বৃহস্পতিবার, ১০ নভেম্বর, ২০১৬

জোতিরিন্দ্র নন্দী : আমার সাহিত্যজীবন


মেঘলা আকাশের মতন মুখভার। হাসি নেই। কথা নেই মুখে। এই ছেলে এমন কেন। চুপচাপ। খেলাধুলা করে না, মেলামেশা নেই কারো সঙ্গে। 
এই বয়সে বাচ্চারা হুটোপাট করে। সারাক্ষণ তাদের ছুটোছুটি লেগেই আছে। এটার জন্য বায়না, ওটার জন্য কান্নাকাটি, খেলনা পেলে খাবার পেলে মহাখুশি। মেলায় যাবার নাম শুনলে আহ্লাদে নাচতে থাকে। জাম পাকলে জামতলায় ছুটে যাচ্ছে। শীতের রোদরে টোপাকুল গাছের তলায় তাদের ভিড়। 
এই ছেলে তো তা নয়। 
ছনের ছাউনি দেওয়া রান্নাঘর। ছেঁচা বাঁশের বেড়া টিনের চাল ঠাকুর্দার শোবার ঘর, যার নাম বড় ঘর। মাঝখানে একফালি রাস্তা পুকুরঘাটে যাবার। রাস্তা ঘেঁষে পুইমাচা। মাচার কাছে চুপ করে দাড়িয়ে আছে ধনু । কি ভাবছে ও । 
চার বছরের ছেলের এত ভাবনা কোথা থেকে আসে। কি ভাবছিস, মা জিজ্ঞেস করে। তারপর ঠাকুর্দা-ঠানদি জিজ্ঞেস করে। তারপর কাকারা পিসিরা । উহু, উত্তর দেবে কে। রা নেই ছেলের মুখে। ড্যাবড্যাব করে পুকুরঘাটের দিকে তাকিয়ে। খেজুর আর ডালপালা ছড়ান একটা বুপসি শেওড়া গাছের পিছনে লাল দগদগে আকাশ। সুৰ্য অস্ত যায়।
ছোটকাকা বলল, ধনু আকাশ দেখছে। বড়পিসি বলল, ফড়িং দেখছে ও । বাঁক বেঁধে লাল ফড়িং উড়ছে। খেজুর গাছের মাথার কাছে। ঠানদি বলল, ওর বোধ করি ঘুম পেয়েছে বউমা, খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দাও। মা ছুটে এসে ঠাস করে গালে চড় লাগায়। আসলে ওর এখানে মন বসে না । মামাবাড়ির জন্য ছটফট। 
ততক্ষণে কোর্ট-কাছারি সেরে বাড়ি ফিরে উকিলের ধড়াচুড়া ছেড়ে বাবা আদর করে ওকে কাছে ডেকে নেয়। তারপর ছেলের হাত ধরে রাস্তার ওপারে সোজা কোবরেজ মশায়ের বৈঠকখানায়। ওষুধের আলমারি ঠাসা ঘরের পিছনে ভিতর দিকে দাবার আড্ডা। দাবার ছক ঘিরে কতগুলি কাঁচা পাকা অত্যুৎসাহী মাথা।। হুকোর গুড়ুক গুডুক। ধোয়ার কুণ্ডলী। আর থেকে থেকে পিলে চমকান হৈ হৈ। ‘আহা, ঘোড়ার চাল দিন।” “নৌকোটা ধরে রাখুন মশাই।”
বাবার পিঠ ধরে হা করে ধনু দাড়িয়ে। খেলা দেখছে ? না তো । কিছুই দেখছে না। সে। রাজা মন্ত্রী হাতি ঘোড়া নৌকো বোড়ে, ঘুটির ওপর ঝুকে পড়া এতগুলি মাথা মুখ, খেলোয়াড়দের বাঁ-হাতে ধরা হুকো, গালগলে ধোয়ার কুণ্ডলী -কিছুই তার দেখবার নেই। কেবল ভাবছে। কি ভাবছে ও ? 
তাই আজ চিন্তা করি। সারাক্ষণ মুখ গোমরা করে কোন ভাবনায় ডুবে থাকতাম সেদিন। আসলে কি জায়গাটাই আমার ভাল লাগত না ? হয়তো তাই। মা-ই আমার মন বুঝাত। মা ছাড়া ছেলের মন কে বেশি বোঝে। 
ছোট মফঃস্বল শহর। কোর্ট-কাছারি হাসপাতাল ট্রেজারী থানা গার্লস স্কুল, এদিক ওদিক কিছু পান সিগারেটের দোকান, স্টেশনারী দোকান, মিষ্টির দোকান, আর কম করেও চার পাঁচটা কবিরাজি ডিসপেনসারী। শীতের মুখে বড় বড় কড়ায়ে চ্যবনপ্রাশ জাল দেওয়ার গন্ধ আর ফাল্গুন পড়তে পাঁচন সেন্ধর গাঢ় তেতো গন্ধে বাতাস ভারি হয়ে উঠত। 
কিন্তু কেন ভাল লাগত না ! জ্ঞান হওয়ার আগে থাকতে যে আমি এই শহরে । বাবার কাছে। মা-র শ্বশুরবাড়ি এটা । কিন্তু মা-র চেয়েও বাবাকে যে আমি বেশি ভালবাসি। এখানে আমার মন না বসার কারণ ? ঐ বয়সে কি কোনো শিশু নিজেকে প্রশ্ন করত । না প্রশ্ন করে নিজের মধ্যে সঠিক উত্তর পেত ? 
ভাল লাগত না, বাস, এই পৰ্যন্ত। একৱত্তি শহরটার দু পা বাড়ালেই ধান ক্ষেত প্লাট ক্ষেত, নদী খালি বিল, আর ধুধু গ্রাম। জ্যৈষ্ঠ আষাঢ়ে বড় বড় ভাওয়ালে নৌকো কাঁঠাল বোঝাই হয়ে বাজারের ঘাটে এসে ভিডত। দুধের সের। আর কার্তিকের শুরু থেকে সারাটা শীত মাছ আর মাছ। মানুষ
কত মাছ খাবে। কাকে বকে খেত। তারপরও যা থেকে যেত, বঁাশের চটায় গোখে শুকিয়ে শুটকি করা হত। কিন্তু মাছ দুধ কঁঠাল দেখে কি চার বছরের
শিশু খুশি হয়। তাই তো। কি দেখলে তার ভাল লাগবে! আজ আমি বুঝি তখনও আমার ভাললাগার বোধ জন্মায়নি। ভাসানের দিন তিতাসের বুকে কত ঠাকুর। শহরে আর কাঁটা পুজো। দূর-দূরান্তের সব গ্রাম থেকে নৌকায় করে সেদিন বড় বড় দুৰ্গা প্ৰতিমা এসে ভিড়েছে। শহরের বাজারের ঘাটে। বেন বিসর্জনের আগে শহরের মানুষকে ঠাকুর না দেখালে গায়ের লোকের মন উঠঙা না। তেমনি পয়লা ভাদের নৌকা দৌড়। শত শত নৌকো লেবিন তিতালের জলে ছাটাছটি করেছে। বিচিত্ৰ দৃশ্য। আর পাঁচটি শিশুর মতন ভাল জাম-কাপড় পরে নৌকা-দৌড় দেখতে গেছি। এই পৰ্যন্ত। খুব একটা উৎসুক দিশেহারা হতে পারিনি যেন। 
ঐ যে বললাম, কোন দৃশ্য কোন শব্দ-কিসের গন্ধ আমাকে আনন্দ দেবার জন্য অপেক্ষা করছিল তখনও জানতে পারিনি, বুঝতে পারিনি। একদিন ঠাকুর্দার সঙ্গে একটা বাগান দেখতে গেলাম। 
আম-কঁঠালের না, ফুলের বাগান। ঠাকুর্দার সঙ্গে রোজ সুৰ্য ওঠার আগে বেরিয়ে পড়তাম। প্ৰাতঃভ্রমণের নেশা ছিল তারা। ঠাকুর্দার আঙুলি ধরে শহরের শেষ সীমায় রেল লাইন পার হয়ে ধান ক্ষেত পাট ক্ষেত দেখতে দেখতে একটা খালের ধারে চলে গেছি। ভাদ্র মাসে জলে ডোবান পাটের পচা গন্ধে, আঘ্রানে পাকা ধানের গন্ধে আর বর্ষার দিনে-বলেছি খাল বিলের দেশ আমাদের, পুটি মৌরলা খলসে মাছের আঁশটে গন্ধে ভোরের বাতাস ভুর-ভুর করছে টের পেতাম। আমি এখানে গন্ধের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি। সব ক’টা ইন্দ্ৰিয়ের মধ্যে সেই শৈশব থেকে আমার নাকটা অতিমাত্রায় সজাগ সচেতন। পরবতী জীবনে সাহিত্য সৃষ্টি করতে গিয়ে এই গন্ধ আমাকে অনেক সাহায্য করেছে। সেদিন খালের ধারে পৌছে ঠাকুর্দার সঙ্গে হেলিডি সাহেবের বাংলোর লাগোয়া ফুলবাগানের কাছে চলে গেলাম। দারোয়ান গেট খুলে দিল। বুড়ো দারোয়ান ঠাকুর্দাকে বড় ভালবাসত। বাগানে ঢুকেই তিনচার হাত দূরে একটা জিনিস দেখে চমকে উঠলাম। না, খুব যে একটা ফুলের সমারোহ ছিল বাগানে তা নয়। দেখলাম আমার মাথার সমান উচু একটা গাছের দুটাে ডালে দুটাে সদ্য ফোটা গোলাপ। একটু একটু শিশির লেগে আছে পাপড়ির গায়ে। ভোরের রক্তরাঙা আলোর ছটা লেগে ঝকমক করছে ফুল দুটো। অল্প বাতাসে একটু একটু কাঁপছে। একটা সোনালী নীল প্ৰজাপতি একটা আফোঁটা কলির বোঁটায় চুপ করে বসে আছে। আমার চােখের পলক পড়ল না। শ্বাস বন্ধ হয়ে গেল। ভাললাগা কাকে বলে, ভাল দৃশ্য কী সেদিন প্ৰথম টেৱ পেলাম। আর গন্ধ। নির্জন উষার সেই বাগানে গোলাপের মৃদু কোমল গন্ধে আমার বুকের ভিতর ছেয়ে গেল। সেই গন্ধ বুকে নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। যেন একটা আশ্চৰ্য সম্পদ আহরণ করে বাড়ি ফিরলাম। 
আর একদিন । বাবার সঙ্গে ট্রেনে চড়ে আমার জন্মস্থান, আমার মায়ের দেশ কুমিল্পায় বেড়াতে গেছি। শহরের ওপর মামাদের বাসা। মাকে ছেড়ে এই প্ৰথম আমার মামাবাড়ি যাওয়া। চার থেকে সাড়ে চার বছর আমার বন্ধন তখন। কাজেই মামাবাড়িতে আমার খাতির যত্নটা সেদিন একটু অন্যরকম ছিল। বড়মামা চোখের ইসারা করতে আমার সমবয়সী দুটি মামা বাড়ির ভিতর ছুটে গিয়ে আমার জন্য উপহার নিয়ে এল। তখনও আমার জাম-কাপড় ছাড়া হয়নি, দিদিমার দেওয়া লুচি সন্দেশ খাওয়া হয়নি। বারান্দায় দাড়িয়ে ছোট দুই মামার হাতে ধরা উপহারগুলি অবাক হয়ে দেখতে লাগলাম। চোখের পলক পড়ছিল না। রঙবেরঙের কাঁটা পাখির পালক, কাজু বাদামের সাইজের-তেমনি সাদা ধবধবে ক’টা বালি-পাথর আর একরাশ শুকনো বকুল। অর্থাৎ ধনু মামাবাড়ি বেড়াতে আসছে, বাবার চিঠি পেয়ে মামারা ছোট ভাগ্নেটির জন্য রঙিন পাখির পালক, ছোট ছোট বালি-পাথর ও কিছু বকুল ফুল যোগাড় করে রেখেছিল। সকালের কুড়োনো বকুল শুকিয়ে লাল হয়ে গেছে। তা হলে হবে কি। ওই শুকিয়ে ওঠা বকুলের গন্ধ তীব্র হয়ে আমার নাকে লাগল। যেন সঙ্গে সঙ্গে আমি সুরভিত হয়ে উঠলাম। যেন ফুলটা বাসি হয়ে উঠেছিল বলে গন্ধটা এত বেশি ভাল লাগছিল। 
যাই হোক, সেদিন আবার আমার প্রথম ভাললাগার আশ্চৰ্য অনুভূতি আমাকে আচ্ছন্ন করে দিল। যেমন একদিন আশ্বিনের পরিচ্ছন্ন প্ৰত্যুষে হেলিডি সাহেবের বাগানের দুটি শিশিরভেজ গোলাপ আমাকে আবিষ্ট করেছিল। প্ৰথম ভাল-লাগার অনুভূতি। এর অর্থ কি! আজি ভাবি, সেদিনের সেই সব মুহূর্ত থেকে একটা শিল্প-বােধ আমার মধ্যে তৈরী হতে শুরু করেছিল। কৈ আমাদের দেশের নৌকো বোঝাই কঁঠাল নারিকেল, কার্তিকের এত মাছ, ভাসানের ঘাটের অগুনতি প্ৰতিমা, পয়লা ভাদ্রের নৌকা-দৌড়ে নদীর বুক জুড়ে সরঙ্গা পাতাম কোষ নাওয়ের ছাটাছুটির দৃশ্য এমন বিস্মিত অভিভূত করতে পারেনি তো। না কি হাজার হাজার মানুষ সে-সব জিনিস দেখত উপভোগ করত বলে ? ভিড়ের ভাললাগা আমার ভাল লাগেনি ? তাই হবে। নির্জন উষায় সাহেবের বাংলোর গোলাপ দুটি যেন একান্ত করে আমার জন্য ফুটেছিল। যেমন আমাকে উপহার দেবে আমাকে খুশি করবে ভেবে ছোট্ট দুটি মামা রঙিন পাখির পালক বাসি বকুল ও কৌটো ভরে বেলেপাথর নিয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। 
এত কথা আমার বলার উদ্দেশ্য একটা মানুষের জীবনে সাহিত্য-রচনা শিল্পসৃষ্টি কিছু আকস্মিক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। একটু একটু করে সে গল্পলেখক হয়ে ওঠে, ঔপন্যাসিক কবি বা চিত্রকর হয়ে ওঠে। বিন্দু বিন্দু করে তার রক্তে শিহরণ সঞ্চারিত হয়। আমার তাই বিশ্বাস ।
হ্যাঁ, ভাল-লাগা কাকে বলে জানলাম। পাখির পালক দেখে শুকনো বকুলের গন্ধ বুকে টেনে মুগ্ধ হতে শিখলাম। 
তারপরের ঘটনা কবিতা পড়া নয়-আবৃত্তি। স্কুলের বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। বিভাগীয় কমিশনার, মহকুমা হাকিম, ডেপুটি মুন্সেফ, উকিল মোক্তার, ডাক্তার, কবিরাজ, পেশকার, দোকান-মালিকদের নিয়ে প্রায় তিনশ ছেলের অভিভাবকদের বিরাট সমাবেশ। পুরস্কার বিতরণের আগে আবৃত্তি প্ৰতিযোগিতা। একলা স্বভাবের ছেলেটি “যাও পাখি যাও উড়ো” বলে একটা কবিতা আবৃত্তি করল। কেমন করে আবৃত্তি করতে হয়, তার বাবা আগের দিন সকালে তাকে শিখিয়ে দিয়েছেন। নীল আকাশের বুকে মুক্তির পাখা মেলে ছোট পাখি উড়ে যাচ্ছে। ছেলেটি যেন নিজেই পাখি হয়ে অগাধ নীলের মধ্যে হারিয়ে যেতে লাগল। আবৃত্তি শেষ। সঙ্গে সঙ্গে কয়েক শ মানুষের হাততালি, প্ৰশংসার গুঞ্জন। বালক স্তব্ধ হয়ে শুনল। উচু উচু ক্লাসের ছেলেদের হারিয়ে দিয়ে আবৃত্তি-প্ৰতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার পেল সে। পুরস্কারের বইটি বগলে নিয়ে তক্ষুনি বাড়ি ছুটে যাওয়া। কিন্তু বাড়ি গিয়ে সে কি দেখল। রান্নাঘরে চুপ করে মা বসে আছে, উনুনের কড়াইয়ে ডাল সেদ্ধ হচ্ছে। ভাল লাগল তার। যেন একটা প্ৰকান্ড আকাশ থেকে নেমে এসেছে সে। খেলার মাঠের প্যান্ডেলের সেই সভাটাও আকাশের মতন বড় লাগছিল তার কাছে। যেন অগুনতি তারার মতন অসংখ্য মানুষের মুখ মাথা। এখন নিরিবিলি রান্নাঘরে মা-র পাশে এসে স্বস্তি পাচ্ছে সে। 
কিন্তু জিনিসটা সেখানেই শেষ হয়ে গেল কি। কল্পনার পাখি দেখতে শিখলাম। মনের মধ্যে অন্তহীন নীলিমা ধরা দিতে লাগল। তারপর থেকে ক্লাসে মাস্টারমশাই বই খুলে যখনই কবিতা পড়ে শোনাতেন, তখন আর শুধু কবিতা শুনতাম না। চোখের সামনে ছবি দেখতাম। 'নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহি রে” অথবা “বাশ বাগানের মাথার ওপর চাদ উঠেছে।” ঐ-বুকের ভিতর শিরশির করে উঠত। অর্থাৎ সাহিত্যের রস কবিতার রস কেমন একটু একটু করে তার স্বাদ বুঝতে পারছি। 
ঠিক তার এক বছর পরেই, তখন আমার বয়স এগারো, একদিন কবিতা পড়া বদ্ধ করে মাস্টারমশাই আমাদের দিকে চােখ তুলে বললেন, তোরাও কবিতা লিখতে পারিস। পারবি। চেষ্টা করে দ্যাখ না। চমকে উঠলাম কথাটা শুনে । তাই তো, এমন কথা তো কেউ বলেনি, এ ধরনের কথা কারো মুখে তো শুনিনি।
বুকের ভিতর যেন বাজনা বেজে উঠল। তোরাও পারবি কবিতা লিখতে। চেষ্টা করে দ্যাখ। আর কেউ চেষ্টা করেছিল কিনা জানি না। তার প্রমাণ পাইনি। আমি তখনই কোমর বেঁধে লেগে গেলাম। সাদা ফুলস্কেপ কাগজ কিনে চটপট একটা খাতা তৈরী করে ফেললাম। রুলটানা বাধান একসারসাইজ খাতায় আমি কিন্তু কোনোদিন গল্প কবিতা লিখতে পারিনি। আজও না। রুলটানা কাগজের চেহারা দেখলেই মনে হয় এই জিনিসে স্কুলের হোম-টাস্ক করা চলে। অর্থাৎ ধরাবাধা যে-সব লেখা। আর পাঁচজন যা লেখে। সাদা কাগজের পৃষ্ঠায় স্বাধীনভাবে কলম চালাবার সুযোগ থাকে। আর আমার কলমও তখন দারুণ স্মৃতি পায়। আজও এমন কাগজেই আমি আমার পাণ্ডুলিপি তৈরী করি।
 হুঁ, গ্ৰীষ্মের ছুটিটা কবিতা লিখে কেটে গেল। কবিতায় কবিতায় খাতা ভরে গেল। কবিতার খাতার নাম দিলাম “ঝরনা” যেন একটা কবিতার বই ছাপিয়েছি আমি। দুটির শেষ ক'টা দিন মামাবাড়ি ছিলাম। খাতাটা সেজমামাকে দেখালাম। একটু হাসলেন তিনি। ক'টা পাতা উল্টেপাল্টে দেখলেন। ব্যস, এই পর্যন্ত। কোনরকম মন্তব্য না। যদি তিনি বলতেন- কিচ্ছু হয় নি, একরকম লাগত ; যদি তিনি বলতেন, “বেশ বেশ, সুন্দর হচ্ছে, লিখে যা', নিশ্চয় আহ্বাদে নাচতাম। কিন্তু শুধু একটা নি:শব্দ হাসি এবং তারপর খাতাটা আমার হাতে ফিরিয়ে দেওয়া । কেমন যেন অবাক হলাম, অভিমান হল খানিকটা, ব্যাথাও পেলাম কম না। আজ আমার নতুন প্ৰকাশিত একখানা উপন্যাস উৎসাহের সঙ্গে কাউকে পড়তে দেই, আর যদি তিনি এভাবে একটু হেসে কয়েকটা পৃষ্ঠা উল্টেপাল্টে দেখে বইটা তখনি আমাকে ফিরিয়ে দেন। আমার মনের অবস্থা কেমন হবে ? সেদিনও তাই হয়েছিল। আমার লেখা সম্বন্ধে একজন পাঠকের শীতল নিম্পৃহতা আমাকে যত ক্ষুন্ন ক্ষিপ্ত করে, গালিগালাজ তা করে না। 
কিন্তু সাতদিন পরেই আমার নিরুৎসাহের ভাবটা কেটে গেল। বাড়ি ফিরলাম। স্কুল খুলে গেছে। ক্লাসের মাস্টারমশাইকে কবিতার খাতাটা দেখালাম। চেয়ারে বসে একটা একটা করে সবকটা কবিতা পড়লেন তিনি। উৎসুক হয়ে আমি তার মুখের দিকে তাকিয়ে। দেখলাম, এক সময় তার বড় বড় সাদা দাত চকচকে হয়ে উঠল, চোখেমুখে খুশির আলো বিচ্ছুরিত হল। খাতাটা বন্ধ করে কাছে ডেকে আমার পিঠে মৃদু চাপড় দিলেন। "লিখে যা, তুই পারবি, ক্লাসের সবাইকে শুনিয়ে বড় গলায় তিনি বললেন, “তোর হবে” । দেখলাম, আমি ছাড়া আর একটি ছেলেও কবিতা লিখে আনেনি, মাস্টারমশায়ের হাতে কবিতার খাতা তুলে দেয়নি। চোখ বড় করে সতীর্থরা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। গর্বে আমার বুক উচু হয়ে উঠল। এই হল সাহিত্য-জগতে আমার প্রথম প্রবেশের কাহিনী। আমার ছোট মহলে আমি “কবি” হয়ে গেলাম।
ঠিক তার কদিন আগের একটি ঘটনা। শরতের মহাঅষ্টমীর জ্যোৎস্না টলটল করছে। বড়মামার সঙ্গে ঠাকুর দেখে আমরা ফিরছি। রাস্তার দুদিকে ধানক্ষেত। অল্প বাতাসে ধান গাছে দোল লাগছে। ধানে দুধ এসে গেছে। কদিন পরে ধান পাকবে। এমন সময় ক্ষেতের দিকে চোখ রেখে হাটতে হাটতে বড়মামা বললেন, পাকা ধানের গন্ধে রবিঠাকুর পাগল হয়ে কবিতা লিখতে বসে যান। খচ করে কথাটা এসে আমার মগজে বিঁধল । অ্যাঁ, রবিঠাকুর, কোন রবিঠাকুর, ঐ যে আমাদের বাংলা সাহিত্য-পাঠের “নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে-. . . কবিতাটা লিখেছেন! তাই তো, ধানের গন্ধে তিনি পাগল হন ! অদ্ভুত লাগল শুনে। সেদিন কালিদাস রায়, কুমুদ মল্লিক, কামিনী রায় থেকে শুরু করে সব কবিকেই সমান চোখে দেখতাম। কিন্তু বড় মামার কথা শুনে মনে হল রবিঠাকুর একজন বিশেষ জাতের কবি, অন্য কবিদের চেয়ে তিনি আলাদা। ধানের গন্ধ তাকে উন্মনা করে, অস্থির করে । আগেই বলেছি, শৈশব থেকে আমার ঘ্রাণেন্দ্ৰিয় অত্যন্ত সজাগ প্রখর । তাই সারাক্ষণ বাড়মামার কথাটা চিন্তা করলাম, আর ভিতরে ভিতরে উত্তেজিত হতে লাগলাম। আমিও তো ধানের গন্ধ পাই, ঘাসের গন্ধ পাই। কেবল কি ধান ঘাস। ফুলের গন্ধ, পাখির পোকা-মাকড়ের গায়ের গন্ধ, খড়কুটাে কাঁকড়ার মাটি মুলো শসা, এমন কি ঘরের কোণার মাকড়সার জালের গন্ধ অহরহ আমার নাকে লাগে, আমি তো পাগল হয়ে রবিঠাকুরের মতন কবিতা লিখতে বসে যাই না । 
সেদিন আফসোস করেছি। কিন্তু পরবর্তী জীবনে এই সব গন্ধের স্মৃতি আমাকে অনেক গল্পের অনেক উপন্যাসের চরিত্র আঁকতে সাহায্য করেছে। 
আমাদের বাসার কাছেই ভুবন পন্ডিতের বাসা। একটা প্ৰকান্ড বাতাবি লেবু গাছ পন্ডিতের রান্নাঘরের পিছনে। পন্ডিতের দু’ মেয়ে বড়বুড়ি ও যমুনা। বাতাবি লেবুর লোভে প্রায়ই আমরা ওদের বাসায় ছুটে যেতাম। এবং যখনই যেতাম, আমি যেন দু'বোনের গায়ে একটা গন্ধ পেতাম। কেমন গন্ধ ? বাদলা দিনে মাটির খোলায় কাঁঠালবিচি ভাজলে যেমন গন্ধ বেরোয়। বস্তুত বড়বুড়িরা সারাক্ষণ যে কাঁঠালবিচি ভাজত বা কটকট করে কাঁঠালবিচি চিবোত তা নয়। কেবল গ্রীষ্ম বর্ষাই না, মাঘের কড়া শীতেও দু'বোনের গায়ে আমি ওই গন্ধ পেতাম। কৈশোরের সেই গন্ধের স্মৃতি চল্লিশ বছর বয়সে আমাকে দিয়ে ‘বুটকি ছুটকি’ গল্প লিখিয়েছিল। 
বলেছি আমাদের বাসার কাছেই কোট-কাছারি। কাছারির কাছেই একটা কাঁঠালগাছের নিচে মিষ্টির দোকান। দোকানের পিছন দিকটায় হালুইকরের এক ফোঁটা বাসা। ছোট পিসির সঙ্গে রোজ একবার করে হালুইকরের বউয়ের কাছে যেতাম। ছোট পিসির সঙ্গে হালুইকরের বউয়ের খুব ভাব ছিল। মাটিতে দাগ কেটে তেঁতুলবীচি দিয়ে আমরা ষোলঘুঁটি খেলতাম। ছোট বাসা, ছোট স্যাঁতস্যাঁতে উঠোন। শ্যাওলা ধরে কেমন সবুজ সবুজ দেখাত। উঠোনের পাশেই গুড়িপানা ভরতি ডোবা । সেখানে সারাহ্মণ হাসের প্যাকপ্যাক শুনতাম। কিন্তু হালুইকরের গিন্নী ছিল ভয়ানক সুন্দরী। জোছনা ছ্যাকা গায়ের রঙ। টান টানা চোখ। ইয়াসের গায়ের গন্ধ থানা-ডোবার গন্ধ স্যাঁতস্যাঁতে উঠোন আর ওদিকে হালুইকরের কড়াই থেকে উঠে আসা খাঁটি ভয়সা-ঘিয়ে লুচি পান্তুয়া ভাজার গন্ধের স্মৃতি দীর্ঘকাল আমার নাকে লেগেছিল। সেইসব গন্ধের সঙ্গে হালুইকরের যুবতী স্ত্রীর অপরূপ রঙ, ছিমছাম কাঠামো ও অনিন্দ্যসুন্দর চোখদুটির স্মৃতি পরে একদিন আমাকে দিয়ে ‘গিরগিটি’ গল্প লিখিয়েছিল। কিনা কে জানে। 
তেমনি শিশুকালে নিত্য যার সঙ্গে প্ৰত্যুষে বেড়াতে বেরোতাম, সেই আমার দীর্ঘায়ু লোভী ঠাকুর্দার গায়ের পাকা আমের গন্ধের মতন নিবিড় মদির গন্ধ ও হেলিডির বাংলোর গোলাপের টাটকা গন্ধ মিলেমিশে গিয়ে আমার কলম থেকে একদিন “বনের রাজা” বেরিয়ে এল। 
আমার ‘সমুদ্র’ গল্প পড়ে পাঠক বন্ধুরা, আমি যতটা তাদের মুখে শুনেছি, কলকাতায় বসে তারা পুরীর সমুদ্রতটের, রৌদ্রতপ্ত বালু, বালুর ওপর ছড়ান ঝিনুক-শামুক ও ইতস্তত সঞ্চরমান ক্ষুদে কাকড়া, নুন মেশানো বাতাস ও মাছ ভাজার গন্ধ পেয়েছেন। 
আবার আমি আমার কৈশোরে ফিরে যাই। কবিতা দিয়ে সাহিত্য আরম্ভ করেছিলাম। কিন্তু কেবল কবিতা লিখে কবিতা পড়ে ক্ষুধা মিটছিল না। গদ্য চাই। গদ্য খুজছি। বাড়ির কারো সাহিত্য পড়ার নেশা খুব একটা ছিল না। কাজেই তেমন বইটই বাড়িতে বড় একটা দেখতাম না। একদিন কিন্তু বাবার টেবিলে আইনের বইয়ের পাশে গ্রন্থাবলীর সাইজের মলাট-ছেড়া তিনখানা উপন্যাস পেয়ে গেলাম। রাজপুত জীবনসন্ধ্যা, মাধবীকঙ্কণ, মহারাষ্ট্র জীবনপ্রভাত। ব্যস, যেন অমূল্যরত্ন হাতে এসে গেল। রুদ্ধশ্বাসে তিনখণ্ড বই পড়ে শেষ করলাম।
শেষ করবার পর আবার রসিয়ে এক একটা বই পড়ি। এগারো থেকে বাৱো আমার বয়স তখন। হয়তো সব কথা বুঝতাম না। কিন্তু বাংলা ভাষা তো। পড়ে যেতে অসুবিধে ছিল কি। তার আগে মােটে দুতিনখানা শিশুগ্ৰন্থ পড়ে শেষ করেছিলাম। চারু-হারু, ঠাকুরমার ঝুলি, ঠাকুর্দার ঝুলি। তার পরেই রমেশচন্দ্রের গ্রন্থাবলী দিয়ে সাবালক সাহিত্য পাঠ শুরু। চরিত্রগুলি চোখের সামনে নড়াচড়া করতে লাগল । 
আমার একটা দোষ। অন্তত ছেলেবেলায় এটা খুব ছিল। ভাবতাম। আমি যেন উপন্যাসের একজন নায়ক, এমনকি কোনো কোনো সময় নিজেকে নায়িকা ভাবতেও সুখ হত। ভাবতাম নায়ক নায়িকাদের মতন আমিও আমার জীবনটা কাটাব। মাধবীকঙ্কণ পড়ে বালুবেলায় একটি বালিকাকে আমি মনে মনে খুজেছি এবং কল্পনায় আমি তার হাতে মাধবীকঙ্কণ পরিয়ে দিয়েছি। মহারাষ্ট্র জীবনপ্ৰভাত পড়ে নিজেকে মনে হত আমিও সেই দুঃসাহসী মারাঠী বীর। মাওয়ালী সৈন্যদের নিয়ে আমিও যেন পাহাড়ে পাহাড়ে একটার পর একটা দুর্গ জয় করে চলেছি। বলতে কি সেদিন থেকে আমি খুব পাহাড়ের স্বপ্ন-দেখতাম। খেলার সঙ্গীদের নিয়ে যুদ্ধ কেল্লা-দখল ইত্যাদি খেলা খেলতে আরম্ভ করে দিলাম। কেবল কি খেলা, ইট মাটি পাথর একত্র করে তার ওপর ঘাসের চাপড়া বসিয়ে ছোট বড় পাহাড় তৈরী করতাম। পাহাড়ে ঝরণা থাকত, গুহা থাকত, গিরিবত্মা থাকত। উহু ইট মাটি পাথর দিয়ে পাহাড় বানিয়ে তৃপ্তি পাচ্ছিলাম না। রঙ তুলি ও কাগজ নিয়ে ছবি আঁকতে বসে গেলাম। সবই ল্যান্ডস্কেপ। পাহাড় পৰ্বত অরণ্য প্ৰান্তর। ব্যস, এবার ছবি আঁকাটাই নেশার মধ্যে দাড়িয়ে গেল। আমার ছবি আঁকার সাখী ছিল ছোটমামা। পরে তিনি গভর্নমেণ্ট আর্টস স্কুল থেকে পাস করেন এবং ছবি একে যথেষ্ট নাম করেন। 
ছবি আঁকা, পাথর মাটি দিয়ে পাহাড় বানান আর সাহিত্য পড়া। আমি আমার কাজ পেয়ে গেলাম। আর আমি গোমড়ামুখ করে রান্নাঘরের পিছনে পুকুর ঘাটের সেই খেজুর ও শেওড়া ঝোপের পিছনে সন্ধ্যার রক্তাক্ত আকাশের দিকে চোখ রেখে একা একা চুপ করে দাড়িয়ে থাকি না। অবশ্য তখন একটু বড়ও হয়েছি। পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র । মাধবীকঙ্কণ, মহারাষ্ট্র জীবনপ্ৰভাত শেষ হয়ে গেল। হাতে এখন জলধর সেনের বিশুদাদা, পাগল, অভয়া । যেন আমিও পাগল হয়ে গেলাম। আত্মহারা হয়ে তিনখানা বই শেষ করলাম। সঙ্গে সঙ্গে আর একখানা উপন্যাস হাতে এসে পড়ল। যতীন্দ্রমোহন সিংহের ধ্রুবতারা পড়ে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। না, ইতিহাসের কোনো চরিত্র নয়। এ যে আমার দেখা মানুষ। উপীন যেন আমার বড় মামা। চারুলতাকে যেন আমাদের পাড়ার কোনো বাড়িতে দেখেছি। বনলতাকে দেখেছি। আর উপীনদের সেই দেশের গায়ের বৃহৎ একান্নবতি সংসার। এ আমার নিত্য দেখা ছবি। ভীষন ভালো লাগল বইটা । বার তিনেক পড়েছিলাম মনে আছে। বলেছি, উপন্যাসের নায়ক, নায়িকাদের সঙ্গে নিজেকে মিশিয়ে ফেলতে আমার প্রাণ ছটফট করত। মনে মনে নিজেকে উপীন ভাবতাম। আর উপীনের মতন আমার জীবনের ধ্রুবতারা কোনো চারুলতাকে খুঁজতাম। প্রেম ও প্রেমের ব্যর্থতার চিত্র তখন থেকে আমার মনে আঁকা হয়ে গেল । 
ইতিমধ্যে কোর্টের কাজে বাবার এক উকিল বন্ধু আমাদের বাসায় এলেন। হঠাৎ তিনি আবিষ্কার করলেন পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র, বয়স বারো অতিক্রম করেনি, ধনু জলধর সেনের বই পড়ছে, ধ্রুবতারার মতন উপন্যাস পড়ছে। দেখে তিনি চমকে উঠলেন। বাবাকে সাবধান করে দিলেন । এত অল্প বয়সের ছেলেকে এ সব উপন্যাস টুপন্যাস পড়তে দেবে না। উপদেশ দেবার পর কাজ সেরে তিনি চলে গেলেন। অবাক হলাম। বাবাকে দেখে । তিনি কিন্তু একবারও আমাকে বললেন না যে এখনও তোমার উপন্যাস পড়ায় সময় হয়নি। আমি কিন্তু সেটাই আশা করেছিলাম। কিন্তু এই সম্পর্কে আমাকে কিছুই বললেন না তিনি। আমার সাহিত্য পড়া ছবি আঁকা বা কবিতা লেখার ব্যাপারে বাবা ভীষণ উদার ছিলেন। আমার সবকিছু তিনি পছন্দ করতেন। একটু বড় হয়েও লক্ষ্য করেছি। 
সপ্তম শ্রেণীতে উঠে আমি প্রথম রবীন্দ্রনাথের গদ্যের স্বাদ পাই। স্কুলে আবৃত্তি করে একখণ্ড গল্পগুচ্ছ উপহার পেয়েছিলাম। প্ৰায় রাতারাতি গল্পগুলি পড়ে শেষ করলাম। তারপর খুজতে লাগলাম গল্পগুচ্ছের বাকি খণ্ডগুলি কোথায় পাওয়া যায়। ছোট শহর, পাবলিক লাইব্রেরী বলতে সেদিন প্রায় কিছুই ছিল না। স্কুলের লাইব্রেরীতেও রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছের পুরো সেট ছিল না। কাজেই বাকি খণ্ডগুলি যোগাড় করে পড়ে শেষ করতে প্ৰায় বছর দু'তিন আমাকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল। 
যাই হোক, একটা মজার ব্যাপার, সেই একখণ্ড গল্পগুচ্ছ পড়ার পর উপন্যাস পড়ার ঝোঁকটা আমার কমে গেল। ছবি আঁকা তখনও সমান বেগে চলছে। কিন্তু একখণ্ড গল্পগুচ্ছের গল্পগুলি ক্ৰমাগত মাথায় ঘুরতে লাগল। এবং একদিন হুট করে ছবি আঁকা ছেড়ে গল্প লিখতে বসে গেলাম। অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র আমি তখন। চৌদ্দ পার হয়ে পনেরোয় পা দেবদেব করছি। বয়ঃসন্ধির সেই ভয়ংকর সময়ে পদ্য ছেড়ে আমি গদ্য লেখায় মন দিলাম। এবং সেটা ছোটগল্প । 
ছোটগল্প লিখতে আরম্ভ করে কিন্তু আমি আর ছবি আঁকার দিকে তেমন মন দিতে পারিনি। ইচ্ছেও করত না । মনে হত গল্প লেখাটাই জরুরী। যখন নবম দশম শ্রেণীর ছাত্র তখন থেকে এই সমিতি সেই ক্লাব অমুক সঙ্ঘ বা এ-পাড়া ও-পাড়ার হাতে লেখা কাগজগুলিতে আমি গল্প দিতে আরম্ভ করি। অর্থাৎ তখন থেকে আমার ছোট গল্পের রীতিমত 'ডিমাণ্ড” শুরু হয়ে গেছে। সেদিন মফঃস্বল শহরগুলিতে হাতে লিখে কাগজ বার করার একটা হিড়িক পড়ে গিয়েছিল। 
আমার মত করে আমি নিজেও হাতে লিখে একটা কাগজ বার করেছিলাম। একটি সংখ্যাই বার করেছিলাম। অবশ্য তাতে অন্য কারো রচনা ছিল না। আমার লেখা কবিতা, আমার আঁকা ছবি আর আমার লেখা গল্প-ব্যাস ! কাগজটা যখন হাতে নিতাম কী যে হাসি পেত না ! 
এভাবে বন্ধুমহলে, ছাত্রমহলে, আমাদের ছোট শহর এবং মামাবাড়ি কুমিল্লা শহরে আস্তে আস্তে আমি গল্পলেখক হিসাবে পরিচিত হতে লাগলাম। 
স্কুলের পড়া শেষ করে কলেজে ঢুকে প্রথম বছরেই মোঁপাসার একটা ছোট গল্প অনুবাদ করে ঢাকার সাপ্তাহিক ‘বাংলার বাণী’ পত্রিকায় পাঠিয়ে দিই। গল্পটা ছাপা হল। ছাপার অক্ষরে এই প্ৰথম নিজের লেখা দেখলাম। যদিও অনুবাদ কর্ম। তার ঠিক একমাস পর ঐ কাগজে একটা গল্প লিখে পাঠাই। সম্পাদক মশায় সঙ্গে সঙ্গে গল্পটা ছেপে দেন। ছাপার অক্ষরে এই আমার প্রথম মৌলিক রচনা। গল্পের নামটা আজ মনে নেই। তবে ঐ সময় আমাদের কলেজ ম্যাগাজিনে একটা গল্প লিখি । গল্পের নাম "অন্তরালে’-আমাদের বাংলার অধ্যাপক গল্পটার খুব প্ৰশংসা করেছিলেন মনে আছে। তারপর থেকে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়, যেমন ঢাকার সাপ্তাহিক ‘বাংলার বাণী’, ‘সোনার বাংলা’, কলকাতার 'নবশক্তি', সাপ্তাহিক ‘সংবাদ’ ইত্যাদি কাগজে একের পর এক আমার গল্প ছাপা হতে থাকে। তখন এক দুপুরে একটা গল্প লিখে ফেলতাম। লেখার জন্য সেদিন কোনো কাগজ থেকে পয়সা পেতাম না । 
হুঁ”, এক দুপুরে, কি একটা সকালে বসে এক একটা গল্প লিখে শেষ করেছি। পরবর্তী জীবনে একটা গল্প লিখতে আমি দু মাসের বেশি সময় নিয়েছি। ইচ্ছে করে। কাটাকুটি মাজাঘষা অদলবদল করা যেন আর শেষ হত না। এখনও প্ৰায় সেই অবস্থা। আমার পাণ্ডুলিপির চেহারা দেখে অনেক সম্পাদক ভয় পান । 
তখন আমি কলেজের ৩য় বার্ষিক শ্রেণীর ছাত্র। ‘সন্ত্রাসবাদী’ সন্দেহে পুলিস আমাকে গ্রেপ্তার করে। চার মাস জেলে আটক রাখার পর আমাকে স্বগৃহে অন্তরীণ করা হয়। কথাটা বললাম এই জন্য সেদিন সরকারী নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে আমার ওপর আর একটা কড়া নিষেধাজ্ঞা বলবৎ ছিল। পত্রপত্রিকায় লেখালেখি 'চলবে না। মুশকিলে পড়া গেল। মাথায় রাশি রাশি গল্প জমা হচ্ছে যে। বাধ্য হয়ে "জ্যোৎস্না রায়” ছদ্মনাম নিয়ে বিভিন্ন সাপ্তাহিক পত্রিকায় অনেকগুলি “গল্প লিখেছিলাম। কাটিং রাখিনি। বা যেন রেখেছিলাম। দেশে আমার বইয়ের আলমারিতে ছিল। দেশভাগের পর সেসব আর আনা হয়নি। এভাবে আমার অনেক লেখা হারিয়ে গেছে। এবং আমার আঁকা অনেক ছবি । 
একদিন আমার ওপর থেকে সরকারী নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হল। আর ঠিক প্ৰায় ঐ সময় সাপ্তাহিক 'দেশ' পত্রিকা বেরোতে আরম্ভ করে। যতটা মনে পড়ে “দেশ’ পত্রিকার তৃতীয় বছরেই (১৯৩৬) “রাইচরণের বাবরি’ নামে আমার একটা গল্প প্ৰকাশিত হয়। এর কিছুকাল পরেই চাকরিবাকরির আশায় কলকাতা চলে আসি। অর্ডিনারী গ্রাজুয়েট । চাকরি দেয় কে! আজকের মতন সেদিনও (১৯৩৭-৩৮) চাকরির বাজার ভয়ানক টাইট ছিল। তবে এ-ও সত্য আদাজল খেয়ে অফিসের দরজায় ঢু মেরে চাকরি খোঁজার মেজাজ আমার ছিল না। কোনোদিনই ছিল না। চোখ ছিল সাহিত্যের দিকে। মন ছিল কি করে একটা ভাল গল্প লিখব। একটা পাইস-হোটেলে থাকি খাই। গোটা দুই টুইশনি করি। আর সারা দুপুর একা একা নিজের সীটে বসে গল্প লিখি। অদ্ভুত ভাল লাগত দিনগুলি। সিনেমা দেখি না খেলা দেখি না। হোটেলে থাকা খাওয়ার জন্য মাসে বাৱো তেরো টাকা দিতে হত । চা জলখাবার ধোপা নাপিত পান বিড়ি ট্রাম বাস ও টুকিটাকি খরচ নিয়ে আরও দশ বারো টাকা। ব্যস, ছেলে পড়িয়ে ঐ কুড়ি বাইশ টাকা রোজগার করে ভাবতাম যথেষ্ট, আর রোজগারের দরকার কি। আমাকে “লেখক’ হতে হবে। বড় সাহিত্যিক হব । খ্যাতিমান হব । রাতদিন কেবল এই স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন দেখার ঠেলা এখন সামলাতে হচ্ছে। সত্যি, 'লেখক' হবার নেশা, আজ চিন্তা করি, সেদিন কি ছেলেমানুষী না পেয়ে বসেছিল।
 হুঁ, হোটেলের তক্তপোশের বিছানায় বসে সারা দুপুর গল্প লিখি। তখন প্রেমেন্দ্ৰ মিত্ৰ সাপ্তাহিক 'নবশক্তি’ কাগজের সম্পাদক। আমার অনেকগুলি গল্প” তিনি ছেপেছেন। একবার 'নবশক্তির” পুজো-সংখ্যায় আমার একটা গল্প ছেপে দিলেন। বুকের পাটা বেড়ে গেল। তার মানে লেখক হবার পাগলামি আর একটু বেশি করে পেয়ে বসল। ঐ সময়ে ‘পূর্বাশা’ ও ‘অগ্রগতি' বেরোচ্ছে। দুটাে কাগজই দারুণ ভাল লাগত। একটা সাপ্তাহিক একটা মাসিক। কাগজ দুটো হাতে নিলেই একটা নতুন গন্ধ বেরোত। আষাঢ়ের শেষে নতুন ফোঁটা কদমফুল হাতে নিলে যেমন নাকে গন্ধ লাগে, পড়তে আরম্ভ করলে নতুন স্বাদ পেতাম। কেনার পয়সা সব সময় থাকত না। কলেজ স্ট্রীটের মোড়ে পাতিরামের স্টলে দাড়িয়ে কতদিন পড়ে ফেলেছি। তখন ঐ পাড়াতেই থাকতাম কিনা। কদিন পরেই ভ্যানসিটার্ট রো থেকে ‘দৈনিক যুগান্তর” বেরোতে আরম্ভ করে। একটা সাব এডিটরের চাকরি জুটে গেল। অবশ্য খুব অল্প সময় চাকরি করার সুযোগ পেয়েছিলাম। কিন্তু সময়টার উল্লেখ করছি এই জন্য, এই ক’মাসের মধ্যে আমার তিনটি উল্লেখযোগ্য গল্প বেরোয় তিনটি কাগজে। পূর্বাশায় "সুধী, ত্রৈমাসিক পরিচয়ে ‘নদী ও নারী’ এবং দেশ পত্রিকায় "অনাবৃষ্টি” নামে গল্প। তারপর থেকে পূর্বাশা ও দেশ-এ আমি নিয়মিত গল্প লিখতে থাকি। তখন শ্ৰীসাগরময় ঘোষ 'দেশ' পত্রিকায় সহ-সম্পাদক হিসাবে যোগ দেন। কদিন পরই হুমায়ুন কবীর সম্পাদিত ‘চতুরঙ্গে” আমার একটি গল্প ছাপা হল। গল্পের নাম "শালিক কি চড়ুই’। 
পূর্বাশা, দেশ, চতুরঙ্গ, ভারতবর্ষ, মাতৃভূমি, পরিচয় ইত্যাদি কাগজে একের পর এক আমার ‘পালিশ', 'মঙ্গলগ্ৰহ', "কমরেড, বধিরা’, ‘শালিশ কি চড়ুই’, ‘শশাঙ্ক মল্লিকের নতুন বাড়ি’, ‘বনানীর প্রেম’, ‘নদী ও নারী’ গল্প বেরিয়ে গেল। তখনও আমি উপন্যাসে হাত দিইনি। আমার সমসাময়িক লেখক বন্ধুরা, প্ৰত্যেকে তখন উপন্যাস লিখতে শুরু করেছেন বা কেউ কেউ একাধিক উপন্যাস লিখেও শেষ করেছেন। আমি কেন উপন্যাসে হাত দিই না। এই নিয়ে দু একটি বন্ধু প্রায়ই অভিযোগ করছিলেন। তঁদের বক্তব্য ছিল এই ; গল্প লিখে তোমার হাত পেকেছে, ভাষা পরিচ্ছন্ন, চরিত্র-চিত্রণ ও মন্দ হচ্ছে না। এখন উপন্যাস লিখতে আটকাচ্ছে কোথায় । 
আমি মনে মনে হাসতাম। বন্ধুদের বোঝাতে পারতাম না বা মুখ ফুটে বলতাম না। আমি উপন্যাসের দিকে আস্তে আস্তে এগোচ্ছি। আমি মনে করতাম গল্পগুলি হল এক এক খণ্ড ইট। আর উপন্যাস হল একটা প্ৰকাণ্ড ইমারত। সুতরাং ইটের পর ইট গাথার মতন আমি আমার গল্পের চরিত্রগুলি সাজিয়ে দেব। সেই সঙ্গে সিচুয়েশনের দরজা জানালা জুড়ে দেব, ঘটনার সিড়ি থাকবে বারান্দা থাকবে। তার ওপর স্টাইলের পলেস্তারা পড়বে এবং তারপর ভাষার রংI 
জানিনা বন্ধুরা সেদিন কথাটা শুনলে হাসতেন কিনা। আজ আমি হাসি। কারণ আমার মতন ইট না পুড়িয়েও এই পৰ্যন্ত অনেকে বড় এবং সার্থক উপন্যাস সৃষ্টি করেছেন। রোদে জলে ঘেমে নেয়ে একশা হয়ে ছোট-গল্প লেখার জন্য তাদের হাত পাকাতে হয়নি। একবারেই তারা মনোলিথিক স্ট্রাকচারের মতন এক একটি সুবৃহৎ উপন্যাস লিখে ফেলেছেন। 
কাজেই বুড়ো বয়সে এখন বুঝতে শিখেছি ছোট-গল্প এক জিনিস, উপন্যাস আলাদা শিল্প। উপন্যাস লিখতে হলে ছোট-গল্প লিখে হাত পাকবার দরকার পড়ে না। বরং বেশি ছোট-গল্প লিখতে অভ্যন্ত ' হয়ে গেলে উপন্যাসের মধ্যে ছোট-গল্পের মেজাজ এসে যাবার ভয় থাকে। আমার কিছু কিছু উপন্যাস তাই হয়ে গেছে। এই জন্য অবশ্য আমি অনুতপ্ত নই। কারণ এই এক ধরনের উপন্যাস না হোক, উপন্যাসিকা তো বটে। 
একদিন “দেশ’ পত্রিকার জন্য শ্ৰীসাগরময় ঘোষ গল্প চেয়ে চিঠি লিখে পাঠালেন এবং সেই সঙ্গে এক লাইন যোগ করে দিলেন-এবার উপন্যাসে হাত দাও।
আর দ্বিধা করলাম না । কাগজ-কলম নিয়ে কোমর বেঁধে উপন্যাস লিখতে বসে গেলাম। দু-চার মাসের পরিশ্রমের পর মোটামুটি একটা লেখা দাড়িয়ে গেল। দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিক সেটা ছাপা হয়। এই হল আমার প্রথম উপন্যাস। নাম ‘সূর্যমুখী”।
 ‘সূর্যমুখী” লিখে নিন্দা খ্যাতি দুই জুটেছিল আমার । খ্যাতির চেয়ে নিন্দাই বেশি। “সূর্যমুখী’ পড়ে দু-চারজন পাবলিশার আমার পরবর্তী গ্ৰন্থ প্রকাশের জন্য উৎসাহী হয়ে আমাকে চিঠি দেন। তঁদের সঙ্গে দেখা করতে তারা বলেন, মশাই, আপনার ‘সুর্যমুখী’ পড়ে আমরা মুগ্ধ হয়েছি- তবে আমাদের যে বইখানা দেবেন, সেটি যেন ‘সূৰ্যমুখী'র মতন না হয়। কথাটা শুনে কেমন বোকা হয়ে গিয়েছিলাম। ই করে তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমার অসহায় অবস্থা বুঝতে পেরে তারা দাত ছড়িয়ে হাসলেন, বললেন, আপনার ‘স্বৰ্যমুখী’র ভাষা বর্ণনা চরিত্র চিত্রণের তুলনা হয় না। খুবই সরস লেখা। তবে আপনার ideology “আমরা মেনে নিতে পারছি না। Ideology বলতে তারা কি বুঝেছিলেন এবং ‘সুৰ্যমুখী’তে আমি কোন আদর্শ দাড় করাতে চেয়েছিলাম, আজও আমার কাছে তা অস্পষ্ট থেকে গেছে। একটা ছোট মফঃস্বল শহর নিয়ে গল্প। সেখানে কিছু ভাল লোক ছিল, কিছু মন্দ লোক ছিল। তাদের লোভ হিংসা ছিল, কামনা বাসনা ছিল, যথেষ্ট স্নেহ মমতাও ছিল কারো কারো মধ্যে । এ-সব নিয়ে তারা বাঁচতে চেয়েছিল । সাধারণভাবে মানুষ যেভাবে বাঁচতে চায় । কোনো বড় আকাঙ্খা সাংঘাতিক স্বপ্ন তাদের চোখের সামনে ছিল না। এবং তাদের নিয়তি শেষ পৰ্যন্ত তাদের কোথায় টেনে নিয়ে গেল এই আমি শুধু দেখাতে চেয়েছি। আদর্শ প্রচার করার জন্য আমি ঐ উপন্যাস লিখিনি । 
‘সূর্যমুখী’র পর ‘মীরার দুপুৱা’ আমার দ্বিতীয় উপন্যাস। তৃতীয় উপন্যাস ‘বারো ঘর এক উঠোন” । 
পাঠকদের মতামত শুনে যতটা ধারণা হয় ‘বারো ঘর এক উঠোন’ আমার সবচেয়ে জনপ্রিয় বহুপঠিত উপন্যাস। হতে পারে। অনেক মুখ অনেক চরিত্র অনেক অন্ধকার বেদনা ও হাহাকার নিয়ে এই বই। এটিও "দেশ’ পত্রিকায় ধারাবাহিক প্ৰকাশিত হয়। যতটা মনে পড়ে ‘ন দশ মাস লেগেছিল 'দেশ’-এর লেখা শেষ করতে । কিন্তু শেষ করার পর আমার মনে হয়েছিল। উপন্যাসের পরিণতি যেন ঠিক হল না। অসম্পূর্ণ থেকে গেছে। আরও কিছু কথা বলার বাকি আছে। তাই গ্ৰন্থাকারে প্রকাশ করার পূর্বে আরও অনেকটা লিখতে হয়েছিল আমাকে ৷ প্ৰায় তিন ফর্ম । 
সেদিন ‘বারো ঘর এক উঠোন' নিয়েও আমাকে নানা মহল থেকে কম আক্ৰমণ করা হয় নি। বিদগ্ধ পাঠকদের মধ্যেও কেউ কেউ এই উপন্যাসের নিন্দায় সোচ্চার হয়ে উঠেছিলেন। তঁদের বক্তব্য অনেকটা এই রকম ছিল : এই সুবৃহৎ উপন্যাস লিখতে জ্যোতিরিন্দ্ৰকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে সন্দেহ নেই। এবং এই গ্রন্থে নিঃসন্দেহে তিনি যথেষ্ট শিল্প-নৈপুণ্যের পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু তার সব শ্রম সব নৈপুণ্য ব্যর্থতায় পৰ্যবসিত হয়েছে। প্ৰতিভার এমন মর্মান্তিক অপচয় সচরাচর দেখা যায় না। তিনি শুধু অন্ধকারই দেখেছেন। নিজে যেমন আলো দেখতে পান নি, তেমনি তাঁর এতগুলি চরিত্রের মধ্যে একটিকেও তিনি আলোর পথে উত্তরণের পথে নিয়ে যেতে সক্ষম হলেন না। এর চেয়ে দুঃখের আর কি হতে পারে । 
কথাটা ঠিক। আমিও আমার জন্য দুঃখ করেছি। পাঁচশ পাতায় একখানা ঢাউস উপন্যাস লিখেও পাঠকদেৱ মনোরঞ্জন করতে পাৱলাম না।
অর্থাৎ এমন বই তাদের হাতে আমি তুলে দিতে পারি না, যা পড়ে তারা আনন্দ পেতেন তাদের মনে সুখের জন্ম দিত অথবা দুঃখের বিলাসে মন ভরে উঠতো।
বারো ঘর লেখার আগে কিছুদিনের জন্য আমাকে এমন একটা বাড়িতে বাস করতে হয়েছিল। তা বলে সেখানে কে গুপ্তও ছিল না বা পাচু ভাদুড়ী, রমেশ, বিধু মাস্টার কি রুচি শিবনাথের মতন শিক্ষিত দম্পতিকেও আমি দেখিনি। কেবল একটা উঠোন ঘিরে বারোটা পরিবারকেই দেখেছিলাম। তার বেশি কিছু নয়। তবে আমার তখন মনে হল উপন্যাসের কাঠামো হিসাবে বহু পরিবারবিশিষ্ট এমন একটা আস্তানা মন্দ হয় না। হ্যাঁ, শুধু কাঠামোটাই কাজে লাগিয়েছিলাম। তারপর মগজ হাতড়ে হাতডে সেখান থেকে কে গুপ্ত, শিবনাথ, রুচি, রমেশ, বেবি, অমল চাকলাদার, কমলা নার্স, পারিজাত ও শ্ৰীতি বীথিকে উদ্ধার করেছিলাম। তার অর্থ কি। আজ থেকে কুড়ি বাইশ বছর আগে তখন আমার বয়স চল্লিশ বিয়ালিশ, তখনই আমি বারো ঘর লিখি, আর আমার ঐ স্বল্পপরিসর জীবনেই সমাজের কোনো না কোনো স্তরে, কোনো না কোনো সময় সেটা আমার মফঃস্বলের জীবনেও হতে পারে, বা কলকাতার মেছুয়াবাজারের বাড়ি, দর্জিপাড়ার বাসা কি শ্যামবাজারের আস্তানায় থাকার সময় আমার আশেপাশে এমন সব চরিত্র ঘোরাফেরা করতে আমি দেখেছিলাম। বারো ঘরের মতন একটা বাড়ি পেয়ে চরিত্রগুলিকে একত্র করার সুবিধা হল। এবং এও সত্য কোনো কোনাে চরিত্র ও ঘটনা একেবারেই আমার কল্পনাপ্রসুত। পূর্বাশার “তারিণীর বাড়ি বদল’ বলে আমার একটা গল্প বেরোয় । আমি চিন্তা করে দেখেছি "বারো ঘর এক উঠোন' উপন্যাসের বীজ কয়েক বছর আগে লেখা ঐ গল্পের মধ্যে লুকিয়ে ছিল। 
আমি স্বীকার করছি। আলো দেখাবার জন্য উত্তরণ দেখাবার জন্য আমি এ বই লিখিনি। কেননা আমার দেখা ও জানা চরিত্রগুলির মধ্যে এমন একটি মানুষও ছিল না, যে এদের মধ্যে উপস্থিত থেকে মহৎ জীবনাদর্শের বাণী শোনাতে পারত। বিপন্ন বিপৰ্যন্ত অবক্ষয়িত সমাজের মানুষগুলি শুধু বেঁচে থাকার জন্য, কোনোরকমে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য কতটা অন্ধকারে, কতটা নিচে নেমে যেতে পারে আমি তাই দেখিয়েছি। আলো বা উত্তরণের পথে এদের নিয়ে যেতে হলে আমাকে আর এক ভল্যুম বারো ঘর লিখতে হত। কেননা আমি যে-সব চরিত্র দেখেছিলাম, তারা জীবিকার অন্বেষণ, খাওয়া ঘুম মৈথুন সন্তান উৎপাদন ও পরস্ত্রীর দিকে কামার্তা চোখে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছু করত না, এর অতিরিক্ত কোনোদিনই তারা কিছু করে না। 
তবে এর মধ্যে ব্যতিক্রম যে না ছিল এমন নয়। যেমন রুচি ও শিবনাথ । তারা নিজেদের অন্ধকারে তলিয়ে যেতে দেবে কেন। চিরকালের মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী মানুষদের মতন আলোর দিকে হাত বাড়াবার সুবুদ্ধি ও বিচক্ষণতা তাদের ছিল । তবে এই আলোর সঙ্গে মহৎ জীবনদর্শন বা আধ্যাত্মিকতার কোনোরকম সংস্রব ছিল কি। যেন সুখ সচ্ছলতার উষ্ণতা গায়ে মেখে শীতের সকালের মৌমাছির মতন সৌভাগ্যের রোদে পাখা মেলে দেবার জন্য দুজন নিয়ত উসফুস করছে। 
যাই হোক ‘বারো ঘর এক উঠোন’ লেখার পর সমালোচকদের নিন্দা আক্রমণের যেমন কমতি ছিল না, তেমনি আমার ভাগ্যে প্ৰশংসা বাহবাও অজস্র জুটছিল। পাল্লার কোন দিকটা ভারি ছিল বলা মুশকিল। ওজন করে দেখিনি। দেখার উৎসাহ আমার শিল্পী-জীবনের প্রায় গোড়ার দিকেই বুঝতে শিখেছিলাম যে, নিজের রচনার ভাল মন্দ যাচাই করতে শিল্পী যত বেশি বাইরের দিকে তাকাবেন তত বেশি তাকে ঠকতে হবে। আপনার একটা লেখা বেরোনো মাত্র একটা কাগজ সার্থক রচনা বলে চিৎকার করে আকাশ ফাটাল। এবং প্ৰায় একই সময় দেখলেন, একই শ্রেণীর কাগজে ব্যর্থ রচনা-কিছুই হয়নি ইত্যাদি বলে আপনাকে ধরাশায়ী করে দিল। একই সময় আপনি নরক-বাস ও স্বৰ্গ-বাসের সুখ-যন্ত্রণা ভোগ করলেন। যুগটা বড় বেশি মুখর। অনেক কাগজ অনেক পাঠক অনেক মতবাদের সামনে আপনাকে অহরহ দাড়াতে হচ্ছে। আপনি চোখ বুজে থাকলেও সমালোচনার চোখা তীর সাঁই সাঁই করে ছুটে এসে আপনার চোখের পাতা এফোঁড় ওফোঁড় করে দেবে। একই সময়ে নিন্দা প্ৰশংসার ঝড়ের সামনে আপনাকে দাড়াতে হচ্ছে। আপনার পায়ের চল্লিশ টাকা দামের জুতো দেখে যদি কোনো একটি বন্ধু চব্বিশের উর্দ্ধে উঠতে রাজী না হয়, আপনার সতেরো টাকার গায়ের চাদর দেখে যদি আপনার অতি-ভক্ত কোনো বন্ধু সত্তর টাকা আন্দাজ করতে আরম্ভ করেন তো কী করার আছে। উপায় নেই। 
আপনার উপন্যাস বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ হয়ে রইল, আপনার উপন্যাস অপাঠ্য অপ্রীতিকর, সাহিত্যের অঙ্গনে এই রচনা অনাবশ্যক। পরস্পরবিরোধী এই দুটি মতামতের কোনটা ঔপন্যাসিক গ্ৰহণ করবেন ? একই সঙ্গে নিন্দা ও অস্তুতির সুমেরু কুমেরুর দিকে তিনি পা বাড়াবেন ? যেন একই সময়ে আপনার হাতে দুটো টেলিগ্রাম এসে গেল। আপনার ঘোড়া রেসে ফার্ষ্ট  হয়েছে-আপনার ঘোড়া রওনাই হয়নি। অর্থাৎ একটা বই লিখে একই সময়ে ঔপন্যাসিক হাসলেন ও কাঁদলেন-তাই না ? শিল্পীর জীবনে এ এক অভিশাপ।
আবার পরীক্ষাও। আমি তাই মনে করি। পরীক্ষা হচ্ছে শিল্পী তার নিজের সৃষ্টি-ক্ষমতার ওপর অকাট্য বিশ্বাস রেখে তার পরবর্তী রচনায় হাত দিচ্ছেন কিনা। কারণ তিনি যদি বুঝতে পারেন এই ধরনের কোনো সমালোচনাই সার্থক আলোচনা নয় তো এই সবের ওপর নির্ভর করে আত্মসমালোচনা করার মূঢ়তা আর হতে পারে না। প্রত্যয়ের হাল শক্ত করে ধরে হাজার রকম মতামতের ঢেউয়ের ওপর দিয়ে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া শিল্পীর আর কিছু করার আছে বলে আমি অন্তত মনে করি না । 
আমার "এতাবৎকালীন রচনার’ মধ্যে কোনো উপন্যাসকেই আমি "শ্রেষ্ঠ’ মনে করি না। নিজের রচনার ক্ষেত্রে “শ্রেষ্ঠ’ শব্দটা প্রয়োগ করতে কোথায় যেন আটকায়। মনে হয়, কোনো রচনাই 'নিখুত হল না। ‘সর্বাঙ্গীণ সুন্দর’ হ’ল না-আরও ভাল করে লেখা উচিত ছিল । 
যাই হোক-আমার রচিত ‘প্রেমের চেয়ে বড়’ উপন্যাসখানা আমি মনের মতন করে লিখতে চেষ্টা করেছিলাম। বিষয়বস্তুটি ভাল লেগেছিল। রচনা কতটা সার্থক হয়েছে বলতে পারব না। এখানেও সেই অপরিতৃপ্তির প্রশ্ন। তবে আমার অন্যান্য রচনার তুলনায় এটিকে আমি ‘অপেক্ষাকৃত ভাল” মনে করি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন