সোমবার, ১ আগস্ট, ২০১৬

লেখকের সঙ্গে আলাপ : রমাপদ চৌধুরী


অরুণকুমার মুখোপাধ্যায়

''দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর ঈশ্বরের মৃত্যু ঘটেছে। আজ আর কেউ তাঁকে স্মরণ করে না, তাঁর শরণ নেয় না। এখন যা করে তা হল, সংস্কারের দাসত্ব, ধর্মাচারের অন্ধ আনুগত্য। আমরা যে-জগতে বাস করি, তা ঈশ্বরহীন জগৎ। আমাদের কোনো অবলম্বন নেই। দেখুন না কেন, আমাদের সংস্কৃতির অভিমান কত অগভীর কত দুর্বল। এবং তা কত অর্থহীন।''



কথাগুলো বলছেন একালের প্রিয় লেখক রমাপদ চৌধুরী। চেহারা বৈশিষ্ট্যহীন, লেখা স্বাতন্ত্র্য-উজ্জ্বল। দশজনের ভীড়ে লেখককে চেনা যায় না, দশটা লেখার মধ্য থেকেও তাঁর লেখা চিনে নেওয়া কঠিন নয়। দক্ষিণ কলকাতায় তাঁদের বাড়ির বৈঠকখানায় বসে গল্প করছি। এক পাড়ার লোক বলেই তাঁর বাড়িতে প্রভাতী আড্ডার অবসর পাই। 

''আমি প্রায় সমগ্র ভারতবর্ষ ঘুরেছি। তা থেকে আমার মনে হয়েছে, বাঙালির মতো শ্রদ্ধাহীন কর্মহীন জাত আর নেই। কোনো কিছুর প্রতিই আমাদের শ্রদ্ধা নেই-- না ধর্মে, না পূর্বপুরুষে, না জাতীয় নেতৃত্বে। সবটাই হুজুগ। আর অলস বাক্যালাপে আমাদের জুড়ি নেই, আড্ডায় আমাদের ক্লান্তি নেই, পরচর্চায় উৎসাহের কম্‌তি নেই। আপনি ত প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াচ্ছেন। আমি দ্বিতীয় যুদ্ধের সময় প্রেসিডেন্সিতে পড়েছি, হিন্দুহস্টেলে থেকেছি। কিন্তু আমাদের সময়ে এখনকার মতো এত আড্ডা ছিল না।'' পরক্ষণেই রসিকতা করে বললেন, ''বোধ হয় বইপাড়ায় বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কফিহাউস ছিল না বলেই এত আড্ডার সুযোগ ছিল না। আজকাল তো ওপাড়ায় গেলে কিরকম অচেনা ঠেকে। আপনি কি বলেন?''

কি আর বলব? সমর্থনের মৃদু হাস্য ছাড়া আর কিছু আমার হাঁটে নেই। 

''আজকাল হিন্দু হস্টেল কি সেই রকমই আছে? তেমনি নির্জন নিস্তব্ধ মনোরম শ্যামল? সেদিন হিন্দু হস্টেল আর তাঁর পরিবেশ কী চমৎকার লাগত! আশেপাশে বড় বড় বাড়ি ছিল না। বেকার ল্যাবরেটরি তখন ছোট ছিল। ছিল না সোশ্যাল সায়ান্স ইনস্‌টিটিউটের বাড়ি, ছিল না বেকার ল্যাবরেটরির দীর্ঘ-প্রসারিত পশ্চিম বাহু।''

মৃদু হেসে বলি, ''দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায় রইল না!''

উত্তরে রমাপদ চৌধুরী স্মিত হাসি হাসলেন। বললেন, ''তখন প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন গণিতে র‍্যাংলার শ্রী বি. এম. সেন। হস্টেলের সরস্বতী পূজোয় তাঁর খুব উৎসাহ ছিল। তিনি আমাদের উৎসাহ দিতে হস্টেলে আসতেন। আসতেন আর একজন। 

''সরস্বতী পূজোর দিন সেই মহৎ বাঙালিকে হস্টেলে দেখেছিলাম। হস্টেলের মাঠে ত্রিপল টাঙিয়ে প্যান্ড্যাল হয়েছে। তার মধ্যে প্রতিমা। পূজো শেষ হয়ে গেছে। প্রায় দুপুর। যে যার ঘরে বসে আড্ডা দিচ্ছি- সন্ধ্যায় নাটকের অভিনয় হবে, তার কথা হচ্ছে। কে যেন ডাকলেন,- আচার্য এসেছেন, শিগ্‌গীর এসো। দুদ্দাড় করে নেমে গেলাম। দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। ইনিই আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়? গায়ে একটি চাদর, লুঙির মতো করে ধুতি পরেছেন। 

শীর্ণকায় রুগ্ন মানুষটি একটি ছাত্রের কাঁধে ভর দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন প্রতিমার কাছে। আমরা প্রণাম করতেই হাত তুলে আশীর্বাদ করলেন!

অভিভূতের মতো তাকিয়ে রইলাম তাঁর দিকে।

প্রতিমার দিকে তাকিয়ে আচার্য বললেন, এখনো তেমনি কমল-কোমল মুখ কেন হে মায়ের? তেজ থাকবে তো চোখে?

তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, পূজো তো স'পাঁচ আনায় সারবে, না কি হে? বাকি সব হৈ হুল্লোড়, কেমন?

কথাটা শুনে লজ্জা পেলাম। এ'কথা তো মিথ্যে নয়। পূজোয় চাঁদা উঠত হাজার দেড়েক টাকা। আমাদের নিরুত্তর দেখে বললেন, এই টাকায় একটা ছেলে ভাল করে পড়াশুনো করে এসে দেশের জন্যে কিছু করতে পারত হে!

আচার্যের কথাটা সত্যি, কিন্তু মনে হল তিনি যেন আমাদের ফুর্তিটুকু কেড়ে নিতে চান। বোধ হয় তিনি আমাদের মনের কথা বুঝতে পারলেন। হেসে বললেন, না, না, এসবও থাকবে বইকি, এসবও থাকবে।

তারপর হাতের কাছে একটি ছাত্রকে উদ্দেশ্য করে বললেন, স্বাস্থ্য ভাল কর। শুধু মুখ গুঁজে বই পড়ে কি হবে? স্বাস্থ্য ভাল কর। 

মিনিট কয়েক পরে তিনি চলে গেলেন। তিনি চলে যাওয়ার পরেও আমরা অভিভূতের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম ফটকের বাইরে।''

গল্প শুনে চুপ করে রইলাম। তারপর প্রশ্ন করলাম, ''আর কোন বাঙালিকে দেখে আপনি অভিভূত হয়েছিলেন।''

রমাপদ চৌধুরীর তৎপর উত্তর- ''রবীন্দ্রনাথ আর সুভাষচন্দ্র। এই তিনজনকে দেখে আমার সাধ মিটে গিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ, প্রফুল্লচন্দ্র, সুভাষচন্দ্র- বলুন, এরপর আর কী দেখার আছে?'' 

মানতেই হ'ল কথাটা। বললাম, ''রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আপনার কি রকম আলাপ ছিল?''

রমাপদ চৌধুরী হাত নেড়ে বললেন, ''না, না, আলাপ বললে যা বোঝায়, তার কিছুই না। আমার কৈশোরের এক মধুর স্বপ্ন রবীন্দ্রনাথ। আমার বাবা রেলে চাকরি করতেন। খড়্গপুরে রেল কোয়ার্টার্সে আমরা থাকতাম। 

ভোরের দিকে প্রতিদিন সাহেব-পাড়া দিয়ে বেড়াতে যেতাম কয়েক বন্ধু মিলে। ঐ পাড়াটি ছিল নিস্তব্ধ, পরিচ্ছন্ন, পিচঢালা চকচকে চওড়া রাস্তা। ভারতীয়দের সে এলাকায় বাস ছিল না। সায়েব আর ফিরিঙ্গীদের রাজত্ব। ঐ সুন্দর পথগুলির দুপাশে ছিল মহানিম, দেওদার, অশোক, অর্জুন, শিরিষ, কৃষ্ণচূড়া। আমরা তিন-চারটি কিশোর সেই সব পথ ধরে বেড়াতে যেতাম।

এই পথেই একটি বিচিত্র ফুল আবিষ্কার করেছিলাম। যার নাম জানি না, যা আগে দেখিনি, যা-কিছু ভালো, যা-কিছু বিরল- তাই ছিল আমাদের কাছে বিলিতী। ফুলটির নাম দিয়েছিলাম বিলিতী চাঁপা। কী সুন্দর সেই ফুল! লম্বা লম্বা আঙ্গুলের মতো চারটে করে পাপড়ি। স্পঞ্জের মত নরম, ঈষৎ সোনালি হলুদ রঙ, আর কী মিষ্টি গন্ধ! আসলে ফুলটির নাম আমরা জানতাম না। 

রবীন্দ্রনাথ আমাকে ফুলের নামটি জানিয়ে ছিলেন।''

ঈষৎ কৌতুক আর অবিশ্বাসে বলি, ''বলেন কি, রবীন্দ্রনাথ আপনাকে ফুল চিনিয়েছেন?''

রমাপদ চৌধুরী একটু হেসে বললেন, ''ভোরের দিকে প্রতিদিন সায়েব-পাড়া দিয়ে বেড়াতে যেতাম। বিলিতী চাঁপা কুড়োতাম। তারপর যেতাম স্টেশনে। খড়্গপুরের দীর্ঘ প্লাটফর্ম। প্লাটফর্মে কৃষ্ণচূড়া গাছ। ফেরবার পথে ঐ গাছ থেকে এক ডাল কৃষ্ণচূড়া ভেঙে নিয়ে বাড়ি ফিরতাম। 

সেদিনও দুহাতে কৃষ্ণচূড়া আর সেই বিলিতী ফুলের রাশি বুকে চেপে প্লাটফর্মের ওপর দিয়ে হেঁটে চলেছি ভোর বেলায়। দেখলাম ডাউন পুরী এক্‌স্‌প্রেস এসে দাঁড়াল। গাড়ির জানালাগুলোর ওপর দিকে চোখ পিছলে চলতে চলতে হঠাৎ থমকে থামল। 

সে দৃশ্য বর্ণনা করা যায় না। সে মনের ভাব প্রকশের ভাষা আমার নেই। এক মুহূর্তেই চিনতে পারলাম। কে না চেনে ঐ রূপবানকে! ফার্স্ট ক্লাস কামরার জানালা থেকে উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন।

অভিভূতের মতো কাছে এগিয়ে গেলাম। নির্লজ্জের মতো সেই দেবদুর্লভ রূপের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। সেই ভোরে দেখতে দেখতে ভিড় জমে গেল। সকলেই চিনতে পেরেছে। দেখি দু-একজন হাত জোড় করে নমস্কারের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। 

একটি ফিরিঙ্গী মেয়ে হঠাৎ ছুটতে-ছুটতে চলে গেল সামনের তার-ঘরে। একটা খাতা নিয়ে এসে কি যেন বললে তাঁকে। তিনি হাসলেন, অটোগ্রাফ দিলেন। 

তা দেখে আমার সাহস এলো। কামরায় উঠে গিয়ে ফুলের রাশি নামিয়ে দিতে গেলাম তাঁর পায়ে। মৃদু হেসে ফুলগুলি তুলে নিলেন তিনি দু-হাতে, তারপর সেই অপূর্ব কণ্ঠস্বরের একটু প্রশ্ন শুনলাম, 'মুচকুন্দ? কোথায় পেলে?' 

জবাব দেবার আগেই ঘণ্টা বাজল, নেমে পড়লাম। তিনি কী যেন বললেন। ট্রেন ছেড়ে দিল। একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম। ধীরে ধীরে ট্রেন এগিয়ে চলেছে। সস্নেহ হাসি দেখলাম তাঁর মুখে, আমার সেই বিলিতী ফুলের ঘ্রাণ নিলেন। সে যে কী আনন্দ তা আপনাকে বলে বোঝাতে পারব না। সে এক অপার্থিব আনন্দ। এক ফিরিঙ্গী সায়েব আমার পিঠ চাপড়ে বললেন, লাকি চ্যাপ। 

রবীন্দ্রনাথকে সেই প্রথম দেখলাম, তাঁর কাছেই মুচকুন্দের নাম শিখলাম। তিনি আমায় ফুল চিনিয়ে ছিলেন। 

তাঁকে দ্বিতীয় ও শেষবার দেখলাম, তিরোধানের পরে, বাইশে শ্রাবণ। সারা কলকাতা সেদিন পথে নেমে এসেছে। মর্ত্যের বন্ধন ক্ষয় করে রবীন্দ্রনাথ অমর্ত্যলোকে যাত্রা করলেন সেদিন। প্রেসিডেন্সি কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। শবযাত্রা এগিয়ে আসছে। অসংখ্য শোকাচ্ছন্ন মানুষের ভিড়, দূর থেকে দেখলাম ফুলের শয্যায় শায়িত মুদিতনয়ন প্রশান্ত রবীন্দ্রনাথকে। ধীরে ধীরে সেই দেবদুর্লভ রূপ চিরদিনের মতো দৃষ্টি থেকে অপসৃত হয়ে গেল।''

স্মৃতিভারাচ্ছন্ন কথক থামলেন। 



অন্য এক সকালের আড্ডা। 

সাহিত্যপত্র সম্পাদনার কথা হচ্ছিল। রমাপদ চৌধুরী জানালেন, তিনি বেশ কিছু পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। "Life of India", "ইদানীং", "রমাপদ চৌধুরীর পত্রিকা", আরও কিছু কাগজ। 

বললেন, জীবনে অনেক কাজ করেছি। মাছ-ঘি-এর ব্যবসা, চাকরি, পত্রিকা-সম্পাদনা, বীমা-এজেন্সি-- নানা ধরনের কাজ করেছি। আবার অনেক সময় বিশুদ্ধ বেকার হয়ে ঘুরে বেড়িয়েছি। রাঁচি, মূবী, বিলাসপুর, গৌহাটি, ডিব্রুগড়, রায়পুর, রামগড়, আরগাডা, মহুয়ামিলন, বরকাকানা। ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে তিনটি মাস কাটিয়েছিলাম বিলাসপুর, রায়পুর। আমার প্রথম দিককার বহু গল্পে এই অঞ্চলের পটভূমি আছে। বিলাসপুরী মানুষগুলিকে ভাল লাগত। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়ে তিন মাস কাটিয়েছি মূবীতে। সেখানকার মুণ্ডাদের জীবন আমাকে তীব্রভাবে আকর্ষণ করেছিল। তারপর ১৯৪৭-এ জীবিকার সন্ধানে কাটিয়েছি হাজারীবাগ অঞ্চলে আরগাডা মহুয়ামিলন বরকাকানায়। নানা দেশ ঘুরে শেষ পর্যন্ত মহানগরীতে। 

"আমার এই ভ্রাম্যমান জীবনের পিছনে আমার কোনো হাত ছিল না। যাকে আমরা দেখতে পাই না, যার পরিচয় জানি না, যার সঙ্গে লড়াই করতে পারি না, সেই ভাগ্য আমাকে বার বার ঘুরিয়েছে। ভাগ্যের হাতে শাস্তি ও পুরস্কার দুই-ই পেয়েছি।"

বাধা দিয়ে বলি, "তাহলে তো আপনি নিয়তিবাদী, fatalist।" কথক বললেন, "একথা যদি বলেন আমি আপত্তি করব না। যুক্তি দিয়ে সব নস্যাৎ করে দিই; অথচ মাঝে মাঝে মনে হয়, মানুষ তার ভাগ্যের নির্দেশ এড়িয়ে যেতে পারে না।"

বললাম, "আপনার কখনো তা মনে হয়েছে?"

কথক বললেন, যখন চাকরির সন্ধানে ঘুরেছি, তখন চাকরি পাই নি। যখন চেষ্টাশেষে নিরস্ত হয়েছি তখন ভাগ্য আমার হাতে চাকরি তুলে দিয়েছে।"

রমাপদ চৌধুরী মৃদু হাসলেন। "একবার পূজোর আগে এক প্রবাসী সাহিত্যিক কলকাতা এসেছেন। আমি গিয়েছি দেখা করতে। কথায় কথায় তিনি বললেন,-- তোমার কোষ্ঠীর ছক মনে আছে?

"বললাম। তিনি তখন তা বিচার করে ভবিষ্যদ্বাণী করলেন। এক, আমার শিশু কন্যার আসন্ন দুর্ঘটনা। দুই, কর্মক্ষেত্র অশুভ। 

"মাসখানেক পরের কথা। অষ্টমী পূজোর দিন সেটা। সন্ধ্যের সময় দুর্ঘটনা ঘটলো, সাজগোজ করে মেয়েটি প্রতিমা দেখতে বেরোবে, কোত্থেকে কি হয়ে গেল, এক কড়াই ফুটন্ত দুধ এসে পড়ল ওর সারা শরীরে।"

একটু থেমে বোধ হয় সেই দুঃসহ দৃশ্যটা মনের চোখে দেখে নিলেন একবার। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "সে যা দিন গেছে একটা মাস, কল্পনা করতে পারবেন না। তার জীবন নিয়ে টানাটানি চললো একমাস, সারাটা দিন পি. জি. হসপিটাল আর বাড়ি, বাড়ি আর পি. জি. হসপিটাল। মাঝে মাঝে ওষুধের দোকান, ডাক্তার, ব্লাড-ব্যাঙ্ক।''

আতঙ্কের ছায়াটা যেন ধীরে ধীরে সরে গেল তাঁর মুখের ওপর থেকে। হঠাৎ হেসে উঠে বললেন, ''জানেন না, বোধ হয়, এই ঘটনার এক সপ্তাহ আগে 'দেশ' পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে লিখতে শুরু করেছি 'বনপলাশির পদাবলী'। একটি মাত্র কিস্তি ছাপা হয়েছে, আর এক লাইনও লেখা হয়নি। অথচ দু'তিন দিনের মধ্যে পরের সপ্তাহের কিস্তি লিখে দিতে হবে। পূজো সংখ্যার কাজের চাপে উপন্যাস সম্পর্কে কিছুই ভাবতে পারি নি, এখন আবার অন্য দুশ্চিন্তা।''

আমি প্রশ্ন করলাম, ''এরই মধ্যে লিখলেন?''

উত্তর এলো, ''লিখতে হলো। উপন্যাস আরম্ভ করেই তার পরের সপ্তাহে 'অনিবার্য কারণ' দেওয়া যায় না।''

বললাম, ''বইটা পড়ে কিন্তু বোঝাই যায় না এমন দুশ্চিন্তার মধ্যে লেখা।''

রমাপদ বাবু হাসলেন। -- ''ঐ একটা দুর্ঘটনা নয়, বলতে গেলে এ- উপন্যাস লিখতে নিয়ে পদে পদে বাধা পড়েছে, মন বিক্ষিপ্ত হয়েছে। মুস্কিল কি জানেন, পাঠকরা উপন্যাস পড়ে সাহিত্যের বিচার করেন, নাক সিঁটকে বলেন, বাজে লেখা, তখন ভিতরের ইতিহাস জানতে চান না।''

আমি হেসে বললাম, ''এত বাধা পড়েও তো এটাই আপনার শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। অথচ একাগ্র মনে লিখেছেন, কোন বাধা পড়েনি, সে লেখা হয়তো সত্যিই উৎরোয় নি।''

রমাপদ চৌধুরী ভুলে-যাওয়া প্রশ্নটাকে এবার ফিরিয়ে আনলেন। বললেন, ''সেই জন্যেই তো কখনো কখনো ভাগ্যের ওপর বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়।''

আমি হেসে বললাম, ''অর্থাৎ কুসংস্কারে বিশ্বাস।''

''হ্যাঁ। আমি তো বলেছি, ঈশ্বরে বিশ্বাস হারিয়েছি আমরা সকলেই, কিন্তু কুসংস্কারকে জয় করতে পারিনি। এই দেখুন না, চার বছরের কন্যাটির দুর্ঘটনার ভবিষ্যদ্বাণী মিললো, সেটাকেই বড় করে দেখি আজও, কিন্তু কর্মক্ষেত্রে অশুভ না হয়ে বরং উন্নতি হলো, তবু সেটাকে দাম দিলাম না।''

একটু থেমে বললেন, ''সবচেয়ে বড় রহস্য কি জানেন, চেষ্টা করে যা পাই না, চেষ্টা না করেও অনেক সময় তা পেয়ে যাই। ভালো লেখার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হই, আর দায়সারা লেখারও খ্যাতি শুনতে পাই। যে নামই দিন, ভাগ্য ছাড়া কি?''

একটু থেমে বললেন, ''যুক্তি তো শুধু সব বিশ্বাস নির্মূল করার জন্যে নয়, নোতুন বিশ্বাস গড়ে তোলার জন্যে। তা আমরা পারি নি, আবার ঈশ্বরে বিশ্বাস হারিয়েছি। এ-যুগের মানুষের তাই ভাগ্যই সম্বল হয়ে দাঁড়াচ্ছে।''


আর একদিনের আড্ডা। 

রমাপদ চৌধুরী গল্প লেখার গল্প করছিলেন। তাঁর দুই সহপাঠী বন্ধু প্রাণতোষ ঘটক আর স্বরাজ বন্দ্যোপাধ্যায়। বললেন-- ''কলেজ স্ট্রিটের মোড়ে পাবলিক রেস্তোরাঁয় বসে তিন জনে মিলে পরস্পরের গল্প শুনতাম, তারপর নৃশংসের মত ধারালো সমালোচনা-ছুরিতে তা টুক্‌রো-টুক্‌রো করে ফেলতাম। এইভাবেই আমরা তিন বন্ধু গল্প লিখতাম আর ছিঁড়ে ফেলতাম। নিজেদের মধ্যে একটা অলিখিত শর্ত হয়েছিল যে, অপর দুজনকে না পড়িয়ে, তাদের সম্মতি না নিয়ে কেউ আমরা কোথাও গল্প পাঠাব না। 

''কিন্তু একদিন একটা ছোট গল্প লিখে ভাবলাম, দিই পাঠিয়ে, দেখি না কী হয়। দুজনকে না জানিয়েই পাঠিয়ে দিলাম। শর্ত ভঙ্গ করলাম। 

''গল্পটার নাম 'উদয়াস্ত'। ছাপা হয়ে গেল, যুগান্তর সাময়িকীতে। কিন্তু বাকি দুজন অভিযোগ করল না, কারণ ওই একই সপ্তাহে 'আনন্দবাজারে' বের হল প্রাণতোষের গল্প, আর স্বরাজের গল্প অন্য কোনো কাগজে। সেই প্রথম বোধ হয় আমরা বাইরের জগতে বেরিয়ে এলাম।''

''তারপর দু'তিন বছর হাসির গল্প লিখেছি।''

''তখনকার দিনের সবচেয়ে আধুনিক সাহিত্যপত্র ছিল 'পূর্বাশা' আর 'চতুরঙ্গ'। তখন এম. এ. পড়ছি। ভাবলাম, 'পূর্বাশা'য় গল্প ছাপাতে না পারলে লেখাই বৃথা। 

অসংখ্য সংশোধনের পর 'পূর্বাশা'য় গল্প পাঠালাম, বেরিয়ে গেল গল্প, নাম 'রত্নকূট'। কিন্তু তা পড়ে কেউ প্রশংসা করল না। তখন আবার লিখলাম। আবার সংশোধন, সংশয়, অসন্তোষ। ফের পাঠালাম 'পূর্বাশা'য়, গল্পের নাম 'চন্দ্রভস্ম', ছাপা হলো। পূর্বাশা সম্পাদক সঞ্জয় ভট্টাচার্যের অনুরোধ-পত্র পেলাম। দেখা করার অনুরোধ। 

তাঁর পোস্টকার্ড পকেটে পুরে 'পূর্বাশা' অফিসে অনেক সংশয় আর ভয় নিয়ে হাজির হলাম একদিন। গিয়ে দাঁড়ালাম। সঞ্জয়বাবু প্রশ্ন করলেন- কি চান আপনি?

বললাম- আমি রমাপদ চৌধুরী। 

সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন। সঞ্জয়বাবু হাঁকডাক শুরু করলেন- আপিসের সকলকে ডাকলেন, প্রত্যেককে দেখালেন, ইনি রমাপদ চৌধুরী, ইনিই রমাপদ চৌধুরী। তারপর বললেন, প্রেমেনবাবু আপনার গল্প পড়ে একটু আগেই ফোন করেছিলেন। খুব প্রশংসা করেছেন। বুঝতে না পেরে বললাম, প্রেমেনবাবু কে?

সঞ্জয়বাবু অবাক হয়ে বললেন, কেন, প্রেমেন্দ্র মিত্র। 

বললাম, ও।

কিন্তু তাতে কী হয়েছে। তিনি যে একজন বিশিষ্ট লেখক, তা তখন জানতাম না। জানতাম তিনি সিনেমার ডিরেক্টর। 

ফিরে এসে আমার এক সমালোচক-বন্ধুকে ঘটনাটা বললাম। জিগ্যেস্‌ করলাম,-- প্রেমেন্দ্র মিত্র কেমন লেখেন রে?

বন্ধু অবাক হয়ে বলল, বলিস কি তুই? ওঁর লেখা পড়িস নি? 

উত্তর দিলাম, দু-একটা কবিতা পড়েছি। 

-সে কি গল্প পড়িস নি? 

-না তো। 

বন্ধু হতবাক্‌। শেষে যখন সে বাক্‌শক্তি ফিরে পেল, তখন বলল,- লেখা ছেড়ে দে তুই। তোর হবে না। 

আমি কেবল বললাম,- 'কিন্তু তিনিই যে ফোনে বলেছেন, আমার হবে।'

রমাপদ চৌধুরী থামলেন, গল্প শুনে হাস্য সংবরণ করা কঠিন হল। কথক নিজেও সে হাসিতে যোগ দিলেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন