বুধবার, ১৭ মে, ২০১৭

অরিন্দম বসু'র গল্প : কুড়ি নম্বর লোক


অফিস থেকে বেরিয়ে ফুটপাতে পা রাখতেই লোকদুটো অজয়ের একেবারে সামনে এসে দাঁড়াল।

আপনার সঙ্গে একটু কথা ছিল স্যার। 

চমকে যেতেই হল। রাস্তাটা নির্জন নয়। লোকজন হাঁটে, গাড়িও ছোটে। তবে সবকিছুই মাপা। মেন রোডের পাশাপাশি বয়ে গেলেও সেখান থেকে কিছুটা দূরে। যারা গাড়ি নিয়ে গড়িয়াহাট এড়াতে চায় তারা এদিকে ঢুকে পড়ে। দোকানপাট নেই বলে ফুটপাতে লোক হাঁটে না তেমন। কাছেই লেক। সকালে অনেকে কুকুর হাঁটায়। নিজেরাও হাঁটে। দুপুর আর সন্ধেয় ফাঁকা ফাঁকা। উচু পাঁচিল দেওয়া বড় বড় বাড়ি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে পাশাপাশি। 

ফুটপাতে ল্যাম্পপোস্টের আলো আছে। আবার গাছের পাতার ঝিরঝরে ছায়াও আছে। লোক দুজনের মুখ দেখা যাচ্ছে না ভাল করে। তাছাড়া ওরা তাকে স্যার বলে ডাকলে অজয় তো চমকে যাবেই। চমকে গিয়ে নিজের দিকে তাকাবেই। 

তার বয়েস চল্লিশ। গালে দাড়ি। সেগুলোর ভেতর বেশ কয়েকটা পেকেছে৷ হাতা গোটানো চেক জামা প্যান্টের ভেতর গুজে রাখা আছে। পায়ে চটি। স্যার বলে ডাকল তাকে? সত্যিই কি তাকে? নাকি ওরাও ভাল করে দেখতে পায়নি? 

সে থমকে দাড়ায়। আমায় বলছেন নাকি? 

লোক না বলে এদের ছেলেই বলা যায়। অজয় খেয়াল করে দেখে। পঁচিশ-ছাব্বিশ হবে। দুজনেরই বেশ গুছিয়ে পরা সাদা জামা, কালো প্যান্ট। পায়ে জুতো। হাতে ফাইল। মুখে খুবই বিনীত হাসি। একজন বলল, হ্যাঁ স্যার, আপনাকেই। আপনার জন্যই আমরা এখানে দাঁড়িয়ে আছি। আমাদের একটু সময় দেবেন। স্যার? 

নর্দান টি এম বার প্রাইভেট লিমিটেডের পারচেজ ক্লার্ক একবার পিছনে তাকাল। তাদের অফিস বাড়ির গেটের সামনেই এখনও দাঁড়িয়ে সে। ভেতরে দুই মালিক আছে। তাই অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার বর্ণিমা এখনও অনেকক্ষণ থাকবে। তবে দুই পিওন আছে। অ্যাকাউন্টসের সুনীল আছে। কেউ যদি বেরিয়ে আসে আর শোনে--তাকে কেউ স্যার বলছে তাহলে যাকে বলে খুবই কিছু একটা ঘটবে। এমনিতেই অফিসে অনেকে মজা করে চিবোয় তাকে। চিবিয়ে হাসিটা বাইরে ফেলে। সুখ পায়। আর এটা জানতে পারলে তো কথা নেই। অজয় তাই তাড়াতাড়ি কিছুটা দূরে চলে গেল।

কী ব্যাপার বলুন? 

দুজনেই তার গা ঘেঁষে দাঁড়াল একরকম। চোরাই মাল বিক্রির গলায় মুখ কঁচুমাচু করে একজন বলল, আপনার কাছে আমাদের একটা স্পেশাল রিকোয়েস্ট ছিল স্যার। 

অজয়ের মাথায় একটা কথা ঝিলকে ওঠে। পারচেজ সেকশনের কাজ হচ্ছে মাল কেনা। নাটবল্টু থেকে সাবান। ভাউচার প্যাড থেকে আখের গুড়। কোনওটা ফ্যাক্টরিতে যায়, কোনওটা অফিসে থাকে। হরেক কোম্পানি থেকে হরেক মাল। নীচে বাসা বাঁধে। কেউ ঘুরঘুর করে বেড়ায়। ফোন আসে। এই দুজন সেরকম কেউ নয় তো? নাঃ, তা কী করে হবে? অজয় বিশ্বাসকে কে চেনে? কে আসবে। তার কাছে? আর এলেও সে কিছু করতে পারবে না। হাত-পা এলিয়ে যাবে। তাহলে এরা কী বলতে চাইছে তাকে?

এবার অন্যজন ফাইল হাত বদল করে, হাত দিয়ে জামা টান টান করে নিয়ে বলল, আসলে আমরা আপনাকে একটা ড্রিংক অফার করতে চাইছি।

হতভম্ব হয়ে অজয় ছেলে দুটোর দিকে তাকিয়ে রইল খানিক। তারপর বলল, ড্রিংক? মানে?

কথাটা যে বলেছিল। সে হাসল আবার। ড্রিংক মানে মদ স্যার। মানে ড্রিংক।

গালের দাড়িতে হাত চলে গেল অজয়ের। বেখাপ্পা কথা শুনলে এরকম হয় তার। সে বলল, আপনারা আমায় মদ খাওয়াতে চাইছেন। কেন? কী ব্যাপারটা কী? এরকম রাস্তায় লোক ধরে মদ খাওয়ান নাকি আপনারা? 

যেন আয়নায় দেখছে ঠিক এভাবে ছেলে দুটো নিজেদের দেখে নিল একবার। না স্যার, ব্যাপারটা ঠিক ওরকম নয়। বুঝিয়ে বলছি আপনাকে। আমাদের কম্পানী একটা নতুন ড্রিংক লঞ্চ করবে বাজারে। তার প্রমোশন ক্যাম্পেনে নামার আগে কম্পানি একটা মার্কেট সার্ভে করছে। এরকম প্রোডাক্টের সার্ভে তো অন্য প্রোডাক্টের মতো করা যায় না স্যার। সবাইকে বলা যায় না। এজন্য সিলেকটেড লোকদের কাছে পৌঁছতে হয়। তাই আমাদের কম্পানি কিছু সিলেকটেড প্লেসে স্পেশাল অ্যারেঞ্জমেন্ট করেছে যেখানে এক্সক্লুসিভলি কয়েকজনকে এই ড্রিংক অফার করা হচ্ছে, শুধুমাত্র আজকেই। আমাদের কাজ হচ্ছে সেই এক্সক্লুসিভ লোকেদের বার করা। আমরা আপনাকে খুঁজে পেলাম।

অজয় অবাক চোখে দুজনের দিকে তাকিয়ে রইল। এরা মদ খাওয়ানোর নেমন্তন্ন করছে তাকে ! তাকে এক্সক্লুসিভ লোক ঠাউরেছে। আশ্চর্য! তাকে কি মাতালের মতো দেখতে? তার কোম্পানির দুই মালিক আহুজা আর মিত্তাল কিংবা পারচেজ ম্যানেজার শুভ্রাংশু কর্মকারের মুখে মদ লালচে আভা ফুটিয়ে রাখে। কিন্তু তার মুখ তো চিমসে, ভাঙা গাল, চোখের তল কালচে। বারাসত থেকে এসে সকাল দশটায় অফিসে ঢুকে, সাতটায় বেরিয়ে রাত দশটায় বাড়িতে। গা থেকে ঘামের গন্ধ বেরোয়, মদের তো নয়। ফেরার পথে রাস্তায় অনেককে টাল খেতে দেখেছে। সে নিজে সোজা পায়ে ঘরে ঢোকে। তাহলে?

থম মেরে যাওয়া ভাবটা কাটাতে অজয় জানতে চাইল--কোন কোম্পানি এরকম করছে?

খুবই নামী কোম্পানি, মাল্টিন্যাশনাল, শুনলেই বুঝতে পারতেন, তবে নামটা আপনাকে বলতে পারছি না। এই ধরনের প্রোডাক্ট তো খুব ডেলিকেট স্যার, ফর্মুলা নিয়ে এত কম্পিটিশন মার্কেটে যে কোম্পানি তার নিজের নাম, ব্র্যান্ডের নাম কিছুই এখন ডিসক্লোস করবে না। আপনাকে শুধু প্রোডাক্ট টেস্ট করে বলতে হবে কীরকম লাগছে। দূরে নয় স্যার, আপনার অফিস থেকে একদম কাছে।

কী করে জানলেন এটা আমার অফিস?

আমরা জেনেই দাঁড়িয়ে আছি স্যার।

ও। কিন্তু আমি তো আপনাদের সঙ্গে যেতে পারব না। আমি মদ খাই না। মানে ড্রিংক করি না।

ছেলে দুটোর হাসি এবার শব্দ করে উঠল। সেটা তো আরও ভাল স্যার। আপনি প্রিকনসাশী নন, প্রিঅকুপায়েড নন, আপনার টেস্ট বাড ফ্রেশ আছে এখনও। কম্পানি তো এরকম কাস্টমারই খোঁজে, যে কিনা একদম, মানে কি বলব, একেবারে ভার্জিন।

ভার্জিন!

কথাটা যে বলেছিল তার গায়ে ঠেলা দিল অন্যজন। কী বলছিস কী! না স্যার, ওই ওয়ার্ডটা বেরিয়ে গেছে। আমরা বলতে চাইছি--একদম নতুন, নিউ। আপনি চলুন স্যার, জাস্ট দশ মিনিট সময় দিলেই হবে। 

অজয় ঘড়ি দেখল। সোয়া সাতটা। এরপর বাসে ঝুলতে হবে, ট্রেনে গাদিয়ে উঠতে হবে, তারপরেও হাঁটা আছে। আর দেরি করা যায় না। সে বলল, আপনারা বরং অন্য কাউকে দেখুন। আমায় ছেড়ে দিন। 

ওরা তাকে ঘিরে ধরল প্রায়। স্যার প্লিজ, রিফিউজ করবেন না। সত্যি কথা বলব স্যার? আমরা তো ওই কম্পানিতে চাকরি করি না। আমরা স্যার এজেন্সির লোক এজেন্সিই ব্যাপারটা অ্যারেঞ্জ করেছে। আমাদের বলেছে কুড়ি জনকে যোগাড় করতে। ওই কোটা কমপ্লিট করতেই হবে। উনিশ জনকে আমরা পেয়ে গেছি। আর একজনের জন্যে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। আপনিই সেই কুড়ি নাম্বার স্যার। সাড়ে সাতটা থেকে ড্রিংক সার্ভ করা শুরু হবে। আপনাকে না নিয়ে যেতে পারলে ওরা ওদের কাজ করে বেরিয়ে যাবে। আমরা কিছু পেমেন্ট পাব না। প্লিজ, আমাদের একটু হেল্প করুন স্যার। 

অফিসের কাছাকাছি আর দাঁড়িয়ে থাকা যাচ্ছে না। কেউ দেখলেই প্রশ্ন ছুঁড়বে। ছেলে দুটো এখন হাত কচলাচ্ছে। কিন্তু কীভাবে হেল্প করবে সে এদের? কেনই বা করবে? যে যার নিজেরটা বুঝে নেয়। মাসের শেষে সাড়ে তিন হাজারের কেরানিকে কে হেল্প করে? শুধু মেয়ের জন্যেও মাসভর রোজ মাছ কিনতে পারে না সে। দুধটা কোনওমতে হয় রেখার পা মেশিনটা আছে বলে। বাড়ি ভাড়া আছে, ইলেকট্রিকের বিল আছে, অজন্তার ক্লাস ফাইভের খরচ আছে। বাবা-মা মরে গিয়ে তাদের হেল্প করেছে বলে তারা বেঁচে আছে। 

আমি তো বললাম আপনাদের, মদ খাই না।

একদিন স্যার। জাস্ট টেস্ট করবেন। ওখানে একজন থাকবেন, তিনি আপনার কাছে থেকে যা জানার জেনে নেবেন। আপনি যাবেন আর আসবেন। আর শুধু হাতেও ফিরতে হবে না। কম্পানির পক্ষ থেকে আপনাকে একটা কাচের গ্লাস দেওয়া হবে। বিউটুফুল ডিজাইন উইথ হ্যান্ডেল। আপনার মেয়েকে ওটাতে দুধ সার্ভ করতে পারবেন স্যার। 

আবার চমকে উঠল অজয়। এরা কি সব খোঁজখবর নিয়ে এসেছে নাকি? স্টিলের গেলাসে দুধ খেতে মেয়ের ভাল লাগে না। তাদের বাড়িতে টিভি নেই। কিন্তু অজন্তা কোথায় যেন একটা বিজ্ঞাপন দেখে এসে তাকে বলেছিল, দুটো ভাইবোন কি সুন্দর কাঁচের গেলাসে দুধ খায় বাবা। বাইরে থেকে দেখা যায়। আমায় ওরম একটা কিনে দেবে বাবা? দেবে অ্যাঁ? 

রেখা রেগে বলেছিল--না, দুধটুকু যোগাড় করতে কী করতে হয় জানো? কাঁচের গেলাসে দুধ খাওয়া ধরলে চলবে না। একটা ভাঙলে আর একটা কোথায় পাব? 

আর দেরি করলে প্রবলেম হয়ে যাবে স্যার, প্লিজ চলুন। 

অজয় গেল। সত্যিই দূরে নয়। তাদের অফিসের উল্টোদিকের রাস্তায় হেঁটে, বাঁদিকের গলিতে ঢুকে আবার ডানদিকে ঘুরতেই একটা পুরনো বাড়ি। কেউ থাকে না বোধহয়। খোলা গেট। ভেতরে সিমেন্ট বাঁধানো অনেকটা জায়গা। তার দুপাশের গাছগুলোর পাতায় ধুলোর আস্তর। 

নীচু বারান্দা পেরিয়ে লম্বাটে ঘর একটা। সেখানে ঢুকে অজয় দেখতে পেল--পাশাপাশি অনেক টেবিল। সাদা কাপড়ে ঢাকা। হাসিমুখে অনেক লোক বসে। সব টেবিলেই জলের জগ, মদের গেলাস। কয়েকটায় সোডার বোতল। একসঙ্গে এতজন বিনা পয়সায় মদ খাচ্ছে অথচ জায়গাটা কী শান্ত সুবোধ! শুধু মদের গন্ধ আর সিগারেটের ধোঁয়া চাক বেঁধে রয়েছে ঘরে। পাশে আর একটা ছোট ঘরে পেটি সাজানো। ওখান থেকেই সাপ্লাই আসছে নিশ্চয়ই। 

রাজীবদা, এই যে নাও, নাম্বার টোয়েন্টি। কোটা কমপ্লিট। 

ছেলে দুটো অজয়কে এগিয়ে দিল। একজনের সামনে। সে আর ফিরে যেতে পারে না এখন। বুঝতে পারছিল, লোকটা তাকে মাপছে। তাকে মদ খাইয়ে আদৌ কোনও লাভ হবে কিনা, তাও ভাবতে পারে। ফিরিয়ে দেবে কি? আচ্ছা, সে তো কোটার মধ্যে ঢুকে পড়েছে, মদ না খেলে গেলাসটা দেবে না? দেবে না বোধহয়। কিছু পেতে গেলে কিছু দিতে হয়।

আসুন স্যার, আপনি এই টেবিলে আসুন। 

এই রাজীব নামের লোকটিও তাকে স্যার বলছে! বসার সময় চেয়ারের পিছনে দাড়িয়ে অল্প সরিয়ে দিল চেয়ারটা। এরা ভদ্রতা জানে। কাস্টমারের বাছবিচার করে। না। সকলের জন্যই এক আদর। এখানে যারা বসে আছে তারা সকলেই তার চেয়ে দামী। গালে হাত উঠে গেল অজয়ের। মনে হল, দাড়িটা থাকলে কিছু খরচ বাঁচে তবে বডড ঘিঞ্জি লাগে মুখটা। আজ অন্তত কামানো চকচকে গাল থাকলে হতো। সেইসঙ্গে একটু পরিষ্কার জামা কাপড়। কিন্তু সাকুল্যে চারটি জামা কত সাফ রাখা যায়! 

রাজীব টেবিলের ওপর একতাড়া কাগজ রেখে উল্টোদিকের চেয়ারে বসল। আমাদের কিছু ফর্মালিটি আছে স্যার। আপনি ড্রিংক্স নিতে নিতেই আমরা সেটা করতে পারি। বলতে বলতে তুড়ি বাজিয়ে কাউকে ডাকল সে। এই টেবিলে সার্ভ করো। 

অজয়ের বুক ধুকধুক। কণ্ঠার কাছটা ধূ ধূ। তার বন্ধুরা প্রায় সকলেই কমবেশি মদ খায়। প্রায় সব মদই সে চেনে। বাংলা পর্যন্ত। তবে অনেকবার ডেকেও ওরা তার নাগাল পায়নি। নেশা বলতে চারমিনার ভরসা। কিন্তু আজ তার জন্যেই গেলাসে ঢালা হচ্ছে মদ। জলের মতো দেখতে এটা কোন মদ? ছেলেটা একটা প্লেটে চিপস আর কাজু বাদামও রাখল। এত যত্ন করে মদ খাওয়াচ্ছে এরা? এরকম নেমন্তন্ন কজন পায়! এটা কোনও পাপ নয়। কাচের গেলাসটা হাতে ধরিয়ে রেখাকে বুঝিয়ে বললেই হবে। মেয়ের হাসিমুখটাও দেখতে পেল সে। 

জল নেবেন? না সোডা স্যার?

জল। ঘড়ঘড়ে হয়ে গেল গলাটা। 

আপনি স্টার্ট করুন স্যার। আমি আপনাকে কয়েকটা প্রশ্ন করব। আপনি আন্সার করবেন। কোনও তাড়া নেই।

অজয় মাথা হেলাল। গেলাস নিয়ে ঠোঁটে ছোঁয়াল। লেবু লেবু গন্ধ পেল খানিক। সামান্য জ্বালা করল গলাটা। খেতে খারাপ নয়। সে দুটো চিপস আঙুলে তুলল। 

আপনার নাম?

নাম বলতেই পরের প্রশ্ন--বয়েস?

বয়েস বলল অজয়। তারপর ঠিকানা। তারপর বিবাহ। স্ত্রী। কন্যা। স্ত্রী কী করেন--এই প্রশ্নে এসে ঢক করে পেগ শেষ করে দিয়ে সে বলল, ওর নিজের সেলাই মেশিন আছে। জামা কাপড় সেলাই করে। 

রাজীব মুখ তুলল। চেঁচিয়ে বলল, এখানে রিপিট করো। গলা নামিয়ে বলল, তাহলে লিখলাম আপনার ওয়াইফের নিজের ব্যবসা আছে। গার্মেন্টসের। আপনি রিল্যাক্স করে ড্রিংক নিন স্যার। বলেছি তো, তাড়া নেই। আপনার অফিস? 

নামটা মুখে আসতেই অফিসের ভেতরটা মনে পড়ে গেল। সুনীল এতক্ষণে বেরিয়ে গিয়েছে। এক পিওন হরিরাম চিকেন ললিপপ কিনে নিশ্চয়ই পৌঁছে দিয়েছে মালিকদের চেম্বারে। একটু পরেই পিওন সঞ্জয় আড়ি পাতবে তার দরজায়। ওখানেই বর্ণিমা আছে এখন। ওরা প্রায় রোজই বোতল খুলে বসে। কত টাকা যে ওড়ায় কে জানে। এত বড় একটা কোম্পানি, তারও শালা মাইনের তারিখ এদিক ওদিক হয়ে যায়। তার বেলা কিছু না। তখনও ললিপপ খাওয়া আর ঢলঢলির বিরাম নেই। 

তার মতো হাল কারও নয় অফিসে। সারাদিন কাজে মুখ গুঁজে থাকতে হয়। পারচেজ অর্ডার তৈরি কর, কনফার্মেশন নিয়ে কথা বল, আ্যাকনলেজমেন্ট পাঠাও, ফ্যাক্টরি থেকে পাঠানো জি আর এন্ট্রি কর, পার্টির চেক বানাও। তাছাড়া মাইনের সময় আরও কাজ তার ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়। অথচ তার মাইনে? সংসার চালায় না সে। ঠেলতে হয়। গেল বছর সকলের মাইনে বাড়ল। শুধু সে বাদ। পারচেজ ম্যানেজারের কাছে গিয়েছিল। বলল, আমি জানি না, আপনি নিজে গিয়ে বলুন। মরিয়া হয়ে চলে গিয়েছিল এক মালিকের কাছে। 

আহুজা বলল, আপনার নামে রিপোর্ট আছে। দেরি করে আসেন, তাড়াতাড়ি চলে যান। ফাঁকি দিলে মাইনে বাড়বে কেন? 

বলতে গিয়েছিল বলে তারপর তার মাইনেই আটকে দিল ওরা। দশদিন। বউ মেয়েকে লুকিয়ে বালিশে মুখ গুঁজে রাতে কেঁদেছি সে। একদিন স্বপ্নে দুই মালিককে দেখেছিল। একশো টাকার নোট দিয়ে বানানো ললিপপ খাচ্ছে। চুষছে, চিবোচ্ছে, কড়মড় আওয়াজ করে খাচ্ছে। 

পারচেজেরই রাহুল তখন বলেছিল, আপনি কি বিপ্লব করার আশায় গেছিলেন নাকি অজয়দা? বিপ্লব অত সহজে হয় না। সেই থেকে অফিসে তার নামই হয়ে গিয়েছিল বিপ্লবী। 

আবার গেলাস ফাঁকা করে দিল অজয়। রাজীব বলল, গোয়িং স্টেডি? ওকে। আপনি তাহলে ক্লার্ক? পারচেজ অ্যাসিস্ট্যান্ট লিখলাম। আর একটা পেগ দেবে আপনাকে? গুড। এবার অন্য কোশ্চেন। আপনি কি রেগুলার ড্রিংক করেন? 

না। আমি মাতাল নই। 

ও কে। কোন ড্রিংক আপনার সবচেয়ে পছন্দ? রাম? হুইস্কি? ভদকা? ওয়াইন? জিন? 

একগাদা কাজু মুখে ভরে নিল অজয়। মাথাটা ঝিমঝিম করছে। কান দুটো কেউ গরম জলে ধুয়ে দিয়েছে মনে হচ্ছে। সে গেলাসটা তুলে ধরল। আমার সবচেয়ে পছন্দ এইটা। যেটা এখনও বাজারে আসেনি! যা আমার আগে কেউ খায়নি। আমি খাচ্ছি।

রাজীবের মুখে চিলতে হাসি। দ্যাটস গুড। বুঝতে পেরেছি। আচ্ছা, এবার আমি আপনাকে কয়েকটা ব্র্যান্ডের নাম বলব। আপনি যেটা বেশি পছন্দ করেন, ইয়েস বলবেন। 

এই পেগটাও শেষ করে ফেলায় পেটে জ্বালা করে উঠল। জিভ জড়িয়ে অজয় বলল, আপনার যা খুশি লিখুন না। সবাই কি সত্যি বলে নাকি! 

মিস্টার বিশ্বাস, আমাদের সময় ফুরিয়ে আসছে। আপনাকে আমি লাস্ট আর একটা পেগ অফার করতে পারি। আর একটা লাস্ট কোশ্চেন। 

করুন। ঝুঁকে পড়া মাথা সোজা করতে চাইল অজয়। আপনারা আমাকে কাচের গেলাসটা দেবেন তো?

অবশ্যই। নিন, আপনার পেগ এসে গেছে। আমার লাস্ট প্রশ্ন হল--এই যে ড্রিংকটা আজ আপনি এখানে টেস্ট করলেন, এরপর বাইরে পেলে সেটাই কিনবেন তো?

নিশ্চয়ই। আমি মদ খাব এবং এরপর থেকে এটাই খুঁজব। 

থ্যাংক ইউ স্যার। রাজীব আবার চেচিয়ে উঠল। মিস্টার বিশ্বাসের গিফটটা দাও ওনাকে। আর এবার আমাদের যেতে হবে। সো প্যাক আপ। 

কাগজে জড়ানো কাঁচের গেলাসটা বুকের কাছে নিয়ে হাঁটছিল অজয়। বেরোতে না বেরোতেই পায়ে পা জড়িয়ে যাচ্ছে। চোখের পাতা ভারী। পেট গুলিয়ে উঠছে। মুখের ভেতরে পাক খাচ্ছে তেতো থুতু। রাস্তার ধারে উবু হয়ে বসে পড়ল সে। ওয়াক উঠছে। কিন্তু বমি হচ্ছে না তো। এই মদ কি বের করে দেওয়া যায় না? 

উঠে দাঁড়াতেই ঠনাৎ করে শব্দ হল জোরে। হাতে যে গেলাসটা ছিল মনেই রাখেনি। রাস্তায় ছড়িয়ে গিয়ে কাচের টুকরোগুলো অজয়ের চোখে আবছা হয়ে আসছিল। 

তার ঠিক পিছনেই তখন বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসছিল অনেক সাদা জামা কালো প্যান্ট। ওরা গাড়িতে মাল তুলছে। কথা বলছে। হাসছে। তাদেরই কেউ একজন আঙুল তুলে অজয়কে দেখাল। রাজীব বলল, ইটস্ ও কে। ওদিকে কেউ যাবে না। ওর ব্যাপার ওকে বুঝতে দাও। ওখানে আমাদের কোনও কাজ নেই। আমাদের কাজ শেষ।

ওরা অজয়কে রেখে চলে যাচ্ছিল।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন