সোমবার, ১ আগস্ট, ২০১৬

অসম দ্বন্দ্বে যারা মেধার চেয়ে মারণাস্ত্রকে প্রধান অবলম্বণ মনে করে অন্তে তারা পরাজিত হয়, এও ইতিহাসেরই কথা--মাসুদা ভাট্টি

গল্পপাঠ--
কেমন আছেন? 

মাসুদা ভাট্টি--
এই সংকটকালে যেমন থাকা যায়।পৃথিবীময় চলমান অস্থিরতার কালে আর সব কিছুই আছে কেবল ভালবাসার অভাব চরমে উঠেছে সর্বত্র।ফলে একধরনের আস্থাহীনতা, ভালোবাসাহীনতার ভেতর দিয়ে যেতে হচ্ছে সকলকে। উদভ্রান্ত এই যাপন, আমাকে প্রতিনিয়ত ভাবায়; পীড়াও দেয়। ঠিক বুঝে উঠতে পারি না, কী করা উচিত বা কী উচিত নয়। দ্বিধান্বিত এই অচলায়তন, মানুষ হিসেবে খুব খাঁটো করে তোলে নিজেকে, নিজেরই কাছে। এইতো, এরকম আছি, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব-অবিশ্বাস-ভালোবাসাহীনতা, সব নেতিবাচক প্রপঞ্চগুলোকে নিয়ে।



গল্পপাঠ--
বাংলাদেশে ধর্মীয় মৌলবাদী জঙ্গি কর্মকাণ্ড মাথা চাড়া দিয়েছে। মুক্তমনা, যুক্তবাদি, ব্লগার, বিজ্ঞানমনষ্ক, সংস্কৃতি-কর্মী, প্রকাশক, নাস্তিক,সংখ্যালঘু আক্রান্ত হচ্ছেন। অনেককে হত্যা করা হয়েছে। সম্প্রতি গুলশানের একটি রেস্তোরায় আক্রমণ করে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করা হয়েছে ২৮ জনকে। এর মধ্যে বিদেশিদের সংখ্যা বেশি। শোলোকিয়ায় ঈদের জামায়াতে আক্রমণ করা হয়েছে পুলিশদের উপর। এই 'ধর্মীয়' 'জঙ্গি ' 'মৌলবাদ' বিষয় গুলোকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

মাসুদা ভাট্টি--
দেখুন, বাংলাদেশের মতো একটি পঞ্চাশ বছরেরও কম বয়সী রাষ্ট্রের জন্য এই অবস্থায় এসে দাঁড়ানোটা একটি স্বাভাবিক ঘটনা, এ কারণে যে, এদেশের জন্ম-প্রক্রিয়া এখনও শেষ হয়নি। এখনও এদেশ গর্ভ যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। প্রশ্ন করতে পারেন, তাহলে একাত্তরে কী হয়েছিল? উত্তর, ভৌগলিক স্বাধীনতা অর্জন করেছিল, বিদেশি শক্তিকে বিতাড়িত করেছিল কিন্তু তার ভেতর দিয়ে দেশের মানুষ নিজেরই অজান্তে এক গাদা প্রশ্নেরও সম্মুখীন হয়েছিল। বিশেষ করে, আত্ম-পরিচয় নিয়ে যে প্রশ্নটা তখন মুখ্য হয়ে উঠেছিল তার উত্তর আজও মেলেনি। বাঙালি নাকি মুসলমান প্রথমে, এর উত্তর না জানা অবধি এই যন্ত্রণার অবসান ঘটবে বলে বিশ্বাস করি না। কিন্তু দুঃখজনক হলো, এই প্রশ্নের উত্তর পেতে পেতে পৃথিবী প্রবেশ করেছে নতুন সমস্যার ভেতর, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যকে কেন্দ্র করে, ইসলামকে নিয়ে যে বৃহৎ ও নেতিবাচক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে বিশ্বে, তাতে জাতি হিসেবে বাঙালি কিভাবে কোন্‌ জায়গায় নিজেকে ফিট্ করবে তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

মজার ব্যাপার কি জানেন, মজার ব্যাপার হলো, বাঙালি বাইরের শত্রুর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার আগেই নিজের ছায়াকেই নিজে শত্রু ভাবতে শুরু করেছে। একাত্তরে যারা প্রচ্ছন্ন ছিল তারা দীর্ঘ চার দশকে প্রকট হয়েছে, শক্তিশালী হয়েছে অর্থে, বৃত্তে, রাজনীতিতে, সক্ষমতায়, ফলে তারা রাষ্ট্রক্ষমতার পুরোপুরি ভাগ চাইছে। কিন্তু জনসমর্থন ছাড়াই এই ভাগ তারা বুঝে নিতে চাইছে। এই বুঝে নেওয়ার চালে তারা মূল শত্রু মনে করছে আওয়ামী লীগকে বা বলতে পারেন একা শেখ হাসিনাকে। বাকি যারা এদেশে রয়েছে তারা আসলে হয় ক্রয়যোগ্য, নাহয় ভয় দেখিয়ে দমিয়ে রাখার যোগ্য। এমনকি কালকে যদি এদেশে ধর্মের নামে কোনো যুদ্ধ শুরু হয়, আওয়ামী লীগের সমর্থকগোষ্ঠীর একটি বিশাল অংশ সেই যুদ্ধে শেখ হাসিনার বিপক্ষে গিয়ে দাঁড়াবে, এটা আমার ধারণা।

 তাহলে শেখ হাসিনা এই ভয়ঙ্কর যুদ্ধটি করছেন কী করে? আমার ধারণা, তিনি আসলে ধরেই নিয়েছেন যে, মানুষ তাকে এখনও ঠিক বুঝতে পারছে না, ধরুন গুলশান বা শোলাকিয়ার ঘটনা, কিংবা তারপর কল্যাণপুরের ঘটনা, এতো গল্প চারদিকে, এতো অবিশ্বাস চারপাশে, আপনার পাশের মানুষটি এসেই আপনার সামনে নানা ধরনের প্রশ্ন উচ্চারণ করবে, আপনার চাক্ষুষ কিংবা জানা গল্পকে প্রশ্ন দিয়ে উল্টে ফেলবে, ঠিক এরকম একটি সময়ে শেখ হাসিনা বা তার প্রশাসন তাহলে কী ভাবে এদেশ থেকে ধর্মীয় জঙ্গীবাদ তাড়াবে? আমার বিশ্বাস যে, শেখ হাসিনা ভাবছেন, মানুষ আজকে হয়তো বুঝবে না, একদিন তাকে ঠিক বুঝতে পারবে, তিনি আসলে এদেশের ভালো চেয়েছিলেন, এই সত্যটি অধিকাংশের ভেতর এখনও বুনিয়াদ পায়নি। তবে একথাও সত্য যে, মানুষ এখনও অবধি শেখ হাসিনার বিকল্পও কাউকে পায়নি নাহলে এতো অপপ্রচারের পরও কিন্তু তার বিরুদ্ধে জনরোষ তৈরি হয়নি কিংবা জনগণকে ঠিক খেপিয়ে তোলা সম্ভব হয়নি।

যাহোক, এই যে জঙ্গীবাদের কথা বলছেন, তারও একটি ইতি এদেশে ঘটবে, শিগগিরই ঘটবে। কারণ, বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্য নয়। কিংবা বৈশ্বিক রাজনীতির মারপ্যাঁচ বাংলাদেশের ওপর ঠিক আরোপ করায় কেউ এখনও অবধি সফল হয়নি। এবার হয়তো দীর্ঘ সময় লাগবে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তোরণে কিন্তু এক সময় ঠিক উতরে যাবে বাঙালি। তবে বাঙালি ঠিক এর থেকে উতরে গিয়ে অন্য কোন্‌ পাথারে পড়বে তা কিন্তু নিশ্চিত নয়। হতে পারে এর পরের খাঁদটি এর চেয়েও গভীর। সেই গভীরতার তল-এর খবর বাঙালির এখনও জানা নেই। সত্যিই নেই।


গল্পপাঠ--
জঙ্গিদের প্রতি যারা সহানুভূতিশীল তারা বলার চেষ্টা করছেন--ব্লগার, মুক্তমনা, নাস্তিক, যুক্তিবাদ, বিজ্ঞানমনষ্করা দেশের সংখ্যাগুরুর ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার মতো কথাবার্তা বলছেন। তারাই জঙ্গিবাদকে উস্কানি দিয়ে এই ঘটনাগুলোর কারণ তৈরি করে দিচ্ছেন। আপনি নানা দেশে নানা কর্মসূচিতে ভ্রমণ করেন। নানা বিষয়ে আপনার পাঠও ঈর্ষণীয়। এই ধর্মীয় অনুভূতি ব্যাপারটি আসলে কী জিনিস? আর ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ঘটনাটিই বা কী? আপনি কি মনে করে বাংলাদেশে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার মতো কথাবার্তা ব্লগাররা বলেছেন?

মাসুদা ভাট্টি--
অনুভূতি – শব্দটি একেক সময় একেক রকম। শরীরের একেকটি অংশে অনুভূতির “অনুভূতি” একেক রকম, মুখে ঠ্নিণ্ডা লাগলে যে অনুভূতি হয়, হাতে বা পায়ে ঠাণ্ডা লাগলে কিন্তু ঠিক সে ধরনের অনুভূতি হয় না। প্রেমের অনুভূতি একরকম, ঘৃণার আরেক রকম। কিন্তু একটি ক্ষেত্রে মানুষ নিজেকে একটি কৃত্রিম ঐকমত্যে পৌছে যায় দ্রুত, সেটি আর কিছুই নয়, ধর্মীয় অনুভূতি। এটি আসলে রাজনৈতিক ধর্মগুলির ক্ষেত্রে বিশেষ করে আব্রাহামিক ধর্মগুলির ক্ষেত্রে বেশি সত্য।

নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে গিয়ে জনমানসকে রাজনৈতিক ভাবে ক্ষমতাশীল করা কিংবা ধর্মের ফলায় একত্রে গেঁথে রাখতে গিয়ে বুদ্ধিমান ধর্মব্যবসায়ীরা এক ধরনের “অনুভূতির” জন্ম দেয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, এই অনুভূতি আসলে যুগে যুগে নেতিবাচক ভাবেই ব্যবহৃত হয়েছে, বিশেষ করে একটি দেশ বা জাতিগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্যই কিংবা যুদ্ধে উস্কানি দেওয়ার জন্য অথবা ক্ষমতা দখলের জন্যই ব্যবহৃত হয়েছে এবং হচ্ছে। আমিতো দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, এই যে এখনকার ধর্মীয় অনুভূতির উল্লম্ফণ আসলে ক্ষমতা দখলের জন্য জনগণকে উস্কে দেওয়ার কৌশল।

হ্যাঁ, এতে ধর্ম নেই, তা নয়, ধর্ম প্রবলভাবেই আছে। কিন্তু যে অনুভূতি ১৪০০ বছর আগেও একই ভাবে এবং একই কৌশলে ব্যবহৃত হয়েছে এখনও, এই ২০১৬ সালেও যখন সেই একই কৌশল ব্যবহার করা হয় তখন মানুষের এই বিশ্বাসকে অন্ধ বলা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা থাকে না, কারণ অন্ধ না হলেতো নিশ্চিত ভাবেই মানুষ দেখতে পেতো যে, ১৪০০ বছর আগে কিংবা তারও আগে এসব কৌশল ব্যবহার করেও কোনো নির্দিষ্ট ধর্মকে ঠিক শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া সম্ভব হয়নি। যুগে যুগে নতুনতর ধর্ম এসে আগেরটাকে বাতিল ঘোষণা করে দিয়ে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করেছে। কিন্তু পেরেছি শ্রেষ্ঠত্ব টিকিয়ে রাখতে?

আপনি খ্রীষ্ট ধর্ম দেখুন, মাত্র ২০০০ বছর বয়সে ধর্মটি আসলে ইতিহাসে পরিণত হয়েছে, মানুষ ইতিহাস বা উপন্যাস হিসেবে ক্রসেড, নাইট টেম্পলার, যীশু খ্রীস্ট, মেরি ম্যাকডালিন, হোলি গ্রেইল ইত্যাদি পড়ছে এবং তারপর কিছুক্ষণ উপভোগ করে ভুলে যাচ্ছে গল্পটি। আমারতো মনে হয়, খুব দ্রুত বাকি সেমেটিক ধর্মগুলিরও পরিণতি এরকমটাই হবে। একটু সময়ের ব্যাপার মাত্র। তখন এই অনুভূতির কথা ইতিহাস মনে রাখবে কি? নাইট টেম্পলারদের কিংবা ক্রুসেডারদের কেউ মনে রেখেছি কি? এমনকি সালাহ্‌উদ্দিন-কেই বা ক’জন মনে রেখেছে?

আমার কাছে এখনকার এই অনুভূতিকে মনে হয়েছে এই সময়ের জন্য একধরনের “চুলকানির” মতো, চুলকে চুলকে যখন গভীর ঘা হয়ে যাবে, তখন এর দাওয়াই খোঁজার জন্য মানুষ পাগল হবে এবং একসয় এই চুলকানি ভালো হয়ে যাবে, মানুষ নিমপাতা বেটে স্নান করে এই দুঃসময় নিয়ে নিজেদের মধ্যেই হাসাহাসি করবে।

এই অনুভূতিকে আঘাত দেওয়া বা যারা আঘাত পাচ্ছেন, উভয় পক্ষই একটি ঘোর-এ আছে। আমি নিজেও এর বাইরে নই। আমারও মনে হয় যে, আমার সময়ে চলমান সকল অচলায়তনকে আমিই ভেঙে যাবো, বিদ্রোহ করবো, কিন্তু আমি এও এখন বুঝতে শিখেছি যে, এই চাওয়াটাই মূল কথা।

ব্লগাররা মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়েছে কি দেয়নি, সেটা যিনি এই আঘাত দেন এবং যিনি এই আঘাত পান, তারাই ভালো বলতে পারবেন। আমার অনেক কথায়/লেখায় অনেকে আঘাত পান, প্রতিদিন অন্ততঃপক্ষে শ’খানেক হুমকি পাই, নিন্দামন্দ শুনি গত দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে। কিন্তু আমি সজ্ঞানে কারো অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার কথা কি ভেবেছি কোনোদিন? হলপ করে বলতে পারি, না ভাবিনি।

কিন্তু কেউ না কেউ তো আঘাত পাবেনই, কিন্তু সেজন্য তিনি যখন কথা বা কলম দিয়ে পাল্টা আঘাতের পরিবর্তে ছুরি/চাপাতি/বন্দুক তুলে নেন হাতে তখনই সমস্যাটা ঘটে, কারণ যিনি লিখছেন বা বলছেন, তিনিতো আর তাকে এই ছুরি/চাপাতি/বন্দুক দিয়ে আঘাত করছেন না বা তাকে মারার চেষ্টা কখনও করেননি, তাহলে দ্বন্দ্বটাতো সমতা পেলো না। অসম দ্বন্দ্বে যারা মেধার চেয়ে মারণাস্ত্রকে প্রধান অবলম্বণ মনে করে অন্তে তারা পরাজিত হয়, এও ইতিহাসেরই কথা। কচু গাছ কাটতে কাটতে মানুষ ডাকাত হয়, একদিন ভিন্ন মতের মানুষকে হত্যা করতে করতে সর্বত্রই ভিন্ন মতের মানুষ খুঁজে পেতে শুরু করার রোগ দ্যাখা দেবে, তখন সবাইকে খুন করতে হবে, সেটাতো সম্ভব নয়, তাই না? বাংলাদেশে এখন যে রক্তপাত চলছে, তাকে সেই পুরোনো দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের ছাঁচে ফেলে বিশ্লেষণ করা যায়।

এখনও সেই প্রশ্ন, যা একটু আগেই বলেছি যে, বাঙালি না মুসলমান, সেটা আসলে অত্যন্ত জাগ্রত। যারা নিজেদেরকে জোরপূর্বক আরো “মুসলমান” বানাতে চাইছে তারা মনে করছে তাদের প্রধান শত্রু “বাঙালিত্ব”, অতএব খতম করো এদের। এই অসহিষ্ণুতা এই জল-কাঁদার ভূখণ্ডে অচল ছিল, নতুন করে চলবে তার প্রত্যয় আসলে হয় না। বিশ্বাস করতে চাই, ক্ষণিকের তরে বাইরে থেকে অর্থের জোগানে, নোংরা-মেধার কিছু মানুষের হাতের ঘুঁটি হিসেবে এরা কাজ করছে। এর শেকড় কেটে দিতে পারলে সামনে সম্মিলনের দিন, বোধনের কাল আসবেই। প্রশ্ন হলো, সেটা করার জন্য সময় দিতে, শ্রম দিতে, বিশ্বাস লগ্নি করতে আমরা কতোটুকু প্রস্তুত রয়েছি?



গল্পপাঠ--
এই প্রসঙ্গে বাক স্বাধীনতা, স্পীচ, হেইট স্পীচ ইত্যাদি বিষয়গুলোও চলে এসেছে। এর ব্যাখ্যাও দেশে নানাজনে নানা রকমভাবে করছেন। যেমন সরকার বলছেন, দেশে বাক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। সরকার বিরোধীরা বলছেন বাক স্বাধীনতা নেই। কিছু কিছু পত্রিকা যেমন ক’ বছর আগে ব্লগারদের বিরুদ্ধে, সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে নানা উস্কানিমূলক খবর প্রকাশিত করছে। দিগন্ত টিভিতে সাম্প্রদায়িক উস্কানি দেওয়া হয়েছে। এমন কি বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে সংখ্যালঘু, মুক্তমনা, প্রগতিশীলদের প্রতি ঘৃণা, বিদ্বেষ,হুমকি প্রকাশ করা হচ্ছে। এমনকি হেফাজতে ইসলামের আমীর মাওলানা শফি প্রকাশ্যে বলেছেন, নাস্তিকদের হত্যা করা ওয়াজিব হয়ে গেছে। সরকার এদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। এর মধ্যে দিয়ে বাক স্বাধীনতা, হেইট স্পীচ বিষয়ে নানা বিভ্রান্তি এসে পড়ে। আসলে ঘটনাগুলো কি?


মাসুদা ভাট্টি--
আসলে ঘটনাগুলি কি তা ওপরে কিছুটা বলতে পেরেছি বলে মনে করি। তবে শেষ করতে চাই এভাবে, যে কোনো উঠতি জাতি যখন সামনের দিকে এগুতে চায় তখন চারপাশ থেকে, এমনকি ভেতরে ভেতরেও বহু নেতিবাচক প্রপঞ্চ জাতিকে পেছনের দিকে ফেরানোর কাজটি সমানতালেই করতে থাকে। ইতি এবং নেতি’র ভেতরকার দ্বন্দ্ব আসলে খুব বেশি বাস্তব সমস্ত মানবজাতি তথা বাঙালি জাতির ক্ষেত্রে।

প্রশ্নে যেসব নেতিবাচক দিকগুলির কথা উল্লেখ করেছেন, আপনি একটি জাতিও কি দেখাতে পারবেন যে, এসব নেতিবাচক ঘটনার ভেতর দিয়ে তারা যায়নি বা যেতে বাধ্য হয়নি? জাতি গঠন প্রক্রিয়ার এসবই হলো অনুসঙ্গ। কখনও কখনও এসকল অনুসঙ্গ তীব্রতর হলে, জাতিগঠন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয় কিংবা জাতিটি পরিণত হয় একটি বদ্ধ ও অনুদার জাতিতে, যেমনটি হয়েছে পাকিস্তানে। খুব চেষ্টা করেছিলেন জিন্নাহ্ সাহেব ধর্ম দিয়ে একটি “পাকিস্তানী” জাতি গঠনের কিন্তু তিনি যে কী ভয়ঙ্কর ভাবে ব্যর্থ হয়েছেন তা মোটামুটি ভাত-মাছ চেনেন এমন ব্যক্তিও বুঝতে পারেন। কিন্তু বুঝতে চান না কারা? ওই অনুভূতিসম্পন্ন বিপদগ্রস্ত মানুষগুলো। মজার ব্যাপার কি জানেন? এদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে কিছু লেখাপড়াজানা মানুষও। আমি তাদের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, ইতিহাস তাদের মতো ব্যক্তি্বর্গকে স্থান দেয়নি। স্থান দিয়েছে তাদেরকেই যারা ইতিহাসকে এগিয়ে নিয়ে যেতে ভূমিকা রেখেছে।

আমার কাছে মনে হয়, মানুষের ইতিহাস পাঠ অত্যন্ত জরুরী, তা সে যে ইতিহাসই হোক না কেন, ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না, সেকথা হয়তো সত্য কিন্তু ইতিহাস মানুষকেতো স্মরণ করিয়ে দিতে পারে সেই অমোঘ সত্য যে, কিছুই পৃথিবীতে চিরকালের নয়, এমনকি নয় ধর্মও। ফলে যে অনুভূতির ধূয়া তুলে আজ রক্তপাত, ক্ষমতা দখল কিংবা ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা চলছে, সেই অনুভূতিও কালান্তরে পরিণত হবে হাস্যকর কোনো ঘটনায়, যেমন আমরা এখন হাসি গতপ্রায় ধর্মগুলোর রীতি-রেওয়াজ-লিপ্সা নিয়ে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন