শুক্রবার, ১০ মার্চ, ২০১৭

বিশ্বদীপ চক্রবর্তী'র গল্প : জাপানি সাহেবের মনুমেন্ট

ইয়াসুকি ইওকোনো আমাদের আর পাঁচটা হিরোকো তাকাহাসি নয়।

হিরোকো তাকাহাসিদের আমরা দেখেছি। তাদের দিকে তাকিয়ে অনেক সময়েই অকারনে হেসেছি। আমরা তাদের শহীদ মিনারের সামনে সুদৃশ্য জাপানি ছাতা মাথায় গভীর মনোযোগের সাথে গাইডের বুকনি শুনতে শুনতে সোনি হ্যান্ডিক্যামে রেকর্ড করতে দেখে বাসের জানালা থেকে ফুট কেটেছি। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের দক্ষিন গেট দিয়ে লাইন করে ইউইনা সাতোদের সাথে ঢুকতে দেখে মনে মনে নিশ্চিত জেনেছি যে উত্তর গেট দিয়ে ঠিক পঁচিশ মিনিট বাদে দক্ষিণেশ্বর যাবার জন্য সেই দলটা বেরিয়ে আসবে লাইন একটুও না টসকে।

কিন্তু ইয়াসুকি ইওকোনোকে আমরা সেইভাবে দেখার সুযোগ পাইনি। কারণ ভিক্টোরিয়ার বদলে ইওকোনো সান তার ক্যামেরা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন ভাটকুড়ায়। যেটা নেহাতই সাধারন একটা মফস্বল শহর। যেটা বর্ধমানে হতে পারত, মেদিনিপুরে হলেও পিনকোড ছাড়া কোন ফারাক পড়ত না। কিন্তু অধুনা এটি উত্তর চব্বিশ পরগনার অংশ। ইওকোনো সান টোকিয়ো ইউনিভার্সিটিতে বাংলা শিক্ষা সমাপ্ত করে, নিজের বাংলার উৎকর্ষতা যাচাই করতে করতে বাংলার অভ্যন্তরে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। বাংলায় দিগগজ হওয়া ছাড়াও অখ্যাত প্রাচীন মন্দির, মিনার , স্তূপ খুঁজে বেড়ানো তার একটা নেশা বলা যায়। এই বিষয়ে একটা বই লিখবেন বলে সুপ্রকাশ সান্যালকে তার সুপ্ত বাসনা ব্যাক্তও করেছেন বার দুয়েক। সান্যাল মশাই ইওকোনো সানের বাংলার গাইড। টোকিয়ো ইউনিভার্সিটিতে ছমাসের জন্য বাংলা পড়াতে গেছিলেন এবং ইওকোনো সানের সাথে টোকিয়ো টাওয়ার, আকিয়াবারা সব ঘুরেছেন। এবং তৈরীও ছিলেন ইওকোনো সানকে নিয়ে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, দক্ষিণেশ্বর ইত্যাদি ঘুরিয়ে দেখানোর জন্য। কিন্তু ভাটকুড়ায় আসতে হবে বলে ভাবেন নি। 

আসলে ভাটকুড়া আসাটা নেহাতই কাকতালীয় ছিল। যাচ্ছিলেন টাকি, ইওকোনো সানের চাপে পড়ে ট্যুরিস্ট গাইডের বাইরের একটা অন্তত জায়গা দেখাতে। টাকি ওনার সাবেক বাড়িও বটে। কিন্তু ট্রেন ভাটকুড়ায় পৌছুতে সুপ্রকাশের এত জোর এক নম্বর পেয়ে গেল, যে নামতেই হল। এর জন্য দায়ী আসলে তার বড় শ্যালক, কারণ তার আগেরদিন জোড়া ইলিশ নিয়ে দিদির হাতে ইলিশ পাতুরি খাবো বায়না ধরে তার বাড়িতে উপস্থিত হয়ে না পড়লে রাতের খাওয়াটা অত বেশি হত না। সুপ্রকাশকেও ভাটকুড়ায় এমারজেন্সী ল্যান্ড করে ইওকোনো সানকে প্ল্যাটফর্ম চত্তব্রে ছেড়ে তীরের বেগে শৌচালয়ে ছুটতে হত না।

যতই বাংলা ভাষা শিখুক, ইওকোনো পুরোদস্তুর জাপানী। সময়ের অপব্যায় কখনই করবে না। তাই নিজের জাপানী থেকে বাংলা সহজ অভিধানটি হাতে বাগিয়ে প্ল্যাটফর্মের চায়ের দোকানে উপস্থিত হলেন। এবং সবিনয়ে নিবেদন করলেন, সুপ্রভাত মহাশয়, আপনাদের নিকট পুরাতন মন্দির, স্তূপ অথবা মিনার আছে কি?

নন্দু এক্সপ্রেস স্পীডে ডাবল হাফ ঢালছিল। একটু চলকে গেল। দেখল সামনে মাথায় টুপি, পরনে ঢোলা জিন্স, সাদা টি শার্ট, ধূসরিত কেডস আর কিট ব্যাগ হাতে কুড়ি থেকে পঞ্চাশ বয়সের মধ্যে যা কিছু হতে পারে এমন এক ব্যাক্তি। সেই প্রদেশের লোকেদের মত দেখতে যারা নন্দুর কাছে সাধারনভাবে চিঙ্কি বলে পরিচিত। তাই তাচ্ছিল্যের সাথে ভেঙ্গিয়ে বলল, আমাদের নিকট নতুন চা, লেড়ো বিস্কুট আরে ল্যাবেঞ্চুস আছে। 

ইওকোনো বুঝতে পারলেন তার কিছু প্র্য়োগজনিত ভুল হয়েছে। তাই আবার বিনয়ের সঙ্গে নিবেদন করলেন, মহাশয়, ভাটকুড়ার নিকট পুরাতন মন্দির, স্তূপ অথবা মিনার আছে কি?

সৌভাগ্যবশত এক বয়স্ক ভদ্রলোক চা খাচ্ছিলেন। চায়ে সুড়ুত করে চুমুক মেরে বললেন, এটাতো ছোট জায়গা, সেরকম বড় কিছু পাবেন না।

ক্ষুদ্র বা বৃহত নিয়ে আমি পরিশ্রান্ত নই। পুরাতন হলেই ভাল হয়।

একটা মনুমেন্ট আছে জানেন, দেখেতো মনে হয় অনেকদিনের। মানিকস্তম্ভ না কি যেন নাম। বলো না গো তোমরা, বলে পাশের লোকটিকে ঠোনা মারলেন।

পাশের হাফ পাঞ্জাবি অবজ্ঞাভরে বললেন, ও সেইটা? বেশী দূরে নয়। প্রাইমারী স্কুলের ধার ঘেঁষে বেরিয়ে গেলে ঝিলের ধারে। গিয়ে দেখতে পারেন। পায়রার বাহ্যি আর নোংরার রাজ্যি! দেখার সাধ হলে যেতেই পারেন। তবে আগে থেকেই বলে দিচ্ছি বড় কিছু নয়। 

নন্দু এবার নাক বাড়াল, চিনতে না পারলে বলবেন নুলো ফনীর আখড়া। 

আনন্দে গদগদ হয়ে ইওকোনো সান বাংলা ভুলে দুবার গোজাইমাসু গোজাইমাসু বলে ফেললেন। এর মধ্যে সুপ্রকাশ ফেরত এসে গেছেন। কর্ম সমাপ্তির পরে একটা লজ্জা ঘিরে ধরেছিল তাকে। যতই হোক তার বিদেশী ছাত্র। কিন্তু ইওকোনো সান সেসব উড়িয়ে দিলেন। কারণ টুরিস্ট গাইডের বাইরের যে কোন মনুমেন্ট দেখাই তার কাছে উপরি পাওনা। এক নম্বর না পেলে সেই সুযোগ কি ভাবে হত? 

এরপর দুই পরিব্রাজক ভাটকুড়ার পথে পথে ঘুরতে লাগলেন। দেখা গেল মানিকস্তম্ভ বললে কেউ চেনে না, কিন্তু নুলো ফনীর আখড়া বলতে এক ডাকে সাড়া দিল। একটা রিক্সা নিয়ে গরমে ঘামতে ঘামতে ভাঙ্গাচোড়া রাস্তা ধরে ওরা এগিয়ে গেলেন। সুপ্রকাশ রিক্সাওলাকে জিজ্ঞেস করলেন, আরে ভাই, নুলো ফনীটা কে? ওর আখরাই বা বলে কেন?

আজ্ঞে, বোমায় হাত উড়িয়ে নাম নুলো ফনী। একসময়ে এ অঞ্চলের তেরাস ছিল বাবু। রিক্সায় প্যাডেল মারতে মারতে হাফায় লোকটা। সন্ধ্যে হলে ওর ভিতরে মদ আর জুয়া চালাত। ওর সঙ্গীসাথী মনুমেন্টের মাথায় বন্দুক নিয়ে পাহারা দিত। সেই থেকে নাম নুলো ফনীর আখড়া।

সুপ্রকাশ বিষম খেলেন। একি জায়গায় নিয়ে চললে হে। বেঘোরে মরব নাকি? টোকিও টাওয়ারের প্রতিদানে এত বড় আত্মত্যাগে মন সায় দিচ্ছিল না।

সে আর কোথায় বাবু, মরে হেজে গেছে এই হল গিয়ে বছর দশেক। নামটাই যা র‍য়ে গেছে। 

ইওকোনো সান এসব কথায় কান দেন নি। তিনি কি অপূর্ব,কি অদ্ভুত এসব গুঞ্জন করতে করতে এই অগোছালো মফস্বলটিকে হ্যান্ডিক্যামে ছবিবন্দী করছিলেন।

পৌঁছে অবশ্য দেখা গেল জায়গাটা বেশ। আশাটা খুব কমের দিকে ধরা থাকলে অতটা আপসোস হয় না। রাস্তার পাশে ঝিলের ধারে এক চিলতে তেকোনো জমির উপর দোতলা সমান উঁচু একটা স্তম্ভ। দশ বাই দশের একটা বেসের উপর ধাপে ধাপে সরু হয়ে উঠে গেছে। এককালে রং সাদা ছিল বোঝা যায়। জায়গায় জায়গায় চুন বালি খসে পড়েছে, ফাটল দিয়ে গাছের চারা মাথা তুলেছে। খোপে খোপে পায়রা বাসা করেছে। দেওয়াল লিখনের চাপান উতোরও আছে। ঠিক যেমনটি আশা করা যায়। 

কিন্তু ঝিলের ধারে একলা দাঁড়িয়ে থাকা স্তম্ভের চারপাশে অসংখ্য গোলা পায়রার বকবকম আর ডানা ঝাপ্টানিতে পরিবেশটা মনোরম, সেটা স্বীকার করতেই হবে। সুপ্রকাশও এতটা আশা করেননি। ইওকোনো বলা বাহুল্য অভিভুত। খরগোশের মত ছুটে ছুটে বিভিন্ন ভঙ্গিতে ছবি তুলতে থাকলেন। লাফালাফি করে চারদিক থেকে দেখতে লাগলেন যদি কোথাও কিছু লেখা থাকে। বোঝা গেল একটা সাদা পাথরের ট্যাবলেটে কিছু লেখা ছিল এককালে, কিন্তু এখন তা ভেঙ্গে চুড়ে কিছুই আর পড়া যায় না। সিমেন্টের দেওয়ালের ছুরি দিয়ে হরেন + সাথী এরকম কিছু লেখা আছে যেটা দেখে ইওকোনো উল্লসিত হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সুপ্রকাশ দৃঢ়ভাবে নস্যাৎ করে দিয়েছেন। তাতে খুব যে দমাতে পেরেছেন সেটাও নয়। ইওকোনো প্রবল উতসাহে পুরো জায়গাটাকে বারংবার চসে ফেলছিলেন।

তবু এই পর্যন্ত ঠিক ছিল। অনেক হল,এইবার যাওয়া যাক ভাব করে সুপ্রকাশ হাতের ঘড়ি দেখছিলেন ঘনঘন। কিভাবে যেন একটু অন্যমনস্ক হয়েছিলেন, হঠাত দেখেন ইওকোনো কোথাও নেই। না ডাইনে , না বাঁয়ে। ভয়ের একটা শিরশিরানি নিয়ে ঝিলের দিকে দৌড়ালেন। চিন্তায় সুপ্রকাশের আবার এক নম্বর এসে গেছিল প্রায়, হঠাত শুনলেন উপর থেকে আওয়াজ ভেসে আসছে , সুপ্রকাশ সান, সুপ্রকাশ সান, এই দিকে দৃষ্টিপাত করুন। শব্দ অনুসরণ করে দেখা গেল শশক প্রবর স্তম্ভের মাথায় চড়ে অ্যালেকজান্ডারের জয়দৃপ্ত ভঙ্গিমায় তার দিকেই হাত নাড়ছেন। 

ইওকোনো সান , নেমে আসুন, যাওয়া যাক এবার। সুপ্রকাশ হাঁক পাড়লেন নিচে থেকে।

এত শীঘ্র প্রত্যাবর্তন? এত অবাক বোধহয় ইওকোনো কোনদিন হন নি। হাঁফাতে হাঁফাতে নেমে এলেন যদিও। সুপ্রকাশ সান, আমাকে তো স্তম্ভের ইতিহাস সম্বন্ধে জ্ঞানলাভ করতে হবে।

অসংখ্য পায়রা ও একটি ছাড়া গরু বাদে ধারে কাছে কাউকে দেখা যাচ্ছিল না। জ্ঞান লাভের কোন সমূহ সম্ভাবনা সুপ্রকাশ দেখলেন না। তবুও সেদিন স্তম্ভদ্বার থেকে ইওকনোকে নিয়ে আসাটা মাতৃক্রোড় থেকে শিশু ছিনিয়ে আনার থেকে কিছু কম কষ্টের হয়নি।

সেদিন প্রত্যাবর্তন করলেও ইওকোনো কিছু কম নাছোড়বান্দা নন। বুঝে গেছিলেন সুপ্রকাশকে নিয়ে খুব সুবিধা হবে না। তাই পরদিন ভোর হতেই ইওকনো একাই ভাটকুড়ার পথ ধরেছিলেন। জাপানি গোঁ একেই বলে।

তখনও খুব সকাল। পরিবেশ বড়ই মনোরম। দেখে আনন্দে ইওকোনো সানের দুচোখের পাশে চারটে করে ভাঁজ পড়ল। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা ইওকনো খোঁজ খবর করার লোক পেয়ে গেলেন। পুটু ভিখারী।

সব জীবনেরই উদ্দেশ্য থাকে। ইওকোনোর যদি উদ্দেশ্য হয় অখ্যাত মিনার ও স্তম্ভাদিকে পরিচয়ের আলোয় নিয়ে আসা, পুটু ভিখারীর জীবন কেন্দ্রীভুত হয়েছে ভাটকুড়ার স্তম্ভকে ঘিরে সমবেত গোলা পায়রাদের খাদ্য বিতরণে। রোজ সকাল সাতটা না বাজতে কেজি খানেক রেশনের চাল বগলদাবা করে পুটু হাজির হয়ে যায়। তারপর শুরু হয় পায়রাদের খাওয়ানো। গুররর , গুররর করতে করতে ভাটকুড়ার যত পায়রা আছে সব বোধহয় জড়ো হয়ে যায় এই সময়ে। পায়রারা খায় আর সে এক কি আনন্দ পুটুর শরীরে গুবগুবিয়ে ওঠে। পুটুকে যদি জিজ্ঞেস করেন, হ্যাঁ রে পুটু, তুই নিজে খাস পরের মেগে, তোর এহেন বাদশাহী চাল যে পায়রা খাওয়াস?

আজ্ঞে, বাপ পিতামোর আমল থেকে চলে আসছে, এতো কুষ্মান্ড তো হই নি, যে বন্ধ করে দেবো। 

ভাগ্যিস ইওকোনোকে এই ভঙ্গীতে বলে নি, কারণ তাহলে কুষ্মান্ডের প্রয়োগ নিয়ে বেচারা ধন্দে পড়ে যেতো। অনেক দিনের ট্র্যাডিশন বুঝতে পেরে উনি অবশ্যই ইতিহাসের গন্ধ পেলেন। পুটু জাপানি সাহেবকে বিশদ করে, আজ্ঞে, এই যে জমিদার মানিকচাঁদ, এত বড় জমিদার। তার পুষ্যি ছিল বেবুশ্যেরা , ঢালতেন টাকা তাদের খাওয়া পড়ায়। তার যে ছিল নায়েব নধরচাঁদ , তার ভক্তি ছিল দেব দ্বিজে। উনি করাতেন ব্রাম্ভন ভোজন। আর আমার যে ঠাকুদ্দার ঠাকুদ্দা, উনি ছিলেন আস্তাবলের সহিস। কিন্তু ভালবাসতেন পায়রা। তাই ঘোড়ার খাওয়া থেকে চুরি করে পায়রাদের খাওয়াতেন। আর খাওয়াতেন কোথায় ? এই কবুতরখানায়। হ্যাঁ, আজ্ঞে। মানিকচাঁদ তো এই মনুমেন্টো করে তার পেয়ারের সুখীরানীর মরণে। কিন্তু পায়রা খাওয়াতে খাওয়াতে এই জায়গাটার নামই হয়ে গেছিল সাতুরামের কবুতরখানা। সাতুরাম আমার পিত্তি পিতামোর নাম আজ্ঞে। ওই যে শুরু হয়েছিল না সাহেব, সেটাই এখনও চলছে। দোষের মধ্যে আমার পিত্তিপুরুষ ঝেঁপে খাওয়াত, আমি মেগে খাওয়াই। জাপানি সাহেব, আমাদের বংশে পায়রা তাই বড় ভক্তি মানে গো, আমাদের কুলদেবী। বলতে বলতে পুটু ভিখারির হাত কপালে ঠেকে,চোখ চকচক করে ওঠে, বুক হাফরের মত লাফাতে থাকে। 

পুটুর সাথে ঘুরে ঘুরে পায়রাদের চাল খাওয়াতে খাওয়াতে ইওকোনো এক অদ্ভুত সুখ পাচ্ছিলেন। পায়রারা পুটুর সারা গায়ে মাথায় অবলীলায় উঠে পড়ে, কোন ভয়ডর নেই। পুটুকে এই সময় দেখতে লাগে এক চলমান পায়রা ঘর। পায়রাদের মত পুটুও বকবক করে যাচ্ছিল। পায়রা খাওয়ানোর কি কম হ্যাপা। কোন ভাল কম্মোটি করতে যাও, পোঙ্গায় কাঠি দেওয়ার লোকের তো অভাব নেই। এই যে এখানের কাউঞ্ছিলার, কম পাঙ্গা করেছে? 

পুটুর সাথে থেকে থেকে ইওকোনোর বাংলা ভোকাবুলারি বেশ অন্য একটা ডাইমেনশান পাচ্ছিল, যেটা সুপ্রকাশ সান্যাল শিখিয়ে উঠতে পারেন নি। ইওকোনো যদিও পুটুর সব কথা ভাল করে বুঝতে পারেন না। কিন্তু যেটুকু আয়ত্তে আনতে পারেন সেই সম্বল নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, যে এই স্তম্ভ সৃষ্টি করেছেন সেই মানিকচাঁদের আপনি পরিচিত? 

সাহেবের মুখে আপনি শুনে বিগলিত হতে গিয়েও আঁতকে ওঠে পুটু । না, না সাহেব সেটা কি করে হবে। উনি তো কোন যুগে মরে হেজে গেছেন, মানে হল আজ্ঞে পরলোক গেছেন। তবে মানিকচাদের কথা জানতে চেলে আপনি জগেন মাস্টারকে গিয়ে ধরো, ও খুব ইসবের খোঁজ রাখে। 

ইওকোনো আরেক খবরীর সন্ধান পেয়ে উদ্দীপ্ত হয়ে উঠলেন। 

পায়রাদের খাওয়া হয়ে এসেছে, এরকম সময়ে হল এক বৃদ্ধার আবির্ভাব। হাতে ঝাঁটা আর জলের বালতি। এসেই কোনদিকে না তাকিয়ে হুঁশ হুঁশ আওয়াজের সাথে জায়গাটায় জল ছড়াতে শুরু করে দিল । পায়রাদের তখন খাওয়া প্রায় শেষ। গুটি কতক ঘুর ঘুর করছিল বটে, তবে বেশিরভাগই ডানা ঝাঁপটে হাওয়া। বুড়ির কোনদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই, নিজের মনে বিড়বিড় করতে করতে ছপাং ছপাং করে জল ছড়িয়ে, ঝপাং ঝপাং করে ঝাঁটা চালাতে লাগল। 

ইওকোনো দুহাত জড়ো করে তাকে নিবেদন করলেন, আপনি কে মা? 

কোন উত্তর নেই।

উনি কারুর সাথে কথা বলেন না সাহেব, তবে রোজ সকাল সন্ধ্যা জায়গাটাকে ঝাটপাট করে তকতকে করে রাখেন। পুটু ইওকোনোর কানের কাছে হাত জড়ো করে। ওনার ছেলে এখানেই শহীদ হলেন কিনা। তারকনাথ, উনার ছেলে গো, নকশাল ছিলেন তো। পুলিশের তাড়া খেয়ে এখানে এইসে হুপুত খেয়ে পড়েছিল আজ্ঞে, কি রক্তারক্তি কাণ্ড সিসব। বুড়ি তারপর থেকে রোজ দুবেলা আসে এখানে ঝাঁট দিতে। পায়রায় যত খায় হাগে মোতে, উনি সব সাফা করে যান। না হলে ওই কাউঞ্ছিলার আমারে পায়রা খাওয়াতে কি দিত আর? 

পুটু আর ইওকোনোর কথাবার্তায় অদ্ভুত ব্যাপার এটাই হচ্ছিল যে কেউই কারুকে সম্পূর্ণ বুঝে উঠতে পারছিলেন না। যদিও ইওকোনো সব নোট করে নিচ্ছিলেন বাধ্য ছাত্রের মত। তবে যদি কোনদিন তার সেই বই প্রকাশ হয়, কি তথ্য সেখানে সংগৃহীত হবে, হলফ করে বলা মুশকিল। ইওকোনো এবার জিজ্ঞেস করলেন, আপনাদের ভাটকুড়ার ঐতিহাসিকের সহিত সংযোগ কিরূপে সম্ভব? 

আন্দাজে আন্দাজে গল্প বলা এক জিনিস আর প্রশ্নের উত্তর দেওয়া আরেক। তাই এবার পুটু রাস্তার দিকে তাকিয়ে হাঁক দিল, ও ভোলাদা, উনি সমসকৃতে কি জিজ্ঞেস করছেন , একটু বুঝিয়ে দেও না গো।

জাপানি সাহেবকে দেখে ভোলাবাবু সম্মানের সাথে সাইকেল থেকে নেমে এগিয়ে এলেন। সব বুঝে শুনে গণেশ রিক্সাওলার দায়িত্বে ছেড়ে দেওয়া হল তাকে। ও তাকে নিয়ে যাবে জগেন মাস্টারের কাছে।

গণেশ, কুড়ি টাকার বেশি এক পয়সা নিবি না, ঠকালে ভাটকুড়ার অসম্মান হবে। ভোলাদা শাসিয়ে রাখে। তারপর আবার ফেরত আনবি এখানেই।

যোগেন্দ্রনাথের সাথে ইওকোনোর খুব পটে গেল। স্কুলের চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর ভাটকুড়ার ইতিহাস লেখাটাই জগেন মাস্টারের জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য। যদিও কেউই সেটা নিয়ে পাত্তা দেয় না। আজ জলজ্যান্ত এক সাহেবকে পেয়ে, হোন না কেন জাপানি, তার আনন্দ ফুলকে ফুলকে বেরোতে থাকল।

এই জায়গার পূর্বতন নাম ভট্টক্রীড়া। তবে বুঝলেন কিনা এখানকার ভট্ট বংশের জমিদার মানিকচাঁদের একমাত্র ক্রীড়া ছিল ওই নারী ঘটিত। ইওকোনোর কথা ভেবে যতদূর সম্ভব সাধু শব্দের প্রয়োগ চালিয়ে যান জগেন মাস্টার। শাস্ত্রে বড়লোকের নারীদোষ নিষিদ্ধ নেই। বরং নিজ গৃহে রাত্রিবাস করলেই অপমানকর ছিল সেটা।বুঝলেন তো। কিন্তু মানিকচাঁদের মত আর কেউ বোধহয় প্রাতরাশ থেকে রাসলীলা শুরু করত না। তবে দিনের বেলা যাই করুন , রাত্রি হলে উনি সুখীরানীকে ছাড়া আর কারো কক্ষে ভিড়তেন না। বুঝলেন কিনা, এত টান ছিল সুখীরানীর জন্য। সেই পেয়ারের সুখীর মৃত্যুতে মৃয়মান হয়েই ওই স্তম্ভ বানালেন মানিকচাঁদ। নাম দিলেন সুখীনীড়। 

ইওকোনো অভিভূত। আহা, এই স্থান তাজমহল হইতে কম কিসে?

তবে বুঝলেন কিনা একটা ফারাক আছে। শাহজাহান জেলখানার জানালা থেকে তাজ মহল দেখতেন। মানিকচাঁদ রোজ সন্ধ্যা হলে ওই স্তম্ভের পাদকক্ষের জানালা থেকে মদ্যপান করতে করতে বাইরের পৃথিবী দেখতেন। লোকে বলে রাত্রি বেলা সুখীর আত্মা নাকি ওই ঘরে ঘুরঘুর করত। একদিন রাতে মানিকচাঁদও ওইখানেই দেহ রাখলেন। তারপর থেকেই বুঝলেন কিনা ওই মনুমেন্টের নাম হয়ে গেল মানিকস্তম্ভ। সুখীনীড়ের কথা লোকে ভুলেই গেল। 

এইরকম প্রভূত খবর সংগ্রহ করে ইওকোনো যখন আবার স্তম্ভের কাছে ফিরলেন, সেখানে তখন মেলা লোক। ভোলা, গণেশ আর পুটু ভিখারীর দৌলতে নুলো ফনীর আখড়ায় আসা এই জাপানি সাহেবের খবর তখন ভাটকুড়ার সব মানুষের মুখে মুখে। 

ইওকোনো বুঝতে পারেন নি, তার উপস্থিতিই এই জনসমাগমের কারণ। তিনি নিজের শশোকোচিত পদক্ষেপে স্তম্ভের দিকে এগোচ্ছিলেন, এমন সময়ে এক ভদ্রলোক ধেয়ে এলেন। পরনে খদ্দরের পাঞ্জাবি, চোস্তা, বয়স বছর পঞ্চাশ কিন্তু বেশ টগবগে চেহারার, বলশালী। 

নমস্কার স্যার, আমার নাম চঞ্চল পুরোহিত, এলাকার কাউন্সিলার। 

সুপ্রভাত মহাশয়, আপনার সাথে পরিচিত হয়ে ধন্য হলাম। আমার নিকট কোন প্রয়োজন?

শুনলাম আপনি নাকি এই মনুমেন্টের ইতিহাস লিখছেন। আপনি ভাটকুড়ার অতিথি, আপনাকে স্বাগত জানান তো আমার কর্তব্য। বলে পাশের চেলাদের দিকে কটাক্ষ হানলেন, তারাও নিমেষে চঞ্চল বাবুর ফাটা রেকর্ড হয়ে গেল। 

চঞ্চল পুরোহিত এবার পুজার নৈবেদ্যটি পেশ করলেন। তাছাড়া স্বাধীনতা আন্দোলনে এই এলাকার অবদানের সাথে এই মনুমেন্টের যে কি আন্তরিক যোগাযোগ , ভাবলাম সেটাও আপনাকে জানিয়ে দিই।

ইওকোনো তার মনুমেন্ট দর্শনে এমন বিঘ্নে নেহাতই বিচলিত বোধ করছিলেন, কিন্তু চঞ্চলবাবুর এই কথায় তেতে উঠে খাতা বাগিয়ে এগিয়ে এলেন। ইহা কি ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনেরও স্মারক?

হ্যাঁ, হ্যাঁ ঠিক বলেছেন। গান্ধীজি যখন ভারত ছাড়োর ডাক দিলেন এই স্তম্ভের পাদদেশে দাঁড়িয়ে ভাটকুড়ার মানুষ শপথ নিয়েছিল করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে , কিন্তু ব্রিটিশ তোমাকে ভারত ছাড়তে হবে। চঞ্চল বাবু পেশাদারি সাবলীলতায় তার কথাকে সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে বক্তৃতায় বদলে ফেললেন। আপনারা জানেন, কি হয়েছিল সেদিন? পুলিশের ধাক্কায় স্বাধীনতা আন্দোলনের অমর নেতা বিনোদকুমার পুরোহিত চশমা ভেঙ্গে এখানেই লুটিয়ে পড়েছিলেন, সেদিনের ভাটকুড়ার মানুষ এক বাক্যে গর্জে উঠেছিল। সমবেত জনতার নৈবর্তিক ভঙ্গী যে তাকে দমাতে পারল না, তাতেই বোঝা যায় চঞ্চলবাবু পেশাদার রাজনীতিক। কিন্তু আমরা কি সেই হৃদয় নেংড়ানো স্মৃতিকে মনে রেখেছি? আমার ইলেকশানের প্রতিশ্রুতি ছিল , সেই মহান ইতিহাসকে মাথায় রেখে স্তম্ভকে ঘিরে উদ্দ্যান বানানোর। বিনোদ উদ্দ্যান , স্বাধীনতা সংগ্রামী বিনোদ পুরোহিতকে সম্মান জানান হবে, আপনাদের বিনোদনও হবে। লোকে তখন পাঁচকথা বলেছে। অথচ আজ সেই ইতিহাসের খোঁজে জাপান থেকে এত বড় ঐতিহাসিক আমাদের মধ্যে উপস্থিত। এরপর কি বলব আমরা? 

জনগণ ততটা সরব হল না, কিন্তু এক শীর্ণকায় ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন, যদিও তার গলা কিছু নিস্তেজ নয় তা বলে। কিসের ইতিহাস চঞ্চল? ইতিহাস বানানোর চেষ্টা করো না। পুলিশের লাঠিতে তোমার দাদুর চশমা ভেঙ্গেছিল বলে সেটা স্বাধীনতা সংগ্রাম হয়ে গেল। আর এই মাটি যে তারকনাথের রক্তে রাঙ্গালো , সেই ইতিহাস আমরা ভুলে যাবো? বলতে বলতে তার গলার শিরা ফুলে উঠল, কপালের রগ দপদপ করতে লাগল। ইওকোনোর কতটা বোধগম্য হচ্ছিল, বলা মুশকিল। তবে তার চোখের কোনার ভাঁজ বেড়ে গিয়েছিল আর ঘনঘন চোখের পাতা ফেলা দেখে বোঝা যেতে পারে এইসব জ্বালাময়ী ভাষনের মানে উদ্ধার করার জন্য জাপানী কম্পিউটার তার প্রসেসিং স্পীড বেশ বাড়িয়ে দিয়েছে। চারদিকে ‘তারকনাথ তোমায় আমরা ভুলছি না ভুলব না এইসব পরিচিত স্লোগানের সাথে তাল মিলিয়ে তেজস্বীর ভাষণ এগিয়ে চলে, আসল ইতিহাস মানুষের সংগ্রামের ইতিহাস, তার রুজি রুটির সংগ্রাম। এই শহীদ বেদী সেই সংগ্রামের পরিচয়, সেই ইতিহাস বদলানোর চেষ্টা করো না। 

আবহাওয়া গরম সর্ষের তেলের মত বুড়বুড়িয়ে উঠছিল। এমন সময়ে রিক্সা করে এক মহিলার আগমন। কাঁধে শান্তিনিকেতনী ব্যাগ, চওড়া লাল পাড়ের শাড়ি, শরীরে সিংদরজার বিশালতা। স্বভাবতই তার সযত্নে সাধা গলা চঞ্চলকে ছাড়িয়ে গেল। গলা যত চড়া, বচন তত সুললিত। নারীর সম্মান যে সমাজ করে না, তার কোন উন্নতি নেই। এই নারী কখনও মা, কখনও কন্যা, কখনও ভার্যা। আবার কখনও সে পতিতা। গলা দুঃখের খাড়িতে নেমেই আবার এভারেস্টের চুড়ায়। কে তাকে পতিতা করেছে? এই পুরুষ শাষিত সমাজ। মানিকচাঁদকে আমরা অশ্রদ্ধা করতে পারি, কিন্তু নারীকে তিনি বুকে করে রেখেছেন। এই স্তম্ভ তাই শুধু সুখিরানীর জন্য নয়, সমাজে উপেক্ষিত নারীজাতিকে স্থান করে দেওয়ার এক প্রয়াস। অথচ আমরা সেই সুখীনীর নাম মুছে দিয়েছি। কেন, সে নারী বলে? 

এতক্ষণ তেতে ছিল, এইবার যেন দাবানল ছড়িয়ে পড়ল। জাপানী সাহেবকে দেখতে ভেঙ্গে পড়া ভাটকুড়ার জনগণ ত্রিকোণ সমরে সোৎসাহে অংশগ্রহণ করল। 

ভাটকুড়ার ঝিলের ধারের এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি থেকে ইওকোনো সান কিভাবে সেদিন বেরিয়ে এসেছিলেন, সেটা আরেক গল্প। তবে পরে সুপ্রকাশ সান্যালকে ইওকোনো বলেছিলেন, সুপ্রকাশ সান, একই স্তম্ভে কত রূপ। কত পাঙ্গা। আমি ইহাই আহরণ করার প্রচেষ্টা করি।

ইওকোনো পাঙ্গা শব্দটি পুটু ভিখারির কাছ থেকে আহরণ করেছিলেন। 

এই গল্প পড়ে উৎসাহিত হয়ে আপনারা কেউ যদি কখনও এই মনুমেন্ট দেখতে ভাটকুড়ায় যান, আপ প্ল্যাটফর্মে নন্দুর চায়ের দোকানে জিজ্ঞেস করতে পারেন। শুধু তাই কেন? আসলে ভাটকুড়ায় যে কাউকে জিজ্ঞেস করুন, জাপানি সাহেবের মানুমেন্ট কোথায়, সেই দেখিয়ে দেবে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন