহী (ইন্ডাকটিভ) পদ্ধতি৷

এক্ষেত্রে খেয়াল করবার বিষয় অনেকগুলো৷ প্রথমত: ফুকো- অনুগামীরা এঁর মধ্যে দেখবেন মানুষের শরীরের মধ্যে সেঁধোনোর হিংস্র প্রয়াস বা শরীরকে নিয়ে রাজনীতি করার বা ‘সত্য’ জানার নিদারুণ বিমারি৷ দ্বিতীয়ত: শিডিউল ভিত্তিক প্রশ্নোত্তরের সময়টাকেই ঐ উত্তরদাতার জীবনের সমগ্র সময় হিসেবে ভেবে নেওয়া হয়৷ অর্থাৎ মানুষটা খাটো বা কনডেন্সড্ হয়ে গেলেন৷ যে সময় মানুষটা সাক্ষাৎকার নেওয়া হচ্ছে, সে সময় তাঁর মেজাজ তেমন, তার তো হদিশ রাখা হয় না এমন ‘দৈর্ব্যক্তিক বৈজ্ঞানিক’ কাজের সময়, তাই তাঁর ক্ষণিকের মেজাজটাই সমগ্রের রূপ ধরে সাধারণীকৃত হয়৷ এরপর সেগুলো গবেষণাপত্রে লিখে ফেলা হয়৷ বেচারা ‘মানুষ’ (সাবজেক্ট) ততক্ষণে ‘বস্তু’ (অবজেক্ট) হয়ে গেছে৷ মানে জ্যান্ত মানুষ মড়া হয়ে গেল৷ বৈজ্ঞানিকের বিজ্ঞান- ‘তন্ত্র’-এ শব সাধনা এমনই — অস্থির ক্ষণিককে স্থবির করা৷

কিন্তু এতে কি সুবিধে হল? বিশেষত: তথাকথিত ‘সমাজ’ বিজ্ঞানে? প্রথমত মানুষ- বস্তুর জড়ীভবনে (অবজেক্টিফিকেশনে) একটা ‘বিষয়’ (‘সাবজেক্ট’ থেকে বলা যায় একে সাবজেক্টিফিকেশন) বা ডিসিপ্লিন (তার মানেই তাসের দেশের নিয়ম কানুন) বনে উঠলো, যেমন, কথা-বলা-বিষয়টা (স্পিকিং সাবজেক্ট) নিয়ে ভাষাতত্ত্ব৷ একটা নাগরিক পেশায় কিছু ‘বিদ্বজন’-এর কর্মসংস্থান হল৷ এবার তাঁরা নানান খবরা খবর পৌঁছে দেবেন বনিক-পোষিত রাষ্ট্রের হাতে৷ এতে যা হবে, তার নাম প্রজাভবন (সাবজেকশন) তথা শাসনতান্ত্রিকতা (Governmentality) এমন কাজকম্মে কেউ কেউ হিংস্রতার উদ্ভাস দেখেন৷

এ পর্যন্ত তো ফুকো ঝেড়ে বলে দিলুম৷ বৈজ্ঞানিক লেখার দস্তুর, আগেই বলেছি, এমন কথার সমস্ত সূত্র-নির্দেশ করা৷ এবার অবশ্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গলতির কথা বলবো সূত্র সহ (‘উইথ রেফারেন্স’— আমার মতো দ্বিভাষিক বাঙালির কথা-কওয়া কেমন তর্জমা ধর্ম হয়ে উঠছে সেটা পাঠক খেয়াল করবেন৷)৷ স্যার প্যাটার ম্যার্ডওয়ার ‘সাইন্টিফিক রাইটিং’ বলে একটা হোস দিশারী নিবঙ্গ লিখেছিলেন, Oxford English (1986) সংকলনে৷ সেখানে তিনি স্পষ্টাপষ্টি করে দেন একটা কথা, এই ধরনের মীলের পদ্ধতি-নির্ভর আরোহী বিজ্ঞানে কদাচ ‘কেন’-প্রশ্নটা করা হয় না৷ কেন একটা ‘তথ্য’-কে আর একটা তথ্যের থেকে বেশি বা কম গুরুত্ব দেওয়া হল, — তার কোনো উত্তর নেই৷ কোন তথ্য নেওয়া হবে বা হবে না কে কেন কিভাবে স্থির করলো— এসব প্রশ্ন বৈজ্ঞানিক লেখায় করতে নেই৷ ‘কেন’-প্রশ্ন বাচ্চারা করে৷ তাদের ধমক দিয়ে থামিয়ে দিতে হয়৷ বড়ো মানে অ্যাডাল্ট বৈজ্ঞানিকরা কি এইসব বাচ্চামো করবেন?

তার মানেই বিজ্ঞানের এটাই একমাত্র পদ্ধতি, তা নয়! ধরুন একজন পেটেন্ট আফিসের কেরানি আঁক কষে বলে ফেললেন, তারাটাকে আকাশে যে জায়গায় দেখছো, তারাটা সেখানে নেই৷ তারার আলো আকাশ-পথে আমার পথে আর সব গ্রহ-নক্ষত্রের টানে বেঁকে গেছে৷ কিন্তু এটা তো প্রমাণ করতে হবে হাতেনাতে৷ তাই আরোহী অভিজ্ঞতাবাদীরা সকাল বেলা তারা দেখতে চাইলেন৷ সেটা দেখা যাবে কখন? সূর্যগ্রহণের সময়! সূর্য-তারার পাশে আরেকটা তারা দেখা যাবে তখন৷ রাতের তারা আর সকালের তারা তারার ঠাঁইবদল তাঁরা চাইতে বুঝতে চাইলেন৷ ঐ কেরানি ভদ্দরলোকের পদ্ধতিকে বলবো অবরোহী পদ্ধতি৷ ‘বৈজ্ঞানিক’ কল্পনার বিস্তার ঘটলো সেখানে৷

তেমনি আমাদের আলোচ্য৷ ‘চমস্কির পদ্ধতি’ অবরোহী অনভিজ্ঞতা-বাদী বা ‘বুদ্ধিবাদী’ (‘র‍্যাশানালিস্ট’ বা বুদ্ধিবাদী শব্দটি এখানে বিশেষ অর্থে ব্যবহার করা হয়৷ দেকার্তের অনুগামীরা মনে করেন, আমাদের জ্ঞানের উৎস ইন্দ্রিয়লব্ধ অভিজ্ঞতা নয়, সহজাত ধারণা!)৷ তিনি এই যে ১৯৫৭ সালে বলে ফেল্লেন সসীম শব্দ দিয়ে অসীম বাক্য সৃজনের মানসিক ক্ষমতার কথা, তার জন্য তাঁকে কিন্তু মানুষের ‘মন’-নামক দেহাঙ্গ কেটে ছিঁড়ে বের করতে হল না৷ এই উপকল্প বা হাইপোথিসিস বানানোর পর সমস্ত মানুষের (যাকে বলে হোমো স্যাপিএন্স) ভাষা-বিশ্লেষণ করে (এই জায়গাটা আরোহী ও অভিজ্ঞতাবাগী৷ বাক্যের তথ্য সংগ্রহ করতে হচ্ছে তো!) এই তত্ত্ব বা থিওরি প্রতিষ্ঠা করে বলতে হচ্ছে সমস্ত হোমো স্যাপিএন্স সৃজন-পারঙ্গম৷ সমস্ত মানুষের জিনের মধ্যেই এমন সহজাত সার্বজনীন ব্যাকরণ আছে ইত্যাদি৷

কিন্তু চমস্কীয় তত্ত্বকে মিথ্যাকৃত করা যায় কি? তিনি যে ‘সত্য’ বল্লেন মানব ভাষা সম্পর্কে, বল্লেন মানবভাষা বিশ্লেষণ করে বিরাট গভীর গোপন মনের অন্দরে খানিকটা অন্তত ঢোকা যাবে, তাকে নেতিকৃত করা যায় কি?

আমাদের উত্তর, হ্যাঁ, যায়৷ এরকম সার্বজনীন সত্যের মহাআখ্যান রচনা না করেই তা করা যায়৷ কিন্তু, সেক্ষেত্রে আমাদের পদ্ধতি কি হবে? ধীরে বৎস্য, ধীরে...রহু ধৈর্যং, বহু ধৈর্যং...


২-২

আর এক ধরনের পদ্ধতি আছে, যেটাকে না পদ্ধতি বলেই যায়৷ এটা হলো গিয়ে ছাঁট জড়ো করার কাজ৷ ব্যাপারটা একটা গপ্পো বলে বলি৷ গপ্পোটা মীরা মুখার্জীর বিশ্বকর্মার সন্ধানে (১৯৯৩) বইটাতে পড়েছি৷

একবার ব্রহ্মা সব কারিগরদের তলব করলেন৷ বিশ্বকর্মা বাদে সব কারিগর ঠিক সময়ে এসে কাজ শেষ করলেন৷ বিশ্বকর্মা যখন এলেন, তখন যা পড়ে আছে তা ছাঁটকাট তলানি— কাঁচামাল শেষ! তবু বিশ্বকর্মা সুন্দর এক ‘উট’ বানালেন এই অবশেষ দিয়েই৷ ব্রহ্মা খুশি, কিন্তু বিশ্বকর্মার দেরিতে আসার কারণ জিগ্যেস করে বসলেন৷ বিশ্বকর্মার হাতে অনেক কাজ এবং এত কাজে জ্বলেপুড়ে (যাকে বলে, বার্ন আউট) তাঁর আসতে দেরি হয়েছে৷ ব্রহ্মা এমন কৈফিয়ত শুনে অভিশাপ দিলেন: ওহে লেট—লতিফ, তোমার জীবনও এরকম হবে৷ যেমন কাজ করবে, তেমনি দাম পাবে৷ তার বেশি সারপ্লাস বা বাড়তি সঞ্চয় তোমার ভাগ্যে নেই৷’

এমন অভিশপ্ত বিশ্ব কর্মাদের এমন তলানি ছাঁট নিয়ে (নান্দনিক) কাজের একটা নাম দিয়েছেন সাহেব রা: ব্রিকোলাজ অর্থাৎ কিনা কোলাজের কাজ৷ যিনি এমন কাজ করেন, তিনি ব্রিকোলার৷ গৌতমভদ্র ওয় চমৎকার তর্জমা করেছেন: কুটুমকাটাম৷ সৌজন্য অবশ্যই অবনী ঠাকুর৷ ছাঁট বা তলানিকে বলে ইংরেজিতে remainder৷ এই রিমেইনডার আমাদের কিছু একটা remaind করাবে, তাই আমরা লিখবো এইভাবে rem(a)inder৷ অধুনালুপ্ত তৃতীয় বিশ্বের তলানি তৃতীয় তার প্রস্তাব পেশ করবে এরপর— একথা আগে ভাগেই দিয়ে রাখলুম৷

আমি পদ্ধতি হিসেবে এই অভিশপ্ত বিশ্বকর্মার তকনিকি কারিকুরি এখানে প্রয়োগ করবো৷ এর পোশাকি নাম: প্লুরিমেথড৷ একবার বিজ্ঞানের ‘সত্য’-ঘরে ঢুকবো৷ আর একবার অধুনা আক্রান্ত বিজ্ঞানবাদের বাইরে বেরিয়ে এসে কথা কইবো৷ ঘটনাটা ঘটবে দ্বিতীয় পাঠের পরপর দুটি অধ্যায়ে৷ নানা তত্ত্বের দৃব্বা দিয়ে সাজিয়ে নেবো আমার প্রতিস্পর্ধী তত্ত্বকথা৷ সেখান সাহেব-মেম থেকে শুরু করে কালা-বাদামি আদমির তত্ত্বকথা পাশাপাশি ঠাঁই পেয়ে থাকে৷

একটু আগেই বলছিলুম ‘সত্য’-ঘরের কথা৷ ‘সত্য’-ঘরই হোক, বা ‘মিথ্যে’-ঘর ই হোক — বিজ্ঞানের সত্য-মিথ্যে বিচারে ‘বস্তুমুখিনতা’ বা অবজেক্টিভিটির দাবি বিচার করতে গেলে বস্তু মুখিনতার তত্ত্ব-কথা পড়তেই হবে৷ সেখানে সত্যের দাবিদাওয়ায় ক্যাচাল পাকবে৷


২.৩.

মূলধারার বৈজ্ঞানিক গবেষণার মোদ্দা ব্যাপারটাই হল আমি বা সাবজেক্ট বা বিষয়টার বিলুপ্তি৷ হুং হুং বাবা, ‘আমি-আমি’ করে অহং-এর তাড়নায় কাজকম্মো করা চলবে না৷ ‘না-আমি’ বা বস্তু বা অবজেক্টের আদ্যোপান্ত খোলসা করে বলতে হবে৷ তাই বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ লিখতে হয় কর্মবাচ্যে, সে যতই ‘বিজ্ঞান’ নামক ধম্মো কর্তৃত্ব ফলাক না কেন!

কিন্তু, এমন আমির বিলোপ কি সম্ভব? সাধু-সন্নেসিরা শুনেছি কেউ কেউ আমিকে শূন্য থেকে অতিশূন্যে নিয়ে যেতে পারেন৷ তাদের কেউ আমি জানি না৷ তবে গত শতাব্দীর ঘ্যাম বুদ্ধিমান বার্ট্রান্ড রাসেল সাহেব চমৎকার তার ব্যাপারটা সামলেছেন৷

মূল উদ্ধৃতিটা বিচ্ছিন্নভাবে না দিয়ে ব্যাপারটা একটু বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করি৷ ‘আমি’ তো একটা ‘মানুষ’ (তাই নাকি?)— এবার আমার ইন্দ্রিয়ের দৌড় যত্তখানি, ততোখানিই দেখতে-শুনতে—চাটতে—ওম্‌পেতে-শুঁকতে পারি৷ ফিজিক্স এসে দেখিয়ে দিলো আমাদের এসব ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতার ভেতর গড়বড় আছে৷ ঘাসের সবুজতা, বরফের শীতলতা বা পাথরের কাঠিন্য, যদি আদৌ ফিজিক্সকে বিশ্বেস করা যায় (রাসেল লিখেছেন, “If bhynics is to be beligved”), তাহলে দেখা যাবে ঐসব শ্যামল সুন্দর হিমশীতল কাঠিন্য গুলো ভিন্ন ধরনের ব্যাপার৷ আবার ফিজিক্সের পর্যবেক্ষণ গুলোও শেষ অব্দি ‘মানুষ’-এর করা৷ মানুষ-ই তো ‘দেখছে’ শেষ অব্দি! তাহলে মানুষ ‘আমি’-(সাবজেক্ট) র সীমা ছাড়ালো কই? একটা পিঁপড়ে ‘নাকি’ দ্বিমাত্রিক বিশ্ব দেখে (এটা ও মানুষের করা পর্যবেক্ষণ), মানুষ-আমি ‘দেখে’ ত্রিমাত্রিক, আরো কোনো মানুষ থাকার সম্ভাবনা ও থাকে, যে ‘দেখতে’ পায় পাঁচ বা এগারো মাত্রার ‘বস্তু’৷ তাহলে, বস্তুটাকে ঠিকঠাক (অ্যাজ্ ইট্ ইজ্) ‘দেখা’-র গ্যারান্টি কে দিতে পারবে?


২.৪.

এখানেই রাসেল সাহেব বলছেন, বিজ্ঞানের নিজের সঙ্গে লাগে যুদ্ধু৷ সে যত বেশি বস্তুমুখি হতে চায়, তত বেশি হয়ে পড়ে বিষয়ীমুখী বা সাবজেক্টিভ্! বৈজ্ঞানিক-আমি ও শত চেষ্টা করে বস্তুমুখী বা অবজেক্টিভ হয়ে উঠতে পারে না আর৷ বাইরের না-আমি ‘বস্তু’-রা ‘অজ্ঞাত ও অজ্ঞেয়’ (আননোন এ্যান্ড আননোত্রবল) চিহ্নই থেকেই যায়৷ তাই ‘সত্য’ ও ‘বাস্তব’ কথাগুলো কথার কথা হয়ে যায়৷ শেষ অব্দি একটা ধাঁধায় গিয়ে ঠেকতে হয়: “একটা চরমসত্য আছে, চরমসত্য বলে কিস্‌সু নেই৷” নাগার্জুন বলে এক বৌদ্ধ দার্শনিক আরেকটু আগ বাড়িয়ে বলেন কথা কওয়া মাত্র কথাটা মিথ্যে হয়ে যায়৷ যেমন ধরুন, ‘রাসেল’স প্যারাডক্স’ বলে খ্যাত ব্যাপারটা৷ “(এই বন্ধনীভূক্ত বাক্যটি মিথ্যে)”বা “একজন কোলকাতা বাসী বললো, সমস্ত কোলকাতাবাসী মিথ্যোবাদী৷” —এমন সব বচনের সত্য-মিথ্যে নির্ণয় করুন তো৷ ক্যাচাল পেকে যাবে৷ আকরণবাদী বা ফর্মালিস্ট হয়ে ব্যাপারটা বলল দেওয়া যাচ্ছে না৷ ‘বিজ্ঞান’ আকরণ-নির্ভর৷ তাহলে সেই সত্য-ঘরে ও তবু আমরা ঘর-বানানো পাব্লিক, এক একটা সত্য-ঘর বানিয়ে নিই, তার পাশাপাশি যাকে আরেকটা আমারই নির্মিত ‘মিথ্যে ঘর’৷ এই সত্য-ঘরের আমি বলি, আমার কথাই সার্বজনীন সত্য৷ অর্থাৎ কিনা ঠাকুরের কথায়, আমার ঘড়িই ঠিকঠাক চলছে৷ আমি আমার ফাড়া (—মেন্টাল) নলেজ নিয়ে বড়াই করি, ‘অরিজিনাল’ কাজ করে ‘মূল’ সত্য ধরে ফেলেছি বলে বড়াই করি৷ মূল-মৌল-মৌলিকের এই ‘সত্য’-দাবি করে আমরাই বলে ফেলি ‘আমরা কিন্তু মৌলবাদী’ নই৷ যেমন, ‘কালো টাকা’, ব্ল্যাকমেইন’, ‘কালো বাজার’, ‘কালো দিবস’ ইত্যাদি কথা কয়ে ‘কালো মানুষ’ এবং ‘কালো মেয়ে’তে এসে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ি আরেকটা! ‘ঝাকালো বাজে’ এসব কথায়, তথাপি আমরা নাকি এ্যাপার যেতে বিশ্বেসই করি না এবং শেষ অব্দি পুং-আমি ইডেনে নেলসন মান্ডেলার অনুষ্ঠান শেষে ফর্সা-মেয়ের অনুসন্ধান চালাই৷

আধিপত্যকারী প্রাতিষ্ঠানিক বিজ্ঞানের সত্য-ঘরে ভগবান-বিজ্ঞানের মৌলবাদী কর্তামি আছে বটে, তবে সব বৈজ্ঞানিকরা এমন সত্য-দাবীদাওয়ায় যিতু আছেন—এমনটি মনে করার কোনো কারণ নেই৷ ব্যতিক্রমী বৈজ্ঞানিকরা নানান সত্য-ঘরকে বা নানান বিশ্বদীক্ষাকে বুঝে শুনে নেওয়ার মতো সহনশীলতায় যিতু হয়েছেন৷ কেননা, না হয়ে উপায় নেই তো ‘মানুষ’ বৈজ্ঞানিকের—৷

কয়েকটা সাধারণ উদাহরণ দিয়ে বোঝাই ব্যাপারটা৷ ধরা যাক একজন নিরামিষাশীর কথা৷ তিনি মাছ-মাংস-ডিমকে যেমন আমিষ ভাবেন, তেমনি আবার মুসুর ডাল, পেঁয়াজ, রসুনকে ও আমিষ ভাবেন৷ তাঁর এটাই সত্য-ঘর৷ আবার অন্য একজন নিরামিষাশী ডিম থেকে রসুন অব্দি সব খেয়ে, মাছ-মাংস খান না বলে আমিষাশী বলে দাবি পেশ করেন৷ এই দু’জনের সত্য-ঘরকেই আমরা মেনে নেবো৷ কিন্তু বিজ্ঞান কি মেনে নেবে? এ্যানিমাল প্রোটিন যে খায় না সেই তো নিরামিষাশী!

আমরা দার্শনিক প্রবর হিবট গেনস্টানইনের কথা এখানে একটু শুনে নেবো৷ উনি মারা যাওয়ার পর ওঁর গণিত-বিষয়ক নোট্‌স (যা রি মার্কস নামে খ্যাত) বা ছাঁটকাট বেরোয়৷ উনি বলেন, অংকের সংখ্যাগুলো যেহেতু মানুষের ইনভেনশন (আগে ছিল না, মানুষ আবিষ্কার করেছে৷), ডিসক ভারি (আগে ছিল—পুনঃ আবিষ্কৃত হয়েছে) নয়, তাই অংক নিয়ে যা খুশি করা যায়! যেমন বলাই যায় ১২ + ১ = ১৪৷ প্রমাণ করবো কি করে?

ধরা যাক একটা সত্য-ঘর৷ বিশাল বড়ো অ্যাপার্টমেন্ট মানে যার অনেকগুলো তলা বা ফ্লোরস্ আছে৷ সেখানের লিফ্‌টে ১২র পরেই ১৪ নম্বর বোতাম আছে৷ এক পিৎজা-ফেরিওলাকে যেতে হবে ১৩ তলায়৷ সে বেচারা তেরোর বোতাম আর খুঁজেই পায় না৷ অবশেষে সে জানতে পারলো এই সত্য-অ্যাপার্টমেন্টের বাসিন্দেরা মনে করেন ১৩ সংখ্যাটা অপয়া৷ তাই তাঁরা ১২র পর ১৪ নম্বর বোতাম রেখেছেন৷ অতএব ১২ + ১ = ১৪৷

এমন আংকিক সমস্যা ক্রিকেট-মাঠেও আমরা দেখেছি৷ এমনকি লর্ডস, ইডেন, চিপকের মাঠের (সত্য-ঘরের) মাপ সমান নয়৷ এক মাঠে যেটা ৬, অন্য মাঠে সেটাই আবার ক্যাচ৷ তার ওপর আবার ৬ বলের ওভারের ক্ষেত্রে খুব আশ্চর্য ভাবেই দশমিক-চিহ্ন ব্যবহার করা হয়৷ বলা হয় ওয়াসিম আক্রম ৭:৪ ওভার বল করেছেন মানে ৭ নম্বর ওভারের ৪ নম্বর বল৷ এই ৪ এর আদতে মূল্য যদিচ অন্য, কিন্তু ৪ বা-/৬ ধরেই চমৎকার ক্রিকেট খেলার সত্য-ঘর লাভও আছে৷ এই হিসেব ধরেই গড় কষা হচ্ছে, এমন কি ভবিষ্যদ্বাণী ও করা হচ্ছে এবং ক্রিকেট নান্দনিকতাও মাঠে মারা যাচ্ছে না৷

এই অংক নিয়ে আরো কথা কইবো পরে৷ অংকের ভাষায় কথা না কইলে নাকি বিজ্ঞান-সত্য ঘরের বাসিন্দেরা আমার বৈজ্ঞানিক বিষয়টাকে ‘বিজ্ঞান’ হিসেবেই গ্রাহ্য করবেন না৷ বিজ্ঞান ‘কৌম’-এর দস্তুর এমনই৷ অথচ দেখুন কি অবস্থা, নিউ গিনির মানুষের বৃষ্টি-ওষুধ—ভগবান নিয়ে কথা বললেও, পাটীগণিত-বিষয়ক জ্ঞানগম্যি তাঁদের কোনো কাজে লাগে না৷ এতে তাঁদের যাপনের কোনো অসুবিধে হচ্ছে না, দিব্যি চলে যাচ্ছে৷

এবার এই যে আমি ‘নিউ গিনির মানুষ’ কথাটা ব্যবহার করলুম, নৃতত্ব—বিজ্ঞানের সত্য-ঘরে এঁদের আবার মানুষ বলেই গণ্য করা হয় না! বলা হয়, ‘ট্রাইব’৷ কেন? তাঁরা কি হোমো স্যাপিএন্স নন? এই মুশকিল বিজ্ঞানের বিরাট সত্য-ঘরের নানান শাখায় আবার আসঞ্জ বা কোহেরেন্স নেই৷ একথাটা শুনতে অনেকেরই আশ্চর্য লাগবে, কিন্তু একটু তলিয়ে ভেবে দেখুন তো হাতের কাছে ফিজিওলজির সত্য-ঘর মজুত থাকতে কেন আবার ফিজিক্যাল অ্যানথ্রোপলজির কথা পাড়ি? কেন হাতের কাছে মোশিওলজি বা হিস্ট্রি থাকা সত্ত্বেও ‘আলাদা’ করে কালচারাল অ্যানথ্রোপলজির সত্য-ঘরের কথা পাড়ি? এখানেই বুঝে নিতে হবে বিজ্ঞানের ভেতরের ‘সাম্প্রদায়িক তা’-র কথা৷ কালা, আদমির জন্য ‘আলাদা’ বিষয়ের সত্য-ঘর আর সফেদের জন্য ‘আলাদা’ সত্য-ঘর বিষয় আশায়৷ হিবটহেনস্টাইন ঠিকই কয়েছিলেন, গণিত-চর্চা একটা সম্প্রদায়ের ব্যাপারস্যাপার৷ আমরা বলছি, সত্য-খোঁজার ব্যাপারটাও নানান বিষয়আশয়ে এবং নানান কেটমে সাম্প্রদায়িক ভাবে আলাদা আলাদা৷ নরকেন্দ্রিক বা বিশ্বদীক্ষায় সার্বজনীন চরমপরম ‘সত্য’ বলে কিস্‌সু পাওয়া যাবে না৷

এই ধরুন, আমাদের ‘বাঙালি’ নামক কল্পিত নেশন স্টেটের বাসিন্দেদের কথা৷ এঁদের নিয়ে সাত-পাঁচ ভাবতে গিয়ে দেখলুম নয়-ছয় হয়ে গেল ‘যাহা বাহান্ন তা হাই তিপ্পান্ন’-তে এসে৷ এবার তাহলে বাঙালির নিজস্ব গণনাপদ্ধতি নিয়ে সাত-সতেরো কথাবার্তা পাড়া যাক৷

অনেক বাঙালিকে জিজ্ঞেস করেছি, ‘মশাই, আপনি লাখ পাঁচেক টাকা বলতে কত টাকা বলেন? আমরা গোটা পাঁচেক আইসক্রিম আনতে বললে কটা আইসক্রিম কিনবেন? যদি আপনরা বাড়ি জনা সাতেক অতিথি এসে যাবেন, তা হলে কটা প্লেটস্ খাবারের অর্ডার দেবেন?

না, ঐ ‘পাঁচেক-সাতেক’-এর নিশ্চিত উত্তর দিতে পারছেন না কেউ৷ এক একবার এক এক রকম উত্তর দিয়ে ফেলছেন৷ আবার ‘লাখ পাঁচেক’ টাকার ক্ষেত্রে আমার সংখ্যাটা একরকম তো হর্ষ নেওটিয়ার উত্তর আর একরম৷ তার মানে এই ১ এক নয়, + ১ ও নয় অথবা এটা ১ এবং + ১৷ (দ্র. অধ্যায় ৫) সবকটা সম্ভাবনার দোর খোলা রাখতে হবে৷ যেই দোর বন্ধ করবো, অমনি মূল-মৌল-মৌলিকের খপ্পরে পড়বো৷ নিশ্চিত সত্য—জ্ঞানের সন্ধানীরা আকরণবাদী হয়ে এসব কথার নিশ্চয়াত্মক মানে বের করার চেষ্টা করবেন৷ সে তাঁরা করুন হে যান৷ যিনি যাতে আনন্দ পান, তিনি তা করুন, কিন্তু আমরা চলবো গ্রহণের নীতি মেনে, হিংস্র বর্জনে আমরা নেই৷ কেননা, আগেই বলেছি, আমরা ব্রিকোলারের পদ্ধতি গ্রহণ করেছি— নানান ছাঁট জড়ো করা আমাদের কাজ৷ তাই কারোর সত্য/মিথ্যা-ঘর যদি আমাদের অপছন্দ হয়, তাহলে তাকে একটা বৈধ সম্ভাবনা বা লেজিটি মেট পসিবিলিটি হিসেবে মেনে নেবো, কিন্তু সেই মতের প্রতি আপাতত দায়বদ্ধতা থাকবে না৷ এমন মনোভাবে নাম: অস্বীকৃতি গ্রহণ৷ অন্যদিকে, যে আপাত সত্য-ঘরে আমি যিতু আছি, যে মতের প্রতি আমার আপাতত দায়বদ্ধতা আছে, সেই সত্য/মিথ্যে ঘরকে আমি স্বীকৃতি গ্রহণ করবো এই মুহূর্তে৷ পর মুহূর্তে কি যে ঘটবে কে জানে! কেননা, ঐ যে ২.৩. - এ বা সেল’ স প্যারাডক্স-এর কথা পেড়েছিলুম, তারই সাপেক্ষে গ্যোয়ডেল নামে এক গণিতজ্ঞ একটা উপপাদ্য তৈরি করেন: কোনো আকরণতন্ত্রই স্বয়ং সম্পূর্ণ নয়৷ প্রত্যেক আকরণবাদী মডেলের সত্যঘরের মধ্যেই অন্তর্ঘাত আছে! ‘বিজ্ঞান’ কি এতোই ঠুনকো পলকা?


২.৫

আমির বিলুপ্তির অসম্ভাব্যতা, আকরণবাদের অন্দরেই অন্তর্ঘাত, ‘কেন’-প্রশ্নের অনুস্থাপন, গণনা ভিত্তিক কার্যক্রমের সমস্যা আমাকে ‘বৈজ্ঞানিক’ নিবন্ধ লিখতে বাধা দিচ্ছে— ক্রমবর্ধমান অসুবিধে তৈরি করছে৷ কিন্তু, আরো অসুবিধে আছে আমার৷ কালা-বাদামি আদমিরা কার্যগতিকে প্রথম বিশ্বের বিজ্ঞানের দরবারে তথ্য জোগান দেন, কিন্তু তত্ত্বকথা কইবার অধিকার (সাহেবের অনুমোদন ব্যতিরেকে) তার নেই৷ প্রথম বিশ্বের বিদ্যে-কারখানায় এই তথ্য জোগান দেওয়ার কারবারকে কেউ কেউ বলছেন বৈজ্ঞানিক সামাজ্যবাদ৷ প্রান্ত থেকে কেন্দ্রে তথ্য যাচ্ছে৷ কেন্দ্রের পছন্দমাফিক মডেলে তথ্য পোরা হয়ে যাচ্ছে৷ ব্যাস্, কাম খতম৷

আরো সমস্যা আছে৷ বিশেষত ‘প্রাকৃতিক’ বিজ্ঞানের সত্য ঘরে৷ সচরাচর প্রাকৃতিক ও প্রায়োগিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক কোনো মন্তব্য করা নিষেধ৷ এই যে আমি বল্লুম ‘অর্থনৈতিক মন্তব্য’, তাও তো আজকাল ‘প্রাকৃতিক’ বিজ্ঞান হিসেবেই ধরে নেওয়া হয়েছে৷ কি কপাল, টাকাপয়সা—চিহ্নের লেনদেন বা বাজারের গতিপ্রকৃতি ও ‘প্রাকৃতিক’ ঘটনা৷ আসলে এই ‘সত্য-ঘর’-এ জ্ঞানকে এমন ‘বিশুদ্ধ’ অসংক্রামিত এক ধারণা হিসেবে ধরে নেওয়া হয় যে তার গায়ে রক্ত-ঘাম-ক্রেদের আঁচ লাগতেই দেওয়া হয় না৷ যেমন আমরা দ্বিতীয় পর্বে গিয়ে দেখবো বুদ্ধিবাদী জ্ঞানতাত্ত্বিক বৈজ্ঞানিক চমস্কির গপ্পের সঙ্গে রাজনৈতিক ভাষ্যকার চমস্কির বিরাট তফাৎ আছে৷ দুজন যেন আলাদা মানুষঃ ভাষা-তাত্ত্বিক চমস্কি আর রাজনৈতিক চমস্কি৷ এবার এঁদের মধ্যে সেতুবন্ধন করবেন কে? রামের চাকর হনুমান৷ অথবা লেটলতিফ বিশ্বকর্মা! অথবা নগণ্য না-মানুষ কাঠবেড়ালি৷

কিন্তু কাঠবেড়ালি- হনুমান — বিশ্বকর্মা বা অধুনালুপ্ত তথাকথিত তৃতীয় বিশ্বের এঁদো গলির অধস্তন গো-এষনা কর্মা কথা বান তর্জমায়৷ এই যেমন আমি করছি, সাহেবদের কথা টুকে মুলে সাহেবদের বিষয় নিয়ে ভাটিয়ে যাচ্ছি৷ অর্থাৎ সাহেব দ্রোনাচার্যের সঙ্গে বিস্তার সম্পর্ক একলব্যের৷ বুড়ো আঙুল কাটা গেলে লিখতেই পারবো না৷

এমন দ্বিভাষিকতার সমস্যার কথা পড়েছিলেন সুধীন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর প্রতিধ্বনি (১৯৫৪) তর্জমা গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি মহাকবি—দ্রোণাচার্যদের সঙ্গে একলব্যের সম্পর্ক পাতিয়ে ছিলেন৷ তারপর থেকে আমি মূল/উৎস-বয়ানকে বলি দ্রোণাচার্য বয়ান, আর আমার বয়ান একলব্য বয়ান৷ দ্রোণ-মূর্তি বানিয়ে পুজো আচ্ছা করে আমি যে দ্রোণ-সম ধনুর্ধর হব, তারও জো নেই৷ সাহেব-দ্রোণর মনপছন্দ ‘তত্ত্ব’ না-হলে বা সেহাব টপকানো কাজ হলে, আমার কপালে দুর্গতি আছে৷

সুধীন্দ্রনাথ যে দ্বিভাষিকতার উভটানে ভুগে প্রতিধ্বনির-র ভূমিকা লিখছিলেন নিজেকে মূল-ধ্বনির ‘প্রতি—’ হিসেবে সাব্যস্ত করে, সে উভটানে ভুগছি আমিও৷ শুধু আমার সঙ্গে তাঁর তফাৎ তিনি দুরন্ত ইংরেজি জানেন, আমি তার ছিটে ফোঁটাও জানি না৷ কিন্তু, আমি যে জল হাওয়ায় বেড়ে উঠলুম, যে বাহ্যিক ভাষা ছোট বেলা থেকে রপ্ত করলুম, রাঙা হলে মনের ঝাল মেটাতে যে ভাষায় খিস্তি করি, সে ভাষায় বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ লেখার চল নেই, কদাচিৎ বাংলা জার্নাল বেরোয়৷ স্টাইলশিটের বালাই নেই ইত্যাদি৷ সব সময় ব্যাপারটাকে একটু পপ্ (—উলার) করে লিখতে হবে—এমন একটা চাপ থাকে৷

তা’বলে কি আমাদের বাংলা ভাষায় দিগন্ত কারী গবেষণা হয় নি? এতো বেশি হীনম্মন্যতায় ভোগার কোনো কারণ নেই৷ হাতের কাছে বঙ্কিমের কৃষ্ণ চরিত্র আছে কি? একবার নেড়ে চেড়ে দেখুন, এককালের সাহেবি একা দেমিক্‌স-এর নিয়মকানুন মেনে প্রথমে সমস্যা বলে নিয়ে, তারপর লিটারেচার সার্ভে (আগে সমস্যাটা নিয়ে যে যে কাজ হয়েছে তার বিবরণ এবং সেসব কাজের সংগে আমার কাজের তফাৎ) করে, কাজের পদ্ধতি (এতক্ষণ নানান অসুবিধে সত্ত্বেও যা নিয়ে আমরা কথা কয়েছি— বিজ্ঞানের দর্শন) বলে নিয়ে তারপর কেষ্ট ঠাকুরের অনলৌকিক বেত্তান্ত পেশ করছেন বঙ্কিম৷ আবার বুদ্ধদেব বসু যখন মহাভারতের কথা নিয়ে কাজ করলেন তখন আবার বঙ্কিমের সঙ্গে তাঁর তফাৎটা ধরিয়ে দিলেন৷ গরুখোঁজা বা গবেষণার এমনই দস্তুর৷

এত কথা কইছি কেননা আজকাল P h. D. করার হিড়িকে কতকগুলো শর্ত এসেছে৷ এইসব কথাবার্তা এখন P h. D. করার আগে পড়ে নিতে হয়৷ অথচ এ পোড়া পশ্চিমবঙ্গে কয়েকজন দর্শনের প্রবৃদ্ধ/বৃদ্ধা ছাড়া এসব পড়ানোর মতো ক্যালি খুব কম লোকেরই আছে৷ আমার মনে আছে P h. D কমিটির কনভেনর বা হোতা হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এক অধ্যাপনা আমায় অবাক করে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘রিসার্চ মেথডলজি, সেটা আবার কি?’ অথচ তিনি স্বয়ং বহু P h. D. বিইয়েছেন৷

এইসব ভেবে চিন্তে এমন একটা অধ্যায় লিখে ফেল্লুম বটে, কিন্তু পাঠক খেয়াল করে দেখবেন, এটা ঠিক কোর্স ওয়ার্কের মতো ব্যাপার হয়ে ওঠে নি, বরং ‘বৈজ্ঞানিক’ লেখা-বানানোর অসুবিধে-সমস্যা ইত্যাদিই প্রমুখিত হয়েছে৷ কিন্তু, গুপচুপ যেটা বলে ফেলা গেছে, সেটা সেই কিন্তু কথার এন্তেকাল: একলব্যের বুড়ো আঙুল কাটার মতো হিংস্র ঘটনার মুখরোও করে ফেলেছি এখানে, যা দ্বিতীয় পর্বের কথা-কওয়ায় আমাদের সাহায্য করবে৷ তবে, দ্বিতীয় পর্বে স্টাইলশিট মেনেই কথা কওয়া হবে৷ এতক্ষণ যেমন হেলাফেলায় রাসেল—হিবট গেন স্টাইন-নীৎসে প্রমুখের কথা সূত্র হীন ভাবে বলে গেছি, দ্বিতীয় পর্বে এমন কম্মোটি আর করবো না৷ MLA stylesheet কথা সম্ভব মেনে এমন ভাবে কথা কইবার চেষ্টা করবো যাতে শ্যাম ও থাকে কূলও থাকে পাঠক ও বোঝেন আবার সাহেব-টপকানো কাজ ও হয়৷

কিন্তু, প্রশ্ন হল গিয়ে সাহেবি আকাদেমিক্‌স-এর ধাঁচাটা গ্রহণ করলুম কেন? আমাদের হাতের কাছেই তো টাকা-ভাষ্য-ধার্তিকের একটা সুন্দর ধাঁচা ছিলো৷ সে ধাঁচা কি কলোনির চাপে হারিয়ে গেছে? বঙ্কিম স্বয়ং সাহেবি পদ্ধতিতন্ত্র চালিয়ে গিয়েও টাকা-ভাষ্য-ধার্তিকের ঐতিহ্যকে গুপ্‌চুপ চালিয়ে দিয়েছেন৷ ‘ভারতীয় দর্শন’ (নামক নির্মাণে-এ পূর্বপক্ষ খণ্ডন না করে নিজ-বঙ্গ উত্তর পক্ষ বাৎলানো যায় না৷ তত্ত্ব জিজ্ঞাসার জন্য তক্কো করতে হলে হারা-জেতার প্রশ্ন থাকে না৷ হ্যাঁ, এই ধাঁচাটাও আমাদের মূল দ্বিতীয় পর্বে পেড়ে ফেলা হবে৷ তাই, বাদী-বিবাদীর পরস্পর বিরুদ্ধ কথাগুলো সংলাপের ধাঁচে ফেলে দেওয়া হবে: যেন গুরু-শিষ্য সম্বাদ!


২.৬

দ্বিতীয় পর্ব শুরু করতে এগিয়ে আবার অসুবিধেয় পড়লুম৷ মনে পড়লো সুধীন্দ্রনাথ দত্তের একটা কথা৷ স্বগত-র ভূমিকায় তিনি লিখেছিলেন যে তিনি নাকি ‘অদৃষ্ট গতিকে পঙ্গু সমাজের সভ্য’ এমন পঙ্গু সমাজে যে নাট্যাভিনয় হয়, তার মঞ্চের “পাত্রপাত্রীরা স্বাভাবিক জাড্যের দৌরাত্ম্যে যখন নিজের মনোভাব প্রকাশে অপারগ হত, তখন তাদের অভিপ্রায় পৌঁছোতে এই বন্ধনীভুক্ত স্বগতের দৌত্যে৷’

সচরাচর যাকে ‘বাস্তববাদী’ নাটক বলা হয়, সেখানেই তো এমন অ-বাস্তব স্বগতোক্তির বাড়াবাড়ি৷ সর্বজন সমক্ষে যে কথা কইতে পারি না মুখোশে মুখে ঢেকে, তাই তো মনে মনে বলা স্বগতোক্তি — জন-অন্তিকে বলা! এমন তঞ্চক ভান আর কি আছে! ঠাকুর ঠিকই বলেন, মন-মুখ এক করে রসে বশে আর থাকা হয়ে উঠলো না৷

এমন সব নিষেধের মধ্যে মনের কথা কই কি করে? না কইতে পেরে চাপের চোটে তো মরতে বসেছি৷ এই মরে যাওয়ার গপ্পো এবার শুরু হবে — শুরু করবে পঙ্গু সমাজেরই এক সদস্য৷ কথা কইবো সৃজনের ফুড়ি সর্জনের পঙ্গুতা নিয়ে৷ পূর্বপক্ষ অবশ্যই চমক্সি, যিনি সৃজনের সংজ্ঞার্থ দিয়েছেন৷

দেখুন এখানেও প্যারাডক্স৷ বলছি একদিকে যে কথা চাপের চোটে বন্ধ, অথচ আবার সেটা নিয়েই বকবক করছি৷ এসব কেলো সামলাবো কি করে?



লেখক পরিচিতি
Debaprasad Bandyopadhyay (born 1965) is a professor (honoris causa) of Linguistics, La Filológica Por La Causa (USA/MEXICO) and one of the distinguished members and collaborators of INTRADEPARTMENTAL LEXICOGRAPHICAL STUDIO, Saint-Petersburg State University. He is also a worker of Linguistic Research Unit, Indian Statistical Institute (Kolkata). He has published more than ten books and 200 articles in journals and magazines on 29 different topics. He has also attended and organized numerous international and national seminars and chaired sessions in seminars. He is a member of the editorial boards of different journals and member of learned societies. He, as a socio-political commentator, is regularly participating in T.V. talk shows.

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন