বুধবার, ১৭ মে, ২০১৭

রুমা মোদকের গল্প : জিঘাংসা

তখন ঈশান কোণ ছেয়ে গেছে কালো মেঘে, গাছের ডালে ডালে তখন কেবল হালকা বাতাসের দাপাদাপি শুরু হয়েছে। পৌছেনি উন্মত্ততায়, দাঁড়কাকগুলো তীব্রস্বরে চেঁচায় আর লাফায় এ গাছ থেকে ও গাছে, তখন খান বাড়িতে কামলা, মুনীশ, ঝিদের হঠাৎ হুড়োহুড়ি পড়ে যায়, বিস্তীর্ণ উঠোনজুড়ে মেলে দেয়া আধ শুকনো ধানগুলো গোলায় তুলতে, তুমুল হাত চালায় তারা আর ঘন ঘন দেখে আকাশের চেহারা। আকাশের চেহারাটা অপরিচিত নয়, তবু বিজ্ঞ চোখ বিশ্বাস করে না এই আকাশকে, তছনছ করে দিতে পারে নিমিষে, আবার সুবোধ বালকের মতো হয়ে যেতে পারে সমস্ত মেঘ উড়িয়ে দিয়ে।
বাতাসের ক্রমবর্ধমান উন্মত্ততায় সবাই ত্রস্ত সারতে থাকে বাকি কাজগুলো। হঠাৎ কারো একজনের চোখে পড়ে বড় রাস্তায়, মনোযোগ আকর্ষণ করে অন্য সকলের-ঐ দেখ! দেখ!! খাকি পোশাক পর পুলিশের দলটির গন্তব্য খান বাড়ির দিকেই। জামায়েত কামলা, মুনীশরা ভুলে যায় আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাস, সন্দিহান চোখে তাকিয়ে তাকে অগ্রবর্তী দলটির দিকে-ঘটনা কি?

মুহুর্তে খবরটি রটে যায়... বাড়ির চারদিকে বাড়তে থাকে উৎসুক মানুষের জটলা। গ্রামবাসী কালেভদ্রে পুলিশ দেখে বটে, করিম মুনীশের ছেলেটা গেলবার ভোটের পর রাতের আন্ধারে খুন হলে পুলিশ এসেছিল, নিতাই জলদাসের বাড়িতে আগুন লাগার পরও এসেছিল পুলিশ। যদিও তারপর কি হয়েছিল কেউ জানে না, তবে নিকট অতীতে পুলিশ আগমনের ঘটনা দু’টি গ্রামবাসীর স্পষ্টই মনে আছে, আর তাদের মনে এই ধারণাও স্পষ্ট আছে যে বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা না ঘটলে গ্রামে পুলিশ আসে না। গ্রামের মানুষের সহজাত কৌতুহল তাই বাধ মানে না, সকলের সকল ব্যস্ততা গৌণ হয়ে যায়।

খান বাড়িতে আয়োজন ছিল ঠিকই, কেউ তেমন টের পায়নি। বড় দুটো রাতা মোরগ জবাই করে কোরমা রান্না হয়েছিল, চিনিগুড়া চালের পোলাও ছিল। দারুচিনি এলাচের ফোড়ন আর ঘি’র গন্ধ মাখানো বাতাস ঝাপটা দিয়েছিল সবার নাকেই, তবে কেউ তলিয়ে খোঁজেনি কোনো কারণ। বড়লোকের বাড়িতে প্রায়ই এটা সেটা ভালো-মন্দ রান্না হয়। বড়লোকেরা শখ করে খায়, যদিও কামলা মুনীশদের জন্য হররোজ বরাদ্দ থাকে ঝাল শুটকি আর মলা-টেংরার পাতলা ছালুন।

দক্ষিণের বৈঠকখানায় মেহগনিকাঠের বনেদী টেবিলের চারদিকে বসে, কোরমা পোলাও-এ পেট পুরে খেয়ে মশলা দেয়া পান মুখে পুরে, ঢেঁকুর তুলতে তুলতে যখন বাড়ির চারপাশের ভিড় ঠেলেঠুলে খানের একমাত্র শালা হামদুকে কোমড়ে দড়ি বেঁধে নিয়ে চলে যায় পুলিশ, তখন সত্যি প্রশ্নটা খুব বড় হয়ে দেখা দেয়-ঘটনা কী? প্রশ্নটা রঙ-বেরঙ এর ডালপালা মেলে ছড়াতে থাকে গ্রামের এ মাথা-ও মাথা। সেই বিকেলে কালবৈশাখী নামে না তবে গ্রামজুড়ে নেমে আসে একটা বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন। 

