বৃহস্পতিবার, ৯ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭

সাদিক হোসেনের গল্প : গুডবাই


তুমি যদি গুডবাই বলো, তার মানে, গুডবাই বলা হয়ে গেল। কিন্তু মরবার আগে, প্রায়শই, এইসব ডায়লগ শেষ করে বিদায় নেবার সময় থাকে না। তাই, তখন, এই আচানক ঘটনাটিকে, যাতে অতটা আচানক বলে না মনে হয় সেই কারণে, আমরা মৃত্যুকে আখ্যানে বর্ণিত কোন অনুষ্ঠানের মতোই উদযাপন করি।
আমরা সব থেকে বেশি ভয় পাই ঘেঁটে যাওয়া পরিস্থিতির সামনে দাঁড়াতে। এই ঘেঁটে যাওয়ার ভেতর কোথায় কী ছন্দ লুকিয়ে রয়েছে তা জানবার জন্য জাসুসি চালাই। এবং প্রত্যাশিত প্যাটার্নটি না পেলে সাজিস রচনা করতে পিছপা হই না। অর্থাৎ, আমরা একইসঙ্গে ডিটেকটিভ এবং ষড়যন্ত্রকারী।

বা, অন্যভাবে যদি বলা যায় অনুমান বহির্ভূত যা কিছু, তাকে অনুমানের মধ্যে নিয়ে আসাটাই আমাদের আদিমতম প্রবণতা।
কিন্তু কেন?
এলা ব্যাগ থেকে জামাকাপড় গুলো নাবিয়ে ওয়াড্রবে তুলছিল। বলল, কিছু বললি?
না তো। আমি ভ্রূ কোঁচকাই। ওর জানবার কথা নয় আমি এতক্ষণ ধরে কীসব ভাবছিলাম। তবু আন্দাজ করল কীভাবে?
এলা এইরকমই। তুমি ওর সঙ্গে থাকলে কখনই অমনোযোগী হবার সুযোগ পাবেনা। ঠিক ধরে ফেলবেই। বললাম, তুই ফ্রেশ হয়ে নে। আমি লবিতে ওয়েট করছি।
তুই থাকলেও আমি ফ্রেশ হতে পারি। এলা মুচকি হাসল।
আমি ওকে পাত্তা না দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে এলাম।
হোটেলের নাম প্যারাডাইসলবি বলতে রিসেপশনের সামনে দুটো প্লাস্টিকের চেয়ার পাতা। একজন তেরো-চোদ্দ বছরের ছেলে রিসেপশনে বসে রয়েছে। এই ছেলেটাই এলার ভোটার কার্ড জেরক্স করে এনে দিয়েছিল। রুমসার্ভিসেও ও-ই। এখন সে বেশ সন্দেহের চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। আমি ওর কিউরোসিটি আরও বাড়িয়ে দিয়ে সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছেচল্লিশের দাঙ্গা বইটি খুলে প্রত্যক্ষ সংগ্রাম চ্যাপ্টারটি পড়তে শরু করে দিলাম।
দাদাজীর মৃত্যুর পর তার দেরাজ থেকে তরবারি হাতে জিন্নাহের একটি ছবি পাওয়া গেছিল। ছবিটি একটি প্রচারপত্র। তাতে কী লেখা ছিল তা ঠিক পড়া যাচ্ছিল না। তবে শিলা সেনের মুসলিম পলিটিক্স ইন বেঙ্গল বইটিকে সূত্র হিসাবে ধরে নিলে এই প্রচারপত্রের ভাষা ছিল এই রকমঃ আশা ছেড়ো না। তলোয়ার তুলে নাও। ওহে কাফের, তোমার ধ্বংসের দিন বেশি দূরে নয়।
আমার ভাবতে বেশ অসুবিধা হয় আমার পূর্বপুরুষ কোনও একসময় এই স্লোগানটির সঙ্গে একাত্মবোধ করেছিল।
কিংবা এমনও তো হতে পারে, সময়ের উত্তেজনা তাঁকে এতটাই গ্রাস করে ফেলেছিল যে তিনি তাঁর স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধি হারিয়ে ফেলেছিলেন!
সময়ের উত্তেজনা শব্দবন্ধটির প্রতি আমাদের মনোযোগী হওয়া জরুরি। এই শব্দবন্ধটি অনেকটা মদের মতোএই শব্দবন্ধটি এমন এক পরিসর সৃষ্টি করে যেখানে ব্যাক্তিস্বাতন্ত্রকে অনায়াসেই ঊহ্য রাখা সম্ভব। সময়ের উত্তেজনা একটি নেশা, যেখানে এই নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা মানুষগুলির আচরণকে আমরা তাদের নিজেদের দ্বারা সজ্ঞানে নির্বাচিত আচরণ হিসাবে ভাবতে চাই না। যেন কোনও মাতাল সুনসান রাতে গাল দিতে দিতে ঘরে ফিরছে। সময়ের উত্তেজনা লঘু হয়ে এলে, তাই, একটি নিরাপদ আস্তানার সন্ধান আমরা পেয়ে যাব, এটুকু আশা করে থাকি।
কিন্তু দাদাজী কি শেষপর্যন্ত কোনও নিরাপদ আস্তানার সন্ধান পেয়েছিলেন? কেনই বা তিনি জিন্নাহের ছবিটি কুটি কুটি করে কেটে ছিঁড়ে ফেলে দেননি?
মৃতদের নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আমরা প্রথমেই তাদের কাজকর্মকে তাদের শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলি। যেন জীবিত অবস্থায় তাদের শরীরটি একটি মাধ্যম ছিল। এই কাজকর্মগুলি সেই মাধ্যমের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। এখন, যখন তার শরীরটি আর নেই, সেই কাজকর্মগুলি কোন আধার না পেয়ে, ঠিক আত্মার মতো, হাওয়ার মতো আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছেচল্লিশের দাঙ্গা বইটি পড়তে পড়তে আমি ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্টের দিনটার কথা ভাবছিলাম।
সাদাসাদা হাওয়া যেন, ভূতের মতো, ভোর হচ্ছে আমি দেখতে পাচ্ছি...
তখনও আমাদের গ্রামে ইলেক্ট্রিসিটি আসেনি। ফলে এখনকার মতো লাউডস্পিকারে আজান শোনা যেত না। দম দেওয়া ঘড়িটা চারবার বেজে উঠতেই দাদাজীর ঘুম ভেঙে গেছিল। কিছুক্ষণ পরেই আজান দেবে। তার আগে দাঁতন করে সেহেরি খেয়ে নিতে হবে। এবারে এখনও অব্দি দাদাজীর একটাও রোজা ক্বাযা হয়নি।
তিনি দাঁতন করতে করতে লক্ষ্য করলেন উঠোনের ডান দিকটা ধোঁয়ায় ভরে গিয়েছে। তাঁর চোখটা জ্বালা জ্বালা করে উঠল। মনের ভেতর কেমন উদ্বেগ ঘনীভূত হল। কে একজন বিধবা যেন, রোগামতো, এই ভোরবেলা আঁচ ধরিয়ে চারদিক এমন ধোঁয়ায় ভরিয়ে দিয়েছে!
তিনি বিধবা ও বৈধব্য কোনকিছুকেই চিনতে পারলেন না।
কে? তিনি যেন শিস দিয়ে ডেকে উঠলেন।
তখনি ধোঁয়ার ভেতর থেকে যে মুখটি উঁকি দিল, সে আর কেউ নয়, শিয়ালসদৃশ সন্দেহ।
দাদাজী চমকে উঠলেন।
২রা অগাস্ট জিন্নাহকে প্রত্যক্ষ সংগ্রামের রূপরেখা নিয়ে জিজ্ঞেস করা হলে জিন্নাহ জানিয়েছিলেন, I am not going to discuss ethics.তবে এসব খবর দাদাজী যে পেপার পড়ে জেনেছিলেন, তা নয়। তখন দাদাজীর পেপার পড়ার অভ্যেসও ছিল না। সেই সময় মসজিদে মসজিদে প্রত্যক্ষ সংগ্রামের সাফল্যের জন্য প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছিল। দাদাজী সম্ভবত এইসব সোর্স থেকেই প্রত্যক্ষ সংগ্রামের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন।
এখন ধোঁয়া কেটে গেছে। দাদাজী তৈরি। ঐ, তিনি চলেছেন ব্রিগেডে।
দাদাজী চলেছেন; তাঁর পাশে পাশে শিয়ালসদৃশ সন্দেহ।
একটি জাতি চলেছে আত্মহননের দিকে।
আমাদের গ্রাম থেকে যে দলটি সোহরাবর্দির ভাষণ শুনতে রওনা দিছিল, তারা শিয়ালদহ স্টেশনে নেমেছিল। আর কিছুক্ষণ পর, ওখান থেকেই ব্রিগেড গ্রাউন্ডের দিকে তারা হাঁটা লাগাবে।   
সকালবেলায় ঠিক কাফনের মতো রোদ বিছিয়ে ছিল কলকাতার রাস্তায়। ঠিক যেন A4 সাইজের সাদা পেইজ। মার্জিন ধরে হেঁটে চলেছে ডট ডট পুরুষ। খসখসে সন্দেহ তাদের সারা গায়ে নিঃশ্বাস ফেলছে।
কদিন ধরেই গ্রামে গ্রামে ছুটছাট সংঘর্ষের খবর পাওয়া যাচ্ছিল। নদীর ধারে একটা গলা কাটা লাশ কাদায় মুখ ঢুকিয়ে পানি খাচ্ছিল। ভোরের বেলায় দেখা গেছিল একটা বক এসে তার মাথার উপর বসে রয়েছে। কেউ কেউ ভেবেছিল কোথাকার লাশ হয়তো, জোয়ারের জলে ভেসে এসেছে, এখন জল সরে গেলেও মৃতদেহটি বাঁধা পড়ে গেছে। কিন্তু ওল্টানো হলে, সেটিকে চেনা গেল। সে ইয়াসিন। মাস খানেক আগে লীগে জয়েন করেছিল। এখন তার ফাঁক হয়ে থাকা গলায় কাদাপানি আর ঘাসের টুকরো ঢুকে রয়েছে।
বউবাজারে ঢোকবার আগেই দাদাজীদের দলটা থেমে গেল। মানিকতলায় ২জন খুন হয়েছে। বউবাজারে লোকজন বল্লম নিয়ে ঘোরাফেরা করছে। কানে পাতলেই শোনা যাচ্ছে আরও অনেক কিছু।
সেহেরি খাবার পর কলসি থেকে পানি ঢালতে গিয়ে দাদাজি খানিক থেমে গেছিলেন। সেই সময় নদীর পানি, পানির টানে দুলতে থাকা গলা কাটা মুর্দা নাকি আলো ফোটার পরেই সফেদ বকের উড়ে চলে যাওয়া-- কোনটি তাঁকে সবথেকে বেশি ভাবিয়ে তুলেছিল তা সঠিকভাবে জানা না গেলেও, কলসি আর ঠোঁটের মধ্যিখানে আজান চলে আসায় তিনি সেহেরি খাবার পর আর পানি খেতে পারেননি।
এখন তাঁর গলা শুকিয়ে গিয়েছে। জিভ আঠাল। তবু থেমে থাকলে চলবে না। দলটি আবার হাঁটতে শুরু করে দিয়েছে।
তুই বসির আলি, না? মাগুরার বসির আলি?
হ। উত্তর দিয়েই দাদাজী চমকে উঠলেন। কে তাঁকে প্রশ্ন করল? তিনি আশপাশ তাকিয়ে আবার হাঁটতে লাগলেন।
তুই রমজানকে চিনিস? কাদেরের বাপ রমজান? তোদের ঘরের উত্তর দিকে ওনার বাসা।
কে? কে কথা বলে?
আমি রে, আমি।
কে?
দাদাজী কোন প্রশ্নকর্তাকেই দেখতে পেলেন না।
সেবার খালেদ মিঞার পুকুর কাটানোর সময় শিং মাছ ধরে ছ্যালো মনিরুদ্দুন। থামির ভেতর মাছটাকে নিয়ে তার কী দৌড়। ওদিকে ভাগ্যের মালিক আল্লা। মাছ বাছতে গে কাঁটা খেল আক্তারি। বলে কী না আঙুল থেকে কাঁটা নাকি বুকের দিকে উঠে আসতেছে। তখন ওনাকে নিয়েই টানাটানি পড়ে গেল। তোর মনে নাই?
দাদাজী ঢোঁক গিলতে যাচ্ছিলেন। এদিকে থুতু গলার নিচে নামলেই রোজা ভেঙে যাবে। দলটা এগিয়ে গিয়েছে। তিনি পা চালিয়ে আবার দলটার সঙ্গে মিশে যেতে লাগলেন।
তবু সন্দেহ তাঁর পিছু ছাড়ল না।
আবার কিছু কিছু সন্দেহকে জিইয়েও রাখতে হয়। সিঁড়িতে পায়ের শব্দে তাকিয়ে দেখলাম রিসেপশনের ছেলেটা এখনো আড়চোখে আমাকে দেখছে।
এলা ফ্রেশ হয়ে নেমে এসেছে। চল্। ও অর্ডার করল।
এলার চুল ভিজে ভিজে। কানের পাশ থেকে ঘাড় বেয়ে যে জলের রেখা ওর টি-শার্টের ভেতর ঢুকে গেল তা ঘাম নয়; ঐ জলে সাবানের গন্ধ লেগে রয়েছে।
এলা বলল, কোথায় খাবি?
তুই বল।
আমি ভাবছিলাম কী... এলা তার ভেজা চুলে আঙুল চালাতে চালাতে বলল, প্রথমে ভেবেছিলাম কতদিন পর কলকাতায় এলাম, বাঙালি খাবার খাব। কিন্তু এটা খুব প্রেডিক্টেবল হয়ে যাবে না? চল্ এক্সপেরিমেন্ট শুরু করা যাক।
এলা প্রায় গলা ধাক্কা দিয়ে আমাকে রাস্তায় নামাল।
কখন বৃষ্টি হয়েছিল খেয়াল করিনি। রাস্তাঘাট কাদায় প্যাচপ্যাচ করছে। তার মধ্যে একজন বয়স্ক মহিলা পিছলে পড়ে গেছিলেন। তাঁকে নিয়ে হুলস্থুল কাণ্ড
এলা আমার থেকে খানিকটা এগিয়ে চলছিল। আমি দেখছিলাম, ও কেমন কলকাতার কাদামাটি মেখে দিব্যি হেঁটে বেড়াচ্ছে। ওর স্লিপার থেকে ছিটকে বেরনো নোংরাগুলো যেন অনিয়ন্ত্রিত সংলাপ। যাকে অর্থপূর্ণ করে তুলবার জন্য নাট্যকার কোনরকম প্রচেষ্টা চালায়নি। যেন এগুলো আছে, তাই আছে; না থাকলেও কোনও খামতি হত না।
          এলা বলল, তুই প্রপের মতো বইটা ক্যারি করছিস কেন? রুমে রেখে আসতে পারতিস। আমার সামনে নিশ্চয় বই খুলে বসবি না এখন!
তা বটে। আমি প্রসঙ্গ পাল্টালাম, কলকাতায় আসার পেছনে তোর প্ল্যানটা কী বল তো? জিজ্ঞেস করলেই চেপে যাচ্ছিস।
বারে এখানে বড় হয়েছি, কলেজ লাইফ কাটিয়েছি, এখন থাকি না তো কী! সব টান তো আর শেষ হয়ে যায়নি।
আজ্ঞে বুঝেছি। মানে টান।
টাআআন। এলা ঘুরে গিয়ে বলল, মানে টাআআন। বুঝলি গরু!
মানে রহস্য ঘনীভূত হোক?
ঐ আর কী। এলা হঠাতই থেমে গেল, ধোসা খায়েগা?
রেস্তোরাঁয় ঢোকার পরেই আবার ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। আমরা তখন সবে খাওয়া শুরু করেছি।
          এলা বলল, আজকেই কাজটা সেরে ফেলব। তারপর দুদিন পুরো ফ্রি। তুই কিন্তু আমার সঙ্গে এখন যাচ্ছিস।
আমি তো অফিস ছুটি করে নিয়েছি। যেতেই পারি। কিন্তু যাবটা কোথায়?
আর কোন কমেন্টস নেই। ও মনযোগ সহকারে ধোসার আলু চিবোচ্ছে
কীরে?
ভাবছি?
কী?
ও আমার বইটার দিকে তাকাল, ভাবছি তুই হঠাৎ ছেচল্লিশের দাঙ্গা নিয়ে কেন গল্প লিখতে যাচ্ছিস।
ধুর কোথায় আর গল্প। এমনিই পড়ছি। কতগুলো ইমেজ মাথায় আসছে। কিন্তু এখনও কোন গল্পের দিকে ঠিক এগোতে পারিনি।
লেগে থাক। তোর হবে।
সে তো দেখতেই পাচ্ছি।

কিছুক্ষণ পরে বৃষ্টি থেমে গেলে এলা বেশ তৎপর হয়ে উঠল, চল্, আর দেরি করব না, ভিসিটিং আওয়ার্স শুরু হল বলে।
যাচ্ছিটা কোথায়?
শ্বশুরবাড়ি।

কলকাতা শহরে ট্যাক্সিওয়ালারা মেয়েদের কথা শোনে বেশ। এলা একচান্সেই একটা ট্যাক্সি পেয়ে গেল। তবে আমি ওর মুখে কেমন টেনশন দেখতে পাচ্ছিলাম। এলা আর আমাকে ধন্দে রাখল না--
এলার প্রাক্তন শ্বশুর বার্ধক্যজনিত কারণে বেশ কিছুদিন যাবৎ ভুগছিলেন। এর মধ্যে একটা মেজর স্ট্রোক হয়ে গেছে দিন পনেরো আগে। বামদিক প্যারালাইসড। এখন আমরা ওনাকে দেখতে হসপিটালে চলেছি।
ট্যাক্সি থেকে নেমে এলা একটু দাঁড়াল। যেন সে নিজের মধ্যেই নিজে ধাতস্থ হতে চাইছে। তারপর একাই হসপিটালের গেটের ভিতর চলে গেল।
আমি এলার এই পেছন ফিরে না তাকিয়ে চলে যাওয়াটাই দেখছিলাম। সে যাচ্ছে। গেট পেরিয়ে, এমারজেন্সি ইউনিট পেরিয়ে...অনেক দূর পর্যন্ত তাকে দেখা যাচ্ছে। তারপর আর দেখা যাচ্ছে না।
এলার এই যাওয়া আর দাদাজীর ব্রিগেড গ্রাউন্ডের দিকে রওনা দেওয়া এই দুই যাত্রা শুধু যে পরস্পরের বিপরীত তা নয়, কোন এক বিন্দুতে তারা পরস্পরকে ইন্টারসেক্টও করে।
এলা তার প্রাক্তন সম্পর্কগুলির দিকে ফিরে যাচ্ছে। তার যাওয়ার মধ্যে অনেকাংশেই ফেরার অনুভূতি লুকিয়ে রয়েছে।
অন্যদিকে দাদাজীর প্রতিটা পদক্ষেপ যেন তার পূর্ববর্তী পদক্ষেপকে এড়িয়ে চলতে চাইছে। তাই সন্দেহ যখন প্রায় শিয়ালের ভঙ্গিমায় তাঁকে গাঁ-গেরামের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে, তিনি যারপরনাই বিব্রত বোধ করছেন। দাদাজীর যাওয়া মূলত স্মৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হবার একটা প্রসেস। তিনি এই প্রসেসটিকে ব্যাবহার করে স্মৃতির বাইরের কোন অঞ্চলে থিতু হতে চলেছেন। স্মৃতি এখানে মার্তৃগর্ভ সদৃশ। মার্তৃগর্ভ থেকে নির্গমন সম্ভব হলে তবেই জীবিতের নিজস্ব আইডেনটিটি প্রাপ্তি ঘটবে।
হ্যাঁ, ১৯৪৬ সালের ১৬ই অগাস্ট দাদাজীর গায়ে গর্ভস্রাব লেগেছিল।
ফিরে এসে এলা বিশেষ কথা বলল না। আমি তাকে চায়ের ভাঁড় এগিয়ে দিতে সে প্রথমে সিগারেটে সুখটান দিল।
সন্ধে থেকে রাত অব্দি আমরা এমনিই ধর্মতলার রাস্তায় ঘুরলাম। এলা ফ্রুট জুস খেল। একটা ৭৫০-এর বোতল তুলল। একসময় বলে ফেলল, মাথার ভেতর হিংসুটেপনা কিরকির করছে।
ওকে যখন হোটেলে পৌঁছে দিলাম তখন রাত সাড়ে দশটা। কোনরকমে লাস্ট ট্রেনটা পেয়ে গেছিলাম।
Direct Action Day-- লিখে গুগুলে সার্চ করলে একটা জমায়েতের ছবি দেখানো হয়। সাদাকালো অপরিষ্কার ছবি। প্রচুর মানুষ সামনের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। তারা কিছু একটা শুনছে, বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু কারোর মুখ স্পষ্ট নয়। আমি জুম করে মুখাবয়বগুলি দেখতে চাইছিলাম। কিন্তু ছবির কোয়ালিটি এতই খারাপ যে স্ক্রিন জুড়ে শুধু পিক্সেল ফুটে উঠল।
তিনদিন দাদাজীর কোন হদিস ছিল না। সেই সময় আব্বার বয়স ৫-৬ বছর। আব্বার বিশেষ কিছু মনে নেই। তবে দাদাজী বুঝি আর ফিরবেন না, এমন কথা আব্বা শুনেছিল, এটুকুই তার মনে আছে।
দাঙ্গাবিধ্বস্ত শহরে দাদাজী কিভাবে তিনদিন কাটিয়েছিলেন? তিনি কি নিজের চোখে কোন হত্যা দেখেছিলেন?
সাদা কাগজ চেটে চেটে একটা শিয়াল কালির দাগগুলোকে তুলে ফেলবার চেষ্টা করছে। রাত্তিরে স্বপ্নে দেখেছিলাম।

অফিস যাব বলে তৈরি হচ্ছি, এলার ফোন এল চলে আয়।
গিয়ে দেখি সে রিসেপশনের ছেলেটার সঙ্গে তুমুল গল্প জুড়ে দিয়েছে। এখন আর ওর মুখে কোন টেনশনের ছাপ নেই। কাল বিকেলের মেয়েটা যেন অন্য কেউ ছিল।
এলা আমার সঙ্গে ছেলেটার পরিচয় করিয়ে দিল, ও ভরত। ভরত শাহ। তবে আমরা ওকে ভারত বলেই ডাকতে পারি। কীরে তোকে ভারত বললে তুই কি রাগ করবি?
ছেলেটা আমার দিকে চেয়ে হাসল।
আমরা তিনজনেই বেরিয়ে পড়লাম।
যথারীতি জানা যাচ্ছে না কোথায় যাচ্ছি।
রিসেপশনে তখন অন্য একজন বসে।

ট্যাক্সি থামল মোমিনপুরে। ভরতের চোখে সস্তার সানগ্লাস। এলা তার ডিএসএলআর থেকে ছবি তুলতে তুলতে হাঁটা লাগাল।
মোমিনপুর থানার পাশেই হাতে-টানা রিক্সা স্ট্যান্ড। সেখান থেকে ডান দিক ঘুরে কিছুদূর এগোলে প্রিয়াঙ্কা স্টুডিওএলা স্টুডিও পেরিয়ে আবার ডান দিক টার্ন নিয়ে একটা সরু গলির মুখে এসে দাঁড়াল।
আমরা ওকে ফলো করছিলাম। কাছে যেতেই একটা নতুন তিনতলা বাড়ি দেখিয়ে বলল, এটাই ১৮ বি।
তো? আমি ভরতের দিকে তাকিয়ে অবাক। ভরতও তথৈবচ।
এলা ক্লাস নেবার ঢঙে জানাল, লেট পান্না চ্যাটার্জী এখানে থাকতেন। অবশ্য এই বাড়িটায় নয়। তখন এখানে একটা একতলা বাড়ি ছিল। চার ভাইয়ের একান্নবর্তী সংসার। ১৬ অগাস্ট এদের বাড়ি অ্যাটাকড হয়েছিল। তিন ভাইকেই খুন করা হয়। একমাত্র হীরানাথ শুধু প্রাণে বেঁচে গেছিলপরের দিন যখন তাঁকে বাথরুমে খুঁজে পাওয়া গেল, তখনও তার জ্ঞান ফেরেনি।
এসব কী বলছিস তুই?
এলা আমাকে পাত্তা না দিয়ে ভরতের দিকে তাকাল, মিস্টার ভারত তুমি কি রিয়ালাইজ করতে পারছ আমি কী বলছি? জাস্ট ট্রাই টু লিসেন। কান পাতো। কান পাতলে তুমিও শুনতে পাবে কিভাবে ৩০ জন ৪০ জন মানুষ ঘেন্নায় গিজগিজ করতে করতে এই রাস্তা দিয়ে এগিয়ে আসছে। তোমার পাশ দিয়ে এখুনি একজন তলোয়ার নিয়ে চলে গেল। দেখতে পেলে?
এলার নাটকীয়তায় ভরত কী করবে বুঝতে পারছিল না। আমার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল। ভরতকে হাসতে দেখে এলা নিজেও হেসে ফেলল।
বুঝলি। আমরা ততক্ষণে আবার মেইন রোডে উঠে পড়েছি। এলা সিগারেট ধরিয়ে সেনটেন্সটা কমপ্লিট করল, প্রাক্তন হাজব্যান্ড একজন করাপ্ট পুলিশ অফিসিয়াল হলে অনেক সুবিধে পাওয়া যায়।
সে তো দেখতেই পাচ্ছি।
এলা আর কথা বাড়াল না।

          খিদিরপুর থেকে কয়েকজন যুবক বালিগঞ্জের লেকে সাঁতার কাটতে গেছিল। ফেরবার মুখে তারা ভবানীপুরে দাঙ্গার কথা শোনে। সেই থেকেই এই অঞ্চলে উত্তেজনা চলছিল।
বেলার দিকে একজন মুদির সঙ্গে দোকান খোলা নিয়ে স্থানীয় কয়েকজনের বচসা শুরু হয়। বচসা থেকে হাতাহাতি। দোকানদার ছুরিকাহত হলেন।
বিকেল পর্যন্ত থমথম করছিল পুরো এলাকা। মগরেবের নামাজের পর নারা--তকবীর শোনা গেল।
পাঠক বাড়ি বলে পরিচিত একটা হিন্দু বাড়ির উপর বোমা ফেলা হল।
শিশির সরকারকে নিয়ে কঘর হিন্দুদের বসবাস। বোমার শব্দে সেইসব ঘরগুলোতে আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে। নিশ্চুপ পাড়া। পাড়ার ভেতরে কালো কম্বলে ঢাকা রয়েছে কতগুলো ঘর। কম্বলের তলায় জীবিতেরা পরস্পরের গায়ে নিশ্বাস ফেলছে।
নেড়ি কুত্তারা ঘরের পাশে এসে কেঁদে যাচ্ছে যেন।
শিশিরবাবু দরজায় কান পেতে সেই কান্না শুনছেন।
ছাদে উঠলে দেখা যায় মশাল নিয়ে মিছিল চলেছে। সেই মিছিল থেকে আল্লা-হো-আকবার ধবনি উঠছে বারবার।
বাচ্চা আর মেয়েদের একটা ঘরে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে তালা দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তালার চাবি এখন শিশিরবাবুর পকেটে। তাঁর হাতে বন্দুক। তিনি ছাদে চলেছেন।
মশাল নিয়ে এগিয়ে আসছে নারা--তকবীর। গাছগুলো আর আকাশ থমথম করে উঠল। শিশিরবাবু বন্দুক তাক করলেন।
ওয়ান...টু...থ্রি...ফায়ার।
তারপর কালো। কোলাপসিপল গেটটা ভেঙে ফেলার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। শিশিরবাবুর বিধবা দিদি তপতী; সে চেঁচিয়ে উঠল নাকি! ছাদের উপর কেউ আসছে না কেন? কেউ আসছে না কেন এখনও?
শিশিরবাবু দখল হয়ে যাবার অপেক্ষায় বন্দুক নিয়ে বসে আছেন একা...

শিশিরবাবুর দুই নাতি। বড় জন ব্যাঙ্গালোরে সেটেলড। ছোটর নাম সুভাষ। আমরা ওনার সঙ্গেই কথা বলতে এসেছি।
এলা বুঝি সুভাষের সঙ্গে গতকালেই অ্যাপয়েন্টমেন্ট ফিক্সড করে রেখেছিল। তখন আমাকে কিছু জানায়নি। জাস্ট মিট করবার আগে জানাল, একটা ছোট্ট ঢপ দিতে হয়েছে। আমরা ওখানে যাচ্ছি একটা অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে। ওদের সঙ্গে কথা বলে ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে নিয়ে নিউজ পেপারে ফিচার লিখব। আমি দ্য হিন্দুর জার্নালিস্ট। তুই কো-রাইটার।
আর ভারত?
ও জাস্ট আমাদের সঙ্গে আছে। এমনিই।
সুভাষবাবু যদি আইডি কার্ড দেখতে চায়?
শোন। এলা মুচকি হেসে বলল, প্রত্যেকের জীবনেই একজন করাপ্ট পুলিশ অফিসিয়াল থাকা অত্যন্ত জরুরি।
অগত্যা আমরা সুভাষ সরকারের মুখোমুখি।
সুভাষের বয়স আমার মতোই। এই ৩৫ কি ৩৬ হবে। ঘরদোর দেখে বোঝা যাচ্ছে পুরনো স্ট্রাকচারে তেমন পরিবর্তন আসেনি। তবে আমরা যে ঘরটায় এসে বসেছি তাতে এসি চলছে।
সুভাষের স্ত্রী চা নিয়ে এল। সঙ্গে বিস্কিট আর দু প্লেট মিষ্টি
ভরতের দৃষ্টি মিষ্টির উপর নিক্ষিপ্ত। এলা ইশারায় অনুমতি দিতে তা জিহ্বার সান্নিধ্যে চলে গেল।
এলা ছবি তুলতে তুলতে জিজ্ঞেস করল, সেদিনের সম্পর্কে কিছু বলুন।
সুভাষ তাঁর স্ত্রীর দিকে তাকালেন, আমি তো তেমন বিশেষ কিছু জানিনা। কী বলব! আপনি জিজ্ঞেস করুন আমি বরঞ্চ উত্তর দিই।
একজ্যাক্টলি। এলা ছবি তোলা থামিয়ে বলল, একটা সিগ্রেট ধরাতে পারি?
সুভাষের স্ত্রী এসি অফ করে জানালা খুলে দিল।
এলা পাকা জার্নালিস্টেদের মতোই শুরু করল, ফার্স্টলি আমাদের কনসেপ্টটা আপনার সঙ্গে শেয়ার করে নেওয়া উচিত। তাতে আপনিও ফ্রিলি কথা বলতে পারবেন। আমাদেরও সুবিধে হবে। আমরা এই ফিচারটাকে একটু অন্য এঙ্গেলে ভেবেছি। আমরা চাইছি সেইদিনের ভিক্টিমদের পরিবারে ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে নিয়ে যেসব গল্প চালু রয়েছে, যেগুলো ইতিহাসের বইতে আমরা পাই না, সেই গল্পগুলিকে পাঠকদের সামনে তুলে ধরব।
আচ্ছা। সুভাষ বেশ গম্ভীর।
এলা চায়ে চুমুক দিল, এবার আপনি বলুন সেইদিনটাকে নিয়ে আপনি আপনার বাবা-মার কাছ থেকে কী কী শুনেছিলেন।
আমার বাবার বয়স তখন খুবই ছোট। আমার মা ছিলেন বর্ধমানের মেয়ে। তা আমার মামারবাড়ির ঐদিকে কোনও দাঙ্গা হয়েছিল কিনা তা তো কোনদিন শুনিনি।
আপনার বাবার কথা বলুন।
ঐ যে... কী বলতে গিয়ে সুভাষ থেমে গেলেন। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে উনি বাল্যস্মৃতি মনে করতে চাইছেন। যে সময়টায় শিশুরা বাবার কাছ থেকে রূপকথার গল্প শুনে থাকে।
এলা সুভাষকে জানালার দিকে মুখ ফিরে দাঁড়াতে বলল। জানালার ওপারে খিদিরপুরের ঘিঞ্জি অঞ্চল। অনবরত ট্রাফিকের শব্দ ঘরের ভিতর ঢুকে আসছে। আমি সিওর নই এলার ক্যামেরা এইসব পরিপেক্ষিতকে স্থিরতা দিতে সক্ষম কি না।
আপনি আপনার বাবার কথা বলছিলেন।
হ্যাঁ। সুভাষ আবার চেয়ারে এসে বসল, আমার বাবার বয়স তখন খুব ছোট ছিল। ওনার বিশেষ কিছু মনে থাকার কথা নয়। তবে ঐ দিনটার কথা বলতে গেলেই উনি আতঙ্কিত হয়ে পড়তেন। হাজার হোক নিজের বাপকে হারিয়েছিল তো... ঐ আর কি... তবে ওরা আমাদের পরিবারের মেয়েদের গায়ে হাত দেয়নি। টাকাপয়সা সব লুট হয়ে গেছিল। ঠাম্মা তো বাবাকে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে গিয়েছিলন। সেখানে অনেকদিন পর্যন্ত ছিলেন। প্রায় বছর খানেক। তারপর, বোধহয় ৪৭এর পরে, আবার এখানে আসতে পারলেন।
উনি কখনও এই ঘরটা বিক্রি করে দিয়ে অন্য জায়গায় চলে যাবার কথা ভাবেননি? মানে এখানেই তো উনি ওনার স্বামীকে খুন হতে দেখেছিলেন। সেই একই জায়গায় ফিরে আসা, বসবাস করা নিশ্চয় খুব কঠিন।
তা তো বটেই।
হয়তো সেদিনে যারা তোমাদের ঘর অ্যাটাক করেছিল... তুমিই বলছি তোমাকে... তাদের মধ্যে কাউকে কাউকে উনি চিনতেন। রাস্তাঘাটে আবার তাদের সঙ্গে দেখাও হয়ে যেতে পারত। এই পসিবিলিটির মধ্যে বেঁচে থাকাটা তো অলমোস্ট আনবিয়ারেবল। তাই না?
সুভাষ আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। কিন্তু কোন উত্তর দিলেন না।

আমরা একটি সমাজকে তার না বলতে পারা কথাগুলোর মাধ্যমেই চিনতে পারি। কথাগুলো এলা বলেনি। ঘরে ফিরে তরবারি হাতে জিন্নাহের ছবিটা আবার দেখতে দেখতে আমার নিজেরই মনে হল। কিন্তু না বলতে পারা কথাগুলো আমরা জানব কিভাবে?
সোহরাবর্দির ভাষণ শুনতে গিয়ে দাদাজী তিনদিন লাপাত্তা ছিলেন। হয়তো তিনি খিদিরপুর, মোমিনপুর বা একবালপুরের কোথাও, কোন দোস্তের চেনাশোনা কোন বাড়িতে মাথা গোঁজার ঠাই পেয়েছিলেন। কাছেদূরে টিয়ার গ্যাসের শেল ফাটার শব্দ। মাঝে মাঝেই গুজব শোনা যাচ্ছে গরচার বস্তিতে আগুন লাগানো হয়েছে। এন্টালি জ্বলছে। থাকতে থাকতে দাদাজী শিউরে উঠছেন। কলেজ স্ট্রীটের জুতোর বাজারে আগুন লাগলে সেই আগুন বহু দূর থেকে দেখা গিয়েছিল।
আমি দেখতে পাচ্ছিলাম একটা ৫ বছরের ছেলে উঠোনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সে সামনের কাঁচা রাস্তাটার দিকে তাকিয়ে। ঐ রাস্তা দিয়ে যে ঘরে ফিরছে সে ওর বাবা।
দাদাজী দৌড়ে এসে ছেলেটিকে কোলে তুলে নিলেন। তারপর তাঁকে চুমু খেতে খেতে নিঃশব্দে, প্রায় লুকিয়ে, ঘরে ঢুকে গেলেন।
পরের দিন অফিস থেকে যখন প্যারাডাইস-এ গেলাম, এলা ততক্ষণে যথেষ্ট কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছে। ওর রুমে গিয়ে দেখি ভরত মেঝেয় শুয়ে বেহুঁশ। ওর হাতে যেটা জ্বলছে সেটা সিগারেট নয়।
এলা বলল, বস, আমার পাশে এসে বস। তোর গল্প কতদূর?
আমার বেশ ভয় করছিল, সেটা এখনও শুরু করিনি। কিন্তু এটা তুই করছিস কী? ভরতকে চরস খাইয়েছিস? ও এই হোটেলেই কাজ করে। জানাজানি হলে কী হবে জানিস? তোর তো কিছু হবে না। ওর কিন্তু চাকরীটা চলে যাবে।
ওর নামটা এত সুইট। এলা প্রায় টলছিল, খাইয়ে দিলাম। কিছুক্ষণ ঘুমোক। সব ঠিক হয়ে যাবে।
তুই কিছু খেয়েছিস? খাবার আনাব?
এলা ঝট করে শুয়ে পড়ল। অনেকক্ষণ আর কোন সাড়াশব্দ নেই। তারপর আচমকাই উঠে বসল, তুই গল্পটা লিখছিস না কেন?
চোখে মুখে জলের ঝাপটা দিতে সে আবার খানিকটা স্বাভাবিক।
দাদাজীর দেরাজ থেকে জিন্নাহের ছবি পাবার গল্পটা শুনে বলল, এটা তেমন কিছু নয়। ছবিটা দেরাজে রেখে দিয়েছিল। তারপর ভুলে গিয়েছিল। সব কথা সবসময় সবার মনে থাকে নাকি?
আমি কিছুতেই ওর কথা মানতে পারছিলাম না। ওকে বললাম, আমাদের ফ্যামিলি সচেতনভাবেই এই ট্রুথটাকে ভুলে যাবার চেষ্টা চালিয়ে গেছে। তা না হলে এত বড় একটা ঘটনা কেন আমি এতদিন পর জানালাম!
ট্রুথ? এলা বেশ জোরের সঙ্গে হেসে উঠল, ট্রুথ...ট্রুথ...ট্রুথ হল ফ্যামিলির ছোট মেয়েটার ভ্যাজাইনার মতোএটার এক্সিসটেন্স সব্বাই স্বীকার করে। কিন্তু এটার সামনাসামনি হতে কেউ রাজি থাকে না।
এলা আগে থেকেই দুটো জয়েন্ট বানিয়ে রেখেছিল। সেটা শেষ হতে না হতেই মদ। সারাদিন অফিসে খাটাখাটনি গেছে। আমি আর তাকাতে পারছিলাম নাও প্রশ্নটা করেই ফেলল, তুই কি চাস আমার কাছে?
এসব প্রশ্নের কি কোনও সোজা উত্তর আছে? আমি মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিলাম। ও আমাকে টেনে নিল, I am not going to discuss ethics.
এলা খাট থেকে নেমে আমার সামনে এসে দাঁড়াল। ও ন্যাংটো। নিজের দিকে তাকিয়ে খুব সহজেই বলল, I am menstruating.  তারপর যেন মুচকি হাসল, But I am not going to discuss ethics.
এলা আমার উপর উঠে এসেছিল। প্রতিবারের ধাক্কায় খাটটা নড়ে উঠছিল। আওয়াজ হচ্ছিল। আমি আর এলার দিকে তাকাতে পারছিলাম না। তবে আমি যে এলার শরীরের রক্তে ক্রমশ ভিজে যাচ্ছি তা বুঝতে পারছিলাম।
           
যখন ঘুম ভাঙল, দেখি রুমে কেউ নেই। ভরত নেই। এলা নেই। এমনকি এলার রুকস্যাকটাও নেই।
আমি দৌড়ে গিয়ে ওয়াড্রব খুললাম। ওয়াড্রব ফাঁকা।
পুরো মাথা ব্লাঙ্ক।
কতক্ষণ ধরে বসে আছি খেয়াল করতে পারছিলাম না। যেন এক ঘণ্টা, দুই ঘণ্টা ধরে এখানেই এই রক্তমাখা বিছানাটায় বসে রয়েছি।
এলা হোটেলের বিল মিটিয়ে দিয়েছিল। আমি যখন প্যারাডাইস থেকে বেরোলাম তখন প্রায় দুপুর দুটো বাজে।
এলার ফ্লাইট দুটো পনেরোতে। এখন ও হয়তো চেকিং-এ ব্যস্ত। ফোন করলে এনগেজড টোন পাব। কিংবা সুইচড অফ।
ওকে গুডবাই লিখে হোয়াটস-আপ করে রাখব?
আমি হাঁটতে হাঁটতে এসবই ভাবছিলাম।
তারপর কখন চায়ের দোকানে ঢুকে পড়েছি বুঝতেই পারিনি।
                       
                                                                




সাদিক হোসেনের গল্পভুবন

গল্পপাঠঃ: গল্প লিখতে শুরু করলেন কেন?
সাদিক হোসেনঃ কী কারণে ঠিক জানি না তবে আমি খুব ছোটবেলা থেকেই জেনে গেছিলাম আমি একজন লেখক হতে চাই। খুব ছোটবেলাতেই, তখন আমি হয়তো ক্লাস ফোর-ফাইভে পড়ি, কোন লেখা পড়লে ভাববার চেষ্টা করতাম লেখাটি আমি লিখলে কেমনভাবে লিখতাম। কোন কোন জায়গায় লেখকের থেকে আলাদা ভাবে ভাবতাম।
যদিও একটা সময় আমি কবি হব ভেবেছিলাম। প্রায় সাত-আট বছর টানা কবিতা লিখেছি। আমার প্রথম বইও কবিতারই। তারপর একটা সময় মনে হল, আমি যা যা বলতে চাইছি সেগুলো কবিতার মাধ্যমে সঠিকভাবে বলতে পারছি না। কবিতা লেখা ছেড়ে দিলাম। তারপর গল্প ও উপন্যাস লেখা...

গল্পপাঠঃ:
শুরুর লেখাগুলো কেমন ছিল?
সাদিক হোসেনঃ কলেজ জীবনে আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে একটি পত্রিকা বার করতাম। পত্রিকাটির নাম ছিল আরও কিছু ওখানেই আমার প্রথম গল্প লেখা। গল্পটি ৯২ এর বাবরি মসজিদ ধংসকে কেন্দ্র করে একটি পরিবারের কাহিনী। এই একটি মাত্র গল্প লিখেই আমি উপন্যাসে হাত দিয়েছিলাম। তখন আমার বয়স ২২ বছর। কলেজ ছেড়ে দিয়েছি। গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করিনি। হাতে অফুরন্ত সময়। সেই সময় আমি ব্রিটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরির মেম্বারশিপ নিই। ওখান থেকেই বিদেশী সাহিত্য পড়তে শুরু করলাম। সারাদিন লাইব্রেরি আর রাতের বেলা উপন্যাসটা নিয়ে নাড়াচাড়া করা।
কিন্তু এভাবে তো বেশীদিন চলে না। বাঁচতে গেলে টাকার দরকার পরে। বাবা মারা গেছিল এইসময়। আমি কলকাতা শহর থেকে অনেক দূরের একটা পেট্রোল পাম্পে চাকরি নিয়ে ছিলাম। সপ্তাহে একদিন বাড়ি ফিরতাম। লাইব্রেরি থেকে বই তুলে নিতাম। পেট্রোল পাম্পে বেশী গাড়ি আসত না। প্রায় সময় ক্যাশবাক্সের সামনে বসে বই পড়তাম। রাতের বেলা টুকটাক লেখালিখি। এইভাবে প্রায় তিন বছর ধরে আমি উপন্যাসটা লিখেছিলাম।

গল্পপাঠঃ: 
গল্প লেখার জন্য কি প্রস্তুতি নিয়েছেন? নিলে সেগুলো কেমন?
সাদিক হোসেনঃ সিনেমা বানানো শেখাবার জন্য যেমন প্রচুর স্কুল আছে, গল্প লেখা শেখাবার জন্য তো তেমন কোন স্কুল নেই! ফলে গল্প লেখার প্রস্তুতি নিজের ভেতরই চলতে থাকে। নিঃশব্দে। একজন লেখক কিভাবে অ্যাপ্রোচ করছেন সেটা বুঝতে শেখাই প্রধান পদক্ষেপ। কেন একটি গল্প সফল হল এবং অন্যটি কেন হল না, সেটাকে নিয়ে নিজের মতো করে ভাবনাচিন্তা করাটাই হয়তো প্রস্তুতির মধ্যে পরে। আর এই সবগুলিই চলে খুব অসচেতনভাবে। এভাবেই একজন ব্যাক্তি বুঝতে পারেন তিনি ক্রমশ লেখক হয়ে উঠছেন।
এযাবৎ কালে পড়া অসফল গল্পগুলিই আমাকে সবথেকে বেশী অনুপ্রাণিত করেছে। এই অসফল বা আংশিক গল্পগুলিকেই প্রতিটি সফল গল্প পূর্ণতা দেয়।
একটি সফল গল্পের শরীরে বহু অসফল গল্পের ডেডবডি লুকিয়ে থাকে।
সফল গল্প একটি হত্যাভূমি।
প্রতিটি ক্লাসিকই, তাই, তার সময়ের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী বহু অসফল লেখা ও লেখকের মৃত শরীরকে বহন করে।
যে লেখা যতবেশি হত্যালীলা চালাবে, সেই লেখা ততবেশি সফল।

গল্পপাঠঃ: 
আপনার গল্প লেখার কৌশল বা ক্রাফট কী?
সাদিক হোসেনঃ আমি কবিতা দিয়েই লেখালিখি শুরু করেছিলাম। এখনও কোনও গল্প লিখতে গেলে আমি প্রধানত শব্দকে অনুসরণ করে থাকি। একটি শব্দ বা বাক্যকে অনুসরণ করেই আমার ভাবনাচিন্তা জুড়তে জুড়তে যায়। এভাবেই গল্প তৈরি হয়। বা আরও ভালোভাবে বললে প্রাথমিক অ্যাম্বিয়েন্স গঠিত হয়।
এরপর আসে আমি কী কী জিনিস লিখব না সেটার সিলেকশন। এটি আমার কাছে খুব ইম্পর্টেন্ট।
একটি গল্প আমার কাছে বহু না-গল্পের বিয়োগফল।

গল্পপাঠঃ: 
আপনার নিজের গল্প বিষয়ে আপনার নিজের বিবেচনা কী?
সাদিক হোসেনঃ একটি গল্প লেখা হয়ে গেলে আমি সেটার প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে ফেলি। এটা এই কারণে নয় যে আমি পরবর্তী গল্পটিতে পূর্ববর্তীর প্রভাব এড়াতে চাই। না সে কারণে নয়। আমি আসলে বুঝতে পারি, (আমার মনে হয় প্রতিটা লেখকই তাই করেন) আমি কোন কোন জায়গায় ফাঁকি দিয়েছি। নিজের খুঁতের কাছে বারবার ফিরতে কারই বা ভাল লাগে?

গল্পপাঠঃ: 
আপনার আদর্শ গল্পকার কে কে?
সাদিক হোসেনঃ আমার মতে আদর্শ আর শিল্পী এই দুটি শব্দ যে শুধু পরস্পরের বিপরীত তাই নয়; এরা পরস্পরকে নাকচও করে। আদর্শ ধর্মে থাকতে পারে। শিল্পে কোনকিছুই আদর্শ হতে পারে না। তাহলে নতুন ধরনের শিল্প, নতুন ধরনের ভাষ্য তৈরি হবে কিভাবে?
তবে বহু গল্পকারই আমার অত্যন্ত প্রিয়। তালিকা খুব দীর্ঘ। আমি কয়েকজনের নাম বলছি কমলকুমার মজুমদার, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, দেবেশ রায়, মানিক চক্রবর্তী, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, অস্কার ওয়াইল্ড, মার্কেজ, বাসুদেব দাশগুপ্ত, মিলান কুন্দেরা, জে এম কোয়েতজি, চিনুয়া আচেবে, অ্যালবের ক্যামু, কাফকা, দস্ত্যভস্কি, চেকভ, টলসটয়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় ...আরও অনেক অনেক।

গল্পপাঠঃ: 
কার জন্য গল্প লেখেন?
সাদিক হোসেনঃ 
আমি গল্প লিখছি মানে আমি তো কমিউনিকেট করতেই চাইছি। অবশ্যই আমি পাঠকের কথা মাথায় রেখে লিখি।
প্রতিটি গল্প মানেই বহু কিছুর সিলেকশন এবং একইসঙ্গে বহু কিছুর রিজেকশনএই সিলেকশন আর রিজেকশন করার পদ্ধতিটি একটি রাজনৈতিক কর্ম। আর সেই কারণেই এটি একটি বোথওয়ে ট্রাফিক।

পাঠক-লেখকের সম্পর্কটি একটি রাজনৈতিক সম্পর্ক।



লেখক পরিচিতি
সাদিক হোসেন : ১১ ডিসেম্বর ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার মহেশতলা অঞ্চলে জন্ম। আইটি নিয়ে লেখাপড়া করেন। গ্রাফিক ও মালটিমিডিয়া চর্চা করে বর্তমানে একটি বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত। প্রকাশিত গল্পের বই— গিয়াস আলির প্রেমও তার নিজস্ব সময় (২০১৩)। সম্মোহন।   উপন্যাস— মোমেন ও মোমেনা (২০১১)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন