শনিবার, ১৫ এপ্রিল, ২০১৭

আইজাক বাশেভিস সিঙ্গারের 'আর্ট অব ফিকশন' সাক্ষাৎকার

সাক্ষাতকারী : হেরল্ড ফ্লেন্ডার
অনুবাদ : এমদাদ রহমান 

আইজাক বাসেভিস সিঙ্গার বাস করেন তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীর সঙ্গে, প্রচুর আলো খেলা করে এরকম এক বিশাল বাড়িতে, আপার ব্রডওয়ে'র পাঁচ কক্ষের এক এপার্টমেন্টে, যেখানে আছে শত শত বই আর এক বিশাল টিভি সেট, পুরনো কেতার আসবাবপত্রের এক শান্ত সমাহিত পরিবেশ, আর আছে একটি টাইপরাইটার, ঈডিশ ভাষার পৃথিবীর শেষ টাইপরাইটার।

সিঙ্গার তাঁর প্রতিদিনের লেখালেখির কাজ করেন তাঁর লিভিং রুমে, ছোট্ট একটা ডেস্ক-এ বসে। এখানে বসে প্রতিদিন তিনি লেখেন, শুধু দিনের বিশেষ কয়েকটি ঘণ্টা বাদ যায়, কারণ এই সময়টুকু তিনি বরাদ্দ করে রেখেছেন সাক্ষাতকারীদের জন্য, কোথাও যাবার জন্য আর প্রয়োজনীয় দূরালাপনের জন্য। সিঙ্গারের নামটি এখনও ম্যানহাটনের টেলিফোন ডাইরেক্টরিতে রয়ে গেছে, আর এরকম দিন তাঁর জীবনে খুব কমই এসেছে যেদিন লেখা পড়ে অচেনা অদেখা পাঠক তাঁকে কল করেনি, তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চায়নি! আর সাম্প্রতিক সময়ে তিনি সেইসব অদ্ভুত পাঠকদেরকে দুপুরের খাবারের নিমন্ত্রণ করেন, না হলে কফি'র জন্য। 

সিঙ্গার তাঁর গল্প আর উপন্যাসগুলি লিখে থাকেন লাইনটানা নোটবুকে, প্রায় অস্পষ্ট টানা হাতে, ঈডিশ ভাষায়। যা কিছু লিখেছেন, তার বেশির ভাগ লেখাই প্রথম প্রকাশিত হয় জুইশ ডেইলি ফরওয়ার্ড-এ, আমেরিকা'র সবচে বড় ঈডিশভাষী দৈনিকটি নিউইয়র্ক সিটি থেকে প্রকাশিত হয়। তাঁর সেই লেখা পরে ইংরেজিতে অনুবাদের ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দেয়, এজন্য তিনি তাঁর অনুবাদকদের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ ভাবে কাজ করেন, প্রতিটি শব্দ বারে বারে অনূদিত হয়ে তাদের মধ্যে চলাফেরা করতে করতে এক সময় চূড়ান্ত রূপ পায়। 

সিঙ্গার সব সময় কালো স্যুট, শাদা শার্ট আর কালো টাই পরেন। তাঁর কণ্ঠস্বর ভরাট, উঁচু কিন্তু তাতে বিনয় আর নম্রতা মাখানো, আর কথা কখনওই চিৎকারে পরিণত হয় না। তিনি উচ্চতায় মাঝারি আর হাল্কা পাতলা গড়নের, অস্বাভাবিক রকমের ফ্যাকাসে গায়ের রঙ। 

বাশেভিস সিঙ্গারের জন্ম পোল্যান্ডে, ওয়ারসো'র এক গ্রামে, ১৯০৪ সালে। বেড়ে উঠেছেন শহরের ঈদিশভাষী ইহুদি পাড়ায়। সবাই মনে করত তিনিও তার বাবার মতো ইহুদি আইনের শিক্ষক হবেন, কিন্তু বিশ বছর বয়সেই সিঙ্গার ধর্ম বিষয়ক জ্ঞানচর্চা বাদ দিয়ে লেখালেখিকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন। তিনি ঈডিশ লিটারারি ম্যাগাজিনে প্রুফ রিডারের কাজ নেন, পুস্তক-পর্যালোচনা করতে শুরু করেন আর প্রকাশ করেন তার গল্পগুলো। ১৯৩৫ সালে পার্শ্ববর্তী জার্মানির নাৎসি আক্রমন যখন ভয়াবহ আকার ধারণ করে, সিঙ্গার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে এক ঈদিসভাষী পত্রিকায় সাংবাদিকতার কাজ নেন। ১৯৪০-এ সিঙ্গার এক জার্মান-ইহুদি উদ্বাস্তু নারীকে বিয়ে করেন। 

যদিও বাশেভিস সিঙ্গারের বেশ কিছু উপন্যাস, শিশুসাহিত্য, স্মৃতিকথা আর প্রবন্ধের বই বেরিয়েছে, তবু গল্পলেখক হিসেবেই তিনি বেশি পরিচিত। 

১৯৭৮ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান এই ঈডিশভাষী লেখক। জীবন শেষ হয় ১৯৯১-এ, ফ্লোরিডায়। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনাগুলি হচ্ছে- 'দ্য মেজিশিয়ান অব লুবলিন, স্নেভ, এনিমি : এ লাভ স্টোরি, দ্য ফ্যামিলি মস্কাট, দ্য পেনিট্যান্টস', দ্য ডেথ অব মেথুসেলা অ্যান্ড আদার স্টোরিজ, শোশা, লাভ এন্ড এক্সাইল, দ্য লাস্ট ডেমোন, দ্য স্পিনোজা অব মার্কেট স্ট্রিট, গিম্পেল দ্য ফুল এন্ড আদার স্টোরিজ, এলোন ইন দি ইস্ট ফরেস্ট, ফ্রেন্ড অব কাফকা। তাঁর জীবনের প্রথম চৌদ্দ বছরের স্মৃতি 'অ্যা ডে অব : প্লেজার স্টোরিজ অব অ্যা বয় গ্রোইং আপ ইন ওয়ারসো।' প্রকাশিত হয় ১৯৬৯ সালে। 


সাক্ষাতকারী :
এমন অনেক লেখক আছেন লেখালেখির শুরুতেই অন্য লেখকদের তারা মডেল হিসেবে ব্যবহার করেন। 

বাসেভিস সিঙ্গার :
হ্যাঁ, তাহলে আমি বলব যে আমার লেখক-মডেল ছিল আমার আপন ভাই ইজরায়েল জশুয়া সিঙ্গার, যে লিখেছে 'দ্য ব্রাদার্স আসখেনাজি'। আমার এই ভাইয়ের চেয়ে ভাল আর কোনও লেখক-মডেল আমি কখনওই খুঁজে পাইনি। মা-বাবার সঙ্গে তার লড়াইটা আমি নিজের চোখে দেখেছি, দেখেছি ভাইটি কিভাবে লিখতে শুরু করেছিল, কিভাবে ধীরে ধীরে তার উত্তরণ ঘটছিল, লেখাপত্র প্রকাশিত হতে শুরু করেছিল। তাই, এটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার যে তার একটা প্রভাব আমার ওপর ছিলই। শুধু তা-ই নয়, পরবর্তী বছরগুলোয়, আমার লেখা প্রকাশের আগে, ভাইটি আমাকে লেখালেখির বেশ কয়েকটি নিয়ম শেখায় যা আমাকে সত্যিই ভয় পাইয়ে দিয়েছিল। এমন নয় যে নিয়মগুলি আমি কখনওই ভঙ্গ করিনি কিন্তু সেগুলিকে মনে রাখাটা বেশ মজার অভিজ্ঞতাই ছিল। একটি নিয়ম ছিল- প্রকৃত ঘটনা বা প্রকৃত সত্যটি কোনভাবেই যখন সেকেলে, বাসি বা মামুলি বিষয়ে পরিণত না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত ভাষ্য বা বিবরণী দিয়ে যেতে হবে, কিন্তু একজন লেখক যখন অতিমাত্রায় ব্যাখ্যা করতে লেগে যান, অতিমাত্রায় মনঃবিশ্লেষণে লেগে যান, ততক্ষণে লেখক তাঁর সময় থেকে বের হয়ে গেছেন যে জায়গা থেকে তিনি শুরু করেছিলেন। কল্পনা করুন, হোমার, গ্রিক দর্শন অনুসারে, তার নায়কদের কাজকর্মের ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন। সেটা গ্রিক দর্শন অনুসরণ করে কিংবা তার সময়ের মনস্তত্ত্ব দিয়ে। তাহলে, কেন আমাদেরকে হোমার পড়তে হবে? সৌভাগ্যক্রমে হোমার আমাদেরকে শুধু ছবি আর কল্পনাটা দিয়েছেন, আর সেই কারণেই ইলিয়াড আর অডিসি আমাদের সময়েও নতুন। এবং আমার মনে হয় সমস্ত লেখালেখির ক্ষেত্রেই এই ব্যাপারটা সত্য। একজন লেখক একবার যখন ব্যাখ্যা করতে লেগে যান- তার নায়কের প্রবৃত্তি কিংবা অভিপ্রায়, মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে লেখক তখনই ব্যর্থ হয়ে গেছেন। কিন্তু তার মানে কিন্তু অবশ্যই এটা নয় যে আমি মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসের বিপক্ষে। অনেক জাঁদরেল লেখক রয়েছেন যারা এরকম কাজ করে ফেলেছেন ইতোমধ্যেই, অত্যন্ত সফলরূপে। কিন্তু আমি আবার এটাও মনে করি না যে এরকমের লেখা একজন লেখকের জন্য ভাল, বিশেষ করে একজন তরুণ লেখকের জন্য, তাদেরকে অনুকরণ করা। দস্তয়েভস্কি, উদাহরণস্বরূপ বলছি, তাঁকে যদি আপনি মনস্তাত্ত্বিক ধারার একজন লেখক হিসেবে মনে করতে থাকেন, আমি নিশ্চিত না যে আমি তাঁকে সেরকম কিছু মনে করব, তিনি মূল বিষয় থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতেন, ব্যাখ্যা করতেন তাঁর নিজস্ব পন্থায়, নিজের মতো করে, কিন্তু তারপরও তাঁর পক্ষে এই মতটি দিতেই হবে যে ঘটনার ভিতর তিনি তাঁর আসল ক্ষমতাটুকুর ব্যবহার করতে পারতেন। 

সাক্ষাতকারী :
মনঃবিশ্লেষণ এবং লেখালেখি- এই দুটো বিষয়ে আপনি ভাবেন? বহু লেখকই মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করেছেন, তাতে করে তাঁরা উপলব্ধি করতে পেরেছেন যে এই বিশ্লেষণ শুধু তাঁদের নিজেদেরকেই বুঝে উঠতে সাহায্য করেনি তাঁরা যেসব চরিত্র নিয়ে কাজ করেছেন তাদেরকে বুঝতে সাহায্য করেছে। 

বাসেভিস সিঙ্গার :
লেখক যদি চিকিৎসকের অফিসে বসে মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করতে থাকেন, তাহলে সেটা পয়সা কামাবার ব্যবসা। কিন্তু লেখক যদি সেই ব্যাখ্যাকে, সেই বিশ্লেষণকে তাঁর লেখায় ঢুকিয়ে দিতে চান, ঢুকাবার চেষ্টা করেন-- তাহলে তো সেটা এক শোচনীয় অবস্থা হবে। এর পক্ষে সবচেয়ে বড় উদাহরণ 'পয়েন্ট কাউন্টার পয়েন্ট', বইটি যিনি লিখেছেন। কী নাম যেন লেখকের! 

সাক্ষাতকারী :
অলডাস হাক্সলি। 

বাসেভিস সিঙ্গার : 
হ্যাঁ, অলডাস হাক্সলি! ফ্রয়েডের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে তিনি উপন্যাস লেখার চেষ্টা করেছিলেন আর আমার ধারনা যে তিনি খুব বাজেভাবেই ব্যর্থ হয়েছেন। বিশেষ এই উপন্যাসটি এখন খুবই পুরোনো আর এতোই জীর্ণ হয়ে পড়েছে যে এমনকি স্কুলেও কেউ কোনোদিন তাঁর একটা পৃষ্ঠাও পড়ে দেখবে না। আমার ভাবনা হলো- একজন লেখক যখন লিখতে বসেছেন, বসেই মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ শুরু করেছেন, তিনি তাঁর কাজটাকে প্রকৃতপক্ষে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করছেন। 


সাক্ষাতকারী :
আমাকে এই কথাটি বলেছিলেন যে আপনার জীবনের প্রথম পড়া ফিকশনটি ছিল দি অ্যাডভেঞ্চার অভ শার্লক হোম্‌স। 

বাসেভিস সিঙ্গার : 
হ্যাঁ হ্যাঁ, এই জিনিস তো আমি তখনই পড়েছি যখন আমি দশ কি এগারো বছরের এক বালক, সেই বয়সে আমার কাছে এটাকে বিস্ময়কর আর মহিমান্বিত বলে মনে হয়েছিল। খুব হতাশ হয়ে পড়ব- এই ভয়টি না থাকলে এমন কি এখনও শার্লক হোমস পড়তে আমার আগ্রহ আছে, বেপরোয়া আগ্রহ। 

সাক্ষাতকারী :
আর্থার কোনান ডয়েল আপনাকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছেন- দীর্ঘদিনের লেখার অভিজ্ঞতায় আপনার কখনও কি তা মনে হয়েছে? 

বাসেভিস সিঙ্গার : 
না না, আমি কখনওই মনে করি না- শার্লক হোমসের গল্পগুলি আমাকে সত্যিকার অর্থে প্রভাবিত করতে পেরেছে। তবে, আমি একটা কথা বলব- সেই ছেলেবেলা থেকেই গল্পের ভেতরে থাকা টেনশন-কে আমি সব সময়ই পছন্দ করে এসেছি। আমি এটা সব সময়ই মনে করি যে গল্পকে অবশ্যই একটি গল্প হতে হবে, এবং একটা জায়গা থেকে গল্পটাকে শুরু করা হবে, আর তার একটা সমাপ্তি থাকবে, তাতে এমন এক অনুভূতি, একটা অপেক্ষা থাকবে- কী ঘটবে, কী ঘটতে চলেছে... আজ পর্যন্ত আমি এই নিয়মটাই মেনে চলছি। আমার কি মনে হয় জানেন, গল্প কথন আজকের এই সময়ে এসে অনেকটাই এক ভুলে যাওয়া আর্ট। এক্ষেত্রে আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা হলো এই বিস্মৃতি, এই বিলোপ যেন চূড়ান্ত পর্যায়ে না পৌঁছয়। আমার কাছে গল্প শুধুই একটি গল্প যেখানে পাঠক গল্পটি শুনছে এবং কী ঘটছে সেটা জানতে উদগ্রীব হয়ে উঠছে। কোনও কারণে একবার যদি পাঠক শুরু থেকেই জেনে ফেলে সমস্ত কিছু, যদি গল্পটির বর্ণনা খুবই ভাল হয়, তাহলেও বলব- এই গল্পটি আসলে গল্প নয়। 


সাক্ষাতকারী : 
এস ওয়াই আগনন এবং নেলি সাখ নোবেল পেতে যাচ্ছেন, তাঁদের লেখালেখি সম্পর্কে আপনার অভিমত? 

বাসেভিস সিঙ্গার : 
নেলি সাখ সম্পর্কে আমি এ পর্যন্ত কিছুই শুনিনি তবে আগননকে জানি। আমি যখন থেকে পড়তে শুরু করেছি সেই তখন থেকেই জানি। আমার ধারনা তিনি একজন ভাল লেখক তবে আমি তাঁকে অবশ্যই জিনিয়াস বলব না, তবে আজকের দিনে আপনি আর কোথায় জিনিয়াসদের পাচ্ছেন? আগনন পুরোনো ধাঁচের খাঁটি লেখক, যে-খাঁটিত্ব অনুবাদের মর্মান্তিক দুর্বলতায় হারিয়ে গেছে। কিন্তু যারা হিব্রু সম্পর্কে ধারনা রাখেন তাঁরা নির্দ্বিধায় স্বীকার করবেন যে আগননের শৈলীটি বিস্ময়কর। তাঁর সমস্ত লেখাপত্র তাল্মুদ, বাইবেল এবং মিদ্রাসের সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি নানামাত্রিক লেখা লিখেছেন। সৃষ্টির বিভিন্ন শাখায় কাজ করেছেন তিনি বিশেষ করে তাঁর কাজ তাঁদের জন্য যারা হিব্রু জানেন। কিন্তু অনুবাদে তাঁর লেখার সেই অতলস্পর্শী বাঁকগুলি হারিয়ে গেছে। কিন্তু তবু, ভাল সাহিত্য হিসেবে তাঁর লেখাকে অনায়াসেই বিবেচনা করা যায়। 


সাক্ষাতকারী : 
পুরস্কার কমিটি বলেছে তারা দুজন ইহুদি লেখককে নোবেল দিতে চলেছে যারা তাঁদের লেখায় ইসরাইলের কণ্ঠস্বরকে তুলে ধরেছেন। এই ব্যাপারটি কিন্তু আমাকে বিস্মিতই করেছে যে তারা কীভাবে আপনাকে ইহুদি লেখক হিসেবে চিহ্নিত করেছে যিনি আসলে লেখক না হয়ে ইহুদি হতে চেয়েছেন?! 

বাসেভিস সিঙ্গার : 
আমার কাছে লেখক হলেন এক একজন ইদিসভাষী লেখক, হিব্রুভাষী লেখক, ইংলিশভাষী লেখক, হিস্পানি লেখক। কিন্তু একজন ইহুদি লেখক কিংবা একজন ক্যাথলিক লেখক- এই ধারার লেখকের সম্পূর্ণ আইডিয়াটিই আমার ক্ষেত্রে কষ্টকল্পিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়, শেষ পর্যন্ত। তবু যদি জোর করে সেরকম এক লেখক হিসেবে আমাকে চিহ্নিত করা হয়, ভাবা হয়, সে ক্ষেত্রে আমি বলব ইহুদি লেখক হবেন সেইরকম একজন কেউ যিনি ইহুদিবাদিতায় অভিনিবিষ্ট, যিনি খুব ভাল হিব্রু জানেন, ঈডিশ, তাল্মুদ, মিদ্রাস জানেন; হিসাদিক সাহিত্য সম্পর্কে ভাল জানাশোনা আছে, কাব্বালাসহ আরও কিছু বিরল বিষয়ে প্রাজ্ঞ; তার ওপর আরও বলা যায় যে তিনি যদি শধু ইহুদিবাদ এবং ইহুদি-জীবন নিয়ে লেখেন, সম্ভবত তখনই তাঁকে ইহুদি লেখক বলা চলে, তা যে ভাষাতেই তিনি লেখেন না কেন। অবশ্য তাঁকে আমরা শুধু একজন লেখকই বলব। 


সাক্ষাতকারী : 
আপনি ঈডিশ ভাষায় লেখেন, আজ যে ভাষাটিকে খুব কম লোকেই পড়তে জানে। আপনার বইপত্র প্রায় আঠান্নটি ভাষায় ইতোমধ্যেই ভাষান্তরিত হয়েছে। বেশিরভাগ পাঠকই আপনাকে অনুবাদে পড়ছে, ইংরেজি কিংবা ফরাসিতে। খুব অল্প কয়েকজন লেখক আছেন যারা আপনাকে ঈডিশে পড়েছেন। আপনার কি মনে হয় না যে অনুবাদে আপনার লেখা অনেকখানিই হারিয়ে যাচ্ছে? 


বাসেভিস সিঙ্গার : 
আসল কথা হলো মূল ঈডিশ পড়তে পারেন এমন বহুসংখ্যক পাঠক আমার নেই যা আমি প্রত্যাশা করি। ব্যাপারটা আমাকে হতাশ করে ফেলে। এ তো কোনভাবেই ভাল কথা নয় যে একটি ভাষা উৎকর্ষের দিকে না গিয়ে ক্রমশই হারিয়ে যাচ্ছে। আমি তো চাই ঈডিশ ফুলেপাতাসম্ভারে পল্লবিত হয়ে উঠুক, ঠিক যেমন ঈডিশভাষীরা বলে থাকেন যে এই ভাষাটা জাগছে, ফুলপাতার বাহারে। কিন্তু অনুবাদ সম্পর্কে আমি যতটুকু জানি, হ্যাঁ, একথা একশভাগ সত্য, খুব স্বাভাবিকভাবে প্রত্যেক লেখকই অনুবাদে হারিয়ে যান বিশেষ করে কবি আর হাস্যরস লেখকেরা। আর সেইসব লেখক যাদের লেখা খুব স্পষ্টভাবে ফোকলোরের সঙ্গে সম্পর্কিত- সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন তারা। আমার ব্যাপারে বলব- আমিও ব্যাপকভাবে অনুবাদে হারিয়ে গেছি। তবু একসময় বইগুলির অনুবাদপ্রক্রিয়ার সঙ্গে আমি নিজের ভূমিকা রাখতে শুরু করি; তাতে, সমস্যাগুলি ভাল করে বুঝতে পারি এবং বেশ সতর্কতার সঙ্গে কাজ করি যাতে খুব বেশি হারিয়ে না যায়। সমস্যার মূল জায়গাটি হচ্ছে- অন্যভাষার বাগরীতির সঙ্গে যায় এমন যথাযথ শব্দগুচ্ছ খুঁজে না পাওয়া। কিন্তু পরে অনুবাদের ভিতর দিয়ে যেতে যেতে ধীরে ধীরে মূল সমস্যার সমাধানের দিকে যেতে চেষ্টা করি। আমার বইয়ের অনুবাদ করতে গিয়ে অনেকেই বাইবেল পড়তে শুরু করে, সে বাইবেলও অনূদিত, অনুবাদে আমরা হোমারকে পুনরায় পড়তে শুরু করি, এবং প্রায় সমস্ত ক্ল্যাসিক; অনুবাদে। যদিও অনুবাদ একজন লেখকের অনেক বেশি ক্ষতি করে থাকে, তবে লেখককে একেবারে মেরে ফেলে না। তিনি যদি সত্যিই একজন বড় লেখক হয়ে থাকেন, হাজার অনুবাদেও তিনি বড় লেখক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবেন। ব্যাপারটা আমি নিজের ক্ষেত্রেই পরীক্ষা করে দেখেছি। আবার, অনুবাদ অন্যভাবে আমাকে সাহায্যও করেছে। অনুবাদগুলি এডিট করতে গিয়ে নিজের লেখাকে ভাল করে দেখতে পেরেছি, বারে বারে দেখেছি। অনুবাদকদের সঙ্গে কাজের সময় নিজের লেখাকে বার বার পড়তে হয়েছে আর ঠিক যতবার পড়েছি ততবার নিজের লেখার দুর্বলতা ধরতে পেরেছি। অনুবাদ আমাকে অপ্রত্যাশিত বহু ভুলের হাট থেকে রক্ষা করেছে। ঈডিশে যদি লেখাগুলি থেকে যেত, তাহলে সেই ভুলগুলিকে আর শোধরানো যেত না, ভুলসহই প্রকাশিত হতো; অনুবাদের কারণে লেখাগুলিকে আমার পড়তে হয়েছে। 


সাক্ষাতকারী :
আর এটাও তো সত্য যে আপনি প্রায় পাঁচটি বছর লেখালেখি করেননি, বন্ধ রেখেছিলেন। আপনার কি মনে হয়েছিল যে যাদের জন্য লেখা তারা কেউ এখন আর পড়ে না? 

বাসেভিস সিঙ্গার :
ব্যাপারটা সত্য যে আমি যখন এই দেশে চলে এলাম, তারপর বেশ কয়েকটি বছর এক অর্থে কিন্তু লেখা বন্ধ করেই রাখলাম। তার প্রকৃত কারণ জানি না তবে এটা হতে পারে- এই দেশে আসার পর আমার ভাবনা হয়েছিল যে এখানে আমার পাঠক নেই। কিন্তু পাঠক তো বহু সংখ্যক তবে তারা আমার লেখার সঙ্গে পরিচিত নন। এই যে এক দেশ ছেড়ে আরেক দেশে চলে আসা, অভিবাসন;- এসব কিন্তু এক ধরণের সংকট। নতুন দেশে এসেই আমার মনে হতে লাগল আমি আমার ভাষাটাকে হারিয়ে ফেলেছি। আমার দেখা ছবিগুলিকে কোথাও খুঁজে পাচ্ছিলাম না। এতো কিছু চারপাশে, হাজার হাজার জিনিস; যাদের নাম পোল্যান্ডে ঈডিশ ভাষায় ছিল না। এই যেমন একটা, হ্যাঁ, সাবওয়ে। পোল্যান্ডে সাবওয়ে নেই, আর নেই বলে ঈডিশে তার কোনও নামও দেওয়া নেই। তো, হঠাৎ করেই যেন আমার জীবনে সাবওয়ে চলে এল, সঙ্গে করে নিয়ে এল শাটল ট্রেন আর একটি লোকাল... এক পর্যায়ে আমার মনে হয়েছিল যে আমি আমার ভাষা হারিয়ে ফেলেছি; আর চারপাশে ছড়ানো সমস্ত কিছুর প্রতি আমার অনুভূতিও হারিয়ে ফেলেছি। সঙ্গে ছিল নতুন দেশের নতুন জীবনধারার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা, নতুন পরিবেশে বসবাস; নিজেকে গুছিয়ে নিতেও বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। আর খাপ খাইয়ে নেওয়াটা চলছিল বেশ কয়েক বছর ধরেই আর আমি লিখতে পারছিলাম না। 


সাক্ষাতকারী : 
আপনার কি মনে হয়ে যে ইদিশের কোনও ভবিষ্যত আছে, না কি অল্পদিনের ভিতরেই ভাষাটি সম্পূর্ণরূপে মারা যাবে? 

বাসেভিস সিঙ্গার : 
না, কখনওই মরবে না, তার কারণ এই ভাষাটা ইহুদিদের পাঁচ থেকে ছয়'শ বছরের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ইহুদি উপাদান। যে-ই এই ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা করবে তাকেই ঈডিশ পড়তে হবে। কিছুটা কৌতুকের সঙ্গেই বলব যে আমি নিজে ঈডিশে লিখতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। আর এই ভাষার লোকসংখ্যা এখন মাত্র ৩.৫ বিলিয়ন কিন্তু একশ বছর পর আমরা কিন্তু ১০০ বিলিয়নে পরিণত হব, অনেকেরই তখন পিএইচডি'র জন্য বিষয়ের দরকার পড়বে। ভেবে দেখুন সমস্ত ছাত্রের জন্য উচ্চতর গবেষণার বিষয় খোঁজে বের করতে ঈডিশ কতোটা সহায়ক হবে। ছাত্ররা ঈডিশের সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্তকিছু খুঁজে দেখবে, বিশ্লেষণ করবে, লিখবে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে আলোচনা-পর্যালোচনা হবে। সুতরাং আমি কখনওই ভাবি না যে ভাষাটিকে কেউ ভুলে যাবে। অ্যারামিক ভাষার কথাই যদি ধরি, তাহলে দেখব যে ইতোমধ্যে দুইশ বছর পার হয়ে গেছে, ইহুদিরাও এখন আর এই ভাষা ব্যবহার করে না কিন্তু দেখুন, ভাষাটি এখনও বেঁচে আছে, হিব্রুর একটি অংশ হয়েই অ্যারামিক বেঁচে আছে। এখন শুধুমাত্র সনদপত্র আর বিবাহবিচ্ছেদের নথিপত্রে অ্যারামিক ব্যবহৃত হচ্ছে। ইহুদিরা কখনওই কোনওকিছু ভুলে যায় না, বিশেষ করে কোনও ভাষাকে তো নয়ই, যে-ভাষা তাঁদের অনেক কিছুই দিয়েছে, বহু সৃষ্টি; ঈডিশের মতো ভাষারই আরেক অংশ। 

সাক্ষাতকারী : 
আমরা যখন ইদিশে লেখেন এমন লেখকের কথা ভাবি তখন খুব স্বাভাবিকভাবে আপনার কথাই প্রথম মনে আসে। অন্য কারো নাম মনে করতে পারি না। আপনার জানামতে আর কি কোনও লেখক আছেন যিনি ইদিশেই লেখেন, যাকে আপনি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন? 

বাসেভিস সিঙ্গার : 
হ্যাঁ, এমন লেখক একজন আছেন যাকে আমি অত্যন্ত শ্রদ্ধা করি। সত্যিকার অর্থেই তিনি মহৎ লেখক এবং কবি। এরন জেটলিন। এই লোকটি আমার বন্ধু, আমি কিন্তু তাঁর প্রশংসা করছি না কারণ তিনি আমার বন্ধু। একজন ভাল কবি তিনি। তাঁর কবিতাকে আমি টমাস হার্ডি'র কবিতার সমপর্যায়ের মনে করি, এবং টমাস হার্ডি সম্পর্কে আমার কিন্তু খুব উচ্চ ধারণা আছে। আর অন্যদের... এখানে কিন্তু অনেক ঈডিশভাষী লেখকও রয়েছেন, যাদের কেউ কেউ বেশ নাম করেছেন, যেমন- শোলেম এসখ, ডেভিড বারগেলসন। এখানে আরও একজন আছেন যিনি খুব দক্ষ গদ্য লেখক, এ. এম. ফুছ, তিনি আসলেই একজন শক্তিমান লেখক। কিন্তু তিনি সব সময়েই একই বিষয় নিয়ে লেখেন। তাঁর আছে একটি মাত্র গল্পকে মিলিয়ন ভঙ্গিতে বলার ধরণ। কিন্তু আমি বলব যে ঈডিশ রচনাবলীতে এমন একটা কিছু রয়ে গেছে যা আসলেই বহু পুরনো কেতা, আর লেখকরাও যেন সেটাকে আঁকড়ে ধরে বসে আছেন, আধুনিক ঈডিশ লেখকরা কখনওই ইহুদিদের জীবনের সত্যিকার চেহারা নিয়ে লিখছেন না, আধুনিক এই লেখকরা আলোকায়নের ফসল যদিও। আজকের লেখক এই ধারণাটি নিয়ে বেড়ে উঠছেন যে কেউ যদি ইহুদিত্ব ত্যাগ করে তাহলেই সে সার্বজনীন হবে। বিশ্বমানব হতে পারবে। আর সে কঠোর চেষ্টায় সার্বজনীন হতে গিয়ে কিন্তু প্রাদেশিক হয়ে পড়ে। এই হলো ট্র্যাজেডি। অবশ্য সমস্ত ঈডিশ সাহিত্য এরকম নয়, কিন্তু সাহিত্যের একটা বড় অংশই এরকম। আর হ্যাঁ,ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, আমি যখন লিখতে শুরু করলাম, এই দুর্ভাগ্যজনক বিষয়টিকে এড়িয়ে গেলাম। শুধু তাই নয় আজীবনই এড়িয়ে গিয়েছি। তারা আমাকে বলেছে কেন আমি বারবার ভূতপ্রেত আর শয়তান নিয়ে লিখছি। কেন ইহুদিদের পরিস্থিতি, ইহুদিবাদ, সমাজতন্ত্র, ট্রেড ইউনিয়ন ইত্যাদি নিয়ে লিখছি না, কিভাবে তারা মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে, এইসব এইসব... কিন্তু আমার মাঝে কিছু একটা ব্যাপার আছে যা আমাকে এসব নিয়ে লিখতে দেয় না। তারা আমাকে সেকেলে বলে অভিযোগ করে। আর সেকেলে লেখক বলেই হয়ত আমি সেই সময়ের লোকদের কাছে চলে যাই যারা ইতোমধ্যেই বিলুপ্ত হয়েছে। আর তাই আমি মোটামুটি প্রতিক্রিয়াশীল লেখক। তবে, তরুণ লেখকরা মাঝেমাঝেই ভীষণ জেদি। আমি তাদের পথকে প্রত্যাখ্যান করেছি আর আনন্দিত হয়েছি এজন্য যে আমার চরিত্রটি এমন যে সেরকম করতে চায়নি তারা আমাকে দিয়ে যা করাতে চেয়েছিল। আমার ধরণের লেখাগুলি খুবই সেকেলে আর এতোই নীরস যে ঈডিশ অনুবাদক পাওয়ার প্রশ্নই আসে না, যদিও আমরা অনেকটাই অনুবাদ করে ফেলেছি। 


সাক্ষাতকারী : 
'এই ধরণের লেখালেখি' কথাটি আপনি যখন বলেন, তখন কি আপনি ট্রেড ইউনিয়ন সংক্রান্ত লেখাকেই... 

বাসেভিস সিঙ্গার : 
হ্যাঁ, ট্রেড ইউনিয়ন সংক্রান্ত, অভিবাসন সংক্রান্ত, প্রগতি সংক্রান্ত, আর ইহুদিবিদ্বেষ সংক্রান্ত (লেখা)। এক ধরণের সাংবাদিকতা-সংক্রান্ত লেখা যেখানে লেখকের ইচ্ছা মূর্ত হয়েছে এমন একটা কিছুর সৃষ্টির জন্য যাকে অনেকে বলেন একটি উত্তম বিশ্বব্যবস্থা গড়বার আকাঙ্ক্ষা। পৃথিবীকে আরও উত্তম করে গড়া, ইহুদিদের অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন। এইসব বিষয়ে লেখা তো বিশ শতকের এক ফ্যাশন, ২০-এর দশকে খুব চালু ছিল, আর আমি এটাও বলব যে ঈডিশভাষী লেখকরা বাস্তবে এ রীতি থেকে থেকে বের হতে পারেননি। 


সাক্ষাতকারী : 
আপনি কি একটি সুন্দর পৃথিবীর ধারনায় বিশ্বাস করেন না? 

বাসেভিস সিঙ্গার : 
হ্যাঁ, একটি সুন্দর পৃথিবীর ধারনার প্রতি আমি আস্থাশীল, কিন্তু এটা আমি মনে করি না যে একজন ফিকশন রাইটার যিনি একটি উপন্যাস লিখতে বসেছেন- যার উদ্দেশ্য যদি এই হয়- যেকোনোও কিছু দিয়ে একটি সুন্দর পৃথিবী গড়ে তোলা, তাহলে সম্ভবত তার পক্ষে কিছুই অর্জন করা সম্ভব নয়। একটি সর্বোত্তম বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে অসংখ্য মানুষের দ্বারা; সরকার, রাজনিতিক, সমাজসমীক্ষকদের দ্বারা। আমার জানা নেই যে ঠিক কে উত্তম বিশ্ব তৈরির দিকে পা বাড়াচ্ছে কিংবা আদৌ এখানে উত্তম একটি পৃথিবী সম্ভব কি না। তবে একটি ব্যাপারে আমি নিশ্চিত যে সেই উপন্যাসিক এটা করতে পারবে না। 


সাক্ষাতকারী :
আপনার প্রায় সমস্ত লেখালেখিতে, বিশেষ করে আপনার ছোটগল্পগুলির কথাই বলছি, অতিপ্রাকৃত ব্যাপারস্যাপার বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছে। অতিপ্রাকৃতের প্রতি কেন এই তীব্র আকর্ষণ আপনার? আপনি কি ব্যক্তিগতভাবে অতিপ্রাকৃতে বিশ্বাসী? 

বাসেভিস সিঙ্গার :
হ্যাঁ, আমি প্রবলভাবেই বিশ্বাসী। লেখায় কেন ঘুরে ফিরে অতিপ্রাকৃত ব্যাপার চলে আসে, সে কথার উত্তরে বলতে চাই যে এই বিষয়টি সবসময়ই আমার মনের মধ্যে থেকে যায়। মন থেকে তাড়াতে পারি না। আমি আসলে জানি না যে নিজেকে আমি একজন নিগূঢ়তাবাদী বলে ভাবব কি না, তবে আমি সর্বক্ষণ এটা অনুভব করি যে বিভিন্ন রকমের অদৃশ্য শক্তি ও রহস্যময়তা আমাদেরকে চারপাশ থেকে ঘিরে রেখেছে। এই জীবনে আমরা যা কিছু করে থাকি সে সমস্ত কিছুতেই এই অদৃশ্য রহস্যময়তার ভূমিকা থাকে। আমি বলতে চাই টেলিপ্যাথি এবং অলোকদৃষ্টি কিংবা অন্তর্দৃষ্টি আমাদের প্রেমের গল্পগুলিতে, এমনকি আমাদের বাণিজ্যিক লেনদেনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মানে, মানুষ এই জীবনে যা কিছু করে বা করতে চায়, সবকিছুতেই সেই অপার রহস্যময়টার খেলাটা থাকেই। হাজার হাজার বছর আগে, সেই আদিমকাল থেকেই লোকে পশমের কাপড় পরে আসছে, রাতের ঘুমের সময় সেই কাপড় সে যখন তার শরীর থেকে খুলতে গেছে তখনই তাতে আগুণের ফুলকি দেখতে পেয়েছে। আমি এই কথাটি ভেবেই অবাক হই যে হাজার বছর আগের সেইসব লোকেরা কাপড়ে আগুণের ফুলকি দেখে ঠিক কি ভাবত! আমি নিশ্চিত যে তারা ব্যাপারটিকে এড়িয়ে যেত, বাচ্চারা হয়ত তাদের মা'দের কাছে জানতে চাইত- এসব কিসের আগুন? আর আমি এ ব্যাপারেও নিশ্চিত যে মায়েরা তাদের বলতেন- তোমরা কল্পনা করে বের করো। লোকে অবশ্যই এ ব্যাপারে কথা বলতে চাইত না, প্রচণ্ড ভয় পেতো যাতে আগুণের ফুলকির সঙ্গে জাদুকর কিংবা ডাইনিদের সম্পর্ক সম্পর্কে তাদের মনে অযাচিত সন্দেহের জন্ম না হয়। যেকোনোওভাবে বিষয়টিকে তারা এড়িয়ে গিয়েছে, আজ আমাদের ধারনা হয়েছে যে আগুণের সেই ফুলকিগুলি মোটেও দৃষ্টিবিভ্রম কিংবা কুহকবিভ্রম, যা-ই বলি না কেন, সেরকম কিছু ছিল না। আগুণের ফুলকিগুলি সত্যি ছিল আর ফুলকিগুলির পেছনে যে শক্তিটি লুকিয়ে ছিল হাজার বছর আগে সেই শক্তিই আজকের দিনে আমাদের কলকারখানাগুলিকে চালাচ্ছে। আমি বলতে চাই যে প্রজন্মের পড় প্রজন্ম ধরে আমরা এসব ফুলকিকে জ্বলতে দেখেও এড়িয়ে গিয়েছি বা এড়িয়ে চলেছি শুধুমাত্র বিজ্ঞানের বিশেষায়িত পদ্ধতিতে তাদের যথার্থ বলে প্রমাণ করতে না পারায়। আমার মনে হয় এখানেই লেখকদের কাজের জায়গা, সেই আলোকমালার সন্ধান লেখকদের জন্য এক আনন্দময় উদযাপন। আমার কাছে, অলোকদৃষ্টি এবং টেলিপ্যাথি... প্রেত এবং গৃহভূত... এই সমস্তকিছুই... 


সাক্ষাতকারী :
ভূত? 

বাসেভিস সিঙ্গার : 
হ্যাঁ, ভূত এবং আরও কিছু ব্যাপার আজকের মানুষেরা যার নাম দিয়েছে- অন্ধ বিশ্বাস, এখন এই অন্ধ বিশ্বাসই ঝলকাচ্ছে আমাদের সময়ে আমরা যাকে এড়িয়ে গেছি। 


সাক্ষাতকারী : 
আগুণের সেই ফুলকিগুলিকে আজকের দিনে যাকে আমরা বিদ্যুৎ বলছি, ঠিক এভাবে কি এই অতিপ্রাকৃতদের তারা বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যাখ্যা করতে সমর্থ হবেন? আপনার কি ধারণা? 

বাসেভিস সিঙ্গার : 
বিজ্ঞানের ধারণাটি নিয়ে আমার ভাবনা-- কোনটি বৈজ্ঞানিক আর কোনটি নয় তা কিন্তু সময়েই বদলে যায়। এমন বহু বিষয় তো রয়েছেই, বহু রহস্য, যার সমাধান ল্যাবরেটরির গভীর পরীক্ষাতেও বের করা যায় না এবং এখনও সেগুলি ফ্যাক্ট। অমীমাংসিত। ল্যাবরেটরিতে আমি কিন্তু এটা দেখাতে পারবেন না যে নেপোলিয়ন নামে কেউ একদিন ছিলেন, আপনি কিন্তু স্পষ্ট করে কোনও কিছুকে দেখিকে বলতে পারবেন না যে এটা হচ্ছে বিদ্যুৎ। এই হচ্ছে বৈদ্যুতিক তরঙ্গ। কিন্তু আমরা তো জানি নেপোলিয়ন নামে কেউ একজন একসময় ছিলেন। আজ আমরা যাকে ভূত, প্রেত, প্রেতাত্মা বলছি, অলোকদৃষ্টি বা অন্তর্দৃষ্টি বলছি- এসব কিন্তু এমন সব ব্যাপার যাকে আপনি নিজে তৈরি করতে পারবেন না, এবং এসব নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করতে পারবেন না, তার মানে কিন্তু এটা নয় যে এই ব্যাপারগুলি মিথ্যা। 


সাক্ষাতকারী : 
শয়তান সম্পর্কে কি বলবেন? আপনার অনেক লেখাতেই কিন্তু শয়তানই প্রধান চরিত্র। 

বাসেভিস সিঙ্গার : 
খুব স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন লেখায় সাহিত্যের প্রতীক হিসেবে আমি শয়তান এবং গৃহভূতদের ব্যবহার করেছি, এ কথা সত্য; প্রতীক হিসেবে সাহিত্যে তাদের ব্যবহারের কারণ হচ্ছে তাদের নিয়ে আমার ভিতরের সংবেদন। আমার ভিতরে যদি তাদের নিয়ে সংবেদনা না থাকে, তাহলে অবশ্যই লেখায় তাদের ব্যবহার করব না। আমি এখনও পর্যন্ত এই বিশ্বাসে অনড় রয়েছি যে আমরা আসলে অদৃশ্য শক্তির দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে আছি, তাদের সঙ্গেই আমি বেড়ে উঠছি, আর তাদের সঙ্গে এখনও যেন জড়িয়ে আছি আঠার মতো। হয়ত আমি জড়িয়ে থাকতে চাই না কিন্তু তবু তারা আমার সঙ্গ ছাড়বে না। রাতের বেলায় আপনি যদি বাতি নিভিয়ে দেন আর আমি যদি অন্ধকার কক্ষে থাকি, তাহলে আমি ভয় পাবো; সাত কি আট বছর বয়সে যেরকম ভয় পেতাম ঠিক সেরকম ভয়। এ নিয়ে অনেক যুক্তিবাদীর সঙ্গে আমি আলাপ করেছি, তারা ব্যাপারটিকে অযৌক্তিক বলে উড়িয়ে দিয়েছেন; কিন্তু আমি যখন তাদেরকে কোনও এক শীতের রাতে মৃতদেহের সঙ্গে একলা ঘরে শুতে পারবেন কি না জিজ্ঞেস করেছি, তারা ভয়ে আঁতকে উঠেছেন। অতিপ্রাকৃতের ভয় আমাদের সবার মধ্যেই আছে আর এখনও আমরা প্রত্যেকে কিন্তু অতিপ্রাকৃতে ভয় পাই, আর একারণেই লেখায় কেন এটা ব্যবহার করব না তার কোনও কারণ আমি খুঁজে পাই না। দেখুন, আপনি যদি কন কিছুতে ভীত হন, তার অন্তর্নিহিত অর্থ অবশ্যই এটা যে আপনি স্বীকার করে নিচ্ছেন তাদের অস্তিত্ব আছে যার কারণে আপনি ভীত হয়ে পড়ছেন। যার কোনও অস্তিত্বই নেই তাতে আমাদের ভয়ও নেই। 


সাক্ষাতকারী : 
আপনিই একমাত্র ইহুদি লেখক যিনি শয়তান নিয়ে লিখেছেন, হিব্রু সাহিত্যও যেখানে শয়তানের আলোচনা কিংবা নারকীয় উপাসনাকে এড়িয়ে গেছে। 

বাসেভিস সিঙ্গার : 
এটা তো সত্য যে ইদিশ এবং হিব্রু সাহিত্য উভয়ই আলোকায়নের প্রভাবে প্রভাবান্বিত, এবং উভয়ই অধুনারীতির সাহিত্যের পথেই এগিয়ে চলেছে। লেখকরা এই আইডিয়াটির সঙ্গে এগিয়ে চলেছেন যে তারা সুদীর্ঘকাল ধরে মধ্যযুগে নিমগ্ন ছিলেন, আর তারা মনে করেন আধুনিক সাহিত্যকে বুদ্ধিবৃত্তিক বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন ও যৌক্তিক হতে হবে; লেখকরা বাস্তব দুনিয়াকে উপজীব্য করে লিখবেন। এই লেখকদের কাছে-আমার লেখালেখি শুরু করার সময় থেকেই- আমি এক চরম প্রতিক্রিয়াশীল লেখক হিসেবে গণ্য হই, যে-লেখক অন্ধকার যুগে ফিরে যেতে চেয়েছে। তবে, যেরকমটা আমি বলে থাকি, তরুণ লেখকরা মাঝেমাঝেই একগুঁয়ে, প্রচণ্ড জেদি। আপনার যাকে অন্ধকার মনে করছেন আমার কাছে তা বাস্তব। এই মনে করার কারণেই আমাকে সবাই দোষী সাব্যস্ত করেছে। কিন্তু আজ? ধীরে ধীরে এই লেখাগুলি বিশেষভাবে পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণে সফল হচ্ছে। পাঠক আখ্যানকে মেনে নিচ্ছেন। আপনি তো জানেন কীভাবে এই দুনিয়া চলে : যদি কোনও কাজ শুরু করা হয় তাহলেই কাজটি একদিন ফলপ্রসূ হয়। আসল কথাটি হচ্ছে- আমি এটা কখনওই আশা করি না যে আমার ধারার লেখালেখির প্রতি কেউ সত্যিকার আগ্রহী হবে। এই ধারাতেই আমার আগ্রহ, আমার জন্য এটাই যথেষ্ট। 

সাক্ষাতকারী :
নানা রকম ধর্মীয় আচার এবং অন্ধবিশ্বাসে আপনার আগ্রহ ছিল, তো, আপনার নিজের সম্পর্কে, আরও নির্দিষ্ট করে বললে, আপনার লেখালেখি বা লেখার প্রতিদিনকার অভ্যাসের সঙ্গে এই বিশ্বাসের কি কোনও সংযোগ আছে? 

বাসেভিস সিঙ্গার : 
হ্যাঁ, এটা তো সত্যি যে অলৌকিক ঘটনা বা দৃষ্টান্তে কিংবা আরও পরিষ্কার করে বললে, স্বর্গীয় প্রশান্তিতে আমার বিশ্বাস আছে। আমি কিন্তু জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে, প্রতিটি ক্ষেত্রেই অলৌকিক-কে বিশ্বাস করি, তবে লেখালখির ক্ষেত্রে নয়। জীবন-অভিজ্ঞতা আমাকে এটা দেখিয়েছে যে একমাত্র লেখালেখির ক্ষেত্রেই অলৌকিক ঘটনা বলে কিছু নেই! উৎকৃষ্ট লেখা তৈরি হয় যে প্রক্রিয়াটির মাধ্যমে, সেটা হলো কঠোর পরিশ্রম। পকেটে খরগোশের পা নিয়ে চলাফেরা করলে আপনার পক্ষে ভাল একটি গল্প লেখা অসম্ভব। 


সাক্ষাতকারী :
গল্প লিখতে শুরু করেন কীভাবে? একজন রিপোর্টারের মতোই কি আপনি চারপাশটাকে অবিরাম পর্যবেক্ষণে রাখেন? আপনি কি নোট নেন? 

বাসেভিস সিঙ্গার : 
গল্পের খোঁজে আমি কখনওই বের হই না। হ্যাঁ, নোট তো নিতেই হয় কিন্তু সেটা ঠিক রিপোর্টারের নোট না। আমার প্রায় সমস্ত গল্পের ভিত্তি আসলে সেই বিষয়গুলি যা আমার জীবনে একটার পর একটা এসেছে, আর তাদেরকে খুঁজে বের করার জন্য বাইরে বের না হয়েই যেসব নোট নিয়ে থাকি, তা হলো গল্পের আইডিয়ার নোট। আমি কিন্তু মোটেও সাহিত্যে প্রতিদিনকার জীবন-অভিজ্ঞতার বাস্তবিক বর্ণনা দানকারী লেখক না। আমার কাছে যখনই একটি বিশেষ আইডিয়া আসে, ছোট্ট নোটবুকে সেই আইডিয়াটিকে আমি টুকে ফেলি, নোটবুকটি সব সময়ই আমার সঙ্গে থাকে। একেবারে চূড়ান্ত সময়ে সে যখন লিখিত হবার দাবি করতে থাকে, কেবল তখনই আমি গল্পটিকে লিখতে শুরু করি। 


সাক্ষাতকারী : 
একদিকে গল্প, উপন্যাস লিখছেন, আবার বছরের পর বছর ধরে সাংবাদিকতাও করছেন। আপনি তো এখনও ফরোয়ার্ড-এর সাংবাদিক, তাই না? 

বাসেভিস সিঙ্গার : 
হ্যাঁ, আমি একজন সাংবাদিক আর প্রতি সপ্তাহেই আমার দুই থেকে তিনটি সংবাদ-সংক্রান্ত লেখা লিখতে হয়। ঈডিশে সাংবাদিকতার পেশা অন্যান্য ভাষার সাংবাদিকতার পেশা থেকে একেবারেই ভিন্ন। এই আমেরিকায় সাংবাদিক হলেন এমন একজন ব্যক্তি হয় তিনি ঘটনার পেছনের ঘটনার অনুসন্ধান করছেন, তা না হলে তিনি বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারাভাষ্য দিচ্ছেন। ঈডিশভাষী খবরের কাগজে, কাগজটি যদি দৈনিকও হয়ে থাকে, তার ধরণ হয় এমন যেন একটি ম্যাগাজিন। সেই ম্যাগাজিনে আমি জীবনের আশাবাদ ও জীবনকে আরও অর্থবহ করে তোলার ভাবনা নিয়ে গদ্য লিখি কিংবা এমন কিছু লিখি যেন আর কেউ আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত না নেয়, বা ধরেন মাঝে মাঝে লেখার বিষয় হয়ে যায় গৃহভূত এবং শয়তান সম্পর্কিত। আমাদের এই পত্রিকার পাঠকরা রেডিও ও টেলিভিশন থেকে খবর পেতে অভ্যস্ত কিংবা ইংরেজি পত্রিকা থেকে, যা সন্ধ্যার সময় বের হয়। পাঠক সকালে যখন পত্রিকা কিনে তখন কিন্তু সে সংবাদের দিকে মনযোগী হচ্ছে না, সে আর্টিক্যালগুলি পড়তে চাইছে। আসলে, আমি যদি সাংবাদিক হয়েই থাকি, তাহলেও আমি কিন্তু সে ধরণের সাংবাদিক নই যে কিনা দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এ কাজ করে থাকে। 


সাক্ষাতকারী : 
আপনি কি এমনটা মনে করেন যে টাইমস-এর মতো পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে কাজ করাটা ফিকশন লিখতে চায় এমন কারোর জন্য বেশ ভাল একটি পটভূমি তৈরি করে দেয়? 

বাসেভিস সিঙ্গার :
আমি তো মনে করি যেকোনও তথ্য মানুষ পেয়ে থাকুক, বিশেষ করে একজন লেখকের জন্য তো ব্যাপারটা আরও ভাল। আমার মনে হয় না যে সাংবাদিকতা তার লেখকসত্তার জন্য ক্ষতিকর। 


সাক্ষাতকারী : 
এখানকার লেখকদের সঙ্গে আপনার যোগাযোগ কেমন? 

বাসেভিস সিঙ্গার : 
মাত্র কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ আছে, কারণ এখানে দেখলাম লেখকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবার তেমন একটা উপযুক্ত জায়গা নেই। যখন পোল্যান্ডে ছিলাম, সেখানে প্রায় সারাদিনই রাইটার্স ক্লাবে পড়ে থাকতাম যেন নিজের ঘরেই আছি! প্রতিদিনই ক্লাবে যেতাম কিন্তু সেখানে আমেরিকার মতো এত দূরবর্তী কিছু ছিল না। এখানকার কোনও লেখককেই আমি নির্দিষ্টভাবে চিনি না। মাত্র একবার এক ককটেল পার্টিতে কয়েকজন লেখকের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল। তাদেরকে আমি খুব পছন্দ করে ফেলি, তাদের খুব আপন মানুষ বলে মনে হয়। কিন্তু কোনও এক কারণে সেটা স্মরণীয় সাক্ষাৎ হয়ে ওঠেনি। ভাবলে আমার খুব মন খারাপ হয়। অনেক লেখকের সঙ্গেই আমি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাই।   

সাক্ষাতকারী : 
সমসাময়িক বহু লেখককে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকতে দেখা যায়। জীবন ধারণের উপায় হিসেবে লেখকদের শিক্ষকতা করাকে কিভাবে দেখেন?

বাসেভিস সিঙ্গার : 
আমি তো বলব একজন লেখকের জন্য শিক্ষকতার চেয়ে সাংবাদিকতা অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর; বিশেষ করে তিনি যদি সাহিত্যের শিক্ষক হয়ে থাকেন। সাহিত্যের শিক্ষকতা করতে করতে সেই লেখক অবিরাম সাহিত্য-বিশ্লেষণে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। একজনের কথা বলি, তিনি হচ্ছেন সমালোচক, আমাকে বললেন- আমি কখনওই কিছু লিখতে পারি না কারণ অনেক ভেবেচিন্তে যখন প্রথম লাইনটি লিখেছি বলে ভাবছি সেই মুহূর্তে দেখতে পাই যে আমি পুরো একটি রচনা লিখে ফেলেছি। ইতোমধ্যেই আমি নিজের লেখার সমালোচনা করতে শুরু করেছি। 

একজন লেখক যখন একই সঙ্গে সমালোচক এবং লেখক- এটা কিন্তু ভাল কথা নয়। তবে হ্যাঁ, এটা কোনও ব্যাপারই নয় তিনি যদি মাঝে মাঝে পর্যালোচনামূলক লেখা লেখেন কিংবা লিখে ফেলেন সমালোচনা বিষয়ে পুরো একটি প্রবন্ধ। কিন্তু সমালোচনাসুলভ বিশ্লেষণ যখন একটা সার্বক্ষণিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়, এবং সেটা লেখকের জীবিকা হয়ে পড়ে, তখন হবে কী, এই ধারাটাই তার লেখার অংশ হয়ে পড়বে। একজন লেখক যখন আধা-লেখক এবং আধা-সমালোচক, ব্যাপারটা খুবই বাজে। তখন লেখক তার প্রধান চরিত্রদের নিয়ে প্রবন্ধ লিখতে থাকেন, গল্প বলার বদলে। 


সাক্ষাতকারী : 
আপনার কাজের ধরণ সম্পর্কে কিছু বলবেন? আপনি কি প্রতিদিনই লেখেন, সপ্তাহের সাত দিন? 

বাসেভিস সিঙ্গার :
ঠিক আছে বলছি। সকালে আমি যখন জেগে উঠি, লিখতে বসার একটা আকাঙ্ক্ষা আমার থাকেই আর প্রতিদিনিই আমি কিছু না কিছু লিখিই। কিন্তু আমাকে টেলিফোন কলগুলি ধরতেই হয়, মাঝেমাঝে ফরোয়ার্ড-এর জন্য আর্টিকেল লিখতে হয়। তার মধ্যে হয়ত কোনও একটি বইয়ের রিভিউ করতে হয়, এবং আমাকে আবার সাক্ষাৎকারীর কাছে সাক্ষাৎকারও দিতে হয়; আর ঠিক এভাবেই সবসময়ই আমি যেন অবরুদ্ধ হয়ে থাকি আর কোনও না কোনওভাবে আমি নিজেকে লেখায় ধরে রাখতে সচেষ্ট হই; আর এজন্য আমাকে অবশ্য কোথাও পালিয়ে যেতে হয় না। এমন কয়েকজন লেখক আছেন যারা বলেন যে তারা কেবল তখনি লিখতে পারেন যখন তারা সুদূরের কোনও দ্বীপে চলে যান। তারা অবশ্য ইচ্ছে করলে চাঁদেও চলে যেতে পারেন সেখানে কেউ তাদেরকে বিরক্ত করবে না। আমার তো সব সময়ই মনে হয় বাধাপ্রাপ্ত হওয়া কিংবা বিরক্তিকর পরিস্থিতিতে পড়াটা মানুষের জীবনেরই একটা অংশ, মাঝেমাঝে কাজে বাধাগ্রস্থ হওয়াটাও বেশ দরকারি, কারণ তাতে করে আপনি লিখতে গিয়ে বার বার আটকে যাচ্ছেন, লিখতে পারছে না, লেখা বন্ধ করে দিচ্ছেন কিন্তু আপনি যেন একটু বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ পেয়ে গেলেন, অন্য কিছু নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন, এতে করে আপনার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হবে কিংবা দেখার জগতের সীমানা বিস্তৃত হবে। সব কথাই আসলে আমি নিজের সম্পর্কেই বলছি, বলছি যে আমি আসলে কখনওই অবারিত শান্তির ভেতর বসে লিখতে পারিনি যেমনটা অনেক লেখকই পেরেছেন বলে তাদের মুখে শুনেছি। কিন্তু তবু, যা-ই হোক না কেন, নিজের সম্পর্কে আমি বলতেই থাকব যে লেখকের জন্য যত বাধাই থাকুক আসলে সেটা কোনও সমস্যা নয়। 


সাক্ষাতকারী :
লেখালেখির সবচেয়ে কঠিন দিক হিসেবে কোনটিকে চিহ্নিত করবেন?

বাসেভিস সিঙ্গার : 
স্টোরি কনস্ট্রাকশন। আমার জন্য এটাই হলো লেখালেখির সবচেয়ে কঠিন দিক। কীভাবে গল্পটিকে নির্মাণ করতে হবে যাতে গল্পটি কৌতূহলোদ্দীপক হয়। আমার কাছে সহজ উপায় হলো পরিকল্পনামাফিক প্রকৃত লেখাটি লিখে ফেলা। কোনোভাবে একবার যদি গল্পের সংস্থাপন কৌশলটি স্থির করে ফেলতে পারি, লেখাটি নিজেই তখন, বর্ণনা ও তার সমস্ত সংলাপসহ- নিজস্ব গতিতে তরঙ্গায়িত হতে শুরু করে।


সাক্ষাতকারী :
পশ্চিমের বেশিরভাগ লেখার নায়ক হচ্ছে সুপারম্যান এবং প্রমিথিউসের মতো চরিত্রের, এদিকে ঈডিশ ফিকশন এবংইহুদি লেখার নায়করা খুবই মামুলি, সামান্য মানুষ। সে গরিব কিন্তু আজীবন জীবন সংগ্রামে লিপ্ত গর্বিত এক লোক। আপনার লেখা সেই মামুলি লোকের সবচেয়ে ক্ল্যাসিক উদাহরণ- 'বোকা গিম্পেল' গল্পটি। বেশিরভাগ ঈডিশ ফিকশনের মামুলি এই নায়কের ব্যাপারে আপনি কি বলবেন? 

বাসেভিস সিঙ্গার : 
দেখুন, ঈডিশ লেখক কিন্তু কোনও নায়কের আইডিয়া নিয়ে বেড়ে ওঠে না, অর্থাৎ, আমি এখানে বলতে চাইছি যে ইহুদি গেটোগুলোয় নায়ক থাকে হাতেগোনা কয়েকজন- গুটিকয় নাইত, কাউন্ট এবং আরও কয়েকজন যারা ডুয়েল লড়ে থাকে। আমার নিজের বেলায়, আমি কিন্তু কখনওই ভাবিনি যে আমিও ঈডিশ লেখকদের পরম্পরা মতো 'সামান্য মানুষ' নিয়ে লিখব, কেননা তাদের বর্ণিত সেই 'সামান্য মানুষ'রা ছিল প্রকৃতই ভিকটিম, সে এমন এক মানুষ যে শিকার হয়েছে ইহুদি-বিদ্বেষের, অর্থনৈতিক বঞ্চনার; এবং আরও কিছুর যা তাকে ভিকটিম বানিয়েছে। আমার চরিত্ররা এই অর্থে খুব শক্তিশালী লোক নয় যে অর্থে এরকম লোককে মনে করা হয় যে সে দুনিয়ায় বড় কোনও ভূমিকা রাখবে কিন্তু সে আবার একেবারেই কিন্তু খুব সাধারণ না মামুলি কেউও নয়, তারা তাদের নিজেদের বৈশিষ্ট্যেই চরিত্রের লোক, চিন্তার লোক, এবং তীব্র যাতনা ভোগকারী লোক। হ্যাঁ, এ তো সত্য যে বোকা গিম্পেল খুবই মামুলি চরিত্র, তবে সে কিন্তু ঠিক এ ধরণের মামুলি নয় যতটা মামুলি শোলোম আলিশাম তাভিয়ে। তাভিয়ে সামান্য মানুষ যার আকাঙ্ক্ষাও সামান্য, আর কিছুটা কুসংস্কারেও সে আচ্ছন্ন। মাটি আঁকড়ে থাকার জন্য সব কিছুরই তার দরকার হয়। যদি যে টিকে থাকতে সমর্থ হয়, তাহলে তাকে তার গ্রাম থেকে কেউ উচ্ছেদ করতে পারবে না। সে যদি তার কন্যাদের বিয়ে দিতে সমর্থ হতো তাভিয়ে তাহলে এক সুখী মানুষে পরিণত হতো। আমার ক্ষেত্রে, আমার বেশিরভাগ নায়কই অল্প গুটিকয়েক রুবলে সন্তুষ্ট হতে পারে না, রাশিয়া কিংবা অন্য কোথাও থাকতে পারার অনুমতি পেয়েও তারা সুখী নয়। তাদের ট্র্যাজেডি ভিন্ন। গিম্পেল মামুলি মানুষ নয়। সে বোকা কিন্তু মামুলি নয়। সামান্য মানুষ মানেই একটা বিশেষ কিছু- নিজের লেখালেখিতে এই ঐতিহ্যকে আমি এড়িয়ে গেছি। 


সাক্ষাতকারী : 
আপনার বেশির ভাগ লেখাই তাদের নিয়ে যাদের হাতে ক্ষমতা নেই, তাদের কোনও ভূমি নেই, তারা দেশপরিচয়হীন, রাজনৈতিক দলে নাম নেই; এমনকি, নিজের জন্য পেশা পছন্দেরও ক্ষমতা তাদের হাতে নেই কিন্তু তারা নৈতিকভাবে উন্নত, তাদের বিশ্বাসের প্রতি অনুগত। এক্ষত্রে আপনি কি ইহুদিদের প্রতি বঞ্চনা ও বৈষম্যের প্রতিবাদে কোনকিছু বলতে চাইছেন? 

বাসেভিস সিঙ্গার : 
আসলে ক্ষমতা যে একটি বিরাট প্রলোভন- এ ব্যাপারে কোনই সন্দেহ নেই আর তারা যাদের হাতে ক্ষমতা রয়েছে, আজ হোক বা কাল অন্যায়ের কারণে তাদের পদস্খলন ঘটবেই। গত দুই হাজার বছর ইহুদিদের হাতে কোনও ক্ষমতা ছিল না- এটা কিন্তু বেশ ভাল একটা ব্যাপার, সৌভাগ্যের ব্যাপার। যদি অল্প কিছু ক্ষমতা তাদের হাতে থাকত তাহলে তারা সেই ক্ষমতার অপব্যবহার করতই- পৃথিবীর ক্ষমতাবানেরা যা করে আসছে। কিন্তু আমরা মহিমান্বিত ঠিক এই কারণে যে প্রায় দুই হাজার বছর আমরা পুরপুরি ক্ষমতাহীন হয়ে ছিলাম, তাই আমাদের কৃত পাপসমূহ মানুষের জীবন ও মৃত্যুর ওপর খবরদারি করবার মতো বড় পাপ নয়। কিন্তু আমার লেখাপত্রে তাদের আনছি ধর্মের বাণী প্রচারের উদ্দেশ্যে নয়। আমি তাদেরকে ভাল করে চিনিই না যাদের হাতে রয়েছে প্রচুর ক্ষমতা; আমি যখন পোলিশদের কথা লিখছি কিংবা কোনও একবার হয়ত কোনও ধনী লোকের কথা লিখলাম, যার ক্ষমতা ছিল তার টাকাপয়সার মধ্যে- শুধু তারা ছাড়া। 


সাক্ষাতকারী : 
আপনার লেখা থেকে আমার এই উপলব্ধিটি হয়েছে যে জ্ঞানের প্রাচুর্য আর প্রজ্ঞাকে আপনি সন্দেহের চোখে দেখছেন। 

বাসেভিস সিঙ্গার : 
হ্যাঁ, একদিক থেকে কথাটি সত্য। ঈডিশ সাহিত্যধারা গড়ে উঠেছিল আলোকায়নের আইডিয়াটি থেকে। আলোকায়ন- ব্যাপারটি জীবনের কতদূর পর্যন্ত যেতে পারবে সেটা কোনও ব্যাপার নয়, আসলে তার মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত মুক্তি আসবে না। সমাজতন্ত্র কিংবা অন্যকোনও মতবাদ মানুষকে ক্লেদাক্ত জীবন থেকে মুক্ত করবে, আর 'নতুন মানব' তৈরি করবে- সেরকম বিশ্বাসও আমার নেই। লেখকদের সঙ্গে এই বিষয়ে আমার অনেক তর্ক হয়েছে। আমি যখন তরুণ ছিলাম, যখন লিখতে শুরু করেছি, সেই সময়ে লোকের এই ধারনাটি ছিল যে একদিন উৎপাদনের উপকরণের মালিকানা সরকারের কাছে চলে যাবে আর 'নতুন মানব' তার সুফল ভোগ করবে। হাহাহা, আমি যথেষ্ট চালাক কিংবা চরম নির্বোধ আর এমন এক সন্দেহপ্রবন লোক যার কাছে মনে হয়েছি যে এসব আজেবাজে কথা। রেলপথ কিংবা কলকারখানাগুলির মালিকানা কার হাতে সেটা তো কোনও সমস্যাই নয়, মানুষ আগে যা ছিল, সবসময় সেরকমই থাকবে। 


সাক্ষাতকারী :
আজকের দিনে এমন বিশেষ কিছু আছে কি যার দ্বারা মানবতার সংরক্ষণ হবে? 

বাসেভিস সিঙ্গার : 
এমন কিছুই আর নেই যা আমাদের বাঁচাবে। আমরা ব্যাপক উৎকর্ষ সাধন করেছি কিন্তু আমাদের যাতনা বাড়ছে, দুঃখবোধ বাড়ছে, কিন্তু এই পরিস্থিতি অবসানের কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না, বরং প্রতিদিনই আমরা আরও নতুন নতুন যন্ত্রণা ও বেদনার জন্ম দিয়ে চলেছি। যে আইডিয়াটিতে বলা হয়ে থাকে যে মানুষকে রক্ষা করা যাবে তা একটি ধর্মীয় আইডিয়া, এমনকি আধ্যাত্মিক নেতারাও এই দুনিয়ায় মানুষকে রক্ষা করা যাবে এমন কিছু সম্পর্কে পরামর্শ দেবেন না। তারা বলে চাইবেন যে অন্য কোনও জগতে আমাদের আত্মারা রক্ষিত হবে, যদি আমরা এখানে উত্তম জীবনাচরণ করে থাকি, তাহলে একটা আশা থাকবে যে আমাদের আত্মার যাত্রা হবে স্বর্গে। এখানে, এই দুনিয়ায় স্বর্গ সৃষ্টির আইডিয়াটি কিন্তু ইহুদি আইডিয়া নয়, এবং অবশ্যই খ্রিস্টান আইডিয়াও নয়, সম্পূর্ণরূপে গ্রিক এবং প্যাগান। ইহুদিরা যেমনটা বলে থাকে, শুকরের লেজ থেকে তুমি সিল্কের পার্স বানাতে পারবে না। তুমি নিজে কারো জীবন নিতে পারবে না এবং হঠাৎই এই জীবন পরম আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে যেন বা এক আনন্দ সরোবর। আমি এসবে বিশ্বাস নেই একেবারেই। লোকে যখন শান্তিপূর্ণ পৃথিবীর কথা বলে তখন আমিও বলতে চাই যে কিছু নির্দিষ্ট শর্তের মাধ্যমে সেটা করা সম্ভব; সেটা সম্ভব করে তুলাটাই একটা বিশাল যুদ্ধ কিংবা যুদ্ধের নামান্তর; এখনও অশান্তি, অরাজকতা ও অসুস্থ্যতা ছড়িয়ে রয়েছে মাত্রাতিরিক্ত, আর আছে ব্যাপক ট্র্যাজেডি,- যা মানুষকে আরও বহুদিন প্রত্যক্ষ করতে হবে, আরও বহুদিন দুঃখভোগ করতে হবে, আর সেই আদিম কাল থেকে যা করে আসছে। হতাশাবাদী হওয়ার মানে আমার কাছে- বাস্তববাদী হওয়া। 

আমি অনুভব করি আমাদের সমস্ত দুঃখভোগ সত্ত্বেও, জীবন আমদের জন্য স্বর্গীয় আনন্দ না দেওয়া সত্ত্বেও, জীবনকালেই আমরা স্বর্গ সৃষ্টির আকাঙ্ক্ষা করি, মনে করি এই একটা জায়গা আছে থাকবার জন্য। মানুষ যে মহত্তম জিনিসটি উপহার হিসেবে পেয়েছে তা হলো স্বাধীন ইচ্ছা, কিন্তু স্বাধীন ইচ্ছার ব্যবহারে আমরা কিন্তু সীমাবদ্ধ। এই সীমাবদ্ধ স্বাধীন ইচ্ছাই আমাদের জন্য এক মহত্তম উপহার, জীবনকে চরম অর্থহীন করার বদলে একটু হলেও মূল্য প্রদান করে, আমাদের এই বেঁচে থাকাটাও সেই মূল্যের অন্তর্গত। যেখানে আমিও এক অর্থে নিয়তিবাদী লোক, আমিও এটা জানি যে আমরা যা চাই, যেখানে পৌঁছার আকাঙ্ক্ষা করি তার আকার অনেক বিস্তৃত। বহুদূর বিস্তৃত এই স্বাধীন ইচ্ছার কারণেই, শর্তগুলোর পরিবর্তন হওয়ার কারণে নয়, যেমনটা মার্ক্সবাদীরা বিশ্বাস করে। 


সাক্ষাতকারী :
বহু পাঠক মনে করে আপনি একজন শ্রেষ্ঠ গল্পকথক। অন্যরা অনুভব করেন যে আপনার লেখার মধ্যে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য থাকে, নিছক গল্প বলতে হবে বলে গল্প বলেন। 

বাসেভিস সিঙ্গার : 
হ্যাঁ, আমি মনে করি গল্পটি খুব ভাল করে লেখাটাই একজন গল্প কথকের দায়িত্ব। তিনি তার সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করলেই তবে সঠিক গল্পটি তার হাত দিয়ে বেরিয়ে আসবে। এই 'সঠিক' শব্দটি দিয়ে আমি আসলে বলবার চেষ্টা করছি গল্পটির নির্মাণ অবশ্যই সঠিক হতে হবে, বর্ণনা সঠিক হতে হবে, তাহলেই ফর্ম ও কনটেন্ট-এর মধ্যে ভারসাম্য আসবে, আসবে অন্যান্য সুস্থিতি। তবে, এটাই সবকিছু নয়। প্রতিটি গল্পের মধ্যে, আমি কিছু বলবার চেষ্টা করি, এবং যা বলার চেষ্টা করি তা কম-বেশি আমার আইডিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকে- এই বিশ্ব, এখানে আমাদের এরকম করে জীবনধারণ, তা-ই সবকিছু নয়, এরপর আত্মা আছে, এখানে ঈশ্বর রয়েছেন, আর সম্ভবত মৃত্যুর পরও এক জীবন আছে। আমি তো সর্বদাই এইসব ধর্মীয় সত্যের কাছে আসি যদিও আমি অন্ধবিশ্বাস বা গোঁড়া মতবাদ অনুসারে ধর্মবিশ্বাসী নই। আমি কখনওই প্রতিষ্ঠিত ধর্মের বিধিবিধান মেনে চলিনি। তবে ধর্মের মুল সত্যগুলো অনেকটাই আমার বিশ্বাসের কাছাকাছি এবং আমি সব সময়ই এসব নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে থাকি। আমি নিজেকে ইহুদি লেখক মনে করি, তারপর নিজেকে অনেক বেশি এক ঈডিশভাষী লেখক মনে করি, কারণ ইহুদি বিশ্বাসে ইহুদিদের চেয়ে আমি অনেক বেশি বিশ্বাসী। তাদের অনেকেই প্রগতিতে বিশ্বাসী। প্রগতিই তাদের আইডলে পরিণত হয়েছে। তারা মনে করে যে লোকে এমন এক পর্যায়ে উঠে আসবে যেখানে ইহুদিরা যেখানে সম্মানের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে, সমাজে ইহুদিদেরকে আত্তীকৃত করা হবে, ইহুদি নয় এমন লোকেদের সঙ্গে তারা সামাজিকভাবে মিশে যাবে, রুজগারের জন্য ভাল কাজ পাবে, এবং এটাও হতে পারে যে একদিন প্রেসিডেন্টও হয়ে যেতে পারে। আমার কাছে এই আশাগুলি খুব সাধারণ, অচল এবং ছোট। আমি অনুভব করি যে আমদের মহত্তম আশাগুলি ঘুমিয়ে আছে আমাদের আত্মায়, শরীরে নয়। এই দিক থেকে আমি নিজেকে একজন ধর্মবিশ্বাসী লেখক বিবেচনা করি। 


সাক্ষাতকারী :
মাঝেমাঝে আপনাকে পড়তে গিয়ে দূরপ্রাচ্যের কয়েকজন দার্শনিকের কথা মনে পড়ে, যেমন ভারতীয় দার্শনিক কৃষ্ণমূর্তি। বৌদ্ধ বা হিন্দু লেখাপত্রের কোনও প্রভাব কি আপনার ওপরে পড়েছে? 

বাসেভিস সিঙ্গার : 
এই লেখকদের অনেক পরে পড়েছি তাই আমার ওপর তাদের প্রভাবও তেমনটা পড়েনি। কিছুদিন আগে পড়তে শুরু করে নিজেকে বললাম তাদের না পড়েই তাদের ভাবনার সঙ্গে আমার ভাবনা মিলে যাচ্ছে! আমি যখন ভগবত গীতা পড়লাম, মনে হল খুব কাছের জিনিস পড়ছি, আর মনে হল আমি যদি জীবনের ফেলে আসা দিনে গীতা পড়তাম, বিস্মিত হতাম। আর ঠিক এই কথাই সত্য বুদ্ধের বাণী ও দূরপ্রাচ্যের অন্যান্য লেখাপত্রের ক্ষেত্রে। তথাকথিত অর্থে চিরন্তন সত্য বলতে আমরা যা বুঝি তা যে আসলেই চিরন্তন, চিরদিনের। চিরন্তন সত্যগুলি আমাদের রক্তে বাহিত হচ্ছে, আমাদের অন্তর্গত রক্তে খেলা করছে। 


সাক্ষাতকারী : 
এই সময়ের সাহিত্য পর্যালোচকেরা, বিশেষভাবে মার্শাল ম্যাকলুহান, মনে করছেন যে শত শত বছর ধরে আমরা সাহিত্য বলে যাকে মনে করছি, তা যেন কালবৈষম্যের শিকার হতে চলেছে, সাহিত্য যেন আর আগের মতো মনোযোগের কেন্দ্রে আসতে ব্যর্থ হচ্ছে। এখনকার গল্প ও উপন্যাসগুলি পড়ে তাদের ধারনা হচ্ছে সাহিত্য অচিরেই অতীত বিষয়ে পরিণত হতে চলেছে- রেডিও, টেলিভিশন, ফিল্ম, স্টেরিওফোনিক রেকর্ড, ক্যাসেটের ফিতা ইত্যাদি বৈদ্যুতিক বিনোদন মাধ্যম এবং যোগাযোগের আরও কিছু উপকরণ এখন পর্যন্ত যা উদ্ভাবিত হয়েছে- এই উপকরণগুলির কারণে। তাদের এই আশংকা কি সত্য বলে মনে করছেন? 

বাসেভিস সিঙ্গার : 
আমাদের লেখকরা যদি ভাল লেখক না হন তাহলেই তাদের আশংকা সত্যে পরিণত হবে। তবে আসার কথা এই যে গল্প বলার শক্তি আছে এরকম লোকের আমাদের অভাব নেই, এবং অবশ্যই তাদের পাঠকও আছে। আমি তো এমনটা ভাবতেই পারি না যে মানুষের স্বভাবে এমন পরিবর্তন ঘটে গেছে, যার কারণে 'ওয়ার্ক অব ইমাজিনেশন'-এর প্রতি সে তার সমস্ত আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। সুনিশ্চিতভাবে বলা যায়- সত্য ঘটনা, আসলে ঘটনা সব সময়ই আগ্রহোদ্দীপক। দেখুন, আজ কিন্তু নন ফিকশন বেশ গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে চলে এসেছে... কী ঘটেছে, কী ঘটতে চলেছে- এইসব ব্যাপারে লোকের আগ্রহ এখন চরমে। মানুষ যদি চাঁদে যায়, তাহলে তার চাঁদে যাওয়ার ব্যাপার নিয়ে সাংবাদিকরা লিখে জানাবেন, এ নিয়ে ফিল্ম তৈরি হবে, চাঁদে লোকে কী করছে, কী কী ঘটছে সেখানে, আর এইসব গল্প কিন্তু অনেক আগ্রহোদ্দীপক হয়ে উঠবে অন্য সকলের চেয়ে- একজন ফিকশন লেখক যখন গল্পটি লিখবেন। ভাল লেখকের জায়গাটি কিন্তু এখনও হারিয়ে যায়নি। কোনও যন্ত্র, কোনও সংবাদ প্রতিবেদন, আর কোনও ফিল্মের পক্ষে কখনওই সম্ভব নয় একজন টলস্টয়, একজন দস্তয়েভস্কি কিংবা গোগোল যা করেছেন তা করতে পারবে। তবে এটা সত্য যে আমাদের কালের কবিতাগুলি যেন বিস্মৃতির দিকে যাচ্ছে। কিন্তু এর জন্য টেলিভিশন কিংবা অন্য কোনও কারণ নয়, বলতে হবে কবিতা নিজেই খারাপ হয়ে গেছে। আমাদের যদি প্রচুর সংখ্যক খারাপ উপন্যাস থাকে আর খারাপ উপন্যাসিকরা একজন আরেকজনকে অনবরত অনুকরণ করতে থাকেন, তাহলে তারা যা লিখবেন তা না হবে আগ্রহোদ্দীপক, আর কেউ সেগুলি বুঝবে না। আসলে এভাবেই হয়ত একটা বিশেষ সময়ের উপন্যাসকে মেরেই ফেলা হচ্ছে। আমি মনে করি না যে ভাল সাহিত্যের প্রযুক্তিকে ভয় পাওয়ার কিছু আছে। ব্যাপারটা একেবারেই ভিন্ন। প্রযুক্তির ব্যবহার যত বাড়বে ততোই মানুষ আগ্রহী হয়ে উঠবে যন্ত্রের সাহায্য ছাড়া মানুষের মন কী সৃষ্টি করছে এটা জানার জন্য। 


সাক্ষাতকারী : 
সুতরাং, আজকের তরুণদেরকে আপনি জীবন যাপনের একটি উপায় হিসেবে সিরিয়াস সাহিত্যের প্রতি আগ্রহী হতে বলবেন? 

বাসেভিস সিঙ্গার : 
সাহিত্যের ব্যাপারটি যখন বাণিজ্য অর্থে আসে, লেখালেখির সঙ্গে টাকাপয়সার সম্পর্কটি প্রধান হয়ে দাঁড়ায়, ঠিক তখন আসলে কী করা উচিত সে সম্পর্কে আমার জানা নেই। এটা হয়ত এমন হতে পারে- একটা সময় আসবে, যখন উপন্যাসিকরা খুব অল্প পরিমাণ সম্মানী পাবেন, যা আসলে প্রয়োজনের তুলনায় যৎসামান্য। যদি কোনও তরুণ আমার কাছে আসে, যদি সেই তরুণের ভিতর সম্ভাবনার একটুও ঝিলিক দেখতে পাই, সে যদি আমাকে তার লিখতে পারার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে, জানতে চায় যে সে লিখতে পারবে কি না, তখন, আমি তাকে বলব- যাও, নতুন কোনও উন্মোচনে ভীত না হয়ে বা সফলতায় উল্লিসিত না হয়ে অবিরাম খুঁড়তে থাকো, ক্লেদাক্ত হও। প্রগতি কখনও সাহিত্যকে হত্যা করে না, ধর্ম বিশ্বাসকে হত্যা করে অনেক বেশি। 


সাক্ষাতকারী : 
এটা আসলে খুঁজে বের করা অনেক কঠিন এক কাজ যে আমেরিকায় বহু পঠিত ও সম্মানিত লেখকদের মধ্যে বেশিরভাগই হচ্ছেন ইহুদি, যেমন- আপনি, সোল বেলো, ফিলিপ রোথ, হেনরি রোথ, বারনার্ড মাল্মুদ। ইহুদি নন এমন অনেকেও ইহুদি থিম নিয়ে লিখছেন এবং সেই লেখা বেস্ট সেলারও হয়েছে; উদাহরণস্বরূপ বলছি, জেমস মিশেনর এবং তার বেস্ট সেলার 'দ্য সোর্স'। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়কালে ইহুদি থিম এবং ইহুদি লেখকের তুমুল পাঠকপ্রিয়তাকে কিভাবে বিবেচনা করবেন? 

বাসেভিস সিঙ্গার : 
দেখুন ইহুদিরা কিন্তু কয়েকশ বছর ধরে সাহিত্যে উপেক্ষিত ছিল। তারা ইহুদিদের নিয়ে যা কিছু লিখেছে খুব সস্তা, অতি ব্যবহৃত মামুলি সব কথাবার্তা। ইহুদি হয় সুদখোর, খুব বাজে লোক, এক একজন শাইলক; আর না হয় সে- হতদরিদ্র, ইহুদি-বিদ্বেষের ভিকটিম। অন্যভাবে বললে, তাদের শুধু তিরস্কার করা হয়েছে কিংবা তাদের করুণা করা হয়েছে। আর এসব কারণেই ইহুদিদের জীবনধারা, তার প্রেম মানবজাতির কাছে গোপন থেকেছে। এই তো অল্পকিছুদিন ধরে ইহুদি লেখকরা ইহুদিদের উপজীব্য করে সত্যকারের সাহিত্য রচনায় হাত দিয়েছেন ঠিক যেমন আমেরিকানরা আমেরিকানদের নিয়ে লিখছেন, ইংরেজ লেখক লিখছেন ইংরেজদের নিয়ে। তারা তাদের নিয়ে রক্তেমাংশে লিখছেন, ভাল-মন্দ সব উঠে আসছে। আর তাতে কিন্তু তারা কারো কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করার চেষ্টা করছেন না, কাউকে তিরস্কার করারও চেষ্টা করছেন না। আমি আসলে বলতে চাইছি যে এইসব লেখাপত্রের কারণেই ইহুদি জীবনাচরণের প্রতি ব্যাপক আগ্রহের জন্ম হয়েছে আর আমি কিন্তু মোটেও বিস্ময়াবিভুত নই এই ব্যাপারটি জেনে যে ইহুদি সাহিত্য এখন এক জনপ্রিয় ফ্যাশন। তার মানে কিন্তু মোটেও এই নয় যে এই সাহিত্য শুধুই এক ফ্যাশন। আমি বিশ্বাস করি যে আজ হোক কিংবা কাল এই সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ ফসল ফলবে। কতজন ইহুদি ভাল লেখক বা খারাপ লেখক আমি তা জানি না আর আমি এটাও মনে করি না যে লোকে যেরকম মনে করছে ঠিক সেই সংখ্যক ভাল লেখক আমরা তৈরি করতে পেরেছি। আমাদের অনেক প্রাজ্ঞ, প্রভূত সহজাত গুণসম্পন্ন লেখক রয়েছেন, আর আছেন দক্ষ জনশক্তি; তবে আমি মনে করি বড় লেখক আমাদের হাতেগোনা মাত্র কয়েকজনই আছেন, ঠিক যেমন অন্যান্য দেশেও হাতেগোনা উল্লেখযোগ্য লেখক থাকেন। সব দেশেই বড় লেখক আছেন দু-একজন।




অনুবাদক পরিচিতি
এমদাদ রহমান
সিলেটে জন্ম। ইংল্যান্ড প্রবাসী।
গল্পকার। অনুবাদক। 

1 টি মন্তব্য:

  1. জাহেদ মোতালেব২১ এপ্রিল, ২০১৭ ৩:১০ PM

    সাক্ষাৎকার পড়ে খুবই ভালো লাগল। এমদাদ রহমানকে অনেক ধন্যবাদ।

    উত্তরমুছুন