শনিবার, ১৫ এপ্রিল, ২০১৭

সাদিক হোসেন'এর গল্প : হায়দার আলি যা কিছু হতে পারত

হায়দার আলি যা কিছু হতে পারত। কিন্তু এখন অতগুলো স্কুল বাচ্চার সামনে দাঁড়িয়ে তার নিজেকে কেমন অদ্ভুত মনে হল। 

প্রেয়ার সবে শেষ হয়েছে। অন্যদিন হলে বাচ্চারা এই সময় ক্লাসরুমে ঢোকবার জন্য হুড়োহুড়ি বাঁধিয়ে দিত। তবে আজকের দিনটা অন্যরকম। হেডস্যার হায়দারকে পাশে দাঁড় করিয়ে বক্তৃতা দেওয়া শুরু করে দিয়েছেন।

হায়দার আর কী করে। এইসময় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকাটাই নিয়ম। তাকে যতটা অসহায় লাগবে, হেডস্যারের বক্তৃতা ততটাই জোরালো শোনাবে। সে তার হাত দুটো এমন ভাবে কোমরের নিচে ঝুলিয়ে রাখল যে দূর থেকে তাকে ঠিক ন্যালব্যালে লতাপাতার মত মনে হতে লাগল। সে শিরদাঁড়া বেঁকিয়ে নিয়েছে। যেন জিজ্ঞাসার চিহ্ন। দেখে বোঝা মুশকিল সে কখনও সোজা ভাবে হাঁটতে পারত কি না! তবে তার কানটা খাড়া। হেডস্যার তার সমস্যার কথা বলতে গিয়ে কোথাও ভুলচুক করছেন কিনা সেই দিকে তার নজর রয়েছে ঠিক।

হেডস্যার বক্তৃতার শেষে হায়দারের দিকে তাকালেন। বুঝি হায়দার কিছু বলতে চাইলে তিনি সেই সুযোগও আজ তাকে দেবেন। কিন্তু হায়দার মুখে কিছু বলল না। বরঞ্চ এমন ভান করে হেডস্যারের দিকে তাকাল যাতে হেডস্যারের মনে হতে পারে সবই অদৃষ্টের খেলা। এবং তিনিই হায়দারকে মুক্ত করতে এগিয়ে এসেছেন। হেডস্যার মহৎ মানুষদের মত খুশি হয়ে গেলেন।

তবে হায়দার জানে, হেডস্যারের মুখ দিয়ে এতসব বলিয়ে দেবার পেছনে যিনি আছেন, তিনি অঙ্কের টীচার, সমীরণ গাঙ্গুলি।

সমীরণ স্যার বাকপটু। বেশীদিন হয়নি তিনি স্কুল জয়েন করেছেন। এই বছর দুয়েক বোধহয়। এত কম সময়ে কোন দারোয়ানের সঙ্গে টীচারের সম্পর্ক ঘনিষ্ট হয়না। তারওপর হায়দার তো ঠিক দারোয়ান নয়। সেই সাত বছর আগে রামদয়াল মরে যাবার পর তাকে নেওয়া হয়েছিল। এখনও পার্মানেন্ট করা হয়নি। ফলে দারোয়ানগিরি ছাড়াও তাকে আরও কয়েকটি কাজ এক্সট্রা করে দিতে হয়। টীচাররা আসতে শুরু করেন পৌনে এগারোটা নাগাদ। অথচ তাকে পৌঁছে যেতে হয় দশটার মধ্যেই। প্রথমেই ক্লাসরুম গুলো খুলে, ঝাঁট দিয়ে, তারপর টীচাররুমে ঢুকে জলের বোতলগুলো ভর্তি করে দেওয়া তার রোজকার কাজের মধ্যে পড়ে। তাছাড়া হেডস্যার জানিয়ে দিয়েছেন, টিফিনের পরে অনেক ছাত্রই আর স্কুলে ফিরছে না। গার্জেন কল করেও কোন লাভ হয়নি। উপরুন্তু তাদের বাপ-মা এলে ঝামেলা আরও বেড়ে যায়। এই তো সেদিন মিড-ডে মিল নিয়ে সে-কী কাণ্ড! হায়দারের মনে হয়েছিল এই বুঝি ভাংচুর শুরু হল এখন। তবে ম্যানেজিং কমিটির মেম্বাররা যা হোক সামাল দিয়েছিলেন। তা না হলে অসীমবাবুর মাথা ফাটত ঠিক। অসীমবাবু বাংলা পড়ান। কোন একসময় নাকি পার্টি করত খুব। সেই সূত্রেই চাকরীটা গছিয়েছে। তবে এসবই শোনা কথা। হায়দারকে কে আর আগ বাড়িয়ে এতসব শোনাতে চাইবে। কিন্তু কিছু কথা এমনিই হাওয়াতে ওড়ে। এই যেমন, হায়দার লক্ষ্য করেছে, অসীমবাবু হেডস্যারের অ্যান্টি হওয়া সত্বেও কদিন ধরে মিড-ডে মিলের বাজার করা নিয়ে আবার এক জায়গায় চলে এসেছেন। এখন বাইরে থেকে যতই তাদের আলাদা আলাদা মনে হোক না কেন, ভেতরে কিন্তু এক। এটাও হাওয়ায় ভাসছে অসীমবাবুর মেয়ের বিয়েতে হেডস্যার সোনার আংটি গিফট করেছিলেন। 

সব জায়গাতেই সমান! হায়দার নিজের মনে এইসব শান্ত্বনা বাক্য আউড়ে যতটা সম্ভব চুপচাপ থাকে। এমনিতে তার টেনশান তো কম নয়। একে তো চাকরীটা পার্মানেন্ট হল না। ওদিকে খবর পাওয়া যাচ্ছে রামদয়ালের ছেলে সোর্স লাগিয়েছে। হায়দারের দারোয়ানগিরি গেল বলে। আশার কথা শুধু এই, তার দেহভঙ্গির মধ্যে এমন কিছু ইঙ্গিত আছে, যা দেখলেই ভদ্দরলোকদের মায়াভাব জেগে ওঠে। 

হায়দারের চোখ ঘোলাটে। চোখের উপর ভ্রূ দুটো এমন ভাবে বিন্যস্ত যে তাকে একই সঙ্গে বিষন্ন ও প্রাচীন বলে মনে হয়। সে হাসে না, হাসলেও বোঝা যায়, সে খুব কষ্ট করে হাসছে। টীচার রুমের বাইরে একখানা বেঞ্চ ফেলা রয়েছে। সে টিফিন পিরিয়ডে সেই বেঞ্চিতে বসে মুড়ি চিবোয়। তার মধ্যমা কাটা পড়েছিল অনেকদিন আগে। ফলে মুঠো ভর্তি মুড়ি নেবার সময় সে বেশ সজাগ থাকে যাতে তার এই মূল্যবান খাবার মেঝেয় না গড়িয়ে পড়ে। না, হায়দার অবশ্য তার এই খাবারটিকে মূল্যবানও ভাবে না। সে যে কী ভাবে তা বলা বেশ মুশকিল। তবু প্রতিদিন একই জিনিস খেয়ে গেলেও তার মধ্যে যেহেতু কোন বিরক্তের প্রকাশ দেখা যায়নি – অনুমান করা যায় – ভরদুপুরের এই মুড়ি চিবনোকে সে প্রায় গাছের সালোক সংশ্লেসের মত প্রাকৃতিক বলে ভেবে নিয়েছিল। 

কিন্তু হেই দেখো, এখন বেঞ্চিতে বসে খাবার আরামটাও চলে গেল তার। হেডস্যারের নির্দেশ, তাকে তাই ছেলে পালানো রুখতে টিফিন পিরিয়ডের সময় গেটের সামনে পাহারা দিতে হচ্ছে। কিন্তু পাহারাটাই বা দিচ্ছে কোথায়? প্রায় সময় তাকে স্কুল মাঠে ছেলেদের পেছনে দৌঁড়তে হচ্ছে। তার এক হাতে মুড়ির ঠোঙা, অন্য হাতে ভাঙা কঞ্চি। ওদিকে ছেলেরা যেন প্রত্যেকেই চে গুয়েভারার ‘গেরিলা ওয়ারফেয়ার’ পড়ে পণ্ডিত বনে গেছে। একদল তাকে মাঠের মধ্যে দৌঁড় করাচ্ছে তো অন্যদল ততক্ষণে পাঁচিল টপকিয়ে ধাঁ।

সেদিন সে বিস্তর হাঁফিয়ে উঠেছিল। টীচার রুমের ভেতরে ফিল্টার বসানো হয়েছে। হায়দারের নিজস্ব কোন বোতল নেই। একটা কমন গ্লাস আছে। সেই গ্লাসে ঠোঁট না ঠেকিয়ে সে জল খেয়ে থাকে। কিন্তু সেদিন কী যে হল! সে আর ফিল্টারের কাছে যেতে পারল না। যে বোতলটা চোখের সামনে পেল, সেটাই তুলে নিল। 

জল খাওয়া শেষ। সমীরণ গাঙ্গুলি তার দিকে চেয়ে হাসছেন। হায়দার বুঝতে পারল সে কী ভুল করে ফেলেছে। তবে এই সব ভুলে তো আর ক্ষমা চাওয়া যায়না। সে তাই ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে স্যারের দিকে। 

কিন্তু স্যারের চোখ তখন অন্য কিছু খুঁজছিল, আপনার মাঝখানের আঙুলে কী হয়েছিল?

হায়দার ছোট্ট করে গল্পটা শুনিয়ে দিল। 

হায়দারের গল্পটা শুনে সমীরণ গাঙ্গুলি খানিকটা উদাস হয়ে গেলেন। দূর্গাপুর গ্লাস ফ্যাক্টরি? তিনি নিজের মনেই যেন উচ্চারণ করলেন। দূর্গাপুর গ্লাস ফ্যাক্টরিতে আমার বাবাও কাজ করতেন।

- ও। হায়দার আর কিছু উৎসাহ দেখালো না। 

তবে সমীরণ গাঙ্গুলি হায়দারের পিছু ছাড়বার লোক নন। টাইম পেলেই হায়দারকে টীচার্স রুমে ডেকে নেন। এতদিনে হায়দারও বুঝে গেছে আগ বাড়িয়ে নিজের কথা কখনো জানাতে নেই। এতে ভদ্দরলোকরা মনে করে লোকটার চাহিদা বড্ড বেশী। পরে আর পাত্তা দিতে চায় না। তার চেয়ে এই ভাল, লোকটা মনে করুক লোকটা নিজের তাগিদেই সব কিছু জেনে নিচ্ছে। এতে যেমন নতুন কিছু আবিস্কারের আনন্দ পাওয়া যাবে, তেমনি অন্য জনের দুঃখে দুখী হবার মহান অনুভব থেকে সে কিছুতেই নিজেকে বঞ্চিত রাখতে চাইবে না।

সমীরণ গাঙ্গুলি হায়দারের ছোট বেলার গল্প শুনল। তার চোখের সামনে এমন এক চিত্রকল্প ভেসে উঠল যেখানে শসা ক্ষেত থেকে কিছুদূর এগোলে ফুটিফাটাময় আনাজপত্তর ঘোলাটে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে খালি। তারপর বৃষ্টি নামল।

- তারপর?

হায়দার আলি জানাল, চাষের জমিন। একবার পলি ঢুকে গেলে আর তেমন চাষ হয় না। দেদার লস। 

- তো?

সমীরণ স্যার খানিক চুপ মেরে বসে থাকলেন। কখনো আবার বাঁধাকপির মত, উচ্চের মত, পটল ও ঝিঙ্গের মত হায়দার আলি কিভাবে গ্রাম থেকে শহরে চালান হয়ে গিয়ে গ্লাস ফ্যাক্টরিতে জয়েন করেছিল – সেইসব খবর শুনলেন। তিনি দেখতে পেলেন ফার্নেসের সামনে জোয়ান হায়দার দাঁড়িয়ে রয়েছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সূর্যের মত জ্বলে পুড়ে উঠছে যেন বা। 

পুজোর ছুটিতেই হায়দার খবরটা পেল। রামদয়ালের ছেলে যাকে সোর্স হিসাবে ব্যবহার করছে সে আর কেউ না – বাংলার অসীমবাবু। তা হায়দারকে সরাতে পারলে অসীমবাবুর লাভ হয় কীসে? হায়দার কিছুতেই ছকটা বুঝতে পারল না। এর মধ্যে একদিন সে ম্যানিজিং কমিটির মেম্বার কালীকৃষ্ণ মিত্তিরের বাড়িতে রামদয়ালের ছেলেকে বাজার পৌঁছে দিতে দেখে ফেলল। 

তার মানে কালীকৃষ্ণ আর অসীমবাবু প্যাক্ট হয়েছে? স্কুলে ভোট হতে এখনও তো বেশ বাকি। এত আগে থেকেই তারা ভোটের বন্দবস্ত শুরু করে দিয়েছে? আর রামদয়ালের ছেলে? তার হিসেবটা মিলছে না তো! সরকারি খাতায় দারোয়ানের পোস্টটা আবশ্য এখনও খালি!

হায়দার আলি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল।

আর তখনি, কী আশ্চর্য, প্রায় অদৃষ্টের লীলার মতই ঘটে গেল ঘটনাটা।

পুজোর ছুটির পর স্কুল খুলল। হায়দার আলি কাগজটা ডান পকেটে এমন ভাবে রাখল যাতে সামান্য এদিক ওদিক হলেই সেটা যত্রতত্র উঁকি দিতে পারে।

যেমনটা ভাবা হয়েছিল – ঠিক তেমনটাই ঘটে গেল।

সমীরণ বাবু জিজ্ঞেস করলেন, প্রেসক্রিপশন মনে হচ্ছে। আপনার শরীর খারাপ? দেখি তো।

- আমার শরীর খারাপ নয়।

- তাহলে?

হায়দার আলি প্রেসক্রিপশনটা এগিয়ে দিয়ে বিশদে বিবরণ দিল।

সমীরণ বাবু বেশ চিন্তিত স্বরে বললেন, এখানে কি লেখা আছে জানেন?

হায়দার আলি মাথা নাড়াল।

- এঞ্জিওগ্রাম করাতে হবে। খোঁজ খবর নিয়েছেন কিছু? এটা না করালে কিন্তু চিকিৎসা শুরু করা যাবে না। 

- সরকারি হাসপাতাল গুলোয় গেছিলাম। কোথাও তিন মাসের আগে ডেট পাচ্ছি না।

- হুম। সমীরণ বাবু কী যেন ভেবে নিয়ে বললেন, ডাক্তার কী বলেছে?

হায়দার আলি নিজেকেই শোনাল, সিরিয়াস!


এখন টীচার্স রুমে হায়দারের প্রায়শই ডাক পড়ে। সমীরণ বাবু তার স্ত্রীকে কাকিমা বলে সম্বোধন করেন। তবে ইতিহাসের টীচার অনেক দূর থেকে এদিকে আসেন। তিনি বলেন, আপনার পরিবার আছেন কেমন? খেতে পারছে ঠিকঠাক?

হায়দারকে মুখে তেমন কিছু বলতে হয়না। তার চেহারাই উত্তর গুলো দিয়ে দেয়।

দিন পনেরো পর সমীরণ বাবু বললেন, একটা ব্যবস্থা করা গেছে। আমার এক বন্ধু এস এস কে এম-এ প্রাক্টিস করে। মনে হচ্ছে খুব তাড়াতাড়ি আমরা এঞ্জিওগ্রামটা করে নিতে পারব।

হায়দার আলি একমুখ দুশ্চিন্তা নিয়ে তাকাল।

- অত ভাববেন না। আমরা তো আছি।


স্কুল ছুটি হয়ে গেছে। ক্লাসরুম গুলোয় চাবি দিতে দিতে হায়দার আলি চমকে উঠল। সেই যে বন্যার সময় তাদের গ্রামের স্কুলটাকে ত্রাণ শিবির বানিয়ে দেওয়া হয়েছিল – এখন তার মনে হল, সে যেন আবার ত্রাণ শিবিরের ভেতর আঁটকে পড়েছে। তারপর বন্যার জল সরে গেলে তাদের স্কুল থেকে বার করে দেওয়া হবে। তখন কোথায় জমিন, কোথায় ঘর উঠোন, কোথায় কী! গুড়-চিড়ে খেয়ে এতদিনে পেটের যে গর্তটাকে বোজানো হচ্ছিল, এবার বুঝি সেই গর্তটা সুড়ঙ্গের মত ক্রমশ আরও গভীরে চলে যাবে। তারপর সেই সুড়ঙ্গের হদিস আর কেউ কোনদিন পাবে না। 

বিপর্যয়ই যে হায়দারের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখে – তা আর বুঝবে কে?

হায়দার আলি ভয় পেতে শুরু করেছিল। এঞ্জিওগ্রামের রিপোর্টে যদি কোন দোষ ধরা না পরে? যদি জানা যায় তার বউ-এর বুকের ব্যথাটা নিছকই অম্লজনিত কারণে ঘটছে – তখন? থাকতে থাকতে হায়দার আলি রামদয়ালের ছেলের পদচালনা শুনতে পায়। সে আরও বিষন্ন হবার চেষ্টা করতে থাকে। অর্ধনিমীলিত চোখে চারদিকে তাকায়। কেউ ডাকলে প্রথম বারে সাড়া দেয় না। যখন সাড়া দেয়, মনে হয়, তার গলায় কফ জমে আছে – কাশলেই কফের সঙ্গে রক্ত বেরিয়ে আসতে পারে।

ডাক্তারের সন্দেহ অমূলক ছিল না। এঞ্জিওগ্রামে তিনটে ব্লক ধরা পড়েছে। কন্ডিশন বেশ আনস্টেবল। শীঘ্রই বাইপাস করাতে হবে।

যাক। হায়দার খানিকটা নিশ্চিন্ত হল। অন্তত অপারেশন অব্দি রামদয়ালের ছেলের পদচালনা তাকে শুনতে হবে না। এত খারাপ অবস্থায় চাকরী নিয়ে নেবার মত জাহেল মানুষ এঁরা কেউ নয়!

কিন্তু রাত আসে। রাত গভীর হয়। মাঝ রাত্তিরে তার বউ যখন জিভের তলায় সরব্রিটেট দিয়ে বসে থাকে, ঘাড় আর চোয়াল ধরে আসে তার – সে, হায়দার আলি, টেনশনে কেন্নোর মত গুটিয়ে যেতে থাকে। বউ-এর মৃত্যু মানে বিষন্নতার অবসান – মানে রামদয়ালের ছেলের পদচালনা...

এতদিনে হায়দার আলি জেনে গেছে কিছু কিছু সমস্যার কোন সমাধান হয় না। তখন ঝুলে থাকাটাই শ্রেয়। ঝুলে থাকাটাই বুদ্ধির পরিচয়। জিভ আর সরব্রিটেটের মধ্যবর্তী ঘনত্বের মতই সে বাকি জীবন ঝুলে ঝুলে থাকতে চায়।

ওদিকে সমীরণ গাঙ্গুলি তার ডাক্তার বন্ধুর সঙ্গে পরামর্শ করে বললেন, যা বুঝছি সরকারি হাসপাতালের জন্য ওয়েট করবার টাইম আমাদের আর নেই। কিছু এনজিও-তে আমার জানাশোনা আছে। আমি দেখছি কী করা যায়। নিশ্চয় কোন রাস্তা আমরা বার করব।

অসীম বাবুর কিছু পলিটিক্যাল কানেকশন ছিল। তিনি সেই সব ব্যবহার করতে চাইলেন যাতে সরকারি হাসপাতালে অপারেশনটা করানো যায়। আদতে কোন কিছুই কাজে দিল না।

সমীরণ স্যার হায়দারকে নিয়ে বেশ কয়েক জায়গায় ঘুরলেন। একটা এনজিও থেকে মনে হচ্ছে কিছু করা যেতে পারে। তবে টাইম এতটাই কম যে সেই আশায় না বসে থাকাটাই ভাল।

তাহলে?

সমীরণ স্যার-ই প্রথমে কথাটা তুললেন, আমরা ক্রাউড ফান্ডিং করতে পারি।

- মানে? 

- ধরুন আমরা প্রত্যেকেই যে যার সাধ্য মত কিছু ডোনেট করলাম। ফেসবুকে একটা একাউন্ট নম্বর দিয়ে অ্যাপিল করলাম। তাছাড়া আমাদের এতগুলো ছাত্র রয়েছে। তারা তাদের বাড়িতে গিয়ে বলল। এই ভাবে তো এখন ফিল্ম বানানো হয়, আর আমরা একটা মানুষকে বাঁচাতে পারব না?

সকলেই একমত। অসীম বাবু একটু বেঁকে বসলেন। বিশেষত অভিভাবকদের এইসবের মধ্যে জড়াতে তিনি রাজি ছিলেন না। শেষে ঠিক হল অভিভাবকদের ডেকে কোন মিটিং করবার দরকার নেই। হেডস্যার নিজে হায়দার আলিকে সঙ্গে করে ছাত্রদের কাছে আর্জি জানাবেন।

ফেসবুকে পেইজ করা হয়েছিল। তবে তা ডাহা ফ্লপ। ছাত্রদের কাছ থেকে যতটুকু আশা করা গেছিল তত টাকা উঠল না। বেশির ভাগটা শিক্ষকরা নিজেরাই দিলেন। সবাইকে অবাক করলেন ইতিহাসের স্যার। তিনি একাই পাঁচ হাজার।

শেষ পর্যন্ত যা দাঁড়াচ্ছে, হায়দারের বউ সম্ভবত এ-যাত্রায় বেঁচে যেতে পারে।

এখন আর হায়দারকে তাই অত বিষন্ন ভাবে থাকলে চলে না। সে তার চোখমুখে সামান্য ফর্সা আলো এনেছে। যদিও দুখী ভাবটা তার চরিত্ররই অংশ – এটি যাবার নয়।

অবশেষে হায়দারের বউ একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে গেল। আমি সমীরণের সঙ্গে হাসপাতালে গেছিলাম।

আজকে অপারেশন হবে না। অপারেশন হবে আগামিকাল। টাকা জমা দেওয়া হয়ে গেছে। আজ সারাদিন ধরে বিবিধ টেস্ট চলবে।

আমি নিজের পরিচয় দিতে হায়দার বেশ ঘাবড়ে গেছিল। সমীরণ যেমন জানিয়েছিল, তেমনই। হায়দার একবার আমার দিকে তাকিয়ে আবার ঘাড়টা নিচু করে নিল। আমার সম্বন্ধে কী যে ভাবল তা বুঝলাম না।

বিকেলের দিকে আমরা চা খেতে বাইরে গেছিলাম। হায়দার আমাদের সঙ্গে এল না। বলল, যদি দরকার পড়ে? আমি আছি। আপনারা যান।

আমরা উঠে পড়লাম।

বেরিয়ে যেতে যেতে আর একবার হায়দারকে দেখবার চেষ্টা করছিলাম।

এই লোকটা বন্যা দেখেছে, উদ্বাস্তু চাষিদের না-হয়ে যাওয়া দেখেছে, কারখানায় ডান হাতের আঙুল খুইয়েছে, আবার ফ্যাক্টরিতে স্ট্রাইকও করেছে এরাই।

হায়দার আলি সত্যিই যা কিছু হতে পারত।
তবে এখন, এই মুহুর্তে, সে শুধু রামদয়ালের ছেলের পদচালনাই শুনতে পাচ্ছে।

৪টি মন্তব্য: