বৃহস্পতিবার, ৯ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭

উপন্যাস ও ছোটগল্প কিভাবে আলাদা হয়ে যায়

অভিখ ভট্টাচার্য

ছোটগল্পের সংজ্ঞা নির্দেশ করতে গিয়ে এডগার অ্যালেন পো বলেন, ছোটগল্প হলো গদ্যে লেখা এমন কাহিনী যা পড়তে আধঘণ্টা থেকে এক বা দু’ঘণ্টা সময় লাগে। অর্থাৎ আর একটু ঘুরিয়ে বলা চলে যে, সেই গল্পই ছোটগল্প যা এক বৈঠকে বসে পড়ে ফেলা চলে। এ তো গেল দৈর্ঘ্যের কথা। গল্পের বিষয়বস্তু কি হবে ?



নিঃসন্দেহে তা জীবন । ছোটগল্প জীবনের খণ্ডচিত্র ? জীবনের কোন বিশেষ বিশেষ মুহুর্তে অভিজ্ঞতার এক-একটি মোড়ক যখন হঠাৎই উন্মুক্ত হয়, গল্পকারের মনের দিগন্তে জীবনের কোন দিক কিংবা অংশ যখন হঠাৎ আলোর ঝালকানির মতো আকস্মিক ঝলসে ওঠে তখনই সেই অস্পষ্টালোকের প্রায়ান্ধকারে জন্ম নেয় ছোটগল্প। বিষয়বস্তুর নির্বাচন তো তাৎক্ষণিক। এখন প্রয়োজন শুধু বস্তুকে ছাঁদে ( plot ) ফেলে শিল্পরসে মণ্ডিত করে ঘন সংবদ্ধ এক অনিবাৰ্য পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়া ।
ছোটগল্প শুধুমাত্র যে জীবনেরই খণ্ডরূপ, কেবলমাত্র জীবনেরই খণ্ডচিত্রের প্ৰকাশক তাই-ই নয়, যা কিছু জীবনের তথা অভিজ্ঞতার প্রান্তসীমায় ধরা পড়ে, তাই ছােটগল্পের উপজীব্য বিষয়।
কিন্তু ছোটগল্পে বিষয়বস্তু কি এক বা একাধিক ? এ বিষয়ে স্থির বক্তব্য, গল্পকার গল্পে শুধু একটিমাত্র ঘটনাকে সুসমঞ্জস্য পরিণতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যান। হথর্ন এবং পো, যাদের হাতে আধুনিক ছোটগল্প পরিচ্ছন্ন শিল্পরূপ ধারণ করেছে তাদের পূর্বে একটিমাত্র ঘটনার সুসমঞ্জস্য পরিণতি যেসব গল্পে আমরা  লক্ষ্য করি তন্মধ্যে ডিফোর-- "The Apparition of Mrs. Veal', অ্যাডিসনের--"The Vision of Mirza', অস্টেন-এর ‘Peter Rugg', 'The Missing Man” ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য ।
কিন্তু আধুনিক ছোটগল্প শুধুমাত্র প্রতীতিগত ঐক্যসর্বস্বই নয়। তার মধ্যে শব্দের মিতব্যয়িতা, প্রয়োগপদ্ধতির একনিষ্ঠতা, বক্তব্য বিষয়ের বাহুল্যহীনতা, গল্পের সামগ্রিক সুরের একতা, উপযুক্ত পটভূমির ব্যবহার, চরিত্রচিত্রণে সত্যের প্রতি নিষ্ঠা ইত্যাদিও দেখা যায়।


অন্যদিকে দেখি, গল্প যেমন জীবনের বা অভিজ্ঞতার খণ্ডচিত্রের প্রকাশক, উপন্যাস তেমনি জীবনের বা অভিজ্ঞতার সামগ্রিকরূপকে প্ৰকাশ করে । সর্বযুগে সর্বকালে আবেগ ও প্রবৃত্তিতাড়িত থরোথরো জীবন ও কর্মের পশ্চাদপটে পুরুষ ও নারীর পরস্পরের প্রতি দুৰ্নিবার কৌতুহল ও মিলনের আকূতি উপন্যাসের উপজীব্য বিষয় । তাই উপন্যাসের পরিসরের ব্যাপ্তি জীবনের ব্যাপ্তিও সূচনা করে। এই বৃহৎ পরিসরে চরিত্রের মানসিক জটিলতা, দ্বন্দ্ব, প্ৰেম, হিংসা, ঘূণা, লোভ, ক্রুরতা, নীচতা ইত্যাদি পাঠকের সামনে উন্মুক্ত করে ধরেন ঔপন্যাসিক এবং তাতে জীবনের প্রচণ্ড সম্ভাবনা ও ক্ষয়ের প্রতি ইঙ্গিতও থাকে সুস্পষ্ট।
উপন্যাসের সঙ্গে ছোটগল্পের পার্থক্য তবে কি শুধু এই ? নিঃসন্দেহেই তা নয়। উপন্যাস ও গল্পের বিষয়বস্তু ও শিল্পরূপের আলোচনায় যে পার্থক্যগুলি বিশেষ করে চোখে পড়ে তা হলো--
১. গল্পের একটা নিজস্ব ছক আছে। নাটক সম্পর্কে যেমন, গল্পের ক্ষেত্রেও এ্যারিস্টোটলের বক্তব্য প্রযোজ্য। তার মতানুসারে বলা চলে--গল্পেরও আদি-মধ্য-অন্ত অবশ্যই থাকতে হবে। আধুনিক সমালোচনার ভাষায় একে বলা চলে--. "Preliminary situation, the complication of the threads of the plot & the Resolution of the complexity i.e., the solution of the problem the writer has set up'. কিন্তু এই ধরাবাঁধা ছাঁদের   সীমিত গণ্ডীর বাইরে যাবার একটা প্রবণতা আধুনিক গল্পকারদের মধ্যে দেখা যায়। গুচ্ছগল্প ( story sequence) লেখার চেষ্টা এই গণ্ডী অতিক্রমের-অভিলাষেরই  ফল। ষ্টিভেনসন-এর New Arabian Nights এবং কনান ডয়েল-এর  Sherlock Holmes এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
এ ছাড়া গল্প রচনার সময়ে যে প্রধান উপাদানগুলি অনিবাৰ্যভাবে প্রয়োজন হয় তা হলো, প্লট বা ছাঁদ, চরিত্র, সংলাপ, সময় ও ঘটনাস্থল, পরিবেশ ( atmosphere ) ও গল্পের সামগ্রিক সুর ( বিয়োগান্ত বা মিলনান্ত ) সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা। এর সঙ্গে মিশে থাকে গল্পকারের জীবন সম্পর্কে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি। মোটামুটিভাবে উপন্যাসেও এ নিয়ম ও উপাদানগুলি লক্ষ্য করা যায়।


২. বিষয়বস্তুর দিক থেকে বলা যায়, গল্পে মানব চরিত্রই একমাত্র উপজীব্য বিষয় নাও হতে পারে। হয়তো-বা কোথাও প্রাকৃতিক নিয়মের কিংবা নিয়তির অমোঘ শক্তির প্রকাশ দেখানো হয়, কখনও মানব জীবনের প্রবৃত্তি বিশেষের চিত্র যেমন ঘৃণা, ভয়, ঈর্ষা, কুসংস্কার, কর্তব্যপরায়ণতা, বিশ্বস্ততা ইত্যাদির চিত্র অঙ্কন করা হয়, আবার কোথাও-বা প্ৰাণীজগতের প্রতি সুগভীর মমত্ববোধ থেকে জন্ম নেয় গল্প ৷ এক কথায় গল্পের কোনো ধরাবাঁধা বিষয় নেই । গল্পকারের সৃষ্টির প্রেরণা-মূহুর্তে যে-কোনো বিষয় অলৌকিক সৌন্দর্য ও নিগৃঢ় অর্থ বহন করে শিল্পসুষমায়  মণ্ডিত হয়ে কবির ভাষায়--'a local habitation and a name" গ্রহণ করতে পারে।
কিন্তু উপন্যাসে মানব চরিত্রের বিশ্লেষণই মূখ্য। অন্যান্য বিষয় যতদূর এই বিশ্লেষণের কিংবা চরিত্রের গৃঢ় জটিলতা উদঘাটনের সহায়ক ততদূর পর্যন্তই গৃহীত হয়ে থাকে। কিন্তু লক্ষ্য এখানে স্থির অনির্বাণ শিখার মতো প্ৰজ্জ্বলিত অর্থাৎ প্রবৃত্তির সংঘাতে বিক্ষুব্ধ, অস্থির, অতি জটিল মানব মনের উদঘাটন।


৩. গল্প-দেহের একটা নির্দিষ্ট কাঠামো আছে, এ কথা আগেই বলেছি। এই নির্দিষ্ট কাঠামো বা ছাঁদ থাকার ফলে গল্পে গল্পকারের স্বাধীনতা কম। স্বল্পপরিসরে নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে বক্তব্য বিষয়কে পরিস্ফুট করতে হয় বলে সামগ্রিক জীবন গল্পের বিষয়বস্তু হতে পারে না। একটি মুহুর্তের স্ফুলিঙ্গ কিংবা অভিজ্ঞতার দ্যূতি থেকে গল্প জন্ম নেয়।
অন্যদিকে ঔপন্যাসিকের স্বাধীনতা অপরিসীম। উপন্যাসের বিস্তৃত পরিসরে জীবনের সামগ্রিক রূপকে ফুটিয়ে তোলা সহজ। তদুপরি এক্ষেত্রে বাঁধাধরা নির্দিষ্ট কোন ছক না থাকায় ঔপন্যাসিকের গতি স্বচ্ছন্দ এবং সহজ ।
৪. ছোটগল্পে থাকে একটিমাত্র প্রতীতি বা বিষয়ের অভিব্যক্তি। বহু বিষয়ের বা বহুতর উপাদানের সমাবেশ এক্ষেত্রে নিষিদ্ধ। কিন্তু উপন্যাসে বহুতর উপাদানের সমাবেশই লক্ষণীয়। ঔপন্যাসিক এইসব বিভিন্ন উপাদানকে একসঙ্গে গ্রথিত করে একটা সামগ্রিক ঐক্য দান করেন। ছোটগল্পের তুলনায় উপন্যাস অনেক জটিল। এখানে বহুতর মানুষ বহুতর অভিজ্ঞতার রংমশাল জ্বালিয়ে পথ চলে এবং ঔপন্যাসিক এই “বহুত্ব'কে আশ্চৰ্য কলানৈপুণ্যে ঐক্য দান করেন। জীবনের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সমাবেশ সত্বেও উপন্যাসে এই বর্ণসংকর মিছিল অসংলগ্ন কয়েকটি অংশে বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একটি সংবদ্ধ রূপে আত্মপ্ৰকাশ করে।


জর্জ এলিঅটের 'সাইলাস মারানার’-এ দেখি কেমন করে একজন মানুষ তার প্রায়-হারানো হৃদয়কে একটি শিশুর অনাবিল স্নিগ্ধ প্রভাবের সান্নিধ্যে এসে ফিরে পেতে পারে, আত্মাকে বিনষ্টির হাত থেকে রক্ষা করতে পারে। এই একই বিষয় নিয়ে ব্রেট হাট তাঁর 'দি লাক অফ রোরিং ক্যাম্প” গল্পটি লিখেছেন । কিন্তু যেহেতু গল্পকারকে ‘ইমপ্রেশনিস্ট’ হতে হবে, সেই কারণেই দেখি ব্রেট হাৰ্ট এখানে চূড়ান্ত পর্বের কাছাকাছি দু’ একটি ঘটনাকে বেছে নিয়ে এবং বাকি  ঘটনার প্রতি ইঙ্গিতে আভাস দিয়ে অতি দ্রুত তাঁর  বক্তব্য বিষয়ে সত্যের প্রত্যয়- নিষ্ঠ ধারণায় পৌঁছেছেন ।


৫. ছোটগল্পের স্বল্প পরিসরে জীবনের ব্যাপ্তিকে প্ৰকাশ করা সম্ভব নয়। এর ফলে চরিত্রচিত্রণও পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না। চরিত্রের শুধুমাত্র একটি বিশেষ দিক বা প্রবণতা উদঘাটিত হয়। কিন্তু উপন্যাসের বিস্তারই পূর্ণাঙ্গ চরিত্রচিত্রণের সহায়ক । ফলে চরিত্রচিত্রণ উপন্যাসে যত ব্যাপক, ছোটগল্পে তার সুযোগ ততই সীমিত। ছোটগল্পে একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে একটি চরিত্রের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যতটুকু প্ৰকাশ ঘটতে পারে গল্পকার তাই আমাদের দেখান। উপন্যাসে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত দেখানো হয় চরিত্রের বিবর্তন, আর ছোটগল্পে চুড়ান্ত পর্যায়ে একটি চরিত্রকে যে অবস্থায় পাওয়া যায় তারই চিত্র উপস্থাপন l


৬. ছোটগল্পে প্লট থাকে একটিই । কিন্তু উপন্যাসে প্রধান প্লট ছাড়াও আরও এক বা একাধিক প্লট প্রধান প্লটের সমান্তরালে চলতে পারে কিংবা প্রধান প্লটের বৈপরিত্যকে আরো স্পষ্ট করে তুলতে পারে। এইসব অপ্রধান প্লটের এক বা একাধিক চরিত্র আবার প্রধান প্লটে ও অংশগ্রহণ করতে পারে এবং এভাবে প্রধান প্লটের সঙ্গে অন্যান্য প্লটের ঐক্যবদ্ধ যোগসূত্র স্থাপনে সাহায্য করে।


৭. উপন্যাস ও ছোটগল্পে উৎসের ঐক্য, ঘটনার ঐক্য, এবং ভাবের ঐক্য লক্ষ্য করি । কিন্তু ছোটগল্প ও উপন্যাসের মধ্যে এখানে যথেষ্ট পার্থক্য আছে। ছোটগল্পে বিষয়বাহুল্য নেই। একটিমাত্র বিষয়েই গল্পকার নিবব্ধ-দৃষ্টি এবং এই একটিমাত্র বক্তব্য বিষয়কে তিনি সম্পূর্ণ গল্পের ভিতর দিয়ে যুক্তিপূর্ণ উপসংহারে প্রতিষ্ঠিত করতে চান । অর্জুনের লক্ষ্যভেদের মত গল্পকারের লক্ষ্যও এখানে প্রয়োগপদ্ধতির নির্ভুল রূপায়ণে স্থির, অচঞ্চল । সকল শ্রেষ্ঠ গল্পেই ঐক্যের এই অনিবাৰ্যতা লক্ষ করা যায়। কিন্তু উপন্যাসের ক্ষেত্রে এত বিভিন্ন উপাদান এক-সঙ্গে গ্রথিত করা চলে যে অনেক সময় সেখানে প্রধান কেন্দ্রীয় ঐক্যের সুরকে সহজে ধরাই যায় না, বিশেষত বিশ্লেষণান্তে যখন কখনো কখনো সুস্পষ্টরূপে দুই বা ততোধিক আকর্ষণীশক্তি ধরা পড়ে। কিন্তু ছোটগল্পে স্থির লক্ষ্যের এ জাতীয়  অসংলগ্নতা দেখা যায় না।

৮. ছোটগল্প যেহেতু আকারে সংক্ষিপ্ত সেজন্য শব্দের মিতব্যয়িতা অবশ্য পালনীয় । উপন্যাসের বিস্তৃত পরিসরে এ জাতীয় শব্দের মিতবায়িতা রক্ষার প্রয়োজন স্বল্প। এছাড়া গল্পকারকে রচনাকালে বর্ণনায় কিংবা অন্য যে কোন আলোচনায় বিস্তারিত বাহুল্য বর্জন করতে হয় । যা কিছু অতিরিক্ত ও অনাবশ্যক মনে হবে, গল্পকারকে তাই  নির্মমভাবে বাদ দিতে হবে, গল্পের পরিপ্রেক্ষিতটুকুকে সযত্নে রক্ষা করতে হবে, গল্পের ক্ৰম-অগ্রসরমান ধাপগুলোকে যথোপযুক্ত মূল্য ও গুরুত্ব দিতে হবে, এবং বিচ্ছিন্ন অংশগুলোকে অতি সতর্কতার সঙ্গে সমগ্র গল্পের মূল বিষয় ও সুরের মধ্যে মিলিয়ে দিতে হবে। উপন্যাসে  একাধিক কাহিনীর বিস্তারে এবং বিরুদ্ধভাবের সম্মিলনে অনেক অনাবশ্যকও সহজে স্থান করে নেয়।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন