বৃহস্পতিবার, ৯ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭

গবেষক-লেখক নন্দিনী সুন্দর-এর সাক্ষাৎকার

রিমি মুৎসুদ্দি

রাতের আকাশের তারাগুলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাওয়ার আগে পর্যন্ত হুঙ্গি এক এক করে প্রত্যেকটা গুণে রাখছে। গতবছর খাদানে কাজ করে যে ক’টা বাড়তি টাকা সে পেয়েছিল যেন অতি যত্নে গুনে তুলে রাখছে সে। ছাগলের বাচ্চাটা প্রায় অর্দ্ধেক রাতই ওকে জাগিয়ে রেখেছে। মাঝে মাঝে বিছানার তলা দিয়ে একদিক থেকে আরেকদিকে দৌড়ে চলে যাচ্ছে। আর এই দৌড়নোর সময়ে হুঙ্গির খাটিয়ার দড়িগুলোকে এমনভাবে নাড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছে যে তার ঘুম ভাঙতে বাধ্য। কখনও আবার খাটিয়ার দড়িতে পিঠ ঘষছে, কখনও বা পায়ের খুঁড়ে মাথা ঘষে চলেছে। এইভাবেই হুঙ্গির রাত কেটেছে।


এতক্ষণে সাদা মোরগটাকে বাবা বোধহয় মিলিটারি প্রশিক্ষণ দেওয়া আরম্ভ করেছে। সামনের পরবে প্যাণ্ড্রি(সাদা মোরগ) যদি মোরগ লড়াইতে জিতে যায়, তাহলে দুটো বাড়তি পয়সা আসবে ঘরে। মা অবশ্য সেই রাত থাকতেই অন্ধকারে মাঠে চলে গেছে। কেউ ওঠার আগেই যেন সকালের কাজগুলো সারা হয়ে যায়।

হুঙ্গির তখনও সারা শরীর জুড়ে আলস্য। আরও কিছুক্ষণ এই মুহুর্তগুলোর মধ্যেই সে শুয়ে থাকতে চায়। কে যেন একটা চিৎকার করে ছুটতে ছুটতে এদিকেই আসছে। এ তো মাসার গলা। বছর ষোলোর এই ছেলেটা কাল রাতে গ্রাম পাহাড়ায় ছিল। “জুড়ুম আসছে, জুড়ুম আসছে! পালাও!” জেগে থাকা, ঘুমিয়ে থাকা ও জেগেও শুয়ে শুয়ে সকালের আলস্যে ডুবে থাকা হুঙ্গির মত সমস্ত কিশোর কিশোরীরা সমেত পুরো গ্রামটাই প্রিয়জনদের হাত ধরে, ছোট বাচ্চাদের কোলে নিয়ে ছুটতে থাকে। তাঁদের ফেলে যাওয়া ছোট্ট কুড়েঘরগুলো ও কষ্টার্জিত জিনিষপত্রগুলো হাঁস-মুরগী, গরু-ছাগলগুলোর মতই যেন চিৎকার করে হাহাকার করে চলেছে। দুদিনবাদে যখন টিকে থাকা কয়েকজন গ্রামবাসী ফিরে আসবে টারমেটলার জঙ্গল তখন পুড়ে ছাই হয়ে যাবে।

পাহাড়, জঙ্গলে ঘেরা ছত্তিশগড়ে আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল বস্তার। সন্ত্রাস দমনের নামে কখনও পুলিশের অত্যাচার, পুলিশকে সাহায্য করার অভিযোগে কখনও আবার মাওবাদীদের রোষের শিকার অরণ্যের আদি ভূমিপুত্রেরা। অত্যাচারে, অবিচারে নৃতাত্ত্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছত্তিশগড়ের বস্তার ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে। স্বস্তিতে নেই সেইসব মানুষেরাও যাঁরা এদের পাশে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রের কাছে সুবিচারের আশা করছেন। রাষ্ট্রের চোখে চোখ রেখে লড়াইটা যাঁরা চালিয়ে যাচ্ছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা নন্দিনী সুন্দর। তাঁর বহু বিতর্কিত বই- The Burning Forest- India’s War in Bastar- এর উপর আমার নেওয়া তাঁর একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছিল আনন্দবাজার ডিজিট্যাল নিউজে। গল্পপাঠের ওয়েবজিনে পাঠকদের জন্য এই সাক্ষাৎকারটি দিলাম। এক বন্ধু একবার বলেছিলেন, ‘বিস্মরণের স্মরণ ঘটান’, কিছুটাই সেই প্রচেষ্টাই।


“যুদ্ধ আগেই আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল, যদিও আমি তা বুঝতে পারি নি”- নন্দিনী সুন্দর
সাক্ষাৎকার- রিমি মুৎসুদ্দি


রিমি মুৎসুদ্দি :
আপনার বই- দ্য বার্নিং ফরেস্ট/ইন্ডিয়া’জ ওয়ার ইন বস্তার-এ আপনি লিখেছেন, “যুদ্ধ আগেই আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল, যদিও আমি তা আগে বুঝতে পারি নি।” এখানে যুদ্ধ বলতে আপনি রাষ্ট্র বনাম মাওবাদী যুদ্ধের কথাই বলেছেন?

নন্দিনী সুন্দর :
হ্যাঁ, ছত্তিশগড়, বস্তারের পরিপ্রেক্ষিতে যুদ্ধ বলতে আপাতদৃষ্টিতে মাওবাদী বনাম রাষ্ট্রই বোঝায়। এই যুদ্ধ, কোম্বিং অপারেশন শুরু হয়েছিল সেই আশির দশক থেকে। তবে যুদ্ধটা এখন আর শুধু মাওবাদী ও রাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মাওবাদীদের প্রতি রাষ্ট্রের দমননীতি এখন কেবলমাত্র বস্তারের আদিবাসীদের উপর রাষ্ট্রীয় আক্রমণেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।


রিমি মুৎসুদ্দি :
কিন্তু সুপ্রীম কোর্ট তো ‘স্পেশাল পুলিশ অফিসারস ইন অ্যান্টিনকশাল অপারেশন’ নিষিদ্ধ করে দিয়েছে।

নন্দিনী সুন্দর :
হ্যাঁ, সুপ্রীম কোর্ট ব্যান করেছে। কিন্তু ছত্তিশগড় সরকার ক্রমাগত সুপ্রীম কোর্টের আদেশ অমান্য করে চলেছে। এই আদেশের ফলস্বরূপ তারা ‘স্পেশাল পুলিশ অফিসারস’-এর নাম পরিবর্তন করে ‘আর্মড অক্সিলারি ফোর্সেস’ রেখেছে। সুপ্রীম কোর্ট যেখানে নিরস্ত্রীকরণের নীতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে সেখানে রাজ্য সরকার ক্রমাগত এই আর্মড অক্সিলারি ফোর্সকে আরো বেশী করে বন্দুক ও টাকার যোগান দিয়ে চলেছে।


রিমি মুৎসুদ্দি :
সালওয়া জুড়ুম আইনত নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে বস্তারের আদিবাসীরা কি একটু স্বস্তিতে নেই?

নন্দিনী সুন্দর :
দেখুন সালওয়া জুডুম শুরু হয়েছিল ২০০৫ সালে। ২০০৭ এর মধ্যেই টিমাপুরম, মোরপল্লী, টারমেটলা এই গ্রামগুলো মিলিয়ে প্রায় ৩০০ ঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ধর্ষণ আর খুনের পরিসংখ্যান দেখলে আঁতকে উঠতে হয়। এরপর ২০০৯ –এ অপারেশন গ্রীন হান্ট শুরুর পর থেকে আদিবাসীরা আরো চরম দুর্দশার মধ্যে দিয়ে জীবন কাটাতে থাকে। কত গ্রাম যে নেই হয়ে গেছে তার হিসাব রাষ্ট্রীয় পরিসংখ্যান-এ পাবেন না। ২০১১-তে সালওয়া জুড়ুম নিষিদ্ধ হয়। সেই বছরই জুলাই মাসে মাওবাদীদের বিরুদ্ধে একটা অভিযানে বস্তারের প্রায় চারটে গ্রাম-ই একেবারে নেই হয়ে যায়।


রিমি মুৎসুদ্দি :
২০১১-এর পর চিত্রটা কি কিছুটা বদলেছে?

নন্দিনী সুন্দর :
সালওয়া জুড়ুম আইনত বন্ধ হলেও আদিবাসীরা কোন স্বস্তি পায় নি। সালওয়া জুড়ুম-এর রূপ পরিবর্তন হয়েছে। পুলিশ ও কিছু রাজনৈতিক সুযোগ-সন্ধানীরা মিলে মাওবাদী দমনের জন্য কয়েকটা ফোরাম তৈরি করেছে। এগুলো হল- অগ্নি, সামাজিক একতা মঞ্চ ইত্যাদি। এরা মাওবাদী দমনের নামে আদিবাসীদের উপর অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে। ধর্ষণ আর ঘর জ্বালিয়ে দেওয়া তো এখানে প্রতিদিনের ঘটনা। যে আদিবাসী মেয়েটা সকালে মহুয়া কুড়োতে যাচ্ছে, দুপুরে তার রক্তাক্ত লাশ পাওয়া যাচ্ছে। খাঁকি পোশাকে ঢাকা সেই মৃতদেহ দেখিয়ে একদল উল্লাস করে বলছে গেরিলা স্কোয়াডের কম্যাণ্ড পুলিশের সাথে খণ্ডযুদ্ধে নিহত হয়েছে। আবার পুলিশের সমর্থনে থাকা গ্রামবাসীরাও মাওবাদীদের অত্যাচারের শিকার হচ্ছে।


রিমি মুৎসুদ্দি :
আপনার বইতে পরিসংখ্যান গত তথ্য ও গ্রামবাসীদের উপর হওয়া অত্যাচারের কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে। এর ফলে কি আপনার মনে হয় বস্তারের কথা সারা দেশে ও বিশ্বের দরবারে পৌঁছাবে? বিচার পাবে অত্যাচারিত গ্রামবাসীরা?

নন্দিনী সুন্দর :
আশা রাখছি। মানুষের কাছে পৌঁছে যাক এই আর্ত কাহিনী। শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ, কল্যাণকামী রাষ্ট্র এগিয়ে আসুক। অসম্ভব নৃতাত্ত্বিক গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চল ও তার ভূমিপুত্রেরা বিচার পাক। তাদের নাগরিক অধিকার সুরক্ষিত হোক।


রিমি মুৎসুদ্দি :
আপনি প্রথম কবে বস্তারে এসেছিলেন?

নন্দিনী সুন্দর :
আমি তখন কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে অ্যানথ্রোপলজিতে পিএইচডি করছিলাম। আমার বিষয় ছিল- সাবঅল্টার্ণ স্টাডিস এন্ড কলোনিয়াল রিবেল। ১৯৯০ সালে আমি যখন এই অঞ্চল সম্বন্ধে পড়াশুনা করছিলাম সেইসময়ে আমার ধারণা ছিল এখানে এই ধরণের কোন রিবেল বা লড়াই শুরু হয় নি। আমার এক জার্ণালিস্ট বন্ধু মহম্মদ ইকবাল ও তাঁর স্ত্রী কলা আমাকে এখানে আসতে অনুরোধ করে। ইকবাল আর কলার গল্পও কিছুটা সেই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে আলাদা ও বৈশিষ্ট্যকারী। নাগপুরের চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট ইকবাল বস্তারের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে ও এক আদিবাসী মেয়ের প্রেমে পড়ে এখানেই সারাজীবন থেকে যায়। ইকবাল ও কলার এই পথ চলা মোটেই মসৃণ ছিল না। যাইহোক, আমি ওঁদের আমন্ত্রণেই প্রথম এখানে আসি ১৯৯০-তে। এরপর এই অঞ্চলের মানুষ, এখানকার জল-জঙ্গল সব কিছুর সাথেই কেমন একটা একাত্মতা অনুভব করতে থাকি। আর তখন থেকেই এখানে যাওয়া আসা।


রিমি মুৎসুদ্দি : 
 ১৯৯০-এর বস্তার আর এখন ২০১৬-এ কি লক্ষণীয় পরিবর্তন হয়েছে? শিল্পের কারণে কিছুটা তো প্রযুক্তিগত উন্নয়ন হয়েছেই। যেমন, সড়ক পরিবহন ব্যবস্থার উন্নিতি হয়েছে। এর ফলে আদিবাসী জনজীবনে কিছুটা উন্নয়নের প্রভাব কি পড়েছে বলে আপনার মনে হয়?

নন্দিনী সুন্দর : 
আমার মনে হয়, বস্তার আরো পিছনের দেকে হেঁটে গেছে। শুধু রাস্তা তৈরি হলেই তো আর জনজীবনের উন্নয়ন হয়েছে এমনটা বলা যায় না। আগে আদিবাসীদের হাট বসত। মানুষ মনের আনন্দে বেচাকেনা করত। এখন মানুষ সবসময়ে ভয়ে থাকে। তাদের তো দুদিক থেকেই ভয়। যখন তখন মাওবাদীরা পুলিশের চর সন্দেহে মেরে দিতে পারে। আর পুলিশি অত্যাচারের কাহিনী তো অবর্ণনীয়। আদিবাসী সুরক্ষার নামে বস্তারের প্রতি ২-৫ কিমি-র ভিতর বসেছে সিআরপিএফ/বিএসফ/আইটিবিপি ক্যাম্প। এরা সারাক্ষণ গ্রামবাসীদের উপর নজরদারি করে। মেয়েদের সুরক্ষা আরো অনিশ্চিত হয়েছে। যখন তখন ঘর থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করা হচ্ছে। এদের অর্জিত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হচ্ছে। মেয়েদের স্কুলের কাছে ক্যাম্প বসলে ভয়ে মেয়েরা স্কুলে যেতে চাইছে না। স্কুল থেকে টেনে এনে ধর্ষণের ঘটনাও ঘটেছে। এতে কি আপনার মনে হয় উন্নয়নের ছিঁটেফোটাও বস্তারের প্রত্যন্ত গ্রামে, জঙ্গলে আদিবাসীদের কাছে পৌঁছেছে?

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন