শুক্রবার, ১০ মার্চ, ২০১৭

আহমেদ খান হীরক'এর গল্প : নার্গিসের কয়েকটি মৃত্যু

নার্গিসের লাশ হাসপাতালের মাথায় রেখে, কাউকে না ডেকে আমি নিচে নেমে আসি। রাত আড়াইটার গার্ড সরু চোখে তাকালে আমি দু'আঙুলে ধূমপানের ইশারা করি। গার্ড শরীরটা আবার ছেড়ে দেয়। আমি ফুটপাতে সিগারেটের দোকান খুঁজি। নেই। ভ্রাম্যমান কেউও নেই। ঢাকা এখন বদলে গেছে। রাত হলে এখানে এখন গ্রামের কবর নেমে আসে।

বসুন্ধরার দিকে এগোতে থাকি। মেঘ মাখা চাঁদ আছে, কিছুটা বাতাস, ফাঁকা রাস্তা। নার্গিসের লাশ পড়ে আছে হাসপাতালে। বেডে। যেন ঘুমাচ্ছে। আমি সিগারেট খুঁজতে খুঁজতে ভাবি নার্গিস সত্যি মারা গিয়েছে তো?

এমন সন্দেহের যৌক্তিক কারণও তো রয়েছে। এই নিয়ে নার্গিস অন্তত চারবার মারা গেল। বা, নার্গিস আরো তিনবার বেঁচে উঠেছে। মৃত্যু ও জীবন, নার্গিসের জীবনে, রহস্যের মতো হয়ে আছে।


প্রথমবারের ঘটনাটা আমাদের বিয়ের মাস তিনেকের মাথায়। ঈদের ছুটিতে গ্রামে গিয়েছি। নার্গিস প্রথম গ্রামে এসেছে। গ্রামে ঢুকেই সে বলল, কই তোমার পুনর্ভবা?

আমি প্রসঙ্গ এড়িয়ে যেতে চাই। আমার লেখালেখিতে পুনর্ভবা নামটা খুব এসেছে। আমি বলেছি নদীটা আমার শৈশবের মতোই জীবন্ত। কিন্তু আসলে তো তা না। লেখায় মিথ্যা বলতে হয়। অথচ বাস্তবের পুনর্ভবার পাড় ভরাট হয়ে পড়ে আছে। একাধিক ব্রিজের চাপে নদীটা হয়ে গেছে স্রোতহীনও। এই নদীর সামনে গেলে গল্পপাঠের নার্গিসকে হতাশ হতেই হবে। আমি এদিক সেদিক ঘুরি, কিন্তু কোনোভাবেই নার্গিসকে নিয়ে পুনর্ভবার দিকে যাই না। নার্গিস যেতে চাইলেও যাই না। অথচ তৃতীয় সন্ধ্যায় খবর এলো নার্গিস হারিয়ে গেছে। ডুবে গেছে বা ভেসে গেছে পুনর্ভবায়। সম্ভবত মরে গেছে।

আমার উপেক্ষা অগ্রাহ্য করতেই গ্রামের এক ছোট বোনকে নিয়ে সে পুনর্ভবার কাছে গিয়েছিল। নেমেছিল পাথরঘাটে। প্রথমে গোড়ালি পানি। তারপর ফিসফিস করে বলেছিল, ও তো ঠিকই লিখেছে... পুনর্ভবা তো জীবন্ত।


এরপরই নার্গিস ঝাঁপ দিয়েছিল গ্রামের ছোট বোনের নিষেধ উপেক্ষা করে। এবং তারা খুব হেসেছিল। সন্ধ্যার সে হাসি পাড়ের বাড়ির ভেতর থেকেও কেউ কেউ শুনেছিল। মুরব্বিরা বিরক্ত হয়ে বলেছিল, সাঞ্ঝের বেলাতে এমুন বেহুদা হাসে কারা?

নদীতে ঢেউ ছিল না, স্রোত ছিল না, গভীরতা তো ছিলই না; তবু একটা ডুবের পর আর পাওয়া গেল না নার্গিসকে। গ্রামের ছোট বোন চিৎকার করল। ছুটে গিয়ে সবাইকে ডাকল। ল্যাংড়া বাবু তার ডিঙি নামিয়ে দিল, হ্যাজাক আর টর্চের আলোয় পাথরঘাট ভররাত্রে দুপুর হয়ে গেল, কিন্তু নার্গিসকে আর পাওয়া গেল না। ফজরের আজানের কালে সবাই হতোদ্যমের সাথে বুঝতে পারল নার্গিস আর বেঁচে নেই।


তবু পরের দুইটা দিন আমার কেটেছিল পুনর্ভবার সাথে। নৌকা নিয়ে, নদীর পাড়ে হেঁটে, নার্গিসকে অথবা নার্গিসের লাশকে আমি খুঁজে চলেছি। পাই নি। গ্রামের মানুষজন বলতে শুরু করল, লয়া বহু তো, এমন বিবশ হয়া যায় মন! তারে ফের শহরে পাঠাই দাও!

আরো পাঁচ দিন পর আমি নাইটকোচে চেপে বসি।

নার্গিসের বাড়ি বলতে এক দূর সম্পর্কের মামা ছিলেন। নার্গিসের মৃত্যু সংবাদ তাকে স্পর্শ করেছিল কিনা আমি বুঝতে পারি নি। মোবাইল ফোনে খবরটা শোনার পর তিনি শুধু বলেছিলেন, ও আইচ্ছা! এরপর ফোন কেটে দিয়েছিলেন। আমার কাছে মনে হয়েছিল সম্পর্কের যে সরু সুতো ছিল, ওই ফোন কাটার সাথে সাথে, তিনি সেটিকেও কাটতে চেয়েছিলেন। দ্বিতীয়বার তাই তাকে আর ফোন করা হয় নি। নাইট কোচ ভোরবেলা ঢাকায় পৌঁছিয়ে দিলে বাসার ঠিকানা ভুলে যেতে ধরি আমি। চার মাস আগের ওঠা এলাকা বলেই হয়তো এই ভ্রান্তি। আমি নিজের বাসার ঠিকানা অনেকক্ষণ ধরে মিলিয়ে ফ্ল্যাটে পৌঁছালে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে দেখি কাঁথামুড়ি দিয়ে নার্গিস ঘুমিয়ে আছে। আমার করা বিবিধ শব্দে তার ভোরের মিঠে ঘুম ভেঙেছে, সে সরু চোখে বলছে, এখন আসলা?

আমি ক্লান্তি কাটাতে গোসলে যাই আর ভাবি যে আমার কোথাও ভুল হয়ে গেছে। আমার সাথে নার্গিস হয়তো গ্রামে যায় নি। আমি হয়তো তাকে ঢাকাতে রেখেই বেড়াতে গিয়েছিলাম। আর পুনর্ভবার সাথে নার্গিসের একটা দৃশ্য তৈরি করে পুরো সময়টা একটা অদ্ভুত গ্রামযাপন করে এসেছি। এরকম মনে হওয়াতে আমার বেশ একটা শান্তি আর স্বস্তি লাগে। মনে হয় নার্গিস বেঁচে আছে এটাই সবচেয়ে জরুরি কথা এই মুহূর্তের জীবনে। ফলে নার্গিসের বাড়িয়ে দেয়া চা সকালের কাকের সাথে খেতে আরাম আরাম লাগে। মনে হয় জীবনটা ঠিক তিন মাসের মধ্যে আটকে গেছে সুন্দরভাবে।


এরপর একটা লম্বা সময় চলে যায়। নার্গিসের সাথে আমার সংসারটা ধীরে ধীরে ছড়াতে থাকে। এক ঘর থেকে দুই ঘর, দুই ঘর থেকে তিন ঘর...ড্রইং ডাইনিং। ফ্রিজ থেকে সোফা থেকে এসি পর্যন্ত বিস্তারিত হয়ে ওঠে সংসার। নার্গিস অনুযোগ করে গত পাঁচটা বছরে আমরা আর কোথাও গেলাম না! না আমাদের কোনো হানিমুন হলো, না আর কিছু! মানুষের তো বেড়াতে যাওয়াও লাগে, লাগে না?

আমি নিরুত্তর থাকি। কিন্তু আমারও মনে হয় আমাদের কোথাও যাওয়া দরকার। কিন্তু কোথায় গেলে ভালো লাগবে আমরা বুঝতে পারি না। এসময় কেউ একজন নেপালের কথা বলে। ইন্ডিয়া বর্ডার ক্রশ করে নেপাল চলে যাওয়া। প্যাকেজের মধ্যে যাওয়া যাবে। খরচ কম, ঘোরার জায়গা প্রচুর। আমি আমার আর নার্গিসের পাসপোর্ট করানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লে নার্গিস জানায় নেপাল সে যাবে না। সে গ্রামে যেতে চায়। গ্রামে তার কখনো যাওয়া হয় নাই। গ্রাম, যেখানে আমার প্রিয় পুনর্ভবা আছে!

কিন্তু আমার তাতে ভয়।

কিসের ভয় তাও ঠিক স্পষ্ট হয় না। আমি নাইটকোচের দুইটা টিকেট কাটি। কিন্তু নার্গিসকে জানাই না। অথচ দেখি নার্গিস শাড়ি পরে সে রাতে তৈরি হয়ে বসে আছে। আমি নার্গিসকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। পড়তে বাধ্যই হই আসলে। বাস যমুনা ব্রিজে উঠলে নার্গিস তার হাত ব্যাগ থেকে সবুজ রঙা একটা চাদর জড়িয়ে নেয় শরীরে। উত্তরের শীত বাসের ফাঁক-ফোকর দিয়ে ঢুকে পড়ছে বলে নার্গিস আমাকে আরেকটু জড়িয়ে ধরে। ঘন কুয়াশা নেমে আসতে থাকে রাস্তায়। ড্রাইভার হর্ন দিতে দিতে হাইওয়ে পেরোতে থাকে। আর নাটোরের বনপাড়ার রাস্তায় ঢুকতেই বিপরীত দিক থেকে তেড়ে আসা আরেকটা নাইটকোচের সাথে তীব্র ধাক্কা খায়। আমরা কে কোথায় ছিটকে পড়ি, মনে থাকে না। নার্গিসের সবুজ চাদর ধরতে পারি শেষ মুহূর্তে। কিন্তু চাদরটাই থেকে যায় হাতে, নাগালে নার্গিস আসে না।

কুয়াশার ভেতর একটা শুকনো জমির ওপর নিজেকে আবিষ্কার করি। আমার ভ্রুতে লেগে আছে ভোরের শিশির। দূরের কোনো মসজিদ থেকে ফজরের আজান ভেসে আসতে থাকে। একটু পরেই কুকুরের সম্মিলিত ডাকও শোনা যেতে থাকে। আর সেগুলোকে চিরে ভেসে আসতে থাকে অ্যাম্বুলেন্সের আওয়াজ। আমি পুনর্জীবনের মতো উত্থিত হই যেন। ভেসে ভেসে খুঁজতে থাকি নার্গিসকে। আমার গায়ে জড়ানো থাকে সবুজ চাদর। কিন্তু নার্গিসকে আমি খুঁজে পাই না। আমাকে কেউ ধরে অ্যাম্বুলেন্সে উঠিয়ে দেয়। আমি নার্গিসের নাম নেয়ার চেষ্টা করতে থাকি, কিন্তু আমার মুখের ভেতর কোনো কিছু অনুভব করতে পারি না।

নাটোর হাসপাতালে আমার তিন দিন কেটে যায়।

গ্রাম থেকে আত্মীয়-স্বজন চলে আসে। আমাকে দেখতে চায়। কিন্তু কারো সাথে আমার দেখা করতে ভালো লাগে না। আমি নার্গিসের কথা জিজ্ঞেস করতে চাই, পারি না। আমার কাছে মনে হয় নার্গিসের কথা খুব বিশ্বাসযোগ্য মনে হবে না তাদের কাছে। ফলে আমি চতূর্থ রাতে নিজের ফ্ল্যাটে ফিরে আসি। ফ্ল্যাটের দরজা খুলতে খুলতে আমার সন্দেহ হয় নার্গিস হয়তো বাসাতেই আছে। বেডরুমের দরজায় দাঁড়ালেই হয়তো দেখব কাঁথামুড়ি দিয়ে নার্গিস শুয়ে আছে আর আমাকে বলছে, এতক্ষণে আসলা?

কিন্তু বেডরুমে কেউ নেই।

দৈনিকের সংবাদে দেখি আমাদের দুর্ঘটনায় দুই বাস মিলিয়ে তেরো জন মারা গেছে। এর মধ্যে তিন জনের লাশ শনাক্ত হয় নি। আমি লাশ শনাক্তের জন্য যাবো কিনা সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। আমি অযথাই, ঘরের মধ্যে বসে বসে, নার্গিসের অপেক্ষা করতে থাকি।


সেই নার্গিস ফেরে আরো এক বছর পর।

কানাডাতে যে তার আত্মীয় আছে, আর সেই আত্মীয়ের কাছে যাওয়ার জন্য সে অনেক দিন ধরেই চেষ্টা করছিল, আর সে কারণেই যে আমি তার পাসপোর্ট করে দিয়েছিলাম এসব আমি মনে করতে পারি না। কিন্তু আমার মনে হয় এসব মনে করতে যাওয়ারও আসলে কোনো দরকার তো নেই। আসল কথা নার্গিস ফিরে এসেছে। আমি নার্গিসের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারছি। কানাডা থেকে ফেরার পর নার্গিস আরো সুন্দর হয়েছে বলে আমার মনে হতে থাকে। নার্গিস শাড়ি ছেড়ে টপ আর স্কার্ট পরছে এটাও একটা কারণ হতে পারে। তাছাড়া তার চুলেও নতুন ধরনের কাট দেখা যায়। এমনকি তার শরীর থেকে যে ঘ্রাণ আসে তাও আমার বিদেশী লাগে। বিদেশী হওয়ায় নার্গিসকে একটু পরপরও মনে হয়। কিন্তু নার্গিস যে আমারই, নার্গিস তা বারবার বুঝিয়ে দেয়। আমি নার্গিসকে তার সবুজ চাদরটা বের করে দিই। নার্গিস ভ্রু কুচকে জানায় এমন খ্যাতমার্কা রঙের চাদর তার কোনো কালেই ছিল না!

আমি দ্বিধা নিয়ে সবুজ চাদর ধরে বসে থাকি। নার্গিস সেটা আমার হাত থেকে নিয়ে ময়লার ঝুড়িতে ফেলে দেয়। আমার কাছে নার্গিসকে খুব নতুন লাগে।


শেষের দিকে আমরা একটা গাড়ি কিনি। ছোট কার। ছোট হলেও নিজেদের গাড়ি পেয়ে নার্গিস খুব আহ্লাদ করে। সে নিজেই ড্রাইভিং শিখে নেয়। আর মাঝে মাঝেই লং ড্রাইভে চলে যায়। আমার তখন মনে হয় নার্গিস বোধহয় এভাবে যেতে যেতে আর ফিরে আসবে না। নার্গিস কোথাও গেলে আমি আতঙ্ক নিয়ে অপেক্ষা করি। কিন্তু নার্গিস ফিরে আসে। আর এলে আমার খুব ভালো লাগে। মনে হয় আমি বেঁচে আছি। কিন্তু নার্গিসের বোধহয় কোনো সমস্যা হচ্ছিল। সে আমাকে তেমন কিছু না জানিয়েই একদিন ফ্যানের সাথে নিজেকে ঝুলিয়ে দেয়। আর খুব আশ্চর্যজনকভাবে একটা নোট লেখে সে। সেই নোটে লেখা থাকে--আমার মৃত্যুর জন্য লেখক দায়ী।


আমি লেখক ছিলাম বলে খুব ভয় পেয়ে যাই।

হতে পারে সে হয়তো হুমায়ূন আহমেদ পড়ে বা সুনীল পড়ে বা শীর্ষেন্দু পড়ে আত্মহত্যা করেছে। ওগুলো ও খুব পড়ত। আমার লেখা কখনোই পড়ত না। কিন্তু নামোল্লেখ না করাই পুলিশ যে আমাকেই ধরবে এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত হয়ে পড়ি। তাই সিলিঙে ঝুলন্ত নার্গিসকে রেখে আমি পালাই। প্রথম দিকে আমার মনে হয় আমার নেপাল চলে যাওয়া উচিত, কিন্তু আমি আমার পাসপোর্ট খুঁজে পাই না। পরে আমার মনে হয় আমার গ্রামে চলে যাওয়া উচিত। কিন্তু নাইটকোচের টিকেট কাটতে গিয়ে আমার অদ্ভুত ভয় হয়। আমার রাস্তায় ভয় হতে শুরু করে। ঘাড়ের কাছে অনবরত শিরশির অনুভব হতে থাকে। উঁচু কোনো ভবনে উঠলে আমার ভয় বাড়তে থাকে। লিফটে ঢুকলে আমার ভয় তীব্র হয়। আমার মনে হয় নার্গিসের হয়ে পুলিশ চলে আসবে আমার সামনে আর আমাকে ধরে নিয়ে যাবে।


আমি নাম বদলে একটা ছোট ঘরে উঠি।

প্রতি রাতে মনে হয় নার্গিস ফিরে আসবে। আমি জানি ফিরে আসবে। আমি অপেক্ষা করতে থাকি নার্গিস কখন কীভাবে ফিরে আসবে তা দেখার জন্য। কিন্তু আমার অপেক্ষা দীর্ঘ হয়, নার্গিস ফিরে আসে না। কষ্ট হওয়ার বদলে স্বস্তি তৈরি হয় আমার মধ্যে। আমার মনে হয় নার্গিস আমাকে ভুলে গেছে বা আমিই হয়তো নার্গিসকে ভুলে গেছি। আমি আবার অবারিত হয়ে উঠতে পারব বলে আমার বিশ্বাস হতে থাকে। আমি আমার পুরনো ফ্ল্যাটের দিকে গেলে আমার প্রতিবেশী আমাকে দেখে চিনতে পারে না। ফ্ল্যাট মালিক দারোয়ান কেউ চিনতে পারে না। আমার ফ্ল্যাটের ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখি স্বামী-স্ত্রী বসবাস করছে তার ভেতর। যাদের কাউকে আমি চিনি না। তারা বেশ সেজেগুজে কোথাও যেন বেরোচ্ছে। আর আমার যে ছোট গাড়ি সেটায় চেপে হাসতে হাসতে গলে পড়ে চলে যাচ্ছে সিনেমা বা রেস্তরার উদ্দেশ্যে।

কোনো কারণ ছাড়াই আমার ভয় বৃদ্ধি পেতে থাকে। কিন্তু তার ভেতর এও স্বস্তি থাকে যে নার্গিস আর কোথাও নেই। নার্গিসের হয়ে আমার হয়ে অন্য যারা জীবন যাপন করছে তাদের জন্য আমার সুখ হয়। তারা সিনেমায় রেস্তরায় যাচ্ছে দেখে আমার ভালো লাগে। আমার আর নার্গিসের সিনেমায় বা রেস্তরায় যাওয়া হয় নি এতদিনেও। আমাদের আসলে তেমনভাবে কোথাও যাওয়া হয় নি। কিন্তু আমাদের যাওয়া উচিত ছিল। আমাকে আবার ভয় ঘিরে ধরে। মনে হয় এসব আসলে সিনেমার মতোই কিছু একটা। যেটা কিছুক্ষণ পর শেষ হয়ে যাবে। শেষটা কেমন হবে আমি বুঝে উঠতে পারি না।

এরকম সময়ে হাসপাতাল থেকে ফোন আসে আমার কাছে। আমার স্ত্রী নার্গিস জীবন আর মৃত্যুর সাথে লড়ছে। জীবন আর মৃত্যুর সাথে লড়ছে শুনে আমার হাসিও আসে। কিন্তু আমাকে হাসপাতালে যেতে হয়। আর দেখি নার্গিস শুয়ে আছে বিছানায়। তার কোনো গভীর অসুখ হয়েছে বলে মনে হয় চেহারার কষ্টে। কিন্তু মুখে তার এতদিনের স্নিগ্ধ হাসিটা ঠিক আছে আর একই রকমভাবে বলছে, এতক্ষণে আসলা?


আমি নার্গিসের হাত ধরে বসে থাকি। আমার কান্নার মতো আসে। মনে হয় সিনেমাটা ফুরিয়ে যাচ্ছে আর তখন নার্গিস শুধু একটা লম্বা শ্বাস ফেলে। মনে হয় কিছু কথা হয়তো তারও রয়েছে আমার সাথে বলার। আমারও তো কিছু প্রশ্ন ছিল। কিন্তু কোনো প্রশ্ন কোনো কথা কেউ কাউকে বলতে পারি না। এক সময় মনে হয় নার্গিস আর শ্বাস ফেলছে না। আমি নার্গিসের হাতটা নামিয়ে রাখি তার বুকের ওপর। বুঝতে পারি নার্গিস আরেকবারের মতো মারা গেছে। আমার বুকটা ফাঁকা ফাঁকা লাগে। মনে হয় সিনেমাটা শেষ হয়ে যাচ্ছে।

রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে সিগারেট খুঁজতে খুঁজতে আমি বুঝতে পারি চাইলেই সিনেমাটা আমি শেষ না করেও চালিয়ে যেতে পারি। কিন্তু একটা ভালো শেষ সব গল্পেরই থাকা দরকার। অথচ কোথায় শেষ করব বুঝতে পারি না। আমি সিগারেট খুঁজতে থাকি। তখন একজন বলে, কী, সিগারেট পাও নাই?

আমি তাকিয়ে দেখি নার্গিস দাঁড়িয়ে আছে। স্ট্রিট ল্যাম্পের ঘোলা আলোয় তাকে ভিনগ্রহের রূপবতী মনে হচ্ছে। সে আমার দিকে সিগারেট বাড়িয়ে দিয়েছে। 

আমার মনে হতে থাকে গল্পটা এখানে শেষ করলেও মন্দ কিছু হয় না। মনে হয় নার্গিসের গলা শক্ত করে চেপে ধরি আর তাকে রাস্তায় ছুঁড়ে মারি। মেরে ফেলি তাকে। কিন্তু তা না করে নার্গিসের হাত থেকে আমি সিগারেটটা নিই। নার্গিসই লাইটার জ্বালিয়ে দেয়। আমি গল্পটা শেষ করতে চাই... পারি না। আমি সিগারেটে টান দিই। আমি গল্পটা শেষ করতে চাই... পারি না। সিগারেটের ধোঁয়া ফসফস করে ছাড়ি। আমি গল্পটা শেষ করতে চাই... পারি না! আমি গল্পটা শেষ করতে চাই... পারি না।


আমি গল্পটা শেষ করতে চাই... পারি না।

২টি মন্তব্য:

  1. সুরিয়িলিস্টিক। বাসের দুর্ঘটনার বর্ণনটা দারুণ। একবাক্যে বুঝিয়েছেন লেখক। ধাক্কা লাগলো। নার্গিসের সবুজ চাদর ধরতে পারি শেষ মুহুর্তে কিন্তু শুধু চাদরটাই থাকলো। অনেক লিখুন হিরক। শুভ কামনা রইলো।/সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. ধন্যবাদ সাদিয়া আপু। প্রিয় লেখকের প্রশংসায় আনন্দিত, কিছুটা আত্মবিশ্বাসীও হয়ে উঠলাম। / আহমেদ খান হীরক

      মুছুন