শুক্রবার, ১০ মার্চ, ২০১৭

রুমা মোদক'এর গল্প : হরিপদ কেরানীর মেটামরফসিস

বিষয়ের গুরুত্ব বুঝে খুব দ্রুত টাইপ করে দেয়ার পর প্রথমবার চিঠিখানা সংশোধনের জন্য এলে তার মেরুদণ্ডী প্রাণী হবার সাধটির পরিপূর্ণতা পাবার প্রক্রিয়ার দিকে আগায়। এ সাধ তার বহুকালের। তার মানে হরিপদ কেরানীর। তার নামটা অবশ্য হরিপদ না হয়ে রসরাজও হতে পারতো, এবং যথারীতি ফেসবুক সম্পর্কে তার কোনো ধ্যান-ধারণা, জ্ঞান-গম্যি নাও থাকতে পারতো। কেননা, সে বড় হয়েছে অল্পশিক্ষিত অশিক্ষিত শুদ্র পাড়ায় একঘর পুরোহিত ব্রাহ্মণ হিসেবে। পূর্বপুরুষদের কৃত রীতি অনুযায়ী শুদ্ররা তাদের থাকার জায়গাটুকু দিয়েছে তিথি লগ্নে লক্ষ্মী পুজো সরস্বতী পুজো করে দেয়ার স্বার্থে।

সঙ্গ দোষে লোহা জলে ভাসার মতো বড় ভাই গুরুপদ খুব বেশিদূর যেতে না পারলেও কষ্টেসৃষ্টে কলেজ পর্যন্ত পৌঁছেছিল। এবং নিজের এবং ফেসবুক ব্যবহার দুটোর কোনোটিতেই তার কোন হাত ছিল না। বড় ভাইয়ের জন্মের পর নবদ্বীপ থেকে আগত গোঁসাই তার নামকরণ করেছিলেন গুরুপদ, আর সেই নামকরণের সাথে মিলিয়ে বাপ তার নাম রাখলেন হরিপদ। ভাগ্যক্রমে কেরানীর চাকরিটা পাবার পর বংশপদবী চক্রবর্তীটা হারিয়ে ‘হরিপদ কেরানী’ নামটাই তার চিরস্থায়ী হয়ে গেলো। শুদ্রপাড়ায় এখন তাদের বাড়িটা সবাই হরিপদ কেরানীর বাড়ি নামেই চেনে। আর চাকরির সুবাদে পাশের ডেস্কে বসা অকাল বিধবা মোসাম্মৎ তাহেরা বেগম, যে কিনা মেডিকেলে পড়া একমাত্র মেয়ের কল্যাণে ফেসবুক সম্পর্কে মোটামুটি বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠেছে, তার কারণে রসরাজের মতো ফেসবুক সম্পর্কেও সে অজ্ঞও থাকতে পারলো না। ই-ফাইলিং প্রজেক্ট চালু হবার পর পুরো অফিসটাই যখন ওয়াইফাই জোন হয়ে গেল, তখন তাহেরা তাকে একটা ফেসবুক একাউন্ট খুলে দিল। চিঠিপত্র টাইপের ফাঁকে ফাঁকে টাইমলাইনে ঢুঁ মারে সে, ভালোই লাগে এই নতুন বন্ধুত্বের দুনিয়া। চেনা-অচেনা হাজারখানেক বন্ধু, কত রং-ঢং এর ছবি, স্ট্যাটাস, খবর। কোনটায় লাইক দাও বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে, কোনটায় সরো, কোনোটায় ওয়াও। এগুলো অবশ্য তাহেরাকে শিখাতে হয়নি। নিজে নিজেই শিখে নিয়েছে হরিপদ। খুঁজতে খুঁজতে একদিন পঁচিশ বছর আগে দেশ ছেড়ে যাওয়া রামকৃষ্ণ কাকার ছেলে অনিলকে পেয়ে উত্তেজনা আর আবেগে চিৎকার করতে ইচ্ছে করে তার। কিন্তু যত্রতত্র আনন্দ কিংবা বিষাদে চিৎকার করতেও মেরুদণ্ড লাগে। 

বিকাল পাঁচটায় অফিস খালি হয়ে যাবার মূহুর্তে এ ডি সি স্যার চিঠি ধরিয়ে দিলে ভয়ে সেঁদিয়ে বিনাবাক্যে চিঠি টাইপ করে যাওয়া কেরানী সে। দিনমান টাইপের ফাঁকে দু একবার ফেসবুকে ঢুঁ মারার সময় নগন্য এমএলএসদের ছায়া দেখলেই তাড়াতাড়ি ফেসবুক থেকে বের হয়ে মনোযোগের সাথে কী বোর্ডে আঙুল চালিয়ে টাইপ করা চিঠির মার্জিন, দাড়ি, কমা, সেমিকোলন ঠিক করতে থাকা কেরানী সে। 

তাহেরা কিন্তু সব উপেক্ষা করে দিব্যি নির্বিকার ভঙ্গিতে মেয়ের সেলফিতে “মাই সুইটি পাই” কমেন্ট লিখে আর হরিপদ কেরানীকে টিপ্পনি কাটে- বুঝছেন হরিপদদা ১২ জোড়া রিভস আর ৩১ খান ভার্টিবা, মেরুদণ্ডখান শক্ত হইতে সবগুলো শক্ত হওন লাগে। মেয়ের কাছ থেকে মেরুদণ্ডের ইতিহাস জেনে এসেছে সে হরিপদ কেরানীকে জানানোর জন্য। সেদিন, যেদিন হরিপদ কেরানীর সামনে সারাদিন স্যার স্যার বলতে বলতে গদগদ হওয়া নাইট গার্ড আবদাল তাকে শুনিয়ে শুনিয়ে পাশের রুমে ঝাড়ুদার শ্রীমাধবরে গালাগালি করছিল-- শালা মালাউনের বাইচ্চা, ডেইলি কামে না আসলে অফিস কী তর বাপে ঝাড়ু দিব? আর না শোনার ভান করে হরিপদ কেরানী দিব্যি আঙুল চালিয়ে যাচ্ছিল কী বোর্ডে, তখন তাহেরা ক্রুদ্ধ হয়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে আবদালকে তিন ধমক দিয়ে বিদায় করে ক্ষোভে থমথমে গলায় বলেছিল হরিপদ কেরানীকে-- হরিপদদা আপনের কী জন্ম থিক্কাই মেরুদণ্ডখান নাইগো দাদা? দীর্ঘদিন পাশাপাশি ডেস্কে বসার কারণে হরিপদ কেরানী বুঝে, তাহেরা তার এই অমেরুদণ্ডী ভীতু কেঁচো স্বভাব সত্ত্বেও তাকে খুব মায়া করে। ভীষণ রকম চায় সে হরিপদ কেরানীর মেরুদণ্ডখান সোজা হোক। তাহেরার খোঁচাখুঁচিতেই মনে পড়ে, জীবনে কতোবার মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর প্রয়োজন ছিল তার। কিন্তু পারেনি। 

দ্বিতীয়বারের মতো চিঠিখানা ফেরত এলে তার মেরুদণ্ডী প্রাণী হবার প্রক্রিয়া প্রবলতর হয়। দৃষ্টি তার ফেসবুকের টাইমলাইনে ছিল। নাসিরনগরের পোড়া ভিটে, বিধ্বস্ত ভগ্নস্তুপ মাটিতে লুটিয়ে থাকা বিপর্যন্ত নারীদের ছবি......। দ্রুত চোখ সরিয়ে ফাইলটা ওপেন করে পুনরায় লাল কালি চিহ্নিত অংশটুকুর স্পেস কমিয়ে ‘নিয়ন্ত্রীত’ বানানে ‘হ্রস্ব ইকার’ বসিয়ে পুনরায় প্রিন্ট আউট করে এম এল এস এস হালিমের হাতে দেয়। 

ফেসবুকে নাসিরনগরের জেলেপাড়া নয় যেনো নিজেরাই শুদ্রপাড়ার বিধ্বস্ত করুন মানুষগুলোর ছায়া তাকে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করতে থাকে, পুনরায় ফেসবুকে ঢোকার জন্য সে উঁকি মেরে তাকিয়ে থাকে দরজার বাইরে যতোক্ষণ পর্যন্ত না হালিমের ছায়ার শেষ চিহ্নটুকু মুছে যায়। অথচ পাশের ডেস্কে তাহেরা একমনে ফেসবুক গুতাচ্ছে। চার পাঁচটা ড্রাফট জমে গেছে সামনে। কখন সে টাইপ করবে কে জানে? নিজে সে কাজ ফেলে বসে তো থাকতেই পারে না, কাজ সেরেও নিঃসংকোচে ফেসবুকে ঢুকতে পারে না। কাজের প্রতি তার এই নিষ্ঠতা দেখেই সবাই আরো বেশি করে ক্ষেপায় তাকে হরিপদ কেরানী। কবিতাটি সে পড়েছিল চাকরিটা পাবার পর-পরই। আর কবিতাটিতে নামের সাথে নিজের জীবনের সামান্য মিল আবিষ্কার করে চমৎকৃতও হয়েছিল ভীষণ। নিজের একটা শক্ত মেরুদণ্ডের প্রয়োজনটাও বোধ করেছিল। 

সেদিন প্রথম, যেদিন বাপের জজমানের কন্যা শুদ্র সমাজের গীতাকে বউ করে ঘরে উঠানো নিয়ে তোলপাড় যুদ্ধ হয়েছিল গুরুপদের সাথে বাপ মায়ের। সামনে দুটো রাস্তা খোলা ছিল তার। ভাইয়ের পক্ষ নিয়ে বাপ-মাকে বউ তুলতে বাধ্য করা, অথবা গুরুপদের বিরোধিতা করে বাপ-মাকে সামাজিক সংকট থেকে বাঁচিয়ে দেয়া, একটা নিপাট সত্য বলে দিলেই দ্বিতীয় কাজটা সম্পন্ন হয়ে যেতো। কেনো না, সে নিজে যেমন জানে গুরুপদও তো জানে দিনের পর দিন যে সব প্রেমপত্র লিখে গুরুপদ গীতাকে পটিয়েছে সবকটা হরিপদর লেখা। কল্পনায় গীতাকে রেখে তার সৌন্দর্য-দেহবল্লরী নিয়ে কাব্য করে প্রেমপত্র লিখেছে কী আর প্রেমে হাবুডুবু না খেয়ে আর সেই গীতা কিনা চিঠি লেনদেনের উন্মাদ প্রেমে গুরুপদর হাত ধরে ঘর পালিয়েছে। একবার বলে দিলেই হয়, সব গড়বড় হয়ে যায়। কিন্তু পারেনি। মেরুদণ্ড সোজা আর শক্ত করে কিছুই বলা হয়নি সেদিন, নির্বিকার দর্শক সেজে পরিস্থিতি আবলোকন করেছে আর তীব্রভাবে নিজের মেরুদণ্ডহীনতাটা টের পেয়েছে। “ঘরেতে এলো না সে তো মনে তার নিত্য আসা যাওয়া”। টাইমলাইনে ‘আমি মালাউন’ প্রোফাইল পিকচারের সারি, ‘নাসিরনগরে পুনরায় অগ্নিসংযোগ’ ইত্যাদি হৃদয় ছিঁড়ে খাওয়া স্ট্যাটাসের স্রোতে তলিয়ে যেতে যেতে আর ‘সরো’ বাটন টিপতে টিপতে মুখস্থ করা কবিতার লাইনটি মনে পড়ে হাসি পায় হরিপদ কেরানীর। লুকাতে না পারা সে মুচকি হাসির রেখা দেখে ক্ষেপে উঠে তাহেরা-- হরিপদ দা এই বর্বরতার ছবি দেইখ্যা আপনের হাসি আইতাছে? সাধে কী আর আপনেরে........। 

তাহেরার কথা শেষ হয় না। এম এল এস এস হালিম পুনরায় আসে। হাতে আরো গুটিকয় লালদাগ সমেত চিঠিখানা দেখে এবার হরিপদ কেরানীর শক্ত মেরুদণ্ডে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়াটি তরান্বিত হয়। আপোষময় জীবনে সবক্ষেত্রে না হোক কিছু কিছু ক্ষেত্রে যে মেরুদণ্ড শক্ত না করতে পারলে আজীবন গ্লানির দায় বয়ে বেড়াতে হয়, বোধটা দৃঢ় হতে থাকে নিজের ভিতরে। কম্পিউটার স্ক্রিনে ফাইল ওপেন করে আবার লাল কালি চিহ্নিত অংশে ‘সেমিকোলন’টা বসায় হরিপদ কেরানী। ‘উপর্যুক্ত’ বানানে বাদ পড়ে যাওয়া ‘রেফ’ চিহ্নটা বসিয়ে পুনরায় প্রিন্ট আউট দিয়ে এম এল এস এস হালিমকে ডাকে। হালিম চিঠিখানা নিয়ে পুনরায় এ ডি এম এর কক্ষের দিকে দৌঁড়ালে তাহেরা ফুঁসে উঠে-- শোনেন হরিপদদা আবার নিয়া আইলে মুখের উপর কইয়া দিবেন, পারতাম না। পারবেন না? আপনে না পারলে আমারে কইয়েন। ক্ষোভের ফোঁস ফোঁস থামেনা তাহেরার। কেনো পারবে না? এবার পারতেই হবে তাকে। মেরুদণ্ড শক্ত করার প্রক্রিয়াটিকে সংহত করে সে। এবার বলতেই হবে, অনেক হয়েছে আর না। এখন কী এই চিঠির দাড়ি, কমা সেমিকোলন পাঁচবার সংশোধন করার কথা, যেখানে সংখ্যাগুরুদের উত্তপ্ত সাম্প্রদায়িক লাভার উদগীরণে যে কোনো সময় চাপা পড়ার আশঙ্কায় অসহায় সংখ্যালঘুরা? তাহেরা বলতে থাকে-- গিয়া দেহেন, ব্যাটা নিজেও ভিত্রে ভিত্রে চাইতাছে মন্দিরগুলা ভাংগুক, পাড়াত আগুন লাগুক, হিন্দুগুলা মাইর খাওক। এইবার যদি আপনে আবার চিঠিখান সংশোধন কইরা সময় নষ্ট করেন তো ঘর থেইক্যা আপনেরে বাইর কইরা দিমু কইয়া রাখলাম। 

না এবার পারতেই হবে। মেরুদন্ড শক্ত করে বলতেই হবে এখন সময় নষ্ট করার সময় নয়। ভাবে বটে, আজীবন বয়ে বেড়ানো মেরুদণ্ডহীন জানটা ধুকফুক করে। এত সহজ কি একদিনে একটা শক্ত মেরুদণ্ড গজিয়ে ফেলা যায়? আবদাল তো সত্যি সত্যি এ ডি এম স্যারকে জানিয়ে দেবে। এ ডি এম স্যারের খরখরে গলার ধমক পেটের নাড়িভুড়ি সুদ্ধু কাঁপিয়ে দেয়, যে খায়নি সে এর ভয়াবহতা বুঝবে না। হরিপদ কেরানীর তো কাপড়-চোপড় নষ্ট হবার মতো অবস্থা হয়। পরিস্থিতির পূর্বানুমানে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে তার মেরুদণ্ড শক্ত হবার প্রক্রিয়া। ধুর যা হবার হবে। যতোবার হালিম সংশোধনের জন্য নিয়ে আসবে ততোবার তো তাকে সংশোধন করে দিতেই হবে। এটা তার দায়িত্ব। কথাটা মিনমিন করে তাহেরাকে বলে সমর্থন আদায় করতে চায় সে-- শোনেন তাহেরা আপা ড্রাফট শুদ্ধ কইরা লেখাতো আমারই দায়িত্ব। তাহেরা যেন উৎ পেতে ছিল। শোনামাত্র মুখ ঝামটা মেরে উঠে-- আমি জানতাম আপনে পারবেন না, ড্রাফট শুদ্ধ কইরা লেখা আপনের দায়িত্ব, আর এত্তোগুলা জানমাল রক্ষা করা এদের দায়িত্ব না? হরিপদ কেরানী চুপ করে যায়। 

কতো দায়িত্বই সে জীবনে পালন করতে পারেনি মেরুদণ্ডের অভাবে। মেয়েকে উত্যক্ত করে বলে বউ যেদিন পাড়া মাথায় তুলে পাশের ভাড়াটিয়া সামাদ মিয়ার ছেলেটাকে অপমান করলো আর এক মাসের নোটিসে পাড়াছাড়া করলো, সেদিন তার দায়িত্ব ছিল বলা যে, ছেলেটার দোষ নাই। তার মেয়েটাই রোজ টিউশনিতে যাবার পথে ছেলেটার গায়ে পানি না হলে চা ছুড়ে মারে। চ্যানেল আই এ রেজওয়ানা বন্যার গান শুনতে শুনতে প্রায়ই লক্ষ করে সে। কিন্তু কথাটি বলতে পারেনি। মেয়েটাকে শাসন করাও দায়িত্ব ছিল তার। তাও পারেনি। আসলে নীতি ঠিক রেখে দায়িত্ব পালন করতেও শক্ত মেরুদন্ড লাগে। কেবল এই কেরানীর দায়িত্ব পালন করতেই মেরুদণ্ড লাগেনা। 

যে শুদ্র পাড়ায় ব্রাহ্মণ ছেলের বাড়তি খাতিরে বড় হয়েছে সে, ফেসবুকে টাইমলাইন জুড়ে সেই শুদ্র পাড়ারই ছবি যেনো। একই টিনের বেড়া, মাটির চুলা, সস্তা কাপ-প্লেট সাজনো আম কাঠের শোকেস, দেবী দুর্গার বিধ্বস্ত ক্যালেন্ডার, লন্ডভণ্ড পাড়ায় লুটিয়ে পড়া নারীগুলো, লেপটানো সিঁদুর, ময়লা শাখা, সব নিয়ে একেবারে মিনতি কাকিমা আর সুনীতি জ্যাঠিমার মতো। ফেসবুকে ছবিগুলো, তাহেরার আক্রমণ, পুনঃপুনঃ সংশোধনের জন্য আসা চিঠি হরিপদ কেরানীকে ভীষণ অস্থির করে তোলে। সব রাগ গিয়ে পড়ে ওই ফেসবুকের উপর। শালা এই ফেসবুকে একাউন্ট না থাকলে কি এই অস্থিরতা আজ পীড়া দিতো তাকে! দিব্যি হরিপদ কেরানী হয়েই নির্বিবাদ জীবন কাটিয়ে দিতে পারতো। 

পরক্ষণেই ভিতরে একটা আলোড়ন টের পায় সে, যদিও সে কাফকার মেটামরফসিস পড়েনি, তবু সে নিজের ভিতর রূপান্তর প্রক্রিয়াটা টের পেতে থাকে। রসরাজ ফেসবুক কী জানেই না, তাই বলে বেঁচে গেছে নাকি? সে কেন ভাবছে সেও বেঁচে যেতো? হরিপদ কেরানীর মেরুদণ্ডটা ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে উঠতে থাকে। ডি এম বরাবর ম্যাজিস্ট্রেট চেয়ে পুলিশ সুপার চিঠি পাঠিয়েছে সকাল নয়টায়, ডি এম এ ডি এমকে ফরোয়ার্ড করেছে সকাল সাড়ে নয়টায়। এখন ঘড়িতে প্রায় বারোটা। এর মাঝে চিঠি সংশোধন হয়েছে চারবার। রজরাজের ছবি পোস্ট করার প্রতিবাদে ডাকা প্রতিবাদি মিছিলের আতঙ্কে দম বন্ধ অবস্থা আশেপাশের হিন্দু গ্রামগুলোর। এখনই ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের চিঠিতে স্বাক্ষর হয়নি ডি এমের। ঠিক তখন হালিম আবার সামনে আসে-- স্যার এইবারই শেষ। হরিপদ কেরানী চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়, টের পায় তার মেরুদণ্ড শক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া শেষ। মোটেই আর নড়বড় করছে না। পুনরায় লাল কালি চিহ্নিত অংশটুকু সংশোধন করার দায়িত্বটা পালন করতে করতে দেখতে পায় রোষে ঘর থেকে বের হয়ে যাচ্ছে তাহেরা। এবার আর হালিমের হাতে দেয়না সে চিঠিখানা। নিজেই রওনা হয় এ ডি এম স্যারের কক্ষমুখী। তার মেরুদণ্ড সোজা অনমনীয়। পথে ডি এম স্যারের কক্ষে তাহেরাকে দেখে মেরুদণ্ড তার অধিকতর দৃঢ় হয়। এ ডি এমের সামনে চায়ের কাপ থেকে ঝুলে আছে ‘লিপটন’ লেখা সুতোয় বাঁধা কাগজ। লাল রক্তের মতো দুধহীন চা থেকে নির্গত গরম ধোয়া উর্দ্ধমুখী। এ ডি এম স্যারের মুখের দিকে তাকিয়ে মেরুদণ্ডের সুদৃঢ় শক্তিটা পুনরায় টের পায় সে, সে শক্তি চেহারায় প্রতিফলিত হয়ে এতোকালের চেনা হরিপদ কেরানীকে সম্পূর্ণ অচেনা করে তুলে এ ডি এম স্যারের কাছে। তাকে ভ্যাবাচ্যাকা খাইয়ে চিঠিখানা টেবিলে ছুড়ে মারে হরিপদ কেরানী-- আর কয়টা নাসিরনগর ম্যাসাকার হইলে চিঠিখান সংশোধন শেষ হইবো স্যার? ততক্ষণে ডি এম স্যারকে নিয়ে তাহেরা এসে দাঁড়ায় কক্ষের দরজায়।

1 টি মন্তব্য:

  1. অসাধারণ বোললে কম বলা হয়। ঘুম ছুটে গেল আমার। এবার চা বানিয়ে পড়া শুরু করব আপনার পরের গল্প।

    উত্তরমুছুন