শুক্রবার, ১০ মার্চ, ২০১৭

লীনা দিলরুবা'র গদ্য : সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের ডায়েরি

কোনো এক বিখ্যাত লেখক বলেছিলেন, তুমি তোমার জীবনটাকে এমনভাবে যাপন করো যেন তোমার ডায়েরি লুকোতে না হয়। একটা বয়স পর্যন্ত এ-কথাটিকে খুব দামী মনে হতো ; এখন, যখন, সবকিছু স্পষ্ট দেখতে পাই, বুঝতে আর অনেককিছুই ঠিকঠাকভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে পারি, তখন কথাটিকে হালকা মনে হয়। এমন কী কোনো ছক রয়েছে যেখানে লেখা রয়েছে জীবনযাপনের যাবতীয় প্রণালী?
জীবনের এমন কোন স্কেল রয়েছে, যে মাত্রায় শুলে-খেলে-পরলে জীবনকে যথাযথ বলা যাবে? কোন কর্তৃপক্ষ আমাকে সার্টিফিকেট দেবে, হ্যাঁ, তুমি তোমার জীবনটাকে সুন্দর যাপন করেছ- এই নাও পুরস্কার। তার প্রযোজনইবা কী? আসলে 'বিবেক' নামের গুপ্তশিক্ষক সারাক্ষণ ঘাড়ের কাছে জাইল্যা বেত নিয়ে বসে থাকে বলেই যা অকর্তব্য তা আমরা করি না। আর কিছু নয়। সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় তাঁর ৩১ বছরের ডায়েরি রেখে ধরাধাম ত্যাগ করেন। সেই ডায়েরি পড়ার অভিজ্ঞতা নিয়েই লিখতে বসা।

আমার বাবাও ডায়েরি লিখেন। তিনিও লেখক। তাঁর লেখা ডায়েরিও আমি পড়েছি (অনুমতি নিয়ে)। সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে এই দুই জায়গায় তাঁর মিল রয়েছে; অমিলের জায়গা হল, সন্দিপন চট্টোপাধ্যায় ডায়েরি লিখতে আড়াল নেননি, আমার পিতা শতভাগই নিয়েছেন। তাই ঠিক একই সময়ের; সন্দীপনের জন্ম ১৯৩৩ আমার পিতার ১৯৩৯, দু’জন লেখকের (দাবী করবোনা আমার পিতা বড় কোন লেখক, তবে আমার কাছে তিনি বড়’ই) ডায়েরি ঠিক দু'রকম। সন্দীপনের ডায়েরি নিয়ে লিখতে বসে পিতার প্রসঙ্গ টানার কারণ একটিই, আমার পিতা ব্যক্তিগত জীবন পুরোটিই আড়াল করে ডায়েরি লিখেছেন। আর তাই তাঁর ডায়েরি পড়ে কেবল একটি রেফারেন্স বই এর উপকারই পাই, তাতে মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির ইতিহাস ঝালাই হয় বটে, সন্দীপনের মতো জীবনের গূঢ় অর্থ বুঝতে সাহায্য করতে এবং তার নির্লিপ্ত মূল্যায়ণ করতে একটি তৃতীয় চক্ষুর জন্ম আমার হয় না।

সাহিত্যে ভারতের বঙ্কিম পুরস্কার এবং আকাদেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় গল্প লিখেছেন ৭০টি, উপন্যাস ২১টি এবং লিখেছেন অসংখ্য প্রবন্ধ-নিবন্ধ। একইসাথে লিখে রেখে গেছেন রোজনামচা, যেটি তাঁর মৃত্যর পর বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে। নাম -'সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের ডায়েরি।' বই এর ব্যাক কভারে লেখা হয়েছে-

'দুঃসাহসী, অকপট, আনপ্রেডিক্টেবল। যা মনে করেছেন তাই লিখেছেন। গোটা বাংলা লেখালেখির জগৎকে ফালাফালা করেছেন। এমনকি বাদ যায়নি নিজেও। শুধু বিতর্কিত নয়, একই সঙ্গে গভীর, মননশীল, বুদ্ধিদীপ্ত। এই আনসেনসেরড ও আনএডিটেড সন্দীপন গুছিয়ে দেওয়া হল টীকাটিপ্পনীসহ।'

ডায়েরি বলতে নিছক দিনযাপন আর রোজকার যেসব গল্প আমরা পড়ি তার অতিরিক্ত অনেক বিষয় সন্দীপন লিখে রেখে গেছেন। 

ডায়েরিতে এক জায়গায় সন্দীপন লিখেছেন- 'একদিন মেট্টোয় গিরিশ পার্কে নেমে সাইসাই সেন্ট্রাল এভিন্যুতে দাঁড়িয়ে ভাবছি, ডানদিকে গেলে আজকাল, বা দিকে সোনাগাছি, কোথায় যাবো?'

এরকম কিছু টুকরো টুকরো এন্ট্রি--
আমি ব্যর্থ! ১) যৌন জীবনে। এটা ধ্বংস করা হয়েছে। এবং করতে দিয়েছি চোখের সামনে। আজ পুনরুজ্জীবনের আশা নেই-সুযোগ এলেও। 
২) কেরিয়ার তৈরির ব্যাপারে। সম্পূর্ণ ব্যর্থ। কারণ এ সম্পর্কে প্রলব্ধ শিক্ষা ছিল না যে কীভাবে করতে হয়- যেভাবে করতে দেখলুম অনেককে। সবচেয়ে সহজ ছিল কিন্তু এই ব্যাপারটাই। আমার পক্ষে। ৩) লেখক হিসেবে। এটা অবশ্য নিজেই পন্ড করেছি… নিজেকে কিছু দিতে পারি নি-লেখককে কেন দেব?


সন্দীপন কেমন যেন হেলাফেলায় তাঁর ডায়েরি লিখেছেন। অথচ পড়তে গেলে অসামান্য যত্ন চোখে পড়ে।

'২১ ডিসেম্বর ১৯৯৩' এন্ট্রি- 'ঘুম থেকে উঠে ক্লান্ত লাগে এত। মিকি মাউসের কার্টুনে মিকির ওপর দিয়ে একটা রোলার চলে গেছে যেন। কাগজ হয়ে গেছি। ফুলে-ফেঁপে আবার মাউস হই। কী হল আমার?'


তারিখ নেই, ১) বলো, কখন, ২) কাল শেষ দিন, ৩) এসো, বমি করি।

১১ মার্চ ২০০০'র এন্ট্রিতে রয়েছে- 'গল্পলেখকের দায়বদ্ধতা হল গল্পের ক্ষতস্থানটি ব্যান্ডেজ খুলে পাঠককে দেখানো। একই দায়বদ্ধতা কবির। চিত্রশিল্পীর। এবং গায়কের।'


সন্দীপন চলে গেছেন ২০০৫ এ। তাঁর ডায়েরির প্রথমপাতা ১৯৭১ এর আগস্ট। ১৯৭৪ সালে তিনি লিখেছেন- 
'প্রতিদিন ভোরে বেঁচে আছি দেখে অবাক হই।' সমগ্র ডায়েরির কোথাও কোথাও এভাবে মৃত্যুচিন্তা এসেছে, এসেছে হেলাফেলায়, এসেছে ভয়ে এবং দুশ্চিন্তায়।

সন্দীপনের ডায়েরির আরেকটি দিক, তিনি গল্প-উপন্যাসের খসড়া ডায়েরিতে লিখে রাখতেন। গল্পের প্লট কিংবা চরিত্র নিয়ে ছোট ছোট অনেক এন্ট্রি রয়েছে। কোনো একদিন হয়ত বৃষ্টি নিয়ে ভেবেছিলেন। বৃষ্টি থেমে যাবার পরে কী হয়, সেটি ভেবে তিনি যে দৃশ্যটি কল্পনা করেছিলেন সেটি এরকম-


"নিশ্চল রিক্সার ওপর ওৎপেতে সরু ও জ্যান্ত চোখ মুখ থেকে মুখ সরিয়ে সওয়ারি খুঁজছে কিশোর বালক।"

কিছু দার্শনিক উক্তি মনে রাখার মত-
১) ঘুম মানুষের অচেতন নগ্নতা, সচেতন নগ্নতা হল, যখন ডাক্তার দেখে। বিশেষত গায়নোকোলোজিস্ট।
২) আনন্দ একটা জটিল আবেগ, শোকও তাই।
৩) আবেগসমূহের মধ্যে ভয়, আহ্লাদ, ক্রোধ এগুলোর মধ্যে জটিলতা নেই। এগুলো সরল প্রকৃতির।
৪) শুধু মানুষ মরণশীল নয় তা তো নয়- সম্পর্কও মরণশীল।
৫) আমি ভালোবাসায় বিশ্বাস করি। যেখানে ভালোবাসা নেই, আমি সেই অবস্থান স্বীকার করি না।
৬) লেখক কোন অভিজ্ঞতার ভিতরে থেকে লিখতে পারে না। সে বেরিয়ে আসে অভিজ্ঞতা থেকে বা অভিজ্ঞতাই তাকে অভিজ্ঞতার বাইরে ঠেলে দেয়।
৭) বড় হবার পর প্রত্যেক মানুষের অধিকার আছে পরের দেওয়া নাম গ্রহন অথবা বর্জন করে নিজে নাম রাখার। এ তার মৌলিক অধিকার।
৮) জীবনে বাংলা ডিক্সনারি দেখিনি। খুলিনি। শ্রেষ্ঠ বাংলা ভাষা জানি। জীবনে একটা নারী নেই। শ্রেষ্ঠ যৌনমনা। একটা কলম পেলাম না যার মন আছে।
৯) এখন বেলচার মত কলমের পেছনটা ধরে ঠেলছি। হ্যাঁ, এটা কোদালই। কলম নয় কিছুতেই।


সন্দীপন সমালোচনায় ছিলেন জোরালো। অকপট। ডায়েরিতে লিখেছেন-
"সে অনেক দিন হল ঋত্বিক ঘটক বলেছিল, গান্ধিজী একটি আদ্যন্ত শুয়োরের বাচ্চা।" 

"প্রতি বিদেশপ্রত্যাগতর পর অনুরূপ একটি নাউন বসে এবং তা হল- খচ্চর।" 

আরেক জায়গায় লিখেছেন, "আমাদের মধ্যে হঠকারি ছিল শক্তি আর শ্যামল" (শক্তি চট্টোপাধ্যায় আর শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়!)।

সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯৩৩ এর অক্টোবরে, এবং মৃত্যু ২০০৫ এর ডিসেম্বরে। ডায়েরি লেখা আরম্ভ করেছিলেন ১৯৭১ এর অগাস্ট-এ এবং এর শেষ, ২০০৫-এর ডিসেম্বরে। মাঝে কিছুটা বিরতি দিয়ে একত্রিশ বছর ধরে তিনি ডায়েরি লিখেছেন। পাঠক হয়ে 'সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের ডায়েরি'র ৩১ টি বছরের সঙ্গে যখন ভ্রমণ করছিলাম, ভিষণ আমুদে, চঞ্চল, বেহিসেবি, তুখোড় রসিক, মেধাবী, সংবেদনশীল একজন মানুষের জীবনের অনেকখানি জানতে জানতে ২০০৪-২০০৫-এ ক্যান্সার আক্রান্ত সন্দীপনের জন্য গভীর কষ্টবোধ হচ্ছিল। আস্তে আস্তে মৃত্যু এগিয়ে আসছে। রে দিচ্ছেন, অপারেশন হচ্ছে, টিউমার কাটছে... ২০০৫-এর ৬ ডিসেম্বর ডায়েরির সর্বশেষ এন্ট্রি লিখেছেন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়। আমরা জানি, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন ২০০৫ এর ১২ ডিসেম্বর !


সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের ডাইরির পিডিএফ লিঙ্ক



লেখক পরিচিতি

লীনা দিলরুবা 
জন্ম সাল: ১৪ ডিসেম্বর।  জন্মস্থান: ফেনী। 
শিক্ষা: মাস্টার্স(অর্থনীতি), এমবিএ(ফিন্যান্স) 
পেশা: চাকুরী। একটা ফাইন্যান্সিয়াল ইন্সটিটিউট এ প্ল্যানিং এন্ড রিসার্চ এর হেড।

২টি মন্তব্য:

  1. ভালো লেগেছে। সন্দীপন চট্রোপাধ্যায় সম্পর্কে অনেক কিছু জানলাম। ধন্যবাদ

    উত্তরমুছুন
  2. অজানাকে জানা হল।
    ধন্যবাদ।

    উত্তরমুছুন