সোমবার, ১ আগস্ট, ২০১৬

মধ্যবিত্ত মুখোশস্খলনের গল্পকার সুবোধ ঘোষ

বিপ্লব বিশ্বাস

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পর্বে সময় ও সমাজে যে অভিঘাত তৈরি হল, আত্মসংকটের হাহাকারময় আবর্তে নিক্ষিপ্ত হল মধ্যবিত্তের পর্যুদস্ত মূল্যবোধ, সহজসরল মানসিকতা হল জটিল থেকে জটিলতর-- তারই যথাযথ দলিল হয়ে উঠল যে সমস্ত বাংলা গল্প তার প্রমুখ রূপকারদের মধ্যে অন্যতম সুবোধ ঘোষ। তিনি ১৯১০( ১৯০৯!) সালে জন্মেছিলেন হাজারিবাগে। সেখানেই ছাত্রাবস্থায় তিনি সান্নিধ্যলাভ করেন ঋষিতুল্য দার্শনিক তথা বহুভাষাবিদ মহেশ্চন্দ্র ঘোষ মহাশয়ের। তাঁর সহায়তায় তাঁরই গ্রন্থাগারে নিয়ত পড়াশোনার সুযোগ পেয়ে তিনি নিজেকে তৈরি করেছিলেন। সার্কাসের কাজ থেকে শুরু বাস কন্ডাক্টর --- বিচিত্রজীবী এই মানুষটি এদেশের নানাস্থানে তথা বহির্ভারতেও ভ্রমণ করেছেন।
১৯৪০ সালে আনন্দবাজার পত্রিকার কর্ণধার সুরেশচন্দ্র মজুমদারের ডাকে তিনি কলকাতায় এসে সাংবাদিকতায় যোগ দেন। আর ঐ সালেই তার প্রথম লিখিত গল্পদ্বয় ' অযান্ত্রিক ' ও ' ফসিল ' পাঠকজগতে প্রবল সাড়া ফেলে দেয়। সংকটাক্রান্ত পাঠক তাঁকে তাদের মনোজগতের নব্য ভাষ্যকার মানলেন। শুধু পাঠক কেন,সমকালিক ও তৎপরবর্তী লেখকরাও কেউ কেউ তাকে অগ্রগামী তথা প্রেরণা হিসাবে মনে করলেন। যেমন,রমাপদ চৌধুরী, বিমল কর,মহাশ্বেতা দেবী প্রমুখ।

যে কোন লেখকের মধ্যে সামসময়িক প্রেক্ষিতপ্রভাব এক বিশেষ ভূমিকা পালন করে। চল্লিশের দশক বাংলা ছোটগল্পের ইতিহাসে এক কালান্তরী ঘটনা--ত্রিশের দশকের গল্পকারগণ রবীন্দ্রভাবনাবিশ্ব থেকে বেরিয়ে স্বতন্ত্রপথগামী হলেন। দ্বান্দ্বিকতাময় গল্পভুবনের পথ ছেড়ে দুটি ধারায় তা প্রবহমান হল। এক, কল্লোলীয় বিদ্রোহী বাস্তবতা আর মোহময় ভাববিলাস যেখানে গল্পকারগণ বিশ্বাস করতেন, মানুষকে তার আটপৌরে জীবন থেকে শুরু করে জৈবক্ষুধা, মনোবিকার, আদিমতাসহ পুরোটা ধরতে হবে। এদের প্রতিনিধি হলেন,প্রেমেন্দ্র মিত্র,অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, মণীশ ঘটক প্রমুখ। আর দ্বিতীয় ধারাটি পুষ্টিলাভ করেছিল প্রথমত বন্দ্যোপাধ্যায় ত্রয়ীর জোরাল কলমে। তার সাথে যুক্ত হয়েছিল, জগদীশ গুপ্তের পাল্টাস্রোতের জীবনভাবনা তথা জীবনানন্দের শয়তানি চক্রের মায়াপ্রভাব।

এহেন জোরালো পরিপ্রেক্ষিতকে সামনে রেখে চল্লিশের দশকের গল্পকারদের কাছে গল্পবুনন বেশ কঠিন হলেও কব্জির তাকতেই তারা নতুন গল্পপথ খুলে দিলেন: নরেন্দ্রনাথ মিত্র,নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, সতীনাথ ভাদুড়ী,অন্নদাশংকর রায়,সন্তোষ কুমার ঘোষ,জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, কমলকুমার মজুমদার, অমিয়ভূষণ মজুমদার, সুশীল জানা,রমাপদ চৌধুরী, বিমল কর এবং অবশ্যই সুবোধ ঘোষের হাত ধরে এই সময়ের বাংলা ছোটগল্প তার স্বভূমি খুঁজে পেল।

এই সময়ের ছোটগল্পের একটি বিশেষ মাত্রা হল,মধ্যবিত্ত ও উচ্চ- মধ্যবিত্তের স্ববিরোধিতা,সুবিধাবাদ ও অমানবিকতার খোলসটিকে ছিঁড়ে ফালাফালা করে জীবনযাপনের প্রাণবন্ত সত্যটিকে গল্পকাঠামোয় প্রতিফলিত করা। কালাভিঘাত অর্থাৎ যুদ্ধ, দাঙ্গা, মন্বন্তর, তেভাগা, অগাস্ট বিপ্লব -- এ সবেরও প্রভাব এই সময়ের গল্পে প্রবলভাবে বিদ্যমান।

যাই হোক,বৈশিষ্ট্যময় মধ্যবিত্ত মানসিকতার স্বরূপ প্রকাশের অনাবিল কলমকার সুবোধ ঘোষ। লেখকজীবনের আটাশটি(১৯৪০-১৯৬৮) বছরে সুবোধ প্রায় ১৫৭টি গল্প লিখেছিলেন। সেখানে তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে চিত্রায়িত করেছেন মধ্যবিত্ত শ্রেণির শঠতা,বঞ্চনা,নীচতা, ভীরুতা, সুবিধাবাদ,আত্মপ্রবঞ্চনা, ঘৃণ্য আপসকামিতা জাতীয় ক্ষতিকারক দোষসমূহ। এই শ্রেণীর মুখোশ খুলে আলগা করতে তার মতো দক্ষ রূপকার গল্পজগতে বিরলপ্রায়। প্রাবন্ধিক জগদীশ ভট্টাচার্য বলছেন,' বাংলায় প্রমথ চৌধুরীর মতো সুবোধ ঘোষকেও নূতন গদ্যরীতির স্রষ্টা বলা যায় '। শ্লেষবিদীর্ণ তীক্ষ্ণতায়,বুদ্ধিদীপ্ত সমাসোক্তির ব্যঞ্জনায়, গভীর ভাবদ্যোতক মন্তব্য যোজনায় তার বাকবৈদগ্ধ সাহিত্যের শিল্পরূপকে এক অভিনব সৌন্দর্যরূপ দিয়েছে।তার ' স্বর্গ হতে বিদায় ', ' তিন অধ্যায় ', 'স্বমহিমাচ্ছায়া', ' হৃদয়ঘনশ্যাম ', ' গ্লানিহর ', 'স্নানযাত্রা', ' গরল অমিয় ভেল,' ' বারবধূ ' প্রভৃতি গল্প এমত বক্তব্যের প্রমাণস্বরূপ। তার প্রকাশিত বইসমূহ যেমন, ফসিল(১৯৪০),পরশুরামের কুঠার (১৯৪০), থিরবিজুরি(১৯৫৫),মনভ্রমরা(১৯৬০),- তে শুধু যে আত্মপ্রচারক মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মনোবিশ্লেষণ আছে তাই নয়, সেখানে প্রেমের বিচিত্র রং ও চেহারাও প্রকট।

এখানে আমার আলোচ্য সুবোধবাবুর পাঠকপ্রশংসিত তিনটি গল্প: ফসিল,গোত্রান্তর আর সুন্দরম। ১৯৪০ সালে যে দুটি গল্প দিয়ে সুবোধের গল্পযাত্রা শুরু তার একটি ' অযান্ত্রিক ' হলে অন্যটি ' ফসিল '। এই গল্পে প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষে তিনি ফ্যাসিজিমের বিভীষিকা তুলে ধরেছিলেন। নানাবিধ কারণেই ' ফসিল ' বাংলা কথাসাহিত্যে ঐতিহাসিক মর্যাদা পেয়েছে। এতকাল সাহিত্যে সাম্যবাদ যে ভরসাপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছিল এই গল্পে তা প্রথম শিল্প হিসাবে সার্থক হয়ে উঠল। এই গল্পে দেখা যায়, সাড়ে আটষট্টি বর্গমাইল আয়তনের দেশীয় রাজ অঞ্জনগড়ের পটভূমিকায় রাজন্যতন্ত্র দ্বারা খনিশ্রমিকের শোষণের কদর্যতা। সাবেকী গড়ে দেওয়ালে দেওয়ালে ঘুঁটের মতো তামা-লোহার ঢাল। রাজক্ষমতা অন্তর্হিত,কিন্তু সামন্ততান্ত্রিক দেমাকে সেই রাজাও জর্জর নরপালদের অন্যতম। লাঠিতন্ত্রের দাপটে রাজ্যশাসন চলে।এরপর সেখানে আসে স্বর্ণলোভী বিদেশি বণিকদল।প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয় ক্ষয়িষ্ণু সামন্ততন্ত্রের সাথে বিত্তশালী ধনতন্ত্রের।খনিকাজে নগদ মজুরির লোভ দেখিয়ে বণিকের দল রাজার বিরুদ্ধে নির্যাতিত প্রজাদের বিদ্রোহে আগুন জ্বেলে দিল। কিন্তু প্রকৃতই যেদিন দুর্বিপাক আছড়ে পড়ল,সেদিন উদ্বুদ্ধ জনমানুষের সংগ্রামী চেতনার সামনে বেসামাল শাসক ও বণিককুল পারস্পরিক শত্রুতা ভুলে গিয়ে বিদ্রোহবিনাশ যজ্ঞে সামিল হল।খনিগর্ভে ধ্বসে পড়া পীটের তলায় পুঁতে ফেলা হল সাধারণ মানুষের বিপ্লবপ্রচেষ্টা। রাত্রির ভয়ানক তমসা ভেদ করে গণআন্দোলনের সেই রক্তাক্ত কাহিনী কোনদিনই আর আলোর মুখ দেখবে না। আর এই মর্মন্তুদ ঘটনাক্রম অসহায়ভাবে প্রত্যক্ষ করল এক মধ্যবিত্ত যুবক মুখার্জী(নামহীন) । সে ভাবতে লাগল লক্ষ লক্ষ বছর পরের কথা যখন 'এই পৃথিবীর কোন এক জাদুঘরে জ্ঞানবৃদ্ধ প্রত্নতাত্ত্বিকের দল উগ্র কৌতূহলে স্থির দৃষ্টি মেলে ' কতক ফসিল দেখবে।' অর্দ্ধপশুগঠন, অপরিণত মস্তিষ্ক ও আত্মহত্যাপ্রবণ তাদের সাবহিউম্যান শ্রেণীর পিতৃপুরুষের শিলীভূত অস্থিকঙ্কাল... যারা আকস্মিক কোনও ভূ- বিপর্যয়ে কোয়ার্টস আর গ্রানিটের স্তরে স্তরে সমাধিস্থ হয়ে গিয়েছিল। তারা দেখছে,শুধু কতগুলি সাদা ফসিল; তাতে আজকের এই এত লাল রক্তের কোনও দাগ নেই।' সমাজতন্ত্র আর বণিকতন্ত্রের মিলিত রূপই প্রকাশমান এই গল্পে।আপাতদৃষ্টিতে এই দুই শক্তি পরস্পরবিরোধী হলেও শোষণের ঘৃণ্য স্বার্থে তাদের মিলিত রূপের বীভৎসাই এই গল্পের প্রতিপাদ্য বিষয়। তবে এই দুইয়ের দুর্মিলনের ফলে অবশ্যম্ভাবী পরাজয় ঘটেছে সাধারণ শ্রমিক শ্রেণীর যাকে মার্ক্সীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে নেতিবাচকই বলা যায়।

এই পর্যায়ের দ্বিতীয় আলোচ্য গল্প ' গোত্রান্তর '। ক্রিস্টোফার কডওয়েল বলেছেন: Those defects in bourgeois social relations arise from cash nexus which replaces all other socialities , so that the society seems held together, not by mutual love or tenderness or obligation but simply by profit. Money makes the bourgeois world go round and this means that selfishness is the hinge on which bourgeois society turns, for money is a dominating relation to an owned thing.( Studies in dying culture) অর্থনীতির এই প্রতিপাদ্য এই গল্পে অক্ষরে অক্ষরে সত্য।এখানে অর্থগোত্র মানুষের অধঃপতন শোচনীয়, বীভৎস। মধ্যবিত্ত যৌথ পরিবারের শিক্ষিত ছেলে সঞ্জয় বিশ শতকের ধনবিজ্ঞানের সমস্ত সূক্ত ধাতস্থ করে বুঝেছে,সংসারে প্রতিটি স্নেহ পণ্যমাত্র, প্রতিটি আশীর্বাদ এক একটি পাওনার বিজ্ঞপ্তি। প্রেম ছেনালি ছাড়া কিছু নয়। তাই সঞ্জয় পরিবারের সংস্রব ত্যাগ করে রতনলাল শুগার মিলে চাকরি নিল। কিন্তু আত্মসর্বস্ব, অর্থান্বেষী,স্খলিতগোত্র মানুষের অধঃপতনের পথটি বড্ড সুগম। সেখানে পতনদ্বার উন্মুক্ত। গোত্রহীন নেমিয়ার আর তার বোন রুক্মিণী সঞ্জয়কে নরকদ্বারে পৌঁছে দিল। কিন্তু স্খলিতগোত্র আর গোত্রহীন মানুষে আসমান- জমিন ফারাক। তা ধরা পড়ল মিলমালিকের সাথে শ্রমিকদের লড়াইয়ের সময়। কুঁকড়ে যাওয়া নেমিয়ার লোহাকঠিন হয়ে উঠল। গোত্রহীন মানুষের সেই তেজরূপ দেখে স্খলিতগোত্র সঞ্জয় আঁতকে উঠল।এ তার সহ্যের অতীত। তাই সে শ্রমিকদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে পালিয়ে আত্মরক্ষা করল। এ গল্প বুর্জোয়া ও শ্রমিকশ্রেণীর মাঝে অবস্থিত পাতিবুর্জোয়া অর্থাৎ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর দোলাচলচিত্ততার মার্ক্সবাদসম্মত শিল্পরূপ। এখানে বলে রাখা যায়, কমিউনিজমে আকৃষ্ট হয়ে বাংলা সাহিত্যক্ষেত্রে পা রেখেছিলেন গল্পকার সুবোধ ঘোষ। নবতর মূল্যবোধজারিত তার সাহিত্যশৈলী অভিনব। কমিউনিস্ট পার্টির আদর্শায়িত প্রথম সাংস্কৃতিক পত্রিকা ' অগ্রণী '- তে সুবোধের গল্প ' ফসিল ' প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে সুবোধের মার্ক্সবাদী প্রত্যয়ে চিড় ধরে-- প্রতিক্রিয়াশীলতার আকর্ষণে। এই গল্পের শিরোনামের মতো তারও ঘটেছিল গোত্রান্তর। কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি বীতরাগ হয়ে তিনি লিখলেন উপন্যাস ' তিলাঞ্জলি '। আর শেষপাদে আত্মস্থ হলেন জীবনবিমুখ অধ্যাত্মবাদে। লিখলেন ' ভারত প্রেমকথা'। সে অন্য প্রসঙ্গ।

আপাতত আমার তৃতীয় ও শেষ আলোচ্য গল্প ' সুন্দরম'। আবারও সেই ঘুণজর্জর মধ্যবিত্ত মানসিকতার কুরূপ উদঘাটন। সুবোধের নিপুণ কলমে নির্লজ্জঢঙে প্রকাশিত তার আত্মকেন্দ্রিক অবস্থান, টানাপোড়ন। আর এহেন স্থবির মানসিকতার গালে ইয়াব্বড় থাপ্পড় এই শিল্পদ্যোতিত চিরকালিক গল্প।এখানে মধ্যবিত্তের সৌন্দর্যভাবনা ও কৃত্রিম নৈতিকতাকে ল্যাংটো করেছেন শব্দচিত্রকর সুবোধ। গৃহকর্তা কৈলাস ডাক্তারের সাথে বাকি সকলের বিশেষত পুত্র সুকুমারের বিরোধ সুন্দরি পাত্রীর ধারণা নিয়ে। রোজকার লাশকাটা ঘরে মৃতদেহ চিরে চিরে তার অন্তর্গত রূপ দেখেন যে ডাক্তার তার সৌন্দর্যভাবনার সাথে একেবারেই মেলে না সুকুমারের পাত্রীর রূপভাবনা। ডাক্তারের কাছে গায়ের রং বা মুখশ্রী মূল্যহীন আর সুকুমার প্রকৃতই সুন্দরের উপাসক যেন। তাই যত পাত্রীই দেখে না কেন সবই বাতিল হয় মঙ্গলয়েড বা দ্রাবিড়ীয় দোষে।শেষ অবধি মধ্যবিত্ত ভদ্রসন্তান সুকুমারের সংযম ও সৌন্দর্যচর্চা যে কতটা ঠুনকো তা দেখিয়ে দেন গল্পকার। দেখান সুকুমার দ্বারা ভিখারিনী তুলসীকে নষ্ট করা, ভোগ করা ও গর্ভবতী করার মাধ্যমে। অতঃপর বিষপ্রয়োগে তুলসীকে খুন করে সুকুমার। তারপর লাশকাটা ঘরে তুলসীর শবব্যবচ্ছেদকালে মৃত ভ্রূণপিণ্ড দেখে ডাক্তার যখন বাকরহিত ও বিস্ময়াবিষ্ট তখন যদু ডোমের শাণিত উক্তি,' শালা বুড়ো নাতির মুখ দেখছে ', মধ্যবিত্তের সৌন্দর্য নামক অট্টালিকার সবকটি খিলান হুড়মুড়িয়ে ভেঙ্গে দেয়। মুখোশ খুলে যায় মধ্যবিত্তের। যেন কোনও বিষধর গুপ্ত বিবরনির্গত হয়ে টানছোবল মারে মধ্যবিত্ত ভণ্ডামির শরীরে। উল্লেখ অপ্রাসঙ্গিক হবে না হয়ত, যদু ডোমের এই উক্তির সাথে তারাশঙ্করের ' অগ্রদানী ' র সেই বিখ্যাত উক্তির কোথাও যেন একটা মিল খুঁজে পাওয়া যায় : ' খাও হে চক্কোত্তি'...। যাই হোক, এই গল্পে আরও আছে অবিকল্প চিত্রকল্প যার সামান্য উদাহরণ অবশ্যই দেওয়া উচিত। যেমন,ব্যবচ্ছেদের সময় মুগ্ধ কৈলাস ডাক্তার তাকিয়ে রইলেন...' প্রবাল পুষ্পের মালঞ্চের মতো বরাঙ্গের এই প্রকট রূপ, আছদ্ম মানুষের রূপ।এই নবনীতপিণ্ড মস্তিষ্ক, জোড়া শতদলের মতো উৎফুল্ল হৃৎকোষের অলিন্দ আর নিলয়। রেশমি ঝালরের মতো শতশত মোলায়েম ঝিল্লী। আনাচেকানাচে যেন রহস্যে ডুব দিয়ে আছে সুসূক্ষ্ম কৈশিকজাল।' সুবোধের চিত্রকল্পের তাৎপর্য এখানেই যে তারা গল্পের দাবি মিটিয়েও পৌঁছে যায় সভ্যতার মূলীভূত প্রশ্নে।

অসীম রায় বলেছিলেন,আমার গল্পের নিঃশ্বাস যেন পাঠকের গায়ে এসে লাগে। সুবোধের এ জাতীয় গল্প পাঠকের গায়ে কেন,ঘাড়েও নিঃশ্বাস ফেলবে ও তাকে পড়তে বাধ্য করবে। তাই নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় যখন আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, ' এমন কালও হয়ত আসবে যখন আর গল্প লেখা হবে না... কিন্তু পৃথিবীর ছোটগল্প যে ঐশ্বর্যতে আজ ভরে উঠেছে, তার ফলে যেমন করে আজকের প্রত্নবিদ অতীতের রসে নিমগ্ন হয়ে রয়েছেন, তেমনি করে সেদিনের গবেষক ছোটগল্পের পুরাতাত্ত্বিক বিস্ময়ে আপ্লুত হবেন।' সেই প্রত্নরাজিমাঝে ' ফসিল '- নিচয় থাকবে না, তা হতে পারে না।


ঋণস্বীকার:

---------------- ১) সুবোধ ঘোষের শ্রেষ্ঠ গল্প/ জগদীশ ভট্টাচার্য সম্পাদিত / প্রকাশ ভবন।



২) নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় ৩) অসীম রায় ৪) নারায়ণ চৌধুরী ৫) তপোধীর ভট্টাচার্য ৬) সোহারাব হোসেন ৭) সুমনা দাস সুর 8) জীবন কুমার সরকার।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন