সোমবার, ১ আগস্ট, ২০১৬

মোজাফ্ফর হোসেন'এর গল্প : আমরা চাইনি ও যথার্থ জীবনানন্দ হোক

আমাদের বন্ধু জহির। পুরো নাম মুহাম্মদ জহিরুদ্দীন বাদশা। আমরা একদিন ঠাট্টাছলে জীবনানন্দ বলে ডেকেছিলাম ওকে। সেদিন কি জানতাম যে, নামটা ওর এতটাই মনে ধরে যাবে—এভাবে সে সত্যি সত্যি একদিন জীবনানন্দ বনে যাবে!

‘দোষটা তোর। এর মধ্যে আমাদের টানবি না।’—সফিক বলল।


‘তুই-ই যত নষ্টের গোড়া; ওর না হয় কবিতা লেখার বাতিক ছিল তাই বলে জীবনানন্দকে চিনিয়ে দেয়ার দরকার কী ছিল, শুনি? আর কবি ছিল না? জীবনানন্দের চেয়ে রবীন্দ্রনাথ কি কম কবি? আর নজরুল তো ছিলই, আমাদের মতোই মুসলমান। তা না, কোথা থেকে আবিষ্কার করল জীবনানন্দ!’ বাশারের চোখে জল। ওর কথাগুলোর অর্থ আর আমাদের অজানা নয়। জহির সত্যিকার জীবনানন্দ হোক, আমরা কেউই চাইনি।

জহিরের এই জীবনানন্দ-বাতিকের পেছনে দায়ী কিছুটা আমাদের বাংলা স্যারও। স্যারের উস্কানিতেই জহির কবিতা লেখা শুরু করে। ছন্দ মিলিয়ে মিলিয়ে নানা বিষয় নিয়ে সে কবিতা লিখে চলে। কলেজ মাঠের গরু ছাগলও তার কবিতার বিষয় হয়ে ওঠে অনায়াসে। বাংলা স্যার ওর কবিতা শুনতেন আর বলতেন—‘এই হল কি যে কবিতা! কেমন বাক্যের ডগায় ডগায় মিল! আর আজকাল পেপার-পত্রিকায় কী সব কবিতা পড়ি, একদিকে গরুর গাড়ি তো অন্যদিকে উড়োজাহাজ—হল কিছু? যত সব ছারপোকা কবিতে দেশটা ভরে ছারখার অবস্থা! কবিতা হবে সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কবিতার মতো—ছন্দে ছন্দে। কি স্বাদ সে-সব কবিতায়, এখনো জিভে লেগে আছে—

‘ইলশে গুঁড়ি ইলশে গুঁড়ি
ইলিশ মাছের ডিম।
ইলশে গুঁড়ি ইলশে গুড়ি
দিনের বেলায় হিম।’

‘স্যার, সত্যিই ইলিশ মাছের স্বাদটা জিভে লেগে থাকে!’—আমাদের ভেতর কেউ একজন স্যারকে অতি স্মার্টনেস দেখাতে বলে।

‘হাঁদা আমি ইলিশের স্বাদ জিভে লেগে থাকার কথা বলছি না, বলছি কবিতার কথা।’ স্যার একটু রেগে গিয়ে বলেন। ‘এটা বুঝলে তো আর বাংলায় ফেল করতিক না।’ স্যার সুযোগ পেয়ে কথাটা ঘুরিয়ে মারে। স্যারের এই প্রবণতা দেখে আমরা মনের সব খটকা চেপে যেতাম। বাংলায় আমাদের মধ্যে একমাত্র জহিরই ভালো করতো। তাই বাংলা স্যারের সঙ্গে যত ভাব ঐ জহিরের।

জহির তখন কবিতা লিখলেও কবি হয়ে ওঠেনি। মাঝে মাঝে লিখত, লিখত না। একদিন আমরা ট্রেন লাইনের ধার-ঘেঁষে জলা মাঠে পা চুবিয়ে বসা। তখন বর্ষাকাল। আষাঢ়ে মাঠঘাট একাকার। আমরা বসে আলাপ করছিলাম বাংলাদেশ জিম্বাবুয়ের ম্যাচ নিয়ে। জহির পানির দিকে দৃষ্টিচুবিয়ে কয়েকটি ব্যাঙাচির লাফালাফি দেখছিল আপন মনে। আমিই ঠাট্টা করে বললাম—‘কি রে জীবনানন্দ হলি নাকি!’ জীবনানন্দ এমন মনোযোগ দিয়ে ব্যাঙাচি দেখতেন কিনা জানি না। নিশ্চয় দেখতেন না। আমি কি যেন মনে করে জীবনানন্দের নামটা বলে ফেলেছিলাম। জহির আমার দিকে কেমন করে জানি তাকাল। গভীর সে দৃষ্টি। একবার মনে হল, চড়টড় বোধহয় কষিয়ে দেবে! আমি ভয় পেয়ে আর কথা তুলিনি। এর মাসখানেক পর জানলাম, ও জীবনানন্দের কবিতাপাঠ শুরু করেছে। জীবনানন্দের ব্যাপারে বাংলা স্যারের কাছে প্রশ্রয় পাবে না ভেবে, অন্যকোথাও থেকে বইপত্র জোগাড় করেছে। এখন সে নিজের কবিতা না আওড়ে সুযোগ পেলে জীবনানন্দ দাশের কবিতা মুখস্থ বলে। অনর্গল। আমাদের প্রথম শোনালো অবসরের গান কবিতাটি। কিছু অংশ। এক সুন্দরতম বিকেলে ধানী জমির আইলের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে। বলল বড় কবিতা, পুরোটা এখনো মুখস্থ হয়নি।

একটি বই মুখস্থ হলে আরেকটি আনালো। আমাদের ছোট্ট শহর। সমগ্র জীবনানন্দ পড়ার ঝোঁক কারো ছিল না। ফলে একটা লাইব্রেরিতে অর্ডার করে করে জীবনানন্দের কাব্যগ্রন্থ আনা শুরু করল, জীবনানন্দের কবিতা ও জীবন নিয়ে লেখা দুয়েকটি বইও যোগাড় করে ফেলল সে। ওর মুখে শুনলাম রাজধানীতে আবদুল মান্নান সৈয়দ নামে একজন নাকি জীবনানন্দকে নিয়ে জবর একটা বই লিখেছে। বইটা ওর কাছে ছিল না বলে খুব আফসোস করত। এভাবে কবি না হলেও কবিতায় বিন্দুমাত্র আগ্রহ না থাকলেও জীবনানন্দের ঘর-বাহিরের অনেক খবর আমাদের জানা হয়ে গিয়েছিল। মনে হত যেন, চিনে ফেলেছি লোকটিকে!

আইএ পাশ করে আমরা তখন শহরের কলেজে ডিগ্রি পড়ছি, জহির বাংলায়। চান্স পেয়েছিল অর্থনীতিতেও। পড়ল না। বাংলায় পড়ে বড় কবি হবে সে। জীবনানন্দ ইংরেজির ছাত্র ছিলেন, জহির অনেক চেষ্টা করে কোনো মতে ইংরেজিতে পাশটুকু করেছিল। ওই বিদ্যায় ইংরেজিতে অনার্স করা যায় না। এতে ওর আফসোসের অন্ত ছিল না।

অনার্স মাস্টার্স শেষ করে এলাকার এক এমপিওভুক্ত কলেজে কিছু টাকা গছিয়ে ঢুকে পড়ল। আমাদের কেউ কেউ রাজধানী শহরে চলে গেল, কেউ কেউ গ্রামেই থেকে গেল নানা কারবারে জড়িয়ে। আমি চলে গেলাম দুবাই। বড় ভাই আগে থেকেই ছিল। দেশে কিচ্ছু হবে না বলে একরকম জোর করে নিয়ে গেল সে। বছর পাঁচেক থাকার পর সেখানেও কিছু হল না দেখে ফের দেশে ফেরত পাঠাল। ততদিনে সকলে বিয়ে করে ঘর-সংসার নিয়ে আছে। বিয়ে করিনি কেবল, আমরা, জহির আর আমি। জহির আছে তার জীবনানন্দ-ঘোরে। এখন সে ছন্দে ছন্দে কবিতা লেখে না। জীবনানন্দের কবিতার সঙ্গে মিলিয়ে মিলিয়ে সে কাব্যকরে। বাংলার স্যার মরে ভূত হয়েছেন কবেই—ভাগ্যিস! না হলে প্রিয়পাত্র জহির ‘দাসের’ এই অধঃপতনে ধাক্কা খেয়ে অক্কায় পেতেন!

আমি নিজে বিয়েটা সেরে জহিরের পেছনে লেগে থাকলাম। লেজকাটা শেয়াল হয়ে অন্য শেয়ালের লেজ দেখলে কেন গা জ্বলে ততদিনে বুঝে গিয়েছিলাম। ও বলে দিলো, বিয়ে করবে একশর্তে—বনলতাকে এনে দিতে হবে। বনলতাকে এখন কোথায় পাই? জহির বনলতা সেনের কবিতা আমাদের মুখস্থ শুনিয়েছে। বহুবার। যতদূর মনে পড়ে ও থাকে নাটোরে। এখনো সেখানে আছে কিনা কে জানে! থাকলেও এতদিনে বিয়ে না করে কি আছে? যদি নাও করে সমস্যা একটা আছে, গুরুতর সমস্যা বটে—বনলতার নামের শেষে সেন আছে। মানে মুসলমান না। জহির কি তবে হিন্দু মেয়ে বিয়ে করবে? সবশুনে জহিরের বাবা চড়াৎ করে তেলে-বেগুনে তেতে উঠলেন। বললেন, ‘ওই মেয়েকে কিছুতেই এ বাড়ি তোলা যাবে না। কোন কবি তাকে নিয়ে কাব্য করেছে, দেশের বেবাক মানুষ তার নাম জানে, স্বভাব কেমন কে জানে!’ তারপর যখন শুনলেন হিন্দু, আরো চটে গিয়ে বললেন, ‘বললাম কাব্য না করতে। যে কাব্য করেছে তারই মাথা বিগড়েছে। জাত-ধর্ম সব গেছে!’

তবে জহিরের কপাল ভালো শেষপর্যন্ত বনলতাকে পেলাম আমরা, সেন নয়, বনলতা পারভীন। আমার শ্বশুরবাড়ির গাঁয়ের মেয়ে। খোঁজটা আমার বউই দিল। আসল নাম পারভীন। বাড়ন্ত বয়সে দেখতে হ্যাংলা আর লম্বা ছিল বলে দাদা ‘বন-লতা’ বলে ডাকতেন। দাদা স্কুলমাস্টার ছিলেন, তবে জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’ কবিতাটি তার পড়া ছিল কিনা জানি না। নামকরণের ইতিহাস চেপে আমরা জহিরকে নিয়ে গেলাম বনলতাকে দেখাতে। জহির দেখল, লজ্জার মাথা খেয়ে চোখে চোখ রেখে গভীরভাবে; আমার কানে কানে বলল, ‘মুখে শ্রাবস্তীর কারুকার্য কেমন দেখায় জানি না; তবে চোখটা অবিকল পাখির নীড়ের মতোন।’ আমি একটু বিস্ময় আর জিজ্ঞাসু দৃষ্টি দিয়ে বনলতার চোখের দিকে তাকাতেই ও আমাকে বলল, ‘অ্যারে, বাড়ির পাশে ঝোপের ভেতর টুনটুনি পাখির বাসার সঙ্গে মেলতে যাসনি। এটা অন্য জিনিস!’ এরপর সে কেবল চুলটা দেখতে চাইলো। মেয়েটি নব্বই ডিগ্রি বেঁকে বসল। ‘মাশআল্লাহ!’ আমি বললাম। ‘সেই অন্ধকার বিদিশার নিশা!’ জহির বলল।

বিয়েতে সম্মতিটা না দিয়ে আর পারল না। এতদিনে জহির বিয়ে করতে রাজি হয়েছে, এতেই খুশি তার বাবা। তাছাড়া তিনি বনলতা বাদ দিয়ে পারভীন নামটাই গ্রহণ করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন।

ভালোই চলছিল ওদের সংসার। মাঝবয়সে অল্পবয়সী বৌ পেয়ে জহির তখন সোনায় সোহাগা। তার জীবনে তখন কবিতায় কবিতা!

‘দেখে যাও জীবন-বাবু, তোমার কবি আজ সংসারসুখে ভেসে যাচ্ছে। তোমার জীবন মিথ্যে হয়েছে আজ। আমার গুরু জীবনানন্দের জীবনী নতুন করে লেখো হে বিধাতা!’ ফাঁকা মাঠের বিপরীতে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে জহির বলেছিল একদিন। আমরা হেসেছি কেবল।

জহিরের এই সুখোচিৎকার বছর গড়াতে না গড়াতেই তেল ফুরিয়ে আসা প্রদীপের মতো আস্তে আস্তে নিভে এলো। কবিতা মোটেও পছন্দ করে না জহিরের বনলতা। কী যে পছন্দ তার, তাও বুঝে ওঠা যায় না। স্বভাবে উচাটন ভাব। আমরা কথা বললাম কয়েক দফায়—কবিতা না বুঝুক, জহিরকে একটু ভরসা তো দিতে পারে। কত কাগজে ওর কবিতা বের হয়, পড়ার ভানও তো করা যেতে পারে। আমরা যেমন জহিরের কথায় কথায় মহা পণ্ডিতের মতো মাথা হেলায়—কতটুকুই বা বুঝি! আমাদের কথা বনলতা মুখ ভার করে শোনে, কোনো উত্তর করে না।

‘ও শুকিয়ে শুকিয়ে কেমন বনের লতার মতো হয়ে গেছে!’ প্রায়ই জহির আমাদের কাছে এসে ছটফট করে বলত। প্রায়ই আমরা বনলতাকে বুঝিয়ে বুঝিয়ে ফিরে আসতাম। এরিমধ্যে একদিন ঘটে গেল ঘটনাটা। জহির একবারও টের পায়নি যে, তলে তলে বনলতা এতদূর এগিয়েছে। বনলতা পারভীন আসলে সাদাসিধা জহিরকে ব্যবহার করেছে।

মাসকতক বিরহজীবন কাটিয়ে আজ সত্যি সত্যি জীবনানন্দের জীবন বেছে নিলো আমাদের জহির। বিধাতাকে সে জীবনানন্দের জীবনী পুনর্লিখনের কথা বলেছিল একদিন। আজ সে নিজেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে তা নিষ্প্রয়োজন করে দিল।

আমরা ট্রেন লাইনে যাইনি। লাশ আসছে শুনে জহিরের বাড়ির সামনের প্রকাণ্ড পাকুড় গাছের নিচে অপেক্ষা করছি। ভাদ্র মাসের এই তালপাকা গরমে মাঝে মাঝে ঠাণ্ডা হাওয়া এসে সবকিছু কেমন প্রশান্তিময় করে তুলছে। জুড়িয়ে আসছে শরীর।

‘বনলতাকে খবরটা দেয়া উচিত।’—সফিক বলে।

‘থাক, আর লাভ কী?—ওভাবে ভেগেই যখন গেল।’ বাশার উত্তর দেয়।

‘সুরঞ্জনা, ওইখানে যেও নাকো তুমি, বোলো নাকো কথা ওই যুবকের সাথে’—জহির শেষদিকে এসে প্রায়ই আওড়াত লাইনদুটো। তখন ভেবেছি কবিতা। বনলতা জহিরকে ঠকিয়ে তার প্রতিবেশী প্রেমিকের সঙ্গে পালিয়ে গেছে ঠিকই; কিন্তু জহির তো জীবনানন্দ হতে চেয়েছিল, ওর আর দোষ কী?

একটা ম্রিয়মাণ মিছিলের পেছনে পেছনে হাঁটতে থাকি আমরা।



1 টি মন্তব্য: