সোমবার, ১ আগস্ট, ২০১৬

হাজার চুরাশির মা : একালের প্রাসঙ্গিকতা

হামীম কামরুল হক


ব্রতীরা ‘খতমের লাইনে’ কেন চলে গিয়েছিল? কেন তাকে নিশ্চিন্ত আরামের জীবন টানলো না? কেন সে তার শ্রেণির চেয়ে অনেক নিচে থাকা আরো কিছু তরুণের সঙ্গে ভিড়ে গিয়ে সমাজবদলের সশস্ত্র পথ বেছে নিলো? তাদের সঙ্গে সুখি পরিবারের ছেলেরাও ছিল, কিন্তু তারাও প্রাণ দিল। বারবার এই প্রশ্নগুলি এসেছে বলে, আমরাও বারবার সেগুলি হাজির করছি
সদ্যপ্রয়াত মহাশ্বেতা দেবীর ওপর শ্রদ্ধা জানাতে আমরা যে-বইটি সবার আগে এখন হাতে তুলে নিতে পারি তার নাম ‘হাজার চুরাশির মা’; এবং তুললেই দেখতে পাব– বাংলাদেশের জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িকতার কুৎসিত উগ্রতার এ-সময়ের সঙ্গে এই উপন্যাসটিতে বর্ণিত সময়ের একটা আশ্চর্য মিল আছে। মিলটা উল্টো দিক থেকে। সেজন্যই এই উপন্যাসটা এখন মারাত্মক রকমের প্রাসঙ্গিক।
নকশালবাড়ি আন্দোলনের আর্দশ নিঃসন্দেহে মহান, কিন্তু পথটি ছিল ভুল– একথা যারা শুনেছেন, তারা বর্তমান সময়ের এই উপন্যাসটি পড়তে গিয়ে আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করবেন ব্রতী চ্যাটার্জিদের আর নিবরাস ইসলামদের একদিক থেকে কতই না মিল। দুজনেই প্রভাবিত হয়েছে উগ্রপন্থায়, কিন্তু দুজনেই অবস্থাপন্ন ঘরের সন্তান, খাওয়া পরার কষ্ট তাদের করতে হয়নি কখনো, দুজনেই উঁচুতলার মানুষদের সন্তান। তাহলে কেন তারা এভাবে জীবনটা মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিল? কোন দাবাখেলার গুটি হয়ে উঠল তারা? কারা তাদের পেছন থেকে চালাচ্ছে? পরিবারে সবচেয়ে প্রিয় যে-মা, তাকে গোপন করে তারা জড়িয়ে পড়ছে সশস্ত্র সহিংস কর্মপন্থায়– জানি বাংলাদেশে সচেতন প্রায় প্রতিটি মানুষ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে চলেছেন। তাঁরা যদি এই সময়ে আবার ‘হাজার চুরাশির মা’ পড়তে শুরু করেন, তাহলে বারে বারে চমকে চমকে উঠবেন: কী করে ঘরের সন্তান দূরে সরে যায়, কী করে গোপন করতে শুরু করে তার মনোজগতে বেড়ে ওঠা অন্ধকার ঝোঁপজঙ্গলে সর্পিল হিংস্র চিন্তাভাবনা, যা বীজ থেকে বিষবৃক্ষে পরিণত? –এমন সব প্রশ্নই উঠে এসেছে ১৯৭৪ সালে প্রথম প্রকাশিত এই উপন্যাসটিতে।
মহাশ্বেতা দেবী নকশালবাড়ির আন্দোলনের নিহত হাজার হাজার সম্ভবনাময় তরুণদের কথা, তাদের মায়েদের ব্যথাকে যথাক্রমে ব্রতী ও তার মা সুজাতার ভেতর দিয়ে ধারণ করতে চেয়েছেন। সেই বেদনায় মহত্ত্বই বেশি। আর নকশালবাড়ী আন্দোলনের পেছনে তো ধর্মীয় উন্মাদনা ছিল না, ছিল আর্দশগত উন্মাদনা। ঠিক একইভাবে বর্তমানের নিবরাস ও তার মায়েদের যন্ত্রণাটা এই উপন্যাসের সঙ্গে সম্পূর্ণ মিলে যেতেও পারত, কিন্তু পারেনি, কারণ সুজাতা পুত্রের মৃত্যুতে অন্তত লজ্জিত নন। কিন্তু জঙ্গিবাদী উৎসাহে গলাকেটে মানুষ হত্যা করা নিবরাসদের কাণ্ডে তার পিতামাতারা সন্তানের লাশ গ্রহণ পর্যন্ত করতে রাজি হননি, কারণ এই মৃত্যু গ্লানির, এই মৃত্যু চরম লজ্জার। পিতা হিসাবে লজ্জার, ততটাই লজ্জার সেই মায়েদের– যারা এমন সন্তানের জন্ম দিয়েছেন।

নকশালবাড়ী আন্দোলনের সূত্রে সত্তর দশককে বলা হয়েছিল ‘মুক্তির দশক’। ‘সেই ব্রতী। মুক্তির দশকে এক হাজার তিরাশিজনের মৃত্যুর পরে চুরাশি নম্বরে ওর নাম।’ মর্গে সংখ্যার হিসেবে তার লাশ দেখতে গিয়েছিলেন তার মা। সেই কারণে এই উপন্যাসের নাম ‘হাজার চুরাশির মা’। সেই মা হলেন সুজাতা চট্টোপাধ্যায়, যার স্বামী দিব্যনাথ চট্টোপাধ্যায় একটা পাঁড় লম্পট। সুজাতার শাশুড়ি তার এই পুত্রের ও সুজাতার ছেলেমেয়েরা তাদের বাবার নানান অপকর্ম জানার পরও সেটিকে সমর্থন করেছে ‘পৌরুষের প্রকাশ’ হিসেবে। মেয়েদের মধ্যে নীপাও বাবা দিব্যনাথের মতো বহুগামী। এবং সেটাকে দিব্যি মেনে নিচ্ছে নীপার স্বামী। আরেক মেয়ে তুলির বিয়ে হচ্ছে টোনি কাপাড়িয়ার সঙ্গে যার মা মিসেস কাপাড়িয়া এক গুরুবাদী মহিলা। স্বামীজি বা গুরুর কথাই হলো তার কাছে জগতের সমস্ত সংকটের সমাধান। তিনি ভাষা, ধর্ম, জাতের বিভেদের সহজ সমাধান দিয়ে দিতে পারেন। তার কাছে ভাষার সমস্যা কোনো সমস্যাই না। যে যেখানে থাকে, কারবার চালায়, সে সেখানকার ভাষা শিখেই ফেলে, শিখে নিতে বাধ্য হয়। ধর্ম? ধর্মের কোনো দরকারই নাই। বার্ন ডাউন মন্দির মসজিদ, স্রেফ স্বামিজি-গুরুজিকে অনুসরণ করাই যথেষ্ট। আর জাতের সমস্যা দূর করা তো আরো সহজ, কেবল নিয়ম করে দিতে হবে যে, কেউ নিজের জাতি ও ভাষার মানুষকে বিয়ে করতে পারবে না।–এই কথা বলছেন তিনি তুলি ও টোনির বাগদান অনুষ্ঠানে মদ খেয়ে মাতাল হয়ে। আদতে কি ওই সব সমস্যার সমাধান এত সহজে হয়? হতে পারে? তাহলে জগতের এত এত বুদ্ধিমান মানুষ এই পথ বেছে নিচ্ছে না কেন?

সেই পার্টিতে ব্রতীর কথা উঠলে তাকে বলা হচ্ছে ‘মিসগাইডেড’। আমরা এই সময়ের জঙ্গিদেরও বলছি ‘মিসগাইডেড’। কেন তারা জঙ্গি হলো? তার অনেক কারণের একটি হলো, পরিবারের শিথিল বন্ধন, মা-বাবার দাম্পত্য সংকট, আশেপাশের মানুষের নৈতিক অধঃপতন ইত্যাদি ইত্যাদি। ‘হাজার চুরাশির মা’য়ে ব্রতীর পরিবারের দশাও তা-ই। কিন্তু কারা তাদের এমন করে তুললো– তাদের পরিচয় আড়ালে থাকে তো বটেই, তাদের চরিত্রগুলির সামনেই আনা হয় না। পালের গোদাদের, কলকাঠি নাড়নেওয়ালাদের আমরা কোনো খোঁজই পাই না। কেবল প্রশ্ন জাগে কেন একজন সচ্ছল ঘরের শিক্ষিত সন্তান উগ্রপন্থা বা হত্যা করে আর্দশ প্রতিষ্ঠার দিকে ঝুঁকে পড়ল? এ উপন্যাসে কিছু উত্তরের আভাসও আছে। যেমন একজায়গায় বলা হচ্ছে: ‘‘একটা বিশ্বাস ওকে, ওদের অন্ধ করে দিয়েছিল। ওরা বোঝেনি যে-ব্যবস্থার সঙ্গে ওদের যুদ্ধ, সে-ব্যবস্থা জন্মের আগেই বহুজনকে ভ্রুণেই বিষাক্ত করে দেয়।’’ এরই সঙ্গে ব্রতীর তুলনায় একেবারে হত দরিদ্র ঘরের সমুদের অবস্থা এসেছে। একই পার্টির ছেলে হিসেবে, নিজের পার্টির ভেতরকার বিশ্বাসঘাতকতার কারণে বিরোধীদের হাতে নিহত হয়েছে এক জায়গায় কয়েকজন তরুণ। তাদের চারজনের নাম খবরের কাগজে ছাপা হয়, কিন্তু অবস্থাপন্ন ও প্রভাবশালী ঘরের সন্তান হওয়ায়– ব্রতীর নাম তার বাবা দিব্যনাথ পত্রিকায় ছাপা হতে দেননি, এজন্য তিনি যথেষ্ট দৌড়াদৌড়িও করেছেন।–শ্রেণি আধিপত্যের ছবিটা এভাবেও মহাশ্বেতা দেখিয়ে দেন। অন্যদিকে, একটা গভীর বাস্তবতার দিকে আঙুল তোলেন মহাশ্বেতা, যেটা তিনি মলি মিত্রের মুখ দিয়ে বলিয়েছেন: ‘‘কি ফুলিশনেস! সমাজের জুয়েলগুলোকে তোরা মারলি। লাভ হল কি? তোরাও মরলি। মাঝখান থেকে অনেস্ট ট্রেডারগুলো ভয় খেয়ে এখন থেকে ক্যাপিটাল তুলে নিয়ে ভেগে গেল।’’–বাংলাদেশের জঙ্গিবাদের ফলও তো সেই দিকেও আঙুল তুলে দিয়েছে– বিদেশের বিনিয়োগ, ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার এবং অর্থনীতিতে একটা বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কাকেই সামনে তুলে এনেছে।


হাজার চুরাশির মা’-তে ব্রতীর মৃত্যুকে একটা বেদনার চাদরে মুড়ে তার মা সুজাতাকে আমরা দিনযাপন করতে দেখি। একদিকে প্রবল কর্তৃত্ববাদী, অন্যদিকে লম্পট স্বামীর বিপরীতে নিজের প্রতিবাদ নিজের মতো করে জারি রেখেছিলেন সুজাতা। তাঁর এই প্রতিবাদের সঙ্গীও ছিল পরিবারের ভেতরে একমাত্র ব্রতী। ব্রতী সংস্কৃতি চর্চা করতো, কবিতার কাগজ বের করতো, সে নন্দিনী নামের একটি মেয়েকে ভালোবাসত, যে নন্দিনী নিজেও একজন নকশালপন্থী। ব্রতীরা ‘খতমের লাইনে’ কেন চলে গিয়েছিল? কেন তাকে নিশ্চিন্ত আরামের জীবন টানলো না? কেন সে তার শ্রেণির চেয়ে অনেক নিচে থাকা আরো কিছু তরুণের সঙ্গে ভিড়ে গিয়ে সমাজবদলের সশস্ত্র পথ বেছে নিলো? তাদের সঙ্গে সুখি পরিবারের ছেলেরাও ছিল, কিন্তু তারাও প্রাণ দিল। বারবার এই প্রশ্নগুলি এসেছে বলে, আমরাও বারবার সেগুলি হাজির করছি। মহাশ্বেতা এসবের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমাদের সামনে যে-সমাজের ছবিটা হাজির করেন, সেই সমাজটা ভেতরে ভেতরে সমস্ত মূল্যবোধ হারিয়েছে, গলে পচে দুর্গন্ধময় হয়ে গেছে। বাইরে এর চকচকে ভাব থাকলেও ভেতরে ভয়াবহ ক্যান্সার: ‘‘সব যেন কীটদষ্ট, ব্যাধিদুষ্ট, পচাধরা, গলিত ক্যানসার। মৃত সম্পর্কের জের টেনে মৃত মানুষেরা বেঁচে থাকার ভান করছে। সুজাতার মনে হল অমিত, নীপা, বলাই, এদের গায়ের কাছে গেলেও বোধহয় শবগন্ধ পাওয়া যাবে। এরা ভ্রুণ থেকেই দুষ্ট, দূষিত, ব্যধিগ্রন্ত। যে সমাজকে ব্রতীরা নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল সেই সমাজ বহুজনের ক্ষুধিত অন্ন কেড়ে নিয়ে এদের সযত্নে রাজভোগে লালন করে, বড় করে। সে সমাজ জীবনের অধিকার মৃতদের, জীবিতদের নয়।’’ ফলে ‘হাজার চুরাশির মা’ হয়ে ওঠে একদিকে মৃতের জন্য শোক, অন্যদিকে এই সব চলমান শবদের প্রতি আমর্ম ঘৃণার কাহিনি।

আমরা জানি, মহাশ্বেতা দেবী ‘বাবু সাহিত্য’কে ঘৃণা করতেন। সেই ‘বাবু সাহিত্যে’র ভেতরে ভুলেও ভাববেন না যে, রবীন্দ্রনাথ বা বঙ্কিমরা পড়েন। বরং ‘বাবু সাহিত্য’ হলো সস্তা প্রেমের কচকচি আর ‘আহা উহু’ করা সাহিত্য, যা এই নিমর্ম বাস্তবকে নানান রঙ চড়িয়ে পোশাকি করে তোলে, আর যার মূলে কাণ্ডে শাখায় ফলে ফুলে বীজে সমাজ, ইতিহাস, সভ্যতার প্রতি কোন দায় নেই। দায় নেই সাহিত্য সৃষ্টি প্রতি, নান্দনিকতার প্রতিও। মহাশ্বেতা অবশ্য এব্যাপারে আরো একধাপ এগিয়ে থাকেন। তিনি ‘নান্দনিকতা’কে সাহিত্যের কোনো বিবেচ্য বিষয় বলেই মনে করতেন না। তাঁর কাছে সাহিত্য ছিল দায়বদ্ধতার, আগুনের মতো একটা দাউ দাউ দায়ের বিষয়। ফলে তাঁর গদ্যটা কতটা গদ্য হলো, তাতে সৌন্দর্য ফুটল কি ফুটল না, তাঁর বলাটা মনোহরা হৃদয়কাড়া হলো কি হলো না– এসব তাঁর কাছে বিবেচ্য বিষয় বলে মনে হতো না। আমরা বলতে পারি এটা ‘মহাশ্বেতীয় ধরন’– যে-ধরনে তিনি একের পর বই লিখে গেছেন; বাংলা সাহিত্যে ভাণ্ডারে দিয়েছেন ‘কবি বন্দ্যোঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু’, ‘অরণ্যের অধিকার’, ‘চেট্টি মুণ্ডা ও তার তীর’, ‘টেরোড্যাকটিল, পূরণ সহায় ও পিরথা’, ‘মার্ডারারের মা’, ‘প্রস্থানপর্ব’ ইত্যাদি উপন্যাস। লিখেছেন ‘তালাক’, ‘স্তন্যদায়িনী’, ‘রুদালী’র মতো ছোটগল্প। লিখেছেন শিশু-কিশোরদের জন্যও। ১৯২৪ সালের ১৪ জানুয়ারিতে ঢাকায় জন্মে জীবনের বহু চড়াই-উৎরাত পাড়ি দিয়ে তিনি ২০১৬-র ২৮ জুলাই চলে গেলেন না-ফেরার দেশে। মাঝেখানে রেখে গেছেন তাঁর সাহিত্য, সমাজসংস্কৃতি ও নানান আদিবাসী মানুষের জন্য মমতামাখা উদ্যোগ। পুরস্কার স্বীকৃতি ও পাঠকও কম পাননি তিনি। বিশ্বের নানান ভাষায় অনূদিত হয়েছে তাঁর লেখা।

মহাশ্বেতা দেবীর মৃত্যুটা এমন একটি সময় হলো, যখন আবার আমরা যদি তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত র্কীতিগুলির দিকে তাকাই, এর সবার আগে এখন এসেই পড়বে ‘হাজার চুরাশির মা’। আর এ এমন এক উপন্যাস, যা নতুন করে পাঠ করতে গিয়ে আমরা এমন এক প্রাসঙ্গিকতা, যে-প্রাসঙ্গিকতা এর আগে এভাবে আর বোধ করি দেখা দেয়নি। আমাদের এই সময়টাকে বুঝবার জন্য বর্তমানে এটিযে কতটা যথাযথ তা এর পাঠকরা জানেন, আর যারা নতুন করে পড়তে শুরু করবেন, তারা পড়ামাত্রাই টের পাবেন। ‘সকাল’, ‘দুপুর’, ‘বিকেল’ ও ‘সন্ধ্যা’– এই চারটি ভাগে লেখা এই উপন্যাস আমাদের এই সময়টাকে যেন বলতে চায় যে: উগ্রপন্থার উন্মেষ, বিকাশ, বৃদ্ধি ও প্রকাশ আছে; কিন্তু এটা কখনোই রাত্রি পার হয়ে নতুন কোনো ভোরের দিকে যায় না, যেতে পারে না। ‘সন্ধ্যা’ই এর সমাপ্তি কাল। তবে আমাদের শুরু করতে হবে নতুন কোনো অন্ধবিন্দু থেকে, যেটি এখনও অচিহ্নিত ও অনির্দিষ্ট।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন