সোমবার, ১ আগস্ট, ২০১৬

বৈশ্বিক বাস্তবতায় জাদুবাস্তববাদ:

প্রত্যেকটি মানুষের জীবন, সে যেখানে বাসবাস করে বা বেড়ে ওঠে, সে অঞ্চলের বা দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জাড়িয়ে যায়। আমরা দেখি জাদুবাস্তববাদী লেখকদের লেখা অত্যন্ত রাজনৈতিক আবেদনে সমৃদ্ধ। বিষয়টি আমরা গ্যুন্টার গ্রাসের (১৯২৭-২০১৫) বেলায় যেমন দেখেছি তেমন দেখি মার্কেসের (১৯২৭-২০১৪) ক্ষেত্রে, একইভাবে মিলান কুন্দেরা (১৯২৯--) ও সালমান রুশদির (১৯৪৭--) রচনায়ও।
অল্প কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া আদতে কোনো সৃজনশীল লেখকই তাঁর সমকালের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ব্যতিরেকে প্রায় কোনো সাহিত্যকর্মেই আত্মনিয়োগ করেন না, এবং তার ওপর তিনি যেদেশে বাস করেন সেখানে যদি প্রতিকূল পরিস্থিতি বিরাজ করে, তাহলে তাঁর সঙ্গে সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে।

ব্যক্তিলেখকের অবস্থাটা সাধারণ মানুষ থেকে খুব বেশি আলাদা নয়, পার্থক্য কেবল সচেতনতায় ও পর্যবেক্ষণে। প্রত্যেক লেখকই স্বতঃপ্রণোদিত হয়েই নিজের জীবনবোধ ও দৃষ্টিকোণের মাধ্যমে তাঁর দেশ-কাল-জনতার প্রতিনিধিত্ব করে থাকেন। একারণে রাজনৈতিক জাঁতাকলে পিষ্ট কোনো জাতির, অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে দিশেহারা কোনো জনগোষ্ঠীর, এবং অগণতান্ত্রিক, বাক্স্বাধীনতাহারা, ধর্মীয় নিপীড়ন ও কুসংস্কারে নিমজ্জিত সম্প্রদায়ের ‘অলীক শান্তির আশ্রয়-সন্ধানী অবস্থা’ যখনই দেখা দেবে, সেখানেই বাস্তবকে হুবহু না দেখে অন্যভাবে দেখার চল লেখকের ভেতরে তৈরি হয়েই যায়। কিন্তু সেটি সাহিত্যের কলাকৈবল্যবাদী বা Art for art’s sake  নয়, যে-তত্ত্ব চিনুয়া আচেবে (১৯৩০-২০১৩)-র বর্ণনা অনুযায়ী ‘সুগন্ধীমাখানো কুকুরের বিষ্ঠা’(Deodorent dog-shit) (ড. মোঃ মুহসিন, ২০১৪: ১৫)। মূলত বাস্তবতাবাদের প্রকাশকে ভিন্ন এক ভঙ্গিতে নিয়ে বর্ণনা করেন জাদুবাস্তববাদী লেখকরা, যেটি আরো জীবনঘনিষ্ঠ কিন্তু বাস্তবতাবাদের অনুসারী নয়, বরং তা নস্যাৎকারী। এজন্য ম্যাগি অ্যান বাউয়ার্স জাদুবাস্তববাদের সীমা-অতিক্রমকারী এবং নাশকতামূলক বৈশিষ্ট্যের কথা বারবার উল্লেখ করেন (Bowers,2007: 66-67)।

অন্যদিকে বাস্তববাদী সাহিত্যের লক্ষ্য জীবনের সরাসরি উপস্থাপন। একে ‘ক্ল্যাসিকাল রিয়ালিজম’ হিসেবে আখ্যায়িত করে ক্যাথরিন বেলসে লিখেছেন, উনিশ শতকের এ জাতীয় উপন্যাসের কাছে পাঠকের চাওয়া ছিল দৃশ্যমান বাস্তবতার বর্ণনা বা ফটোগ্রাফিক বর্ণনা, ফলে সেসব উপন্যাস বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করতে ‘বলা’র চেয়ে ‘দেখা’য় বেশি (Belsey, 1980:68)। কিন্তু এই দেখানোটাও যে কতটা আড়াল করা যেতে পারে, নানান দেশের প্রাচীন সাহিত্যে সেসবের দৃষ্টান্ত আছে। প্রাচীন সাহিত্য হিসেবে ‘আরব্য রজনী’র সঙ্গে লাতিন আমেরিকার জাদুবাস্তববাদের নিবিড় সাদৃশ্য দেখতে পান মনোজ চাকলাদার--

‘‘অধুনা সাহিত্যে এক নতুন ধারার লেখা চর্চা হয়ে চলেছে। সমালোচকরা সেগুলোকে ম্যাজিক রিয়্যালিজম নাম দিয়েছেন। মূলত স্পেন ও ল্যাটিন আমেরিকায় এ ধরনের সাহিত্য বেশ জনপ্রিয় হয়। ক্রমশ এ সাহিত্য অন্যত্র বেশ জনপ্রিয় হয়। এইসব রচনাতে ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর বিশ্বাস, কুসংস্কার, এমন কী তাদের যে প্রাচীন বীরত্ব গাথা রয়েছে, স্থানীয় আদিবাসীদের যুদ্ধ, জয়, বিশ্বাস ও কথকতা, আফ্রিকার রূপকথা, সংগ্রাম, মুক্তির গল্প, স্বপ্ন ভাবনা এই সব লেখায় পাওয়া যায়। তবে তুলনামূলক আরব্য রজনীর গল্পগুলি সরাসরি ব্যবহৃত হয়নি। যেসব জাদু, অলৌকিক কোনো কোনো লেখায় পরিলক্ষিত হয়। কাহিনির সঙ্গে না মিললেও কোনো কোনো জায়গা রয়েছে ম্যাজিক রিয়্যালিজমের সঙ্গে মেলে। এই মেলাটাকেই অনেকে মনে করেন ‘ম্যাজিক রিয়্যালিটি’। এ কারণে মনে করেন ‘ম্যাজিক রিয়্যালিটি’ রীতির লেখকরা আরব্য রজনীর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে।’ ( মনোজ, ২০০৩:১৬৭)

যেমন আমরা দেখি সালমান রুশদির ‘মিডনাইটস চিলড্রেন’ (১৯৮১)-এ অনেক বর্ণনাই ‘আরব্য রজনী’র সঙ্গে মেলে(Bowers, 2007:54)। বোর্হেস ‘আরব্য রজনী’ নিয়ে গভীরভাবে ভেবেছেন এবং প্রবন্ধ লিখেছেন (মনোজ,২০০৩:৪৯-৫৮) এবং জাদুবাস্তববাদ যাঁর নামের সঙ্গে নিয়তির মতো অনিবার্যভাবে এসে পড়ে সেই গাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেস ‘আরব্য রজনী’কে তাঁর পঠিত সেই সব বইয়ের একটি বলে মনে করেন যেটি অবশ্যপাঠ্য একটি বই এবং এ বই আমরা বারবার পড়তে বাধ্য (Marquez, 2004:151)। আমরা দেখতে পাই, তাঁর রচনায় জাদুবাস্তববাদের প্রয়োগ কোনো কোনো ক্ষেত্রে ‘আরব্য রজনী’কে মনে করায়। কিন্তু এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তাঁর গভীর ইতিহাসবোধ। এই ইতিহাসবোধের জায়গা থেকে লাতিন আমেরিকার সমকালীন নৈরাজ্য ও বাস্তবতা তাঁর রচনার প্রধান উপজীব্য হয়েছে। সেখানে প্রতিনিয়ত এমন সব ঘটনা ঘটছিল যা ভীষণ রকমের অনাকাক্সিক্ষত কিন্তু ভয়ংকরভাবে বাস্তব। হত্যা, গুম ও দমনপীড়নের কোনো সীমা ছিল না। মুক্তকণ্ঠে কোনো সমালোচনা করাও ছিল অত্যন্ত কঠিন। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের এই পরিস্থিতি যেখানেই দেখা দেয় তা কোনো না কোনোভাবে জাদু ও মায়ার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এজন্য লাতিন আমেরিকার জাদুবাস্তবতার সঙ্গে ‘আরব্য রজনী’র তৎকালীন পরিস্থিতির মিলটাই স্বাভাবিক। মনোজ চাকলাদার লেখেন--

‘‘তবে ‘আরব্য রজনী’র গল্পগুলোয় সৃষ্টি হওয়া সে সময়কার রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশের সঙ্গে ল্যাটিন আমেরিকার উপনিবেশ গড়ে ওঠার সমকালীন রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির একটি মিল রয়েছে। উভয়ক্ষেত্রেই বিশৃঙ্খলা, দস্যুবৃত্তি, নিরাপত্তাহীনতা ছিল। কোনো ক্ষেত্রে সুষ্ঠু সমাজ ব্যবস্থা ছিল না। ফলে এর থেকে বেঁচে থাকার আকাক্সক্ষাগুলোর রূপ পেয়েছে কী আরব্য রজনীতে কী ল্যাটিন আমেরিকার জাদু-বাস্তব সাহিত্যরীতিতে। যদিও বলা হচ্ছে এসব গল্প ভারত ও চিনে সৃষ্ট হয়েছে। সে সময় ভারত ও চিনের শাসনধারায় শান্তিময় পরিবেশ ছিল একথাও ভাবা যায় না।

যে সময়ই হোক বা যে দেশেই হোক এ ধারায় সাহিত্যরীতিতে প্রকাশ পেয়েছে শাশ্বত প্রতিবাদ ও শাশ্বত শান্তির আকাক্সক্ষা। শাশ্বত বেঁচে থাকার আকাক্সক্ষা।’’ (মনোজ, ২০০৩:১৬৭)

আদতে জাদুবাস্তববাদী এই পরিস্থিতি বৈশ্বিকভাবে বারবার ইতিহাসের নানান পর্যায়ে হাজির হয়েছে; কিন্তু সেটি জাদুবাস্তবতা, কিন্তু জাদুবাস্তববাদ নয়। যেকারণে লাতিন আমেরিকার জাদুবাস্তববাদ বৈশ্বিক বাস্তবতায় যে যে কারণে পৌঁছে যায়, তার ভেতরে আছে আধুনিক মানুষের জটিলতা, তীব্র জীবনযন্ত্রণা ও লড়াইয়ের প্রণোদনা, সেটি আরব্যরজনীতে পাওয়া যায় না। ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণ, উত্তর-ঔপনিবেশিক পর্বে দ্বিধাবিভক্ত জাতিতে ক্ষমতার লড়াই, সামরিক অভ্যুত্থান, একনায়কতন্ত্র, চরম স্বৈরাচারী শাসন ও শোষণ, বিপ্লব ও প্রতিবিপ্লব, নির্বিচার হত্যা ও দমন-পীড়ন, গুম-খুনের ঘটনা, ক্ষমতাসীনদের চরম ভোগবাদিতা ও হতদরিদ্র মানুষের মানবেতর জীবন যেখানে প্রতিদিনের বাস্তবতার ভেতরে ঢুকে যায়, সেখানে বাস্তবতা উপস্থাপনের এক প্রতিবাদী প্রতিরোধী কৌশল হিসেবে জাদুবাস্তববাদের প্রয়োগ ঘটানো যেতেই পারে। এমনকি যেখানে বর্ণবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মীয় গোঁড়ামি প্রবল হয়ে ওঠে জাদুবাস্তববাদ সেখানকার শিল্প-সাহিত্যে জোরলো ভূমিকা পালন করতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, জাদুবাস্তবতা বহু সংস্কৃতি ও বহু বাস্তবতার প্রতিনিধিত্ব করে। একমুখী মৌলবাদী সত্যের বিপরীতে এর অবস্থান। এজন্য ব্রেন্ডা কুপার বলেন,ÔÔMagical realism at its best oppose fundamentalism and purity; it is at odds with racism, ethnicity and the quest for tap roots, origins and homogeneity. ÕÕ (Cooper, 1998: 22)

ভারতীয় সমালোচক কুম কুম সাঙ্গারি মনে করেন, জাদুবাস্তববাদ কর্তৃত্ববাদী সংস্কৃতি ও সত্যের একরৈখিক অভিমুখ যা ক্ষমতার মাধ্যেমে নিয়ন্ত্রিত হয় সেটিকে আক্রমণ করে (Sangari,1987:163। তাঁর মতে, জাদুবাস্তবতাবাদে পাশাপাশি একই সত্যের বহুমুখী উন্মোচন হতে পারে, বা পাশাপাশি বহু সত্য সহাবস্থান করতে পারে। চিলির ইসাবেল আলেন্দে (১৯৪২-)-র ‘দ্যা হাউস অব দ্যা স্পিরিট’(১৯৮২) এবং চীনা-আমেরিকান লেখক ম্যাক্সিনে হং কিংস্টন (১৯৪০-)-এর ‘দ্যা উইম্যান ওয়ারিয়র’(১৯৭৬) উপন্যাসে এই কাজটি করা হয়েছে।

কুম কুম সাঙ্গারি আরো মনে করেন, মার্কেসের ‘ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিচ্যুডে’ আরেকটি কাজ হল এতে ইতিহাস সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা ভেঙে চুমরার হয়ে গেছে (Sangari,1987:163)। ফ্রেডরিক জেমসন উত্তরাধুনিকতার বৈশিষ্ট্য হিসেবে বলেন, এটি কোনো কিছু সম্পর্কে ইতিহাসসম্মতভাবে চিন্তা করে। কর্তৃত্ববাদী ইতিহাস যাকে ভুলে যেতে দিতে চায় বা বিস্মৃত হতে দেওয়ার পাঁয়তারা করে-- জাদুবাস্তববাদের মাধ্যমে তা রোধ করা যায় (Bowers,2007:80)। সেদিক থেকে জাদুবাস্তববাদ উত্তরাধুনিকতাবাদী চিন্তারও অংশ হয়ে যায়।

আমরা টনি মরিসনের উপন্যাস ‘বিলাভড্’ (১৯৮৭)-এ দেখি, এ-উপন্যাস দাসী করে রাখা সমস্ত নারীর প্রতীক হয়ে দেখা দিয়েছে। আর সেটি করা হয়েছে শ্বেতাঙ্গদের কর্তৃত্ববাদী ইতিহাসের বিপরীতে। লিওতার্দ মনে করেন, উত্তরাধুনিকতার শিল্প-পরিস্থিতিতে জীবনকে বহুবিস্তৃতভাবে দেখা হয়, এতে অ-উপস্থাপনযোগ্য বিষয়কে উপস্থাপনযোগ্য করে তোলাটাও সব সময় বিশেষ বিবেচনার সঙ্গে গৃহীত হয় (Lyotard,1984:81)।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন