সোমবার, ১ আগস্ট, ২০১৬

পৃথিবীর ক্ষুধার্ত পথে হেঁটে বেড়ানো পবিত্র সেই বালকটি- বেন ওকরি

বিপাশা চক্রবর্তী

“ঐ দিনটিকে আমিও এখনো একটি বিশেষ নির্দিষ্ট দিন হিসেবে মনে করতে পারি। বৃষ্টি হচ্ছিল বাইরে। এবং দিনটি আমার জীবনকে পরিবর্তন করে দিল। বাসার সবাই বাইরে গিয়েছিল। আমি বসার ঘরে বসেছিলাম। একটি কাগজের টুকরো নিয়ে ফায়ারপ্লেসের কাছে কাঠের তাকের উপর রেখে আঁকতে শুরু করেছিলাম আমি। এক ঘণ্টা সময় লেগেছিল কিছু একটা আঁকতে। তারপর আরেক টুকরা কাগজ নিয়েছিলাম। একটি কবিতা লিখেছিলাম। মাত্র দশ মিনিটে কবিতা লিখেছিলাম। আমার আঁকা চিত্রটি আর লেখা কবিতাটা দেখছিলাম। চিত্রাঙ্কনটি ছিল বাজে। আর কবিতাটি...... চলনসই, সহনীয় ও গ্রহণযোগ্য। এবং আমার কাছে পরিষ্কার হয় ব্যাপারটি এটাই আমার জন্য অনেক বেশী স্বতঃস্ফূর্ত স্বাভাবিক এলাকা।”


১৯৯২ সালের জুলাই মাসের একদিন, কোন এক হোটেল রুমে ‘নিউজ ডে’ পত্রিকার এক সাংবাদিককে দেয়া সাক্ষাৎকারে এসব বলছিলেন, ১৯৯১ সালে গ্রেট ব্রিটেনের ম্যান অব বুকার পুরস্কার জয়ী নাইজেরিয়ান কবি ও ঔপন্যাসিক বেন ওকরি। সেবছর সেরা ফিকশন হিসেবে বুকার জয় করে তাঁর লেখা উপন্যাস ‘দি ফেমিশড রোড’ বা ‘ক্ষুধার্ত সড়ক’।

সাক্ষাৎকারে যে সময়টার কথা বলছিলেন, তখন ওকরি ১৪ বছর বয়সের বালক। সেই থেকে শুরু লেখালেখি। কবিতা দিয়েই শুরু। এখন সারা পৃথিবীতে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে। ভারতীয় উপমহাদেশেও তাঁর বিপুল জনপ্রিয়তা। তাই বেন ওকরি আমাদের কাছে খুব পরিচিত একটি নাম।গল্পই ওকরির লেখার প্রাণ। খুব স্বাভাবিকভাবেই ঠিক যেন ভেতর থেকেই অসাধারণ সব গল্প আসে ওকরির কাছে। লেখেন ইংরেজি ভাষায়। 

১৯৫৯ সালে নাইজেরিয়ায় জন্ম হলেও মাত্র দুবছর বয়স পুরো হলে পরিবার ইংল্যান্ডে চলে আসে। লন্ডনের পিকহ্যামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বেনের লেখাপড়া শুরু। দশবছর পর আবার নাইজেরিয়ায় ফিরে আসেন। ঐ বয়সে আইজ্যাক নিউটন’পড়ে তাঁর মনে সাধ জেগেছিল বিজ্ঞানী হবার। লাগোস শহরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থ বিজ্ঞান নিয়ে পড়তে চাইলেন বেন। কিন্তু বয়স খুব কম হওয়ায় সে সুযোগ পেলেন না। লিখতে শুরু করলেন। কারণ বেন জানেন এটাই সবচেয়ে স্বতঃফূর্ত এলাকা। ঠিক দৈববাণীর মতো কবিতা তাঁকে ডাকছিল তখন। কিন্তু এত সহজ ছিল না লেখালেখিতে ক্যারিয়ার গড়া। 

অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছিল বেন’কে। প্রবন্ধ নিবন্ধ এসবও লিখতে থাকলেন সামাজিক ও রাজনৈতিক নানা ইস্যুতে। প্রকাশক পেলেন না। তাই, সেসব নিবন্ধের উপর ভিত্তি করে ছোট গল্প লিখতে শুরু করলেন। কিছু প্রকাশিত হল নারীদের পত্রিকায় আর কিছু সান্ধ্য পত্রিকাগুলোতে। কিন্তু যখন দেখলেন, এই কাজগুলোতে সরকারের সমালোচনা থাকায়, তাঁর নামটি সরকারী মৃতের তালিকায় উঠে যেতে পারে যেকোনো সময়, তখন দেশ ত্যাগ করাটা জরুরী হয়ে পড়ল। এরই মধ্যে বেনের সাথে পরিচয় ঘটেছে নিজের শিকড়ের সঙ্গে, হয়েছে গৃহযুদ্ধের অভিজ্ঞতা, স্বাদ পেয়েছেন নিজস্ব সংস্কৃতি। যা কিনা পরবর্তীকালে আমরা ওকরির লেখায় দেখতে পাই। 

১৯৭৮ সালে নাইজেরিয়ান সরকারের কাছ থেকে একটি স্কলারশিপ নিয়ে আবার ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান। তুলনামূলক সাহিত্য নিয়ে পড়তে শুরু করেন এসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু কিছুদিন পরেই নাইজেরিয়ান সরকার ওকরির জন্য বরাদ্দ স্কলারশিপটি বাতিল করে দেয়। শুরু হয় ওকরির জীবনের দূর্দশাময় অধ্যায়ের। নিজেকে গৃহহীন অবস্থায় দেখতে পান ওকরি। কখনো রাস্তায়, পার্কে, গাছের তলায় কিংবা কোন বন্ধুর বাসার মেঝেতে দিনযাপন করতে লাগলেন। কিন্তু এই দুঃখের মাঝেও ওকরি খুশী ছিলেন। ইংল্যান্ডে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা দ্রুত তৈরি হলেও অর্থের মুখ দেখতে পাননি তখনও। এই তরুণ বয়সে ওকরির মনে হতো ‘ইংল্যান্ড হচ্ছে মহৎ গ্রন্থের দেশ।’ শেকসপীয়র ও ডিকেন্স পাঠ করে তার এই ধারণা জন্মেছিল। এই সময়টাকে ওকরি নিজের কাজের জন্য ‘ভীষণ, ভীষণ, গুরুত্বপূর্ণ!’ এই বলে আখ্যায়িত করেন। বলেন, “আমি লিখেছি। শুধুই লিখেছি তখন। সবকিছু লিখেছি। যা লিখতে ইচ্ছা করত, লিখতাম। খুব তীব্রভাবে”। 

লেখক হিসেবে ওকরির সাফল্য আসে, ১৯৮০ সালে যখন প্রথম উপন্যাস ‘ফ্লাওয়ার্স এন্ড শ্যাডোস’ বেরুলো। চাকরী পেলেন বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস’এ ওয়েস্ট আফ্রিকা ম্যাগাজিনের কবিতা বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে। কিন্তু তিনবছরের মাথায় চাকরী থেকে বরখাস্ত হলেন। কারণটি ওকরির ভাষায়, "I had very high standards and I was finally fired because I wasn't publishing enough poetry." যথেষ্ট সংখ্যক কবিতা প্রকাশ না করার অজুহাতে ওকরি’র চাকরীটি চলে গেলেও, কবিতা লেখা কিন্তু ছাড়েননি। লিখতেন খুব বেশী আফ্রিকান শৈলীতে। এসময় বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় বেনের লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হতে শুরু করে। 

১৯৮৮ সালে প্রকাশক বন্ধু মার্গারেট বাজবি নটিং হিলে বেনকে একটি ফ্ল্যাট ভাড়া করে দেন। ফ্ল্যাটটির কথা বেন কখনো ভুলতে পারেন না। বন্ধুর দেয়া ঐ আশ্রয়ে থেকেই শেষ করেছিলেন ‘দি ফেমিসড রোড’ উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি। বার বার লিখেছেন, কেটেছেন তারপর একদিন শেষ হল উপন্যাসটি। নটিং হিলের ঐ ফ্ল্যাটে আরো কিছু গল্প লিখেছিলেন বেন। তবে ‘দি ফেমিসড রোড’ উপন্যাসটি লেখক হিসেবে তাঁর অবস্থানকে মজবুত করে দেয় বুকার জয় করার মাধ্যমে। 

১৯৯১ সালে বুকার পুরস্কার নেবার সময় বেন ওকরির বয়স ছিল মাত্র ৩২ বছর। ঐ সময় পর্যন্ত বেনই ছিল বুকার জয়ী সবচেয়ে কম বয়সী লেখক। (এরপরের রেকর্ডটি নিউজিল্যান্ডের লেখক ইলেনর ক্যাটননের ২০১৩ সালে ২৮ বছর বয়সে।) ‘দি ফেমিশড রোড’এর সারা পৃথিবীতে অনেক পাঠকের মন জয় করে নেয়। কেউ কেউ আবার সমালোচনা করতেও ছাড়ে না। তখন থেকে আজ অবধি এই বইটিকে নিয়ে চলছে নানান আলোচনা সমালোচনা। বিশেষভাবে বইটির ব্যতিক্রমী বর্ণনার শৈলীর জন্য। নাইজেরিয়ান বালক ‘আজারো’ এর বর্ণনাকারী কথক ও মূল চরিত্র। পাঠক আজারো’র বর্ণনার সঙ্গে সঙ্গে যেন যোগসূত্র স্থাপন করে রক্ত মাংসের পৃথিবীর আর আধ্যাত্মিক জগতের। বইটির শুরুটি এমন “ "In the beginning there was a river. The river became a road and the road branched out to the whole world. And because the road was once a river it was always hungry."

“শুরুতে সেখানে একটি নদী ছিল। নদীটি রাস্তা হয়ে গেল এবং রাস্তাটি সমগ্র বিশ্বে শাখা ছড়াল। এবং যেহেতু রাস্তাটি একসময় নদী ছিল এটা সবসময় ক্ষুধার্ত ছিল”।

বলতে গেলে ৫৭৪ পৃষ্ঠার বইটি একটি স্বপ্ন অনুক্রমিক বর্ণনার মধ্যে দিয়ে গেছে। কোন কোন সমালোচক একে দুঃস্বপ্ন বলল কিন্তু বেশিরভাগ পাঠক পরিষ্কারভাবেই পছন্দ করে নিল।

ওকরির সবচেয়ে বেশী ভালবাসা কবিতায়। এখন পর্যন্ত কবিতা, ছোট গল্প, উপন্যাস সব মিলিয়ে ২০টির মতো বই বেরিয়েছে। সর্বশেষ কবিতা বই ‘ওয়াইল্ড’ ২০১২ আর উপন্যাস ‘দি এইজ অব ম্যাজিক’২০১৪। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ, এবং সালমান রুশদী’র সাথে তুলনা করা হয় বেন’কে। ওকরির লেখনী মাতৃভূমি নাইজেরিয়া বা আফ্রিকাকে কেন্দ্র করে উত্তর-উপনিবেশবাদী ঘরানার হলেও নবীন সময়বাদ বা মডার্নিজম, ভৌতবাস্তবতা, জাদুবাস্তবতা, অতিপ্রাকৃত বাস্তবতা , অস্তিত্ববাদ এ-সবকিছু খুঁজে পাওয়া যায়। ছোটবেলায় মায়ের কাছ থেকে গল্প শুনে, নিজে নিজে বলার চেষ্টা আর বাবার বুকশেলফ’ই হচ্ছে বড়বেলার ওকরির সাহিত্যের মূল ভিত্তি। অন্যদিকে অনুপ্রেরণা ছিল উভয় ফ্রান্সিস বেকন (একজন লেখক ও দার্শনিক অপরজন চিত্রশিল্পী), শেকসপিয়র বিশেষ করে ‘দ্য মিডসামার নাইট ড্রিম’। সহস্র এক আরব্য রজনী, ইসপ’স ফেবলস, উইলিয়াম ব্লাকের কবিতাও তাঁকে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। আর অবশ্যই বিশেষভাবে স্বচক্ষে দেখা নাইজেরিয়ার গৃহযুদ্ধ।

সেই হোটেল রুমে দেয়া সাক্ষাৎকারগ্রহীতা সাংবাদিককে, ওকরি বলেছিলেন, “আপনি দেখবেন, আমরা গল্প বলেছিলাম, আমরা সবাই গল্প বলেছিলাম নাইজেরিয়ান শিশুদের মতো। আমাদের গল্প বলতে হয়েছিল যা অন্যদের আগ্রহ ধরে রাখে, এবং সবাই জানে এমন গল্প তোমাকে বলতে দেয়া হয়নি। তোমাকে একটি নতুন স্বপ্ন দেখে নিতে হয়েছিল”।

“এবং এটা কখনোই ঘটেনি আমাদের কাছে যে, ঐ গল্পগুলো আসলে একটি অনন্য বৈশ্বিকদৃষ্টিভঙ্গী বহন করে। এটা অনেক বেশী সেই নদীটির মতোই যা তোমার বাড়ির উঠানের পিছনদিক দিয়ে বয়ে চলছে। এর জন্য কখনোই তোমার নদীটির কোন আলোকচিত্র ধারণ করে রাখতে হয়না, খুঁজতে হয়না নদীটির পৌরাণিক কোন ইতিহাস। এটা শুধুই আছে ওখানে, এটা ছুটে চলছে তোমার ধমনীতে, ধাবিত হচ্ছে তোমার আত্মায়”।

‘তুমি যদি গার্সিয়া মার্কেজ প্রসঙ্গে বল, চিনুয়া আচেবে নিয়েও বলবে। আমরা যদি মনে করি, লোরকা হবে যেকোনো আলোচনার আবশ্যিক বিষয় তাহলে হলে সোয়াংকি’ও এখানে আবশ্যিক হওয়া উচিত”। ওকরি এমন করেই ভাবেন। কিন্তু তখনই খুব আহত হন যখন দেখেন বার্গাস ইয়োসা’কে নিয়ে কথা বলতে সহজেই সবাই প্রস্তুত হয়ে যায় সবসময়, কিন্তু আচেবে’কে পাঠ করার জন্য হয় না। এসব কিছু মানুষের বোকামি বলে মনে হয় ওকরির কাছে।

লেখকের কোন জাত নেই, লিঙ্গ নেই, শ্রেণীবিভাগ নেই, সময়কালও নেই। পাঠকের কিছু যায় আসে না, সে নাইজেরিয়ান লেখক না ব্রিটিশ লেখক। সাহিত্য নির্দিষ্ট কোন বিন্দু থেকে জন্ম নিতে পারে, কিন্তু ক্রমেই সে বসতি গাড়ে আমাদের সকলের একান্ত নিজস্ব একক ভুবনে। সেখানেই সে থাকে সবসময়। বর্তমান সময়ের লেখকদের মধ্যে বেন ওকরি তাই অনেক বেশী উজ্জ্বল, অনেক বেশী সার্বজনীন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন