বৃহস্পতিবার, ২৭ জুলাই, ২০১৭

সাক্ষাৎকার : কমলকুমার মজুমদার

কমলকুমার মজুমদার (জন্ম: ১৭ নভেম্বর, ১৯১৪ - মৃত্যু: ৯ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৯) আধুনিক বাঙলা কথাসাহিত্যের অন্যতম স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব হিসাবে পরিগণিত। তাঁকে বলা হয় 'লেখকদের লেখক'। তাঁর উপন্যাস অন্তর্জলী যাত্রা অনন্যপূর্ব আখ্যানভাগ ও ভাষাশৈলীর জন্য প্রসিদ্ধ। বাংলা কথাসাহিত্য বিশেষ করে উপন্যাস ইয়োরোপীয় উপন্যাসের আদলে গড়ে উঠেছে। কমলকুমার মজুমদার সেই অনুসরণতা পরিহার করেছিলেন।

তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের দুরূহতম লেখকদের এক জন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বিখ্যাত ছিলেন; যেমন সুহাসিনীর পমেটম উপন্যাসে ২৫০ পৃষ্ঠায় যদি-চিহ্ন বিহীন মাত্র একটি বাক্য লক্ষ করা যায়। তিনি বাংলা সাহিত্যের দুবোর্ধ্যতম লেখক হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। দীক্ষিত পাঠকের কাছে কমলকুমার অবশ্যপাঠ্য লেখক হিসেবেই সমাদৃত হলেও অদ্যাবধি তিনি সাধারণ্যে পাঠকপ্রিয়তা লাভ করেননি।

তাঁর বিখ্যাত উপন্যাসসমূহ হল: অন্তজর্লি যাত্রা, গোলাপ সুন্দরী, অনিলা স্মরণে, শ্যাম-নৌকা, সুহাসিনীর পমেটম, পিঞ্জরে বসিয়া শুক এবং খেলার প্রতিভা। ছোটগল্প গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে: অন্নপূর্ণা, গল্প সংগ্রহ। একদিকে, ভাষায় আর অপরদিকে বিষয়ে নির্জনতা দুয়ের মধ্যবর্তী পথে বিচরণ করে কমলকুমার সৃষ্টি করেছিলেন তাঁর চিরায়ত কাহিনিগুলো। বহমান বাঙালিত্বকে রূপময়তায় চিত্রায়িত করেছেন, শহুরে জীবনে থেকে খুঁটিয়ে দেখেছেন কৌম জীবন, তার আখ্যান লিখেছেন অপরিচিত জগতের অন্যরকম জীবন ও জীবিকার ছোঁয়ায়, যা অন্তিমে হয়ে উঠেছে ধ্রুপদী। তা কি ভাষার গুণে, না দেখার অনন্যতায়? কমলকুমারের জীবদ্দশায় পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়েছিল দুটি মাত্র উপন্যাস আর দুটি গল্প সংকলন। বিচিত্র জীবন ও আশ্চর্য সব জীবিকা গ্রহণের অন্তে তিনি কিন্তু মনোনিবেশ করেছিলেন কাহিনিবিন্যাসে, যা হয়ে উঠেছে শেষপর্যন্ত লেখকরূপেই তাঁর প্রধান পরিচয়।সমতট পত্রিকায় ১৯৭২ সালে কথাসাহিত্যিক কমলকুমার মজুমদারের এই সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয়েছিল। 

পাঠক না প্রেরণা, কাকে মনে রেখে লেখেন? 

--নিজে ভাবতে চেষ্টা করেছি এটা, উত্তর পাইনি । এটা হলে অত্যন্ত বিলাসিতার একটা উত্তর দিতে হয়। কিন্তু ব্যাপারটা কি জানেন এটা লেখা উচিত এ রকম একটা বোধ থাকে। 

নি [-নিজের সৃষ্টি অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার একটা দায় আছে না ? অথচ আমাদের অনেকেরই শিল্পবোধটা তো কিছু কম কতলোকই বা ভাগ নিতে পারে? তাতে আমাদের করণীয় কিছু আছে কি? আপনার কি মনে হয় কিছু বদলানোর দরকার যাতে তারা বোঝে?]

--না । তাতে ব্যাপারটা হচ্ছে ধরুন আপনি সমস্ত বাংলা সাহিত্য বলতে--বঙ্কিম চাটুজ্জে পড়েছি। চর্যাপদ পড়েছি, সংস্কৃত নাটক--আমি কোনো লেখা বাদ দিই না জানেন, এখনকার সব ঐ... ... এ সব বহু লেখক এখনকার দেখলাম। কী লিখছে দেখি যে। এটা তো দেখতে হবে দেশটাকে কী ভাবে নষ্ট করছে। অনেক বাচ্চা ছেলে আসে 'এ কী? আপনি এর লেখা পড়ছেন ?' আমি বলি : তাতে কী হয়েছে? কেন না সে একটা মনকে ধরে ফেলেছে । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মশায় একটা মনকে ধরেছেন। সে এক আরেকটা মনকে ধরেছে। এইগুলোকে অ্যাভারেজ করুন, কোন মনটা এখন ছাড়া আছে। 

আমি কতকগুলো জিনিস বিশ্বাস করি। আপনি হয়তো অদ্ভুত মনে করবেন। আমি বুঝলেন বংশ মর্যাদায় বিশ্বাস করি। আপার ক্লাসে বিশ্বাস করি। আপার ক্লাসের মনটা, তার সেনসিবিলিটি আপার ক্লাসের । আপার ক্লাস বলতে ভারতীয় আপার ক্লাস । হঠাৎ কতকগুলো আইডেনটিটি অফ ওয়র্ড উপনিষদ থেকে বললুম সে রকম মিষ্টিসিজম হয় না--তার অত্যন্ত একটা, ফলে তার সৌন্দর্য বোধ একটা থাকে যাতে করে টপটপ করে--, আজকে ধরুন গ্রীস মরে গেছে, কী করে হলো যে ভারতীয় দুম করে উঠে গেল। 

আজকে একটা ইংরেজের সঙ্গে যে কোনো সাবজেক্ট নিয়ে আপনি কথা বলতে পারেন। ঠিক এই রকম ভাবে, জাতীয়ভাবে আমি শুধু মাদ্রাজ বলছি না, বাংলা বলছি না, আপনি মহারাষ্ট্র দেখুন, ভারতবর্ষের অন্যসব দেখুন কট্টর, সাংঘাতিক একটা ভগবৎ শক্তিতে দাঁড়িয়ে আছে। সেই শক্তিটা তাকে সেনসিবিলিটি দেয়। যেমন মানুষের দুঃখ ভাগবতে আছে না মানুষের দুঃখে কাতর বোধ করবে তেমনি ছোট ছেলের হাসি আপনাকে খুশি করবেই। এ দুটো মিলেই এসথেটিকস তৈরি হচ্ছে তো? সৌন্দর্যবোধ এই ভাবেই স্পর্শ করে এইটেকে আমরা রিভীল করছি। 

বিদ্যাসাগরের স্বরচিত জীবনীটা পড়েছেন? ওর মধ্যে দেখবেন খুব মেলোড্রামাটিক কথাবার্তা আছে। আমার বাবা ঠাকুরদাস একবার তিনদিন খেতে পেল না। রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে কাত হয়ে পড়লো একটা মুড়িওয়ালীর দোকানে--আজকে যদি লিখি আপনি বলবেন এ কী লিখেছেন? কিন্তু সেটাকে স্ট্রেনদেন করছে যে যখন খাওয়ালো তখন--হোল্‌ জিনিসটার রিয়ালিটি এলো যে--'আমার পিতার পুনর্জন্ম ঘটিল।' একটা জিনিসে। একটা লাইনে এমন হয়তো আসবে যে হোল্‌ জিনিসটায় রিয়ালিটি এলো। যোগাযোগেই এই যে সেন্টিমেন্টটা আপনি যদি বিশ্বাস করেন দেখবেন খুব নিচু ক্লাসে নেই।


অন্য প্রদেশীয় লেখা

ভারতীয় ভাষা-- হিন্দিটা খুব অল্প জানি। পড়তে হবে হ্যাঁ । যে যেমন আপনি বাংলাটা বলেন সেরকম পড়তে হবে। যখন ট্রানস্লেটেড তখনি যেমনি বেরোচ্ছে তেমনি পড়তে হবে। যেমন অর্ঘ্যকুসমের এখানে লেখা বেরোচ্ছে আমি জানি না সেটা বানিয়ে আমি বাঙালি আমি একটা মাদ্রাজি নাম দিয়ে লিখলাম সে রকম কিনা ও বললো না না ।


সাহিত্যে আন্দোলন দেখছেন? 

সাহিত্যে মুভমেন্ট খুব গোলমাল হয়ে গিয়েছে। সাহিত্যে এখন হয়েছে কি জানেন? আমি ভীষণ বিরক্ত। আপনার কথা আমি কিছ বলতে পারব না। হঠাৎ দারিদ্র্যের কথা, হয়তো বস্তির কথা বলে বসলাম। সোসাল কনটেন্ট এটাতে, হোল ভারতবর্ষে এইটাতে ভুগছে ।

আপনি যদি ইংরেজিতে ফেমিনা অমুক তমুক পড়েন হয়তো বলবেন লাইট, আপনারা হয়তো পড়েন না কিন্তু কি রকম লাইন থাকে 'য়ু ক্যান ফ্রিলি বরো লুঙ্গি ফ্রম ইয়োর বয় ফ্রেন্ড' কি সব লাইন। জাতটাকে তৈরি করছে কোথায় আপনারা দেখতে পাচ্ছেন না। এই যে ধরুন, কতকগুলো জিনিস আমি বিশ্বাস করি ছেলেমেয়েদের জানার দরকার নেই। আপনার বাবা-মা যখন কথা বলতেন তখন আপনাকে বলতেন চলে যা । এখন সেটা বলা হয় না তো । [এখন এইটুকু ফ্ল্যাটে কোথায় আর যেতে বলবে?] --এইটুকু ফ্ল্যাট। ফ্ল্যাটটাকে দোষ দেয় না। নিজের অপদার্থতা যে আমি বড় ফ্ল্যাটে থাকতে পারছি না, না, ওদের সব জানা উচিত। উল্টে নিয়েছে বুঝতে পেরেছেন? আমি ফ্ল্যাট বড় করতে পারছি না জীবন যুদ্ধে হেরে গিয়ে সে না বলে না না ওদের সব জানা উচিত। এই ভাবে করছে। সমস্ত জিনিসটাকে দুটো ট্রেন্ডে ভাগ করে নিয়েছে। --ঐ পত্রিকাগুলো পড়ে দেখবেন।

নি [--মানে আপনি লেখক হিসেবে এখনকার সাহিত্যে দেখতে পাচ্ছেন-- পভার্টি আর সেক্স । ]

--ঐ সোশাল কনটেন্ট নিয়ে এখন হয়েছে এইসব । এবং সব সময়ে সায়েন্টিফিক [ঠাট ] একটা লার্নিংয়ের পার্ট করে যেতে হবে। অদ্ভুত ভাবে র‍্যাশনালাইজ করে যাচ্ছে ।

তবে এতে সাহিত্যের কোনো ক্ষতি হবে না। সাহিত্য তাদের মাথার উপর দিয়ে যায় না। সাহিত্য যায় আপনাকে আমাকে মুখ টিপতে টিপতে নইলে এত বড় ট্রেন্ডটা থাকতে পারতো না ।


টিভির ফল

--ভাল হবে। বুদ্ধিজীবীরা বল পাবে। মাস্‌-এর জন্য ওটা তৈরি হবে। যদি হিন্দুমতে নেন ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ইত্যাদি হোল ক্লাস আবার ক্লাসিফিকেশন হচ্ছে বুদ্ধিতে তারা একেবারে ঐ রকমই।-- আপনি, আমি আমরা আলাদা হয়ে যাব। 

নি [--সমাজ এরকম ভাগ হওয়াতে আমাদের কিছু ক্ষতি হবে না? ] 

-- কিছু ক্ষতি হবে না। আপনি তো একদিনে এখানে আসেন নি। চার হাজার বছর ধরে আপনি এসেছেন । অতএব আপনার ক্ষতি কেউ করতে পারবে না। সমাজের ক্ষতি হলে আমাদের কী এসে যাচ্ছে? আপনি তো পূর্বজন্মের সুকৃতির ফলে আপার ক্লাসে জন্মেছেন। আপনার সঙ্গে কী মতলব, আপনার সঙ্গে কোনো লোকের, গভর্নমেন্টের মতলব নেই, কারু নেই । আপনি আপনার স্বামীপুত্র নিয়ে রয়েছেন আমিও আমার সেরকম রইছি । 

নি[--কিন্তু আজকালকার দিনে কোনো ক্লাস তো একেবারেই স্থায়ী নয়। ]

--ঠিক বলেছেন । যেমন আগে একটা অ্যারিস্টোক্র্যাট ক্ল্যাস ছিল, সারা ভারতে বিরাট । চাকর পেছন ফিরলে তার চাকরি চলে যেত। আমার মামার বাড়িতে লখনউতে দেখেছি ঘরেতে ঢুকলো ঢুকেই সে তো আর পেছন ফিরতে পারবে না আমার সামনে, সে আবার ব্যাক করে চলে যাবে। এখন তা হয় না। কমুনিস্টরা একে ফিউডাল ফিউডাল বলে গ্রুপিং করছে। এটা অত্যন্ত সহবৎ এটা রামচন্দ্রের কাল থেকে রয়েছে। 

ক্লাসটা যেন আর্থিকভাবে চলে গেল। মেন্টাল এইটা তো রয়েই গেছে । তা না তো আপনি পড়ছেন কি করে জানছেন কি করে জানবার ক্ষুধাটা, জানবার ইচ্ছেটা এইটা হচ্ছে আপার ক্লাস । আপনি যদি কোনো গ্রামে যান--বাংলাদেশে, আসামে, পুণাতে আপনি যা-ই জিগগেস করুন সে উত্তর দেবে না। দেবেনা, দিতে পারবে না। 

[ঐ ক্লাসটা তো বাড়ছে। ]

--ও ক্লাস তো বাড়তে পারে না। এটা খাব একগয়ে কথা হলো, কিন্তু এটা

বাড়তেই পারে না। তাহলে আমাদের জন্মই হতো না । নি[-আমরা সোশাল সায়েণ্টিন্টরা ভাবি, এই যে ভাগ হয়ে যাচ্ছে ক্লাসগলো এদের ভিতরে কমানিকেশন হওয়াটা দরকার। আমরা আশা করি সাহিত্য সে পথ দেখিয়ে দেবে। আমরা আটকে যাই কেন না। আমরা দেখতে পাই না। এ ব্যাপারে কি সাহিত্যিকদের কোনো ভূমিকা নেই ? ] 

--ভূমিকা আছে। স্নেহ কথাটাকে রেখে যাব, আমরা প্রেম কথাটাকে রেখে যাব । আমরা শ্রদ্ধা কথাটাকে বাঁচিয়ে যাব। এই যে সব ক্লাস আসছে। এ ক্লাস কথাগুলো জানতে পারবে। এ কথাগুলো ইন্টারপ্রিট করতে পারে, নিজেদের মধ্যে প্রোপাগেট করতে পারে। 

আমরা সাহিত্যয় কী করি ? আমরা কতকগুলো সুন্দর কথা কতকগুলো সুন্দর ভক্তিরস এই কথাগুলো--যেমন ছেলেবেলাতে দেখলাম ওয়র অ্যান্ড পীস। তেমনি কোনো বইয়ে ভক্তির কথা, পিতৃস্নেহ, মাতৃস্নেহ, এটাতে স্ত্রীর ক্যারাকটার খুব চমৎকার রয়েছে অর্থাৎ এরকম হওয়া উচিত। 

ধরুন যেমন ফিল্ম-এর হীরো থেকে ছেলেরা করে তেমনি আপনি স্নেহ কথাটা রেখে যান সেটা মানুষের থাকবে, ছেড়ে যেতে পারে না। এ ছাড়া তো নেই। ভেবে দেখুন। 

আমাদের দেশকে লম্বা লম্বা নামগুলো শিখিয়ে যেমন মার্শাল প্রুস্ত্‌ বলেন--এর কোনো--হয় না। আমাদের দেশের লোক কী বলেন দেওয়া উচিত যাতে করে আপনার কানেকশন হয়। কতকগুলো সুন্দর সুন্দর উর্দু বয়েৎ রয়েছে, ছোট ছোট কোটেশন তার মধ্যে রয়েছে ভালবাসা ভক্তি, স্নেহ,--কোথায় কোনটা কোট্‌ করতে পারি। যে একটা বস্তি থেকে এল সে একটা তার বোনকে দেবার সময়ে ওরই মধ্যে থেকে পদ্য বের করলো। ও পদ্যটা বোন পড়ে এত ছোট বুঝতেও পারে না কিন্তু সে বললো এ পদ্যটা খুব ভালো। এটা আমায় দাদা দিয়েছে ক্লাসের মেয়েকে দেখাল, মেয়েরা বললো, তাই তো।-- অনেকদিন পর হয়তো এটা কাজ করলো। 

আমরা সব পৃথিবীর লোকেরা বোকা হয়ে গেছি। ভাবছি যে পৃথিবীটা আমারই তৈরি। চঞ্চল হয়ে একী একী হলো। আরো! এত বড় ফুলিশনেস আর নেই। যার সৃষ্টি, সে ঠিক দেখছে। [ দেখছে?]


অন্যের লেখায় নিজের প্রভাব 

--না, আমি দেখিনি।--আমি দেখলাম যে আপনি অত্যন্ত আপার ক্লাসের লোক এইর'ম করে গাড়িতে চড়েন কিন্তু হঠাৎ সেই ভাষাটা দিয়ে একটা লোক বললো 'কোদাল দিয়ে কাটেন।' আমি কোদাল লিখবই না। তাহলে সেটা ইনফ্লুয়েন্স না। সেটা হচ্ছে বরোড কতকগুলো বাক্যের সিনট্যাক্স । দ্যাট ইয নট ইনফ্লুয়েন্স। 



গল্পে থীম থাকা না থাকা

--থীম প্রধান বিষয়ে লেখা উচিত কেননা গল্প বলতেই তাই । এই যে ফরাসী থেকে কায়দা এসেছে, কতকগুলো চালিয়াত মার্শাল প্রুস্ত টুস্ত। আমারই একটা আর্টিকল বেরিয়েছিল আমার একটা লাইন ছিল তাতে প্রেসে বললো একী লিখেছেন? আমি বললাম আমি বিশ্বাস করি না মশাই, তবে আপনি বলেছেন আমি লিখে দিয়েছি । জাঁ পল সার্ত, মার্শাল প্রুস্ত-এ আমার বিশ্বাস নেই। নাইনটিনথ সেঞ্চুরি লেখকের থেকে আমার ধারণা আমি জেনেছি এ অতি বাজে লেখা। বাজে লেখক বলছি না বলছি তাদের তুলনায় কিছ নয়। এখন বলতে পারেন আমি নাইনটিনথ সেঞ্চুরি মনে নিয়ে বসে আছি। তারা একটা যুদ্ধ দেখেছে। ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড ওয়ার, তারা তা অ্যাকসেপ্ট করেছে।

--থীমটা বলতেই হবে । লিখতে লিখতে আস্তে আস্তে মনে আসে ওসব তারা খুব ট্যালেন্টেড লেখক। 

আমার ধরুন একটা গল্প ছিল। খুব মেলোড্রামাটিক মানে কমন অ্যাকসেপ্টেড সেন্সে মেলোড্রামাটিক। এই রিপেনটেন্স, সেই গল্পটা--গত বছর ঠিক হলো এই ইন্টারপ্রিটেশন হবে তখন গল্পটা তৈরি হলো । গল্পর একটা ঘটনা থাকে, কিন্তু ঘটনা ইজ নো গল্প। 

বঙ্কিমচন্দ্র যেমন বলেছিলেন সাহিত্য কি লোক-শিক্ষার জন্য? 

--ওটা রামকৃষ্ণ সাধু প্রথম গিরীশ বাবুকে গিয়ে বললেন, না, না, ও কাজ করুক লোকশিক্ষা হবে । থিয়েটার । লোকশিক্ষার জন্য শঙ্করাচার্য, সবাই লোকশিক্ষার জন্য, ভারতের মধ্যে শ্রীমদ্ভাগবতে কথাটা কৃষ্ণ পর্যন্ত বলেছেন। লোকশিক্ষা, লোক সংগ্রহ। আমি যা করব লোকশিক্ষা। আপনার মা নিশ্চয়ই বলেছেন একী করছ ছোট ভাই বোনগুলো শিখবে । তার মানেই আপনার রেসপনসিবিলিটিটা আপনার মা-বাবা আপনাকে ধরিয়ে দেন। 

আকাদেমি অন্যদেশে ভালো হয়। আমাদের দেশে এখনো সে শ্রদ্ধা নেই। আকাদেমির কী করা উচিত ছিল? মালয়ালমে কী হচ্ছে গুজরাতিতে কী হচ্ছে এখানে জানিয়ে যাওয়া! আগে ছিল নবদ্বীপ। অনেকদিন ধরে ভারতবর্ষ এভাবে এক হয়েছে। আজকে পুণাতে কী হচ্ছে কোথায় কী হচ্ছে আমরা জানি না। ভারতবর্ষ থেকে ভক্তিটা উঠে গেছে ।


কমলকুমার মজুমদারের ভাষা

--এখনই হাই টাইম হিন্দি বাংলা মারাঠি সমস্ত মিলিয়ে একটা গ্রামার চাই। গ্রামারটা এখন দরকার এ আর ও গ্রামারে চলবে না ।

আমি আপনার কথাটা স্পষ্ট করে বলতে পারছি না। টুক করে ছেড়ে দিয়ে যাচ্ছি। যেমন আমরা অনেক সময়ে লিখি আপনার ভাষা বর্ণনাতীত। এখন বর্ণনাতীত সাবজেকটিভ কোয়ালিটিটা আমার মধ্যে এখনও নেই। কিন্তু দেখা যাচ্ছে তাহলে আমরা সে অবজেক্টকে ছেড়ে দিই। অথচ দেখছি যে ইনার অবজেক্ট, ধরুন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ভাষা সম্বন্ধে বলতেন--অনেক কথা, যেমন মধুসূদন মেলাঙ্কলিক, কেশব সেনের একটা কথা--করতে করতে সাবসট্যানটিভ কথাটা যেমন বেড়েছে তেমনি তার জন্যে তখনি খানিকটা ভিতরটা ওপর হচ্ছে । হৃদয়াবেগ । হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বলতেন, হৃদয়াবেগ যদি ক্রমশ ওপন হয়--এককালে আপনি একটা কথা ধরতে পারতেন না । যেমন একটা ছোট ছেলে তার বাড়িতে মরলে সে তখনো হাসছে, তখনো কিছ করছে। কিন্তু যখন তার রিলেশনশিপটা তার মা বাবার সঙ্গে এলো, তার মা বাবা যদি গত হয় তখন সে আর কেঁদে কূল পাবে না। ঠিক তেমনি এক একটা--হয়তো তার সঙ্গে আমার এক্সপিরিয়েন্সের যোগাযোগ নেই--পড়তে পড়তে ''অগ্নি আমার ভাই'' যেখানে তিনি বলছেন, এইবারে আমি বুঝতে পারছি জিনিসটা কী বলতে চেয়েছেন। এখন সেই ভুলতে চায় সেই যে মন ভুলছে সেইটাকে ভোলাতে গেলে তা'লে আমার কোথায় কোথায় ভাষার কী কী হচ্ছে--একবার বিষ্ণু দে মশাই লিখে দিলেন আমি নাকি ফ্রেঞ্চ সিনট্যাক্স-এ লিখি । প্রথমত আমার ও সব সম্বন্ধে জ্ঞানও নেই। ফ্রেঞ্চ সিনট্যাক্স কাকে বলে কী বলে আর উনি কোত্থেকে জ্ঞান পেয়েছেন তাও আমি জানি না। 

নি[--এ ভাষা কি বিশেষভাবে আপনার নিজের বলার জন্য প্রয়োজন?] 

--আমার বলার জন্য, আমার ভারতীয়দের জন্য এই ভাষাটা দরকার। আপনাকে এখন সামাজিক--কি বলবো,--ভোটদাতা নাগরিক তৈরি করছে। কিন্তু আপনি প্রথমত নাগরিক নন। আপনি বিরাট ঐতিহ্য থেকে আসছেন। আজকে দাঁড়ালে হয়তো হাজার হাজার লোককে আপনার কথা শুনতে হবে। দুটো মিলিয়ে তো একটা। 



ভাষা ছবি ফোটে হ্যাঁ

--এখন ভেবে দেখেছি ইমেজের সঙ্গে লেখার সঙ্গে সম্পর্ক নেই। ওটা এসে যায়। আর এক একটা লোক থাকে আমি এই রকম করে গুছিয়ে লিখব । একটু এই রকম করবো। স্পষ্ট করবো। তার পরে করতে করতে মনে হয় আরে, আমি তো এটা ভুল করছি। কেবল মাঠ কোঠা এইভাবে দাঁড়িয়ে আছে কিন্তু শ্রদ্ধাটা যে কি ভক্তিটা যে কি তাতো লিখতে পারছি না--এর তো ছবি নেই এর পোয়েটিক ইমেজ যা সে তো সাংঘাতিক সেটা তো এর মধ্যে একেবারেই রইল না। 

আমার মতিলাল পাদরীতে যেখানে ভক্তি বা বাৎসল্য বলা উচিত ছিল সেটাকে স্পষ্ট করতে হলে একটা নভেলে দাঁড়িয়ে যায় । সেখানে শুধু রিপেন্ট করার লাইনটাতে হয়তো আপনি বা নিয়েছেন এটা--পিতা পুত্রের সম্পর্ক। 



জ্যোতিষী নির্ভরতা

--আমার বাবা বলতেন ওটা হলে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গীতাতে বলেই দিতেন আমাকে না বিশ্বাস করে পাড়ার রমেশ জ্যোতিষীকে বিশ্বাস করো। আমার আপত্তি কারো সম্বন্ধে নেই কোনো উৎসাহও আমি দিই না। আমি নিজেকে নিয়ে--আমি অত্যন্ত ভারতীয়। আমি নিজে, অমুক, তমুক, আত্মীয় স্বজনকে বিশ্বাস করি।

আর গুরু? 
--ওটা আপনাকে গোপনে বলি ওটা হচ্ছে পাবলিক রিলেশনস্‌। 





কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন