বৃহস্পতিবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৬

দীপেন ভট্টাচার্যের ধারাবাহিক উপন্যাস : আদিতার আঁধার

প্রথম অধ্যায় 

"কাল রাতে আমি স্বপ্ন দেখলাম আমার মা আমাকে একটা বড় অলিন্দের মধ্য দিয়ে হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছেন । সেই অলিন্দের দেয়ালে অপসরাদের ছবি খোদাই করা । সেই অপসরারা আমার দিকে তাকিয়ে হাসছিল। মাকে বললাম, ওরা হাসছে । মা বলল, ওদের দিকে নজর দিস না । ওরা তোকে বাঁচতে দেবে না ।" 


এটুকু বলে অদিতা জানালার বাইরে তাকাল। বেগুনী ফুলে ভারাক্রান্ত হয়ে একটা পারুল গাছ বিকেলের অলস রোদকে পাহারা দিচ্ছিল। গাছটা পেরিয়ে রোদের অবশিষ্ট রেশটুকু অদিতার ছড়ানো সাদা চুলকে রাঙিয়ে অদিতাকে যেন আরো বিষণ্ন করে দিল। 


"আমার এবার যাবার সময় হয়েছে, ডাক্তার। আপনি আমাকে ছুটি দিন।" 

ডাক্তার বিনতা চেয়ার থেকে উঠে জানালার কাছে গেলেন। তাঁর লম্বা কালো চুল পিঠের ওপর ছড়ানো। তাঁর নিজের কি সময়ে হয়েছে যাবার? না, তাঁর বয়স সবে একশো ছাড়াচ্ছে। তাঁর দুটি ছেলে এখনো যেন শিশু। একটির বয়স পঁয়তাল্লিশ, এখনো তাঁর সাথে থাকে। আর বড়জন থাকে পৃথিবীর অন্যপ্রান্তে দক্ষিণ আমেরিকায়। দুবার বিয়ে করেছিল বিনতা, টেঁকে নি। তাঁরও সামনে অপার সময়, অদিতার কথাগুলো তাঁর জন্যও প্রযোজ্য। 

"আপনার কি মায়ের কথা প্রায়ই মনে হয়?" পারুলের ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে বিনতা। 

"না, জেগে থাকা অবস্থায় তাঁকে খুব একটা মনে করি না। কিন্তু ইদানীং স্বপ্নে তাঁকে দেখছি।" 

"উনি কবে মারা গেছেন?" 

উত্তরটা দিতে অদিতা সময় নেয়। চেতনা বা মস্তিষ্ক কপি করার প্রকল্প তখনও চালু হয় নি। তাঁর মা'র মৃত্যুর সময় অদিতার বয়স হয়েছিল মাত্র চল্লিশ। "একশো বছরের ওপর," উত্তর দেয় অদিতা। 

"ওনার কথা এতদিন পরে মনে আছে?" প্রশ্ন করে বিনতা। 

"ছোটবেলায় যেমন দেখেছিলাম তাঁকে সেভাবেই দেখছি। ছবি আছে। কিন্তু ওসব বেশী দেখতে পারি না। মনটা বড় খারাপ হয়ে যায়।" এটুকু বলতেই গলাটা ধরে আসে অদিতার, এক বিশাল বেদনাবোধে আচ্ছন্ন হয়ে যায় তার মন। গলার মধ্যে কিসের একট দলা পাকিয়ে ওঠে, ঢোক গিলতে কষ্ট হয়। বিনতা দেখে অদিতার চোখে জল টলমল করছে। 

"মা'র মৃত্যুর কয়েক বছর আগে মানুষের চেতনাকে গণহারে সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা শুরু হল। তখনও চাইলে মাকে হয়তো কপি করা যেত, কিন্তু উনি নিজে এটার ঘোরতর বিরোধী ছিলেন। আর ওনার মৃত্যুর প্রায় কুড়ি বছর পরে বাধ্যতামূলকভাবে চেতনাকে কপি করার নীতি গ্রহণ করা হয়।" 

"হ্যাঁ, এসবই হয়েছে যখন আমি খুব ছোট ছিলাম," বলে বিনতা, "মানুষের মৃত্যু যে কী সেটা এখন ক'টা লোক জানে। আমি কিছুটা জানি কারণ আমি মানুষকে মৃত্যুর ছাড়পত্র দিই।" 

পারুল গাছ ছাড়িয়ে দূরে একটা পুকুর। পুকুরের পাশে বিনতার গাড়িটা দাঁড়িয়ে। সেই গাড়ি নিয়ে সে সপ্তাহান্তে শহরে যায়। পুকুরের পারে একটা বটগাছ, সেটার শিকড় জল পর্যন্ত নেমে গেছে। সেদিকে তাকিয়ে বিনতা বলে, "মাকে ছাড়া আর কেউ আপনার স্বপ্নে আসছে?" 

জানালার বাইরে পুকুরটার দিকে তাকিয়ে অদিতা বলে, "না, মানুষ কেউ আসছে না। তবে অনেক রাত আছে যখন একটা অন্ধকার আমাকে চেপে ধরে।" 

বিনতা আশ্চর্য হয়ে অদিতার দিকে তাকায়। "অন্ধকার?" 

"হ্যাঁ, অন্ধকার, অদ্ভূত আঁধার বলতে পারেন। এক ধরনের শূন্যতা। সেটা স্বপ্ন কি বাস্তব আমি বুঝতে পারি না। ঘরটা যদি আলো-আঁধারি হয় শুধু তখনই সেটা আসে, একটা কালো বেলুন ফুলে ফেঁপে ওঠে ঘরের মধ্যে। হয়তো জানালা দিয়ে আসে, জানালা বন্ধ থাকলেও আসে। পুরো ঘরটা ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে যায়। মনে হয় কালো কালো আঙ্গুল সেই অন্ধকার গঠ্ন থেকে বের হয়ে আমার মুখের দিকে আসছে। আমি চোখ বন্ধ করে ফেলি। তারপর আর কিছু মনে থাকে না। এমন যেন আমার মৃত্যু হয়েছে।" 

বিনতার চোখ বিশ্বাস-অবিশ্বাসের সীমানায় জ্বলজ্বল করে। সে বলে, "আপনি আমাকে এটা আগে বলেন নি কেন?" 

"আমি বলতে গিয়েছি, কিন্তু প্রতিবার বলার সময় কেন জানি বলতে পারি নি। এমন যেন সেই অন্ধকার আপনার ঘরের কোণায় দাঁড়িয়ে আছে, আমাকে শ্বাসাচ্ছে। বললে যেন এখনই আমাকে মেরে ফেলবে। কীরকম ধাঁধা বলুন তো? আমি তো মৃত্যুই চাই। অথচ সেই মৃত্যুর ভয়ে আপনাকে কিছু বলতে পারছি না।" 

ঘরের কোণায় অন্ধকার দাঁড়িয়ে আছে শুনে চমকে ওঠে বিনতা, ঘাড় ঘুড়িয়ে ঘরে কোণাগুলো দেখে। না সেখানে কিছু নেই। বিনতার আচরণ অদিতার অলক্ষিত থাকে না। সে বলে, "আজ নেই। আজ মেঘ নেই আকাশে, আজ সে থাকবে না। কেমন রোদ পড়েছে ঘরে দেখেছেন?" বিনতা আশ্চর্য হয়। অদিতা একটা বিমূর্ত ধারণাকে "সে" বলছে , প্রাণ পেয়েছে সেই আঁধার। 

প্রায় আধ মিনিট দুজনেই চুপ করে থাকে। তারপর অদিতা বলে, "যে রাতে আমার ঘুম আসে না সে রাতে আমি দোতলার বারান্দায় যেয়ে নদীর ওধারে জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে থাকি। জোনাকীরা ঝলমল করে, নদীর এপাড়ে যখন তারা নেভে ওপাড়ে জ্বলে, আবার ওপাড়ে নিভলে এপাড়ে জ্বলে। ঝিঁঝিঁর ডাকও যেন তার সাথে ওঠানামা করে। মাঝে মধ্যে মেছো পেঁচা ডেকে ওঠে কোথায় হুহহুহু-হু, রাতের অন্ধকারেও মেঘহও মাছরাঙারা জলে ঝাঁপ দেয়। অনেক সময় নেকড়ের ডাক শুনি, উউউউউউ, রহস্যময় সেই ডাক। গায়ে কাঁটা দেওয়া তাদের কোরাস কন্ঠ ছড়িয়ে পড়ে পুরোনো বনস্পতির ওপর দিয়ে, নিশীথ রাতের চাঁদের নীরবতার নিচে সেই ডাক ভেসে আসে নদীর এধারে আমাদের বাড়িতে। এসব কিছুই আমার চেনা, আমিই এখন রাতের অরণ্য। বনের শব্দ, গন্ধ, স্পর্শ আমার মজ্জাগত। কিন্তু এসব কিছুর মধ্যেই অন্য একটা কিছু জিনিস সৃষ্টি হতে থাকে। আমি যেন দেখতে পাই নদীর ঐ পাড়ে একটা অন্ধকার দলা পাকিয়ে উঠছে, ফুলে ফেঁপে উঠছে বর্ষার কালো মেঘের মতন। ফুঁসে উঠছে সেই অন্ধকার। আর তখনই বনের সব আওয়াজ বন্ধ হয়ে যায়। নেকড়ে, পেঁচা, ঝিঁঝিঁ, সব। জোনাকীরাও যেন কোথায় চলে যায়। 

"নদী পার হয়ে সেই কালো অন্ধকার আমার দিকে তার শীর্ণ হাত বাড়িয়ে দিতে চায়। কিন্তু সেই আঁধারের মধ্যেই, সেই ফুলে ওঠা অন্ধকারের মধ্যেই কি যেন নেকড়ের চোখের মত জ্বলজ্বল করে, আমাকে যেন লক্ষ করে। এরকম মিনিটখানেক থাকে, তারপর সেই অন্ধকার, জ্বলজ্বলে চোখ মুছে যায়। আমি ঘরে ফিরে আসি। ঐসব রাতে সেই আঁধার আর আমার ঘরে আসে না। এমন যেন একবার ভয় দেখিয়েছে, আর দেখানোর দরকার নেই।" 

দিনের আলোতেও অদিতার কথা শুনে বিনতার শরীরে কাঁটা দেয়। বনের পাশে গবেষণাগার, তাতে প্রায় দশ-বারোজন বিজ্ঞানী থাকে, তারা মাঝে মধ্যেই বনে যায়, নানান ছোঁয়াচে রোগ নিয়ে আসে, এছাড়া শহর থেকে দূরে থাকতে হয় তাদের, নিসঙ্গতা, একঘেয়েমী জীবনে মানসিক চাপ আছে, এসব কিছুই বিনতাকে সামলাতে হয়। অদিতা প্রায় কুড়ি বছর আছে এই কেন্দ্রে, এই বনের নাড়ীনক্ষত্র তার জানা। বিনতাই বরং নতুন, পাঁচ বছর হল এসেছে। 

বনবিজ্ঞানীরা তাদের গবেষণা করতে প্রায়ই জঙ্গলের গভীরে চলে যায়, একা একাই দিন দশেক থেকে ফিরে আসে। অদিতা যে কতবার বনে গিয়ে থেকেছে তার হিসাব নেই। বিনতা ভাবে, এত বছর ধরে বনে থাকতে থাকতে অদিতার মনকে বন অধিকার করে নিচ্ছে, অরণ্যের হাতছানি এরকমই। 

"এরকমই হয় অনেক রাতে, শুধু একবারই এর ব্যতিক্রম হয়েছিল," অদিতা বলে, "এক রাতে ওরকমভাবেই ফুঁসে উঠছিল আঁধার, হঠাৎই মনে হল ধীরে ধীরে সেই আঁধারের মেঘ কেটে যাচ্ছে, স্পষ্ট হচ্ছে ওপাড়ের গাছগুলো। মনে হল ঐপাড়ে বনের গভীর থেকে একটা বাঁশির শব্দ ভেসে আসছে। প্রথমে নিশ্চিত ছিলাম না, কান পাতলাম। ক্ষীণ ছিল সে বাঁশি। এমন একটা উদাস করা সুর কখনো শুনি নি, মনে হল বহু অতীত থেকে, সময়কে উপেক্ষা করে, সেই বাঁশি যেন আমার জন্যই বাজছে। আর সেই বাঁশি সব আঁধার কাটিয়ে দিচ্ছে। সেই বাঁশি যেন ভোরের আলো, সে অন্ধকার কুয়াশা গলিয়ে দেয়।" 

অদিতার কথায় বিনতাও যেন কেমন আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। দুজনেই অনেকক্ষণ নিশ্চুপ থাকে। 

"আমার একশ সত্তর বছর পার হল, আমাকে এবার ছাড়পত্রটা দিন, ডক্টর বিনতা।" অদিতার কথায় বিনতার সম্বিত ফেরে। জানালা থেকে ফিরে এসে চেয়ারে বসে। দু'বছরে মাত্র একটা ছাড়পত্র লিখতে পারে সে। এই গবেষণাকেন্দ্রে আসার পর থেকেই অদিতা তাকে অনুরোধ করে যাচ্ছে। 

বিনতা বলে, "এই মহাবিশ্বকে আপনি সচেতনভাবে উপলব্ধি করতে পারছেন, এর অস্তিত্বকে বুঝতে পারছেন। যেটুকু সময় আপনি পাচ্ছেন এই পৃথিবীতে সেটুকু ব্যবহার করুন। যখন চলে যাবেন তখন তার কিছু বুঝতে পারবেন না।" 

হাসে অদিতা, বলে, "চলে তো যেতে দিচ্ছেন না, আপনিও দিচ্ছেন না, জাতিসংঘও দিচ্ছে না। আর মহাবিশ্ব থেকে আমার আর পাবার কিছু নেই। অন্যদিকে বাঁচার জন্য এই পৃথিবীটা খুব ছোট। আমি কি না দেখেছি? কেউ দুশো বছর বাঁচলে কোনো কিছু কি অদেখা থাকে? আর যতবার আত্মহত্যা করেছি ততবার আমাকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এভাবে তো চলতে পারে না।" 

আদিতার কথাগুলো বোঝে বিনতা। প্রতি তিন বছর অন্তর সব নাগরিকদের মস্তিষ্ককে কপি করা হয়। কপি করার পদ্ধতিটা খুবই জটিল। মস্তিষ্কের প্রতিটি কোষ, নিউরন যেভাবে থাকার কথা সেভাবেই সৃষ্টি করা হয়। সেই মানুষ যদি কোনোভাবে মারা যায়-- দুর্ঘটনায়, হত্যা বা আত্মহত্যায়, কিংবা হৃদযন্ত্রের কোনো অপ্রত্যাশিত গোলযোগে তার কপি করা মস্তিষ্ককে হয় তার পুরাতন দেহে অথবা নতুন সৃষ্ট কোনো দেহে স্থাপন করা হয়। মৃত্যু বলতে যা বোঝায় পৃথিবী সেটা বিদায় করে দিয়েছে। জাতিসংঘের সনদে মৃত্যুর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, দু'শ বছর পার হলে সহজেই অনুমতি মেলে। তবে সমাজ একেবারে অসংবেদনশীল নয়, দু'শর নিচে বয়স হলেও বিশেষ ক্ষেত্রে মৃত্যুর অনুমতি মেলে, কিন্তু ছাড়পত্র পেতে অনেক আমলাতান্ত্রিক পথ পার হতে হয়। 

অদিতাকে নতুন দেহ নিতে হয় নি। একবার হাতের কবজি কেটেছিল সে, বলতে গেলে দশ মিনিট পুরোপুরিই মৃত ছিল। তবে জন্ম থেকেই এখন মস্তিষ্কের কোষগুলোকে এমনভাবে শিক্ষা দেয়া হয় যে সেগুলো ত্রিশ মিনিট পর্যন্ত অক্সিজেন না পেলেও বেঁচে থাকতে পারে। চিকিৎসকরা খুব সহজেই অদিতাকে বাঁচাতে পেরেছিল। 

"আমাকে এবার ছাড়পত্রটা দিয়ে দিন, ডাক্তার বিনতা। এবার আমাকে যেতে দিন।" মৃত্যুকে পুরোপুরি নিশ্চিত করতে হলে সরকারি ছাড়পত্র লাগবে। যে ছাড়পত্র তাঁর মস্তিষ্কের কপিকে পুনরায় সঞ্জীবিত করবে না। 

বিনতা অদিতার দিকে তাকিয়ে থাকে। একশ সত্তর বছরের প্রবীণ মুখে কোনো বলিরেখা নেই, তীক্ষ্ণ চিবুক, মসৃণ কপোল, উজ্জ্বল বাদামী চোখ, কপালের ওপরে কাঁচা-পাকা চুল। একটা উজ্জ্বল লাল রঙ্গের স্কার্ট পরেছে অদিতা, সেটার প্রতিফলন তার মুখকে লাল করে দিচ্ছে। সেই রঙ দেখে বিনতার মুখই যেন রাঙা হয়ে যেতে থাকে, বিনতার হৃদস্পন্দন বাড়ে, হাত কাঁপে, কিন্তু মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নেয়। বলে,"এই গবেষণাকেন্দ্রের প্রাণ আপনি। আপনি না থাকলে এই কেন্দ্রের কী হবে?" 

অদিতা জোরশব্দে হাসে, তার চোখে থাকে আনন্দ ও বেদনার এক মিশ্রণ। বলে, "পৃথিবীতে কোনো কিছুই কারুর জন্য আটকে থাকে না। আমি কাল আবার বনে যাচ্ছি, হয়তো দিন পনেরোর জন্য। আমার কথাটা ভুলে যাবেন না।" 

অদিতার হাতটা ধরতে চায় বিনতা। বলতে চায়, আপনাকে ভোলা আমার জন্য কঠিন। আপনাকে ছেড়ে আমি দিতে চাই না। 

সেই রাতে বিনতার ঘুম ভেঙ্গে যায় গভীর রাতে। কটা বাজে, ভাবে সে। ঘরের কোনো একটা জায়গা থেকে মৃদু নারীকন্ঠ ভেসে আসে, "এখন রাত দুটো বাজে।" ঘুমাবার চেষ্টা করে বিনতা, কিছুক্ষণের মধ্যেই তন্দ্রাছন্ন হয়ে পড়ে। একটা শব্দে যেন তন্দ্রা ভেঙে যায়। জানালা খোলা, বাইরের বাতাসে পর্দাটা পালের মত ফুলে উঠেছে। দূরের রাস্তার আলোটা পর্দার পেছনটাকে ম্লান উজ্জ্বল করে রেখেছে। হঠাৎই সেই আলোটা নিভে যায়, এমন যেন সেটা বিনতার মনোযোগের ওপর নির্ভর করছিল। জানালার বাইরে বাতাসটাও পড়ে গেল, পর্দাটা জানালার গ্রিলের সাথে সেঁটে গেল। তারপর আবার ফুলে উঠল। এবার মনে হল একটা অন্ধকার জীব পর্দাটাকে প্রাণ দিচ্ছে। একটা মৃদু উঁচু কম্পঙ্কের শব্দ কানে আসে বিনতার। কিসের শব্দ? এই ভাবতে ভাবতেই মনে হল সেই অন্ধকার জীবটা পর্দা ছেড়ে ঘরে প্রবেশ করেছে, তার দিকে এগুচ্ছে। ভয়ে দুটো হাত মুঠি বদ্ধ হয়ে যায় বিনতার। চিৎকার করলেই ঘরের বাতি জ্বলে যাবে, কিংবা কম্পিউটার খুলে যাবে, সে যাকে ইচ্ছা সাহায্যের জন্য ডাকতে পারে। কিন্তু বিনতার গলা দিয়ে স্বর বের হয়ে না, এক সীমাহীন শূন্যতা তাকে গ্রাস করে। কিন্তু এই শূন্যতার যেন প্রাণ আছে, অবয়ব আছে। পর্দার কাপড়ের অদৃশ্য ছিদ্রগুলি দিয়ে সেই শূন্যতা যেন গলে বেরিয়ে আসে ঘরের মধ্যে, ভাসে ঘরের মেঝের ওপর, তারপর বিছানার দিকে সেই আঁধার অনায়াসে এক মসৃণ মৃদু গতিতে এগিয়ে আসে, ঝুঁকে পড়ে বিনতার ওপর। সেই আঁধারের কোটারাগত চোখে যেন অনন্ত অন্ধকার, তার কালো লিকলিকে আঙ্গুলগুলো এগিয়ে যায় বিনতার বিস্ফারিত চোখের দিকে। পালাতে হবে, এখানে থেকে পালাতে হবে, কিন্তু তার পায়ে কোনো জোর নেই, এই তার শেষ শয্যা। এক শিরশির ঠাণ্ডা স্পর্শে হিম হয়ে যায় বিনতার শরীর। চোখ বুঁজে ফেলে সে, জোর করে চোখের পাতাদুটো আটকে রাখে, মনের মধ্যে ফুটিয়ে তুলতে চায় কোনো রঙ্গীন বনফুলের সমারোহ, বিশাল উঁচু বনস্পতির মাথায় লুকানো সূর্যের ছটা, পাহাড়ি নদীর পাথরের পাশে জলের ঘূর্ণীর উচ্ছাস। ঐ সব স্মৃতি সেই অন্ধকারকে পরাজিত করতে পারবে। তারপর বিনতার মনে হল অদিতার বাঁশি। সেই বাঁশির শব্দ সে কি শুনতে পারবে? ঐ বাঁশি আঁধার কাটিয়ে দিতে পারে বলেছিল অদিতা। কান পেতে শুনতে চায় বিনতা, কোনো বাঁশির শব্দ কি ভেসে আসছে? চোখ খোলে না বিনতা অনেকক্ষণ, আর যখন চোখ খুলল তখন সকাল হয়ে গেছে। বাঁশি শোনার চেষ্টা করতে করতে কখন ভোর হয়ে গেছে।




দ্বিতীয় পর্ব

উঁচু কালিগর্জন আর বনশিমুল গাছের ছাউনির মধ্যে দিয়ে সূর্যের আলো এসে পড়ে নিচে আশোক আর ছাতিমের ওপর, সেখান থেকে গলে পাতার ছায়ায় অনেক ওপরের রোদ নিজেকে ছড়িয়ে দেয় ভোরের আলস্যে। গোলাকার, তেকোণা, চৌকোণা ছকের আলো-আঁধারি ছায়া খেলা করে মাটিতে। সেই ছায়ায় পা ফেলে চলতে ধাঁধাঁ লেগে যায় অদিতার। খুব সকালে রওনা হয়েছে সে, ডামুরি নদীর ওপরের সাঁকো পার হয়েছে সূর্য ওঠার আগেই। বনের গভীরে গবেষণা কুটিরে পৌঁছাতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে। 

প্রতি কয়েক মাস অন্তর অদিতা বনের গভীরে যায়। সেখানে কয়েকটা জায়গায় কর্মীদের জন্য ছোট কুটির করে রাখা হয়েছে। সবচেয়ে কাছের কুটিরটিতে পৌঁছাতেই এক দিন পুরো লেগে যায়, সাধারণতঃ সেখানে যেয়ে গবেষকরা এক সপ্তাহ থেকে এক মাস নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে। একাই এসব করে, বনে মানুষের পদচিহ্নকে সীমিত করার জন্যই এই ব্যবস্থা।

পৃথিবীর সঙ্গে আজ অদিতা সংযোগবিহীন। চাইলেই খুলে রাখা যায় তাঁকে খুঁজে পাবার নানান ব্যবস্থা, স্যাটেলাইট ট্র‍্যাকিং, চোখের ক্যামেরা, কানের নিচে চামড়ার ভেতরে বসানো ফোন। কিন্তু এসব বন্ধ করে সে হাঁটছে। হাঁটছে আর ভাবছে। বঙ্গীয় বদ্বীপের পুরোটায় এখন প্লাবিত। সেই প্লাবিত বদ্বীপের পূর্ব দিকে যেখানে ভারতীয় টেকটনিক প্লেট এশীয় মহাদেশের নিচে ঢুকছে সেখানেই পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে বিশাল বনভূমি। সেই বন বিস্তৃত হয়েছে পশ্চিমে সমতলে। পাহাড়ি নদী ডামুরি নেমে এসেছে উঁচু থেকে, গভীর বনের মধ্যে দিয়ে ছোট গিরিখাত কেটে সে পৌঁছেছে একটি জলাভূমিতে। সেই নদীর পাশেই গবেষণাগার। সেখানকার বিজ্ঞানীরা গত পঞ্চাশ বছর ধরে প্রায় চল্লিশ হাজার বর্গকিলোমিটার ক্ষেত্র আয়তনের এই বনটিকে নীরিক্ষণ করছে। সেই বিশাল ডামুরি অভয়ারণ্যে কোনো মানুষ বাস করে না, শুধুমাত্র এই বিজ্ঞানীরাই বনের ভেতর প্রবেশ করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি জীববৈচিত্রের ও জলবায়ুর পরিবর্তন তাদের গবেষণার মূল বিষয়। এই বনকে এককভাবে পাওয়াকে সৌভাগ্য মনে করে অদিতা।

অদিতার পিঠে খাবার আর যন্ত্রপাতি ভরা ব্যাগ। প্রায় চার ঘন্টা একটানা হাঁটার পরে মূল পথটা ছেড়ে একটা শাখাপথ নেয় সে। ধীরে ধীরে খাড়াই একটা পাহাড়ের পাশ দিয়ে সেই পথটা উঠতে থাকে। অনেকদিন এই রাস্তা ধরে বনকর্মীরা যাতায়াত করে না, বনগুল্ম আগাছায় ভরে যাচ্ছে সেটি। অদিতার দুহাতে সরু ধাতব লাঠি, সেই লাঠি দিয়ে আগাছা সরিয়ে হাঁটে সে। যত ওপরে ওঠে গাছের ফাঁক দিয়ে নিচের উপত্যকাটা দৃষ্টিগোচর হতে থাকে। ডামুরির স্রোত চিকচিক করে দুপুরের আলোয়। 

চার-পাঁচটা চিত্রা হরিণ পথের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। অদিতাকে দেখে পথ ছেড়ে তারা গাছের আড়ালে চলে গেল, কিন্তু পালায় না। অদিতা কিছুটা কাছাকাছি এলে ওদের দেখতে পেল আবার। হরিণগুলো বড় বড় চোখে কৌতূহলে তাকিয়ে ছিল অদিতার দিকে। এই বনে মানুষের উপদ্রব থেকে তারা মুক্ত। গত দুশো বছর ধরে, যখন থেকে এই অভয়ারণ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তখন থেকেই এই অঞ্চলের লুপ্তপ্রায় প্রাণীরা ফিরে আসছে। 

একসময় হারিয়ে যায় নিচের উপত্যকা। এই পাহাড়টার ওপরে অল্প একটু সমতল জায়গা। এখানে অনেক কটা নাগেশ্বর গাছের সম্মেলন, সেই জায়গাটা ভাল করে চেনে অদিতা। তারপর উৎরাইয়ে নামতে থাকে অদিতা। আরো ঘন হয়ে ওঠে বন। দুপুরের আলো হারিয়ে যায়। ওপরে বাতাসে গাছের পাতা শর শর করে, নিচে সেই বাতাস পৌঁছায় না। আস্তে আস্তে সেই বাতাসের বেগ বাড়ে, তবে দমকা হাওয়ায় মাঝে মধ্যে বড় গাছগুলোও দুলে ওঠে। অদিতার মনে হল অরণ্য আন্দোলিত হচ্ছে তার পিছনে, অথচ সামনে সব শান্ত। এমন যেন এক অশান্ত হাওয়া তাকে তাড়া করছে, যে মুহূর্তে সে পা রাখছে সামনে সেই মুহূর্তে পথের সঙ্গে লম্বভাবে থাকা সব গাছ দুলে উঠছে। চোখের সামনের গাছগুলো দাঁড়িয়ে আছে স্থির, তাদের পাতাগুলো অল্প নড়ছে মৃদু হাওয়ায়, অথচ পেছনে যেন গর্জন করছে বন। 

দাঁড়িয়ে পড়ে আদিতা। বুঝতে চায় এটা শুধু মনের ভুল কিনা। এমনটা হবার কথা নয়, এর আগে এরকম ঘটনা কখনো ঘটে নি। পিছন দিকে তাকায় অদিতা, পথটা পাহাড়ে উঠে গেছে, তার দুদিকের সমস্ত গাছ দুলছে যেন প্রলয় হচ্ছে। অন্ধকার আরো গাঢ় হয়ে ওঠে। তার মনে হয় সেই অন্ধকারে একটা বিমূর্ত অবয়ব রূপ নিচ্ছে। না, এরকম হবার কথা নয়, সে কি পাগল হয়ে যাচ্ছে? কিন্তু একটা অবোধ্য ভয় থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারে না সে। অদিতা সামনের দিকে দৌড়ায়, পালাতে হবে তাকে সেই অশরীরী অন্ধকার থেকে। 

দৌঁড়ায় অদিতা, পেছনে তাড়া করে হাওয়া, শোঁ শোঁ করে তার শব্দ উঁচু বনস্পতির চূড়ার ফাঁকে। কম্পিত মহীরুহ বেঁকে পড়ে মাথা নুইয়ে। বহু ওপরে মেঘে বিদ্যুৎ ঝলসে ওঠে, তার শব্দ শোনে অদিতা, বিদ্যুতের আলো গাছের বেড়া ভেদ করে মাটিকে উজ্জ্বল করে দেয়। বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে নিচের ধুলায়। সামনের পথটাও ঝাপসা হয়ে যায়। থেমে যায় অদিতা, কিরকম পাগলের মত আচরণ করছে সে। এরপর বোঝে পথভ্রষ্ট হয়েছে সে, তার আগের নির্দিষ্ট পথ হারিয়ে গিয়েছে। কিন্তু সেটা নিয়ে চিন্তার কারণ নেই, তার কব্জিতে পরা যন্ত্রই বলে দেবে সে কোথায় আছে। একটা গাছের নিচে দাঁড়ায় অদিতা, কাঁধ থেকে ব্যাগটা নামিয়ে একটা বর্ষাতি বের করে পরে নেয়। 

এই বনে সে কুড়ি বছর ধরে আসছে। ঝড়-ঝঞ্ঝা, বৃষ্টি, কুয়াশা, নেকড়ে, বাঘ, সাপ কি না সে দেখে নি। এসব কিছুই কখনো তাকে বিচলিত করতে পারে নি। আজ কেন এরকম? কিছুই না, সবই কল্পনা। হৃদস্পন্দ ধীরে ধীরে শান্ত হয়। জলের ফোঁটায় ছোট ছোট ডোবা হয়ে থাকে চারিদিক। বৃষ্টির শব্দ খুব ভাল লাগে অদিতার। কিন্তু আজকের বৃষ্টি তাকে যেন কী বলতে চাইছে। আবার বিদ্যুৎ চমকায়। তার ক্ষণিক আলোয় অদিতার চোখে পড়ে একটা ছোট ঘর। এখানে কোনো ঘর থাকার কথা নয়, চোখের ভুল। আবার বিদ্যুতের জন্য অপেক্ষা করে অদিতা। পরের বিদ্যুতের সাথে ঘরটা আবার দেখা যায়। না, চোখের ভুল নয়। বৃষ্টির পর্দার ওপাড়ে, দুসারি গাছের পরে ঘরটা ঠিকই দাঁড়িয়ে আছে। কাঠের একটা ছোট ঘর। কুড়ি বছর ধরে এই বনে আসছে অদিতা। গবেষণাকেন্দ্রের এত কাছে কোনো ঘর, কুটির, মানুষনির্মিত কিছুই নেই। এখানে কারুর কোনো কাঠামো বানানোর অনুমতি নেই, আর বানালেও সেটা অদিতার জানার কথা। 

বৃষ্টি আরো জোরে নামে। অদিতা বুঝে পায় না কী করবে। বনের মধ্যে যে কুটিরের উদ্দেশ্যে সে যাত্রা শুরু করেছিল সেখানে আজ পৌঁছাতে পারবে না। তাহলে সে কি ঐ ঘরের দিকে দৌড়ে যাবে, আশ্রয় পাবে কি সেখানে? সবার অজান্তে এরকম একটা ঘর কেউ তুলে ফেলল? কক্ষপথের উপগ্রহের ছবিতে এসব তো দেখতে পাবার কথা। মনস্থির করে ঘরটার দিকে হাঁটতে শুরু করল অদিতা। বৃষ্টি প্যান্টের নিচটা ভিজিয়ে দিল। চতুষ্কোন ঘরটার কাছাকাছি এলে দেখতে পায় এদিকে কোনো দরজা বা জানালা নেই, অন্যদিকে একটা দরজা, দুদিকে দুটো জানালা। দরজাটা একটা ছোট খাতের দিকে মুখ করা, সেই খাতে একটা ছোট জলধারা বয়ে যাচ্ছে, বৃষ্টিতে সেই ধারা শক্তিশালী হয়েছে। কাঠের বাড়ি, তাড়াহুড়োয় যেন বানানো, তক্তাগুলো ঠিকমত বসানো হয় নি, দরজাটার চারদিকে বেশ ফাঁকা জায়গা রয়ে গেছে। 

ঘরটার ভেতরে কি কেউ আছে? মানুষ? নেকড়ে? বাঘ? সাপ? পকেট থেকে ছোট তড়িৎ-বন্দুকটি বের করে অদিতা, দূর থেকে তড়িৎ আবেশে কোনো পশুকে (কিংবা মানুষকে) কিছুক্ষণের জন্য সেটা সহজেই অসাড় করে দিতে পারে। ঘরের দুই দিকের জানালাদুটো ভেতর থেকে বন্ধ। দরজাটা বন্ধ, কিন্তু বাইরে কোনো তালা বা হাতল দেখা যাচ্ছে না। তাকে কি কেউ ঘরটার ভিতর থেকে খেয়াল করছে। নাকি বাইরের থেকে? ছোট গিরিখাতটার অন্যপাড়টা দেখতে চেষ্টা করে অদিতা। গাছে গাছে একাকার, সেখানে কেউ দাঁড়িয়ে থাকলেও এই বৃষ্টিতে তাকে দেখতে পেত না সে। হঠাৎ করেই শীতে যেন কেঁপে ওঠে অদিতা। শীত নয়, একধরণের ভয় যা কিনা বড় হয়ে সে অনুভব করে নি। বহু আগে ছোটবেলায় একবারই সে এরকম ভয় পেয়েছিল। এইসব ভাবতে ভাবতেই দরজাটাকে বাঁ হাত দিয়ে আলতো করে ধাক্কা দেয় অদিতা। ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ করে দরজাটা খুলে যায়, এমন যেন অদিতার হাতের স্পর্শই অনুভব করতে চেয়েছিল সেটা, অদিতার আঙুলের স্পর্শ যেন দরজাটা চিনতে পেরেছে। 

ভেতরটা শুকনো খটখটে। বাইরের থেকে মনে হয়েছিল ঘরটা কাঁচা হাতের কাজ, অথচ ভেতরে সবকিছু যেন পরিপাটি। জলের কোনো ফোঁটাই পড়ে নি মেঝেতে। মেঝেটাও কাঠের। ঘরটা একেবারেই ফাঁকা, আসবাবপত্র, খাবার, দেয়ালে চিত্রকর্ম কিছুই নেই, পুরোপুরি শূন্য। ক্লান্ত হয়েছিল অদিতা, কাঁধ থেকে ব্যাকপ্যাকটা নামিয়ে বসে পড়ে দেয়ালে ঠেঁস দিয়ে। তারপর দেখল দরজাটা বন্ধ করে নি, বৃষ্টির ছাঁট আসছে। উঠে দরজাটা বন্ধ করতে গিয়ে বাইরে ছোট গিরিখাতটার দিকে চোখ পড়ল অদিতার। চমকে ওঠে সে। ঐপাড়ে গাছের ধারে একজন দাঁড়িয়ে ছিল, একটা আবছায়া দেহ, বৃষ্টির জন্য কিছু বোঝা গেল না। মুহূর্তের জন্য, তারপর তাকে দেখা গেল না। সারা শরীর শীতল হয়ে যায় অদিতার, দরজাটা বন্ধ করে দেয়। কিন্তু দরজাটা তালা দেবার মত কোনো ব্যবস্থা ছিল না, তবে একটা গোল হাতল ছিল। ব্যাকপ্যাকটা দিয়ে দরজায় ঠেঁস দেয় সে। প্যাকটা থেকে একটা স্লিপিংব্যাগ বের করে মেঝেতে বিছিয়ে দেয়, তারপর ভিজে প্যান্টটা খুলে স্লিপিংব্যাগের ভেতর ঢুকে যায়। 

দরজাটা পুরোই অরক্ষিত। কিন্তু এত ক্লান্ত হয়েছে অদিতা যে ওটা নিয়ে ভাবতে চাইছিল না। কিন্তু না চাইলে কি হবে, গিরিখাতের অপর পাশেই কিছু একটা আছে। মানুষই হবে, কিন্তু এই সময়ে এই এলাকায় সে ছাড়া আর কারুর থাকার কথা নয়।

বহু বছর আগে, তার বয়স যখন দশ বছর ছিল বাবা মা তাকে চাঁদে নিয়ে গিয়েছিল। তাঁর মা ছিল জ্যোতির্বিদ, বাবা প্রত্নতাত্ত্বিক। চাঁদে অবশ্য প্রত্নতত্ত্বের কিছু ছিল না, কিন্তু চাঁদের বড় মানমন্দির থেকে মা মহাকাশ পর্যবেক্ষণ করতেন। চাঁদের বায়ুমণ্ডলবিহীন আকাশ এত উজ্জ্বল ছিল মনে হত তারাগুলোকে যেন আকাশে হাত বাড়িয়ে ধরা যাবে। আর পৃথিবীটা আকাশের এক কোণায় সব সময়ই স্থির হয়ে থাকত। কিন্তু চাঁদের নির্জনতাকে অদিতা ভয় করত। মানমন্দিরের নিচেই তাদের থাকার ব্যবস্থা ছিল। সেখানে আরো বেশ কিছু মানুষ, শখানেকমত হবে, থাকত। জ্যোতির্বিদ, ভূতাত্ত্বিক, প্রকৌশলী, লেখক, বাদকদের সমাহার। মাটির নিচে থাকার ব্যবস্থা যাতে মহাকাশ থেকে আগত শক্তিশালী কণিকারা শরীরের ক্ষতি না করতে পারে। তাদের বাসস্থানের ওপরে একটা বড় কাঁচের গম্বুজমত ছিল, তার নিচে বসে বাইরের ৩৬০ ডিগ্রী দৃশ্যই দেখা যেত। একদিন অদিতা ওপরে উঠে দেখে সেখানে কেউ নেই। স্বচ্ছ কাঁচের নিচে বসে ওপরের পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে ছিল অদিতা। চাঁদের শূন্যতার দিকে তাকাতে তার ভয় করছিল। হঠাৎ তার চোখের কোণায় মনে হয়েছিল দিগন্তে কী যেন নড়ছে, চাঁদের মরুপ্রান্তরে কি একটা জিনিস সরছিল। ভয়ে হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছিল অদিতার। মনে হচ্ছিল সেই জিনিসটা যেন তাকে ডাকছে। আতঙ্কে নড়তে পারছিল না সে। এভাবেই সে বসেছিল অনেক ক্ষণ। পরে কেউ একজন তাকে সেভাবেই দেখতে পেয়ে তার বাবা মাকে ডাকে। এটুকুই, এর থেকে বেশী কিছু না। এখনো মনে পড়ে সেই দিনের কথা। আজ প্রায় ১৬০ বছর পরে চাঁদের সেই অদ্ভুত দিনটার কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ে অদিতা। 



তৃতীয় পর্ব
----------------------------------------------------------------
একটা চাপা চিৎকারে ঘুম ভেঙ্গে যায় অদিতার। নিজেরই চিৎকার ছিল সেটা। অনেকটা গোঙানীর মত। ঘরটা অন্ধকার, বাইরের পৃথিবী ঝিঁঝির ডাকে কম্পিত। দূরে একটা তক্ষক ডাকে, পাখীর ডাকের মত। তার ওপর দিয়েই নিশাচর পেঁচা ডেকে ওঠে হুহুহু। অদিতা বুঝতে পারে না সে কোথায় আছে, কেন আছে। চারদিকে অন্ধকার। একটা স্বপ্ন দেখছিল সে, না অপসারাদের নিয়ে নয়, তার মাও সেখানে ছিল না।

একটা ছোট, খুবই ছোট ঘরে সে বন্দী। এতটুকু ঘর যে সে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না, বাক্সই বলা যায়। বাক্সের মেঝেতে বসে হাঁটুদুটো জড়িয়ে তাতে মুখ গুঁজে বাইরের দিকে চেয়ে আছে। বাক্সটার দেয়াল নেই, তার বদলে কড়িবর্গা দিয়ে সবদিক আটকানো। বাক্সটা একটা বিশাল সবুজ অরণ্যের ওপর ভাসছে। সে বুঝতে পারছে একটা বিরাট দৈত্য বাক্সটা তার তালুতে রেখে হেঁটে যাচ্ছে। দৈত্যটা এতটাই লম্বা যে গাছগুলোর মাথা তার হাঁটু পর্যন্ত মাত্র পৌঁছাচ্ছে, দু-একটা উঁচু গাছ তার কোমর পর্যন্ত উঠছে। দৈত্যটার মুখ বা শরীরের গঠন অদিতার দেখতে পাবার কথা ছিল না, কিন্ত স্বপ্নে যা হয় - স্বপ্নদ্রষ্টা অদেখাকেও দেখে, তার মস্তিষ্কের গভীরে সব তথ্য সঞ্চিত আছে। অদিতার মনে হয় দৈত্যটা তার অনিষ্ট করতে চায় না, কিন্তু ঘটনার বিপরীত স্রোতে সেই দৈত্য যেন অসহায়, সে পালাতে চাইছে। 

কী হল তারপর সেই স্বপ্নে? মনে করতে চায় অদিতা মুছে-যেতে-থাকা স্বপ্নকে জোর করে মনে করতে। একবার যদি সে স্বপ্নটাকে মনে করতে পারে তাহলে হিপোক্যাম্পাসে সে সেটা গুদামজাত করতে পারত। দৈত্যটা পালাতে চাইছিল কিছু থেকে, তার মুখটা পুরোপুরি মনে না থাকলেও সেখানে যে ভয় ছিল সেটা অদিতার মনে আছে। তারপর একটা গাছের সঙ্গে পা লেগে দৈত্যটা পড়ে যেতে থাকে, হাত থেকে কড়িবর্গার বাক্সটা দিতাসহ ছিটকে পড়ে। আকাশ থেকে মাটির দিকে দ্রুত পড়তে থাকে অদিতা, ভয়ে চিৎকার দিয়ে ওঠে। ঘুম ভেঙে যায়। 

কত বছর ধরে এই বনে আসছে সে, সপ্তাহের পর সপ্তাহ থেকেছে, কিন্তু নিজেকে এরকম অসহায় অবস্থায় কখনো আবিষ্কার করে নি সে। গতকাল সেই এই কুটিরে আশ্রয় নিয়েছিল, কিন্তু এই অরণ্যে সেই কুটিরের থাকার কথা ছিল না। নিজেকে খুব একা লাগে অদিতার। স্লিপিং ব্যাগটা থেকে হাত বাড়িয়ে ডান চিবুকের হাড়টা জোরে স্পর্শ করে সে, তাকে পৃথিবী এখন দেখতে পাবে। চামড়ার নিচে থাকা চিপ পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা উপগ্রহের সঙ্গে যোগাযোগ করবে। অনেক দিন পরে বিষাণের কথা মনে পড়ে, একশ বছর আগে এমনি এক বৃষ্টির দিনে তারা তাঁবুর নিচে শুয়ে ছিল পৃথিবীর আর এক প্রান্তে মাদ্রে দে দিওস নদীর পাশে এক বিশাল উঁচু রামোন গাছের নিচে। এক কালের পেরু আর বলিভিয়ার সীমান্ত ছিল সেটি, পৃথিবী থেকে দেশ আর দেশের সীমানার ধারণা সেই কবেই উঠে গেছে, এক হাজার বছর অন্ততঃ হবে। 

বিষাণ পাশে থাকলেও সেদিনও খুব অসহায় ছিল অদিতা। তার চোখ দিয়েও জল ঝড়ছিল বিষুবীয় বৃষ্টির অবিরাম নির্ঝরতার সঙ্গে, তবে সেই জলের ধারা ছিল নিস্তব্ধ ও শান্ত, সঙ্কোচে ও দ্বিধায় সেই ধারা গাল বেয়ে, থুতনির পাশ দিয়ে গড়িয়ে, গলার ওপর পর্যন্ত যেয়ে উবে যাচ্ছিল বাতাসে, মিশে যাচ্ছিল ত্বকে। বিষাণও তাকে সান্ত্বনা দিতে পারছিল না। অদিতার ডান হাতটা ধরে সে তাকিয়ে ছিল তাঁবুতে ঢোকার উন্মুক্ত প্রবেশপথের বাইরে রামোন গাছের নিচে ছড়ানো অসংখ্য গাছের বীজ, যাকে মায়া বাদাম বলে, তার দিকে। গাছটার বিশাল গোড়া চারদিকে ভাগ হয়ে এক একটা ঢাউস উল্টানো নৌকার মত হয়ে মাটিতে ঢুকে গিয়েছিল। 

এতদিন পরেও সেই সময়টার কথা মনে পড়লে অস্থির হয়ে যায় অদিতা। জোর করে মুছে দিতে চায় সেই স্মৃতি। না কথাটা ঠিক নয়। সেই স্মৃতি মুছে দেবার জন্য পদ্ধতি ছিল, চিকিৎসকরা, উপদেশদাতা মনোবিজ্ঞানীরা বলেছিল খুব সহজেই সেই স্মৃতিকে মুছে দেয়া যাবে, আর মুছে না দিতে চাইলেও তাকে মোলায়েম করে দেয়া যাবে যাতে সেটা মনে পড়লে এত কষ্ট হবে না। কিন্তু অদিতা সায় দেয় নি, জীবনটা তো স্মৃতিরই আধার, সেই স্মৃতি তা যত কষ্টেরই হোক, সেই স্মৃতির সম্মিলনেই তো তার জীবন গড়ে উঠেছে। তাকে বাদ দিলে কি বাকি থাকে? 

অন্ধকার ঘরে আবার সেই দংশানো স্মৃতি ফিরে আসে, একশ বছরেও তার কোনো ক্ষয় হয় নি। হৃদপিণ্ডে একটা প্রচণ্ড ব্যথা হতে থাকে যেন কেউ ছুরি দিয়ে কাটছে তাকে। ওপরের অদৃশ্য কাঠের চাদের দিকে তাকিয়ে থাকে অদিতা। ভোর কখন হবে? সেই সময়ই মনে হয় সে বাঁশির শব্দটা শোনে। হ্যাঁ, কোনো ভুল নেই। সেই বাঁশিই বাজছে, যে বাঁশি কালো অন্ধকারের মেঘ দূর করে দিয়েছিল। যান্ত্রিক ইলেকট্রনিক শব্দ নয়, কাঠের ছোট বদ্ধ চোঙায় দীঘল শব্দ তরঙ্গ অনুনাদ সৃষ্ট করে, সেটা যান্ত্রিক বাঁশির ভ্রান্তিহীন সুর সৃষ্টি করে না, অমসৃণ কাঠের ত্বক তাকে দেয় এক ধরনের খুতসম্পন্ন গভীরতা। স্লিপিং ব্যাগের মধ্যে থেকে বের হয়ে আসে অদিতা, বাঁ হাতের কব্জিটা অল্প নাড়ায়, সেখানে বাঁধা ছোট একটা ঘড়ির মত গোলাকৃতি চাকতি থেকে হাল্কা লাল আলোয় পুরো ঘরটা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। ব্যাকপ্যাকের পাশ থেকে একটা জলের বোতল তুলে নিয়ে সেখান থেকে জল খায়। 

মেঝেতে রাখা প্যান্টটা শুকিয়ে গেছে এতক্ষণে। সেটা দ্রুত পরে নিয়ে বাইরে বের হবার দরজাটা খুলতে গিয়ে গতকালের কথা মনে পড়ে যায় অদিতার। ঘরটার একটু দূরেই যে ছোট গিরিখাতটা আছে তার ঐ পাড়ে সে যেন কী একটা দেখেছিল, আবছায়া, মানুষ হতে পারে। মনে হয়েছিল কে যেন তাকে অনুসরণ করছে। কব্জিটা আবার নাড়িয়ে লাল বাতিটা নিভিয়ে দেয় অদিতা, সে যে এই ঘরটা থেকে বের হচ্ছে সেটা সে জানান দিতে চায় না। কিন্তু বাতি নেভান থাকলেও দরজাটা খুলতে আবার ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ করে, সেটা দিতার কানে এমন বিরক্তকর একটা অনুভব সৃষ্টি করে মনে হয় সব ঝিঁঝির ডাক সেই ক্যাঁচক্যাঁচানিতে থেমে গেছে। কিন্তু আসলে থামে নি, ঝিঁঝিরা যেন পূর্ণোদ্যমে ফিরে আসে তাদের ঝিঁঝি নিয়ে, মনে হয় বনের গাছগুলোর মধ্যে যে ফাঁকটুকু আছে সেটুকু তারা শব্দ দিয়ে ভরে দিতে চাইছে যাতে এই বন পরিণত হয় এক ছিদ্রহীন বিরামহীন এক ঘন বস্তুতে। 

ভোর হচ্ছে, কুটিরের সামনে ঊষার ঈষৎ আলো। এরকম ভোর এই অরণ্যে অনেক দেখেছে অদিতা, কিন্তু আজকের মত কোনো বাঁশির শব্দ নিয়ে আকাশকে ধীরে ধীরে নীল হয়ে যেতে সে দেখে নি। দূরে কোথাও, গিরিখাতের ঐ পাড়ে বাঁশি বেজে যায় তার তালে। উঁচু থেকে নিচু, আবার উঁচু কম্পাঙ্কে তার শব্দ ছড়িয়ে পড়ে বনের মাঝে, বাহিত হয়ে গাছের ওপরও। অনেকটা সম্মোহিতের মত গিরিখাতের দিকে এগিয়ে যায় অদিতা, কুটিরে পড়ে থাকে তার স্লিপিং ব্যাগ, ব্যাকপ্যাক, তার ভেতর খাবার। 

খাতটা খুব গভীর নয়, মিটার দশেক হবে, উত্তর থেকে একটা ঝর্ণাধারা এসে পড়ছে। নিচে জল বয়ে যাচ্ছে। ঘাস, কাদামাটি আর বড় বড় পাথরে ভর্তি খাড়াই পাড়টা নেমে গেছে নিচে একটা জলের ধারায়। সেটাতে নিচু হয়ে নামতে গিয়ে পিছলে যায় অদিতা, ছেঁচড়িয়ে নিচে নেমে যায় অনেকখানি। বাকি পথটা সামলিয়ে নিচের অগভীর স্রোতধারায় পা ফেলে। বুটের ফাঁক দিয়ে জল ঢোকে না, কিন্তু বুটের ওপরে হাঁটুর অল্প নিচ পর্যন্ত প্যান্টটা আবার ভিজে যায়। এই নিয়ে চিন্তা করে না সে, এই ধরণের প্যান্ট পাঁচ মিনিটেই শুকিয়ে যায়। জলস্রোত পার হয়ে ঐ পাড়ে উঠতে একটু কসরৎ করতে হয়। পূর্ব পাড়ে উঠে আসলে অদিতা খেয়াল করে তার সারা শরীর কাদামাটি লেপ্টে এক ধরণের কালো বাদামী রঙ ধারণ করেছে। মুখে, চুলে সব জায়গায় কাদা লেগেছে, কিন্তু মুখ ধোবার মত জল হাতের কাছে নেই। 

অদিতা পূর্ব-দক্ষিণে এগোয়, বাঁশির শব্দটা এবার জোরাল হয়। দিগন্তে সূর্যের আলো পাহাড় আর গাছ পেরিয়ে বনের নিচে পৌঁছায় না। কিন্তু আকাশ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এখানে কোনো নির্দিষ্ট পথ নেই, অদিতা জলের ছোট ছোট ডোবা এড়িয়ে দুটি পাহাড়শ্রেণীর মাঝে একটা ছোট অববাহিকা দিয়ে হাঁটে। কিলোমিটার খানেক হাঁটার পরে একটা গাছে-ঢাকা একটা উঁচু টিলা পড়ে। টিলা আর বাঁদিকের পাহাড়শ্রেণীর মাঝ দিয়ে ওপরে ওঠা যায়, বাঁশির শব্দটা মনে হয় ঐখান থেকেই আসছে। ওপরে উঠতে উঠতে অদিতা একটা বাঁকের মুখে আসে, সেইখানে একটা বিশাল পাথর, প্রায় ৭ মিটার উঁচু, রাস্তাটা আটকে বসে আছে। সন্তর্পণে পাথরের ওপর ওঠে অদিতা। আর উঠেই তাকে দেখতে পায়। 

বেশ কিছুটা নিচে একটা ছোট জলাশয়, সেখানে দক্ষিণ আর পশ্চিম থেকে বেশ কয়েকটা ঝর্ণা এসে পড়ছে। জলাশয়ের চারদিকে মাঝারি ধরণের গাছ নুয়ে পড়েছে, তাদের কোনো কোনোটার পাতা জল ছুঁইছে। সেই জলাশয়ের একটু ওপরে একটি পুরুষ তার দিকে পেছন ফিরে বাঁশিটা বাজাচ্ছে। তার পরনে কোনো জামা নেই, পিঠ পুরো খোলা, নিচে ধূসর রঙের একটা কাপড়ের ওপরটা দেখা যাচ্ছে। পিঠের রঙ ঘন বাদামী, মাথার লম্বা কালো চুল পিঠের ওপর ছড়ানো। এরকম ছড়ানো চুলের মানুষ আছে এখনো পৃথিবীতে, অদিতা ভাবে। কিন্তু এই বনে কারুরই থাকার কথা নয়। মানুষটি অদিতার মনে এক অবোধ্য প্রাগৈতিহাসিক অনুভব নিয়ে আসে। 

উঁচু পাথরটার ওপর বসে অদিতা সেই অচেনা মানুষের বাঁশি শোনে। ছোট জলাশয়ে ছাড়িয়ে সেই শব্দ যেন বায়ুমণ্ডলের সর্বোচ্চ স্তরে উঠতে চায়। বিষন্ন কোনো রাগ, কিন্তু তার মধ্যে কোনো বেদনা নেই, আছে যেন কোনো আত্মসমর্পণের ইঙ্গিত, প্রকৃতির সঙ্গে বিলীন হয়ে যাবার আহ্বান। বাঁশীর বিষাদে পাথরের ওপর সমাধিস্থ হয়ে যায় অদিতা। চোখ বুঁজে যায় তার। এরকমভাবে চলে যায় অনেক সময়। হঠাৎ বাঁশি থেমে যায়। চমকে উঠে অদিতা চোখ খোলে। নিচে মানুষটি বাঁশি হেঁটে চলে যাচ্ছে। মানুষটি তরুণ নয়, তার লম্বা চুল কোমর ছাড়িয়েছে। "এই যে," বলে চিৎকার করে ওঠে অদিতা। 

নিচ থেকে ওপরে তাকায় পুরুষটি, দূর থেকে ভাল করে তার মুখ দেখতে পায় না অদিতা। কিন্তু অদিতাকে দেখতে পেয়ে সে যেন আশ্চর্য হয় না। মুহূর্তের জন্য দাঁড়ায়, তারপর দৌঁড়ায়। তার পরনে ছিল শুধু এক ধূসর কৌপিন। অদিতা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসে, তাল সামলিয়ে যাতে পড়ে না যায়। যতক্ষণে সে নিচে নামল বাঁশুরিয়া গাছের আড়ালে প্রায় চলে গেছে। "এই যে, থামুন, থামুন," চিৎকার করে ওঠে অদিতা, তারপর দৌড়ায় তার দিকে। অদিতাও বনের গাছে মধ্যে হারিয়ে যায়। 

ওদিকে বন-গবেষণা কেন্দ্রে বিনতা সবে মাত্র ঘুম থেকে উঠেছে। সকালের এই সময়টা খুব পছন্দের বিনতার। সূর্য দিগন্তের ওপরে উঠেছে মাত্র, কিন্তু পৃথিবীকে তবু আলো-অন্ধকারে রেখে দিয়েছে। এক কাপ কফি নিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ায় বিনতা। দূরে খরস্রোতা ডামুরি বইছে। জলের সঙ্গে পাথরের আর জলের সঙ্গে জলের ধাক্কায় যে শব্দটা হয় সেটা শুনতে কখনই পুরোনো হয় না বিনতার। হঠাৎ পেছনে ঘর থেকে একটা তীক্ষ্ণ সাইরেনের শব্দ ভেসে আসে। দৌঁড়ে ঘরে ঢোকে বিনতা। সারা দেয়াল জুড়ে ডামুরি অরণ্যের মানচিত্র ফুটে উঠেছে, তাতে একটা লাল বিন্দু, জ্বলছে নিভছে। বিনতা জানে ঐ লাল বিন্দুটি কার। সেটি অদিতার। অদিতার শারীরিক সমস্ত তথ্য ফুটে ওঠে পাশে। হৃদপিণ্ড, মস্তিষ্ক, শরীরে প্রতিটি অংশের তথ্য। বিনতা দেখে অদিতার রক্তচাপ কমে যাচ্ছে। বোঝাই যাচ্ছে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। হৃদপিণ্ডের কম্পাঙ্ক কমছে। বিনতা চিৎকার করে ওঠে, "অদিতা, অদিতা, আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন?" অন্য দিক থেকে কেউ উত্তর দেয় না। বিনতা জানে অদিতার সাথে কেউ নেই, অদিতার লাল বিন্দুর পাশে আর কোনো বিন্দু নেই। এক মিনিটের মধ্যে অদিতার হৃদপিণ্ড বন্ধ হয়ে যায়। বিনতার সারা শরীর কাঁপতে থাকে। সে চিৎকার করে ওঠে, "জরুরী অবস্থা, জরুরী অবস্থা!" 

ঘরের মাঝেই ত্রিমাত্রিক অভিক্ষেপে আবির্ভূত হয় কেন্দ্রের পরিচালক বজসেনক। বিনতার কথা আটকে যায়, কয়েক সেকেন্ড কিছু বলতে পারে না। তারপর বলে, "অদিতার হৃদপিণ্ড বন্ধ হয়ে গেছে।" এই পৃথিবীতে কেউ 'মারা গেছে' আর বলে না। বজসেনক কিছুক্ষণ সময় নিলেন এই সংবাদটাকে আত্মস্থ করতে। অদিতা এই কেন্দ্রের প্রধান বিজ্ঞানী, বলতে গেলে পৃথিবীব্যাপী তার নাম। এখানে সিদ্ধান্ত নেবার কিছু নেই, বিনতা নিজেই ড্রোনদের পাঠিয়ে দিতে পারত, কিন্তু এই কেন্দ্রের নিয়মানুবর্তিতার গঠ্ন বজায় রাখতে সে পরিচালককে ফোন করেছে। বজসেনক প্রশ্ন করে, "অদিতার চিপ চালু আছে?" মাথা নাড়িয়ে সায় দেয় বিনতা, বলে "কিন্তু উনি ভিডিও চালু রাখেন নি, তাই আমরা ওনার পারিপার্শ্বিক অবস্থা জানতে পারছি না।" পরিচালক তার ঘরে হাতটা নাড়ায়, তার দেয়ালে ফুটে ওঠে অরণ্যের মানচিত্র। তারপর দেয়ালকে উদ্দেশ্য করে বলে, "চার এবং পাঁচ নম্বর ড্রোনকে চালু কর।" অপর দেয়ালে ফুটে ওঠে কয়েকটা ছবি। একটা বড় গুদামের মত ঘর থেকে দুটো হেলিকপ্টারের মত আকাশে ওড়ার মত যন্ত্র বেড়িয়ে যায়। সেই চালকবিহীন যন্ত্রের কাছে ইতিমধ্যে সব তথ্যই চলে গেছে, অদিতা কোথায় আছে, তার হৃদপিণ্ড কখন বন্ধ হয়েছে, তার দেহকে উদ্ধার করে কোথায় নিয়ে আসতে হবে। এইসব যন্ত্র এক একটা কৃত্রিম বুদ্ধিসম্পন্ন রোবট, তাদেরকে বিস্তারিত নির্দেশনামা দিতে হয় না। তাদের ইঞ্জিন শব্দহীন, শুধু বাতাসের সঙ্গে প্রপেলারের আঘাতের শব্দ শোনা যায়, সেটাও খুব মিহি। আধঘন্টা থেকে চল্লিশ মিনিটের মধ্যে অদিতার দেহকে উদ্ধার করে নিয়ে এলে তাকে তার এখনকার মস্তিষ্ক রেখেই বাঁচানো যাবে। এর পরে হলে তাকে তার কপি করা পুরনো মস্তিষ্ককে ব্যবহার করতে হবে। 

বিনতা দুটো ঠোঁট চেপে আর কপালের ত্বক কুঁচকে হেলিকপ্টার দুটোকে পাহাড়ের ওপাশে অদৃশ্য হয়ে যেতে দেখে। তার বাঁ চোখটা থেকে শুধুমাত্র একটা জলে ফোঁটা গড়িয়ে পড়ে। অদিতা মারা গেছে, কিভাবে সে মারা গেল? তাকে আবার জীবিত করা সম্ভব হবে, কিন্তু নতুন অদিতা কি পুরনো অদিতার মত হবে?



চতুর্থ পর্ব
----------
‘এখানে কেউ মরে না,’ বহু বছর আগে ছয় বছরের বিনতাকে তার বাবা একটা ভূগোলক দেখিয়ে বলেছিল। ‘কে মরে তাহলে বাবা?’ জিজ্ঞেস করেছিল বিনতা তার চোখ গোল করে। ‘অন্য প্রাণীরা। তুমি তো হাতি ভালবাস, কিন্তু হাতি আশি বছরের বেশী বাঁচে না।’ 


সেদিন বিনতা বোঝে নি কেন হাতি এর চেয়ে বেশীদিন বাঁচবে না। সারা পৃথিবী এখন অভয়ারণ্যে ভর্তি, হাতির দল ঘুরছে সারা আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া থেকে পুরাতন চীনদেশে। এই ডামুরি অরণ্যেই রয়েছে কত হাতি, আজ তাদেরই একটা বড় দলের ছবি ভেসে ওঠে বিনতার ঘরে। অদিতার দেহের খোঁজে পাঠানো রোবট-হেলিকপ্টার থেকে পাঠানো ভিডিও ত্রিমাত্রিক গঠনে মূর্ত হয়ে ওঠে ঘরের একপাশে। একটা পাহাড়ের ঢালে ছোট একটা জলাশায়, তাকে ঘিরে কয়েকটা গাছ তাদের ডাল আর পাতা প্রায় ডুবিয়ে রেখেছে জলে। আর জলের ধারেই ওপর হয়ে পড়ে আছে অদিতা, তার দেহের প্রায় অর্ধেকটা জলে। বিনতা ডান হাত্টা দিয়ে নাক আর মুখ চেপে একটা অস্ফূট আর্তনাদ করে ওঠে। অদিতার দেহের হাজার হাজার ন্যানোরোবট তাকে বাঁচাতে পারে নি। কেন? ভাবে বিনতা। ছোট রোবটগুলোর কাজই তো এই, হৃদযন্ত্রের ধমনীতে ছোটখাটো প্লেক জমলে সেখানে গিয়ে মুহূর্তে তাকে ধ্বংস করে দেবে, শিরা-উপশিরায় রক্ত জমাট বাঁধতে দেবে না, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হলে সঙ্গেসঙ্গেই সেটাকে বন্ধ করে দেবার ব্যবস্থা থাকবে। তবে বিনতা এটাও জানে মাথার পেছনে হঠাৎ আঘাত পেলে ন্যানো-রোবটদের কাজ করার সুযোগ নেই। অদিতা কি পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়েছিল? পড়তে পড়তে কি তার মাথায় পাথরের ধাক্কা লেগেছে? নাকি তাকে পেছন থেকে কেউ পাথর দিয়ে আঘাত করেছে? অদিতাকে এই অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে বিনতার নিজেকে অসহায় মনে হয়। 

রোবট-হেলিক্প্টার দুটো জলাশয়ের ওপর কিছুক্ষণ ভাসে, বিনতা একটি রোবটকে বলে পার্শ্ববর্তী জায়গাটা জরীপ করতে আর দ্বিতীয়টিকে বলে অদিতার দেহকে উদ্ধার করতে। দ্বিতীয় রোবটটি নিচে নেমে আসে, সেটার পাশ থেকে প্রায় আটটি লম্বা চোঙার মত নল বেড়িয়ে আসে, প্রতিটি নলের সামনে মানুষের হাতের মত দশটি করে ধাতব আঙুল, তারা খুব আলগোছে অদিতার দেহ তুলে নিয়ে হেলিকপ্টারের নিচে উঠিয়ে নিয়ে আসে। হেলিকপ্টারের নিচের অংশটায় চারটে ত্রিভুজের মত দরজা খুলে যায়, ভেতর থেকে একটা প্ল্যাটফর্ম বের হয়ে আসে, সেখানে খুব যত্ন করে নল-আঙুলগুলো অদিতার দেহটা রেখে দেয়। প্ল্যাটফর্মটা ওপরে উঠে যায়, দরজাগুলো বন্ধ হয়, নলগুলো নিজেদের গুটিয়ে নেয়। 

যতক্ষণ দ্বিতীয় রোবটটি অদিতার দেহকে উদ্ধার করছিল তত্ক্ষণ প্রথম রোবটটি জলাশয়ের গাছগুলো পেরিয়ে তার পাশেই একটি গর্জনগাছের বনের ওপরে উড়তে থাকে। রোবটের অবলোহিত তরঙ্গের প্রতিচ্ছবিতে বিনতা দেখতে পায় জলাশয় থেকে সেই বনে ঢোকার জন্য একটা অস্পষ্ট পায়ে-হাঁটা পথ। পথটা দৃশ্যমান তরঙ্গে দেখতে পাবার কথা নয়, কিন্তু অবলোহিত তরঙ্গের উষ্ণতায় ফুটে ওঠে মাড়ানো ঘাসের মাঝে পদচিহ্ন। সেই পথ দিয়ে কোনো মানুষ কিছুক্ষণ আগেই গিয়েছে, তার পায়ের স্পর্শের তাপ রয়ে গিয়েছে ঘাসের মধ্যে। এই বনে অন্য মানুষের থাকার কথা নয়, কিন্তু অদিতার মৃত্যুতে কি সেই মানুষের হাত রয়েছে? 

“চেতনা দিয়ে যে জীবনের অনুভব, তার অবর্তমানে কোনো ধরণের অস্তিত্বের অর্থ নেই। মৃত্যু হল স্বপ্নহীন ঘুম। আমাদের সচেতন জীবন সবসময়ই ধ্বংস হতে থাকে যখন আমাদের ঘুমে স্বপ্ন থাকে না। জন্মের পূর্বে যেমন চেতনা থাকে না, ঘুমের মাঝেও আমরা সেই অবস্থায় বিরাজ করি। স্বপ্ন-ছাড়া ঘুমের মাঝে নিউরনদের মধ্যে সংকেতের আদান-প্রদানের কম্পাঙ্ক খুব কম হয়ে যায়। সেকেন্ডে এক থেকে তিনবার, অথচ যখন আমরা স্বপ্ন দেখি তখন সেই নিউরনগুলি উঁচু কম্পাঙ্কে যদৃচ্ছভাবে কাজ করে। আবার যখন জেগে থাকি তখনও সেভাবে কাজ করে। তাই স্বপ্ন ও জাগরণের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। আর স্বপ্নবিহীন ঘুম ও মৃত্যুর মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই, প্রতি রাতে ঘুমের সময় আমরা বহুবার মৃত্যুবরণ করি।” 

একটা ছিমছাম ঘরে দশটি ছাত্রকে উদ্দেশ্য করে কথা বলে বিষাণ। পশ্চিমে সূর্যের লাল আলো জানালার কাঁচ পেরিয়ে ঘরে ঢোকে। বিকেলের এই সময়টাতে পড়াতে চায় না বিষাণ, কিন্তু সময়টা ঠিক করা হয়েছে ঐ দশটি ছাত্রর সুবিধা অনুযায়ী। সারা পৃথিবীর বাছাই করা একশটি ছাত্রদের মধ্যে দশটি ছাত্র এই স্কুলে পড়ছে। এদের বয়স চৌদ্দ থেকে ষাট বছর। গত বছর নব্বই বছর বয়সী এক নারী তার ছাত্র ছিল, এই ক্লাসে পড়তে হলে বয়সের কোনো সীমা নেই। প্রায় দশ বছর ধরে এই স্কুলে পড়ায় বিষাণ। লেকচার দিতে দিতে সে ভাবে পৃথিবীতে সুনির্দিষ্ট কাঠামোয় শিক্ষার ধারণা কবেই উঠে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো রূপান্তরিত হয়েছে ছোট ছোট স্কুলে যেখানে সিলেবাস বদলাচ্ছে প্রতিনিয়ত। 

শেষ সূর্যের আলোয় আকাশে ধীর গতিতে চলমান বিমানগুলোর দিকে তাকিয়ে বিষাণ ভাবে বিশালগড় শহরটাও কেমন বদলেছে। বহুদূরে, প্রায় ৯০ কিলোমিটার পশ্চিমে পড়ে রয়েছে এক কালের মহানগরী ঢাকা। এখন সেটা জলে নিমজ্জিত, তার উঁচু সব বাড়ির ধ্বংসাবশেষ এখন একটা অগভীর সমুদ্রের নিচে। আর এই বিশালগড়ে এসে নামছে বিমান পৃথিবীর দূর প্রান্ত থেকে। বিমানগুলো এমনভাবে উড়ছে যেন তাদের কোথাও যাবার তাগাদা নেই। সূর্যালোক, ঠাণ্ডা-গরমে বাহিত বাতাস, বায়ুর ঘনত্বের হেরফের, এমন কি মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে কাজে লাগিয়ে নিঃশব্দে আকাশে উড়ছে বিমানগুলো। 

বিষাণ স্কুলটির সবচেয়ে ওপরের তলায় - তিন নম্বর তলায় পড়াচ্ছিল। জানালা দিয়ে দেখা যায় স্কুলের একদিকে ঘন শালবন, তার মধ্য দিয়ে একটা সরু হাঁটা পথ। পথটা একটা বড় রাস্তার ধারে শেষ হয়েছে। সেই রাস্তার ঐ পাড়ে এই শহরের সবচেয়ে উঁচু এবং বড় বাড়িটি। মাটির ওপরে পাঁচটি তলা, কিন্তু সবাই জানে মাটির নিচে সেই বাড়ি বিস্তৃত হয়েছে বিশটি তলাতে। সেখানে জমা আছে বিশ মিলিয়ন বা দু কোটি মস্তিষ্ক। সারা পৃথিবীর জনসংখ্যা এখন দুই বিলিয়ন বা দুশো কোটি। দুশো কোটির কিছু বেশী মস্তিষ্কের প্রতিলিপি সংরক্ষিত আছে পৃথিবীর নানান জায়গায় এরকম দেড়শটি বাড়িতে। পৃথিবীর আর কোথাও নিরাপত্তা এত কড়া নয় যেটা এরকম মস্তিষ্ক সংগ্রাহাগারে থাকে। দূর থেকে কিছু বোঝা যায় না, সাধারণ বাড়িই মনে হয়, ওপরে সবুজ রঙের ঢালু চাতাল, ফুটপাতের পাড়েই একটা লাল দরজা। কিন্তু সেটা সব সময় বন্ধই থাকে। সেই বাড়িতে কিভাবে ঢুকতে হয় বেশীরভাগ লোকই সেটা জানে না। যার ঢোকার অনুমতি আছে তার জন্য লাল দরজাটা নিজে থেকেই খুলে যায়। পৃথিবীর এই অঞ্চলে হয়ত পনেরো থেকে কুড়ি জন লোকের সেখানে ঢোকার অনুমতি আছে, বিষাণ তাদের মধ্যে একজন। লাল দরজাটির পাশে দেয়ালে একটা সবুজ ফলক, তাতে লেখা ‘নিলয়’। পৃথিবীর সমস্ত মস্তিষ্ক সংরাক্ষাণাগারের নাম হল ‘নিলয়’. 