তখন রাহেলা খানম, খানের স্ত্রী বসেছিলেন জায়নামাজে, এবাদতের কোনো সময় এটি? জোহর, মাগরিব? না গ্রামবাসী ঝি-কামলা-মুনীশরা ঘড়ি চেনে না, দেখেও না, দেখার দরকারও পড়ে না। তবে মসজিদ থেকে আহবান শোনে-কল্যাণের জন্য এসো। সেই আহবান শুনে সময় বিবেচনা করে তারা। কিন্তু আজ অসময়ে জায়নামাজে খানের স্ত্রী রাহেলা। তার চোখ থেকে অবিশ্রান্ত ধারায় নামে জল, ভিজে যায় জায়নামাজ। ঝি, আয়ারা দূর থেকে দেখে আর আফসোস করে পরস্পর-আহারে! একডাই মোডে ভাই রাহেলা বিবির, কি ঘটলো এমন? সেসব আফসোস বাণী রাহেলা বিবির কানে যায় কি যায় না, ডুকরে কেঁেদ ওঠেন তিনি, ভেতরে তার দাবানলের দাউ দাউ! কোথায় শান্তি? অক্ষম আত্মসমর্পণ করেন খোদার কাছে, পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তা তাকে কি জানতে দেবেন-তার কি অপরাধ?

তখন খান বাড়ির পূর্ব ভিটার দো’চালা ঘরটায় খিল আটকে বসেছিল শাহেলা আর রোকেয়া, রহেলা বিবির দু’সহোদরা এই খান বাড়িরই আশ্রিতা। যেন খান বাড়িরই অঙ্গ। কখনো আলাদা বলে মনে হয় না। ঘরের খিল দেয়া দরজা ভেদ করে অব্যক্ত ফোঁপানির সুর, অব্যক্ত যন্ত্রনার কোরাস ধাক্কা দেয় সম্পন্ন খান বাড়ির সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কামলা, মুনিশদের ত্রস্ত ব্যস্ততাকে, স্পর্শ করে কারো কারো হৃদয়কেও। ঘটনাটা কি ঘটেছে যদিও তারা স্পষ্ট করে জানেনা কিছু তবু এই অনুঢ়া মেয়ে দুটির অসহায় যন্ত্রনার উৎস কারো তেমন অজানা নয়। তারা কানাকানি করে পরস্পর-আহারে কি দরদ যে লাগে মাইয়া দুইডার জইন্যে! এসব দরদি অপুষ্ট বাণী ঢুকে না পূর্বভিটার খিল আটা ঘরটার চৌহদ্দিতে, যত রাত বাড়তে থাকে, দু’বোনের কান্নার আওয়াজ তত তীব্র হয়ে যেন ভেদ করে যেতে থাকে খান বাড়ির সম্ভ্রমের দেয়াল। 

কামলা-মুনীশ-ঝি-আয়ারা তখন কাছারি ঘরে ঘুমে ঢুলে আর দিনময় ক্লান্তি তাড়ানোর চেষ্টা করে টিভিতে শাবনূর-রিয়াজের অর্থহীন লষ্ফঝষ্ফ গিলে। তারা কেউ কেউ টের পায় অন্দরে এক ভুতুড়ে নীরবতা আজ, আর হঠাৎই তারা আবিষ্কার করে এর আবশ্যিক অনুষঙ্গ এক অস্পষ্ট গোঙানির সুর, যেন প্রচন্ড কষ্টে কেউ ছটফট করছে কিন্তু চেপে রাখা হয়েছে কন্ঠ তার। তারা একে অন্যের মুখের দিকে তাকায়-কে গোঙায় এমন করুণ সুরে? কেউ জানে না। আরও একটি প্রশ্ন বোধক তাদের উৎসুক মুখগুলি ঘুরে মিশে যায় টেলিভিশনের পর্দায়। কারো কারো দীর্ঘশ্বাস দীর্ঘতর হয়ে মিশে যায় শাবনূরের উন্মাদ নৃত্যের তালে। 

কেউ একজন উঁকি দিয়ে দেখে তখনো খোলেনি পূর্বভিটার খিল, বোধকরি পেটে দানাপানি পড়েনি তাদের আজ সারাদিন। তাদের সাহস বা অধিকার নেই নাক গলায় খান বাড়ি এই অস্বাভাবিক রহস্যে। 

পূর্বভিটার দো’চালা ঘরের ভেতরটা কেমন রহস্যময় আলোতে ভরে গেছে, শাহেলা, রোকেয়া আলো জ্বালায়নি, বেড়ার ফাঁক-ফোকর দিয়ে ছিটকে ঢুকে গেছে বাইরের আলো, দু’সহোদরা স্পষ্টই দেখতে পায় পরস্পরের চেহারা, ভেতরের ক্ষরণ। রহস্যময় আলো আধাঁরিতে তারা ডুকরে উঠে বারবার অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ আশঙ্কায়, নিজেদের জীবনের অন্ধকার দিকটা তাদের পরস্পরের কাছে লজ্জা, অপমান আর বিবমিষায় দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট। তারা নিরুপায়.... ওরা অসহায়.... কিছুই করার নেই তাদের। করার ছিলও না। নিঃস্ব বাপ যখন মরে তখন পরীর মতো সুন্দরী মাও বেঁচে ছিল না। বাপ মরার আরো বছর তিনেক আগেই পাশের ডোবায় ডুবে মরে ভেসে উঠেছিল এক পৌষের সন্ধ্যায়। মৃগী ব্যারাম ছিল মায়ের। পাঁচগ্রাম খ্যাত মায়ের সৌন্দর্য পেয়েছে মেয়ে তিনটা চুল থেকে নখ পর্যন্ত। ধনাঢ্য ব্যবসায়ী বাপ সৌন্দর্যে পাগল হয়ে বিয়ে করেছিল তাদের মাকে পণের বিনিময়ে। ঘি-দুধ খেয়েই বড় হয়েছে ওরা বাপের ঘরে। তারপর এক সময় মদ-জুয়ার নেশায় শুরু হয়েছে বাপের পতন, সেই সাথে শুরু হয়েছে গরিবের ঘরে কাক-শকুনের ঠোকরানো।

এলাকার ধনী গৃহস্থ খান বংশের জ্যৈষ্ঠ উত্তরাধিকার আফিলউদ্দিন খানের দয়ার শরীর। বেড়ার মতো ছাগলের হাত থেকে তিনি আগলে রেখেছেন তিন সহোদরাকে। বড় মেয়ে রাহেলাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে ঘরে তুলেছেন-বাকি দু’জনকেও রক্ষা করেছেন চিল-শকুনের হাত থেকে, ভাত-কাপড়, থাকা-খাওয়া-নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে হয়নি শাহেলা রোকেয়া আর একমাত্র ভাই হামদুকেও, যখন রক্ষক তার অর্থ প্রতিপত্তি ক্ষমতায় গ্রামে অপ্রতিদ্বন্দ্বী তখন অবিবাহিত রূপসী দু’সহোদরার দিকে নজর দেবার মতো সাহসী গ্রামে আর কই? বাপ মরার পর মাথা গোঁজার আশ্রয়টুকু বিক্রি করে সবাই যখন আশ্রিত হয়েছিল খানভিলায়, তখন থেকেই ব্যবস্থা হয়ে গিয়েছিল পাকা আর আফিলউদ্দিন খানের দয়ার কাহিনীও পৌঁছে গিয়েছিল গ্রাম-গ্রামান্তরে।

হামদুর বুদ্ধিশুদ্ধি কিছু কম, ঠিক হাবা নয়, তবে স্বাভাবিক বুদ্ধিমান তাকে বলা যায় না। পর পর তিন মেয়ের পর ছেলে। অতি আদরে, অতি প্রশ্রয়ে বেড়ে ওঠা হামদু প্রথম প্রথম অতি সোহাগে আর পরে দিনে দিনে অতিরিক্ত চাহিদা সৃষ্টি হওয়ার কারণে বয়সের তুলনায় একটু বেশিই খায়, কেবলই ভাত-তা লবণ দিয়েই হোক কিংবা মরিচ, বয়সের তুলনায় ওজনটাও তার বেশি। বেশ বেঢপ দেখায় তাকে, যে ভাত মা পাতে জোর করে তুলে দিত খেতে না চাইলেও, খানবাড়িতে সেই ভাত তাকে চাইতে হয় বড় কুন্ঠায়। ঝিদের হাসাহাসি টের পায় সে, উপলব্ধি করে আশ্রিতের অবহেলাও। আর এই আপাত বোকাসোকা নিরীহ অবয়বের পিছনে রূঢ় সত্যটা টের পাওয়ার কোনো ক্ষমতা কী আছে তার, সেটা টের পায় না অন্য কেউ। কৈশোর অতিক্রম করার আগেই নির্বোধের মতো দৃষ্টি নিয়ে সে দেখেছে, শাহেলা, রোকেয়ার ওপর আফিল উদ্দিনের সবল আর অযাচিত অধিকার। যদিও সবাই ভাবে, বোধবুদ্ধি হামদুর কিছু কম কিন্তু হামদু কি আর ঠিক ঠিক উপলব্ধি করে তার বোনদের অসহায়ত্ব, পড়তে পারে তাদের আপাত নির্বিঘœ জীবনের অন্তরালে ক্রুদ্ধ দৃষ্টি আর তার মুক্তিকাঙক্ষার ভাষা? বড় বোন আফিল উদ্দিনের স্ত্রী রাহেলার নির্বিকারত্বের ভাষা ও কী সে বুঝে? হামদুর ভাষা বুঝতে পারে না কেউ, বুঝতে পারেনা কখন বোকা সোকা হামদু নিজেকে তৈরি করেছে, কিভাবে তৈরি করেছে। দু’বেলা মরিচ টিপে ভাত খেয়ে হুজুরের কাছে আমপারা শিখতে গেছে হামদু আর ভেবেছে কেবল ভেবেছে। তার সে ভাবনার সন্ধান পায়নি কেউ-না রাহেলা, না শাহেলা, না রোকেয়া, না আফিলউদ্দিন। তবু নারী হয়ে ওঠার আগেই নারীত্বের তীব্র অপমান, বৈরী যৌবন আর দৈহিক শ্রীর প্রতি প্রচন্ড ঘৃণা নিয়ে দিন গুনেছে শাহেলা-রোকেয়া, সহোদরকে জাগাতে চেয়েছে বারবার-হামদুরে ভাই, আল্লা কি তরে হাছাই কিছু বুঝবার ক্ষমতা দেয় নাই? ভাইয়ের দৃষ্টিতে নির্বুদ্ধিতা, তবু, মনের ক্ষীণ আশাটিকে প্রশ্রয় দিয়েছে তারা। নিশ্চয়ই কোনো না কোনো একদিন এই নির্বোধ ভাইটিই তাদের উদ্ধার করে নিয়ে যাবে এই নরকবাস থেকে। 

হামদু আফিলউদ্দিন খানের গোপন লকার ভেঙে চুরি করেছে বিশ ভরি সোনাসহ হাজার পঞ্চাশেক টাকা। চুরি করেও কেন নির্বিকার ঘরে বসে ছিল সে? নির্বোধ বলে? কামলা-মুনীশ-ঝি’রা প্রশ্নটি আড়ালে-আবেডালে করলেও কেউ প্রকাশ্যে করার সুযোগ পায় না। সেই সন্ধ্যায় অন্দর থেকে মাইক্রোবাসটি সোজা চলে যায় থানা সদরের হাসপাতালে, সাথে যায় অস্পষ্ট গোঙানির সুরটাও। 

হাসপাতালের ডিউটি ডাক্তার মেয়েটিকে প্রাথমিক পরীক্ষা করেই খুব তাড়াতাড়ি রক্ত যোগাড় করতে বলেন, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মেয়েটি মুমূর্ষু। কেন আরো আগে আনা হলো না হাসপাতালে, ডাক্তারের ক্রুদ্ধ প্রশ্নে ডুকরে কেঁদে উঠেন গর্ভধারিনী রাহেলা। চোখের জল মুছেন জনক আফিল উদ্দিন, মনে জাগে তার আক্ষেপ-এ তার কৃতকর্মের ফল। ডাক্তার ফিসফিস করেন নার্সদের সাথে-রেপ কেস, অবস্থা ভালো না, মনে হয় প্রচন্ড প্রতিহিংসায় কেউ মেয়েটিকে নির্যাতন করেছে অমানুষের মতো।

গ্রাম জুড়ে নেমে আসা প্রশ্নবোধকটি মিলাতে গিয়েও আর মিলায়না। নির্বোধ হামদু বোনদের উপর দিনের পর দিন ঘটে যাওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদে আফিল উদ্দিন খানের উপর প্রতিশোধ স্পৃহায় ঝাঁপিয়ে পড়বে তার মেয়ের উপর এটা কেউ বিশ্বাস করতে পারে না। না রাহেলা, না শাহেলা, না রোকেয়া, তিন সহোদরার কেউ না। কিন্তু ত্রস্ত মেয়েটির অস্পষ্ট অচেতন গোঙ্গানির সুর থামে না-আম্মাগো............বাঁচাও.........হামদু মামা.........।


1 টি মন্তব্য:

  1. এমন গল্প পাঠককে মিউটেট করার ক্ষমতা রাখে। এবং ভিন্নপাঠ দাবী করে।

    উত্তরমুছুন