বিকেলের শেষ আলোটা দ্রুত মিলিয়ে যেতে থাকে, সেটাকে ধরে রাখার জন্যই ঘরে একটা মৃদু লাল আলো ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হতে থাকে। এই পৃথিবীতে ঘরের আর রাস্তার বাতি হঠাৎ জ্বলে ওঠে না। বিকেল থেকে সন্ধ্যা, সন্ধ্যা থেকে রাতের আঁধারে যে রূপান্তর তাকে উজ্জ্বল বিজলীর আলো দিয়ে মানুষ নষ্ট করে দেয় না। তাই বিশালগড়ের মত শহরেও রাতে ফুটে ওঠে ছায়াপথ, শয়ে শয়ে উজ্জ্বল তারা। 

বিষাণ বলতে থাকে, “আমরা বহুদূর এসেছি। প্রকৃতির সঙ্গে প্রকৌশলকে আমরা নরমভাবে সংযুক্ত করতে পেরেছি। পৃথিবীর বুকে বিশাল নির্মাণই যে মানব জাতির সাফল্য সেই ধারণা থেকে আমরা সরে এসেছি। আমরা সৌর জগতের প্রান্তে মানুষ পাঠাতে পেরেছি, কিন্তু আমরা বুঝেছি মহাশূন্যে বসবাস মানুষের জন্য স্বাভাবিক নয়। তাই সেইসব মহাকাশযানে আমাদের পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণকে নকল করতে হয়েছে, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলকে সৃষ্টি করতে হয়েছে। মহাজাগতিক রশ্মি থেকে বাঁচতে দেহের মধ্যে ন্যানো রোবটের সাহায্য নিতে হয়েছে যারা কিনা খুব সহজেই আহত কোষকে সারিয়ে বা সরিয়ে দিতে পারে। কিন্তু আমাদের পক্ষে অন্য গ্রহে বা উপগ্রহে দীর্ঘমেয়াদী উপনিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব হয় নি। 

এ’সব বলতে বলতেই বিষাণ অন্যমনা হয়ে যায়, কিন্তু সেটা ছাত্রদের বুঝতে দেয় না। বলে, “আপনারা জানেন এক হাজার বছর আগে শুধুমাত্র একটি মহাকাশযান, আন্টারেস, সৌর জগতের নিকটবর্তী তারাদের মাঝে পৃথিবীর মত গ্রহ খুঁজতে রওনা হয়ে গেছে। সেই যানটিতে প্রায় পাঁচশো মানুষ আছে যারা কোনোদিন পৃথিবীতে ফিরে আসবে না। আর সাতশো বছর আগে পৃথিবী থেকে দূর নক্ষত্রের সমস্ত মানুষবাহী যান পাঠানোকে সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছিল, সেই সাময়িক সিদ্ধান্ত এখন প্রায় স্থায়ী হয়েছে।” 

মাথা নাড়ায় সবাই। বিষাণ জানে এসব কোনো কিছুই তার ছাত্রদের অজানা নয়। একদম সামনের সাড়িতে বসা ছিল সিলেয়া নামের মেয়েটি। তীক্ষ্ণ চিবুক আর নাক, স্পষ্ট গালের হাড়, উজ্জ্বল খয়েরী চোখ, পেছনে ছড়ানো কালো চুলের সিলেয়া মাঝে মধ্যেই দুটো হাত তুলে তার দশটা আঙুল নাচের মুদ্রায় খোলে আর বন্ধ করে। মনে হয় সে বিষাণর কোনো কথাই মনোযোগ দিয়ে শুনছে না, কিন্তু বিষাণ জানে তার একটি কথাও সিলেয়ার কানকে ফাঁকি দেয় নি। ফাঁকি যে দেয় নি সেটা সিলেয়ার হঠাৎ কথা বলে ওঠার মধ্যেই প্রমাণ পেল। 

“নিষিদ্ধ করাটা ঠিক হয় নি। মানুষ এই গ্যালাক্সিতে আবির্ভূত হয়েছেই অজানাকে জানার জন্য,” সিলেয়ার কথায় দৃঢ়তা থাকে, সেই দৃঢ়তা এমন যে বিষাণকে মুহূর্তখানেকের জন্য সেটা যেন অপ্রস্তুত করে দেয়, বিষাণের হৃদযন্ত্রে একটা তাল বাদ পড়ে, তারপর আবার খুব দ্রুত চলে। 

“ঠিক নিষিদ্ধ করা হয়েছে আমি বলব না, এর মধ্যে দূরপাল্লার শখানেক স্বয়ংক্রিয় যান কাছের নক্ষত্রদের উদ্দেশ্য পাঠানো হয়েছে,” কথাগুলো বলে নিজেকে একটু বোকা লাগে বিষাণের। সিলেয়া এমন একট হাসি মুখ করে থাকে যেন বিষাণ নিতান্তই একটা বাচ্চা ছেলে, কিছু বোঝে না। অথচ বিষাণের বয়স একশ পঞ্চাশ ছুঁলে সিলেয়াই এক বিরাট অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। শ্যাম্পেনের গ্লাস উঁচু করে বলেছিল, “পৃথিবীর স্মৃতির রক্ষাকর্তাদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর দেখতে মানুষটির জন্য।” বিষাণের মুখ কেন জানি লাল হয়ে গিয়েছিল সেটা শুনে। লজ্জায় নাকি আনন্দে, অথবা দুটোতেই! কিন্তু সেই আনন্দের সন্ধ্যাতেও বিষাণ সিলেয়াকে এড়িয়ে গিয়েছিল, সেটা কিছুটা ভয়েই। এই মেয়েটি তাকে যেভাবে আকর্ষণ করেছে তার ফল ভাল হতে পারে না সে জানে। 

“আর হাজার বছর আগে যে যানটি পাঠানো হয়েছিল সেটি এখন কোথায় আছে?” সিলেয়ার আর একটি প্রশ্নে বিষাণের সম্বিত ফেরে। কোথায় আছে সেটা সিলেয়া ভাল করেই জানে, কারণ আন্টারেসের শেষ বার্তা আসে তিনশো বছর আগে। আন্টারেস তখন ১৪ আলোকবর্ষ দূরের লাল বামন তারা Wolf ১০৬১ পার হচ্ছিল। সেই বার্তা বলে সেখানে অভিযাত্রীরা পৃথিবীর মত কোনো বাসযোগ্য গ্রহের সাক্ষাৎ পায় নি, অথচ পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা মনে করেছিলেন সেই তারার চারদিকে বেশ কয়েকটি গ্রহ পৃথিবীর মত হতে পারে। 

আন্টারেসের ইঞ্জিন ছিল হাইড্রোজেনের। সূর্য তার অভ্যন্তরে কয়েকটা হাইড্রোজেন পরমাণুকে জুড়ে তৈরি করে হিলিয়াম, সেই সঙ্গে সৃষ্টি করে শক্তির। একে বলে ফিউশান। ঠিক সেইভাবে আন্টারেসের ইঞ্জিন ফিউশান ব্যবহার করে আন্তঃনাক্ষত্রিক পথ পাড়ি দিচ্ছে। কিন্তু সেই নাক্ষত্রিক জাহাজের নাবিকদের মস্তিষ্ক কপি করা ছিল না, সেই প্রকৌশল সৃষ্টি হয়ে আন্টারেস পৃথিবী ছেড়ে যাবার কয়েক শ বছর পরে। তাই সেখানে মৃত্যু ছিল। আন্টারাসের নতুন প্রজন্ম কখনো পৃথিবী দেখে নি। পৃথিবীর কাহিনী তারা শুনেছে কিংবদন্তীর মত। 

আন্টারেস পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবার সময় থেকেই বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করছিলেন মস্তিষ্ককে যথাযথভাবে নকল করবার। প্রথমে বিজ্ঞানীরা ভেবেছিলেন মস্তিষ্কের সমস্ত তথ্যকে নকল করে কৃত্রিমভাবে সেই তথ্যকে কম্পুটারে বাস্তবায়িত করা যাবে। সেই মস্তিষ্ক হবে ইলেকট্রনিক। কিন্তু আট হাজার ছয়শ কোটি নিউরন, ছিয়াশি লক্ষ কোটি সিন্যাপসকে সঠিকভাবে বাস্তবায়িত করা কঠিন, শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা জৈবিক আধারেরই সাহায্য নিলেন। মস্তিষ্কের প্রতিটি কোষ - গ্লিয়াল ও নিউরনের তড়িৎ-চুম্বকীয় সংকেতের ওপর ভিত্তি করে গড়ে তুললেন ত্রি-মাত্রিক জৈবিক মস্তিষ্ক।

টেবিলের ওপরে রাখা পাত্লা একটা স্ক্রীন লাল আলোতে জ্বলে ওঠে। সেদিকে বিষাণ তাকালে দেখে একটা লেখা ফুটে উঠেছে, ‘নিলয়ে’ আপনার উপস্থিতি প্রয়োজন। বিষাণ বোঝে ‘নিলয়ে’ নতুন দেহ এসেছে। কিন্তু সেখানে সবসময় যে তার উপস্থিতি প্রয়োজন তা নয়, কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে তাকে ডাকা হয়। 

“আজকের মত ক্লাস এখানেই শেষ,” বলে বিষাণ, “আমাকে ‘নিলয়ে’ যেতে হবে। তবে কাল যখন আসবেন নতুন একটা সমস্যার সমাধানে আপনাদের আইডিয়াগুলো নিয়ে আসবেন। সমস্যাটা আন্তর্জালে দেয়া আছে - কপি করা মস্তিষ্ক কি আসলেই আদি মানুষটির সত্তা ও চেতনা বহন করে, নাকি সেই কপি নতুন একটি সত্তার জন্ম দেয়? সমস্যাটির সঙ্গে কোয়ান্টাম বলবিদ্যা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর একটি প্রশ্ন হল স্বপ্নবিহীন ঘুম থেকে যখন একটি মানুষ জেগে ওঠে সেটি কি সেই মানুষই যে একটু আগে ঘুমাতে গিয়েছিল? শেষের প্রশ্নটি কি প্রথমটির সঙ্গে সম্পর্কিত?” 

এটুকু বলে বিষাণ দ্রুত ক্লাস থেকে বের হয়ে যায়, তারপর একটু আতঙ্কিত হয়েই দেখে সিলেয়াও একই সঙ্গে বের হয়ে এসেছে। “ডকটর বিষাণ, সিলেয়া নামের একটি মানুষ আপনার ক্লাসে গতকাল এসেছিল, একদম সামনের টেবিলে বসেছিল।” বিষাণ প্রথমে বিস্মিত হয়ে সিলেয়ার দিকে তাকালেও সঙ্গে সঙ্গেই বোঝে এটা একটা প্রশ্ন বা রসিকতার ভূমিকা মাত্র। সিলেয়া বিষাণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে আর প্রশ্নটি করার উত্তেজনায় হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, “এখন আমার মনে হচ্ছে আমি - আজকের সিলেয়া - গতকালের সিলেয়া থেকে একেবারেই ভিন্ন, যেন আর একটা মানুষ। এটা কি সম্ভব? ” 

বিষাণ বোঝে সিলেয়া তার সঙ্গে ঠাট্টাই করছে, কিন্তু ঠিক কি উত্তর দেবে ভেবে পায় না। “সেটা আপনিই আমাকে কাল বলবেন,” একটু ভদ্রতা-রক্ষাকরা হাসি হেসে বিষাণ এগিয়ে যেতে চায়, কিন্তু সিলেয়ার আরো কিছু পরিকল্পনা ছিল। সে জিজ্ঞেস করে, “আপনার সঙ্গে কি আমি ‘নিলয়ে’ যেতে পারি?” 

এটা যে একেবারেই সম্ভব নয় সেটা সবাই জানে, তবু বিষাণ সিলেয়াকে কীভাবে এড়াতে পারবে বুঝে পায় না, বলে, “খুবই জরুরী অবস্থা এখন, এই মুহূর্তে তো যাওয়া সম্ভব নয়।” সিলেয়া হেসে চলে যায়, সে বিষাণের সঙ্গে ঠাট্টা করে যেন মজা পায়। হাঁপ ছেড়ে বাঁচে বিষাণ। তেতলা থেকে একটা ঘোরানো সিঁড়ি ধরে সে নিচে স্কুলের বাগানে ঢোকে, তারপর প্রায় দৌড়েই বাগানটা পার হয়ে একটা সরু পায়ে চলা রাস্তা দিয়ে সে শালবনে প্রবেশ করে। অন্ধকার হয়ে আসছে, ছোট বনের রাস্তাটার পাশে মৃদু বাতি জ্বলে। শালবনটা শেষ হয়েছে একটা বড় রাস্তায়, বিশালগড়ের প্রধান রাস্তা এটা। একটা কালো রঙে চকচক করে রাস্তাটা, সৌর সেল দিয়ে রাস্তাটা মোড়া, সূর্য থেকে শক্তি আহরণ করে সেই রাস্তা। কিন্তু রাস্তাটা একেবারেই ফাঁকা, দু-একটি চালকবিহীন বড় বাস নিঃশব্দে চলছে, একপাশে সাইকেলের মত একটি বাহনের জন্য নির্ধারিত রাস্তা - সেখানে মানুষেরা নিজ শ্রমে তাদের বাহন চালাচ্ছে, তার পাশেই আর একটি দাগ দেওয়া পথ, সেখানে তারা একটি চাকার ওপর ছোট প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে চলছে, তাদের বাহন কোথায় তারা যেতে চায়, কত দ্রুত যেতে চায় এসবই জানে। 

রাস্তা পার হতে একটা ছোট সেতু দিয়ে, সেতুটার উচ্চতা বেশী না, এই শহরের কোনো গাড়ির উচ্চতাই তিন মিটারের চেয়ে উঁচু নয়। বিষাণ সেতুটাতে পা দেওয়া মাত্রই নিচে রাখা পথটা চলতে আরম্ভ করে, নিঃশব্দে। ওপাড়ে বিষাণকে নামিয়ে দিয়ে পথটা থেমে যায়। ‘নিলয়ে’ ঢোকার মুখে একটা ছোট কফির দোকান, সেখান থেকে মৃদু বাজনার শব্দ ভেসে আসছে। এখানে অনেক সময়ই বিষাণ আসে, কিন্তু আজ সময় নেই, নতুন একটি মৃতদেহ এসেছে, তার মধ্যে পুরোনো মস্তিষ্ক বসাতে হবে। 

বিষাণ কাছে আসা মাত্র ‘নিলয়ের’ নিচের লাল দরজা খুলে যায়, বাড়িটা তাকে চিনতে পেরেছে। ঢোকা মাত্র একটা চলন্ত সিঁড়ি বিষাণকে দোতলায় নিয়ে আসে। সেখানে একটু খোলা জায়গা, তার একদিকে একটি সুরক্ষিত দরজা, সেটাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে যায়। ঘরের ভেতরে মৃদু আলোয় বিষাণর জন্য অপেক্ষা করে তিনজন, দুজন নারী ও একটি যান্ত্রিক রোবট। এদের দুজনকে খুব ভাল করে চেনে বিষাণ - নিলয়ের প্রধান ডকটর তারকার আর প্রধান সার্জন আর প্রকৌশলী স-কুরা। স-কুরা হল একটি মানুষরূপী রোবট যে কিনা নিজেকে মানুষ বলে দাবি করে। সে আরো দাবি করে যে তার আত্ম-উপলব্ধি আছে, কিন্তু তার আশেপাশের মানুষরা এই ব্যাপারে কখনই নিশ্চিত হতে পারে নি। স-কুরার মুখ দেখে সহজে বোঝা যাবে না সে নারী কিংবা পুরুষ, এক্ষেত্রে তার বক্তব্য হল সে একজন পুরুষ। ঘরের মাঝখানে ছিল মানুষ-প্রমাণ একটা নীল রঙের বাক্স। বিষাণ জানে সেই বাক্স কী আছে। 

ডকটর তারকারের বয়স বিষাণর মতনই, একগুচ্ছ না-আঁচড়ানো সোনালী চুল এলোমেলোভাবে মুখটাকে ঘিরে আছে। সে দাঁড়ানো আর একজন নারীকে পরিচয় করিয়ে দেয়, “ইনি ডকটর বিনতা। ডামুরি অভয়ারণ্যের মানুষজনদের দেখাশোনা করেন।” বিনতা মাথা নিচু করে সম্ভাষণ করে, বিষাণও করে। “আমার থেকে বয়সে ছোটই হবে বিনতা,” ভাবে বিষাণ। বিনতা বিষাণকে উদ্দেশ্য করে বলে, “ডকটর বিষাণ, আপনি আমাকে চিনবেন না, কিন্তু আপনাকে আমি এখানে কাজের আগে দুটো কথা বলতে চাই যদি ডকটর তারকার আমাকে একটু সময় দেন।” তারকার আশ্চর্য হয়, কিন্তু সম্মতিসূচকভাবে মাথা নোওয়ায়। বিনতা স-কুরার দিকে তাকিয়েও মাথা নোয়ায়, স-কুরাও তার জবাব দেয় মাথা নিচু করে। তারপর বিনতা বিষাণকে জানালার কাছে যেতে ইঙ্গিত করে। বিষাণও খুব বিস্মিত হয়ে জানালার দিকে এগোয়। বিনতা পাশে হাঁটতে হাঁটতে বলে, “ডকটর বিষাণ, আপনার কথা আমি অনেক শুনেছি। শুধু সংবাদমাধ্যমে নয়, আমি আপনার কথা শুনেছি আপনার একজন নিকট মানুষের কাছ থেকে।” 

বিষাণ জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় বিনতার দিকে। 

“অদিতা সান আমাকে আপনার কথা বলেছে।” 

“অদিতা সান? অদিতা - বন বিশেষজ্ঞ?” বিস্ময়ের বাধ মানে না বিষাণের। 

“হ্যাঁ, ওনার কাছ থেকেই,” সায় দেয় বিনতা। 

“অদিতা কোথায় এখন?” প্রশ্ন করে বিষাণ। 

জানালার বাইরে গাছের মাঝ দিয়ে বড় রাস্তাটা দেখা যায়। অল্প কিন্তু যথেষ্ঠ আলোয় লোকজন হেঁটে যাচ্ছে, সাইকেল চালাচ্ছে, এক চাকার বাহনে মনে হয় যেন ভেসে যাচ্ছে। আকাশে সন্ধ্যাতারা জ্বলজ্বল করছে, তার একটু ওপরেই উজ্জ্বল বৃহস্পতি। আর তার ওপরে তৃতীয়ার চাঁদের ফলা। বিনতা বিষাণের চোখে চোখ রাখে, তারপর ডান হাতটা আলতো করে ওপরে তুলে ঘরের মাঝখানে রাখা নীল বাক্সটার দিকে বাড়িয়ে দেয়। 

অদিতা যে ডামুরিতে ছিল বিষাণ জানত, কিন্তু গত কুড়ি বছর তারা নিজেদের মধ্যে কোনো যোগাযোগ রাখে নি। বাইরের সন্ধ্যার বিষণ্নতায় বিষাণের মনে পড়ে দক্ষিণ আমেরিকার মাদ্রে দে দিওস নদীর পাড়ে সেই অবিরাম বর্ষার কথা, অদিতার অশ্রুধারার কথা। সেই কান্না বিষাণ শেষ পর্যন্ত আর সইতে পারে নি, অদিতাও বিষাণের মৌনতাকে সহ্য করতে পারে নি। দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ফিরে দুজন পৃথিবীর দু প্রান্তে চলে গিয়েছিল। 

জানালার বাইরে চাঁদটার দিকে তাকিয়ে থাকে বিষাণ। তৃতীয়ার চাঁদ কিছুক্ষণ পরেই ডুবে যাবে, তার কাস্তের ফলায় মের ক্রিজিয়ামের কালো সমতল দেখা যাচ্ছে। একশো বছরেরও আগে অদিতা আর বিষাণ চাঁদের মের ক্রিজিয়ামের ধারে এক মানমন্দিরে গিয়েছিল এক সপ্তাহের ছুটি কাটাতে। অদিতা হয়তো গিয়েছিল তার ছোটবেলার চাঁদে ভ্রমণের স্মৃতি রোমন্থন করতে। তাদের সঙ্গে ছিল তাদের সন্তান, দশ বছরের সৌম্যদর্শন বালক সেনভা। সবই ঠিক ছিল, চাঁদের গহ্বরে ঘুরে বেরানো, কম ওজনে হাইজাম্প দেওয়া, উজ্জ্বল নক্ষত্রের আকাশে পৃথিবীকে দেখা, ভায়োলিনের বাজনা উপভোগ করা। কিন্তু অদিতা তার ছোটবেলায় চাঁদে একটা বিভীষিকার সাক্ষাৎ পেয়েছিল, সেটা তার মনে ছিল না। চাঁদের দিগন্তে সে কি যেন একটা দেখেছিল। সেই বিভীষিকার কথা বিষাণও জানত না। শুধুমাত্র তখনই সেটা অদিতার মনে পড়ল যখন এক দিন সে দেখল সেনভা চাঁদের পোষাক পরে একা একাই মানমন্দিরের নিচের দরজা দিয়ে বেড়িয়ে যাচ্ছে। অদিতা বেতারে চিৎকার করে সেনভাকে ডাকল, কিন্তু মনে হয় সেনভা তার সব যোগাযোগের যন্ত্র বন্ধ করে রেখেছিল। অদিতা সঙ্গে সঙ্গেই জরুরী অবস্থায় সাহায্য চাইবার ব্যবস্থাগুলো চালু করেছিল, অনুসন্ধানী রোবটদের দুমিনিটের মধ্যে সেনভাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু ততক্ষণে সেনভা একটা বড় পাথরের আড়ালে চলে গিয়েছিল। রোবটগুলো সেখানে যেয়ে তাকে আর খুঁজে পায় নি। সেনভার উষ্ণ পদচিহ্নও এক জায়গায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। 

সেনভা যেভাবে হাঁটছিল তাতে অদিতার মনে হয়েছিল সে যেন এক সম্মোহনের মধ্যে আছে। এমন একটা সম্মোহন যা কিনা অদিতা তার ছোটবেলায় অনুভব করেছিল চাঁদের দিগন্তে কিছু একটা দেখে। কি দেখেছিল সে বলতে পারবে না, কিন্তু সে অনুভব করেছিল সেই জিনিসটা তাকে ডাকছে। সেই ডাকে অদিতা সাড়া দেয় নি, সেই ডাকে তার সারা শরীরে কাঁটা দিয়েছিল, সেই ডাকে বিভীষিকার ছাপ ছিল। কিন্তু সেনভা নিজেকে আটকাতে পারে নি, সেনভা সেই ডাকে চাঁদের বায়ুরোধী পোষাক আর হেলমেট পরে বের হয়ে গিয়েছিল চাঁদের ঊষর প্রান্তরে । অন্ততঃ এই ছিল অদিতার বিশ্বাস। এটাই সে বলেছিল মানমন্দিরের লোকজনদের, বিষাণকে। কেউ তার কথা বিশ্বাস করে নি, তবে পুরো চন্দ্রপৃষ্ঠ তন্ন তন্ন করেও সেনভার খোঁজ পাওয়া যায় নি। একটা মানুষ চাঁদের বুক থেকে উধাও হয়ে যাবে সেটাও আবার অবিশ্বাস্য মনে হয়েছে। সেনভা সেই যে হারালো, আর তাকে পাওয়া গেল না। 

সেনভার বয়স ছিল তখন দশ। তার আট বছর বয়সের একটি মস্তিষ্কের কপি ছিল। সেই মস্তিষ্ককে একটি নতুন সৃষ্ট দেহতে পুনরুজ্জীবিত করা হয়েছিল। অদিতা ও বিষাণ দুজনেই নতুন সেনভাকে কীভাবে তাদের জীবনে গ্রহণ করবে বুঝে পাচ্ছিল না। এই সেনভার মুখ আদি সেনভার মত দেখতে হলেও তাতে কি যেন একটা খাদ ছিল, নতুন সেনভাও বুঝেছিল তাকে তার বাবা মা পুরোপুরি গ্রহণ করে নি। নতুন সেনভা বিদ্রোহী হল, এমন সব কাজ করতে লাগল যে তার বাবা মাকে পুলিশের, মনোবিজ্ঞানীদের সাহায্য নিতে হল। অবশেষে তার তেরো বছর হলে তাকে কর্ত্তৃপক্ষ উত্তর আমেরিকার একটা সংশোধনাগারে পাঠিয়ে দিল। এরপর সেনভার সঙ্গে অদিতা আর বিষাণের কয়েকবার দেখা হয়েছে, কিন্তু বড় হলে সেনভা তাদের সঙ্গে আর সম্পর্ক রাখতে অস্বীকার করে। 

বিষাণ আর অদিতাও একসঙ্গে থাকতে পারে না। 

বিনতার মুখের দিকে তাকিয়ে বিষাণ বোঝে এসব কথাই বিনতা জানে। সে বলে, “কীভাবে? অদিতা কীভাবে মারা গেল?”



পঞ্চম পর্ব

‘কীভাবে, অদিতা কীভাবে মারা গেল?’ আবার প্রশ্ন করে বিষাণ। সেই প্রশ্ন যেন এক দুঃসহ হতাশায় ভারাক্রান্ত ছিল। বিনতা জানালার বাইরে ঘনায়মান অন্ধকারের দিকে তাকায়, দ্বিধা করে। দ্বিধা করারই কথা। একটি তীক্ষ্ণ শলা অদিতার হৃদযন্ত্রকে ভেদ করেছিল। একটি তীর, যে ধরণের তীর মানুষ ব্যবহার করে নি গত চার হাজার বছর। এখনকার তীরন্দাজরা শুধুমাত্র খেলাধূলায় অংশগ্রহণ করে, তাদের তীর অত্যাধুনিক প্রকৌশলে নির্মিত। কিন্তু এই তীরটি ছিল খুবই সাধারণ, শাল কাঠের লম্বা শলাকা, তবে সামনের শলাকাটি ছিল উজ্জ্বল মসৃণ ধাতুর।


‘আর তার চোখের ভিডিও বোধহয় চালু ছিল না?’ জিজ্ঞেস করে বিষাণ। ‘না,’ উত্তর দেয় বিনতা, ‘অদিতা সান খুব কম সময়ই সেটা চালু রাখতেন।’

প্রতিটি চোখের মণির পেছনে, রেটিনার ওপর খুবই ছোট একটি স্বচ্ছ ক্যামেরা লাগানো থাকে। সেটি দিয়ে মানুষ চোখে যা দেখে তারই ছবি কোনো ধরণের ঝামেলা ছাড়াই তুলে নিতে পারে। কিন্তু সেটাকে চালু করার জন্য কপালের বাঁ দিকে চাপ দিতে হবে। অথবা রেকর্ড করার চিন্তা করলেই হবে, সেই চিন্তাই নিউরন সমষ্টির মাধ্যমে ক্যামেরা চালু করবে। তবে শেষের পদ্ধতির জন্য কিছু অনুশীলনের প্রয়োজন। অনেকে তাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে ধরে রাখত সেই ভিডিওতে, কিন্তু বেশীরভাগ মানুষই তাদের একান্ততাকে মূল্য দিত, তাদের চোখের ভিডিও চালু থাকত না।

‘তবে উনি অডিও রেকর্ড করেছেন,’ বলে বিনতা, ‘সেখানে একটা বাঁশির শব্দ ছিল।’ ‘বাঁশি?’ বিস্ময়ে প্রশ্ন করে বিষাণ। ভিডিও না করতে চাইলে অডিও রেকর্ড করার সুযোগ রয়েছে, একটি কানের ভেতরে খুবই ছোট একটি যন্ত্র থাকত। 

‘হ্যাঁ, মনে হয় বাঁশ বা ঐ জাতীয় কোনো কিছুর বাঁশী। ইলেকট্রনিক শব্দ নয়,’ উত্তর দেয় বিনতা। একটু দূরে ডকটর তারকার ও স-কুরা অপেক্ষা করে। তাদের দিকে তাকিয়ে বিনতা বলে, ‘ওনারা অপেক্ষা করছেন, তাঁদের বোধহয় আপনার কাছে কিছু জিজ্ঞাস্য আছে। আমারও আরো কিছু বলার আছে, তবে সেটা পরে বলা যেতে পারে।’

বিষাণ আর বিনতা ফিরে আসে ডকটর তারকার ও স-কুরার কাছে। তারকার গলাটা পরিষ্কার করে নেয়, প্রশ্নটা করতে ইতস্তত করে, তারপর বিষাণের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘আপনি কি জানেন অদিতা সান বেঁচে থাকতে চাইছিলেন না?’ বিষাণ এই প্রশ্নে আশ্চর্য হয়। সে এখন বুঝতে পারে কেন তাকে এমন জরুরীভাবে ডাকা হয়েছে। সময় নেয় উত্তর দিতে, সে কি এটা জানত? সে ভাবে, সে জানত আবার জানত না। এই পৃথিবীতে আত্মহত্যা করে মুক্তি পাওয়া যায় না, তাকে ফিরিয়ে আনা হয়। চাঁদের বুকে তাদের দশ বছরের ছেলে সেনভা হারিয়ে যাবার পরে, নতুন সেনভাকে গ্রহণ না করতে পারার যন্ত্রণা অদিতাকে তাড়া করে বেরিয়েছিল। অদিতা তার মা’র মৃত্যুও গ্রহণ করতে পারে নি। অদিতা বাঁচতে চায় নি, কিন্তু সেই ইচ্ছাকে যে সে সরকারিভাবে নথিভুক্ত করেছিল সেটা বিষাণ জানত না। ‘না,’ উত্তর দেয় বিষাণ, মাথা নাড়িয়ে।

ডকটর তারকার বলেন, ‘অদিতা সান তাঁর এই ইচ্ছেটা নথিভুক্ত করেছেন সাত বছর আগে। ওনার আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। তারপরে দুবার তাঁর মস্তিষ্ককে কপি করা হয়েছে। আপনি বুঝতে পারছেন সেই মস্তিষ্কের মাঝে না-বাঁচার সুপ্ত ইচ্ছাটা প্রথিত আছে। আপনার কি মনে হয় সেই কপি-করা মস্তিষ্কের মাঝে লুকান ইচ্ছা তার নিজের দেহকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে?’

বিষাণ বুঝতে পারে কেন তাকে ডাকা হয়েছে। সে অদিতার সঙ্গীবন্ধু ছিল বলে নয়, বরং অদিতার মস্তিষ্কের একটা বিশেষ দিককে পর্যালোচনা করার জন্য তারকার তাকে ডেকেছে। যে বেঁচে থাকতে চায় না তার কপি-করা মস্তিষ্ক তারই জৈবিক দেহে বসাতে গেলে কিরকম প্রতিক্রিয়া হবে সেটা নিয়ে তারকার চিন্তিত ছিল।

জানালার বাইরে অন্ধকার গাঢ় হয়ে উঠছে। বাইরে রাস্তায় মৃদু আলো, চলমান যান, কাজ থেকে হেঁটে ফিরছে মানুষ, কিন্তু সেখান থেকে কোনো শব্দ আসে না। কেন জানি বিষাণ সেদিকে তাকিয়ে তার ছোটবেলার কথা ভাবে, দূরে কোথাও বন্দরে জাহাজের বাঁশি বাজছে, জাহাজটা এখনই ছেড়ে যাবে কোলাহলময় লোকালয়, পাড়ি জমাবে নিঃসঙ্গ অথই পারাবারহীন সমুদ্রে। তার নিজের মা’র কথা মনে পড়ে। নতুন চট্টগ্রাম শহর সমুদ্রের জলে ডুবে গেলে তারা চলে এসেছিল বিশালগড়ে। সেখানে জাহাজের বাঁশি আর শোনা যেত না। একদিন সন্ধেবেলা রাস্তা থেকে জাহাজের ভেঁপুর মত শব্দ শোনা গেলে মা বলেছিল, ‘শুনছিস বিষাণ, জাহাজের শব্দ, আমাদের পুরনো বাড়ির কথা মনে করিয়ে দিল। তোর মনে পড়ে ছোটবেলার কথা।’ মা’র এই স্মৃতিটা বিষাণকে সব সময় তাড়া করে বেড়াত, বিষাদে ভরিয়ে দিত। অদিতার মনও তার মা’র স্মৃতিতে ভরে ছিল, প্রায়ই স্বপ্নে মাকে দেখত।

আমরা দুজনাই এক ধরণের বিষাদে পূর্ণ ছিলাম, ভাবে বিষাণ, এক ধরণের মেলানখোলিয়া। মেলানখোলিয়া যা কিনা আমাদের অস্তিত্বকে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রাখে। কিন্তু মনের বিষাদ কি এমন এক দুর্দমনীয় ইচ্ছায় পরিণত হতে পারে যা কিনা সুপ্ত থেকে নিজের দেহকে বিসর্জন দিতে পারে? অদিতা কি নিজের মস্তিষ্ককে সেভাবে ট্রেনিং দিতে পারে? ধ্যান দ্বারা হৃদযন্ত্রকে হয়ত নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, কিন্তু তাকে কি বন্ধ করে দেওয়া যায়? কপি করা মস্তিষ্ককে দেহর সাথে সংযোজনের সময় সেটি কি বিদ্রোহ করতে পারে যদি বিদ্রোহের বীজ সেখানে বপিত থাকে?

‘এরকম ঘটনা কি আগে হয়েছে?’ ডকটর তারকারের প্রশ্নে বিষাণের সম্বিত ফিরে আসে। 

‘আগে কি হয়েছে? হয়েছে, নতুন দেহকে কপি-করা-মস্তিষ্ক প্রত্যাখ্যান করেছে, তবে সেগুলো কারিগরি ভুলের জন্য হয়েছে, মস্তিষ্কের সুপ্ত ইচ্ছার জন্য হয় নি। সেইসব ক্ষেত্রে কপি-মস্তিষ্ককে দেহের সঙ্গে সংযোজনে নিতান্তই কিছু ডাক্তারি ভুল করা হয়েছিল,’ বিষাণ বলে। 

বিষাণ চাইছিল না অদিতার প্রাণহীন দেহটা দেখতে। তীরটা সরিয়ে অদিতার শরীরকে সংরক্ষণ করার জন্য প্রয়োজনীয় সব কাজ বিনতা ডামুরি গবেষণাগারেই করেছিল। ডকটর তারকার আর স-কুরার কাছে দরকারি সমস্ত তথ্য ইতিমধ্যেই আছে। নতুন মস্তিষ্ক বসানোর অস্ত্রোপচারের কাজটা প্রায় পুরোপুরিই স্বয়ংক্রিয়, দু-একটা ছোটখাটো সূক্ষ্ণ কাজ স-কুরাই করে নিতে পারে। ডকটর তারকার কাজটার তত্বাবধানে নিযুক্ত। অদিতার কপি-মস্তিষ্ককে ইতোমধ্যে মাটির নিচের ক্রায়োজেনিক হিমাগার থেকে নিয়ে আসা হয়েছে। এই পদ্ধতিটি স্বয়ংক্রিয়, তাপ, চাপ, আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রিত বাক্সটি বিশেষ রেল ব্যবস্থায় উঠে আসে এই ঘরটিতে। বিষাণ ঘরে ঢুকেই খেয়াল করেছিল ঘরের কোনায় লাল বাক্সটি।

তারকার জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনার কি মনে হয় প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়া শুরুর সময় হরমোন আর কর্টিসোল মাত্রা ঠিক করা দরকার? আমি জানি এটা খুবই সেকেলে পন্থা, কিন্তু জিন বা ডিএনএ পর্যায়ে হস্তক্ষেপ করার উপায় আমাদের নেই।’

‘না, না, প্রমিত পন্থায় যেভাবে হবার কথা সেভাবেই এগোন,’ বলে বিষাণ, ‘আমরা সবাই একটা প্রাকৃতিক উপায়ে বিবর্তিত হচ্ছি, সেখানে অচেতন মস্তিষ্কে হস্তক্ষেপ করাটা উচিত হবে না। যতক্ষণ না অদিতার চেতনা ফিরে না আসছে ততক্ষণ আমরা কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারব না। আপনি প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়া শুরু করুন। আমার যতদূর মনে হয় অদিতা সান তাঁর দেহকে প্রত্যাখ্যান করবেন না।’

বিষাণের কথায় ডকটর তারকার স্বস্তি পেল, সে বিষাণকে মাথা নুইয়ে সম্মান জানাল, বিনতার দিকে তাকিয়ে একইভাবে পুরো দেহ ঝুঁকিয়ে বিদায় নিয়ে পাশের অপারেশন ঘরে চলে গেল। স-কুরা তার দেহে প্রথিত যোগাযোগ মাধ্যম দিয়ে অদিতার দেহ যে নীল বাক্সে রাখা আছে সেই বাক্সটাকে চালু করল। একটা চলন্ত বেল্ট বাক্সটাকে অপারেশন ঘরে নিয়ে গেল। অদিতার কপি-করা মস্তিষ্ক রাখা লাল বাক্সটাও একই পদ্ধতিতে সেই ঘরে গেল। বাক্স দুটোর পেছনে স-কুরাও প্রস্থান করল। 

বিষাণ ভাবে, নতুন যে অদিতা হবে সে কি মাদ্রে দে দিওস নদীর পাশে পুরনো সেনভার জন্য কাঁদবে। নতুন সেনভাকে তারা দুজনেই ভালবাসতে চেয়েছিল। নতুন সেনভার স্মৃতি, পরিচয়, আত্মউপলব্ধি অবিকল আদি সেনভার মতই ছিল। সেই সেনভা তাদের বাবা আর মা বলেই ডেকেছিল। তারাও তাকে গ্রহণ করতে চেয়েছিল তাদেরই ছেলে হিসাবে, কিন্তু নতুন সেনভা পুড়নো সেনভার সবকিছু ধারণ করেও তাদের ছেলে হয়ে উঠতে পারে নি, কোথায় যেন একটা খাদ থেকে গিয়েছিল। ওপরে গ্রহণ করলেও হৃদয় থেকে সেই সেনভাকে তারা সন্তান হিসাবে মেনে নিতে পারে নি। নতুন সেনভা সেটা বুঝেছিল।

সে কি নতুন অদিতাকে মেনে নিতে পারবে?

এর থেকে মুক্তি নেই, ভাবে বিষাণ, মহাবিশ্বের নিঃস্পৃহ অচেতনার মাঝে এটা আমাদের অস্তিত্বের সঙ্কট। দীর্ঘজীবী হয়েও আমরা সেই সঙ্কটের নিরসন করতে পারি নি। যে চলে যায় তাকে ঠিক ফিরিয়ে আনা যায় না। চাঁদে সেনভা হারিয়ে যাবার পরে অদিতা ও বিষাণ আর চাঁদে ফিরে যায় নি। মঙ্গলে যাবার জন্য অনেকবার ডাক পড়েছিল কিন্তু সেগুলোতে তারা সারা দেয় নি। মঙ্গলকে দ্বিতীয় পৃথিবী বানানোর তৃতীয় পর্যায় তখন সবে শুরু। বায়ুমণ্ডলের চাপ বাড়ানোর জন্য মেরুতে জমা নিরেট কার্বন-ডাই-অক্সাইডকে বাষ্পীভূত করা হচ্ছিল আর বায়ুমণ্ডলকে ধরে রাখার জন্য মঙ্গলব্যাপী চুম্বকক্ষেত্র সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছিল। চুম্বকক্ষেত্রের জন্য মঙ্গলকে চক্রাকারে পেঁচিয়ে কিছু অতিপরিবাহী বিদ্যুতের তার বসানো হচ্ছিল। তবু মহাকাশ থেকে আগত শক্তিশালী মহাজাগতিক কণা থেকে বাঁচতে কর্মীদের মাটির নিচে বসবাস করা ছাড়া উপায় ছিল না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মঙ্গলে স্থায়ী বাসস্থান কারুরই হয় নি। ওরকম নিম্ন মহাকর্ষীয় অঞ্চলে বাস করা ছিল মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। বায়ুমণ্ডলে বায়ুচাপ ও অক্সিজেনের পরিমাণ বৃদ্ধি সম্ভব, গ্রহের উপরিভাগের তাপমাত্রা বাড়ান সম্ভব, মহাজাগতিক কণা থেকে দেহকে রক্ষা করাও হয়ত সম্ভব, কিন্তু সঠিক মাধ্যাকর্ষণ সৃষ্টি সম্ভব নয়। আর মানুষের কঙ্কাল আর মাংসপেশি পৃথিবীর মত মাধ্যাকর্ষণ ক্ষেত্র না পেলে ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায়। তবু কিছু সাহসী অভিযাত্রী মঙ্গলকে স্থায়ী বাসস্থান করতে চেয়েছিল, কিন্তু যেখানে সূর্যালোক অস্পষ্ট, চাঁদ যেখানে নেই, যেখানকার আকাশ দিনের বেলা নীল নয়, যেখানে জল ঝর্ণা হয়ে বয়ে যায় না, যেখানে উঁচু গাছের বন দিনের আলোকে ঢেকে দেয় না, যেখানে রঙিন জংলী ফুলের প্রান্তর পাহাড়ের পাদদেশকে ঢেকে দেয় না সেখানে মানুষ বেশী দিন থাকতে পারে না। তাই মঙ্গল তাদের শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে পারে নি।

এর মধ্যে নতুন সেভানের অগ্রহণযোগ্যতা অদিতাকে বিষাদের বিশাল খাদে নিমজ্জিত করল। ধীরে ধীরে অদিতা বিষাণের কাছে অপরিচিতা হয়ে উঠল। নতুন সেভানকে উত্তর আমেরিকার একটি সংশোধানাগারে ভর্তি করার পর বিষাণ আর অদিতার জীবনের পথ আলাদা হয়ে যায়। অদিতা বলত, ‘আমরা যাই করি না কেন তুমি আর আমি পৃথক সত্তা, দুটি আলাদা জীব যাদের মস্তিষ্ক করোটির দেয়াল দিয়ে ঘেরা। সেই কঠিন নিরেট দেয়াল ভেদ করে দুটি মন কখনই এক হতে পারে না। এই ভিন্ন অস্তিত্বই মানুষকে বিবর্তনের পথ ধরে এইখানে নিয়ে এসেছে, আবার এক হতে পারে নি বলে তারা সারা জীবন এই মহাবিশ্বে একাকী জীবন কাটিয়ে গেছে।’

‘তাহলে তুমি, তুমি কিরকম সত্তা তৈরি করতে? তোমার মহাবিশ্ব কেমন হত? সেখানে কি বিষাদ থাকত না?’ জিজ্ঞেস করেছিল বিষাণ।

‘আমি? আমি যদি ঈশ্বর হতাম,’ উত্তর দিয়েছিল অদিতা, ‘আমি যদি ঈশ্বর হতাম আমি আলোর জীব তৈরি করতাম, যে জীবের শক্তির জন্য ঘাস লতা পাতা মাংসের দরকার হয় না, যে জীব সরাসরি নক্ষত্রের বিকিরণ থেকে শক্তি আহরণ করে। সেই মহাবিশ্বে আলোর গতি অসীম না হলেও আমাদের এই হাস্যকর সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিলোমিটার হত না। আমার আলোর জীব নক্ষত্র থেকে নক্ষত্রে বিচরণ করত প্রায় আলোর গতিতে, এমন কি এই অসীম ব্রহ্মাণ্ডের একটি গ্যালাক্সি থেকে আর একটি গ্যালাক্সিতেও সে যেতে পারত। মহাবিশ্বে কত কিছুই না দেখার আছে, কত অজানা গ্রহ, কত বিস্ময়কর সভ্যতা, কত নিহারীকা নক্ষত্র। আমি যদি সেসব তৈরিই করি তো আমার সৃষ্ট জীব কেন আটকা পড়ে থাকবে এই ছোট পৃথিবীতে, মহাবিশ্বের এক কোনায়। আমার সৃষ্ট জীব কেমন করে একটা ভাল শৌচাগার বানান যায় সেই চিন্তায় সময় ব্যয় করবে না।’

নক্ষত্র থেকে নক্ষত্রে বিচরণ করতে চেয়েছিল অদিতা, গ্যালাক্সি থেকে গ্যালাক্সি। সেই মহাবিশ্বে অস্তিত্বের সংকট নেই, ছেলেকে হারানোর বেদনা নেই, মাকে স্বপ্নে দেখে হতাশার অতল খাদে নিমজ্জিত হবার সম্ভাবনা নেই। সেই মহাবিশ্বের সত্তারা এক ধরনের কোয়ান্টাম ভাষায় কথা বলে, নিজেদের মাঝে যোগাযোগ রাখতে পারে শত আলোকবর্ষ দূরেও। অদিতা বলত যদি মহাবিশ্বকে বিশালভাবে সৃষ্টিই করা হয় তবে সেই বিশালত্বকে দেখবার জন্য, অনুভব করবার জন্য সামঞ্জস্যপূর্ণ জীবেরও সৃষ্টি প্রয়োজন।

কিন্তু অদিতা মানুষ হয়ে এমন এক মহাবিশ্বে জন্মেছিল যেখানে আলোর গতি সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিলোমিটার। যেখানে বিবর্তনের খাঁচায় মানুষ শুধু পৃথিবীতেই একটু স্বস্তি নিয়ে থাকতে পারে, যেখানে মানুষের দেহ মহাবিশ্বে চলাচলের জন্য নিতান্তই অনুপযোগী।

তারকার আর স-কুরা অপারেশন ঘরে চলে যাবার পর বিনতা ও বিষাণ কিছুক্ষণ মৌন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে ঘরের মাঝে। দুজনেই একটু অস্বস্তিতে থাকে, মৌনতাটা কিভাবে ভাঙবে সেটা নিয়ে দুজনেই ভাবে। অবশেষে বিষাণ বলে, ‘নিচে একটা ক্যাফে আছে, ওখানে কি যেতে চান?’ বিনতা সায় দেয়। দুজনের কাছেই অনেক প্রশ্ন জমা।

ছিমছাম ক্যাফেতে খুবই হালকাভাবে, প্রায় শোনা যায় না এমন একটা বাজনা বাজছে, করুণ ভায়োলিন। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কয়েকজন বসা। তাদের মৃদু কথোপকথন আর কফির কড়া গন্ধ জায়গাটাকে বিশেষ বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। কফি নিয়ে জানালার বড় কাচের পাশে দুজন বসে। তৃতীয়ার চাঁদ ততক্ষণে ডুবে গেছে। 

বিনতা বলে, ‘আপনাকে অদিতা সান কি কখনও একটা আঁধারের কথা বলেছেন?’ বিষাণ আশ্চর্য হয়, বলে, ‘আঁধার, কি ধরণের আঁধার?’

‘একটা সুনির্দিষ্ট আকারহীন অন্ধকার মেঘ,’ উত্তর দেয় বিনতা, ‘এমন একটা মেঘ যা কিনা আলো শুষে নেয়, যা কিনা আমরা যখন ঘরে একা থাকি তখন ঘরের কোনায় রূপ নেয়, বনের মধ্যে হাঁটলে বনের গভীরতম অংশ থেকে সেটি ছুটে আসে। এমন যেন তার একটা প্রাণ আছে।’ বিষাণ বিনতার কোনো কথাই ধরতে পারে না। বিনতা বলতে থাকে, ‘দু দিন আগে অদিতা সান আমাকে এই আঁধারের কথা বলেন। তিনি নাকি অনেক দিন ধরেই এই আঁধার দেখে আসছেন।’

বিষাণ বিনতাকে অবিশ্বাস করে না, কিন্তু সে জিনিসটা বুঝতে পারে না। বিনতা এমনভাবে এই আঁধারটা বর্ণনা করছে যেন সেটির জীবন আছে। বিনতা বিষাণকে জিজ্ঞেস করে, ‘আপনি নিজে সেরকম কখনো কিছু দেখেন নি?’ ‘না,’ উত্তর দেয় বিষাণ। তারপর বলে, ‘আপনি জানেন আমাদের ছেলে সেনভা চাঁদে হারিয়ে গিয়েছিল। সে বায়ুচাপ- নিয়ন্ত্রিত পোষাক পড়ে মানমন্দির থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে তাকে আমরা আর খুঁজে পাই নি। ঐ ছোট চাঁদে কেউ কি হারিয়ে যেতে পারে? তাকে যেন কেউ চাঁদ থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আপনি কি জানেন অদিতার যখন আট বছর বয়স তখন সে চাঁদে গিয়েছিল তার বাবা মার সাথে। সেখানে একদিন সে দিগন্তে কিছু একটা দেখতে পায়। দেখতে পায় এবং ভয় পায়। কিন্তু সে বলতে পারে না কি সে দেখেছে। এমন হতে পারে এই আঁধার অদিতার এইসব অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত।’ 

‘আমিও এই আঁধার দেখেছি,’ বলে বিনতা। ‘আপনি?’ আশ্চর্য হয় বিষাণ। ‘হ্যাঁ, যেদিন অদিতা সান সেই আঁধারকে আমার কাছে বর্ণনা করলেন, সেদিন রাতেই আমার ঘরে একটা আঁধারের মেঘ ঢোকে। আমার মনে হয় না সেটা স্বপ্ন ছিল। এমন যেন সেই অন্ধকার চুপ করে ঘরের কোনায় দাঁড়িয়ে ছিল যখন অদিতা আমাকে সেটির বর্ণনা দিচ্ছিলেন।’ এটুকু বলে বিনতা যেন শিউরে ওঠে। তারপর বলে, ‘এমন যেন সেই আঁধার ডামুরীতে বাসা বেঁধেছে। আমি জানি আপনার পক্ষে এটা বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে। যতক্ষণ না আপনি এটা নিজে না দেখবেন ততক্ষণ এটা এরকম হেঁয়ালির মতই লাগবে। আর একটা ব্যাপার, অদিতা সান বলেছিলেন একবার এরকম আঁধার কেটে গিয়েছিল একটা বাঁশীর শব্দে। বন থেকে আসছিল শব্দটা।’ 

‘বাঁশী? বনের বাঁশী! এরকম একটা বাঁশী অদিতার অডিও রেকর্ডিংয়ে ছিল না?’ প্রশ্ন করে বিষাণ। মাথা নাড়িয়ে সায় দেয় বিনতা। দুজনেই চুপ করে থাকে। বিষাণ ভাবে, ‘অদিতাকে কে হত্যা করল? যে হত্যা করেছে সে তো জানে এইভাবে মানুষকে হত্যা করা যায় না। নাকি সে জানে না। এরকম মানুষ কি এখনো পৃথিবীতে আছে যারা একেবারেই বিচ্ছিন্ন, যারা এখনো প্রাগৈতিহাসিক তীর ধনুক ব্যবহার করে। ডামুরীর বনে কি তারা লুকিয়ে থাকতে পারে? হয়তো অদিতা অজান্তে তাদের রাজ্যে প্রবেশ করেছিল, তাদেরকে চমকে দিয়েছিল। সেই বাঁশীর শব্দ কি তাদের সাথেই জড়িত? না, এটা একেবারেই অসম্ভব একটা ব্যাপার। এই সময়ে কোনোভাবেই ঐ ধরণের মানুষজন ডামুরির অরণ্যে লুকিয়ে থাকতে পারে না।’

তারপর বিষাণের মনে আর একটি চিন্তা ভর করে। অদিতা বাঁচতে চাইছে না। হয়তো এই পুরো ঘটনাটাই অদিতার সৃষ্টি। অদিতা একবার মৃত হয়ে এই প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে চাইছে। কেন যেতে চাইছে সেটা বিষাণ জানে না, কিন্তু অদিতার বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বিষাণের পরিচয় আছে। ডকটর তারকারের আশঙ্কাটা বোধহয় অমূলক ছিল না। অদিতা একবার মৃত হয়ে হয়ত চিরতরে মৃত হবার পন্থা খুঁজছে।

বিনতা বিষাণের কাঁচা-পাকা কোঁকড়ান চুল, চওড়া ললাট, রোদে পোড়-খাওয়া গালের চামড়ার দিকে তাকিয়ে ভাবে এই মানুষটা অদিতার জীবনের একটা বড় অংশে সঙ্গী ছিল। অদিতা বিষাণকে ভালবেসেছিল, তাদের বন্ধন কিসের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল? ঈর্ষা হয় বিনতার। ভাবে এই মানুষটি অদিতার কাছ থেকে অনেক কিছু পেয়েছে। কিন্তু সেই ভালবাসা এখন স্মৃতি, হয়ত বেদনাময় স্মৃতি। সেই স্মৃতি কি ছোরার ফলা হয়ে বিষাণকে রাতে জাগিয়ে রাখে, নাকি নিত্যনতুন মোহে ছোরার তীক্ষ্ণতা মুছে যায়? এই মানুষটির নতুন প্রেমিকা কিরকম মানুষ, ভাবে বিনতা।

বিষাণ বিনতার কালো ভুরু দুটির দিকে তাকায়, তারপর কালো চোখের মণিতে যেন নিজের প্রতিবিম্ব দেখে। তাই দেখে তার কেন জানি মনে হয় এই নারীটি অদিতাকে ভালবাসে। সেই ভালবাসায় অতৃপ্তি রয়েছে, অদিতার মেলানখোলিয়ায় সেই ভালবাসার স্থান পাওয়া কঠিন। বিষাণ ভাবে একটি প্রেম হারিয়ে গেছে চাঁদের প্রান্তরে, আর একটি গড়ে উঠতে পারে নি ডামুরির অরণ্যে। সেই অতৃপ্ত প্রেমের হতাশা বিষাণ যেন বোঝে, সেই আশাহীনতা তাকে বিনতার প্রতি সহমর্মী করে তোলে, সে বিনতার হাত স্পর্শ করতে চায়। কফি টেবিলের দুপাশে বসে অদিতাকে ঘিরে এভাবেই দুজনেরই চিন্তা আবর্তিত হয়, ওদিকে ‘নিলয়ের’ দোতলায় প্রাণহীন অদিতা অপেক্ষা করে পুনর্জন্মের। 


ষষ্ঠ পর্ব

ক্যাফের একটি কোনা থেকে মৃদু পিয়ানোর শব্দ ভেসে আসে। কাচের বড় দেয়াল পেরিয়ে বাইরের অন্ধকারে ফুটপাথের পরে রাস্তার দু-একটা গাড়ির আলো দেখা যায়। কেমন অদ্ভূতভাবে অদিতা তার জীবনে ফিরে এল, ভাবে বিষাণ, বিনতাকে জিজ্ঞেস করে, ‘কে অদিতাকে হত্যা করতে পারে?’ 


‘আমি বুঝতে পারছি না,’ বিনতা বলে, তার বাঁ হাতটা কপালে রেখে। মনে হয় সেই হাতটা তার মাথা থেকে একটা সুপ্ত জ্ঞান বের করতে চাইছে যা কিনা এই রহস্যের সমাধান দেবে। ‘আজ সকালে ড্রোন দিয়ে ওনার দেহ উদ্ধার করে নিয়ে আসার পর পরই নিয়ন্ত্রক দল তদন্ত করতে সেই জলাশয়ের ধারে গিয়েছিল। এখন পর্যন্ত অরণ্যে তারা অন্য কোনো মানুষের সন্ধান পায় নি। কিন্তু মানুষ ছাড়া ঐ তীর আর কে ব্যবহার করবে? পাঁজরের ফাঁক দিয়ে সেই তীর কেমন সুনিপুণভাবে হৃদযন্ত্র ভেদ করেছিল, এর জন্য দক্ষ হাত দরকার।’

‘হমমম,’ বলে বিষাণ গভীর চিন্তায়, ‘তবে আমাদের তীরন্দাজ একটি অ্যানড্রয়েড মানুষ-রোবট হতে পারে।’ 

‘তা হতে পারে,’ সায় দেয় বিনতা, ‘সেই জন্য হয়তো গোয়েন্দা দল মানুষের চিহ্ন পায় নি।’

‘তীরটা কোথায় এখন?’ বিষাণের প্রশ্ন। 

‘এই শহরেই কেন্দ্রীয় ফরেনসিক ল্যাবে। ওরা তীরটার বয়স, বানানোর পদ্ধতি, অতীত ইতিহাস ইত্যাদি অনুসন্ধান করছে। শহরের তীর-ধনুক ক্লাব থেকে আরম্ভ করে ওরা পৃথিবীর সব সৌখিন তীরন্দাজদের সঙ্গে যোগাযোগ করবে।’

বিষাণের কপালে চিন্তার ভাঁজরেখা আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেদিকে তাকিয়ে বিনতা ভরসার স্থল খোঁজে। আজ সারাদিন খুব ধকল গেছে। প্রথমে অদিতার হৃদপিণ্ড থেকে তীরটা বের করতে বেশ চাপ তাকে নিতে হয়েছে যদিও পুরো অপারেশন রোবট মাধ্যমেই করা হয়েছে এবং অপারেশন-উত্তর নিরাময় পন্থাগুলি অদিতার শরীরের ভেতরের ন্যানোযানগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করেছে। এরপর বিশালগড়ের নিয়ন্ত্রক সংস্থায় যোগাযোগ করতে হয়েছে। খবর দেবার আধ ঘন্টার মধ্যে দশজনের একটি দল এসেছে, ওদের সঙ্গে কথাবার্তা বলা বেশ কঠিন কাজ, পারলে লোকজন তাদের এড়িয়ে যায়। এই দলের আটজন ডামুরি অরণ্যের ভেতরে চলে গেল কয়েকটা ছোট ছোট যানে যে যানগুলো গাছপালার মধ্যে দিয়ে অনায়াসে উড়ে যেতে পারে। ওদের দুজন বিনতার সাথে আদিতার দেহ নিয়ে বিশালগড়ের মস্তিষ্ক সংরক্ষাণাগারের ‘নিলয়ে’ আসে। সারাদিন বলতে গেলে কিছুই খাওয়া হয় নি, আর এখন ক্লান্তিতে ঘুম নেমে আসছে। কফি খেয়েও সেই ঘুম কাটছে না। একটু শুতে পারলে ভাল হত, ভাবে বিনতা। শহরে তার একটা ছোট বাড়ি আছে, এছাড়া নিলয়ের কাছেই হোটেলে থাকতে পারে। একটু দূরেই পাঁচ রাস্তার একটা মোড়, সেখানে পর্যটকদের জন্য ছোট কিন্তু আরামের হোটেল রয়েছে। 

‘মানুষ কি আজন্ম হিংসা আর সন্ত্রাসের বীজ বহন করে?’ আনমনা ভাবেই কথাগুলো উচ্চারণ করে বিনতা। 


বিনতার ক্লান্তি বিষাণের অলক্ষিত থাকে না, কিন্তু তাকে বিশ্রাম নেবার কথা বলতে তার সাহস হয় না। বিনতার সঙ্গে তার সবে পরিচয় হয়েছে আর বিষাণ বিশ্বাস করে এইসব ক্ষেত্রে মানুষের নিজস্ব সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করা উচিত নয়। বিনতার প্রশ্নের উত্তর সে দেয় না, এর উত্তর তার ঠিক জানা নেই। অপরকে হত্যা করার আকাঙ্খা সম্বলিত কোনো দৃশ্যমান জিন মানব ডিএনএতে সরাসরি পাওয়া যায় নি যদিও অনেক গবেষক সম্ভাব্যতা তত্ত্ব ব্যবহার করে পরোক্ষভাবে মানুষকে হিংস্র হবার পেছনে কয়েকটি জিনের ভূমিকা দেখতে পেয়েছেন। অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন মানুষের সমাজে সংগঠিত হবার পেছনে হিংস্রতা কাজ করেছে। সে নিজে এই নিয়ে অনেক ভেবেছে। তবে গত কয়েক শ বছর ধরে হিংস্র অপরাধ ও সন্ত্রাসের মাত্রা ক্রমাগতই কমেছে। তবে পৃথিবীতে অপরাধের ছক বদলাচ্ছে, সেই ছকের মধ্যে একটা বড় পরিবর্তন এল যখন মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপনের প্রক্রিয়া যুক্ত হল। মৃত্যুর যেখানে অর্থ নেই সেখানে সরাসরি খুনের ধারণা বদলেছে। মানুষকে মেরে ফেললেও সে যখন বেঁচে ওঠে তখন নতুন ধরণের খুনীর আবির্ভাব ঘটেছে। 'হত্যা' যেখানে হত্যা নয় সেখানে মানুষকে মেরে ফেলার মধ্যে যে নৈতিক বাধা বর্তমান ছিল তা অনেকের জন্য অপসারিত হয়েছে। তুচ্ছ কারণে, বাক-বিতণ্ডার সূত্র ধরে যে ধরণের হত্যাকাণ্ড তার পরিমাণ, মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলে, বেড়ে গেল। এর সাথে যুক্ত হয়েছিল শখের সাইকোপ্যাথিক খুন। মানুষকে হত্যা করার মধ্যে যে এড্রেলানিন হরমোন-জনিত পৈশাচিক উন্মাদনা, শুধুমাত্র সেটুকু অনুভব করার অন্য এক শ্রেণীর খুনী সৃষ্টি হল। এদের মধ্যে একদল হল সিরিয়াল খুনী, তারা ছিল সাইকোপ্যাথ, মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন। জন্ম থেকে সাইকোপ্যাথদের জিন, মস্তিষ্কের গঠন ইত্যাদি বিচার করে তাদের পূর্ব থেকে চিকিৎসার কথা বিশ্ব পরিচালনা সংস্থা প্রতি পঁচিশ বছর অন্তর বিবেচনা করে, কিন্তু প্রতিবারই প্রতিনিধিরা খুব অল্প ভোটের ব্যবধানে স্বাধীন চিন্তা বা ফ্রি উইল রক্ষার্থে সেই প্রস্তাবকে পরাজিত করে। 


বাইরে রাস্তার আলোর দিকে তাকিয়ে থাকে বিনতা। সেই ফাঁকে, বিনতার অলক্ষে, তার মুখটাকে দেখে বিষাণ। কালো চুলের একটা গুচ্ছ কানের পাশ দিয়ে গালের ওপর পড়েছে। কানের লতিতে একটা খুবই ছোট দুল, তাতে চমকায় নীল অসিতোপল মণি। সেই মণি সম্মোহিত করে বিষাণকে, সে যেন বিনতার অশরীরী মনকে দেখতে পায় - অশান্ত অথচ শৃঙ্খলাময়, সরল জীবনের যাত্রী অথচ দুঃসাহসে বিমুখ নয়। সেই দুঃসাহসই হয়তো তাকে অদিতাকে ভাল বাসিয়েছিল। শেষের চিন্তাটা বিষাণের অনুমান, কিন্তু বিনতার চঞ্চল চোখের মণিতে এক অতৃপ্ত প্রেমিকার অসাহয়তাই যেন সে দেখেছিল।

বিনতার খেয়াল হয় বিষাণ তাকে দেখছে। নিজের গাল না দেখতে পেলেও বিনতা বোঝে তার মুখ লাল হয়ে উঠছে, সে নিজেও বুঝতে পারে না সেই রক্তিমতার কারণ। বিনতা ভাবে তার দ্রুত কিছু বলার দরকার, তাই কিছুটা না ভেবেই অগোছালভাবে বলে, বিষাণের দিকে না তাকিয়ে, ‘এমন কি হতে পারে অদিতা সান কাউকে এমন একটি জিনিস করতে দেখেছিলেন সেটা সেই জন গোপনে করতে চেয়েছিল, কাউকে দেখাতে চায় নি। সেই সাক্ষাতের বা সাক্ষ্যর স্মৃতি মুছে দিতে সে অদিতাকে হত্যা করেছে?’ 

বিষাণ বিনতার কথায় বিস্মিত হয়, এই অনুমানটা অমূলক নয়। বলে, ‘আপনি বলছেন সেই স্মৃতি মুছে দিতে সে বা তারা ডামুরির বনে আততায়ী পাঠিয়েছিল যে আততায়ীর চিহ্ন গোয়েন্দা বাহিনী খুঁজে পায় নি, কক্ষপথের উপগ্রহে ধরা পড়ে নি। তাহলে বলতে হবে সেই দল খুবই শক্তিশালী, তারা বিশ্ব পরিচালনা কমিটির সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারে?’ 

বিনতা বলে, ‘কোনো বড় ষড়যন্ত্র বলছেন? কিন্তু অদিতা সান কী এমন দেখেছেন যে তাঁকে হত্যা করে তাঁর স্মৃতি অপসারণ করতে হবে? পৃথিবীর সেই হিংস্র অতীত থেকে তো আমরা সরে এসেছি, তাই নয় কি?’

মাথাটা ওপর নিচ করে বিষাণ, কিন্তু বিনতা বোঝে না তার কথায় সে সায় দিচ্ছে কিনা। কয়েক সেকেন্ড সময় নেয় বিষাণ, তারপর বিনতার ধূসর গভীর চোখের মণির দিকে তাকিয়ে বলে, ‘আর এক ধরণের খুন হতে পারে, সেটা আবেগজনিত, ক্রাইম অফ প্যাশান।’ 

বিনতার চোখের তারারন্ধ্র কি বিস্ফারিত হল? দেখা দিল কি সেই চোখে ভীতি কিংবা অনুশোচনা? বিষাণ কল্পনা করে ডামুরির বনে এক ব্যর্থ প্রেমিকার ভাড়াটে আততায়ী একটি আধুনিক ধনুক থেকে ভয়ানক বেগে তীর ছুঁড়ে অদিতার হৃদপিণ্ড ভেদ করছে। হাস্যকর! নিজের কল্পনায় নিজেই হেসে ওঠে বিষাণ। 

‘হাসছেন কেন?’ বিনতা প্রশ্ন করে। 

‘না এমনিই,’ বিব্রত হয়ে বলে বিষাণ। বিনতা অনেকটা বুঝতে পারে, অথবা বুঝতে চেয়েও এই নিয়ে চিন্তা করতে চায় না। দুজনেই একটু অপ্রস্তুত হয়, নীরবতা নামে। বিনতা অস্বস্তিকর মৌনতা ভাঙতে কথা খোঁজে, অবশেষে খুঁজে পায়, বিষাণকে জিজ্ঞেস করে, ‘আপনি কি সেনভাকে অদিতা সানের কথা জানাবেন না?’ 

বিষাণের মাথায় সেনভাকে অদিতার মৃত্যুর সংবাদ জানানোর যে প্রয়োজন সেটা আসে নি, বিষাণের চোখের বিহ্ববলতায় সেটা বোঝে বিনতা। 

‘আপনি কি জানেন সেনভা এখন কোথায় আছে?’ বিনতার প্রশ্নের স্বরের মৃদুতায় বোঝা যায় সে বিষাণকে অপ্রস্তুত করতে চাইছে না। 

মাথা ওপর-নিচ করে বিষাণ, হ্যাঁ, সে জানে। অদিতা ও বিষাণ দুজনেই বহু চেষ্টা করেছে ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে, সেনভা তাদের সমস্ত প্রচেষ্টা প্রত্যাখান করেছে। চল্লিশ বছর কেটে গেছে শেষবার যখন সেনভার সঙ্গে দেখা হয়েছিল, পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের কেম্যান ব্রাক দ্বীপে। অদিতা ছেলের সঙ্গে দেখা করতে খুব জোর করেছিল, সেনভা অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাজী হয়েছিল। সেনভা তার মা বাবার গুণ পেয়েছে, ছোটবেলায় কয়েক বছর সে সংশোধনাগারে থাকলেও বড় হয়ে সে সমুদ্র বিজ্ঞানী হয়েছে। কিউবা দ্বীপের মায়াভরা ত্রিনিদাদ শহর থেকে একটা ছোট জাহাজে ক্যারিব সমুদ্রের গভীর থেকে জেগে ওঠা ছোট কেম্যান ব্রাক দ্বীপে গিয়েছিল অদিতা ও বিষাণ। দু হাজার বছর আগেও এর কাছে আরো দুটি দ্বীপ ছিল - গ্র্যান্ড ক্যামান ও ছোট ক্যামান দ্বীপ, তারা আজ সাগরের নীচে। 

সমুদ্রতীরে তরুণ সেনভা তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। মায়ের চোখ, নাক আর ভুরু পেয়েছিল সেভান, আর বাবার চোয়াল আর থুতনি। বাবার মতই অল্প কোঁকড়া চুল, তাতে লালচে আভা। চল্লিশ বছর তখন ছিল তার বয়স। সেনভা তাদের সঙ্গে বেশি কথা বলতে চায় নি, কিন্তু তারা বাতাসের ট্যাঙ্ক পেছনে বেঁধে সমুদ্রের নিচে ঝাঁপ দিয়েছিল। দ্বীপের অনতিদূরেই জলের নিচে ছিল প্রবাল প্রাচীর, সেই প্রাচীর যেরকম রঙীন, তাতে মাছের বাহারও ছিল রামধনুর বর্ণালীর মতন। সেই প্রাচীরের পরই সমুদ্রের তল হঠাৎ করেই নেমে যায় সাত কিলোমিটার, সেই জায়গাটাকে বলে ক্যামেন ট্রেঞ্চ। উত্তর আমেরিকা মহাদেশ ও ক্যারিব টেকটনিক পাত একে অপরের তুলনায় পাশাপাশি সরে যাবার সংযোগস্থলে সৃষ্টি হয়েছে সাগরের এই গভীর অংশ। অদিতা, বিষাণ ও সেনভা ডুবুরীর সরঞ্জাম পরে প্রবাল প্রাচীর পার হয়ে সেই অতলস্পর্শী খাদের ধারে ভাসছিল, কি রোমাঞ্চকর জায়গা ছিল সেটা। বিষাণ আজও সেই অতল অন্ধকার স্মরণ করে শিউরে ওঠে। তবু চল্লিশ বছর আগে সেই মুহূর্তে, জলের গভীরে ভাসতে ভাসতে বিষাণ ভেবেছিল ছেলের সঙ্গে তার এক বিশেষ সম্পর্ক রচিত হয়েছে যা দিয়ে সে কিনা ভবিষ্যতের সেতু গড়তে পারবে। না, সেরকম কিছুই হল না, বরং ক্যামান থেকে বিশালগড়ে ফিরলে যতটুকু সম্পর্ক আগে ছিল সেটাও ভেঙে গেল। চাঁদে হারিয়ে যাওয়া প্রথম সেনভার মত দ্বিতীয় সেনভাও তার জীবন থেকে অদৃশ্য হল। অদিতাও পরে ডামুরির বনে চলে গেল। 

ক্যামানের সাক্ষাতের প্রায় পনেরো বছর পরে সেনভা একটা বড় অভিযাত্রীদলের সঙ্গে বৃহস্পতির উপগ্রহ ইউরোপা গিয়েছিল ইউরোপার উপরিভাগের বরফের নিচে সমুদ্র নিয়ে গবেষণা করতে। এই খবরটা সেনভা তাকে দেয় নি, সংবাদ মাধ্যম থেকে তার এই যাত্রার কথা শুনেছিল বিষাণ। সেনভার বৃহস্পতিগামী মহাকাশযানে ওঠা, এক বছর পরে ইউরোপায় অবতরণ, ইউরোপার চিরজমাট বরফকে ড্রিল দিয়ে ভেদ করে তার শীতল সমুদ্রে সাবমেরিন নামানো, সাবমেরিন করে সেই অন্ধকার জলে অভিযান, এর দু বছর পরে পৃথিবীতে ফেরা এ সব কিছুই গণমাধ্যমে এসেছে, পৃথিবীর লোকেরা তাকে চিনেছে, শুধু সে নিজে একটিবারও তার বাবাকে যোগাযোগ করে নি। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিষাণ। বলে, ‘হ্যাঁ, ওকে খবরটা দেয়া দরকার।’ 

বিনতা বলে, ‘আপনি ওকে ফোন করুন, আমি এর মধ্যে একটু হেঁটে আসি।’ বিনতা চেয়ারটা পেছনে ঠেলে দাঁড়ায়। বিষাণও দাঁড়ায়, মাথা সামনে ঝুঁকিয়ে বিনতাকে সাময়িক বিদায় জানায়। বিনতা ক্যাফের বাইরে চলে গেলে বিষাণ কপালের ডানদিকে চাপ দিয়ে সেনভার নাম বলে। এটুকুই যথেষ্ঠ, সেনভা যেখানেই থাকুক, পৃথিবীর যে কোনো জায়গায়, চাঁদে, মঙ্গলগ্রহে কিংবা কোনো গ্রহাণুপুঞ্জের এক্সপেরিমেন্টে, এই যোগাযোগ ব্যবস্থা সেনভাকে ঠিকই বের করবে। কপালের পাশে লাগান ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ইলেকট্রনিক চিপ সবই জানে কোন সেনভাকে বিষাণ খোঁজ করছে। উত্তর মেরুর ঊর্মিময় সমুদ্রের এক জাহাজে খুঁজে পায় তাকে বিষাণ। এক কালের বরফে ঢাকা আর্কটিক মহাসমুদ্র আজ উন্মুক্ত। উত্তর সাইবেরিয়ার বন্দর থেকে উত্তর কানাডায় সমুদ্রপথে সহজেই যাওয়া যায়। কিন্তু সেই সমুদ্র বেশীরভাগ সময়ই থাকে ঝড়-ঝঞ্ঝায় উত্তাল। সেই উত্তাল সমুদ্রে এক জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে সেনভা বলে, ‘হ্যালো।’ 

পিতা-পুত্রকে কথা বলার সুযোগ দিয়ে বিনতা ক্যাফের বাইরে বের হয়। হেমন্তের রাত, কিন্তু বাতাস এখনো গরম। পথের ধারের গাছগুলো নিজের আলোয় নানাবিধ রঙে উজ্জ্বল। এক ধরণের ব্যাক্টেরিয়ার সাথে উদ্ভিদের যোগ, দিনের বেলা সূর্যের থেকে গাছ শক্তি নেয়, রাতের বেলা উচ্ছসিত থাকে সেই গাছ বায়োলুমিনেসেনসের আলোতে, পথচারী চলে গাছের প্রাকৃতিক আলোয়। সেই আলোয় পা ফেলে সাত-পাঁচ ভাবে বিনতা, ‘আবেগজনিত অপরাধ, ক্রাইম অফ প্যাশান,’ বলে বিষাণ তার চোখের দিকে তাকিয়েছিল। বিষাণ কি বুঝতে চাইছিল তার প্রতিক্রিয়া? তার দৃষ্টি সেকেন্ডখানেক মাত্র স্থায়ী হলেও তার অর্থ বিনতার অলক্ষিত থাকে নি। 

‘নিলয়’ থেকে কয়েক শ মিটার হাঁটলেই রাস্তাটা একটা বড় চত্বরে এসে পড়ে। চত্বর থেকে আরো চারটা রাস্তা বেরিয়েছে, মাঝখানে একটা সুন্দর ফোয়ারা। গাড়ি, যানবাহন চত্বরের বাড়িগুলোর পাশে ঘেঁষে যায়, মাঝখানে ধূসর ইঁট বাধানো বড় পথচারীদের হাঁটার আর বসার জায়গা। বাড়িগুলো সরু, দোতলা কি তিনতলা, ওপরে বসবাস, নিচে নানাবিধ দোকান - বই, খাবার, আসবাবপত্র, মনোহারী, সৌখীন প্রসাধনের, টুকটাক দৈনন্দিন ব্যবহার্য জিনিসের। হাজার বছর আগে পৃথিবী থেকে সব দোকান উঠে গিয়েছিল, মানুষ আন্তর্জাল কম্পুটার মাধ্যমে সব অর্ডার দিত ও বাড়িতে সেগুলো গ্রহণ করত। এই নতুন পৃথিবীতে মানুষ পুরাতন দোকান ফিরিয়ে এনেছে। দিনের বেলা চত্বরে কবুতরের ঝাঁক আনাগোনা করে। ফোয়ারার পাশে বাঁধানো জায়গায় বসে অফিস করা মানুষ বন্ধুদের সাথে মধ্যাহ্নভোজ সারে। এক সময় দোকান যেরকম উঠে গিয়েছিল প্রচলিত অফিসের ধারণাও চলে গিয়েছিল, সবাই তাদের বাড়ি থেকে কাজ করত। এখনও অনেকে করে, তবে পুরনো কাজের জায়গার পরিবেশ অনেক জায়গায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে। 

ফোয়ারাটা নিয়ে কিছু কিংবদন্তী চালু আছে এই শহরে। একটি তরুণ মেয়েকে নাকি খুব রাতে ঐ ফোয়ারার পাশে বসে থাকতে দেখা যায়। কিন্তু তার কাছে কেউ যেতে চাইলে সে অদৃশ্য হয়ে যায়। বিনতা মনে করে এটা কোনো কৌতুকপ্রিয় তরুণদলের কারসাজি, ত্রিমাত্রিক প্রক্ষেপণ ইত্যাদি দিয়ে এরকম বিভ্রম সহজেই সৃষ্টি করা যায়। এখন রাত হয়েছে, দূর থেকে দেখা যায় ফোয়ারার পাশে নিচু বাঁধানো জায়গাটাতে চার-পাঁচজন বসে আছে। তারা গিটার বাজিয়ে গান করছে। ফোয়ারার জল উঠছে নামছে, সাথে সাথে জলের নিচ বসানো বাতিগুলো তাদের রঙ বদলাচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে বিমনা হয়ে যায় বিনতা। স্ব-উজ্জ্বল গাছগুলো পেরিয়ে সে তখনো মোড়ে পৌঁছায় নি যখন সে তার পিঠে একটা তীক্ষ্ণ ছুরির মাথা অনুভব করে। চমকে উঠে ঘুরে দাঁড়াবার আগেই শোনা যায় একটি পুরুষ কন্ঠস্বর, ‘ঘুরে দাঁড়াবেন না, আর জরুরী সাহায্যের বার্তা পাঠানোর চেষ্টা করবেন না, আমরা এই রাস্তার সমস্ত বেতার সংকেতকে জ্যাম করে দিয়েছি, এমন কি ভিডিও ক্যামেরাগুলোও কাজ করছে না। চিৎকার করবেন না। চিৎকার করলে এখনি এই ছোড়া আপনার হৃদপিণ্ডতে প্রবেশ করবে।’ বিনতা ভয়ার্ত চোখে পাশের বাড়ির দোতলাতে লাগানো একটা ক্যামেরা দেখে। সেই কন্ঠটি বলে, ‘ওটা দেখে কোনো লাভ হবে না, আপনাকে এখন কেউ দেখতে পাচ্ছে না।’ বিনতা রাস্তার ওপাড়ে ফোয়ারার পাশে বসা মানুষগুলোর দিকে তাকায়, তারা গান-বাজনায় মশগুল, এদিকে খেয়াল করছে না, আর খেয়াল করলেও তারা বুঝত না এখানে কী হচ্ছে। 

জীবনে এরকম ঘটনা তার আগে ঘটে নি। দুদিন আগে রাতে তার ঘরে এক অন্ধকার মেঘ জমা হয়েছিল। সেদিন সে ভয় পেয়েছিল, কিন্তু মানুষ যে এরকম ভয়ের বস্তু হতে পারে সেটা সে কোনোদিন অনুভব করে নি। তবু এই পৃথিবীতে বিনতার বাস অনেক দিনের, সে শান্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করে, ‘আপনি কী চান?’ তার স্বরের স্থিরতা হুমকিদাতাকে কিছুটা সময়ের জন্য বিহ্বল করে দেয়। সেই মৌনতা ভেঙে একটি নারী কন্ঠ বলে, ‘বাঁ পাশের গলিটা দেখছেন। ওদিকে যান।’ ঠিক গলি নয়, দুটো বাড়ির মাঝে দু মানুষ সমান এক চিলতে রাস্তা, সেটা দুটো রাস্তাকে যোগ করেছে। 


বিনতার আগে নারীটি গলির দিকে এগিয়ে যায়। তার মুখ দেখে বিনতা বিস্মিত হয়। একটি তরুণ মেয়ে, কত বয়স হবে ত্রিশ? তার পরনে একটা লম্বা কালো পাতলা ওভারকোট, এই গরমে কেউ এরকম পোষাক পড়তে পারে, ভাবে বিনতা। পেছনের পুরুষটি তার একটি হাত বিনতার বাঁ কাঁধে রেখে তাকে গলিটার মধ্যে ঠেলে দেয়, বিনতা মেয়েটিকে অনুসরণ করে। গলিটার মাঝামাঝি যেয়ে যুবতীটি ঘুরে দাঁড়ায়। অন্ধকারে তার মুখটা ভাল করে দেখতে পারে না বিনতা, কিন্তু তার উপস্থিতি বিনতাকে কিছুটা স্বস্তি দেয়, এই অপহরণ ধর্ষণের প্রচেষ্টা নয়। এই পৃথিবীতে ধর্ষণকে প্রায় বিদায় করে দেওয়া হয়েছে - প্রায়, পুরোপুরি করা যায় নি। যুবতী কোনো ভূমিকা না করে প্রশ্ন করে, ‘আপনারা অদিতার দেহ কোথায় রেখেছেন?’ প্রশ্নটি বিনতাকে বিস্মিত করে। এরা অদিতাকে চেনে? কেমন করে? বিনতা প্রথমে কথা বলে না, ক্লান্ত হয়েছিল সে, তার মনে হল সে স্বপ্ন দেখছে, কিন্তু তারপরই অনুভব করে পেছনে ছোরাটা তার কাপড় ভেদ করছে। সে বলে, ‘ওনার দেহ নিলয়ে আছে।’ 

‘সে আমরা জানি,’ পেছনের যুবকটির কন্ঠে বিরক্তি, ‘আমরা জানতে চাই নিলয়ের কোথায়?’ 

‘দোতলায়,’ উত্তর দেয় বিনতা, ‘প্রধান প্রবেশ পথের ওপরেই মাঝখানের ঘরটি হল মন্ত্রণাকক্ষ, তার পেছনেই কোথাও অপরেশন ঘরটির থাকার সম্ভাবনা।’ এই খবরটুকু দিতে বিনতা দ্বিধা করে না, কারণ এটা জেনে ওদের কোনো লাভ হবে না। নিলয়ে ঢোকার সহজ কোনো পথ নেই। 

‘অদিতার নিরাময়-নম্বর বলুন,’ যুবতী বলে। প্রতিটি মানুষের একটি নিরাময়-নম্বর বা ফাইল থাকে যেখানে তার শরীর ও মনের বিভিন্ন দশার মান উল্লিখিত থাকে। সেই নম্বরের অধিকারী ছাড়া আর দু-একজন সেটা জানতে পারে, ব্যক্তিগত চিকিৎসক তাদের মধ্যে একজন। ‘না, আমি সেটা বলতে পারব না,’ দৃঢ় গলায় বলে বিনতা। ছোরার ফলাটা পেছনের কাপড় ছিঁড়ে বিনতার ত্বক স্পর্শ করে। ঠাণ্ডা ধাতবের ধারালো ছোঁয়ায় গা শিরশির করে ওঠে বিনতার। তবু চুপ থাকে বিনতা, ছোরাটা ত্বক ভেদ করে, দাঁত চেপে যন্ত্রণা সহ্য করে সে। ‘আপনি না বললে ডামুরি গবেষণাগারের অধ্যক্ষ বলবেন, তাঁর প্রতি আপনার মত আমরা সদয় হব না,’ বলে সেই নারী। 

‘আপনারা কি তাঁকে অপহরণ করেছেন?’ প্রশ্ন করে বিনতা, তার স্বর আর্তনাদের মত শোনায়। ওরা দুজনেই চুপ থাকে। অবশেষে বিনতা বলে, ‘২৩১ম৬৮৯। কিন্তু এটা জেনে আপনাদের লাভ কী?’ ছোরাটা তার ত্বক থেকে বেরিয়ে আসে। ‘পাসওয়ার্ড বলুন,’ যুবতীর গলা অধৈর্য। চুপ করে থাকে বিনতা। আবার ছোরার স্পর্শ পায়, ফুঁপিয়ে ওঠে ব্যথায়। ‘আপনার একটি ছেলে আপনার সাথে থাকে, তাই না? কি যেন ওর নাম, নীল?’ আবার দাঁতে দাঁত চাপতে হয় বিনতার, পিঠের রক্তে জামা ভিজছে বোঝে, কিন্তু নীলের কথা ওদের মুখে শুনে সেই উষ্ণ রক্ত যেন শীতল হয়ে গেল। তার হৃদপিণ্ডও যেন একবার থেমে গিয়ে আবার দ্রুত চলতে শুরু করল। ‘আমাদের হাত অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত, ডকটর বিনতা,’ যুবতীর গলা যেন বরফের শৈত্যে ঢাকা, ‘নীলের তো অনেক বয়স হল, খুব সাধাসিধে মানুষ, পৃথিবী কি করে চলে বোঝে না।’ সত্যি নীল এমনই একটি মানুষ যদিও তার বয়স চল্লিশের কাছাকাছি হল। ‘আপনার কি মনে হয় ওর আপনার মত সহ্যশক্তি আছে?‘ নিরুত্তাপ ভাবে বলে যুবতী। না, নেই, নীলের মুখটা বিনতা ভাবে, সে চিন্তা করতে পারে না কেউ তাকে নির্যাতন করছে। ‘সমুদ্র,’ ফিসফিস করে বলে সে। ‘সমুদ্র? পাসওয়ার্ড হল সমুদ্র?’ পাসওয়ার্ড যে সমুদ্র হতে পারে সেটা যেন সেই নারী মানতে চাইছে না। ‘হ্যাঁ, সমুদ্র,’ দাঁত চেপে কথাগুলো বলে বিনতা, তার কোনরকম দুর্বলতা সে এই বাচ্চাদের দেখাতে চায় না। ডামুরির অধ্যক্ষ, তার ছেলে নীলকে টর্চার করবার হুমকি দিয়ে তার কাছ থেকে এরা পাসওয়ার্ড আদায় করল, কিন্তু অদিতার ফাইল নিয়ে তারা কী করতে পারে, তারা কিছুই করতে পারবে না, ভাবে সে। 

ছোরাটা পিঠ থেকে সরে যায়। বিনতা জানে তার রক্তের মাঝে ভাসমান ন্যানোরোবটেরা ইতিমধ্যে ক্ষত সারানোর কাজে লেগে গিয়েছে। সেই রোবটারাই তার ব্যথাটা কমিয়ে দেয়। এর মধ্যে যুবতী তার বাঁ কব্জির চামড়ায় লাগানো কম্পুটার স্ক্রীন চালু করে। অদিতার নিরাময়-নম্বর ও পাসওয়ার্ড দিয়ে তার ফাইলে ঢোকা যায় কিনা সেটা সেই নারী পরীক্ষা করে নেয়। বিনতা বলে, ‘আপনারা কেন অদিতা সানের ফাইল চাইছেন? তার নিরাময়ের ইতিহাস দেখে আপনাদের কী লাভ?’ কথাটা বলেই বিনতার একটা জিনিস মনে হয়। প্রতিটি মানুষের মস্তিষ্কের নিউরোকম্পাঙ্ক ঐ ফাইলে লেখা আছে, সেই কম্পাঙ্কের তড়িৎ-চুম্বকীয় বিকিরণ দিয়ে মস্তিষ্কের কার্যকলাপ অনুনাদ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যাহত করা সম্ভব। 

দুজনের কেউই বিনতার প্রশ্নের জবাব দেয় না। যুবতী বলে, ‘আমাদের নিয়ে আপনার নিলয়ে ঢুকতে হবে।’ 

‘সে তো অসম্ভব একটা ব্যাপার,’ বলে বিনতা, ‘আমার নিজেরই নিলয়ে ঢোকার অনুমতি নেই। আজকে ঢুকতে দিয়েছে কারণ আমি অদিতা সানের চিকিৎসক। কিন্তু আপনারা কেন নিলয়ে ঢুকতে চান?’ কয়েক সেকেন্ড মৌন থেকে যুবতীটি বলে, ‘আমরা মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপনের বিরোধী। আমরা চাই না পৃথিবীর মানুষ মৃত্যুর পরে আবার ফিরে আসুক, কারণ এই প্রক্রিয়া অস্বাভাবিক ও প্রকৃতিবিরুদ্ধ। মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপনের পরে পুনরুজ্জীবিত মানুষ কখনই আদি মানুষটির মত হয় না। এই ব্যবস্থা মানব সমাজকে ধ্বংস করে দিচ্ছে, এই কাজের অবসান হওয়া প্রয়োজন।’

যুবতীর কন্ঠের প্রত্যয় বিনতার হৃদয়কে হিম করে দেয়। হ্যাঁ, এদের সম্বন্ধে শুনেছে সে, সংবাদ মাধ্যমে অনেক সময় এই দলটির কথা পরোক্ষভাবে উচ্চারিত হয় যদিও তাদের অস্তিত্বের ব্যাপারে সরাসরি কিছু বলা হয় না। এরা এই কষ্টকৃত সমাজকে ধ্বংস করে দেবে। আতঙ্ক বিনতাকে গ্রাস করে, সে কোনোরকমে বলে, ‘আপনারা আপনাদের বক্তব্য ভোটে দিতে পারেন। এই বিষয়ে সারা পৃথিবীর মানুষের মতামত নিতে পারেন। সেটাই কি উচিত হবে না?’ 

হা হা করে হেসে ওঠে পেছনের যুবকটি, সে বলে, ‘পৃথিবীর মানুষ দুর্বল, তারা অমরত্ব চায়, ভোটাভুটিতে তারা শুধু নিজেদের কাপুরুষতারই পরিচয় দেবে। আসলে সব মস্তিষ্ককে ধ্বংস করে দেওয়া প্রয়োজন। আমরা আবার পুরনো পৃথিবীকে ফিরিয়ে নিয়ে আনতে চাই।’ 

এই কথাগুলো শুনতে শুনতে বিনতা বুঝতে পারে ধীরে ধীরে ছোরাটা আবার তার ত্বক ভেদ করছে। সে শুনতে পায় যুবতীর কন্ঠ, মনে হয় তার কথা বহু দূর থেকে ভেসে আসে ‘আমরা খুবই দুঃখিত, এই সাক্ষাতের কোনো চিহ্নই রাখা যাবে না।’ ক্লান্ত ছিল বিনতা, আসন্ন মৃত্যুর ছায়াকে সে মনে করল যেন নিতান্তই স্বপ্ন। মনে হল সময় পার হয়ে সেই যুবতীর কথা একটি একটি করে আলাদা উচ্চারিত সিলেবলে বিভাজিত হয়ে যাচ্ছে, ‘তবে আমাদের আবার দেখা হবে, ডকটর বিনতা, যদিও আপনি আমাদের তখন চিনতে পারবেন না।’ 

বুকের কোথায় পাঁজর আছে জানত সেই দক্ষ আততায়ী, স্ক্যাপুলার হাড়কে পাশ কাটিয়ে পাঁজরের ফাঁক দিয়ে ছোরা খুঁজে নেয় হৃদপিণ্ড। অনায়াসে, হাতের অল্প চাপেই তার তীক্ষ্ণ ফলা প্রবেশ করে বাম নিলয়ে। এরকম সরাসরি আক্রমণ থেকে হৃদপিণ্ডকে রক্ষা করতে শরীরের ন্যানোরোবটরা অসহায়। মাটিতে লুটিয়ে পড়ার আগে বিনতা আশ্চর্য হয় এই ভেবে যে হৃদয়ের গভীরে সেই ছোরার স্পর্শ ছিল কেমন বেদনাহীন।


সপ্তম পর্ব

অদিতা চোখ খোলে, সামনেই বড় কাচের জানালা। তার বাইরে সবুজ গাছের মাথা দেখা যায়, ওপরে সুনীল আকাশ। একদল পাখী সেই আকাশে ঘুরছে, ঘুরছে পাক খাচ্ছে। বাইরের বাতাস এই ঘরে বোঝা যাচ্ছে না, কিন্তু গাছের মাথা আন্দোলিত হচ্ছে, নতুন দিন এসেছে। অদিতা প্রথমে বুঝতে পারে না সে কোথায় আছে, তারপর অস্পষ্টভাবে মনে পড়ে গতকাল রাতে সে এসেছিল তার মস্তিষ্ককে কপি করাতে নিলয়ে। কপি করার আগে তাকে অচেতন করে দেয়া হয়েছিল, ডকটর তারকার বলেছিল, ‘আপনি এখন দশ ঘন্টা ঘুমাবেন। এর প্রথম পাঁচ ঘন্টায় আপনার মস্তিষ্ক পুরো অচেতন থাকবে, পরের পাঁচ ঘন্টায় স্বপ্ন দেখবেন। সকালে যখন উঠবেন সামনের দেয়ালে দিন-তারিখ ফুটে উঠবে। আপনি দেখবেন সন ৪৩৫৬, নভেম্বর ২৩, শুক্রবার। তবে ভবিষ্যতে আপনার যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে তবে ঐ সনটা ৪৩৫৬ হবে না সেটা বুঝতেই পারছেন। আপনার এই মস্তিষ্কই জেগে উঠবে ভবিষ্যতের ঐ তারিখে।’ 

স্বপ্ন সত্যিই দেখেছে অনেক অদিতা, মনে হয় অনন্তকাল ধরে। পাখীগুলোর থেকে সে দৃষ্টি সরিয়ে আনে ঘরের মধ্যে। ঘরটার দেয়াল হালকা গোলাপী রঙের, দেয়ালে চোখ পড়তেই তাতে বেগুনী রঙে ফুটে ওঠে আজকের তারিখ - সন ৪৩৫৯, অক্টোবর ২১, বুধবার। মুহূর্তে আড়ষ্ট হয়ে যায় অদিতার শরীর। তিনটি বছর!! তিনটি বছর তার জীবন থেকে চলে গিয়েছে! তিনটি বছর সে ঘুমিয়ে ছিল নিলয়ের নিচে এক অন্ধকার সংরক্ষণাগারে, আরো লক্ষ লক্ষ মস্তিষ্কের সঙ্গে। কিন্তু তার থেকে বড় কথা সে মৃত্যুবরণ করেছে। কি হয়েছিল তার, কিভাবে সে মারা গেল? নিজের মৃত্যুকে মেনে নেওয়া কঠিন। 

কি করেছে সে এই কটা বছর? সে নয় - আর এক অদিতা, এক ভিন্ন অদিতা। আর সে নিজে আসল অদিতা নয়, এক কপি-করা অদিতা। কপি-করা জিনিসের কি বাঁচার অধিকার আছে? ঘাম ঝরে, শুয়ে থেকেও মাথা ঘুরাতে থাকে অদিতার। 

ছুটে আসে স-কুরা পাশের ঘর থেকে। ‘আপনি জেগে উঠেছেন,’ উল্লসিত কন্ঠে বলে স-কুরা। জৈবিক রোবট স-কুরা মানুষের প্রতিটি অনুভূতির অধিকারী। স-কুরা দাবী করে তার মানবিক ব্যাপারগুলো মানুষের চাইতে অনেক বেশী সূক্ষ্ণ। তার সঙ্গে মাত্র গতকালই পরিচয় হয়েছে অদিতার, ভাল লেগেছে এই মানুষটিকে অদিতার - যদিও তাকে মানুষ বলা কতটুকু সঙ্গত সে ভেবেছে। ‘যাক বাঁচা গেল, সবকিছু একদম ঠিকঠাক, আপনি একটু বিভ্রান্ত আছেন, সেটা খুবই স্বাভাবিক। নতুন করে বেঁচে ওঠা কি চাট্টিখানি কথা।’ স-কুরার ভাষাটা ঠিক আধুনিক নয়, একটু সেকেলে, কিন্তু তার মধ্যে একটা আভিজাত্য আছে। এই জিনিসটা গতকালই খেয়াল করেছে অদিতা। 

কিন্তু গতকাল তো গতকাল নয়, গতকাল পার হয়ে গেছে কতকাল। দেয়ালের তারিখটার দিকে তাকায় আবার অদিতা। সে নিলয়ে ঢুকেছিল গতকাল ৪৩৫৬ সনের নভেম্বর মাসে, এখন ৪৩৫৯ সনের অক্টোবর। তিনটি বছর পার হয়ে গেছে। এই তিনটি বছর সে অচেতন হয়েছিল নিলয়ের ভূ-গর্ভস্থ্য সংরক্ষাণাগারে। না, অচেতন হয়ে ছিল না, ধীরে ধীরে তার দুঃস্বপ্নগুলো মনে পড়তে থাকে। এই তিন বছর ধরে সে স্বপ্ন দেখেছে, সেই স্বপ্নে ধীরে ধীরে আর একটি জগৎ তৈরি হয়েছে। বিশাল সেই জগৎ, দুঃস্বপ্নের জগৎ। স-কুরা যেন অদিতার মনের কথাগুলো ধরতে পারে, সে অনেক মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপন করেছে, সে জানে সংরক্ষাণাগারে মস্তিষ্করা স্বপ্ন দেখে। প্রথম দিকে বিজ্ঞানীরা এই প্রক্রিয়াটা বোঝে নি, তারা সংরক্ষিত মস্তিষ্কর স্বপ্ন দেখা বন্ধ করে দিতে চেয়েছিল, কিন্তু পরে তারা বুঝতে পারে মস্তিষ্কর নিজের বাঁচার জন্য স্বপ্ন দেখার প্রয়োজন আছে। কিন্তু স-কুরা জানে সেই স্বপ্ন সাধারণতঃ দুঃস্বপ্ন হয়। 

স-কুরা বলে, ‘আজ কেমন সুন্দর দিন দেখছেন, বাইরে পাখী উড়ছে। আপনার জন্য যেন উড়ছে।’ স-কুরার কন্ঠ উজ্জ্বল দিনের মত, শুনলেই মন ভাল হয়ে যায়। বাইরে পাখীগুলো তখনো চক্রাকারে উড়ছিল। অদিতা জিজ্ঞেস করে, ‘ওরা কি বক?’ নতুন জীবনে অদিতার প্রথম কথাগুলো হল এই তিনটি শব্দ। স-কুরা বাইরে তাকায়, ওর গাঢ় ধূসর চোখের মণিতে নীল আকাশ প্রতিবিম্বিত হয়। সে বলে, ‘তা বলতে পারেন। ওদের বলা হয় ধবল মাণিকজোড়।’ 

স-কুরা জানে অদিতা সবধরণের পাখিই চেনে। বনবিজ্ঞানী অদিতার অজানা কিছুই নেই। তবে স-কুরা এটাও জানে যে মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপনের পরে প্রথম দিনটিতে কপি-করা মস্তিষ্ককে দেহের সঙ্গে স্নায়বিক যোগাযোগ স্থাপনে সময় দিতে হবে। স-কুরা বলে, ‘ওরা হিমালয় পার হয়ে এসেছে।’ অদিতা বালিশের ওপর মাথাটা নাড়িয়ে সায় দেয়, তার এখ্ন সব মনে পড়ছে। 

অদিতা বলে, ‘আমার হৃদপিণ্ডটা কি নতুন?’ স-কুরা এই প্রশ্নটি আশা করে নি, সে ভেবেছিল অদিতা জিজ্ঞেস করবে, ‘আমি কেমন করে মারা গেলাম?’ কিন্তু বিচক্ষণ অদিতা তার বুকের ক্ষত অনুভব করেছিল, ধরে নিয়েছিল তার পুরনো হৃদপিণ্ডটা একেবারেই অচল হয়ে গিয়েছিল। সেই জন্য শরীরের ন্যানোযানরা কিছুই করতে পারে নি। তবে ত্রিমাত্রিক প্রিন্টারে অদিতার জন্য নতুন হৃদযন্ত্র সৃষ্টি করতে বেশী সময়ের প্রয়োজন হয় নি। স-কুরা আর ডকটর তারকার মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপনের আগে নতুন হৃদযন্ত্রটি অদিতার বুকে বসিয়েছিল। স-কুরা অদিতার প্রশ্নের উত্তর দেয়, ‘হ্যাঁ।’

‘পুরনো অদিতার রইল কী?’, ভাবে অদিতা। নতুন মাথা, নতুন হৃদয়। সেই অদিতা কী করেছে গত তিন বছর? নতুন কিছু আবিষ্কার করেছে, নতুন কারো প্রেমে পড়েছে, ছেলে সেনভার সঙ্গে কি যোগাযোগ আছে? ঈর্ষা হয় অদিতার, নতুন কি না জানি সেই অন্য অদিতা দেখেছে। কিন্তু এসব ছাপিয়ে একটা বেদনা ধীরে ধীরে হামাগুড়ি দিয়ে মনের ভেতরে ঢোকে, বেদনাটা কিসের জন্য বোঝে না। বাইরের নীল আকাশটা ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যেতে থাকে। নতুন হৃদপিণ্ডে সেই ব্যথা সঞ্চারিত হয়। খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গেলে যেমন হারিয়ে যাওয়া সময়ের জন্য মন কাঁদে তেমনই যেন হল। তার মা’র জন্য, সেনভার জন্য, পুরনো সব প্রেমিকদের জন্য একটা বিষন্ন বোধ তাকে আচ্ছন্ন করে। ‘আমি কি আত্মহত্যা করেছিলাম, স-কুরা?’ কথাগুলো নিজের অজান্তেই যেন অদিতার মুখ দিয়ে বের হয়। 

স-কুরা এই প্রশ্নের জন্য তৈরি ছিল। সে বলল, ‘আপনার হৃদপিণ্ড ভেদ করেছিল এক প্রাচীন তীর। আমাদের মনে হয় না আপনার একার পক্ষে ঐ তীর বুকের মধ্যে গাঁথা সম্ভব। তবে আত্মহত্যা করবার জন্য আপনি যদি কাউকে নিয়োজিত করে থাকেন সেটা অন্য ব্যাপার।’ একটু চুপ থেকে স-কুরা বলে, ‘তবে আমি শুনেছি আপনি জীবন থেকে মুক্তি পাবার জন্য চেষ্টা করছেন। পরিচালনা কমিটির কাছে আবেদন করেছেন। ডকটর বিনতা - যিনি আপনাকে গতকাল নিলয়ে নিয়ে এসেছিলেন - উনি বললেন - আপনি চির-মৃত্যুর জন্য ওনার সুপারিশ চেয়েছেন।’ 

ডকটর বিনতা? খুব আবছাভাবে বিনতার মুখটা ভেসে ওঠে আদিতার মনে। ডামুরির নতুন চিকিৎসক, দু-একবার তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। অন্য অদিতা তাহলে চেষ্টা করেছে তাকে যাতে আর পুনরুজ্জীবিত না করা হয়। কিন্তু তার প্রচেষ্টা সফল হয় নি। এই যে সে আবার ফিরে এসেছে। দুঃখবোধ, বিষন্নতা অদিতাকে অবশ করে দেয়, সেই অবশতায় তার মনে হয় বাঁদিকে ঘরের এক কোনায় দেয়ালের গোলাপী রঙের সামনে এক কালো কুয়াশা ঘনীভূত হচ্ছে। তার চোখের কোনায় সেটা যেন ধরা পড়ে। অদিতা আশ্চর্য হল যে স-কুরা কেন সেই কুয়াশাটা দেখতে পাচ্ছে না। কুয়াশা নয়, ঘন অন্ধকার মেঘ। ঘরে কি কখনো মেঘ জমে? অদিতা স-কুরাকে ডাকতে যাবে এমন সময় ডকটর তারকার ডানদিকের দরজা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করে। তারকারের দিকে মুহূর্তখানেক চোখ রেখে আবার বাঁদিকে তাকিয়ে অদিতা দেখে সেই মেঘ অন্তর্হিত হয়েছে। অন্ধকার মন মেঘ তৈরি করেছে। 

অদিতা তারকারের বয়স অনুমান করতে চাইল, তার থেকে হয়তো বছর বিশেক বড়ই হবে তারকার। গোলগাল সহৃদয় মুখ, সেই সহৃদয়তার প্রমাণস্বরূপ এক গাল হাসি। তারকার উচ্চস্বরে বলল, ‘অদিতা সান, আপনাকে ৪৩৫৯ সনে সুস্বাগতম। আমি জানি আপনার জন্য এটা একটা কষ্টকর সময়, বিশেষতঃ যখন আপনার জীবন থেকে তিনটি বছর হারিয়ে গেছে, কিন্তু আমাদের জীবনের সামনে অনেক পথ পড়ে আছে, ঐ তিনটি বছর সহজেই পুষিয়ে নেয়া যাবে।’ 

বুকের ভেতর বেদনাটা আবার ফিরে আসতে শুরু করে। তাকে আবার জীবনে ফিরিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে। অদিতা নিশ্চিত যে আর এক অদিতা - যে অদিতা মারা গেছে - সে এইভাবে ফিরে আসতে চায় নি। হৃদপিণ্ড আর মস্তিষ্ক বাদে বাকি শরীরে সেই অদিতা যেন ঐরকম ‘না ফেরার’ একটা ইচ্ছা রেখে গেছে। 

ডকটর তারকার বলে, ‘আপনাকে একটা কথা আমার বলার আছে, কথাটা বলা হবে কিনা সেটা নিয়ে আজ সকালে অধ্যাপক বিষাণের সঙ্গে আমার একটা মিটিং হয়েছে।’ 

বিষাণ? বিষাণ এখানে? তারপর অদিতার মনে হয় বিষাণের গবেষণাগার নিলয়ের পাশেই। বিষাণ এই পৃথিবীর একজন অগ্রগণ্য মস্তিষ্ক বিশারদ। 

‘প্রফেসর বিষাণ নিজেই আপনাকে বলতেন, কিন্তু এই মুহূর্তে উনি আর একটি মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপন কাজে আমাদের সাহায্য করছেন। আমরা আর একটু অপেক্ষা করতে পারতাম, কিন্তু আমাদের হাতে মনে হয় বেশী সময় নেই।’ 

অনেক কিছু ঘটে গেছে এই তিন বছরে, ভাবে অদিতা, কিন্তু সে জানে না কি ঘটেছে। 

‘আপনাকে গতকাল ডামুরির বন থেকে উদ্ধার করা হয়। সেই উদ্ধার কাজ পরিচালনা করেন ডকটর বিনতা। আপনার দেহ তীরবিদ্ধ অব্স্থায় ডামুরি অরণ্যের একটা হ্রদের ধারে পাওয়া যায়। ডকটর বিনতাই আপনাকে নিলয়ে নিয়ে আসেন। আমরা প্রফেসর বিষাণকে ডাকি পরমার্শের জন্য কারণ আপনি গত পাঁচ বছর হল চিরমৃত্যুর আবেদন করে যাচ্ছেন। আপনার এই মস্তিষ্কও সেই মৃত্যু কামনায় আচ্ছন্ন, আমাদের ভয় ছিল প্রতিস্থাপনের পর এই মস্তিষ্ক আপনার দেহকে প্রত্যাখান করতে পারে।’ 

না, কপি-করা মস্তিষ্ক তার দেহকে প্রত্যাখ্যান করে নি। হতাশায় মূহ্যমান হয়ে পড়ে অদিতা। কিন্তু কে তাকে হত্যা করতে পারে সেটাও ভাবে। 

তারপর তারকার বলে, ‘গতরাতে যখন সু-করা এবং আমি আপনার মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপন করছিলাম তখন ডকটর বিনতাকে এই নিলয়ের খুব কাছেই হত্যা করা হয়েছে।’

অদিতার চোখ বিস্ফারিত হয়, হৃদপিণ্ড প্রায় থেমে যায়। তারকার বলতে থাকে, ‘একটা ধারাল ছোরা দিয়ে তাঁর হৃদপিণ্ডকে ভেদ করা হয়েছে। আততায়ীরা জানে কিভাবে ন্যানোরোবটদের পরাস্ত করতে হয়, হৃদপিণ্ডকে অত দ্রুত মেরামত করার ক্ষমতা তাদের নেই। ঐ সময়ে খুনীরা স্থানীয় সমস্ত বেতার তরঙ্গ জ্যাম করে দেয় যার ফলে এই হত্যাকাণ্ডের কোনো দৃশ্যই আমাদের সংগ্রহে নেই। আপনার মৃত্যুর সঙ্গে এই হত্যার অনেক মিল আছে, আমরা নিশ্চিত এই দুটি হত্যাকাণ্ড জড়িত। আমাদের মনে হয় আততায়ীরা চায় নি বিনতার কাছ থেকে তারা কি চেয়েছিল সেটা আর কেউ জানুক। তবে হত্যার পরপরই তারা বেতার জ্যাম তুলে নেয়, তারা চেয়েছিল আমরা যাতে বিনতার দেহ খুব তাড়াতাড়িই খুঁজে পাই। ডকটর বিনতার মস্তিষ্ক দুবছর আগে কপি করা হয়েছিল। নিলয়েরই আর একটি ঘরে এই মুহূর্তে তার মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপন হচ্ছে।’ 

তারকার কয়েক সেকেন্ড নীরব থাকে, তারপর আবার বলতে থাকে, ‘আপনাকে হত্যার দিনেই বিনতাকে হত্যা করা হল। হত্যাকারীরা ঠিকই জানত উনি আপনাকে নিয়ে বিশালগড়ে এসেছেন। এর পরে তারা অপেক্ষা করে কখন বিনতাকে একা পাওয়া যাবে। তারা বিনতার কাছ থেকে কোনো তথ্য চেয়েছিল। ঠিক কী তথ্য চেয়েছিল সেটা আমরা জানি না। তবে প্রফেসর বিষাণ একটা কম্পুটার সিমুলেশন করছেন সেটা সম্ভাব্যতা তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে তারা বিনতার কাছে কি চেয়েছিল সেটা বার করার চেষ্টা করবে।’

বিষাণ! কতদিন বিষাণের সঙ্গে দেখা হয় নি ভাবে অদিতা। দশ বছর? বিশালগড় ডামুরি থেকে খুব একটা দূরে নয়। সবাই চলে গেছে - মা, সেনভা, বিষাণ। সে তার অরণ্য নিয়ে ছিল, কিন্তু আর কতদিন? মাদ্রে দে দিয়স নদীর বৃষ্টিভেজা আমাজন অরণ্যে তার কান্নার কথাটা এবার মনে পড়ল। চাঁদে হারিয়ে যাওয়া সেনভা কি এখনো বেঁচে আছে? 

‘ডকটর তারকার, আমি যদি আবার মারা যাই তাহলে কী হবে? আমার ছ’বছর আগের মস্তিষ্কটা ব্যবহার করা হবে?’ 

‘হ্যাঁ,’ উত্তর দেয় তারকার। আমরা দুটো মস্তিষ্ক সংরক্ষণ করি। প্রতি তিন বছর অন্তর মস্তিষ্ক কপি করা হয়, কিন্তু দুটোর বেশী মস্তিষ্ক আমরা সংরক্ষণাগারে রাখি না।’ 

‘তাহলে আমি যদি ঐ ছ’বছর আগের মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপনের পর পরই মারা যাই তাহলে আমাকে আর পুনর্জীবিত করা যাবে না।’ 

‘না, তা যাবে না, তবে তার আগেই আমরা আপনার মস্তিষ্কের একটা কপি করে নেব।’ 

‘কবে করবেন?’ প্রশ্ন করে অদিতা। 

‘নতুন মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপনের পরে অন্ততঃ ছ’মাস সময় দিতে হবে।’ 

তারকার বোঝে অদিতার মাথায় অনেক চিন্তা ঘোরা ফেরা করছে, তার মধ্যে মৃত্যুচিন্তাই মুখ্য। 

‘আমি কি উঠতে পারি?’ জিজ্ঞেস করে অদিতা। ‘নিশ্চয়’, বলে তারকার। 

অদিতা উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করে, সমতা রাখতে পারে না, পড়ে যাবার আগেই স-কুরা ঘরের আর এক কোনা থেকে একটা বড় লাফ দিয়ে এসে তাকে ধরে ফেলে। অদিতা একটু অপ্রস্তুত হাসি হাসে। তারকার বলে, ‘আমারই দোষ, স-কুরাকে আগেই আপনার পাশে দাঁড়াতে বলা উচিত ছিল। আপনার মস্তিষ্কের সেরিবেলাম এত বছর পরে শরীরের সাথে সংযোগ স্থাপন করছে, সেরিবেলাম আমাদের ব্যালান্সের ব্যাপারটা দেখে।’ 

অদিতা এসব জানে। স-কুরার হাত ছেড়ে জানালার দিকে এগিয়ে যায়। জানালা দিয়ে দেখা যায় সামনে একটা ছোট বন। আকাশের বকরা কখন হারিয়ে গেছে। 

পাশের দরজাটা খুলে যায়, ঘরে ঢোকে বিষাণ - তার মুখে উদ্বেগ। সে ভাবে নি অদিতা ইতোমধ্যে জেগে উঠেছে। কত বছর পরে অদিতাকে সে দেখছে? গুণতে চাইল, কিন্তু তার আগে কিছু বলা দরকার, কী অনুভূতি হচ্ছে সেটা পরে ভাবলেও চলবে। বিষাণ তারকার আর স-কুরাকে কম্পিত কন্ঠে বলে, ‘অদিতা সানকে এখুনি এখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যান। ওনাকে কোনো বেতার-তরঙ্গ-নিরোধী ঘরে রাখা দরকার।’

অদিতার পাশে এসে দাঁড়ায় বিষাণ। দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে ভাবে তাদের বয়স বেড়েছে। তাদের অতীতের ভালবাসা এখনো কতখানি বর্তমান? সারা রাত ঘুমায় নি বিষাণ। সেনভাকে তার মা’র মৃত্যু ও মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপনের খবরটা জানিয়ে ফোনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার এক মিনিটের মধ্যে তার ফোনে বিপদ সঙ্কেত বেজে ওঠে, ক্যাফেতেও একটা এলার্ম বাজে। বিনতার বিপদ হয়েছে। বিষাণের বাঁ হাতের কবজিতে ফুটে ওঠা মানচিত্রে বিনতার অবস্থানটা দেখা যায়। কাফে থেকে বের হয়ে দৌড়ে খুব সহজেই সে ফোয়ারার কাছে একটা গলিতে বিনতার দেহকে খুঁজে পায়। ততক্ষণে বিনতার হৃদপিণ্ড বন্ধ হয়ে গেছে। 

বিনতাকে খুন করার এক মিনিটের মধ্যে হত্যাকারীরা তারা যে বেতার সংকেত জ্যাম করেছিল সেটা তুলে নেয়। বিনতার দেহ যাতে কর্তৃপক্ষ খুঁজে পায় তারা সেটাই চেয়েছিল। অন্ততঃ তাই বিষাণের ধারনা। বিনতার দেহকে কয়েক মিনিটের মধ্যে নিলয়ে নিয়ে আসা হয়। কেন বিনতাকে হত্যা করা হয়েছে, বিনতার কাছে কি তথ্য হত্যাকারীরা চাইতে পারে এইসব প্রশ্ন করে একটা গণনার সিমুলেশন কম্পুটারে বিষাণ দিয়েছিল। তার ফলাফল সে সবে পেয়েছে। 

বিষাণ অদিতার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘হত্যাকারীরা ডকটর বিনতার কাছে তোমার নিরাময়-নম্বর ও পাসওয়ার্ড চেয়েছে এবং মনে হয় সেটা তারা পেয়েছে। নিরাময়-নম্বরে তোমার মস্তিষ্কের নিউরোকম্পাঙ্ক লেখা আছে, সেই কম্পাঙ্কের তড়িৎ-চুম্বকীয় বিকিরণ দিয়ে তোমার মস্তিষ্ককে বন্ধ করে দেওয়া সম্ভব।’ 

বিষাণের কথা শেষ হতে না হতেই অদিতা মাটিতে পড়ে যেতে থাকে। স-কুরা ঘরের একদিক থেকে লাফ দিয়ে আবার অদিতাকে ধরে ফেলে বিছানায় শুইয়ে দেয়। ডকটর তারকার বিছানার পাশেই লাগানো একটা প্যানেলের বোতামে চাপ দেয়, মেঝে ফাঁক হয়ে যায়, অদিতার বিছানাটা নিচে নেমে যায়। বিষাণ হতবিহ্বল হয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকে, দেরী হয়ে গেল, কম্পুটারের গণনাটা আগেই করা উচিত ছিল। বিনতার হত্যাকারীরা বোধহয় অদিতার মস্তিষ্ককে অচল করে দিয়েছে। জানালার বাইরে তাকায় বিষাণ, বিশালগড়ের যেকোনো জায়গায় থাকতে পারে এই আততায়ীরা। তাদের নাম এখন জানে বিষাণ। কম্পুটার সিমুলেশন বলেছে বিনতাকে হত্যার পেছনে ‘লোহিতক’ নামে একটি দলের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা শতকরা ৮২%। ‘লোহিতক’ পুনর্জন্মের অবসান চায়, মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপনকে বন্ধ করতে চায়, সমস্ত সংরক্ষিত মস্তিষ্কের ধ্বংস চায়। কিন্তু তারা কেন অদিতার ব্যাপারে এত আগ্রহী হবে? অদিতার সঙ্গে কি তাদের যোগাযোগ আছে? তারাই কি অদিতার চিরমৃত্যুর ইচ্ছাকে বাস্তবায়িত করতে চাইছে? জানালার বাইরে বনের ওপরে বিশালগড়ের নিশ্চিন্ত সুনীল আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে বিষাণ। সেই আকাশের নিচে কোথাও লুকিয়ে আছে ‘লোহিতকের’ মানুষ, ষড়যন্ত্র করে তারা, বেতার তরঙ্গ দিয়ে অচল করে দিতে চায় হাজার বছরের অগ্রগতি। হঠাৎ অসহায় বোধ করে প্রফেসর বিষাণ, এরকম অসহায়ত্ব সে বোধ করেছিল চাঁদে সেনভা যখন হারিয়ে গিয়েছিল। আর এখন মনে হয় সবাই এরকমভাবে হারিয়ে যাবে।



অষ্টম পর্ব

রাত্রি হল। এক খাদের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল এক মধ্যবয়সী পুরুষ, সত্তরের ওপর কিন্তু একশোর নিচে বয়স হতে পারে তার। খাদের নিচেই উত্তাল সমুদ্র। তার ঢেউ ভেঙে পড়ছিল নিচের পাথরে, জল ঢুকছিল পাথরের ফাঁক দিয়ে, আবার নেমে যাচ্ছিল শব্দ করে। ভাটার সময় এখন, জোয়ারের উঁচু জল ধীরে ধীরে নামছে। পশ্চিমে সমুদ্রের জলে চতুর্থীর চাঁদ ডুবছে। দিগন্তে চাঁদের ফলাকে বিশাল দেখাচ্ছে, তার প্রতিফলন পড়ছে সমুদ্রের জলে, চিকচিক করছে তা অন্ধকারে। চাঁদের দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে ছিল মানুষটি, যেন চাঁদকে চোখের চাহনি দিয়ে বেঁধে রাখবে পৃথিবীর সাথে। তার পরনে ছিল একটা কালো ওভারকোট। অল্প শীত পড়ছে, লোকটি তার ওভারকোটের কলার তুলে দিল গালের পাশে। তার চুল উড়ছিল দক্ষিণ থেকে উড়ে আসা বাতাসে। চাঁদ ডুবে গেলে একটা কালো নিকষ আকাশ নিচের ঊর্মিময় সমুদ্রকে অন্ধকারে ঢেকে দিল, তখন ঢেউয়ের সর্বব্যাপী শব্দ ঘিরে রাখল তাকে। সমুদ্রের গর্জন, ভাবল সে, পৃথিবীব্যাপী বিশাল দানব, সমুদ্রের অধীনেই এখন পৃথিবী।

সে যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল তার আশেপাশে কোনো জনবসতি ছিল না। দূরে থেকে দেখা গেল দুজন হেঁটে আসছে ঐ দিকে। টর্চের আলোতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে পাথর এড়িয়ে তার এগিয়ে আসছিল খাদের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির দিকে। বড় পাথরের আড়ালে তাদের হাতের টর্চের আলো কখনো হারিয়ে যাচ্ছিল, আবার কিছুক্ষণের জন্য দেখা যাচ্ছিল। লোকটি মাঝে মধ্যে পেছন ফিরে এদের অগ্রযাত্রা লক্ষ করছিল, তার দেহভঙ্গী দেখে বোঝা গেল সে হয়তো তাদের জন্যই অপেক্ষা করছিল। এরকম মিনিট দশেক যাবার পরে তার কাছাকাছি এল দুজন - একটি যুবতী ও একটি যুবক। সমুদ্রের গর্জনের ওপর যেন তার কথা শোনা যায় সেজন্য উচ্চস্বরে চিৎকার করে ওঠে যুবক, “অশির সান!” লোকটি পেছন ফিরে তাকায় যুবক যুবতীর দিকে, হাত তুলে ইঙ্গিত করে তাদের এগিয়ে আসার জন্য। 

বহু দূরে সাগরের ওপর জমা মেঘে বিদ্যুৎ চমকায়, তার শব্দ তীর পর্যন্ত পৌঁছায় না।

যুবক ও যুবতীটি অশিরের কাছে পৌঁছায়, মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন করে। অশির অভিবাদনের উত্তর দেয় নিজের মাথা ঝুঁকিয়ে। এদের দুজনের তুলনায় অশির বেশ লম্বা। যুবতীর গায়ে পাত্লা কালো ওভারকোট, যুবকের গায়ে একটি খয়েরী জ্যাকেট। এদের দুজনেরই বয়েস ত্রিশের মত হবে। অশির তাদের দিকে তাকিয়ে তার বাঁ কব্জির দিকে ইঙ্গিত করে। তারা মাথা ঝুঁকিয়ে সায় দেয় - হ্যাঁ, তাদের দেহের মধ্যে প্রোথিত ফোন ও কম্প্যুটার তারা অনেক আগেই বন্ধ করে দিয়েছে, এখানে তাদেরকে কেউই আর কোনোভাবেই ট্র্যাক করতে পারবে না। 

অশির ঐ দুজনকে ইঙ্গিত করে তাকে অনুসরণ করা জন্য। তিনজন সমুদ্র ছেড়ে পাহাড়ের দিকে যায়, কিন্তু যে পথে ঐ দুজন তরুণ এসেছিল সে পথে নয়। বড় বড় পাথরের ওপর আলো ফেলে সাবধানে তার পথ চলে। মিনিট পনেরো ক্রমাগত চলার পরে তারা পৌঁছায় এমন একটি জায়গায় যেখানে পাহাড়ের শুরু হয়েছে বলা যায়, পাহাড়ের বন যেন হঠাৎ করেই সমুদ্রতটের পাথরে শেষ হয়েছে। এখানে কিছু ঝাউগাছ। অশির আলো ফেলে পাহাড়ে ওঠার একটা পথ বার করে। একটানা আবারো মিনিট পনেরো নীরবে হাঁটার পরে একটা গিরিখাতের মধ্যে ঢোকে তারা, সেখানে প্রচুর বনশিমুল গাছ, পাহাড়ের ঢাল আঁকড়ে আছে। টর্চের আলো মাঝেমধ্যে ওপরের পাতায় পড়ে একটা ছমছমে পরিবেশ সৃষ্টি করে। দূরে কোনো বনজন্তুর ডাক শোনা যায়। হাঁটা পথটা ছেড়ে দিয়ে একটা প্রায় দেখা-যায়-না এরকম পথ ধরে তারা। সেই পথ ছিল আগাছায় পরিপূর্ণ, তবু তার মাঝে অশির অনায়াসে পথ খুঁজে পায়। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পথ চলতে পেছনের দুজনের অসুবিধা হচ্ছিল। এইভাবে মিনিট দশ চলার পর তারা একটি জায়গায় থামে। একটা গাছের ডাল নিচু হয়ে ছিল, অশির সেটাকে ডান হাত দিয়ে ওপরে তুলে পেছনের দুজনকে এগিয়ে যেতে বলে। তারা অশিরকে পাশে রেখে গাছটা পার হতেই সামনে দেখে একটি ছোট ঘর। কাঠের ঘর, হালকা ধূসর রঙ করা। তারা ওপরে তাকায়, আকাশ দেখা যায় না। গাছ আর পাহাড়ের সংযোগস্থলে আকাশ হারিয়ে গেছে, পৃথিবীর কক্ষপথের কৃত্রিম উপগ্রহের দৃষ্টিতে এই ঘর থাকবে অদৃশ্য। 

পুরনো দিনের কালো রঙের তালা ঝোলে দরজায়। অশির একটা ধাতব চাবি দিয়ে দরজা খোলে। যুবক যুবতী একে অপরের দিকে কিছুটা আশ্চর্য হয়ে তাকায়, তারা এরকম তালা-চাবি শুধু কম্প্যুটারের স্ক্রিনেই দেখেছে। ভেতরে ঢুকে দেয়ালে একটা সুইচ টেপে অশির, ঘরের দু-কোনে স্ট্যান্ডের ওপরে দুটো বেশ জোরাল বৈদ্যুতিক আলো জ্বলে ওঠে। ছিমছাম সাজানো একটা ঘর, সেখানে চেয়ার সোফা ইত্যাদি সাজানো। কাঠের মেঝে তাদের ভারে ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে। কাঠের দেয়ালে রঙ নেই। পেছনের দরজা দিয়ে ভেতরে আর একট ঘর দেখা যায়। তরুণ দুজন বোঝে বাইরে থেকে যা দেখা যায় তার চেয়ে অনেক বড় এই বাড়িটা। 

অশির যুবতীর কোটটা খুলতে সাহায্য করে। কোটটা একটা সোফার ওপরে রেখে দেয়। যুবকটি তার জ্যাকেট খুলে সোফার ওপরেই রাখে।

তরুণ দুজন পাশাপাশি সোফায় বসে। অশির তাদের সামনে ছোট একটি চেয়ারে বসে। যুবতীর দিকে তাকিয়ে বলে, “তারপর, মিরা?”

মিরা অশিরের কোঁকড়া চুলের দিকে তাকায়, বাদামী চোখের দিকে, বলিষ্ঠ চোয়ালের দিকে। গত এক বছরে এই মানুষটিকে সে বেশ কয়েকবার দেখেছে। সে জানে অশির তার ওপর ভরসা রাখে। কয়েকদিন আগে, বিশালগড়ের এক গোপন আস্তানায় শেষবার তাদের দেখা হয়েছে। অশির বলেছিল তাদের গত রাতের অভিযান ‘লোহিতকে’র ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিযান। অশিরই তাদের শিখিয়েছিল কেমন করে রাস্তার সব ক্যামেরা অচল করে দিতে হয়, ফোনের সঙ্কেত জ্যাম করে দেয়া যায়, মাথার ওপরের কৃত্রিম উপগ্রহের নজরদারি থেকে নিজেদের অদৃশ্য রাখা যায়। 

“আমাদের অভিষ্ঠ্য সবই সার্থক হয়েছে,” বলে মিরা, “আমরা অদিতা সানের মস্তিষ্ককে কোমায় নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছি।” মিরার ছোট করে ছাঁটা কালো চুল ঘাড় পর্যন্ত নেমেছে। তীক্ষ্ম চোয়ালের মধ্যে একটা টোল, গালে আর একটি টোল। উজ্জ্বল বাদামী চোখের মণির ওপর চিকন করে ছাঁটা ভুরু। চোখের নিচে মনে হয় দিনরাত না ঘুমানোর ক্লান্তি। 

“তাই?” মধ্যবয়সী মানুষটির কথায় সন্দেহ প্রকাশ পায়, “আপনারা কেমন করে নিশ্চিত হলেন?” 

“আমরা নিলয় থেকে আসা রেডিও বার্তা শুনতে সক্ষম হয়েছি। ডকটর তারকার বাড়তি নিরাপত্তারক্ষী চেয়ে পাঠিয়েছেন,” বলে মিরা। 

“কিন্তু তার মানে এই না যে অদিতা সানের মস্তিষ্ক নিষ্ক্রিয় করে দেয়া সম্ভব হয়েছে?” 


“হয়েছে,” খুব দৃঢ় কন্ঠে বলে ওঠে মিরা, “আপনি এই ভিডিও রেকর্ডিংটা দেখুন।” 

মিরা তার জামার পকেট থেকে একটা ছোট দেয়াশলাইয়ের বাক্সর মত জিনিস অশিরকে এগিয়ে দেয়। অশির বাক্সটাকে তার চোখের কাছাকাছি আনতেই তাতে একটা ত্রিমাত্রিক ভিডিও মূর্ত হয় - অদিতা নিলয়ের একটা জানালার ধারে দাঁড়ানো, তার পাশে দাঁড়ানো বিষাণ। এর পরের দৃশ্যে অদিতা অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাচ্ছে এবং মাটিতে পড়ার আগেই স-কুরা তাকে ধরে ফেলে ভেতরে নিয়ে যায়। পরবর্তী দৃশ্যে বিষাণ জানালার কাছে এসে বাইরের দিকে চাইছে - খুঁজছে তাদের যারা অদিতার মস্তিষ্ককে নিষ্ক্রিয় করেছে। 

মিরা খেয়াল করে ভিডিওটা দেখতে দেখতে অশিরের চোখ কুঁচকে ওঠে, কপালে ভাঁজ পড়ে। অশিরের মুখে মুহূর্তখানেকের জন্য কি বেদনার ছাপ দেখা গেল, নিশ্চিত হতে পারে না মিরা। অশির জিজ্ঞেস করে, “প্রফেসর বিষাণ আপনাদেরকে দেখতে পায় নি?”

“না,” আবার বেশ জোরের সঙ্গে উত্তর দেয় মিরা। 

“বেশ, আর ডকটর বিনতা?” 

“তাঁর কাছ থেকে অদিতা সানের নিরাময় নম্বর ও পাসওয়ার্ড বার করা গেছে খুব সহজেই,” এবার কথা বলে সিলোন, “ওঁর ছেলেকে অত্যাচার করা হবে এই ভয়েই সব বলে দিলেন। আর ওনাকে হত্যা করাটাও খুব একটা কঠিন হয় নি।” সিলোনের কালো চুল ছোট করে ছাঁটা, চৌকো মুখ, কামানো গাল। তার চোখেও এক ধরণের দীপ্তি, কিন্তু না-ঘুমানোর ক্লান্তি তার মাঝেও স্পষ্ট। 

“খুব একটা কঠিন হয় নি? একটা মানুষকে মেরে ফেললেন, আর বলছেন খুব একটা কঠিন হয় নি? আর বলছেন নম্বর পাসওয়ার্ড বার করা গেছে সহজেই? ছেলেকে নিয়ে ব্ল্যাকমেল করলেন বলেই তো উনি আপনাকে নম্বরটা দিয়েছেন।’ অশিরের রাগ দমিত থাকে না, ভিডিওর ছোট বাক্সটা তার বাঁ হাতে ধরাই ছিল, মিরা দেখল সেই হাত কাঁপছে। 

সিলোন অশিরের ক্রোধে আশ্চর্য হয়। সে মিরার দিকে তাকায়, মিরার চোখেও বিহ্বলতা লক্ষ করে, তারপর বলে, “মানুষকে মেরে ফেলা তো আর ঠিক মেরে ফেলা নয়। আজকের মধ্যে তো ডকটর বিনতার জীবন ফিরে পাবার কথা। আর ওনার হত্যার নির্দেশ তো আপনিই দিয়েছেন।”

“হ্যাঁ, আমিই দিয়েছি সেই নির্দেশ, তার মানে এই না যে হত্যাকে আমরা নিছক খেলা হিসেবে গ্রহণ করব। একটা হত্যা মানে পৃথিবী থেকে একটা জীবনের অপসারণ।”

“কি বলছেন আপনি? কার জীবনের অপসারণ? ডকটর বিনতার মস্তিষ্ক ইতিমধ্যে নিশ্চয় প্রতিস্থাপিত হয়েছে, উনি এতক্ষণে নিশ্চয় বেঁচে উঠেছেন,” বিস্মিত হয়ে কথাগুলো উচ্চারণ করে সিলোন। 

“হ্যাঁ হয়েছে। কিন্তু এই ডকটর বিনতা কি সেই ডকটর বিনতা যাকে আপনি হত্যা করেছেন? নাকি এই দুইজন সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যক্তি? আমি বলি, তাঁরা দুজন আলাদা মানুষ, তাঁদের দুজনের দুটো আলাদা মস্তিষ্ক। একটি মস্তিষ্ককে আপনি নিভিয়ে দিয়েছেন, আর একটি মস্তিষ্ক সেটির জায়গায় এসেছে। কিন্তু যে মস্তিষ্ক এসেছে সে আমাদের সময়কার বিনতা নয়, সে আর একটি সময়ের, আর একটি মহাবিশ্বের বিনতা। এই দুইজন কিছু পুরনো স্বপ্ন নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাঁটোয়ারা করে মাত্র, এর থেকে বেশী কিছু নয়। আমার থেকে এর চেয়ে কে আর বেশী জানে?’ অশিরের স্বরের প্রাবল্য বাড়ে, মিরা লক্ষ্য করে তার হাত আগের চেয়ে জোরে কাঁপছে। 

চেয়ার ছেড়ে দাঁড়ায় অশির। ঘরের কোনায় দাঁড় করানো বাতিটার আলো পড়ে তার মুখের একদিকে। সেই আলোতে মানুষটাকে বুঝতে চায় মিরা। অশিরের মুখে, কথায়, দাঁড়িয়ে থাকার কিংবা হাঁটার ভঙ্গীতে এমন কিছু আছে যা সহজেই আকৃষ্ট করবে মানুষকে। তার ডাকেই সিলোনের মত তরুণেরা ‘লোহিতকে’র মত এমন একটা গোপন সংগঠনে যোগ দিয়েছে। আকৃষ্ট হয়েছে মিরাও, সেই আকর্ষণের জন্য তাকে মূল্যও দিতে হয়েছে। কিন্তু সেই মূল্য দিতে দ্বিধা করে নি, কারণ সে বিশ্বাস করেছে অশিরের কথাকে, অশিরকে। মানুষকে আবার মানুষের মত বাঁচতে দিতে হবে, বর্তমান এই সমাজকে বদলাতে হবে। আর অশিরকে বিশ্বাস করে বলেই বিনতাকে হত্যার মত কঠিন অভিযানে সে রাজি হয়েছে। 

অশির অধৈর্য হয়ে পায়চারি করে। বলে, “আমরা যদি মানুষকে হত্যা করি, সেই দায়ভার আমাদের নিতে হবে। কারণ প্রতিটি জীবিত মানুষ অনন্য। যে বিনতাকে গত রাতে আপনি মেরেছেন সেই বিনতা আর কোনোদিন ফিরে আসবে না, যে আসবে সে হল আর এক বিনতা যাকে সৃষ্টি করা হয়েছিল তিন বছর আগে। তিন বছর আগে কপি করা বিনতাও অনন্য। আর এবার চিন্তা করুন সেই কোটি কোটি মস্তিষ্কের কথা যারা তৃতীয় সংরক্ষিত মস্তিষ্কে পরিণত হয়। প্রতি তিন বছর অন্তর মস্তিষ্ক কপি করা হয়। আপনি জানেন একজন মানুষের মাত্র দুটো মস্তিষ্ক সংরক্ষাণাগারে রাখা হয়, একটি প্রতিস্থাপনের জন্য, অন্যটি থাকে ব্যাকআপ হিসেবে। কিন্তু এই দুটি ব্যবহার না হলেও ষষ্ঠ বছরের মাথায় আর একটি মস্তিষ্ক কপি করা হয়। সেই সময় ছ’বছর আগের কপি করা প্রথম মস্তিষ্কটিকে ধবংস করে দেয়া হয়, অর্থাৎ পুরনো মস্তিষ্ককে বাঁচিয়ে রাখতে যে শক্তি প্রবাহ দরকার সেটা বন্ধ করা দেয়া হয়। আপনার কি মনে হয় না সেই ধ্বংস হয়ে যাওয়া মস্তিষ্কের জীবন ছিল? আপনার কি মনে হয় না সেই মস্তিষ্কের বাঁচার অধিকার ছিল? সংরক্ষাণাগারের হিম শীতলতায় সেই মস্তিষ্ক স্বপ্ন দেখে, আর স্বপ্ন যে দেখে সেই মানুষ। সেই মস্তিষ্ককে বন্ধ করে দেয়া মানে তাকে হত্যা করা। আমরা নাকি সভ্যতার শিখরে পৌঁছেছি, অথচ তার জন্য আমরা যে মূল্য দিচ্ছি তা প্রাচীন সব সমাজের বর্বরতাকে ছাপিয়ে যাবে।” 

সিলোন মাথা নাড়ায়, সে এসব বোঝে, সে কোনো অন্ধ যান্ত্রিক আততায়ী নয়। তবু অশিরের কথার মাঝে এমন কিছু ছিল যা তাকে বিচলিত করে। অশিরের এমন প্রতিক্রিয়া, কথার তীক্ষ্মতা সে আশা করে নি। কোনো একটা অবোধ্য কারণে তার অস্বস্তি হয়। 

অশির আবার চেয়ারে বসে, বলে, “কিন্তু সেটাও বড় কথা নয়। মানুষের সৃষ্টি হয়েছে প্রাকৃতিকভাবে মৃত্যুবরণ করা জন্য, তার জীবনকাল যদি অনির্দিষ্টকালের জন্য দীর্ঘায়িত করা হয় তবে সেটা অস্বাভাবিক, সেই জীবনের মুল্য কী? মৃত্যু আছে বলেই তো জীবনের মূল্য আছে।” 

মিরা অনুভব করে ঘরটা গরম হয়ে উঠছে। অশিরের কপালে ঘামের বিন্দু খেয়াল করে সে। এই মানুষটি তার জীবন বদলে দিয়েছে। বিশালগড়ের বাইরে একটি ছোট খামারে মিরা কাজ করত, শাক সবজী টমেটো আলু, কিছু ফল এসবের ফলন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে ছিল সে। এক বছর আগে নিলয়ে নিয়মিত মস্তিষ্ক কপি করাতে এলে, নিলয়ের কাছেই ফোয়ারার চত্বরে, তার সঙ্গে একটি যুবকের পরিচয় হয়, তার পরে প্রেম। সেই যুবক ‘লোহিতক’ সংগঠনের সদস্য ছিল। তার মাধ্যমেই অশিরের সঙ্গে পরিচয়। মিরার প্রেমিক বন্ধুটি বলেছিল ‘লোহিতকে’র সর্বময় কর্তা হল অশির। অশির অবশ্য সেটা হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল, বলেছিল পৃথিবীর অনেক বড়, তার দায়িত্বও অনেক, তার মত ছোট মানুষের পক্ষে সেই দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়। অথচ আজ যখন অশির কথা বলছে, মিরার মনে হয় পৃথিবীর সমস্ত দায়ভার যেন অশিরের ঘাড়ের ওপরই ন্যস্ত। মানুষকে তার প্রকৃতির পথে ফিরিয়ে আনতে হবে, এই কথাগুলো মিরার মনে হয় একেবারেই অনন্য, শুধুমাত্র এক সর্বময় কর্তৃত্বের পক্ষেই এই কথাগুলো বলা সম্ভব। 

পরের কথাগুলো অশির বলে খুব ধীরে, কিন্তু দৃঢ় প্রত্যয়ে, “তাই ‘লোহিতক’ গোষ্ঠীর মিশন হল সমস্ত সংরক্ষিত মস্তিষ্ক ধ্বংস করে দেয়া।” মিরা আর সিলোন ‘লোহিতকে’র উদ্দেশ্য সম্পর্কে শিক্ষা নিয়েই এর সদস্য হয়েছে, অশিরের কথায় তারা বিচলিত হয় না। অশির বলে, “হ্যাঁ, আমাদের যুক্তিমত এটা হবে একটা গণহত্যা। কিন্তু এই মস্তিষ্কগুলোকে তো কর্তৃপক্ষ ধ্বংসই করে দিত। কিন্তু সেই হত্যাকাণ্ড শুধু একবারই সংঘটিত হবে, হাজার হাজার বছর ধরে নয়। মানুষকে তার প্রকৃতির পথে ফিরিয়ে আনতে এর প্রয়োজন আছে।”

মিরার প্রেমিক মিরাকে ‘লোহিতক’ সংগঠনের কাজে যুক্ত করেছিল, মিরা যে কর্তৃপক্ষের গোয়েন্দা হিসেবে কাজ করছে না তার নিশ্চয়তা দিয়েছিল। অশির প্রথম দর্শনেই মিরার মধ্যে এক বিশাল সম্ভাবনা দেখেছিল। তাই মিরার সেই প্রেমিকের অজান্তেই মিরার ওপর ন্যস্ত হয়েছিল গুরুতর দায়ভার। কিন্তু ইতিহাস বলে এধরণের সংগঠনের গোপন কার্যকলাপ এক ধরণের অন্ধকার নিয়ে আসে, ‘লোহিতকে’র ব্যাপারেও তার অন্যথা হয় নি। সংগঠনের সদস্যরা সেই অন্ধকার প্রথমে বুঝতে পারে না, কিন্তু নেতৃত্ব, দক্ষতা, নৈপুণ্য, বিশ্বাসঘাতকতা, ঈর্ষা ও অহংএর লড়াইয়ে তাদের ব্যক্তিগত আত্মত্যাগ বিসর্জিত হয়। ‘লোহিতক’ সংগঠনে মিরার গুরুত্ব দেখে সেই প্রেমিকের ঈর্ষা হয়, সে মিরার সঙ্গে অশিরের একটা সম্পর্কের কথাও কল্পনা করে। অশির মনে করে সংগঠনের স্বার্থে মিরার প্রেমিককে সরিয়ে দেয়া দরকার, অশিরের এই সিদ্ধান্তে মিরা রাজিও হয়। তাই অশিরের সঙ্গে মিরার পরিচয়ের কয়েক মাসের মধ্যেই সেই প্রেমিকের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়। অশির হয়তো সিলোনকে দিয়ে এই খুনটা করায়। কর্তৃপক্ষ সেটাকে আত্মহত্যা বলে ধরে নেয়। মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপনের পরে নতুন যে যুবকের আবির্ভাব হয় তার মাথায় ‘লোহিতক’, অশির বা মিরার কোনোই স্মৃতি ছিল না। মিরার সঙ্গে তার প্রেমের ইতিহাস মুছে গিয়েছিল। এভাবেই সংগঠনের স্বার্থে, বৃহৎ উদ্দেশ্যের নিমিত্তে মিরা তার প্রেমকে বিসর্জন দেয়। 

তার মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপনের পরে বিশালগড়ের রাস্তায় সেই প্রেমিক দু-একবার মিরার পাশ দিয়ে গেছে, মিরাকে চিনতে পারে নি। এতে মিরার মনে যে একেবারে দুঃখবোধ হয় নি তা নয়, কিন্তু বৃহত্তর স্বার্থের জন্য এটা একটা আত্মত্যাগ বলে নিজেকে প্রবোধ দিয়েছে। ততদিনে অবশ্য অশিরের প্রতি এক আদিম আকর্ষণ তার মধ্যে সে অনুভব করেছে তাই সেই বেদনাকে মেনে নিতে তার অসুবিধে হয় নি। এক খামার শ্রমিক থেকে মিরা পরিণত হয়েছে এক বিপ্লবী আততায়ীতে, অশিরের জন্যই এই নতুন উত্তেজনাময় জীবন সম্ভব হয়েছে। ইতিহাস গড়ছে এই মানুষ, মিরাকেও ইতিহাসে ভূমিকা রাখতে সাহায্য করছে। অশিরের ব্যক্তিত্বে সম্মোহিত মিরা লোহিতকের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন করে না, জানতে চায় না কেন অশিরের নির্দেশে অদিতার মস্তিষ্ককে বেতার কম্পাঙ্ক দিয়ে নিষ্ক্রিয় করে দেয়া হল, জিজ্ঞেস করে না কেন কোটি কোটি মানুষের মধ্যে অদিতাকে বাছাই করা হল। 

সে রাতে অশিরের আস্তানায় বিশ্রাম নেয় মিরা আর সিলোন আলাদা ঘরে। ‘লোহিতকে’র নেতার সম্মোহন চুম্বকের মত, তার মোহ মিরার মত সাহসী আর পৃথিবী বদলে দেবার মত মানুষও অগ্রাহ্য করতে পারে না। মাঝ রাতে উঠে অশিরের ঘরে যায় মিরা।

---------------------------

ঐ একই রাতে বিশালগড়ের ‘নিলয়ে’ জেগে ওঠে নতুন (আসলে পুরনো) বিনতা। তার মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপিত হয়েছে। ঘুম ভাঙতেই সে চিৎকার করে ওঠে, “পারছি না, আর পারছি না, আমাকে মুক্তি দাও।” ঘরে দৌড়ে আসে স-কুরা। সে হাত রাখে বিনতার মাথায়, মুহূর্তে শান্ত হয়ে যায় বিনতা, মাথাটা হেলে পড়ে বালিশে। আবার আর এক ঘুমে ঢলে পড়ে, আবারো স্বপ্ন দেখে, যে স্বপ্ন দেখেছে সে গত দু-বছর নিলয়ের মাটির নিচের গুদামে, সংরক্ষাণাগারে। যে স্বপ্ন থেকে মুক্তি নেই, যে স্বপ্ন সত্যির কাছাকাছি, যে স্বপ্ন বলে তুমি এক হাত-পা দেহবিহীন মানুষ, আবদ্ধ আছ এক কাঁচের বড় শিশিতে, সেই শিশি থেকে তোমার মুক্তি নেই, মুক্তি নেই। 


অদিতার আঁধার : পর্ব নয় 

দুবছর আগে বিনতা এসেছিল ‘নিলয়ে’ তার মস্তিষ্ক কপি করাতে। সেই কপি-করা মস্তিষ্ক দুবছর ধরে স্বপ্ন দেখেছে সূর্যাস্তের যে সূর্যাস্তের কোনো শেষ নেই। এক প্রশান্ত সাগরপাড়ে দিগন্তের মেঘের পেছনে সূর্য অস্ত যায়, বিনতা বালির ওপর বসে থাকে। তার পেছনে খাড়াই পাহাড় নেমে এসেছে, রচনা করেছে একটা বালিয়াড়ির তিনদিকে অর্ধবৃত্ত, অর্ধবৃত্তের অন্যদিকে একটা সরলরেখা ধরে ভেঙে পড়ে সমুদ্রের ঢেউ। পাহাড় আর সমুদ্রের মধ্যে এই উন্মুক্ত ছোট কুলুঙ্গীতে বসে বিনতার মনে পড়ে না সূর্যাস্ত ছাড়া অন্য কোনো সময়ে সে সূর্যকে দেখেছে কিনা, অথচ মনে হয় তার মনের গভীর কোনে এক কুয়াশা-ঢাকা স্মৃতি রয়ে গেছে - সে দেখেছিল তার দুপাশে ছোট ছোট মসৃণ ভেজা কালো পাথর চকচক করছে দুপুরের উষ্ণ সূর্যের আলোয়। কোনো এক অতীতে সূর্য মাথার ওপরে ছিল। 

এছাড়াও তার স্বপ্নে থাকত আর একটি মানুষের অধরা উপস্থিতি। তার কাছেই কোথাও আছে এক যুবতী, বিনতার মনে হয় তাকে সে চেনে - স্বপ্নে যেমন হয় - একটা আবছায়া বোধগম্যতার মধ্যে লুকিয়ে থাকে পরিচয়। মাঝে মাঝে দূর থেকে নিজেকে দেখে বিনতা - পেছনে চুল ছড়িয়ে সমতল উজ্জ্বল বালির ওপর বসা সে নিজে, তার অল্প পেছনে বসা আর একটি তরুণী। কিন্তু সে যখন মুখ ফিরিয়ে তরুণীকে দেখতে চেয়েছে সেখানে সে কাউকে দেখে নি। কোনো কোনো সময় বিনতা তার ছোট বালিয়াড়ির বাইরে যেতে চেয়েছে, কিন্তু চারপাশের পাহাড় তাকে বের হতে দেয় নি। সে চেষ্টা করেছিলে পাহাড়ের পাথরে পা রেখে ওপরে উঠবার, কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থ হয়েছে, পা পিছলে পড়েছে বহু নীচে। কিন্তু সেই পড়ায় তার হাড় ভাঙে নি, চামড়া ছড়ে রক্ত বের হয় নি। এখানে সকাল নেই, দুপুর নেই, এমনকি অন্ধকারও নেই, অথচ তার মনে হয় পৃথিবীতে সূর্যোদয় ছিল, দুপুর ছিল, আর পৃথিবীটা পাহাড় দিয়ে আটকানো সমুদ্রের ধারে এই ছোট বালির জগতের চাইতে বড় ছিল। বিরামহীন সূর্যাস্ত আর পাহাড়ের দেয়াল তাকে আটকে রেখেছিল সময় ও স্থানে। 

বিনতার স্বপ্ন বুদবুদের মত ভেসে উঠছিল একটা রাসায়নিক-ইলেকট্রনিক পাত্রে যত্ন করে রাখা মস্তিষ্কে। সেই মস্তিষ্ক বাইরের জগতের বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন ছিল না, কিন্তু ধীরে ধীরে বিনতা বুঝেছে তার অবরুদ্ধতা, বুঝেছে এই স্বপ্নের বাইরে সে যেতে পারবে না। সে সমুদ্রে সাঁতাড় কাটতে চেয়েছে, কিন্তু হাঁটুজল থেকে সে বারে বারে হাঙরের ভয়ে ফিরে এসেছে, স্বপ্ন তাকে সাঁতার কাটতে দেয় নি। এক সূর্যাস্ত থেকে আর এক সূর্যাস্ত, তারপরে এর এক সূর্যাস্ত - অসীম সংখ্যক সূর্যাস্ত তাকে বিদ্ধস্ত করে দিয়েছিল। এক অসহায় ক্ষোভে সে পাহাড়ের পাথরে মাথা কুটেছে, কিন্তু তাতে মাথা ভাঙে নি, রক্ত ঝরে নি। সে চিৎকার করত, “আমাকে মুক্তি দাও, পাহাড় ভেঙে আমাকে নিয়ে যাও।” কিন্তু তার আর্তনাদ স্বপ্ন-জগতের নিউরনদের বাইরে যেতে পারত না। 

অবশেষে একদিন সে স্বপ্ন থেকে বের হয়ে আসে। পৃথিবীতে চলমান ডকটর বিনতা খুন হয়েছে লোহিতক আততায়ীদের হাতে। মৃত বিনতার মাথায় স্থাপন করা হল রাসায়নিক-ইলেকট্রনিক পাত্রে সুরক্ষিত বিনতার কপি-করা মস্তিষ্ক যে মস্তিষ্ক অন্তবিহীন সূর্যাস্তের স্বপ্ন দেখেছে গত তিন বছর। এই বিনতা আসলে পুরনো বিনতা, অপারেশনের পরে তার জ্ঞান ফিরে এলে প্রথমেই সে দেখে ডকটর তারকারের চোখ, তাতে উদ্বেগ। প্রথমে বিনতা ভাবে তার সূর্যাস্তের জীবনের সাথে যোগ হয়েছে এক নতুন মাত্রার, বিনতা বলে, “পারছি না, আর পারছি না, আমাকে মুক্তি দাও।” ডকটর তারকার বুঝতে পারেন বিনতার আকুতি, গভীর সমবেদনায় হাত রাখেন বিনতার কপালে, বলেন, “আপনার মুক্তি হয়েছে, ডকটর বিনতা।” তারকারের অগোছালো সোনালী চুলের নিচে উজ্জ্বল সহৃদয় নীল চোখে বিনতা সান্ত্বনা পায়। তারকারকে চিনতে পারে বিনতা, এই তো সেই বিশেষজ্ঞ যার সঙ্গে তার সবে পরিচয় হয়েছে, যে কিনা তার মস্তিষ্ককে কপি করার জন্য তাকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছিল। বিরাট কাচের জানলার বাইরে বিশালগড়ে তখন মধ্যরাত, গতকাল এরকম সময়েই আর এক বিনতাকে শহরের রাস্তায় ছোরা দিয়ে কারা যেন হত্যা করেছিল। সেকথা এই নতুন বিনতা এখনো জানে না, কিন্তু সে জানে সে যখন পাহাড়-ঘেরা সমুদ্রতীরে আটকে ছিল, তার প্রতিলিপি - আর এক বিনতা - পৃথিবীর বুকে ঘুরে বেরিয়েছে। আজকের বিনতা এও বোঝে ঐ বিনতার মৃত্যু হয়েছে। 

*****************************

ডকটর তারকার যখন বিনতার মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপন করছিলেন তখন ‘নিলয়ের’ আর একটি ঘরে বিষাণ কথা বলছিল কেন্দ্র থেকে পাঠানো দুজন রাজনৈতিক কর্মীর সঙ্গে। এদেরকে হয়তো গোয়েন্দা বলাই সঙ্গত। এদের একজন পৃথিবী পরিচালনার নীতিসংক্রান্ত বিধিগুলো দেখে, তার নাম আলহেনা, অপরজন হল নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, তার নাম নাকোটা। নাকোটা উড়ে এসেছে সুদূর গ্রীনল্যান্ড আর আলহেনা আরব অন্তরীপ থেকে, দুজনেই তরুণী, তাদের বয়স এক শর নিচে। বিশালগড়ের আর্দ্রতার জন্য তারা কেউই প্রস্তুত ছিল না। এখন নিলয়ের আবহাওয়া-নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে দুজনেরই স্বস্তি পাবার কথা, কিন্তু স্বস্তি তারা পাচ্ছে না। গত কয়েক শ বছর ধরে পৃথিবীতে যে সাম্যাবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে তার মধ্যে কোথায় যেন চিড় ধরেছে। সেই ফাটলের শুরু কোথায় সেটাই ধরতে চাইছে এই দুজন। 

পৃথিবী পরিচালনা কমিটির সঙ্গে একসময়ে বিষাণের খুবই ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল, কারণ মস্তিষ্ক কপি করার বিজ্ঞানে বিষাণের কাজ ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মস্তিষ্ক নিয়ে অধ্যাপক বিষাণের গবেষণার কথা এই দুই গোয়েন্দা খুব ভাল করেই জানে। তারা বিষাণের সঙ্গে কথা বলার জন্য খুবই উৎসুক ছিল, বিষাণ তাদের কাছে এক কিংবদন্তীর নায়ক। তবু এই আলাপে পেশাদারীত্ব বজায় রাখতে আলহেনা ও নাকোটা তাদের উচ্ছ্বাস সংবরণ করে। শুভেচ্ছা বিনিময়ের পরে আলহেনা বলে, “প্রফেসর বিষাণ, আমাদের বেশ কিছু প্রশ্ন আছে, এটা একটা বিরাট ধাঁধা, এই ধাঁধার সমাধানে আপনার একটা বড় ভূমিকা আছে।” কেন্দ্র থেকে আসা এই দুই নারীকে একটা বাড়তি আপদ ভাবছিল বিষাণ, অদিতা ও বিনতাকে বাঁচিয়ে তুলতে হবে, এখন এদের সঙ্গে কথা বলে সে সময় নষ্ট করতে চায় না। গত দুদিনের নিদ্রাহীন ক্লান্তি তাকে গ্রাস করে, কিন্তু আলহেনার কথায় সহানুভূতির ছোঁয়া পায় সে, তার অসন্তোষ কিছুটা কমে। তাছাড়া পরিচালনা কমিটির সঙ্গে সংযুক্ত সবাই খুবই যোগ্য মানুষ, তারাও সময়ের অপব্যবহার করে না। 

“আপনাকে আমরা বেশ কিছু ব্যক্তিগত প্রশ্ন করব, আপনি এতে আমাদের ওপর বিরক্ত হবেন না,” আলহেনা কপালের ওপর সোনালী চুল হাত দিয়ে পাশে সরিয়ে বলে, “আপনার সঙ্গে আমাদের কথাগুলো ভিডিও করা হবে, আশা করি তাতে আপনার সম্মতি আছে?” আলহেনার হাল্কা কালো চোখের দিকে তাকিয়ে বিষাণ সম্মতিসূচক মাথা নাড়ায়। 

“আপনার সঙ্গে অদিতা সানের কতদিন হল ছাড়াছাড়ি হয়েছে?” নাকোটা জিজ্ঞেস করে। এই প্রশ্নটা বিষাণ আশা করছিল না। কয়েক সেকেন্ড সময় নেয় সে উত্তর দিতে, “আশি বছর হবে প্রায়।” 

“আর চাঁদে আপনার ছেলে সেনভা কবে হারিয়েছে?” নাকোটার কালো লম্বা চুলের একপাট সামনে রাখা। সেনভার কথাটা কেন নাকোটা জিজ্ঞেস করছে সেটা বিষাণ বুঝতে পারে না। 

“একশো বছর হল অন্ততঃ।” একটু ভেবে উত্তর দেয় বিষাণ। 

“হমমম…,” মাথা দোলায় নাকোটা। চুলের পাটের মধ্যে দিয়ে তার জামার ওপর পরিচালনা কমিটির ব্যাজ চোখে পড়ে। বিষাণ জানে এসব কথা আর ছবি রেকর্ড হচ্ছে নাকোটার বাদামী চোখের মণির পেছনের রেটিনায়। 

এবার আলহেনা প্রশ্ন করে, “ডকটর বিনতাকে আপনি কবে থেকে চেনেন?” 

“ওনার সঙ্গে মাত্র গতকাল পরিচয় হল।” 

“উনি কি আপনাকে কোনো অদ্ভূত আঁধারের কথা বলেছেন?” আলহেনা জিজ্ঞেস করে। 

চমকে ওঠে বিষাণ। আঁধার? এরা আঁধারের কথা কী করে জানল? কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকে বিষাণ, ঘরের একদিকে বড় কাচের জানালা দিয়ে বিশালগড়ের আলো দেখা যায়। বিষাণ মনে করতে চায় বিনতার সঙ্গে তার কথোপকথন। তারপর আস্তে বলে, “ডকটর বিনতা আমাকে এক আকারহীন অন্ধকার মেঘের কথা বলেছিলেন যা কিনা সমস্ত আলো শুষে নেয়। অদিতা তাঁকে সেই মেঘের কথা বলেছিল।” 

“হ্যাঁ, আমাদের ফাইলে অদিতা সানের সঙ্গে ডকটর বিনতার কথোপকথনটা আছে। আপনার এটা দেখা দরকার,” নাকোটা একটা ছোট বাক্স টেবিলের ওপর রেখে হাত দিয়ে একটা ইঙ্গিত করে, বাক্স থেকে একটা ত্রিমাত্রিক প্রক্ষেপণ বের হয়, তাতে অদিতাকে কথা বলতে দেখা যায়। এই ভিডিওটি বিনতার চোখ রেকর্ড করেছিল। 

অদিতা বলছে, “"হ্যাঁ, অন্ধকার, অদ্ভূত আঁধার বলতে পারেন। এক ধরনের শূন্যতা। সেটা স্বপ্ন কি বাস্তব আমি বুঝতে পারি না। ঘরটা যদি আলো-আঁধারি হয় শুধু তখনই সেটা আসে, একটা কালো বেলুন ফুলে ফেঁপে ওঠে ঘরের মধ্যে। হয়তো জানালা দিয়ে আসে, কিন্তু জানালা বন্ধ থাকলেও আসে। পুরো ঘরটা ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে যায়। মনে হয় কালো কালো আঙ্গুল সেই অন্ধকার গঠ্ন থেকে বের হয়ে আমার মুখের দিকে আসছে। আমি চোখ বন্ধ করে ফেলি। তারপর আর কিছু মনে থাকে না। এমন যেন আমার মৃত্যু হয়েছে।" 

শিউরে ওঠে বিষাণ। একটা ঠাণ্ডা বাতাস যেন বয়ে যায় ঘরে, হিম হয়ে যায় শরীর। মনে হয় ঘরটা অন্ধকার হয়ে আসে, বিশালগড়ের রাত ঘরের উজ্জ্বল বাতিগুলোকে ম্রিয়মান করে দেয়। 

অদিতার প্রক্ষেপণ বলতে থাকে, "যে রাতে আমার ঘুম আসে না সে রাতে আমি দোতলার বারান্দায় যেয়ে নদীর ওধারে জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে থাকি। জোনাকীরা ঝলমল করে, নদীর এপাড়ে যখন তারা নেভে ওপাড়ে তখন তারা জ্বলে ওঠে, আবার ওপাড়ে নিভলে এপাড়ে জ্বলে। ঝিঁঝিঁর ডাকও যেন তার সাথে ওঠানামা করে। মাঝে মধ্যে মেছো পেঁচা ডেকে ওঠে কোথায় হুহহুহু-হু, রাতের অন্ধকারেও মেঘহও মাছরাঙারা জলে ঝাঁপ দেয়। অনেক সময় নেকড়ের ডাক শুনি, উউউউউউ, রহস্যময় সেই ডাক। গায়ে কাঁটা দেওয়া তাদের কোরাস কন্ঠ ছড়িয়ে পড়ে পুরোনো বনস্পতির ওপর দিয়ে, নিশীথ রাতের চাঁদের নীরবতার নিচে সেই ডাক ভেসে আসে নদীর এধারে আমাদের বাড়িতে। এসব কিছুই আমার চেনা, আমিই এখন রাতের অরণ্য। বনের শব্দ, গন্ধ, স্পর্শ আমার মজ্জাগত। কিন্তু এসব কিছুর মধ্যেই অন্য একটা কিছু জিনিস সৃষ্টি হতে থাকে। আমি যেন দেখতে পাই নদীর ঐ পাড়ে একটা অন্ধকার দলা পাকিয়ে উঠছে, ফুলে ফেঁপে উঠছে বর্ষার কালো মেঘের মতন। ফুঁসে উঠছে সেই অন্ধকার। আর তখনই বনের সব আওয়াজ বন্ধ হয়ে যায়। নেকড়ে, পেঁচা, ঝিঁঝিঁ সব। জোনাকীরাও যেন কোথায় চলে যায়। 

"নদী পার হয়ে সেই কালো অন্ধকার আমার দিকে তার শীর্ণ হাত বাড়িয়ে দিতে চায়। কিন্তু সেই আঁধারের মধ্যেই, সেই ফুলে ওঠা অন্ধকারের মধ্যেই কি যেন নেকড়ের চোখের মত জ্বলজ্বল করে, আমাকে যেন লক্ষ করে। এরকম মিনিটখানেক থাকে, তারপর সেই অন্ধকার, জ্বলজ্বলে চোখ মুছে যায়। আমি ঘরে ফিরে আসি। ঐসব রাতে সেই আঁধার আর আমার ঘরে আসে না। এমন যেন একবার ভয় দেখিয়েছে, আর দেখানোর দরকার নেই।" 

অদিতার বর্ণনা নাকোটা আর আলহেনার মধ্যেও এক ধরণের ভয় সঞ্চারিত করে। নাকোটা অদিতার এই কথাগুলি বারদুয়েক শুনেছে, যতবার শুনছে ততবার সে এক অন্ধকার মেঘ কল্পনা করছে, ততবাত শিহরিত হয়েছে। সে বিষাণকে প্রশ্ন করে, “প্রফেসর, ডকটর বিনতা কি নিজে সেই আঁধার অনুভব করেছেন?” 

“হ্যাঁ, উনিও নাকি এই আঁধার দেখেছিলেন। যেদিন অদিতা তাঁকে সেই অন্ধকার মেঘের কথা বর্ণনা করেছিল সেদিন রাতেই ডকটর বিনতা তাঁর ঘরে ঐ কালো মেঘ দেখেন। ওঃ, আর একটা কথা অদিতা বিনতাকে বলেছিল একবার এই অন্ধকার মেঘ কেটে গিয়েছিল বাঁশীর শব্দে।” 

“বাঁশীর শব্দে!?” নাকোটা আর আলহেনা দুজনেই আশ্চর্য হয়ে বলে ওঠে। বিষাণ তাদের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায়, এই দুজন এমন কী জানে যা তার অজ্ঞাত। কিন্তু তারা কিছু বলে না। বেশ কিছু সময় তিনজনই মৌন থাকে, তারা যেন সেই ঘরে অন্ধকার মেঘ জমার অপেক্ষা করছিল, তারা যেন সেই বাঁশীর শব্দ শুনতে চাইছিল। 

আলহেনা নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে বলে, “অদিতা সান তাঁকে মৃত অবস্থা থেকে যাতে আর ফিরিয়ে না আনা হয় সেটার চেষ্টা করছিলেন। উনি এখন কোমায় আছেন, আপনি ভাল জানবেন উনি এই কোমা থেকে ফিরতে পারবেন কিনা। যদি না ফেরেন তবে আর মাত্র একটি মস্তিষ্ক আছে ওনার, সেটি নিষ্ক্রিয় হলে ওনার অভিলাষ পূর্ণ হবে। আপনার কি মনে হয় ওনার সঙ্গে লোহিতক গোষ্ঠীর কোনো যোগাযোগ হয়েছিল?” 

ব্যাপারটা এভাবে বিষাণ আগে যে ভাবে নি তা নয়, লোহিতক যদি সব সংরক্ষিত মস্তিষ্ক ধ্বংস করে দেয় তবে অদিতার মুক্তি হবে। কিন্তু লোহিতকের সঙ্গে অদিতার সরাসরি কোনো সম্পর্ক থাকবে সেটা বিষাণ ভাবতে পারে না 

“আপনার কম্পুটার সিমুলেশন কি লোহিতকের নেতা সম্পর্কে কোনো তথ্য দিয়েছে?” আলহেনা প্রশ্ন করে। 

“না, শুধু বলেছে বিনতার হত্যাকাণ্ডে লোহিতকের দায়িত্বের সম্ভাবনা শতকরা ৮২ ভাগ। সেখানে কোনো নেতার উল্লেখ করা হয় নি।” 

নাকোটা বিষাণকে প্রশ্ন করে, “আপনি কম্পুটারে সিমুলেশন করেছেন, বলছেন ডকটর বিনতাকে হত্যা করতে পারে লোহিতক সন্ত্রাসী সংগঠন। আপনার সিমুলেশন বলছে অদিতা সানকে বেতার তরঙ্গের সাহায্যে কোমায় নিয়ে গেছে লোহিতকরাই। আপনি কি নিজেকে এই সিমুলেশনে অন্তর্ভূক্ত করেছিলেন?” 

নাকোটার প্রশ্নটা বুঝতে অসুবিধে হয় বিষাণের। “আমাকে? না, আমাকে সিমুলেশনে রাখি নি।”

“আপনি বলছেন নিজেকে সিমুলেশনে রাখার কথাটা আপনার মনে হয় নি?” এবার প্রশ্ন করে আলহেনা। তার আর নাকোটার চোখে-মুখে বিস্ময়, বিষানের মত বুদ্ধিমান মানুষ নিজের চরিত্রকে বাদ দিয়ে অদিতা ও বিনতার মৃত্যুকে সিমুলেশন করেছে সেটা তাদের বিশ্বাস হয় না। 

তরুণী দুজনের বিস্ময় দেখে বিষাণের বোধোদয় হয়, সত্যি কেন সে নিজেকে বাদ দিয়েছে এই গণনা থেকে! সে ভাবে কেমন করে প্রোগ্রামে নিজের তথ্য দিতে সে ভুলে গেল! 

“আপনি সেনভাকে শেষ কবে দেখেছেন?” আলহেনার প্রশ্ন। আবার সেনভা, ভাবে বিষাণ, সেনভার সঙ্গে এইসব ঘটনার কী সম্পর্ক? 

“প্রায় ষাট-সত্তর বছর হবে। আমি আর দিতা কেম্যান দ্বীপে গিয়েছিলাম ওর সঙ্গে দেখা করতে।”

“শেষ কবে তার সঙ্গে কথা হয়েছে?” 

“পরশু দিন, আমি ওকে ফোন করেছিলাম অদিতার খবরটা জানাতে।” 

“কোথায় ছিল সেনভা যখন আপনি ফোন করেছিলেন?” 

“উত্তরের আর্কটিক মহাসমুদ্রে, এক জাহাজে।” 

আবার দৃষ্টি বিনিময় করে আলহেনা ও নাকোটা। বিষাণ সেই দৃষ্টির অর্থ ধরতে পারে না, সেনভাকে এর মধ্যে কেন টেনে আনা? যা মনে হয় এরা সেনভা সম্বন্ধে মোটামুটি সব কিছুই জানে। বেশ অনেক বছর আগে বৃহস্পতির উপ্রগ্রহ ইউরোপা অভিযানে সমুদ্রবিজ্ঞানী হিসেবে সে যোগ দিয়েছিল, এ কথা অনেকেরই জানা। এসব ভেবে আরো শ্রান্ত হয়ে পড়ে বিষাণ। তার ক্লান্তি চোখে পড়ে আগন্তুকদের। 

নাকোটা বলে ওঠে, “আপনি এখন বিশ্রাম নিন, প্রফেসর। তবে একটু সুস্থির হয়ে সিমুলেশনটা আর একবার চালাবেন - এবার আপনাকে অন্তর্ভূক্ত করে। সেটার কী ফলাফল হয় দেখতে আমরা খুবই আগ্রহী।” 

“কেন? আপনারা কী কিছু জানেন, আপনাদের সিমুলেশন কি নতুন কোনো তথ্য দিয়েছে? দয়া করে আমার কাছ থেকে আড়াল করবেন না,” বলে বিষাণ। 

নাকোটা আলহেনার দিকে তাকায়। আলহেনার কালো ভুরু অল্প ওপরে ওঠে, যেন সম্মতি দেয়। নাকোটা বলে, “লোহিতকগোষ্ঠী একটি সন্ত্রাসী সংগঠন, মানব জীবনের মূল্য তাদের কাছে খুবই কম, তারা মানুষের দীর্ঘ জীবন চায় না। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা তারা এই উদ্দেশ্যের জন্য মানুষ হত্যা করতে পিছ-পা হয় না। এই সন্ত্রাসের শিক্ষা প্রতিটি লোহিতকের সদস্য পায় তাদের এক নেতা থেকে। সে আমাদের সমস্ত ধরণের তথ্য সংগ্রহ-উপায়ের বাইরে থাকে। মাত্র গতকাল তার একটা ছবি আমরা জোগাড় করতে পেরেছি। আপনাকে দেখাচ্ছি।” 

টেবিলের ওপর যে ছোট বাক্সটা বিনতার সঙ্গে অদিতার কথোপকথন দেখাচ্ছিল সেটাতে একটা মুখ ভেসে ওঠে। সেটা দেখে বিষাণের মুখ থেকে একটা অস্ফূট গোঙানি বের হয়। তারপর দুহাত দিয়ে মাথা চেপে ধরে সে, বলে, “এটা সম্ভব নয়, এটা সম্ভব নয়।” আলহেনা ও নাকোটা বিষাণের বেদনায় বিচলিত হয়, উতলা হয়, কিন্তু এই মুহূর্তে তাদের করার কিছু থাকে না। বিষাণের কথা প্রায় শোনা যায় না, ভাঙা গলায় সে বলে, “আপনারা ভুল ছবি দেখাচ্ছেন।” 



দশম পর্ব

ত্রিমাত্রিক ছবিটি টেবিলের ওপরে ঘোরে। সেনভার ছবি। বিষাণ আর্তনাদ করে ওঠে, “এই ছবি ঠিক ছবি নয়, এই ছবি ভুল ছবি।” সেই আর্তনাদের অসাহয়ত্ব নাকোটা ও আলহেনাকে বিচলিত করে। সেনভার মুখটা টেবিলের ওপর ঘুরতে ঘুরতে শেষাবধি স্থির হয়ে যায়। নাকোটা তার হাত দিয়ে টেবিলের মাঝখানে রাখা বাক্সটার দিকে একটা ঈঙ্গিত করে, সেনভার ছবিটা নিভে যায়।

“সেনভা এখন আর্কটিক সাগরে, সে এখানে কী করে আসবে?” বিষাণের গলা অস্ফূট।

“আপনি এত বিচলিত হবেন না, প্রফেসর,” আলহেনা বলে, “আমরা জানি সেনভা এখন উত্তর সাগরে আছে।”

“তাহলে?” তাহলে কথাটা যতক্ষণ বিষাণের বলতে সময় নিল, সেই সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যেই তার মনে একটা সম্ভাবনার কথা জেগে উঠল -- এটা কী সম্ভব? না এটা অসম্ভব একটা ব্যাপার। এটা হতে পারে না।

আলহেনা আর নাকোটা বিষাণকে সময় দেয়। তারা জানে বিষাণ নিজেই এই ধাঁধার অর্থোদ্ধার করতে পারবে। অবশেষে বিষাণ বলে, “চাঁদে তাহলে সেনভা হারায় নি, সে পৃথিবীতে ফিরে এসেছে? না না, সেটা অসম্ভব, এই যুবক সেনভা হতে পারে না, অশির সেনভা হতে পারে না, এটা অন্য কেউ।”

নাকোটা বা আলহেনা কেউই এর উত্তর দেয় না, তারা দুজনেই জানে বিষাণকে সময় দিতে হবে। প্রায় মিনিটখানেক পরে চেয়ার ছেড়ে আলহেনা উঠে একদিকের দেয়ালের কাছে যায়। আলহেনার হাতের নির্দেশে এবার দেয়ালে ফুটে ওঠে বিশালগড়ের ব্যস্ত রাস্তা। সেখানে ক্যামেরা জুম করে এক নারী মুখের ওপর, আমরা তাকে চিনি, সে হল মিরা, ডকটর বিনতার একজন হত্যাকারী।

আলহেনা বলে, “এই যুবতীর নাম হল মিরা, বহুদিন হল সে আমাদের কম্পুটার ব্যবস্থায় আছে কারণ তার প্রাক্তন প্রেমিক লোহিতকের সদস্য ছিল। লোহিতকের সঙ্গে জড়িত প্রতিটি মানুষকে আমরা চোখে চোখে রাখি, কিন্তু তাদের আটক করতে পারি না, হত্যা সন্ত্রাস এসবের সঙ্গে তাদের যোগাযোগের প্রমাণ না পেলে আমরা কোনো পদক্ষেপ নিতে পারি না। মিরার প্রেমিকের খুব সন্দেহজনকভাবে মৃত্যু হয়, কিন্তু সেটাকে আমরা খুব একটা আমল দিতাম না যদি না ছেলেটির মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপনের পরে মিরার ব্যবহারের পরিবর্তন আমরা লক্ষ না করতাম।”

দেয়ালে ভেসে ওঠে সেই যুবকের ছবি। আলহেনা বলতে থাকে, “যুবকটির মস্তিষ্ক কপি করা হয় প্রায় তিন বছর আগে, লোহিতক গোষ্ঠীর সঙ্গে তার যোগাযোগ এরপরে স্থাপিত হয়, মিরার সাথে পরিচয় হয় আরো পরে। তাই পুরোনো মস্তিষ্কের স্মৃতিতে এসব ঘটনা নেই। মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপনের পরে স্বাভাবিকভাবেই লোহিতক আর মিরার সঙ্গে তার যে সম্পর্ক ছিল সেটা সে ভুলে যায়। কিন্তু আমাদের চোখে পড়ল মিরা তাকে যেন আর চিনতে চাইল না। এর আগে মিরা সম্পর্কে আমরা সেরকম কিছু ভাবি নি, কিন্তু তার প্রেমিকের মৃত্যু ও এরপরে তাকে না চেনার ভাব করা আমাদের মাঝে সন্দেহ জাগায়। আমরা সমস্ত তথ্য দিয়ে কম্পুটার সিমুলেশন করি। সিমুলেশন বলে সেই যুবকের মৃত্যুর পেছনে লোহিতকের হাত আছে।”

বিষাণ বুঝতে পারে না মিরার সঙ্গে সেনভার কী সম্পর্ক, সে একটু অস্থির হয়ে ওঠে। আলহেনা বিষাণের অস্থিরতা বোঝে, কিন্তু তার আরো কিছু পূর্বকথা বলের আছে। সে বলে, “আমরা এরপরে মিরাকে চোখে চোখে রাখি। কয়েক দিনের মধ্যেই মিরাকে আমরা বিশালগড়ের একটা বাড়িতে আসা-যাওয়া করতে দেখি। সেই বাড়ি থেকেই একদিন সেনভা - বা যাকে এখন আমরা অশির বলে চিনি - তাকে বের হতে দেখি। দুঃখের বিষয় আমাদের হাতে যথেষ্ঠ প্রমাণ ছিল না তাকে ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য, আপনি জানেন তো আমাদের নাগরিক সুরক্ষা আইন কেমন শক্তিশালী, বিশেষতঃ বিশালগড়ে। এমনকি লোহিতকের সদস্যদের যে আমরা নজরে রাখছি সেটা যদি সুরক্ষা কমিটি জানতে পারে তাহলে আমাদের সমস্ত গোয়েন্দা কার্যকলাপ বন্ধ করে দেবে। তবে ডকটর বিনতার হত্যাকাণ্ডের পরে মনে হয় আমাদের হাতে অনেক সাক্ষ্য এসেছে আইনতঃ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবার।”

বিষাণ আলহেনার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনে, কিন্তু সেই কথার মধ্যে চাঁদ থেকে সেনভা কী করে পৃথিবীতে এল, অথবা কেমন করে সেনভা অশিরে পরিণত হল সেই ব্যাখ্যা থাকে না। সে বলে, “কিন্তু অশির চাঁদে হারিয়ে যাওয়া সেনভা হতে পারে না।”

এবার নাকোটা বলে, “প্রফেসর বিষাণ, আমরা অশিরের কোনো জীন-বা ডিএনএ-গত তথ্য সরাসরি বিশ্লেষণ করতে পারি নি, কিন্তু আমরা তার মুখাবয়ব ও চুলের রঙের বর্ণালী বিশ্লেষণ করে সেনভার সঙ্গে বলতে গেলে শতকরা ১০০ ভাগ মিল পেয়েছি।”

“কিন্তু তাহলে সেনভা চাঁদ থেকে কেমন করে পৃথিবীতে ফিরে এল? আর চাঁদেই বা সে কেমন করে হারিয়ে গেল?”

আলহেনা দেয়ালের ওপর হাত রাখে। দেয়াল জুড়ে ভেসে ওঠে চাঁদের বড় ছবি। সেই ছবির দিকে হাত তুলে আলহেনা বলে, “আপনি জানেন চাঁদের বুকে প্রায় ১০০টি স্টেশন আছে, মূলতঃ বিজ্ঞান গবেষণা ও পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে। এর মধ্যে শুধুমাত্র ২০টি চাঁদের অপর পৃষ্ঠে, যাকে আমরা অন্ধকার দিক বলি, সেদিকে অবস্থিত যারা পৃথিবীর সাথে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারে শুধুমাত্র চাঁদের কক্ষপথে বসানো কয়েকটি কৃত্রিম উপগ্রহ মাধ্যমে। অশির যে সেনভা হতে পারে এই ধারণাটা আমাদের মাথায় এলে আমরা আবার সেনভার পুরোনো ফাইল খুলি। নতুনভাবে কম্পুটার সিমুলেশন করা হয়, সেই সিমুলেশন বলে আপনারা - আপনি ও অদিতা সান - যেখানে ছিলেন তার পাশেই একটা খুবই প্রাচীন, প্রায় ১৭০০ বছরের পুরোনো স্টেশন ছিল মাটির নিচে। তখনো মহাজাগতিক বা কসমিক কণা থেকে মানুষের দেহকে বাঁচানো সহজ ছিল না। তাই মাটির নিচে প্রায় দশ-বারোটা স্টেশন চাঁদে করা হয়েছিল। এর মধ্যে পৃথিবীতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রকোপে যে বিরাট সামাজিক ও রাজনৈতিক দুর্যোগ দেখা দেয় তার ফলে চাঁদের সমস্ত প্রকল্প বন্ধ হয়ে যায়, ঐ স্টেশনগুলোর সব তথ্যই হারিয়ে যায়। শুধুমাত্র একটি সংগঠনের কাছে ঐ তথ্যগুলো ছিল। সেটা বলতে পারেন লোহিতকের পূর্বসূরী। আমরা শুধুমাত্র এটা আন্দাজ করছি, আমাদের সিমুলেশনও তাই বলছে। সেনভাকে ঐ সংগঠন তার মস্তিষ্কের স্বাভাবিক তরঙ্গ কম্পাঙ্ক ব্যবহার করে স্টেশনের বাইরে যেতে বাধ্য করে, তারপর স্টেশনের কাছেই মাটির নিচে যে পুরোনো বাসস্থান ছিল - যার নকশা তখনো অজানা ছিল আপনাদের কাছে - সেই জায়গায় তাকে নিয়ে রাখে। সেই বাসস্থান থেকে মাটির তলায় প্রায় শ খানেক কিলোমিটার সুরঙ্গ ছিল যাতে কিনা অনায়াসে একটি গাড়ি চলাচল করতে পারে।”

দেয়ালের ভিডিওতে একটা সিমুলেশন ফুটে ওঠে - বালক সেনভা বায়ুচাপ-সম্বলিত পোষাক পড়ে চাঁদের স্টেশন থেকে বের হয়ে একটা পাথরের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে যায়। পরে সেই পাথরের পেছন দিকে দেখানো হয় একটা গর্ত যেখান দিয়ে সেনভা নিচে নেমে যায়। সেনভা গর্তে ঢুকে যাবার পরপরই একটা পাথর স্বয়ংক্রিয়ভাবে নড়ে গর্তের মুখটা বন্ধ করে দেয়। চাঁদের মাটির তলার স্টেশনের সুরঙ্গ ফুটে ওঠে। সেখানে সেনভা যন্ত্রচালিতের মত একটা গাড়িতে ওঠে, গাড়িটি দুটো রেল লাইনের ওপরে বসানো। সেনভা উঠলে গাড়িটি চলতে শুরু করে ও সুরঙ্গের অপর প্রান্তে হারিয়ে যায়।

বিষাণ আশ্চর্য হয়ে ভিডিওটি দেখে। চাঁদে মাটির নিচে স্টেশনের কথা সে শুনেছে, কিন্তু সেটা যে তার জীবনের সাথে এভাবে জড়াতে পারে সে ভাবে নি। কিন্তু সেনভাকে বেতার-তরঙ্গ দিয়ে প্রভাবিত করে স্টেশনের বাইরে নিয়ে যাবার কথাটা সে যেন বিশ্বাস করতে পারে না। ঐ সময়ে বেতার-তরঙ্গ দিয়ে কি মানুষের মস্তিষ্ককে পুরোপুরি আয়ত্তে আনা সম্ভব ছিল? এর মধ্যেই বিষাণের কপালের চামড়ার নিচে বসানো ফোন সঙ্কেত দেয় - ডকটর তারকার ফোন করছে। বিষাণ হাত তুলে আলহেনাকে থামতে বলে। ডকটর তারকার বলে, “ডকটর বিনতার চেতনা ফিরে এসেছে। কিন্তু আপনার এখানে একটু আসা প্রয়োজন।” বিষাণ বলে, “আমি আসছি কিছুক্ষণ পরেই।”

বিনতার জ্ঞান ফিরে আসায় বিষাণ কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়, কিন্তু আলহেনা ও নাকোটার কাছ থেকে তার এখনো অনেক কিছু জানার আছে। একশ বছর আগে লোহিতক গোষ্ঠী বালক সেনভাকে অপহরণ করেছে, সেই সময়ই তারা এমন কিছু পরিকল্পনা করেছিল যা কিনা সুদূরপ্রসারী, অন্ততঃ একশ বছরের ভবিষ্যতে বিস্তৃত। বিষাণ বুঝতে পারে মস্তিষ্ক কপি করা ও প্রতিস্থাপনে তার বিশেষ ভূমিকার জন্যই সেনভাকে লোহিতক বেছে নিয়েছিল, তারা সেনভাকে নতুনভাবে গড়েছে, লোহিতকের দর্শনে বড় করেছে, অশির নাম দিয়েছে। সেই অশির আজ লোহিতকের নেতা। এটা এক ধরণের প্রতিহিংসা। অশির কি জানে না বিষাণ ও অদিতার সাথে তার সম্পর্ক, নাকি জেনেশুনেই সে এই পথে গেছে। হয়তো নতুন সেনভার অস্তিত্ব সে সহ্য করতে পারে নি।

বিষাণ আলহেনা ও নাকোটাকে উদ্দেশ্য করে বলে, “ডকটর বিনতার জ্ঞান ফিরেছে, আমাকে যেতে হবে। কিন্তু বুঝতেই পারছেন আপনাদের কাছ থেকে আমার অনেক কিছু জানার আছে। চাঁদ থেকে সেনভা বা অশিরকে পৃথিবীতে কেমন করে নিয়ে আসা হল অথবা এতদিন কেমন করে সে সমস্ত তথ্য-ব্যবস্থার বাইরে ছিল - এই সবকিছুই বড় রহস্য। লোহিতকের দর্শন সম্পর্কে আমি আগ্রহী হই নি, অথচ আমার কাজের বিপরীতে তাদের অব্স্থান সম্পর্কে আমি গত একশ বছর ধরেই জানি।”

আলহেনা দেয়ালে চাঁদের ছবি নিভিয়ে দিয়ে এসে চেয়ারে বসে। তারপর টেবিলের ওপরের সূক্ষ্ণ কারুকাজের দিকে তাকিয়ে কিছুটা আনমনা ভাবেই বলে, “লোহিতক আপনার কাজের উদ্দেশ্যতে বিশ্বাস করে না। তারা সমস্ত কপি-করা সংরক্ষিত মস্তিষ্ক ধ্বংস করে দিতে চায়। ১৬ বিলিয়ন থেকে গত দু হাজার বছরে আমাদের জনসংখ্যা দুই বিলিয়নে নেমেছে। এই সংখ্যাকে স্থিত করতে মানুষের আয়ু বাড়ানো জরুরী ছিল। একই সাথে দুর্ঘটনা-জনিত ট্র্যাজেডিকে চিরতরে দূর করার জন্য মস্তিষ্ককে কপি করে রাখার দরকার ছিল। পৃথিবীর মানুষ নানান ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে গেছে। আমরা মনে করছি বর্তমান পৃথিবীর মানুষ মানুষ হিসাবে তার পরিচয়কে প্রাধাণ্য দিচ্ছে। কিন্তু এগুলোকে ধরে রাখতে কিছু কেন্দ্রীয় নীতি চালু রাখতে হচ্ছে, এর মধ্যে একটি হল একটি মানুষের আয়ু অন্ততঃ ২০০ বছর না হলে সে মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়ার থেকে অব্যাহতি পাবে না, অর্থাৎ সে মরতে পারবে না। আপনি জানেন বিশ্বব্যাপী যে গণভোট হয়েছে তাতে এই আইনটি পাশ হয়েছে। আগামী ২০ বছরের মধ্যে এটি পরিবর্তনের কোনো অবকাশ নেই, ২০ বছর পরের গণভোট হয়তো এটাকে বদলাবে। আমি যেটা বলতে চাইছিলাম একটা সুস্থির সুন্দর সমাজ গড়তে স্বাধীন চিন্তা দরকার, কিন্তু সেই চিন্তার বিকাশের জন্য আবার একটা সুস্থিত অবস্থার প্রয়োজন। লোহিতকের দাবি আমাদের বর্তমান স্থিতিকে পাল্টে দেবার দাবি, তারা জানে গণতান্ত্রিক উপায়ে এগোলে মানুষ তাদের ভোট দেবে না।”

আলহেনার কথায় এক ধরণের আশাবাদিতা থাকে। আরব অন্তরীপের ধূসর বালিকণার মাঝে একটি শহরে সে বড় হয়েছে। উদারতা ও সহিষ্ণুতার যে শিক্ষা সে ছোটবেলায় পেয়েছে গোয়েন্দা কাজের জটিলতা ও কুটিলতার মাঝেও তার ঔজ্জ্বল্য ম্লান হয় নি।

বিষাণের চোখদুটো জড়িয়ে আসে, দুদিন জেগে থাকবার ক্লান্তিতে সে টেবিলের ওপর ঝুঁকে পড়ে তারপর নিজেকে সামলে নেয়। আলহেনা বলে, “আপনি একটু বিশ্রাম করুন। আমরা তো শহরেই আছি।”

বিষাণ বলে, “কিন্তু সেনভাকে কে অপহরণ করল?”

আলহেনা আর নাকোটা এক অপরের দিকে তাকায়। তারপর নাকোটা বলে, “প্রফেসর আপনি তো এনাকে চেনেন?” নাকোটা টেবিলের ওপর রাখা বাক্সটার দিকে হাতের ইঙ্গিত করে, একটি বর্ষীয়ান পুরুষ মুখ ভেসে ওঠে। আবার বিষাণের আশ্চর্য হবার পালা, সে বলে, “প্রফেসর রাস্কো!”

নাকোটা বলে, “হ্যাঁ, প্রফেসর রাস্কো। আপনার শিক্ষাগুরু, কিন্তু যিনি আপনার মস্তিষ্কের ওপর কাজের ঘোরতর বিরোধী ছিলেন।”

বিষাণ নাকোটাকে বিশ্বাস করতে পারে না, বলে, “আপনি বলছেন রাস্কো সেভানকে অপহরণ করেছিল? এটা অসম্ভব। প্রফেসর রাস্কো আমাদের চাঁদে যাবার আগেই মারা গিয়েছিলেন।”

নাকোটা তার ডান হাত ক্পালের ওপর রাখে। এই অনুসন্ধানে সে বহুদিন হল জড়িত, সে ধীরে ধীরে এক বিশাল ষড়যন্ত্রের জট উন্মোচন করেছে, যত সে এর ভেতর ঢুকেছে তত সে আশ্চর্য হয়েছে এর জটিলতায় আর মানব মনের বিচিত্রতায়। তার জন্মভূমি গ্রীনল্যান্ড এখন নাতিশীতোষ্ণ প্রাকৃতিক ভূস্বর্গ, সেখানকার মানুষের মনে এত জটিলতা নেই। নাকোটা বলে, “আমাদের মনে হয় প্রফেসর রাস্কো এখনো বেঁচে আছেন, কোথায় আছেন সেটা আমরা জানি না। কিন্তু আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস সেনভাকে অপহরণের জন্য উনিই সনাক্ত করেছিলেন।”

প্রফেসর রাস্কো! না, এটা হতেই পারে না। বিষাণ ছিল রাস্কোর সবচেয়ে প্রিয় ছাত্র, বিষাণের আদি সমস্ত গবেষণার নির্দেশক। রাস্কো ছিল পৃথিবীর অগ্রগণ্য মস্তিষ্ক গবেষক, নোবেল পুরস্কার পেয়েছিল, কিন্তু মস্তিষ্ক সংরক্ষণের ব্যাপারে ছিল ঘোরতর বিরোধী। বিষাণ যখন মস্তিষ্ক কপি করার গবেষণা দলে যোগ দিল রাস্কো ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়েছিল, নানাভাবে বিষাণকে নিরস্ত করার চেষ্টা করেছিল, ব্যর্থ হয়ে বিষাণের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল। বহুদিন পরে বিষাণ যেন শুনেছিল রাস্কো মারা গেছে, কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও সে রাস্কোর হদিশ করতে পারে নি।

নাকোটা বলে, “আমাদের যেটা মনে হয় সেটা হল রাস্কো দেখতে চেয়েছিলেন সেনভাকে অপহরণ করার পরে নতুন সেনভার সঙ্গে আপনাদের সম্বন্ধ কেমন হয়, তিনি জানতেন আপনারা নতুন সেনভাকে পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারবেন না। এটা একটা নিষ্ঠুর পরিহাস বলতে পারেন, কিন্তু রাস্কো ভেবেছেন তিনি একটা ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করছেন। আর আমাদের মন হয়, একশ বছর আগে, শুধুমাত্র প্রফেসর রাস্কোর পক্ষেই সম্ভব ছিল বেতার-তরঙ্গ ব্যবহার করে কোনো মানুষের মস্তিষ্ককে সম্পূর্ণভাবে প্রভাবিত করার।”

মাথা ঝিম ঝিম করে বিষাণের। প্রফেসর রাস্কো - যার জন্য একসময় বিষাণ সবকিছু ত্যাগ করতে রাজী ছিল, ঘন্টার পর ঘন্টা, রাতের পর রাত জেগে গবেষণাগারে তারা কাজ করেছে, বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ লিখেছে। সারা পৃথিবীর বৈজ্ঞানিক মহলে রাস্কো ও বিষাণের নাম মস্তিষ্ক গবেষণাকে নতুন স্তরে নিয়ে যাবার জন্য সুপরিচিত হয়েছে। রাস্কোর সঙ্গে তার শেষ দেখার কথা মনে করতে চায় বিষাণ, রাস্কো বলেছিল পৃথিবীর মানুষ নিজের মস্তিষ্ককে কপি করে বাঁচিয়ে রেখে সুখী হবে না। মস্তিষ্ককে কপি করা মানে আর একটা মানুষ সৃষ্টি করা। সেই মানুষের স্বপ্ন ও আত্মিক বোধ হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিষাণ বলেছিল, এ হল মন্দের ভাল, মানুষ যদি মারাই যায় তার স্মৃতি ও বোধ নিয়ে আর একটি জীবন পৃথিবীর বুকে থাকবে, বলতে গেলে এই নতুন মানুষটির সঙ্গে পুরোনো মানুষটির কোনোই পার্থক্য হবে না। রাস্কো বিষাণের কথায় সায় দেয় নি, হয়তো হাতে নাতে তার কথা প্রমাণ করতে এরকম নিষ্ঠুর এক্সপেরিমেন্টের সাহায্য নিয়েছে, তার সন্তানকে ছিনিয়ে নিয়ে সন্ত্রাসী সংগঠনের নির্মম নেতা হিসেবে গড়ে তুলেছে।

ডকটর তারকার আবার ফোন করে। বিষাণকে দরকার। বিনতা জেগে উঠেছে, কিন্তু তার স্বপ্ন থেকে বের হতে পারছে না।



অদিতার আঁধার

একাদশ পর্ব

বিষাণ বিনতার ঘরে ঢোকে। ডকটর তারকার ছুটে আসে, “ডকটর বিনতা তাঁর স্বপ্নে আট্কা পড়েছেন।” তার কথায় ব্যাকুলতা থাকে, বিষাণ ভাবে এতদিন পরেও তারকার রোগীর প্রতি তার অনুভূতি হারায় নি।

তার স্বপ্ন থেকে বের হতে পারছে না বিনতা। সেই স্বপ্নে সে বসে আছে সমুদ্রের পাড়ে, দূরে সূর্য নেমে যাচ্ছে জলে, এরকম সূর্যাস্ত সে দেখেছে বহু সময় ধরে। বিনতার কপি-করা মস্তিষ্ককে বিনতার মৃতদেহতে বসানো হয়েছে, তাকে জাগানো হয়েছে, কিন্তু বিনতা সেই সমুদ্র তীর থেকে উঠে আসতে পারছে না।

তারকারের হাতে একটা টর্চ। টর্চ থেকে জোরালো নানা রঙের আলো বের হয়, সেই আলো জ্বলে নেভে এক একটা কম্পাঙ্কে যা চোখে ধরা যায় না। তারকার বিষাণকে জিজ্ঞেস করে বিনতার চোখের মণির ওপর টর্চের আলো ফেলবে কিনা, এই পদ্ধতি ব্যবহার করে অনেককে এর আগে স্বপ্ন থেকে তারকার বের করে নিয়ে আসতে পেরেছিল। কিন্তু বিনতার ঘটনাটা ভিন্ন, ‘লোহিতক’ সংগঠনের কার্যকলাপের ফল, এখানে বিষাণের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিষাণ তারকারকে একটু অপেক্ষা করতে বলে, সে বিনতার খাটের পাশে একটা চেয়ারে বসে বিনতার বিস্ফারিত মণির দিকে তাকায়, দেখে বিনতার ঠোঁট নড়ছে। ঝুঁকে পড়ে বিনতার অস্ফূট কথা শোনে বিষাণ। বিনতা বলে, “এই সাগরপাড় থেকে আমাকে নিয়ে যাও। আমি আর সূর্যাস্ত দেখতে চাই না।”

বিনতার কথা বিষাণকে সংক্রামিত করে। বিনতার ঠোঁট নড়ে, আরো অনেক কথা সে বলতে চায়, কিন্তু সেগুলো মূর্ত হয় না। এক অতল বিষন্নতায় ভরে যায় বিষাণের মন, নিজের অজান্তেই বিনতার পাশে পড়ে থাকা ডান হাতের উন্মুক্ত করতলে নিজের ডান হাত রাখে। আর এক বিনতার সঙ্গে বিষাণ ২৪ ঘন্টা আগে কফি খেয়েছে, সেই বিনতা তাকে তার ছেলে সেনভাকে ফোন করতে বলেছিল। সেই বিনতার সাথে বিষাণ এক ধরণের যোগাযোগ অনুভব করেছে। এই নতুন বিনতা কি পুরোনো বিনতার মত হবে?

বিষাণের হাতের স্পর্শ অনুভব করে বিনতা মাথা কাৎ করে বিষাণকে দেখে। এই মানুষটিকে সে চিনতে পারে না। এই কি তাকে সাগর পাড় থেকে নিয়ে যেতে এসেছে? বিনতা বিষাণের করতল তার হাতের মুঠির ভেতর নেয়, একটা অবলম্বন পেয়ে সেটাকে আঁকড়ে ধরে। বিষাণ তার বাঁ হাত বিনতার মুঠির ওপর রাখে, বিনতা যেন তার মধ্যে মমতা ও বিষন্নতা দুটিরই আভাস পায়। তার স্বপ্নে বিনতা দাঁড়ায়, অস্তগামী সূর্যের অপসৃয়মান আলোয় ঠাণ্ডা বালির স্পর্শ সে অনুভব করে তার খালি পায়ে, তার ডান হাত ধরা থাকে বিষাণের হাতে। সেই স্বপ্নে বিষাণের হাত ধরে বিনতা হাঁটে পেছনের পাহাড়ের দিকে যে পাহাড় তাকে বন্দী করে রেখেছে এই সাগরপাড়ে। স্বপ্নে সেই পাহাড় কখনই পার হতে পারে নি বিনতা, কিন্তু আজ বিকেলের লাল আলোয় রাঙা পাহাড়ের দেয়াল সরে যায়, বিনতা নিজেকে আবিষ্কার করে আলোকোজ্জ্বল এক ঘরে, সে বিছানায় শুয়ে আছে, তার হাত ধরে বসে আছে এক মধ্যবয়সী মানুষ, তাকে বিনতা আগে কোনোদিন দেখে নি।

বিষাণ ডকটর তারকারের দিকে তাকায়, দুজনেই বোঝে বিনতা তার স্বপ্ন থেকে বার হতে পেরেছে। এই বিনতা জানে না অদিতাকে হত্যা করা হয়েছে ডামুরির বনে, এই বিনতা দুদিন আগে অদিতার দেহকে বিশালগড়ে নিয়ে আসে নি। বিষাণ বিনতার দিকে তাকায়, কিন্তু তার মন পড়ে থাকে নিলয়ের অন্য একটি ঘরে যেখানে গোয়েন্দা আলহেনা আর নাকোটা বসে আছে। অদিতা এখনো জানে না চাঁদে তাদের হারিয়ে যাওয়া ছেলে সন্ত্রাসী নেতা হয়েছে, তারই নির্দেশে বিনতাকে হত্যা করা হয়েছে। তাদের দুটি ছেলে সেনভা ও অশির সমাজের দুই প্রান্তে অবস্থিত। অচেতন অদিতা নিলয়েরই একটি ঘরে রয়েছে পর্যবেক্ষণের মধ্যে।

জানালা দিয়ে রাতের বিশালগড়ের আলো দেখা যায়, সেইদিকে তাকিয়ে বিষাণ গভীর চিন্তায় নিমজ্জিত হয়, তার মনের অলিগলিতে স্মৃতি আর সম্ভাব্নার মিশ্রণে এক বাস্তব সৃষ্টি হয়। তার শিক্ষক প্রফেসর রাস্কো চাঁদে তার ছেলে সেনভার মস্তিষ্ককে দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করে তাকে অপহরণ করেছিল। সেনভার মগজ ধোলাই করে তাকে অশিরে রূপান্তরিত করেছে। এই প্রতিহিংসার অর্থ কী? ভাবে বিষাণ, তাদের মধ্যে দর্শনগত পার্থক্য হয়েছে, তবে এটা সত্যি যে মস্তিষ্ক কপি-করার নীতি প্রণয়ন বিষাণের ভূমিকা ছাড়া হত না। তবুও রাস্কোর এই চরম প্রতিক্রিয়া বিষাণ আশা করে নি। এতসব করেও কি রাস্কো শান্ত হবে? রাস্কোর প্রতিহিংসা আরো সুদূরপ্রসারী হতে পারে। এসব ভাবতে ভাবতেই বিষাণ ভাবে সেনভার কথা, সাগরবিজ্ঞানী সেনভা। সে কি নিরাপদে থাকবে? রাস্কোর হাত সুদূরপ্রসারী, আর্কটিক সাগরে ভাসমান এক জাহাজে সে সেনভার ক্ষতি করতে পারে। বিনতার হাতটা ছেড়ে দেয় বিষাণ, চেয়ার ছেড়ে জানালার কাছে যায়, সেনভাকে একটা ফোন করা দরকার।

ঐ সময়েই বিশালগড় থেকে কয়েকশো কিলোমিটার দূরে সমুদ্রের কাছাকাছি অশির তার পাহাড়ি গোপন আস্তানায় এক মানচিত্র দেখে। বিশালগড়ের। অশিরের ঘরে বলতে গেলে ইলেকট্রনিক্স জাতীয় কোনো কিছুই নেই। যে মানচিত্রটা সে দেখছে সেটা কাগজের। তাকে যাতে কোনোভাবেই গোয়েন্দা সংস্থাগুলো খুঁজে না পায় সেজন্যই এই ব্যবস্থা। ঘরের কোনায় একটা কফি টেবিলের ওপর রাখা একটা টেলিফোন বেজে ওঠে। পুরোনো দিনের ফোন, কয়েক হাজার বছর আগের। বড় একটা বেঢপ বাক্সের ওপর বড় একটা হাতল। সেটা বেজে ওঠে কর্কশ ধাতব আওয়াজে। এই ফোনটি যুক্ত মাটির তলার তারের সঙ্গে যেটি চলে গেছে সমুদ্রের নিচে। অনেক পুরোনো একটা সাবমেরিন কেবল লাইন, যে লাইনটির অস্তিত্ব কোনো নিরাপত্তা বা গোয়েন্দা সংস্থা জানে না। যে লাইনটির কথোপকথন ধরা পড়বে না কোনো সংবেদী নিরূপক যন্ত্রে। ফোনের হাতল তোলে অশির, ওপাশ থেকে কন্ঠস্বর ভেসে আসে, “সব ঠিক আছে, ২৪ ঘন্টার মধ্যে পৃথিবীর প্রতিটি ‘নিলয়ে’ আক্রমণ হবে, ধ্বংস হবে দুশো কোটি সংরক্ষিত মস্তিষ্ক। তুমি নাগানো, চেংডু, দিল্লী আর ইসফাহানের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের প্রস্তুত হতে বল।” এটুকু বলেই ওপাশ থেকে লাইন কেটে দেয় সেই কন্ঠস্বর। এই দিনটির জন্য সে প্রস্তুত করেছে নিজেকে গত পঞ্চাশ বছর, তার উদ্দেশ্যে সম্বন্ধে অশিরের কোনো দ্বন্দ্ব নেই।

***********************************************
পৃথিবীর বুকে এখন সমুদ্রের উচ্ছাস, ডুবে গেছে বড় সব প্রাচীন শহর - ঢাকা, কলকাতা, সাংহাই, বুয়েনস আইরেস, মায়ামি, নিউ ইয়র্ক, ভেনিস, লন্ডন। পৃথিবীর জনসংখ্যা ১৮০০ বছর আগে সর্বোচ্চ ১৩ বিলিয়ন ছিল। সেই সময় পৃথিবী যে দুর্বিপাকের মধ্যে দিয়ে যায়, খাদ্য-সংস্থান, বাস্তু-সংস্থান, মহামারী, ধর্ম নিয়ে টানা-পোড়েন, সন্ত্রাস, জাতীয়তাবাদ, জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি সবকিছু পৃথিবীকে ওলোট-পালট করে দেয়। সমস্ত ধরণের কারিগরী উৎকর্ষতা সত্ত্বেও মানব সমাজ এক মাৎসান্যায়ের সম্মুখীণ হয়। বিভিন্ন প্রাণী প্রজাতিও বিশাল বিলুপ্তির মধ্যে দিয়ে যেতে থাকে। অথচ ঐ একই সময়ে চাঁদে অনেক কটি বৈজ্ঞানিক আর পর্যটন গবেষণাকেন্দ্র স্থাপিত হয়। এর মধ্যে অনেক কটিই ছিল মাটির নিচে। ঐ সময় থেকেই মানব সভ্যতায় এক আমূল বিপ্লব আসে। সেই বিপ্লব সশস্ত্র রক্তক্ষয়ী কোনো বিপ্লব নয়, বরং এক নতুন বোধোদয়ের উন্মেষ। যে জাতিসংঘ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল তাকেই আবার নতুন করে সংগঠিত করা হয়। কট্টর ধর্মীয় ও সামাজিক জাতীয়তাবাদ নির্বাসিত হয়। ধীরে ধীরে দেশগুলোর সীমানা উঠে যায়, মানুষ তার সংস্কৃতি ধরে রাখে ভাষা দিয়ে। অন্যদিকে ইংরেজীরই একটা রূপান্তরিত ধরণ পৃথিবীর বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে আদান-প্রদানের মূল মাধ্যম হিসাবে গড়ে ওঠে। তবু এই সম্মিলিত পৃথিবীর কোনো সরকারি ভাষা নেই। কপালের কাছে বসানো কম্পুটার মুহূর্তে অনুবাদ করে দেয় অবোধ্য ভাষা। প্রকৃতিকে যে অবাধভাবে ভোগ করা যাবে না সেই বোধোদয় হয়। মানুষ পৃথিবীর নাগরিক হিসাবে নিজেকে বিবেচনা করে, তার অধিকার থাকে পৃথিবীর যে কোনো জায়গায় বাসা বাঁধার, সংরক্ষিত বনভূমি, তৃণভূমি, জলাভূমি, পাহাড় বাদে। উষ্ণ পৃথিবীতে গ্রীনল্যান্ড বসবাসের জন্য একটা চমৎকার জায়গা বলে বিবেচিত হয়।

১৮০০ বছর ধরে পৃথিবীর জনসংখ্যা ক্রমাগত নামতে থাকে। তবে কয়েকশো বছর ধরে তার মান স্থিত হয়েছে দুই বিলিয়নে।

এর মধ্যে মানুষ মহাকাশ থেকে উন্নত সভ্যতার সঙ্কেত খোঁজে, কিন্তু কোনো সঙ্কেতই তার দূরবীনে ধরা পড়ে না। ধীরে ধীরে মানুষ বোঝে এই ছায়াপথ গ্যালাক্সিতে আরো সভ্যতা থাকলেও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ হবার আশা বৃথা। মানুষ বোঝে এই বিশাল মহাবিশ্বে তাকে আর কেউ সাহায্য করবে না, তাকে একাই এই মহাবিশ্বের উদাসীনতার সাথে লড়াই করতে হবে। এর মধ্যে, প্রায় এক হাজার বছর আগে, একটা দুই কিলোমিটার ব্যাসের গ্রহাণুকে আবিষ্কার করা হয় যেটা কিনা পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসছিল। আসন্ন বিপর্যয়ের সমাধানে সমস্ত মানুষেরা তাদের মেধা নিয়োগ করে। অবশেষে শক্তিশালী লেজারের রশ্মি দিয়ে সেই গ্রহাণুকে আংশিকভাবে বাষ্পীভূত করে তার পথ পরিবর্তন করা হয়। এই গ্রহাণুকে আটকাতে গিয়ে পৃথিবীর মানুষেরা বোঝে তাদের ভবিতব্য একই সুতোয় বাঁধা, তাদের একাত্মবোধ দৃঢ় হয়।

গ্রহাণুর ঘটনার পর পরই সম্মিলিতভাবে আন্টারেস মহাকাশযান তৈরি করা হয়। আন্টারেসের ইঞ্জিন ছিল পারমাণবিক ফিউশনের - কয়েকটি হাইড্রোজেন পরমাণু যোগ করে সৃষ্টি হয় হিলিয়াম ও শক্তি। প্রায় এক হাজার মানুষ আন্টারেসে চড়ে নিকটবর্তী লাল বামন তারাদের গ্রহগুলোকে অনুসন্ধান করতে রওনা হয়। আন্টারেসের যাত্রীরা জানতো তারা আর পৃথিবীতে ফিরে আসবে না। তারা নিজেরাও হয়তো নতুন কোনো গ্রহ দেখবে না, কিন্তু তাদের বিশ্বাস ছিল তাদের পরবর্তী প্রজন্মরা এমন গ্রহের সন্ধান পাবে যাকে কিনা পৃথিবীর মত ঢেলে সাজানো যাবে, যার পৃথিবীকরণ করা যাবে। আন্টারেস থেকে শেষ বার্তা এসেছে প্রায় তিনশো বছর আগে, ১৪ আলোকবর্ষ দূরের এক বামন তারার কাছ দিয়ে যাবার সময়। এর পরে তিনশো বছর সবাই অপেক্ষা করেছে আন্টারেসের পরবর্তী খবরের, কিন্তু ধীরে ধীরে তারা হাল ছেড়ে দিয়েছে। তারা ধরে নিয়েছে মহাকাশের অসীম অন্ধকারে আন্টারেসের সমাধি হয়েছে।

আন্টারেসের স্মৃতি ধীরে ধীরে মুছে যেতে থাকে। শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর মানুষ বুঝতে পারল এই গ্রহ ছেড়ে তাদের যাবার আর কোথাও নেই, তখন তারা পৃথিবীকে শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে সময় দিল। তারা ভূমিকম্পের পূর্বাভাস প্রায় পনেরো মিনিট আগে দেবার পদ্ধতিকে উদ্ভাবন করল, মানুষের শরীরে ন্যানোরোবটরা নতুন ধরণের ভাইরাস বা ব্যাক্টেরিয়া সংক্রামক যেমন ধ্বংস করে দিতে সক্ষম হল, তেমনই হার্ট-এটাক বা স্ট্রোককে থামিয়ে দিতে পারল। একদিকে জেনেটিক প্রকৌশল ও অন্যদিকে ন্যানোযন্ত্র ক্যানসারকে শেষ পর্যন্ত পরাস্ত করল। এর মধ্যেই আবার পৃথিবীর সমস্ত জ্বালানী তেল ও গ্যাস ফুরিয়ে গেল। কৃত্রিম তেল তৈরি জন্য শিল্প গড়ে উঠল, কিন্তু সেই তেল শুধুমাত্র রকেট বা জেট বিমানের জন্য ব্যবহার করা হত। বাদবাকি যানবাহন সৌর, বায়ু, জোয়ার-ভাটার বিদ্যুৎ ব্যবহার করত।

একই সাথে গত কয়েক হাজার বছর ধরে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে যে সমাজ গড়ে উঠেছিল ধীরে ধীরে সেই স্বয়ংক্রিয় পূর্বনির্ধারিত কাঠামো থেকে মানুষ বের হয়ে আসতে চাইল। বিশাল সুপারমার্কেটের ধারণা উঠে গেল। ফিরে এল পুরোনো দিনের ছোট ছোট বিশেষায়িত দোকান। তবে এই নতুন পৃথিবীতে আর্টের কী ভূমিকা হবে সেটা বোঝা গেল না। কয়েক শ বছর আগেও মানুষ মনে করত ইউটোপিয়া একটা নিতান্তই বোরিং ধারণা, কিন্তু সামাজিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব ছাড়া শুধুমাত্র প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের অস্তিত্বের দ্বন্দ্ব নিয়ে যে আর্টের ধারণা সম্ভব মানুষ সেটা ধীরে ধীরে বুঝতে শিখল। তবু এক ধরণের একটা অতৃপ্তি বোধ রয়ে গেল। এই অতৃপ্তি অস্তিত্বের অর্থ না বোঝার অতৃপ্তি। কিন্তু মহাবিশ্বের প্রকৃতির মাঝে নিজের অস্তিত্বর ক্ষণস্থায়ী রূপের অতৃপ্তিকে স্বীকার করে নেবার মধ্যে যে এক ধরণের মুক্তি আছে সেটা মানুষেরা বুঝতে শিখল। একই সাথে তাদের এই একটি মাত্র জীবনে মহাবিশ্বকে অনুভব করার সময়-সীমাকে তারা বাড়াতে চাইল।

মানুষ মহাবিশ্বে তার সময়ের পরিধি বাড়াতে চাইল। এই ইচ্ছাকেই প্রফেসর রাস্কো ও বিষাণ বাস্তবে পরিণত করতে চেয়েছিল। দু হাজার বছর আগে অনেকে ভেবেছিল মানুষের চেতনা ও স্মৃতিকে কম্পুটারে ধরে রাখা যাবে, কিন্তু সেই ধারণাটা ছিল একেবারেই অবাস্তব। রাস্কো ও বিষাণ বুঝেছিল শুধুমাত্র একটি জৈব মাধ্যমেই মস্তিষ্ককে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব। একটি মস্তিষ্কের প্রতিটি পরমাণুর অবস্থান, উচ্চ-চৌম্বক ক্ষেত্রে সেই মস্তিষ্ককে রেখে, বেতার তরঙ্গ দিয়ে চিত্রিত করা যায়। সেই চিত্র দিয়ে ধীরে ধীরে ত্রিমাত্রিক প্রিন্টারে গড়ে তোলা যায় সেই মস্তিষ্কের একটি যথার্থ কপি। কিন্তু শেষ মুহূর্তে রাস্কো এই প্রজেক্ট সম্বন্ধে দ্বিধান্বিত হল এবং এই সম্বন্ধে তাঁর সমস্ত গবেষণাপত্র ও সরঞ্জাম ধ্বংস করে দিতে চাইল। তখন বিষাণই পরিচালনা কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ করে সেগুলো বাঁচায়। এর পর পরই রাস্কো উধাও হয়ে যায়, কোনো ভাবেই তার পদচিহ্ন আর খুঁজে পাওয়া যায় না।

***********************************************

বিষাণ বিনতার ঘর থেকে বের হয়ে আসে। সেনভাকে ফোন করতে হবে, সেনভার বিপদ হতে পারে, রাস্কোর দ্বেষ সেনভা পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। কিন্তু রাস্কো ব্যক্তিগতভাবে তার আর অদিতার বিরুদ্ধে এত ক্ষোভ কেন পুষে রেখেছে সেটা বোঝে না বিষাণ। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসে সে, নিচে ল্যান্ডিংয়ে দুজন সৈনিক। অনেক বছর পরে নিলয়ে অস্ত্রবহনকারী মানুষ দেখল বিষাণ, তারা মাথা নিচু করে বিষাণকে অভিবাদন জানায়। বিষাণ প্রত্যুত্তরে মাথা ঝুঁকিয়ে ‘নিলয়ের’ বাইরে বের হয়ে আসে। দরজার বাইরেও সান্ত্রী।

সামনে ফুটপাথের পাশে বেঞ্চে একটি মেয়ে বসে আছে, তার ছাত্রী সিলেয়া। সিলেয়াকে এখানে আশা করে নি বিষাণ। দূর থেকেই ডাক দেয় তাকে বিষাণ। অপেক্ষা করতে করতে সিলেয়া ঘুমিয়ে পড়েছে, কাছে যেয়ে তার কাঁধে হাত রাখে বিষাণ। সিলেয়া চমকে উঠে দাঁড়ায়, বিষাণকে দেখে তার মুখটা রক্তিম হয়ে যায়, তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, “প্রফেসর, আপনাকে দুদিন ধরে দেখছি না, আমরা সবাই খুব চিন্তা করছি।”

সিলেয়ার মুখের দিকে একটু আনমনাভাবেই তাকায় বিষাণ, তারপর আর একটু মনোযোগ দিয়ে। সিলেয়ার কালো চুলের একটা গুচ্ছ কানের পাশ দিয়ে এসে গালের ওপর পড়েছে। বহুকাল আগে, একশ বছরেরও আগে, এরকম ভাবেই অদিতার চুল এসে পড়ত গালে। এজন্যই কি সে সিলেয়ার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে? বহুকাল আগে তরুণী অদিতার সঙ্গে বিষাণের পরিচয় হয়েছিল প্রফেসর রাস্কোর গবেষণাগারে। এটাও কি সম্ভব? ভাবে বিষাণ। এটাও কি সম্ভব যে রাস্কো অদিতার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল? এখন যেমন সে সিলেয়ার আকর্ষণ অনুভব করছে? কিন্তু রাস্কোর সঙ্গে অদিতার যদি কোনো সম্পর্ক থেকে থাকে সেই কথা রাস্কো তাকে বুঝতে দেয় নি, অদিতাও তাকে কোনোদিন কিছু বলে নি। এতদিন পরে সিলেয়ার মুখ দেখে বিষাণের মনে হয় অদিতা বিষাণকে রাস্কোর ওপর বেছে নিয়েছিল, রাস্কো তার প্রতিশোধ নিচ্ছে। আরো অনেক কিছু মনে হয় বিষাণের, রাস্কোর সুর-জ্ঞান ছিল, ভাল বাঁশী বাজাতে পারতো। মাথা ঝিম ঝিম করে বিষাণের। সিলেয়া ক্লান্ত বিষাণকে দু হাত দিয়ে ধরে বেঞ্চে বসায়, সে বিষাণের জন্য স্যান্ডউইচ বানিয়ে নিয়ে এসেছে।

*************************************
ডামুরির বনে সে রাতে বৃষ্টি নেমেছিল। একটা কাঠের কেবিনে মাটির ওপর শুয়ে ছিল এক প্রৌঢ়, তার বয়স দুশোর ওপর হতে পারে। তার দীর্ঘ লম্বা চুল কোমড় ছাড়িয়ে গেছে। কেবিনের একপাশে রাখা ছিল একটি বাঁশী, অন্যদিকে রাখা ছিল একটি ধনুক। তার পাশে রাখা ছিল একটা বহু পুরোনো টেলিফোন, সেই টেলিফোনটার তার বেরিয়ে ঘরের একটা কোনায় মাটির মেঝেতে ঢুকে গিয়েছিল। সেই তারের তথ্য বিশ্বের কেউ জানে না, সেই তার দিয়ে এই প্রৌঢ় নিরাপদে ‘লোহিতকের’ সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারে। বাইরে বৃষ্টির ঝাপটায় গাছের শাখারা কাঁপে, শব্দ করে।

(চলবে)



লেখক পরিচিতি
দীপেন ভট্টাচার্য
জন্ম ১৯৫৯। আদি নিবাস এলেঙ্গা, টাঙ্গাইল।
বিজ্ঞানী। গল্পকার।

মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে পদার্থবিদ্যায় মাস্টার্স এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নিউ হ্যাম্পশায়ার থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞানে পিএইচডি করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট ইন্সটিটিউটের গবেষক ছিলেন। পরে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার রিভারসাইড ক্যাম্পাসে (ইউসিয়ার) গামা রশ্মি জ্যোতির্বিদ হিসেবে যোগ দেন। এ ছাড়া ক্যালিফোর্নিয়ার রিভারসাইড কলেজে পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক। ১৯৭৫ সালে তিনি বন্ধুদের সহযোগিতায় 'অনুসন্ধিৎসু চক্র' নামে একটি বিজ্ঞান সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন।

বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর প্রকাশিত বই : দিতার ঘড়ি, নিওলিথ স্বপ্ন, অভিজিৎ নক্ষত্রের আলো।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন